যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের (পূর্ব প্রকাশিতের পর)
৩
আমি পড়াশুনো করেছি মফঃস্বলের একটি সাদামাটা বাংলা মাধ্যম স্কুলে।
স্কুলের ছাত্রসংখ্যা খুব বেশি নয়, প্রত্যেকটা ক্লাসে দুটো করে সেকশন। আমি বরাবরই ভাল ছাত্র, ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকতাম। বিনয়ী এবং শান্ত স্বভাবের হওয়ায় সব শিক্ষকই আমাকে পছন্দ করতেন। খেলার মাঠে আমাকে বিশেষ দেখা যেত না।
পড়াশোনা ছাড়া আর একটা ব্যাপারে আমার একটু খ্যাতি ছিল। আমি ভাল আবৃত্তি করতে পারতাম। কমবয়স থেকেই এই ছোট শহরে আমার আবৃত্তির সুনাম ছিল।
এই আবৃত্তি শিক্ষার জন্যে আমি একজনের কাছে মাঝেমধ্যে যেতাম। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়, এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র, নাম রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। ভালো আবৃত্তি করতেন, পরবর্তীকালে বাচিক শিল্পী হিসেবে তাঁর বেশ নাম হয়েছিল।
এই রজতদার বাড়িতেই আমার সঙ্গে সম্পুর্ণ নতুন একটি দর্শণের পরিচয় হয়। হ্যাঁ, পড়তে গিয়ে আমার মার্ক্সবাদকে একটি দর্শণই মনে হয়েছিল। স্কুল শেষ হওয়ার আগেই আমার মার্ক্সের বেশ কিছু লেখা পড়া হয়ে যায়। অবশ্য বাঙালি লেখকদের তর্জমায়। মার্ক্সের তত্ত্ব বেশ শক্ত, গভীরভাবে না বুঝেই আমি এই জার্মান দার্শনিকের ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ পথ, যা তিনি শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির জন্য নির্ধারিত করে গিয়েছেন।
হয়তো স্কুলজীবন থেকে বেশি বই পড়ার জন্য আমার মধ্যে আদর্শের ভাবালুতা ছিল। মার্ক্সবাদ বিষয়ে পড়তে পড়তে আমি একটা শোষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। তখন খুব সুন্দর কাগজে অনেক রঙিন ছবিওয়ালা ‘সোভিয়েত দেশ’ একজন শিক্ষক বিনা পয়সায় দিয়ে যেতেন আমাদের বাড়িতে। ‘সোভিয়েত নারী’ও দেখেছি।
রাশিয়াকে মনে হত স্বপ্নের দেশ, যেখানে শ্রমিক-কৃষকের কোনও দুঃখকষ্ট নেই। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম, জীবনে যেন একবার রাশিয়াতে যাওয়ার সুযোগ হয়। অনেক পরে আমার এই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়।
এইখানে একটি অভিজ্ঞতা, যা ভবিষ্যৎ জীবনে আমার ধর্মচিন্তাকে প্রভাবিত করেছে, লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার। আমার একজন মাস্টারমশাইয়ের (উনি অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ ছিলেন) সংগ্রহ থেকে নিয়ে আমি কিছু ধর্মীয় পুস্তক পড়েছিলাম। বেশিরভাগ বইয়েই রয়েছে বেশ কিছু বাণী এবং কিছু কাহিনি, যাতে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কিছু আচরণবিধি রয়েছে। অর্থাৎ কিছু অনুশাসন, যা পালন করা অবশ্যকর্তব্য।
পড়লেই বোঝা যায়, এসব কোনও দৈবমুখনিঃসৃত নয়, কিছু প্রাজ্ঞ মানুষ আদর্শ সমাজের আচরণবিধি নির্দেশ করে দিয়েছেন। এভাবেই আস্তে আস্তে আমার পূজা-পাঠ-আরাধনা বা নির্দেশিত আচরণের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। ধর্মগ্রন্থগুলোকে আমার এক ধরনের সাহিত্য মনে হতে থাকে।
কিন্তু সত্তরের কলকাতা যে বিপ্লবের আগুনে ফুটছে, সেই নকশালবাড়ি আন্দোলন সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা ছিল না।
বর্ধমান নামের যে ছোট্ট মফঃস্বল শহরটিতে আমার বড় হয়ে ওঠা, সেটি তখন ছিল বেশ শান্ত, নিরিবিলি। লোকসংখ্যাও ছিল এখনকার অর্ধেক। অনেক গাছ-পালা, পাঁচিল ঘেরা ফলের বাগান, অনেক পাখি, আর ছিল কয়েক হাত অন্তর পুকুর-ডোবা। পিচের রাস্তা হাতে-গোনা, বেশিরভাগ রাস্তাই কাঁচা আর তেমন চওড়া নয়। তাছাড়া ছিল অসংখ্য সরু সরু গলি। সেই শান্ত মফঃস্বলে ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ কানে এসেছিল শুধু।
নকশাল আন্দোলনের আঁচ আমি প্রথম অনুভব করতে শুরু করি সমীরের সঙ্গে, তার ইডেন হিন্দু-হোস্টেলের ঘরে। দোতলার একটি ঘরে থাকত সমীর। তার ঘরে আর কে কে স্থায়ী বাসিন্দা বোঝা শক্ত। সবসময়ই তার ঘরে ছ-সাতজন ছেলে, কখনও দশ-বারোজন, চা-সিগারেট, তার সঙ্গে উত্তপ্ত আলোচনা এবং বিতর্ক।
প্রথমদিকে আমার ভূমিকা ছিল প্রধানত শ্রোতার, কিন্তু ধীরে ধীরে আমি এই র্যাডিক্যাল আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। অচিরেই আমি এই আড্ডায় স্বচ্ছন্দভাবে অংশ নিতে থাকি। তখন আমার বয়স আঠারোও পুরো হয়নি। ওই বয়েসে যে কোনও অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে।
আমাকে বইপত্র সাপ্লাই দিত সমীর। তার বই দেয়ানেয়ার একটা বিশেষ প্যাটার্ন ছিল। বই দেওয়ার ঠিক তিনদিনের মাথায় সে বইটি ফেরত নিয়ে যেত। সে আমাকে মাঝে মাঝে সাপ্তাহিক ‘দেশব্রতী’ পত্রিকাও পড়তে দিত। সেই পত্রিকা সকালে দিয়ে আবার বিকেলেই ফেরত নিয়ে যেত। আমাকে বলত, এসব বই মেসে রাখা ঠিক নয়। কতরকম লোক আসে। বিপদ হতে পারে।
একবার আমাকে চিনে ছাপানো একটা রেড বুক এনে দিয়েছিল। তখন এই বই অনেকের কাছে গীতার মতন। দাম ছিল বোধহয় দশ টাকা। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, যতটা আশা করেছিলাম, আমার বইটি তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি।
তখন কলকাতা এবং আশপাশের জেলাতেও স্কুল-কলেজের ল্যাবরেটরি ভাঙা হচ্ছে, কোথাও ভাঙচুর করা হচ্ছে লাইব্রেরি। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, স্বামী বিবেকানন্দ সহ অন্যান্য মনীষীদের মূর্তি ভাঙা বা তাঁদের ছবি পোড়ানোর কাজ চলছে। এই মূর্তি ভাঙা ছিল নকশাল আন্দোলনের অন্যতম বিতর্কিত বহুনিন্দিত একটি পর্যায়। সরোজ দত্ত এই পর্বের উদ্গাতা। যদিও বর্ষীয়ান নেতা সুশীতল রায়চৌধুরী এই কালাপাহাড়ি কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন। এই মূর্তি ভাঙার ব্যাপারটা বেশিরভাগ মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
আগেই বলেছি, সমীর খুব মিশুকে স্বভাবের, ওর মাধ্যমে প্রেসিডেন্সিতে আমার কয়েকজন বন্ধু জুটে গেল। আলোচনার মূল বিষয় অবশ্যই র্যাডিক্যাল আন্দোলন। একটা জিনিস দেখতাম, এখানে স্লোগান একদম অন্য ধরনের।
বর্ধমানে সিপি-এমের মিছিলে (আমিও হাতে-গোনা কয়েকবার গিয়েছি ) স্লোগানগুলো ছিল খুব সাধারণ ইনক্লাব-জিন্দাবাদ টাইপের। আর সব মিছিলেই পেটেন্ট স্লোগান ছিল, ‘সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।’ আমি ভাবতাম, ‘আরে, সব গণ্ডগোলই কি আমেরিকা বাধায় নাকি?’ তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে আমার জ্ঞান সীমিত।
নকশালদের স্লোগান বা দেয়াল-লিখন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস,’ ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান,’ ‘সদর দফতরে কামান দাগো,’ ‘পার্লামেন্ট হল শুয়োরের খোঁয়াড়,’ এইসব তখন কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে লাল অক্ষরে লেখা। পাশে অনেক জায়গায় টুপি পরা মাওয়ের ছবি।
সমীরের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে একজনের কথা এখানে আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়। নামটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত প্রবাল বা প্রণব, এই জাতীয় একটা নাম হবে। খুব অল্পদিনের জন্য তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল।
প্রবাল এসেছিল মেদিনীপুর থেকে। খুব ভাল স্বাস্থ্য, কপালের ওপর এসে পড়া ঝাঁকড়া চুল। আমি ডাক্তারি পড়ি শুনে যেচে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করল। তার নাকি ডাক্তারি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল, কী একটা কারণে হয়নি।
প্রবাল আমাকে ওদের ক্যান্টিনে চা খাওয়াত, মাঝে মাঝে আমার মেসে এসে পার্টির জন্য চাঁদা চাইত। সেই বিলের ওপর মাও-সে-তুংএর মাথায় ক্যাপওয়ালা ছবি, জ্যালজেলে কাগজ। আমি তখন গরীব মানুষ। এক টাকা-দু’টাকা চাঁদা দিতাম। প্রবাল তাতেই খুশি হয়ে চলে যেত। প্রবাল ছিল স্বপ্নদর্শী। সারাক্ষণ গল্পের মতো সে বিপ্লবের কথা বলে যেত। স্বপ্ন দেখত একটা দীর্ঘ জনযুদ্ধের। আগস্ট মাসের এক টিপটিপে বৃষ্টির সকালে একটি রেললাইনের পাশে প্রবালের মৃতদেহ পাওয়া যায়। পেটে এবং গলায় খুব কাছ থেকে ছোঁড়া গুলির দাগ।
কে বা কারা প্রবালকে মেরেছিল তা শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাতই থেকে গেল। পরে সমীর আমাকে জানিয়েছিল, পুলিশ নয়, সম্ভবত পার্টিরই অন্য কোনও গোষ্ঠীর এই কাজ। তখনই সি পি আই এম এলের মধ্যে বিভিন্ন দল উপদলের ভাগ শুরু হয়ে গেছিল।
এ ছাড়াও একটি ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরি। যে কোনও নৈরাজ্যের সময়ে স্থানীয় গুন্ডা-বদমাসরা অতি দ্রুত তার সুযোগ নেয়। এই নৃশংস গুন্ডার দল বানের জলের মতো নকশাল পার্টিতে ঢুকে পড়ে। এদের অনৈতিক কাজের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে পার্টি সম্বন্ধে ভুল বার্তা যেতে থাকে।
এই সময়েই আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে অসীম চট্টোপাধ্যায়ের (তখন কাকা নামেই খ্যাত) বক্তৃতা শুনি। বিরল অভিজ্ঞতা। অসীম তখন প্রেসিডেন্সি কনসোলিডেশনের নেতা। তখন অসীম চট্টোপাধ্যায় আমার মতনই রোগা, গালে চাপ দাড়ি, চোখদুটো ঝকঝকে উজ্জ্বল। অসাধারণ বক্তা, শুধু কথা দিয়ে ছাত্রদের চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করতে পারেন। এই অসীম চ্যাটার্জির সঙ্গে পরবর্তীকালে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয়।
ঠিক দশ বছর পর, আশি-একাশি সালে তখন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডাক্তারি পড়ার জন্য পি জি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি ক্যান্টিনে আমরা দুপুরের খাবার খেতাম। সেই ক্যান্টিনে অসীম চ্যাটার্জি মাঝে মাঝে আসতেন। ডাক্তারদের মধ্যে ওঁর কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল। সাতাত্তরের পর জরুরি অবস্থা উঠে গেলে অসীম চট্টোপাধ্যায় জেল থেকে ছাড়া পান। আবার নতুন সংগঠন, কমিউনিস্ট রেভোলিউশনারি লিগ অফ ইন্ডিয়া তৈরি করে কাজ শুরু করেন।
আমার সঙ্গে যখন দেখা হয়, তখন অতটা শীর্ণ নয়, দোহারা চেহারা, একগাল কাঁচাপাকা দাড়ি, মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা। কথাবার্তা একইরকম আকর্ষণীয়, বন্দিজীবন থেকে ছাড়া পেয়ে আবার নতুন সংগঠন নিয়ে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করছেন। পরে কখনও সুযোগ পেলে, সেই কাহিনি বিস্তৃতভাবে বলা যাবে।
সমীরের আমন্ত্রণে আমি দুয়েকবার নকশালদের গোপন মিটিংয়ে গিয়েছি। ভারী অদ্ভুত সেইসব মিটিং। প্রায়ান্ধকার ঘর, সব জায়গাতেই একটা বুড়ো মতন লোক কেতলি আর ভাঁড় এনে চা দিয়ে যায়। এই মিটিংগুলোতে সকলেরই নিজস্ব বক্তব্য থাকে, কেউ কারও কথা চট করে মেনে নিতে চায় না। মিটিং যত গড়ায়, আলোচনার উত্তাপ তত বাড়তে থাকে। দু-তিনটে মিটিং অ্যটেন্ড করার পর, আমি সমীরের আমন্ত্রণ এড়িয়ে চলতে লাগলাম।
অন্যদিকে সাহিত্যের নেশা তখন আমার রক্তে মিশে গেছে। প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন পড়ছি, গোগ্রাসে গিলছি মালার্মে থেকে ভাস্কর চক্রবর্তী। অনেক রাত্রে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মনের ভেতর ভেসে আসছে কবিতার লাইন। সমীর কবিতা লেখে না, কিন্তু তার ছোটোগল্পের হাত খুবই ভাল। সেই বয়েসেই লিটল ম্যাগাজিনের সীমানা পেরিয়ে বাণিজ্যিক পত্রিকায় তার লেখা বেরিয়েছে।
সমীরের সঙ্গে আমার দুটো আলাদা বৃত্ত ছিল। একটির বিষয় নকশাল আন্দোলন, প্রধানত ইডেন হিন্দু-হোস্টেলে, আর একটি ছিল সাহিত্য সম্পর্কিত, যার কেন্দ্রে ছিল কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস। সমীর প্রায় প্রতিদিনই কফি হাউসে আড্ডা মারত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোটো ছোটো টেবিলে তুমুল আড্ডা। আমার এই কফি হাউস কালচার ভালই লাগত, কিন্তু আমি সময় পেতাম কম, মাঝে মাঝে সমীরের সঙ্গী হয়েছি।
সমীর ছিল কফি হাউসের পরিচিত মুখ। দুপুর বা সন্ধেবেলায় ঢুকলেই বিভিন্ন টেবিল থেকে ডাক আসে। আমাকে তখনও বিশেষ কেউ চেনে না। আমিও কাউকে চিনি না। কফি হাউসের গল্প বলতে গিয়ে আমার একটি স্বীকারোক্তি করা উচিত। আত্মজীবনী তো এক অর্থে স্বীকারোক্তিই। এই কফি হাউসে আমি একজনের সঙ্গে অপব্যবহার করেছিলাম।
