“আপনি থাকছেন স্যার”

"আপনি থাকছেন স্যার "

শঙ্কর – মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়

লেখার শুরুতে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। তখন হয়তো ক্লাস থ্রিতে বা ফোর-এ পড়ি। বইয়ের পোকা বরাবর ছিলাম, তখন সাহিত্য পরিচয় বলতে প্রথম দিকের কিছু ছোটোদের শীর্ষেন্দু কাহিনি, শুরুর দিকের পাণ্ডব গোয়েন্দা, শুকতারা, আনন্দমেলা ইত্যাদি। গরমের ছুটিতে মামার বাড়ি গিয়েছি, সেখানে বইয়ের তাকে একটা ইন্টারেস্টিং নামের বই চোখে পড়ল – ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল।’ খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল লেখকের নাম শংকর, তিনি বড়দের বই লেখেন, ফলে আমার ওই বইতে হাত দেওয়া নিষিদ্ধ। এর পাঁচ ছয় বছর পরের ঘটনা, আমি ততদিনে এন্টালির অদ্বৈত আশ্রম লাইব্রেরি মেম্বার এবং আমার লাইব্রেরির চাইল্ড কার্ড থেকে অ্যাডাল্ট কার্ডে প্রমোশন ঘটেছে। অ্যাডাল্ট কার্ড হাতে পাওয়া মাত্র অকালপক্ক আমি প্রথম যে বইটি হস্তগত করলাম তা হল ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল।’ অকালপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিঞ্চিৎ পিছনপক্কও ছিলাম ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল যে বইটার পিছনদিক থেকে শুরু করতে হবে। সেইমতো আমি তৃতীয় তথা শেষ গল্প ‘আশা আকাঙ্খা’ দিয়ে শুরু করব। বলতে দ্বিধা নেই কমলেশ আর চন্দ্রমল্লিকার সেই রোম্যান্টিক মধুচন্দ্রিমায় আমার নবকৈশোর ভেসে গেল। সেই অর্থে আমি তথাকথিত ভদ্র ছেলে ছিলাম, তখনো বটতলার চটিসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল না, শারীরিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষ স্পষ্ট ধারণাও ছিল না – থাকলে বরং হয়তো এই পরিমিত রোম্যান্সের সঙ্গে এত একাত্ম হতে পারতাম না। লেখক কোথাও এতটুকু বাউন্ডারি ক্রস করেননি অথচ রোম্যান্স পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের সঙ্গে দেখলাম এই রোম্যান্টিক গল্প কী করে ধীরে ধীরে এক ক্যান্সার রোগাক্রান্ত গবেষকের ভারতবর্ষকে সার উৎপাদনে স্বনির্ভর করার স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন লেখক, সঙ্গে রইল কমলেশ – চন্দ্রমল্লিকার দাম্পত্য উত্থানপতনের কাহিনি। শেষ গল্পটি যখন এত ভালো লাগল তখন প্রথম দুটি নিশ্চয় আরও ভালো হবে – এই ধারণার বশবর্তী হয়ে প্রথম গল্পটি পড়া শুরু করে দিলাম – ‘জন অরণ্য’ এবং যারপরনাই হতাশ হলাম। কোথায় প্রেম? কোথায় রোম্যান্স? এ যে রুক্ষ বাস্তবের জমি। একটু ধাতস্থ হয়ে ধীরে ধীরে তখন সত্তর দশকের কলকাতাকে উপলব্ধি করতে শুরু করতে শুরু করলাম। সেখানে সোমনাথের মতো হাজার হাজার বেকার যুবক স্নাতক হয়ে চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবনযুদ্ধে চাকরি পাওয়ার আশায় তার শৈল্পিকসত্তা, প্রেমিকসত্তা সব পিছনে চলে যায়, কালক্রমে সে এক দালালে পরিণত হয়। উপন্যাসের শেষে সোমনাথের দালালে পরিণত হওয়ার সঙ্গে যে একটি চমক এবং কশাঘাত রয়েছে সেটি আজকের এই ডিজিটাল যুগে বসে ধারণাই করা যাবে না। আজকে ভোগবাদ বাঙালি মধ্যবিত্তকে গ্রাস করেছে। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির সিংহভাগ আজকে বাঙালি মেয়েদের দখলে এবং তা বেশিরভাগই স্বেচ্ছায় উন্নত জীবনযাপনের আশায়। তাঁরা আর মুখ লুকিয়ে থাকেন না। তাঁদের প্রত্যেকের সোশ্যাল মিডিয়া এবং অগুনতি ফ্যান ফলোইং রয়েছে। ষাট সত্তরের দশক কিন্তু এরকম ছিল না। সে যুগে গ্রাসাচ্ছাদন আর মাথার ওপরে ছাদের জন্য উপন্যাসের কণার মতো কেউ কেউ নিজের আত্মাকে বন্ধক রেখে এ পথে পা বাড়াতেন তা এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন লেখক। প্রায় একই ধরণের বিষয় নিয়ে শংকরের আরেকটি উপন্যাস আছে – ‘মাথার ওপর ছাদ।’ আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন। ট্রিলজির মাঝের উপন্যাসটিও ষাট-সত্তর দশকের কলকাতার এক উচ্চাকাঙ্খী নব উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্যামলেন্দুর উচ্চাকাঙ্খা আর এথিক্স এর দ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে কেউ যদি ষাট সত্তর দশকের কলকাতা ও তার সন্নিহিত অঞ্চলের বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনের আশা, নৈতিকতা, জীবনযুদ্ধ, উচ্চাকাঙ্খা এইসবকিছুকে ধরতে চান তাহলে শংকরের এই ট্রিলজিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় কোনোমতেই।

নন্দিত উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’

পাঠক হিসাবে আমার একটা বদভ্যাস আছে। যার লেখা পড়ে ভালো লাগে তার লেখা পরপর পড়তে থাকি। শংকর থেকে শুরু করে হালের সন্মাত্রানন্দ বা প্রীতম বসু অবধি আমার সেই ধারা অব্যাহত। এতে সুবিধা আর অসুবিধা এই যে এতে একদিকে যেমন লেখকের বিষয়বৈচিত্র্য, নান্দনিকতা, দৃষ্টিভঙ্গী বোঝা যায় সেরকম তাঁর সীমাবদ্ধতাও বোঝা যায়। শংকরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একে একে পড়ে ফেললাম ‘কত অজানারে,’ ‘চৌরঙ্গী,’ ‘ঘরের মধ্যে ঘর,’ ‘সোনার সংসার,’ ‘বিত্ত বাসনা,’ ইত্যাদি উপন্যাস। একদিকে মুগ্ধ হয়েছি তাঁর বিষয় নির্বাচন দেখে, ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মানব মানবীর সম্পর্ক, প্রেম, প্রকৃতি, রহস্য রোমাঞ্চের চিরচেনা জগৎ থেকে তিনি পাঠককে সম্পূর্ণ অচেনা এক জগতে নিয়ে যেতে সমর্থ হলেন। সম্ভবত এর আগে পরে বিশেষ কেউ এভাবে একটি হোটেলকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কলকাতার এলিট সোস্যাইটির গ্ল্যামারাস ঝাঁ চকচকে জীবনের পিছনের আলো আঁধারিকে তুলে ধরেননি। আবার কখনো কখনো তাঁর লেখা পড়ে মোহভঙ্গও হয়েছে যখন একের পর এক লেখায় একই প্যাটার্ন লক্ষ করেছি। দু’একটা উদাহরণ দিই। শংকরের নিজের বিবেকানন্দ প্রীতির বড় বেশি ছাপ তাঁর বেশিরভাগ চরিত্রের ওপর পড়েছে। যাত্রার বিবেকের মতো লেখক নিজের বিশ্লেষণে বিবেকানন্দ কী বলতেন তা তো বেশিরভাগ গল্পে এনেছেনই, এমনকী লক্ষ করেছি তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররাও অনেকবার বিবেকানন্দ কী বলতেন বা লিখে গেছেন তা বলেছে বারবার। এর ফলে শংকরের সৃষ্ট চরিত্রগুলি সময়ে সময়ে কৃত্রিম হয়ে গেছে, কোনটি চরিত্রের বক্তব্য আর কোনটি লেখকের তা গুলিয়ে গিয়েছে এমনকি পুনরাবৃত্তি দোষে দুষ্ট হয়েছে। যতদূর মনে পড়ছে ‘সোনার সংসার’ উপন্যাসে প্রথম পড়ি বালজ্যাক বলেছিলেন ‘মানি ইজ দ্য পেট্রল অফ লাইফ।’ এই বাক্যটি ওই একটি গল্পে কিছু না হলেও অন্তত বার পাঁচেক ব্যবহৃত হয়েছে এবং তার পরেও তাঁর বেশ কিছু লেখায় এই একই বাক্য পেয়েছি। সেরকম ওঁর নিজের লেখাও একটা প্যাটার্ন হয়ে যেতে শুরু করেছিল। পরের দিকের লেখাগুলোয় প্রায়ই দেখা যেত বেশিরভাগ বাক্য শুরু হচ্ছে ‘মনে রাখা দরকার,’ ‘জেনে রাখা ভালো’ এই ধরণের বিন্যাস দিয়ে। 

কিন্তু তিনি শংকর! শুধু লেখায় বাণিজ্যসফলই নন, কর্পোরেট কর্তাও বটে। তাই হয়তো বুঝতে পারছিলেন স্টিরিওটাইপড হয়ে যাচ্ছেন, আগের মতো আর গল্প বলতে পারছেন না। চাইলে একঘেয়ে লিখে যেতে পারতেন আর বিভিন্ন সাহিত্যসভা আলো করে বসে থাকতে পারতেন। 

কিন্তু না! 

আদৃত লেখক শঙ্কর

যে বয়সে এসে লোকে রিটায়ার করে সেই বয়সে এসে উনি ট্র্যাক পাল্টালেন। ওঁর অন্যরকম লেখার কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’ বা এরকম আরও কিছু বই থেকে। তবে সরাসরি ছক্কা মারলেন বিবেকানন্দ মূলক সাহিত্যে ঢুকে। এর আগে বিবেকানন্দ বলতে সাধারণ বেশিরভাগ বাঙালিই বিবেকানন্দের ব্যাপারে ‘হে আমেরিকাবাসী ভাই ও বোনেরা’-র বাইরে খুব বেশি কিছু জানতেন না। উৎসাহীরা রামকৃষ্ণ মিশনের বইগুলি পড়তেন আর গবেষণায় আগ্রহীরা শঙ্করীপ্রসাদ বসুর বইগুলি পড়তেন। 

শংকর-ই প্রথম বিবেকানন্দকে নিয়ে বাঙালি মা বোনেদের হেঁসেলে ঢুকে গেলেন। বড় বড় গবেষকদের একদিকে রেখেও বলা যায় মানুষ বিবেকানন্দ, নরেন্দ্রনাথ, খাদ্যরসিক বিবেকানন্দ – এই সমস্ত দিকগুলি সাধারণ বাঙালি শংকরকে পড়েই জেনেছেন। সহজ সরল ভাষায় বিবেকানন্দকে একেবারে বাঙালির নাগালের মধ্যে এনে দিলেন শংকর। অনুসরণ তিনিও শঙ্করীপ্রসাদকেই করেছেন বেশিরভাগ সময়, কিন্তু সঙ্গে ওই কথা সাহিত্যিকের মজলিশি অনুষঙ্গে জীবনীসাহিত্যকে সর্বজনগ্রাহ্য করে দিয়েছেন। কখনো কখনো ভাবলে মনে হয় বাণিজ্যসফল কথাসাহিত্যিকের চেয়েও বেশি সাফল্য তিনি এই ক্ষেত্রে পেয়েছেন। খুব কম লেখক সত্তরোর্ধ বয়সে নিজের চিরাচরিত ট্র্যাক সম্পূর্ণ পরিবর্তন করেন (তা সে যতই আগে থেকেই তাঁর এই ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি থাকুক না কেন ) নতুন কিছুতে এরকম সাফল্য পান। শংকর এই দিক থেকে ব্যতিক্রম।      

পাঠককে শংকর সবার ওপরে রাখতেন, প্রতিটি বইমেলায় দীর্ঘক্ষণ পাঠকের সামনে বসে তাঁকে বইতে সাক্ষর করতে দেখা যেত। শুধু পাঠক নয় দর্শক আনুকূল্যও পেয়েছেন তিনি, তাঁর একাধিক লেখা পরে ছায়াছবি হয়েছে।

শংকরের প্রতিটি লেখা ধরে ধরে আলোচনা করার পরিসর এটি নয়।

তবে প্রয়াণের পরে মূল বিষয়টি হল লেখক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়কে বাঙালি কিভাবে মনে রাখবে? সাধারণত জনপ্রিয়, বাণিজ্যসফল কথাসাহিত্যিকের প্রতি বাঙালির বরাবরের উন্নাসিকতা রয়েছে। সেই তালিকায় দুটি বড় বড় নাম নারায়ণ সান্যাল এবং শংকর। এঁরা দুজনেই পাঠক আনুকূল্য পেলেও বড় সাহিত্যিকের তালিকায় এঁদের নাম রাখতে অনেকেই দ্বিধাবোধ করেন। এই প্রসঙ্গে বলি, অনেকেই শরৎচন্দ্রকেও বড় লেখকের তালিকায় রাখতে চান না বিবিধ কারণে। সেই কারণগুলি বেশিরভাগই সাহিত্যের ব্যাকরণের দিক থেকে যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য।  কিন্তু তারপরেও আজ অবধি বাংলায় কেউ ‘দেবদাসে’র মতো একটি সফল ক্লাসিক ট্র্যাজেডি লিখতে পারলেন কি? ঠিক সেভাবেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে শংকরকেও অবহেলা করার উপায় নেই। জনপ্রিয় মানেই খেলো – এই ধারণাটির মধ্যেও যথেষ্ট অতিসরলীকরণ রয়েছে। বরং এখন সময় এসেছে এই ধরণের স্টিরিওটাইপ ছেড়ে এটা মেনে নেওয়ার যে পাঠকের আনুকূল্য পাওয়া নেহাত সহজ কাজ নয়, শুধু বটতলার সাহিত্য লিখে পঞ্চাশ বছরের বেশি পাঠকের মনে টিকে থাকা যায় না। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’ দু’লাখের বেশি মুদ্রিত। এই পরিমাণ পাঠকপ্রীতি খুব কম বাঙালি লেখক পেয়েছেন। আমরা দুধরণের উদাহরণই দেখেছি – যিনি সমকালে পাঠক আনুকূল্য পাননি  তাঁকে ইতিহাস মনে রেখেছে, আবার যিনি সমকালে পাঠক আনুকূল্য পেয়েছেন কিন্তু মহাকালের বিচারে বিস্মৃত হয়েছেন এই উদাহরণও প্রচুর। সব মিলিয়ে এটুকু হয়তো আজকে দাঁড়িয়ে বলাই যায় পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকের মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবন, তদুপরি সেই সময়ের কর্পোরেট/হোটেল/কোর্ট চত্বরের মতো বিষয়ের জন্য এবং পরবর্তীকালে বিবেকানন্দ বিষয়ক চর্চার জন্য শংকর বাঙালি মননে দীর্ঘদিন থেকে যাবেন। 

পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ায় কর্মরত বিগত কুড়ি বছর ধরে। নেশায় পড়ুয়া, বিশেষ আগ্রহ বাংলা কথা সাহিত্যের দিকে| এছাড়া স্বভাব পল্লবগ্রাহী – বাগান করা, কাঠের কাজ, ছবি আঁকা, 3D modeling, ফুলদানি বানানো, ল্যাম্পশেড বানানো ইত্যাদি যা কিছু হতে পারে। জীবনে একটি বিষয় আছে যা নিয়ে সমস্ত জীবন একা নিভৃতে কাটিয়ে দিতে পারেন – রবীন্দ্রনাথের গান। লেখালেখির বিষয়ে আইডিয়া মাথায় কিলবিল করলেও লিখতে বসার পরিশ্রমটুকু করেন না, বন্ধুবান্ধবের চাপে মাঝেমধ্যে দু’চার লাইন লেখা হয়ে যায়|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *