ঠগি কাহিনি

ঠগি কাহিনি

‘ঠগি’ – বাংলার রহস্যময় খুনি সম্প্রদায়

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক, উনবিংশ শতাব্দী শুরু হচ্ছে। ভারত তখন তমসাবৃত। মুঘল সাম্রাজ্য অস্তমিত, দেশ ছোটছোট রাজ্যে বিভক্ত, আইন শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। মানুষের জীবন ও সম্পত্তি দুই বিপন্ন। প্রজারা খাজনা দেয় না। চারিদিকে চলছে লুট। পথে পথে খুনি। সৈন্যরাও লুট করছে, রাজপুরুষেরাও লুট করছে, জমিদাররাও লুট করছে। এমনকি ব্রিটিশ সৈন্যরাও লুট করছে। সন্ন্যাসীরা শাস্ত্র ছেড়ে ধর্মের নামে শস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। নাগা সন্ন্যাসী, বৈরাগী, দাদুপন্থী গোসাঁই, বাংলার সন্ন্যাসী, এরা সবাই ছোট ছোট দল করে লুটপাট, খুন জখম করে চলেছে পিণ্ডারীদের মতন, বর্গীদের মতন। সামাজিক জীবনও ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সতীদাহ, সন্তান বিসর্জন, দাসপ্রথা, শিশুহত্যা – নানা কদাচারে সমাজ কালিমালিপ্ত। ভূমিহীন গরিব মানুষেরা সমাজচ্যুত, জাতিচ্যুত, জীবন–জীবিকাচ্যুত। জীবিকা উপার্জনের উপায়হীনতায় ভুগছে। এই সর্বব্যাপী অরাজকতার সময়ে কেউ সিন্ধিয়ার বাহিনীভুক্ত, কেউ জয়পুরের, আবার কেউ বা নিজেরাই অন্ধকারের পথিক হয়েছে। তারা নৃশংস জীবিকা বেছে নিয়েছে — খুন।

সেই সময়ে নানা ধরণের দল পথে পথে লুটপাট ও খুন-জখম করে বেড়াত। সাধারণ মানুষ তার কোন খবরই জানত না। ফাঁসিগীর, ফাঁসুড়ে, ভাগিনা, পাঙ্গু, তুসমাবাজ, মেকফানসা, আরাতুলুকর, তান্তাকেলেরু, ওয়ান্দুলু, ধুতুরিয়া, ঠ্যাঙ্গাড়ে, আরও অনেক নাম তাদের। গ্রামেগঞ্জে লোকের বাড়িতে ডাকাতপড়া এক নিত্ত দিনকার ব্যাপার ছিল। সেই অন্ধকার যুগের সর্বোত্তম প্রতীক হল – ঠগী। নিষ্ঠুরতম, নিপূনতম খুনি। সব খুনির সঙ্গে মিল আছে, অথচ তুলনাহীন।

ভারতবর্ষ গ্রাম প্রধান দেশ। অসংখ্য গ্রামে সাধারণ জীবনযাপন করছে গ্রামবাসীরা। সারা বছর তারা অন্যান্য গ্রামবাসীদের মতই গার্হ্যস্থজীবন পালন করে। বর্ষাশেষে শীতের শুরুতে ক্ষেতের ফসল ঘরে তোলে। দেওয়ালি, পুজো, বা মহরম হয়ে গেলে শুরু হয় তাদের পথে নামার সময়। দলপতি সকলের ঘরে দু’তিন মাসের রসদ রেখে দেয়। যথাক্রমে পুজোপাঠ সেরে যাত্রাশুরু হয় ‘জয় ভবানী’ জয়ধ্বনি দিয়ে। যাত্রার প্রথম কয়েক দিন তারা ক্ষৌরী করে না যেন অশৌচ পালন করছে। খালি পা, দরিদ্র বেশ, মাথায় পুঁটলি – ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে রাস্তার ধার দিয়ে চলে যেন তীর্থ করতে যাচ্ছে। পথে অন্যান্য দল এসে মেলে। রাস্তায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে দেখা হলে একসঙ্গে গল্পগুজব করতে করতে চলে। ‘দিনকাল ভালো না, একসঙ্গে গেলে একটু বল বাড়ে।’ দিনে দিনে অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে, বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নতুন বন্ধুর কোন ধারণাই নেই তারা যাদের সঙ্গে চলছে, এক সঙ্গে খাওয়া দাওয়া গল্পগুজব করছে, তারা নিষ্ঠুরতম খুনি। একদিন ঝিরনি ওঠে — ‘সাহেব সিং তামাকু লাও’ বা ‘পান লাও।’ ব্যাস, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃতদেহ। অদৃশ্য হয়ে যায় নতুন যাত্রীর দল। ভারতের পথে পথে কত যে পথিক হারিয়ে গেছে কেউ তার খবর রাখে না। বাড়ির লোকেরা কিছুদিন অপেক্ষা করে, মন খারাপ করে, তারপর আবার মন দেয় ঘরকন্নার কাজে।

উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান

এরা আদতে কারা? কী তাদের ধর্ম, কী তাদের জাত, কতদূর তাদের বিস্তৃতি? সমস্ত কিছুই ভারতবাসীর অজানা ছিল। এমনকি নিজের পরিবারের লোকজন ছাড়া পাড়াপ্রতিবেশীরাও ছিল অন্ধকারে। ভারতের জনসাধারণ হয়তো এখনও থেকে যেত সেরকমই নিশ্চিন্ত, উদাসীন, নির্বিকার, যদি না ব্রিটেন থেকে আসতেন কর্নেল স্লিম্যান। ১৮২২ সালে আর্মি থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি এলেন মধ্যভারতের সগর জেলায় গভর্নর জেনারেলের বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে। অসাধারণ ভাষাবিদ এবং এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ। ভারতে আসার পর প্রথমে হাতে পড়ল এম থিভেন্টের লেখা সতেরো’শো শতাব্দীর ভারতের বর্ণনা। এই বিবরণে আছে আগ্রা থেকে দিল্লী যাওয়ার রাস্তায় পথিক সেজে খুনির দল ঘোরাফেরা করে। যারা প্রথমে বন্ধুত্ব করে, তারাই সুযোগমত গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। তিনি সাবধান করে দেন অচেনা অজানা লোকেদের সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকতে।

তারপর স্লিম্যানের হাতে আসে ডাক্তার শেরউডের লেখা একটি পাণ্ডুলিপি। তিনিই প্রথম ঠগীদলের বর্ণনা দেন এবং তাদের ভাষার কিছু উদাহরণ লিখে রাখেন। ইতিমধ্যে স্লিম্যান উর্দু, ফারসী, গোর্খালি, হিন্দুস্থানি, পোস্তু, আরবী, সব ভাষাই শিখে ফেলেছেন। তিনি দেখেন যে নমুনাগুলি এক নতুন ভাষার ইঙ্গিত দিচ্ছে। হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফার্সি, তেলেগু, তামিল, কোনো ভাষার সঙ্গে তার মিল নেই। তিনি অচিরে ঠগীদের ভাষাও শিখে ফেললেন। সে ভাষার নাম রামসী। এবার তাঁর ঠগীদের খুঁজে বের করার পালা।

মুসলিম বিজেতাদের পায়ে পায়ে ঠগীদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের নরম মাটিতে পা রেখেছিল। আদিতে এসেছিল সাতটি মুসলমান পরিবার — বাহলিম, ভিন, ভুজসোত, কাচুনি, হুত্তার, গানু, ও তুনদিল। দেশের আবহাওয়া লুন্ঠনের অনুকূল, তাই আর তাদের স্বদেশে ফেরা হয়নি। এদেশেই তারা অরণ্য প্রতিষ্ঠা শুরু করে। হিন্দু মুসলমানের যুগ্ম সাধনায় গড়ে ওঠে ঠগীধর্ম। দুই ধর্মের এক অদ্ভুত সমন্বয়।

প্রথমে এরা দিল্লীর আশেপাশেই বসতি করেছিল। জালালউদ্দিন শাহ তুঘলকের (১২৯০) আমলে প্রায় হাজার ঠগি ধরা পড়ল। সুলতান তাদের নৌকায় তুলে নির্বাসন দিলেন বাংলার লক্ষণাবতীতে। সেই থেকে বাংলায় ঠগীদের সংক্রমণ শুরু হল। যেহেতু বাংলা নদীপ্রধান, ঠগীরা জলের ঠগি হয়ে যায় – নাম হয় ভাগিনা বা পাঙ্গু। তাদের  ঘাঁটি ছিল বর্ধমান। তাছাড়া বীরভুম, সিউড়ি, বাঁকুড়া, কালিনা, এইসব জায়গা তারা প্রভাব বিস্তার করে। এরা যাত্রী সেজে নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াত ও সরল অসাবধান যাত্রীদের নৌকোয় উঠিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলত। তাদের আর কোনো খবরই পাওয়া যেত না। কালক্রমে এদের ভাষা একটু আলাদা হয়ে গেল। যেমন গলার ফাঁসকে এরা বলত আঙ্গুছা, আর ঝিরনি দিত তিনবার বৈঠা ঠুকে।

স্লিম্যান-এর লেখা ঠগ কাহিনি

কিন্তু বাকি সব ব্যাপারে এরা খাঁটি ঠগি। রাজধানি দিল্লী থেকে বিতারিত হয়ে এরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঁচটি পরিবার এসে বসত গাড়ে আগ্রায়। এদের বলা হত আগুরিয়া। আগ্রা-দিল্লীর রাজপথ দৈর্ঘে ছিল চৌদ্দশ ছ’মাইল। তার প্রতি মাইলে তখন ঠগ। রাস্তার দু’ধারে কবর। সত্যিই, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। এদের মধ্যে এক দল চলে গেল দক্ষিণ ভারতের আর্কটে। ঠগিদের মধ্যে এরা সবচেয়ে বনেদি ঘরানা। সপ্তম গোষ্ঠী হল মুলতানি ঠগি। এরা ভ্রাম্যমান। কোথাও এদের স্থায়ী ঠিকানা ছিল না এবং ঝোরা নায়েকের শিষ্য হয়ে ক্রমশ এরা আসল ঠগিদের থেকে আলাদা হয়ে গেল। ঝোরা নায়েক আদিতে মুলতানি ঠগ হলে কী হবে, সে মেকফানসা বলে আরেকটি ঠগি শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের ভাষা একটু আলাদা। হত্যার প্রনালী এক হলেও মৃতদেহ নিয়ম মেনে দাফন করত না। শিকারদের সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকলে তাদের নিয়ে বিক্রী করে দিত বেদেদের কাছে। ছোট বাচ্চা, বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চার তখন খুব চাহিদা দিল্লি, লখনউ, হায়দ্রাবাদ, পুনা, লাহোর, এই সব শহরের বিলাসপল্লীতে। এছাড়া ঠগিদের কিছু স্থানীয় ঘরানাও ছিল। রাজস্থানের সুসিয়া, অযোধ্যার জুমালদেহী, আর আদি মুলতানি চিঙ্গুরিয়া। এদের মধ্যে পার্থক্য ছিল চালচলনে আচার-ব্যাবহারে। সুসিয়ারা ব্যবসায়ীর বেশে দামি পাল্কী চড়ে পথে নামত। আর্কটের ঠগিদের আবার ঠাটবাটই আলাদা ছিল। রাজকীয় বেশ, হাতে বেতের ছড়ি, চাকর বাকর, বেয়ারা বাবুর্চি, হুকাবরদার – সব মাইনে করা লোকজন।

আলাউদ্দীন খিলজির সময়ে ঠগিদের কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়, তারপরে বাদশা আকবরের আমলে শ’পাঁচেক ঠগি ধরা পড়েছিল। সারা ভারতে – পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ, সুসিয়া হোক বা চিঙ্গুরিয়া, কিছু কিছু তফাৎ থাকলেও এরা সকলেই ছিল ঠগি। কোথাও হিন্দু বেশি কোথাও মুসলমান, কোথাও বা সমান সমান। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে তাদের পরিচয় কিন্তু যে নামেই তারা পরিচিত হোক না, তারা সকলেই ঠগি – তাদের হাতিয়ার এক, ভাষা এক, জীবন এক, পেশা এক, এবং ধর্ম এক।

ঠগিদের পেশা ছিল রাজপথে পথচারীদের আস্থা অর্জন করা এবং সুযোগ মতন তাদের হত্যা করে জিনিসপত্র লুট করা। হাতিয়ার একটি সামান্য হলুদ বর্ণের কাপড়ের ফালি – নাম তার পেলহু বা সিক্কা। ভাঁজ করলে কাপড়টির দৈর্ঘ হবে তিরিশ ইঞ্চি। দেখতে অনেকটা কোমরবন্ধ বা পাগড়ির মতন। আঠারো ইঞ্চি দূরে একটি গিঁট এবং গিঁটের প্রান্তে বাঁধা একটি সিঁদুর মাখা রুপোর টাকা বা তামার ডবল পয়সা। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে মেপে মেপে অতি যত্নসহকারে তৈরি করতে হত এই পেলহু। এটি আসলে একটি ফাঁস আর হাঁটুটি শত শত মানুষের গলা। টাকাটা ফাঁসটিকে আরও নির্ভুল করে।

এই হাতিয়ারটি কোমরে গুঁজে পথে নামত ঠগির দল। ফিরিঙ্গিয়া, দুর্গা, আমীর আলি, রোশন জামাদার, প্রসাদ লোদী, পরশুরাম জমাদার, ভুকুত ব্রাহ্মণ, এনায়েত খাঁ – সঙ্গে তাদের নানা বয়সের নানা চেহারার অসংখ্য লোক। চেহারা বা ব্যাবহার দেখে বোঝাই যাবে না তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বিচক্ষণ, সবচেয়ে নিপুণ খুনির দল। বেশবাস বা চেহারা দুইই সনাতন ভারতীয়দের মতো। সঙ্গী হিসেবে অতি চমৎকার, মানুষ হিসেবেও। চমৎকার গল্প বলতে পারে, ভজনকীর্তন করতে পারে, আবার অনেকে সেতার তবলা এসব বাজাতেও ওস্তাদ। সন্ধেবেলায় পথের ধারে আগুন জ্বালিয়ে গল্পের বা গান বাজনার আসর জমিয়ে তুলতে আর সঙ্গী পথযাত্রীদের বিশ্বাস উৎপাদন করতে তাদের জুড়ি ছিল না।

শ্রীপান্থ-এর লেখা ঠগিদের ইতিহাস

পথযাত্রীরা জানতও না যে মুহূর্তে তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে কিছু লোক চলে গেছে ‘বিল’ বা ‘বিয়াল’ পছন্দ করতে। বিয়ালে এসে তারা ‘খাপ’ পাতবে মানে তাঁবু খাটাবে এবং সেখানেই ‘ঝিরনি’ উঠবে – মানে পথযাত্রীদের মৃত্যু অবধারিত হবে। বিয়াল পছন্দ হলে ‘লুগহা’ চলে যাবে কবর খুঁড়তে। ইতিমধ্যে ‘তিলহাই’রা বা গুপ্তচররা চারিদিকে নজর রাখছে। যথা সময়ে দলপতি বা জমাদার হুকুম দেবে ‘সাহেব খান তামাকু লাও’ অথবা ‘পান লাও।’ সঙ্গে সঙ্গে গলায় পেলহু পরিয়ে দেবে ‘ভুকত’ আর ‘চুমিয়া’ এবং ‘চুমোসিয়া’ হাত পা চেপে ধরে সাহায্য করবে। ‘ভোজা’রা মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাবে ও ‘কুথওয়া’ ছুরি মেরে দেহগুলিকে কবরস্থ করবে।

সব কিছু সম্পন্ন হত অতি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। অদ্ভুত টিম ওয়ার্ক। সেই কবরের ওপর দেখতে দেখতে ভোজসভা বসে যেত – গুড়ের ভোজ। ভোজের পর সেইখানেই বিছানা বিছিয়ে রাত্রি যাপন। পেলহু ছাড়া আরও দুটি জিনিষ ওদের অতি প্রয়োজনীয় ছিল — ছোট্ট একটি কোদাল – ‘মাহি’ বা ‘কাসসি।’ লম্বায় ৬ ইঞ্চি থেকে ৮ ইঞ্চি, ওজনে মাত্র দু’ থেকে আড়াই সের। হাতল থাকে না। ব্যাবহারের সময় হাতল বানিয়ে নিতে হত। প্রতিবার যাত্রার আগে কোদালটি নতুন করে তৈরি করা হত – অতি গোপনে অতি যত্নে। শুধু মঙ্গল, বুধ, বা শুক্রবার কোদাল তৈরি করা যেত। তৈরি হয়ে গেলে শুভদিনে শুভক্ষণে সেটিতে প্রাণসঞ্চার করে মন্ত্রপূত করা হত। মন্ত্রপূত করার অনেক প্রক্রিয়া ছিল এবং সেগুলি সব ঠিকমত সম্পন্ন হলে কোদালটি একটি পরিষ্কার কাপড়ে জড়িয়ে একজন মনোনীত সদস্যের হাতে তুলে দেওয়া হত। তারপর নানা রকম শুভাশুভ দেখে তবেই ঠগিরা যাত্রা করত। ঠগিদের জীবনে রুমালের মতই এই কোদাল পরম মহত্বপূর্ণ। রুমাল যদি হয় সিক্কা তবে কোদাল হল নিশান। এ কোদাল যাত্রার দিক নির্দেশ করত, দলের ভাগ্যনিয়ামক বলে গন্য হত। কেউ মিথ্যে বলছে কিনা জানার জন্যে কোদালের ওপর হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করতে হত। এটির বিশেষত্ব ছিল মাটি খোঁড়ার সময় শব্দ হয় না। এছাড়া সবার সঙ্গে একটি ছোরাও থাকত।

ঠগিরা বংশপরম্পরায় ঠগি। তাদের জামাদার বা দলপতি হত খানদানি ঘরানার। সে ব্যক্তির দলপতি হবার মতো ব্যক্তিত্ব থাকতে হত, গোটা সংস্থাটি নিপুণ ভাবে চালাতে হত। শিকার হিসেবে তাকে নিখুঁত পরিকল্পনা করতে হত, যাকে বলে plan of action। এছাড়া তার দায়িত্ব ছিল লুটের মাল সঠিকভাবে ভাগ করা। দলের প্রত্যেকে, এমনকি যে সদস্য কোনো কারণে অনুপস্থিত, তাকেও সমান ভাগ দেওয়া হত।

ঠগিরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত এই কাজ করতে মা ভবানীর তাদের নির্দেশ দিয়েছে। দানব রক্তবীজের সঙ্গে যুদ্ধ করে মা ভবানী যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁর গা থেকে দু’ বিন্দু ঘাম নির্গত হয়েছিল। সেই ঘামের ফোঁটা দুটি থেকে দুটি মানুষ উৎপন্ন হলে তিনি তাদের হাতে রুমালটি দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন রক্তবীজের ফোঁটা থেকে উৎপন্ন দানবদের হত্যা করতে। যেহেতু দেবীর নির্দেশে এই কাজ তারা করছে তাই কোনো অন্যায়বোধ ঠগিদের স্পর্শ করত না, ভূতপ্রেত ইত্যাদির ভয়ও তারা পেত না। তাদের সবচেয়ে বড় তীর্থ ছিল কলকাতার কালীঘাটের মা কালী। তারপরেই স্থান ছিল বিন্ধ্যাচলের মা ভবানী। সবচেয়ে অদ্ভুত কথা হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, সকলেই ছিল মা ভবানীর ভক্ত। ব্যাতিগত জীবনে তারা তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করে, জাতপাত মেনে চলত, কিন্তু জীবিকার ধর্ম পালনে তারা ছিল ঐক্যবদ্ধ – মা ভবানীর সন্তান, মা ভবানীর ভক্ত। বর্ষাশেষে যখন তারা পথে নামত তখন শুধুমাত্র মা ভবানীর দেখানো প্রাকৃতিক শুভ বা অশুভ লক্ষণ মানত। মা ভবানীর নির্দেশে সামনে যারা আসত তাদের আর রক্ষা ছিল না – হত নিশ্চিত মৃত্যু।

হেরোডটাসের মতে ঠগিরা আদিতে পারসিক। ওদের ভাষা, বেশবাস এবং হাতিয়ার সবই ইঙ্গিত করে তারা পারসিক দস্যুপতি সাগার্তির উত্তরপুরুষ। ভারতে এসে এরা রয়ে গিয়েছিল সমাজের অপাংক্তেয় হয়ে। তাই নিজেদের জীবিকাকে নিজেদের কাছেই যুক্তিসংগত করার জন্যে মা ভবানীর চরণে আশ্রয় নিয়েছিল। মা কালীর মন্দিরে এদের প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না। শুধু তাই নয়, ভবানীর সন্তান বলে কেউ ওদের ছুঁতো না। বরং দেখা গেছে বহু ক্ষেত্রে জমিদার বা অন্যরা এদের পক্ষ নিয়েছে। তবে তার কারণ বেশির ভাগ সময়ই ছিল আর্থিক। ঠগিরা একা খেতো না, ঘুষ নেওয়ার রেওয়াজ তখনও ছিল।

প্রায় সাতশ’ বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ঠগিরা বাধাহীন ভাবে মৃত্যুলীলা চালিয়ে গেছে। গিনিস বুক অফ রেকর্ডস বলে প্রায় কুড়ি লক্ষ লোক ওদের হাতে নিহত হয়েছে, যদিও সঠিক কোন তথ্য নেই। ১৮২৬ সাল থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে স্লিম্যান এদের প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। ১৮৪০ থেকে ১৮৪৮ এই ক’বছরে ছ’শ ঠগি ধরা পড়েছিল। তারপর আর তাদের কথা শোনা যায়নি। লখনৌতে যখন স্লিম্যান কর্মরত তখন ঠগিরা ওঁকে মারার চেষ্টা করেছিল কিন্তু প্রতিবারই তিনি সেটা ধরে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত তারা রণে ভঙ্গ দেয়।

স্লিম্যান শুধু ঠগি নির্মূল করেননি, তিনি তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্যে এবং যারা সাজা ভোগ করে মুক্তি পেয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করেছিলেন। তাদের জমি বিতরণ করেছেন, তাদের দিয়ে আখের চাষ শুরু করিয়েছিলেন। ঠগিদের বানানো একটি বিশাল কার্পেট আজও শোভা পাচ্ছে ইংল্যান্ডের উইন্ডসর কাসলে। আজও জব্বলপুরের কাছে রয়েছে স্লিম্যানের নামে একটি গ্রাম – স্লিমানাবাদ। তাঁর তৈরি মন্দিরে আজও তাঁর নামে প্রদীপ জ্বলে। ঠগিরা আজ রয়ে গেছে গল্প কথায়।

———-

তথ্যঋণ

শ্রীপান্থ। (১৯৬০)। ঠগী। কলকাতাঃ আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিমিটেড।

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

শ্রীঅন্নদাশঙ্কর এবং লীলা রায়ের কনিষ্ঠ কন্যা তৃপ্তি। ইনিই বাবা অন্নদাশঙ্কর রায়-এর বিখ্যাত রচনা ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’র নায়িকা ‘খুকু।’ মুম্বাইয়ের ‘আর্য বিদ্যামন্দির’ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন। আপাতত পুনে নিবাসী। নিখিল ভারত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন, পুনে ব্রাঞ্চের সদস্য। ‘পুনে বঙ্গদর্পণ’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *