যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের

দুম… দুম… ঠিক কানের পাশে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ! 

দুটো, তিনটে বা চারটে —— শব্দগুলো ঘুম থেকে জাগরণের মধ্যে বজ্রনির্ঘোষের মতো ভেসে এল। 

শিউরে বিছানায় উঠে বসল একটি কিশোর। বুকের মধ্যে ব্রিজের ওপর দিয়ে রেলগাড়ি আসার মতো শব্দ হচ্ছে। মাত্র একদিন আগে ছায়াচ্ছন্ন, শান্ত মফসসল থেকে সে এসে পা রেখেছে মহানগরীর বুকে।

কলেজ স্ট্রিটের একটি মেসবাড়ি আপাতত এখন তার আস্তানা। খুব পুরনো বাড়ি, কলেজ স্ট্রিটের একদম ওপরেই, পাতিরামের বুকস্টলের দুটো বাড়ি পরে। বড়ো বড়ো সবুজ রঙের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, গাড়ির শব্দের জন্য রাতে বন্ধই থাকে। 

বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে, খড়খড়ি ফাঁক করে কিশোরটি যে দৃশ্য দেখল, তা এরপর সারাজীবন তার দুঃস্বপ্নে হানা দেবে।

রাস্তার উজ্জ্বল আলোর নীচে, ট্রামলাইনের ওপর রক্তাক্ত একটি যুবক পড়ে আছে। একটা পা হাঁটুর কাছে ভাঁজ করা, মাথাটা একপাশে কাত হয়ে আছে। তার শোয়ার ভঙ্গি থেকে বোঝা যায় দেহে প্রাণ নেই। 

সব সময়ের জমাট কলেজ স্ট্রিট এখন নিঃশব্দ, নির্জন। কিশোরটি বাঁ দিকে চেয়ে দেখল – রাস্তা শূন্য। ডান দিকে চেয়ে দেখল – রাস্তা শূন্য। এই বিপুল শূন্যতার মধ্যে ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো শায়িত একটি যুবক। 

একটু পরেই রাতের নৈঃশব্দ্যকে চুরমার করে, জান্তব আর্তনাদ তুলে এসে দাঁড়াল একটা বিশাল কালো ভ্যান। জাল লাগানো বড়ো পুলিশের গাড়ি, গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল পাঁচ-ছ’জন উর্দিধারী পুলিশ। দু’জনের হাতে রাইফেল, তারা ঘিরে ধরল জায়গাটাকে। আর তার পরেই সাইরেন বাজিয়ে হাজির হল একটা অ্যাম্বুলেন্স। জানলা থেকে কিশোরটি দেখছিল অ্যা ম্বুলেন্সের মাথায় নীল আলোটা ঘুরেই যাচ্ছে, তবে এখন শব্দহীন। গাড়ি থেকে স্ট্রেচার হাতে নেমে এল তিন-চারজন টুপি-পরা লোক। অভ্যস্ত হাতে তারা যুবকটিকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল। 

 কিশোরটি জানে, খুব কাছেই কলকাতা মেডিকেল কলেজ, অ্যা ম্বুলেন্সটি সেখানেই যাবে। 

 রাত এখন কত? ঘড়ির দিকে তাকাল কিশোর। এখন মধ্যরাত।

দুটো গাড়িই চলে গেছে। 

শুধু একটা রক্তের ধারা বয়ে চলে যাচ্ছে, কলেজ স্ট্রিট পার হয়ে, চব্বিশ পরগণা পার হয়ে, কাঁটাতার লাগানো সীমান্ত পেরিয়ে – যা পার হয়ে কিশোরের পিতামহ-পিতামহীরা এসেছিলেন একদিন, এরকমই একটি রক্তের নদী পার হয়ে। 

এক

আমি কলকাতায় এসেছিলাম উনিশশো সত্তর সালের মে মাসে। তারিখটা মনে নেই। অসহ্য গরম কলকাতায়। বেলা এগারোটা নাগাদ শিয়ালদা স্টেশনে নেমে, বাবার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমি পৌঁছই নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে। মফসসল শহর থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিয়ে এসেছিলাম। তখন এগারো-বারো ক্লাস আলাদা হয়নি। একবারেই এগারো ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা হত। 

আমার বয়স তখন সতেরো। ঠোঁটের ওপর সবে গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। ছোটবেলায় দু’একবার বাবা-মার সঙ্গে কলকাতায় আত্মীয়দের বাড়িতে এলেও, এই প্রথম আমার দীর্ঘস্থায়ী ভাবে কলকাতায় আসা। ভয়-বিস্ময়মিশ্রিত চোখে আমি চারদিক দেখছিলাম। এত বড়ো কলেজে আমি পড়ব? 

আধঘণ্টার মধ্যেই অ্যাডমিশনের কাজ সম্পুর্ণ হয়ে গেল। আমি তো যাকে বলে খুশিতে ভাসছি, বাবার মুখেও নিশ্চিন্তির ছাপ। 

কিন্তু এর পরই সমস্যা দেখা দিল। ভর্তি তো হলাম, কিন্তু এই মহানগরীতে আমি থাকব কোথায়? হস্টেলের খোঁজ নিতে গিয়ে মাথায় বাজ পড়ল। 

নীলরতনের একটিই হস্টেল, সেই মেন হস্টেলে জায়গা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন জমে আছে, অন্তত এক বছরের আগে কোনও সিট পাওয়া যাবে না। বাইরে থাকার অনেক খরচ –এক বছর, দেড় বছর, যাই হোক, এতদিন থাকব কোথায়?

আমি নীলরতনে ভর্তি হচ্ছি জেনে আমার এক মাসতুতো দাদা দেখা করতে এসেছিলেন। উনি একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, সব মেডিকেল কলেজেই ওঁর যাতায়াত আছে। বলিয়ে-কইয়ে মানুষ। ওঁরা শিয়ালদার কাছেই প্যারামাউন্ট সিনেমার পাশে থাকেন। আমরা জায়গা খুঁজছি শুনে অভয় দিলেন, কোনও চিন্তা নেই। তারপর, হ্যারিসন রোড আর কলেজ স্ট্রিটের জংশনের কাছে একটা জায়গার খোঁজ দিলেন।  

সদানন্দ আবাস, বা, ওই ধরনের কিছু একটা নাম, যদিও দাদুর মেস বলেই এলাকায় পরিচিত। দু-চারজন চাকুরিজীবী ছাড়া প্রধানত ছাত্রদের ডেরা। একজন বয়স্ক মানুষ মেসটি পরিচালনা করেন, চার্জও বেশি নয়। আমাদের পক্ষে সবচেয়ে দরকারি তথ্য এই চার্জ, কারণ আমার বাবা রেলে একটি সাধারণ চাকরি করতেন। দামি কোনও জায়গায় আমাকে রেখে পড়ানোর মতো সঙ্গতি তাঁর ছিল না। 

প্রায় বিকেলবেলায় বারো নম্বর ট্রাম ধরে আমরা গিয়ে নামলাম কলেজ স্ট্রিট আর হ্যারিসন রোডের সংযোগস্থলে। রাস্তায় গিজগিজ করছে ভিড়। আমি দু’দিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটছি কলেজ স্ট্রিট ধরে। পাতিরামের ম্যাগাজিন স্টলটা (তখন নাম জানতাম না) পার হয়ে আরও দুটো বাড়ি পরে মেসবাড়িটা দেখা গেল। নীচে বড়ো কাপড়ের দোকান, প্রচুর ভিড়। কিন্তু সদানন্দ আবাসে ঢুকব কীভাবে?

একজন মজুর গোছের লোক দেখিয়ে দিল, দুটো বাড়ির মধ্যে একটিমাত্র মানুষ ঢোকার মতো সংকীর্ণ একটা পথ। গলি দিয়ে ঢুকে ভেতরে একটা বড়ো উঠোন, তিনদিক ঘিরে ঘর উঠেছে। শ্যাওলা-পড়া উঠোনের একধারে একটা বড়ো চৌবাচ্চা, এই অবেলায় লুঙি পরে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ স্নান করছেন। অবশ্য ভেতরের দিকে টিনের দরজাওয়ালা একটা ঘেরা বাথরুমও রয়েছে। 

বাড়ি দেখে মনে হয় অন্তত একশ-দেড়শ বছরের পুরনো। আমরা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলাম। অনেকগুলো ছোটো-বড়ো ঘর, বড়ো ঘরগুলোকে আবার কাঠের পার্টিশন দিয়ে ছোট করা হয়েছে।

আমার ঘরে, আমাকে নিয়ে আবাসিক তিনজন। অন্য দুজনের মধ্যে একজন বছর চল্লিশের চাকুরিজীবী, আর একজন বছর কুড়ির সিটি কলেজের ছাত্র। রাস্তার দিকে বড়ো জানলার নীচে একটি সরু চৌকি হল আপাতত এই নগরীতে আমার আস্তানা। 

মেসভাড়া আয়ত্তের মধ্যেই, ভর্তি হয়ে, একফালি চৌকিতে আমার বিছানাটি পাততে পাততে একবার ভাল করে ঘরটায় চোখ বুলিয়ে নিলাম। এই শেষ বিকেলেই ঘরের মধ্যে অন্ধকার হয়ে এসেছে, ড্যাম্প-ধরা দেওয়ালে কাঁচা হাতে চুনকাম করা, ঘরের মাঝখানে কড়ি-বরগা থেকে ঝুলছে ঘরের একটিমাত্র ফ্যান। আদ্যিকালের সেই ফ্যানে হাওয়ার থেকে আওয়াজ উঠছে বেশি। 

 বাবা চলে যাওয়ার পর, আমি মেস থেকে বের হয়ে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম। তখন শেষ বেলার পড়ন্ত লাল আলো এসে পড়েছে রাস্তায়। মফসসল থেকে আসা একটি সতেরো বছরের কিশোর দাঁড়িয়ে রয়েছে, একা, এই অচেনা শহরে।

আজ এতকাল পরেও ছবিটি আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। 

দুই

নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে ক্লাস শুরু হয়ে গেল। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, নতুন বিষয়, ক্লাসরুমে দেড়শ জন ছেলেমেয়ের হল্লা – আমার যেন উৎসব মনে হত।                     

এরপর শুরু হল ডিসেকশন অর্থাৎ শবদেহ ব্যবচ্ছেদের ক্লাস। খুব উৎসাহে সাদা অ্যাপ্রন পরে ক্লাস করতে গেলাম। একটি মানুষের মৃতদেহ গভীর অভিনিবেশে কাটা ছেঁড়া করছি, নিজেকে বেশ তালেবর মনে হতে লাগল। 

কলেজে যতক্ষণ থাকি, আনন্দেই কেটে যায়, মুশকিল হত কলেজ থেকে মেসে ফিরে আসার পর। এই মেসে কোনও ডাক্তারি ছাত্র ছিল না। কোনও বোর্ডারের সঙ্গে আমার আলাপও হয়নি। বন্ধুদের মধ্যে আমি বাক্যবাগীশ হলেও অচেনা জায়গায় মুখচোরা।

 আমার ঘরের সিটি কলেজের ছাত্রটি কোনও অজ্ঞাত কারণে আমাকে একটুও পাত্তা দিত না। বড়োলোকের ছেলে, তার সাজপোশাকের চেকনাই ছিল দেখার মতো। হয়তো সে আমাকে গেঁয়ো মফস্বলের ছেলে মনে করত। 

 তাই সন্ধেবেলায় সময় কাটানোর আমার একমাত্র জায়গা ছিল পাতিরামের ম্যাগাজিন স্টল। মেস থেকে নেমে দু’পা হাঁটলেই সেই স্টলটি। অনেক রকম লিটল ম্যাগাজিন সাজানো থাকত সেই স্টলে। বেশিরভাগ পত্রিকাঢ় নামও শুনিনি।  

সেই বয়েসেই, সাধারণ বাঙালি ছেলেদের মতো, আমিও বেশ কিছু হিজিবিজি কবিতা লিখে ফেলেছি। যে মফসসল শহরে থাকতাম, সেখানে দু’একটা স্যুভেনির জাতীয় পত্রিকায়,  আমার কয়েকটা কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে, তখনই নিজেকে একজন কবি মনে করতাম।  দীর্ঘক্ষণ স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ম্যাগাজিন উল্টেপাল্টে দেখতাম,মাঝে মাঝে দুয়েকটা কিনতাম। একটা আশ্চর্য ব্যাপার, দীর্ঘ সময় স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও দোকানের অবাঙালি মালিক (তাঁর নামই কি পাতিরাম? ) আমাকে তাড়িয়ে দিতেন না। সন্ধের কলেজ স্ট্রিট দিয়ে স্রোতের মতো হেঁটে যাচ্ছে অজস্র সুবেশ মানুষ, তার মধ্যে রোগা একটি ছেলে তার স্টলের সামনে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা দেখছে – এই দৃশ্য হয়তো তাঁর খারাপ লাগত না। 

পাতিরামের স্টলে ম্যাগাজিন ঘাঁটতে ঘাঁটতেই আমি আবিষ্কার করি, এই স্টলে বইয়ের কালেকশনও বেশ ভাল। আমি স্কুলজীবন থেকেই বইয়ের পোকা। স্টলের বইগুলো ঘেঁটে প্রথম যে বইটি আমি কিনি, সেটা ছিল আলব্যের কাম্যুর ‘দি ফল।’

 প্রচ্ছদে কাম্যুর ছবি, পেছনে দাম লেখা তিন শিলিং ছ’ পেন্স। তখনকার দিনে বোধহয় তিন-চার টাকা দাম নিয়েছিল। পাতিরাম থেকে আমি অনেক বই কিনেছি, কিন্তু এই বইটির কথা আলাদা করে মনে আছে, কারণ এই বইটির সূত্রেই কলকাতা শহরে আমার প্রথম বন্ধুলাভ হয়। 

তখন সদ্য নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে, পড়াশোনার তেমন চাপ নেই, সন্ধেবেলাটা আর কাটতে চাইত না। একদিন সন্ধেবেলায়, মেসের ঘরে বিছানার ওপর বসে কাম্যুর বইটা পড়ছি, ঘরে আর কেউ নেই, এমন সময়ে একটা ছেলে এসে আমার ঘরে ঢুকল। 

ফর্সা, লম্বা, ছিপছিপে ছেলেটির একমাথা কোঁকড়া চুল, পোশাকআশাক সাধারণ। সে এসেছিল আমার ঘরে যে সিটি কলেজের ছেলেটি থাকে, তার কাছে। তাকে না পেয়ে, আমাকে এই ঘরে দেখে সে প্রশ্ন করল, “তুমি কি এই মেসে নতুন ঢুকেছ? আগে তো দেখিনি!”

ছেলেটি বেশ মিশুকে। বন্ধুর মতো আমার বিছানার একপাশে বসল, তারপর ভুরু নাচিয়ে বলল, “তোমার নাম কী?”

নাম বললাম। আমি ডাক্তারি পড়ি শুনে সে একটু অবাকই হল। এরপর নিজেই জানাল তার নাম, সমীর ব্যানার্জি। আসানসোলে বাড়ি, এখানে প্রেসিডেন্সিতে পড়ে, সেকেন্ড ইয়ার, হিসেব মতো আমার থেকে দু’বছরের বড়ো। 

একটু পরে বলল, “কী বই পড়ছ দেখি!” তারপর বইটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে বিছানার ওপর রেখে দিয়ে বলল, “আজ পর্যন্ত এই মেসে কাউকে কাম্যু পড়তে দেখিনি!” তারপর গালে হাত বুলিয়ে বলল, “কাম্যু পরে পড়বে, এখন ড্রেস-আপ করে নাও, চলো, একটু ডবল-হাফ চা খেয়ে আসি।”

ডবল-হাফ চায়ের নাম জীবনে সেই প্রথম শুনি। সমীরের সঙ্গেই গেলাম কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ভেতরে একটা ছোটো  দোকানে। অপূর্ব সেই চায়ের স্বাদ। পরে সেই চা আমাদের দুজনেরই খুব ফেভারিট হয়ে ওঠে। 

এই ডবল-হাফ চা ছাড়া আরেকটা যে জিনিস আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় করে তুলেছিল – সেটা হল মার্ক্সবাদ।

[ক্রমশ] 

বাড়ি বর্ধমান , পেশায় চক্ষু চিকিৎসক। কর্মজীবনের ব্যস্ততা এড়িয়ে অল্পই সময় থাকে বইপড়া এবং লেখালেখির কাজে। প্রথম প্রেম অবশ্যই কবিতা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত দুটি কাব্যগ্রন্থ , 'এমন নিঃশব্দ তুমি' এবং 'তিন মাস কথা নেই।' প্রথম গল্প প্রকাশিত রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে। একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত এবং একটি উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায়। শখ : সাহিত্যপাঠ। প্রিয় লেখক: মুরাকামি এবং মার্কেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *