রবীন্দ্রনাথের “বিদেশী ফুল”

ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়, বসার ঘরের তাকে সাজানো বইগুলোর ধুলো মুছতে বসলেই এটা ঘটে থাকে, কোনো না কোনো একটা বই যেটা হয়তো আগে অনেকবার করেই পড়া হয়ে গিয়েছে, হঠাৎ করে হাতে উঠে আসবে, আর গুচ্ছের পুরোনো সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি উথলিয়ে তুলবে। আর তারপর? প্রতিবারই যা হয়ে থাকে ঠিক তার পুনরাবৃত্তি হবে, সেদিনের মতো ঝাড়াপোঁছ করার মহান উদ্দেশ্যের সেখানেই যবনিকাপাত হবে, কারণ আমি তখন মেঝেময় ছড়ানো বইয়ের মাঝেই থেবড়ে বসে সেই নির্দিষ্ট বইয়ের ভিতর থেকে ভিতরে ক্রমশ সেঁধিয়ে যাব। এবারও তার অন্যথা হল না। আজকের কাজ পন্ড করা বইটি ছিল ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ।’ স্কুলের ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার পুরস্কার পাওয়া এই বইটা আমার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়, অনেকটা আমার পাসপোর্ট-এর মতন, সঙ্গে না থাকলে শান্তি বা স্বস্তি কোনোটাই পাই না। বইয়ের কাগজের রংটা অনেকটাই হলদেটে হয়ে গিয়েছে, পাতাগুলো কোনায় কোনায় ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, হবেই তো, ওরাও তো আমার মতোই পুরোনো কিনা।
ওই দেখ, কী বলতে কী বলি, ধান ভাঙতে শিবের গাজন, বাবু বিবিরা ক্ষমা করে দিয়েন যেন। আসুন বইটার ইতিবৃত্তে ফিরে আসি। এটা আসলে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত স্প্যানিশ ভাষায় লেখা আর্জেন্টাইন লেখিকা ও বুদ্ধিজীবী রামোনা ভিক্টোরিয়া এপিফানিয়া রুফিনা ওকাম্পো ওরফে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর স্মৃতিকথা ‘ট্যাগোর এন লাস বারানকাস দে সান ইসিদ্রো’ (‘সান ইসিদ্রোর শিখরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’) বইটারই বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক আর কেউ নন, আমাদের সকলের অত্যন্ত প্রিয় স্বনামধন্য কবি শঙ্খ ঘোষ।
দেখুন, রবীন্দ্রনাথ তো আমাদের প্রাণের ঠাকুর, তাঁর কবিতা, গান, জীবনকথা আমাদের চলার পথের একান্ত সাথী। যখনই আনন্দসাগরে ভাসি, তাঁর গানের চরণগুলি মূর্ত হয়ে ওঠে আমাদের জীবনছন্দে। আবার যখন মনের মাঝে জমা হয় মলিনতা, যন্ত্রণা, অসিহষ্ণুতা, তখন আমাদের বুকের ক্ষতস্থানে মলম প্রলেপনের সমান স্নিগ্ধতা আনে তাঁর বাণী; সংসারের সকল তুচ্ছতা তখন বাষ্পের মতো ক্ষণজীবী হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কমবেশি তাই অনেক কথাই আমাদের জানাশোনা আছে, কিন্তু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো? তাঁকে কি আমরা সকলে তেমন করে চিনি? না, বোধয়। আসুন না, সেই প্রয়াসেই এক্ষণে মেতে উঠি আমরা!
ওকাম্পোর কথা উঠলেই আমাদের সর্বপ্রথমে যা মনে আসে তা হলো তিনি রবীন্দ্রনাথের গুণমুগ্ধ, আর্জেন্টিনার উচ্চবিত্ত সমাজের এক মহিলা, যাঁকে কবিবর তাঁর একাধিক কবিতায় “বিদেশী ফুল” বলে উল্লেখ করেছেন। কবিগুরু ওকাম্পোর নাম দিয়েছিলেন ‘বিজয়া।’ “পূরবী” কাব্যগ্রন্থটি ওকাম্পোকে উৎসর্গ করার সময় তিনি সেখানে দুটি মাত্র শব্দই লিখেছিলেন: “বিজয়ার করকমলে।”
পূরবীর কবিতাগুলোর ভিতর দিয়ে কবির প্রেমালুতার গভীর আবেগ আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না; রহস্যময়ী লাতিন আমেরিকান রমণী ওকাম্পোকে ঘিরে আমাদের কৌতূহলও তাই উছলে উছলে ওঠে। বইটির সঙ্গে বিজয়াকে যে চিরকুটটি পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাতে লেখা ছিল, “My readers who will understand these poems will never know who my Vijaya is, with whom they are associated.” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২৯ অক্টোবর, ১৯২৫)। এই চিঠিতে বলার থেকে না বলা কথাদের সুবাসই যেন বেশি বেশি করে ভেসে বেড়ায়; আর সেই না বলা কথাগুলো আমাদের সাধারণ পাঠকদের ভাবনা জগৎকে রামধনু রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যায়। এই দুই মানব মানবীর মধ্যেকার মানসিক বন্ধনটি ঠিক কতটা গভীর ও অন্তরঙ্গ ছিল তার প্রকৃত স্বরূপ হয়তো আমাদের কাছে অজানা থেকে যাবে কারণ এ ছিল আসলে দুই সৃষ্টিশীল মানুষের একান্ত গোপন গভীর ব্যক্তিগত এক সম্পর্ক, কেবল তাঁদের যৌথ জগতেই বিদ্যমান, হাটের মাঝে তা বিলোবার নয়। কবি তাঁর বিজয়াকে একবার লিখেছিলেন, “পূরবীর কবিতাগুলি যারা পড়বে, তারা জানতেও পাবে না তোমার প্রতি কত তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।”ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবির কথা মিথ্যে হয়নি, ওকাম্পো যে কবির “পূরবী” কাব্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অনুপ্রেরণা ছিলেন, তা আমাদের অনেক পাওয়া।
আমেরিকান সাহিত্যিক ডরিস মেয়রের লেখা “Victoria Ocampo: Against the wind and the tide” শীর্ষক জীবনীমূলক গবেষণার বইটি ওকাম্পোকে আরও কাছ থেকে জানার কাজে আমাদের দারুণ সাহায্য করে। এই বইটি ১৯৭৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, বস্তুত এটি “লা সুপারবে আর্জেন্টাইন”–এরই ইংরেজি সংস্করণ। এখানে মেয়ার ওকাম্পোকে “first lady of Argentine letters” বলে সম্বোধন করেছেন। ওকাম্পো ছিলেন একজন অসাধারণ নারী যিনি পারিবারিক ও সামাজিক শ্রেণীর কঠোরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক’রে আর্জেন্টিনায় নারী অধিকারের লড়াইয়ে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে পেরোন শাসনের একজন দৃঢ় বিরোধী হওয়ার অপরাধে তাঁকে ১৯৫৩ সালে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

মেয়রের বর্ণনা থেকে আমরা আরও অবগত হই যে, দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপিয় মহাদেশের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক অন্যতম মহান স্থপতি ছিলেন আর্জেন্টাইন লেখক, প্রকাশক এবং বুদ্ধিজীবী ওকাম্পো। আর্জেন্টিনার সুবিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস ওকাম্পোকে “আর্জেন্টিনার আদর্শ নারী” বলে অভিহিত করেছেন। সাহিত্যে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অবদান অপরিসীম। দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকা “সুর” (স্প্যানিশ ভাষায় অর্থ “দক্ষিণ”) এবং এর সহযোগী প্রকাশনা সংস্থা “এডিটোরিয়াল সুর”-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে ফরাসি ভাষায় লেখালেখি করলেও পরবর্তীতে মাতৃভাষা স্প্যানিশে নিজস্ব স্বর তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই মূলত “সুর” পত্রিকার সৃষ্টি করেছিলেন ওকাম্পো। এটি প্রথিতযশা আন্তর্জাতিক লেখকদের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, পাশাপাশি বোর্হেসের মতো আর্জেন্টাইন লেখকদের রচনাও সেখানে প্রকাশ করেছিল এবং নারীবাদী ধারণা প্রচার করেছিল। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত লেখক এবং চিন্তাবিদ যেমন হোসে ওর্তেগা ই গ্যাসেট, কাউন্ট হেরমান কাইসারলিং, ভার্জিনিয়া উলফ, অ্যাড্রিয়েন মনিয়ার, ভিটা স্যাকভিল-ওয়েস্ট, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ট্রাল এবং আরও অনেকের সাথে ওকাম্পোর রীতিমতো ওঠাবসা ছিল। ওকাম্পো শুধু একজন উল্লেখযোগ্য লেখক, সমালোচক এবং সাংস্কৃতিক দূতই ছিলেন না, তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করেছিলেন এবং সাহিত্যে নারীদের সমর্থন যুগিয়েছিলেন। তিনি প্রায় বিশটি বই রচনা করেছেন, যার বেশিরভাগই ছিল প্রবন্ধ সংকলন, যেমন দশ খণ্ডের ‘টেস্টিমোনিওস,’ যেখানে সাহিত্য সমালোচনা, আত্মজীবনী এবং রাজনৈতিক ভাষ্যের মিশ্রণ ঘটেছে।
রবীন্দ্রনাথও বসে রইলেন না, সান ইসিদ্রোতে পৌঁছে সেদিন লিখে ফেললেন পূরবীর সেই অপূর্ব কবিতা “বিদেশী ফুল” –
হে বিদেশী ফুল, যবে আমি পুছিলাম—
কী তোমার নাম,
হাসিয়া দুলালে মাথা, বুঝিলাম তবে
নামেতে কী হবে।
আর কিছু নয়,
হাসিতে তোমার পরিচয়।
হে বিদেশী ফুল, যবে তোমারে বুকের কাছে ধরে
শুধালেম ‘বলো বলো মোরে
কোথা তুমি থাকো
হাসিয়া দুলালে মাথা, কহিলে ‘জানি না, জানি নাকো।’
বুঝিলাম তবে
শুনিয়া কী হবে
থাকো কোন দেশে
যে তোমারে বোঝে ভালোবেসে
তাহার হৃদয়ে তব ঠাঁই,
আর কোথা নাই।”
আর্জেন্টিনায় রবীন্দ্রনাথের প্রথমে সাত দিন থাকার কথা থাকলেও সেটা ক্রমশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি। প্রিয় অতিথির সুখসুবিধার জন্য এমন কিছু ছিল না, যার ব্যবস্থা ওকাম্পো করেননি। সাজানো ঘর, স্বর্গীয় দৃশ্য সম্বলিত অলিন্দ, কবিতা লেখার উপযোগী নিরালা পরিবেশের বন্দোবস্ত করা থেকে শুরু করে যখনই দরকার তখন তাঁকে সঙ্গ দেয়া, দর্শনার্থীদের সঙ্গে রবিঠাকুরের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা, সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া, রবিঠাকুরের পছন্দের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সবই করেছিলেন ওকাম্পো। কেবল তাই নয়, কবির যত্নআত্তিতে যাতে এতটুকুও খামতি না থাকে তার জন্য নিজের চল্লিশ বছরেরও বেশি পুরনো ব্যক্তিগত পরিচারিকা এস্তেফানিয়া আলভারেজ ওরফে ফানিকে নিযুক্ত করেছিলেন। এর ফলে কবির বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন ফানি। ওকাম্পো তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ বিষয়ে একটু মজা করেই লিখেছিলেন,
…তবে ওদের কথাবার্তাটা ঠিক কোন ভাষায় চলত, তা দুজনের একজনও আমাকে কখনো বুঝিয়ে বলতে পারেননি, কারণ একজন শুধু ইংরেজি বলেন, আরেকজন কেবলই স্প্যানিশ। হোটেলে বা জাহাজে সব সময়ে যে জিনিসটা আমি চাইতাম সেই টি-স্ট্রেইনার হলো ফানির জানা একমাত্র ইংরেজি শব্দ। এই একটিমাত্র শব্দের দৌলতে ওঁদের সংলাপ যে খুব একটা এগোত, এমন তো আমার বোধ হয় না। তবুও ওঁরা কথা বলে যেতেন, বোধ হয় ঠারেঠোরে।
শোনা যায়, রবিঠাকুরের ভরণপোষণের এই খরচ মেটানোর জন্য ওকাম্পোকে খুব দামি একটি হিরের টায়রা খুব নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছিল। গয়না বিক্রির সেই টাকা থেকে দশ হাজার পেসো আগাম ভাড়া তিনি নিজের আত্মীয়কে দিয়ে এসেছিলেন মিরালরিওর সেই বাড়িটির জন্য। কবিগুরুর দৃষ্টিতেও অবশ্য এসব কিছুই এড়ায়নি। ওকাম্পোর আতিথেয়তার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “আমার জন্য যে ও কী করবে দিশে পেত না। অজস্র টাকা আমার জন্যে খরচ করেছে, তাতেও যেন ওর তৃপ্তি নেই। সবসময়ে তবু আশায় থাকত আমি কী চাই। আমার চাওয়া ও প্রাণ দিয়ে মেটাবে এমনি ভাব।”

একটা ছোট্ট উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিকতার দাবি রাখে। মিরালরিওতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ রোজ ড্রইংরুমের যে আরাম কেদারাটিতে বসতেন সেটি তাঁর বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছিল। আজের্ন্টিনা থেকে কবির দেশে ফেরার সময় ‘জুলিয়া চেজারে’ নামক জাহাজে তাঁর জন্য একটি নয় একেবারে দু-দুটি কামরা ভাড়া করেন ওকাম্পো! একটিতে দিনে লেখাপড়া করবেন কবি, আরেকটিতে রাতে শয়ন। ওকাম্পো মনস্থ করলেন যে জাহাজের কেবিন দুটি তিনি স্বহস্তে সাজিয়ে দেবেন। এখানেই শেষ নয়, ওকাম্পো বললেন যে কবির সেই প্রিয় কেদারাটি তাঁর সঙ্গেই যাবে। এ কথা শুনে জাহাজের ক্যাপ্টেনের তো মাথায় হাত, এমন অদ্ভুত আবদার তিনি জন্মে শোনেননি এবং যথারীতি তিনি বেঁকে বসলেন, কিন্তু ওকাম্পো রীতিমতো জোরাজুরি করে সেটিকে জাহাজে তুলে দিলেন। ওদিকে অত বড়ো চেয়ার জাহাজের দরজা দিয়ে কেবিনে কোনোমতেই ঢুকতে চায় না। ওকাম্পোও নাছোড়বান্দা! মিস্ত্রি ডাকিয়ে জাহাজের দরজার কব্জা খুলিয়ে, দরজা সরিয়ে, চেয়ারটিকে যথাস্থানে বসিয়ে তবে তিনি শান্ত হয়েছিলেন। চেয়ারটি সাধারণ হলেও ওকাম্পোর ভালোবাসা সেটাকে অমূল্য করে তুলেছিল। তাই সাত সমুদ্র, তেরো নদী পার ক’রে কবি শান্তিনিকেতনে বয়ে নিয়ে আসেন তাঁর বিজয়ার প্রীতির এ নিদর্শনটিকে। কবির পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী লিখেছেন, “সেই চৌকিখানি সেবার নানা দেশ ঘুরে অবশেষে উত্তরায়ণে পৌঁছেছিল। অনেকদিন আর বাবামশায় ওই চৌকি ব্যবহার করেননি। আজ আবার ব্যামোর মধ্যে দেখলুম ওই চৌকিখানিতে বসা তিনি পছন্দ করছেন, সমস্ত দিনই প্রায় ঘুম বা বিশ্রামান্তে ওই আসনের উপর বসে থাকতেন।”
আমাদের মনে একটা দারুণ কৌতূহল জাগে, কেমন দেখতে ছিলেন ওকাম্পো? কেমন করে কথা বলতেন তিনি? প্রতিমা দেবীর স্মৃতিচারণ থেকে তার কিছু আভাস পাওয়া যায়।
ভিক্টোরিয়া ইংরেজি খুব ভাঙা ভাঙা বলতেন, ফরাসি ভাষাতেই তাঁর দক্ষতা ছিল বেশি, তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না। কিন্তু বুদ্ধির প্রখরতা তাঁর মুখে একটি সৌন্দর্যের দীপ্তি এনে দিত। তাঁর বড়ো বড়ো পল্লব ঢাকা গাঢ় নীল চোখে একটি স্বপ্নময় আকর্ষণী ক্ষমতা ছিল। তাঁর দীর্ঘ দেহ গৌরবময় আভিজাত্যের পরিচয় দিত। তিনি যখন নতজানু হয়ে বাবামশায়ের পায়ের কাছে বসতেন, মনে হতো ক্রাইস্টের পুরোনো কোনো ছবির পদতলে তাঁর হিব্রু ভক্ত মহিলার নিবেদন-মূর্তি।
মিরালরিওর দিনগুলো রবীন্দ্রনাথ এবং ওকাম্পো দুজনের কাছেই খুব সুখকর হয়ে উঠেছিল। অলিন্দে বসে বসে ওঁরা একসঙ্গে প্লাতা নদীর সৌন্দর্য অবলোকন করতেন। কখনো বা বাড়ির কাছের উইলো গাছের নীচে বসে দুজনে চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতা ওকাম্পোকে আবৃত্তি করে শোনাতেন, আর মাদাম ওকাম্পো কবিকে শোনাতেন বোদলেয়রের ফরাসি কবিতার অনুবাদ। একে অপরের সাহচর্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই দুই মহান মানুষের শিল্পীসত্বা যেন সেই মন্থর দিনগুলি মুখরিত হয়ে উঠেছিল। কবি ৩০টির মতো কবিতা এইসময় লেখেন। সুদূর সান ইসিদ্রোর সেই বাড়ির স্মৃতি শান্তিনিকেতনে বসেও রোমন্থন করেছেন কবি। ‘পূরবী’ বইটি যে ওকাম্পোকে উৎসর্গ করেছেন সেটি আর্জেন্টিনায় চিঠি লিখে জানিয়েও ছিলেন কবি। আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বইখানা তোমায় উৎসর্গ করা, যদিও এর ভিতরে কী রয়েছে তা তুমি জানতে পারবে না।” ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কিন্তু ১৯২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের চিঠিতে লিখেছিলেন, “বইটাতে কী আছে তা জানার জন্য আমি পাগল হয়ে আছি।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মধ্যকার সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে এক বহুল আলোচিত বিষয়। এ নিয়ে শুধু লেখালেখি, আলোচনা ও সমালোচনাই নয়, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র – আর্জেন্টাইন ফিল্মমেকার পাবলো সিজার পরিচালিত ২০১৮ সালের সিনেমা ‘থিঙ্কিং অব হিম’ যেটি রবি ঠাকুর এবং ভিক্টোরিয়ার মধ্যকার আত্মিক বন্ধনটি সুচারুভাবে তুলে ধরে। এই সিনেমাটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ছবির হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলো আমাকে ক্ষণে ক্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে দেশ থেকে দেশান্তরে। কবির চরিত্র চিত্রায়ণে ভিক্টর ব্যানার্জীর অভিনয় প্রশংসার্হ।
এই সম্পর্কের মধ্যে শারীরিক ভালোবাসার ছোঁয়া খুঁজে গেছেন অনেকে, কিন্তু প্রচলিত রোমান্টিক সম্পর্ক বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি এ তেমনটি ছিল না। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর নিজের অনুভূতিকে “আমুর দে তেন্দ্রেস” (কোমলতার ভালোবাসা) বলে বর্ণনা করেছেন ওকাম্পো, যা একটি গভীর, শারীরিক সম্পর্কবিহীন বন্ধনের উপরই জোর দেয়। আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তীব্র এক মেলবন্ধন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন এই দুই মানব মানবী। মূলত শৈল্পিক এবং মানসিক গভীরতার জন্যই ইতিহাসে এই সম্পর্ক স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় এই দেখাসাক্ষাতের ছ’বছর পর আবার দুজনের দেখা হয় প্যারিসে, ১৯৩০ সালে। সেবার কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথও সঙ্গে ছিলেন| রবীন্দ্রনাথের ডাকে তাঁর প্যারিস সফরের সহযাত্রী হলেন ভিক্টোরিয়া। প্যারিসের বিখ্যাত ‘তেয়াতর পিগাল’ গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোর প্রদর্শনীর সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করে দেন ভিক্টোরিয়া। প্রদর্শনী উদ্বোধনের তারিখ ছিল ২-রা মে, ১৯৩০। রথী ঠাকুর সেই প্রথম দেখলেন সেনিওরা ভিক্টোরিয়াকে, স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছেন, “বাবার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল গভীর- এত স্নেহ করতেন যে বাবার তুচ্ছতম খেয়ালটুকু মেটাবার জন্য হেন কাজ ছিল না যা তিনি করতে না পারতেন।”

১৯৩০ সালের এই সাক্ষাতই ছিল তাঁদের মধ্যকার শেষ সামনাসামনি দেখাশোনা, কিন্তু যোগাযোগ বন্ধ হয়নি, তা চলেছিল সেই ১৯৪১ সাল পর্যন্ত, কবির মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। অন্ততঃ পঞ্চাশটির মতো চিঠি তাঁরা নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করেছিলেন। তাঁদের লেখা চিঠিগুলোতে দেখা যায়, একজন আরেকজনকে বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করছেন। ভিক্টোরিয়াকে বারবার শান্তিনিকেতনে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু “সুর” পত্রিকা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকায় ওকাম্পোর আসা হয়ে ওঠেনি শান্তিনিকেতনে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর একেবারে শেষ চিঠিতে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে লিখেছিলেন, “এতদিন পরে তোমার আমাকে মনে পড়ল – কী যে ভালো লাগছে! পৃথিবীর সব রঙ ফিকে হয়ে আসছে যখন, বিমর্ষ মন কেবল তাদের নৈকট্যই কামনা করে যাদের স্মৃতি সুখময় দিনগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে। যত না দিন যায়, সেই স্মৃতিগুলো যেন গাঢ় হতে থাকে।” এভাবেই ভিক্টোরিয়াকে তাঁদের দুজনের একসঙ্গে কাটানো সময়ের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন কবি। রবীন্দ্রনাথ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, সেসময়েও তার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন ওকাম্পো, খোঁজখবর নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ ভিক্টোরিয়া পান তাঁর গাড়িতে বসে, রেডিওর সংবাদে। “সুর” পত্রিকায় ওকাম্পো লিখেছিলেন দীর্ঘ একটি “অবিচ্যুয়ারি” নিবন্ধ। নিজ স্মৃতিকথায় ভিক্টোরিয়া লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেছেন, তাঁর ভারতবর্ষে। খবর পেলাম পথে, রেডিও থেকে, বুয়েন্স আয়ার্স আর মার দেল প্লাতার মাঝামাঝি জায়গায়। নির্জন রাজপথে ছুটে চলেছে গাড়িটা। চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ সমতলভূমিকে ঢেকে আছে শীতের ধূসর আকাশ…।”
শঙ্খ ঘোষের লেখা থেকে জানতে পারি: ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ‘সুর’ পত্রিকায় ওকাম্পো রবীন্দ্রপ্রসঙ্গে লেখেন, বক্তৃতা দেন সভায়। ১৯৫৮ সালে লেখেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘতম রচনা। ‘সুর’ পত্রিকার পক্ষ থেকে সেই লেখা বই হিসাবে ছাপা হল ১৯৬১ সালের মে মাসে: এ সেই “ট্যাগোর এন লাস বারানকাস দে সান ইসিদ্রো।” ভিক্টোরিয়ারই উৎসাহে ১৯৬১ সালে সান সিদ্রোর একটি রাস্তার নাম হল রবীন্দ্রনাথের না্মে: ‘আদেনিদা তাগোর;’ ডাকবিভাগ থেকে বেরোল তাঁর নামে বিশেষ স্ট্যাম্প। শতবর্ষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত ৭ মে-র জনসভায় ভাষণ দিলেন ওকাম্পো; দু’দিন পরে রবীন্দ্রবিষয়ক এক আলোচনাবৃত্তেরও অপরিহার্য একজন কথক রইলেন তিনি। স্প্যানিশ ভাষায় ‘ডাকঘর’-এর অভিনয় হল ৩১ মে তাঁর নিজস্ব অবধানে। এ তো এক পরম একনিষ্ঠ পূজারী, রবীন্দ্র পূজারী; ত্যাগ, প্রেম তিতিক্ষা ঢেলে যিনি সাজিয়েছেন তাঁর নৈবেদ্যর নিরুপম পূজা-সাজিটি। ওকাম্পোর প্রতি আমাদের মাথা নত হয়ে আসে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসায়।
মৃত্যুর চার মাস আগে ওকাম্পোকে ভেবে লেখা রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি তার পুত্র রথীন্দ্রনাথ পৌঁছে দিয়েছিলেন যথাস্থানে।

বিদেশের ভালোবাসা দিয়ে
যে প্রেয়সী পেতেছে আসন
চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া
কানে কানে তাহারি ভাষণ।
ভাষা যার জানা ছিল নাকো,
আঁখি যার কয়েছিল কথা,
জাগায়ে রাখিবে চিরদিন
সকরুণ তাহারি বারতা।
১৯২৫ সালে, প্রকাশের পরপরই পূরবীর একটি কপি ওকাম্পোর কাছে প্রেরণ করে কবি লিখেছিলেন, “পলাতকা স্মৃতিগুলি আজ কথায় বন্দী। ভাষার অপরিচয়ে তুমি কোনদিন একে জানবে না, কিন্তু তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এ কবিতা বেঁচে থাকবে অনেকদিন!” সত্যিই তাই, আমাদের মর্মস্থলে প্রেমের অনুরণন জাগায় সেইসব কবিতা, রবীন্দ্রনাথ আর ওকাম্পোর মধ্যকার অমলিন প্রেমকুসুমের সুবাসে যেন ভেসে যায় চরাচর। পূরবী’র ওকাম্পো, রবীন্দ্রনাথের ‘বিজয়া’ কখন যেন আমাদের আপামর বাংলা ভাষাভাষীদের বাঙালি বিজয়া হয়ে ওঠেন। অজস্র গুণরাশির অধিকারিণী ওকাম্পোর ভালোবাসার প্রতিভাখানিই আমাদের হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি আবেগমথিত করে তোলে, তাঁকে আমাদের বড়ো কাছের মানুষ বলে মনে হয়। ‘পূরবী’-র ‘শেষ বসন্ত’ কবিতা পড়ি আর বিজয়ার জন্য আমাদের বুকের ভিতরটা কোন এক নাম না জানা কষ্টে মুচড়ে মুচড়ে ওঠে।
রাত্রি যবে হবে অন্ধকার
বাতায়নে বসিয়ো তোমার।
সব ছেড়ে যাব, প্রিয়ে,
সমুখের পথ দিয়ে,
ফিরে দেখা হবে না তো আর।
ফেলে দিয়ো ভোরে-গাঁথা ম্লান মল্লিকার মালাখানি।
সেই হবে স্পর্শ তব, সেই হবে বিদায়ের বাণী।
এহেন একজন বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন, স্বনামধন্য মানবীর সঙ্গে রবি ঠাকুরের প্রথম পরিচয়টা কীভাবে হল? সত্যিই সে কাহিনির শুরুটা চমকে দেবার মতোই এক ঘটনা বটে!
১৯২৪ সাল। দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর রাজধানী লিমাতে ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবার্যিক উৎসব হবে। একশ’ বছর পূর্বে ৯ ডিসেম্বর ১৮২৪ আয়াকুচোর যুদ্ধে পেরুবাসীরা স্পেনিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকে ধ্বংস করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। সেই দিনের স্মরণ উপলক্ষে জাতীয় মহোৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ পান। কিন্তু যাত্রা শুরুর ক’দিন আগেই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হলেন কবি, ভালো করে সেরে ওঠার আগেই যাত্রা শুরু করতে হলো তাঁকে, কারণ প্রস্তুতি সব তৈরি ছিল যে।
ফ্রান্স থেকে দক্ষিণ-আমেরিকার আর্জেন্টিনাগামী জাহাজ ধরলেন তেষট্টি বছরের রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে আছেন লের্নাড কে. এলমর্হাস্ট, নীল চোখ, দীর্ঘ দোহারা চেহারা, খড়গের মতো নাকের এক ইংরেজ–কবির সেক্রেটারি। কম দিন তো নয়, তিন সপ্তাহ। কবির শরীর বেগড়বাই করতে শুরু করল, তিনি যখন আর্জেন্টিনার বন্দর রাজধানী বুয়েনোস আইরেসে নভেম্বর ৬ তারিখে পৌঁছলেন, তখন শরীর মোটেই চলছে না, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভালো করে চেপে ধরেছে কবিকে। ডাক্তাররা তো গম্ভীরমুখে রায় দিলেন: রোগীর হৃদযন্ত্রের এমন অবস্থা নয় যে আন্দিস পর্বত পেরিয়ে তিনি পেরু অবধি যেতে সক্ষম হবেন, সুতরাং এমত অবস্থায় লিমা যাত্রা নৈব নৈব চ। নতুন করে জাহাজে উঠবার আগে কোনো গ্রামাঞ্চলে বিশ্রাম নিতে হবে কবিকে। অগত্যা ঠিক করা হল যে পেরুর প্রেসিডেন্ট লেগুইয়াকে তার করে দেওয়া হবে যে তাঁর অতিথি পেরু পর্যন্ত পৌঁছতে পারছেন না; কবি আর্জেন্টিনাতেই কিছুদিন থেকে যাবেন। হোটেল প্লাজাতেই সহযাত্রী এলমহার্স্টের সঙ্গে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন রবীন্দ্রনাথ।
ওদিকে ১৯২৪ এর সেপ্টেম্বরেই “লা নাৎসিওন” পত্রিকার মাধ্যমে ওকাম্পো জানতে পেরেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনা হয়ে পেরু যাবার পথে বুয়েনোস আইরেসে কয়েকদিন থাকবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ওকাম্পোর কাছে মোটেই অজানা ছিলেন না, কারণ তার কিছু কাল আগেই ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে “গীতাঞ্জলী”র জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, পৃথিবীর নানা ভাষায় রমরমিয়ে অনূদিত হচ্ছে “গীতাঞ্জলী।” ওকাম্পোর হাতেও এসে পড়ে গীতাঞ্জলীর ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফরাসি অনুবাদ। ওই তিন ভাষাতেই ওকাম্পোর চলন থাকলেও, ১৯১৪ সালে আঁদ্রে জিদের ফরাসি ভাষায় করা অনুবাদটিই ওকাম্পোর সবথেকে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। চৌত্রিশ বছর বয়স্ক ওকাম্পোর ব্যক্তিগত জীবনেও তখন এক অশনিসংকেত ধেয়ে এসেছিল, দুর্বিষহ এক বিবাহিত জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তিনি তখন নিজেকে শেষ করে দেবার কথা ভাবছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং অন্যান্য লেখাগুলোর মাঝেই মৃতসঞ্জীবনীর সন্ধান খুঁজে পেয়েছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথের লেখা তাঁকে এতটাই ছুঁয়ে গিয়েছিল যে, তিনি সে সময়ে “রবীন্দ্রনাথ পড়ার আনন্দ” নামে একটি লেখাও লিখে ফেলেন।
সুতরাং, রবীন্দ্রনাথ এসে পৌঁছেছেন শুনেই রবীন্দ্রনাথের লেখার ভক্ত ওকাম্পো কোনোভাবেই এ সুযোগ হাতছাড়া করে চাননি। কবির সঙ্গে দেখা করা জন্য একদিন হোটেল প্লাজাতে বন্ধু আডেলিয়ার সঙ্গে সরাসরি চলে আসেন ওকাম্পো। ওকাম্পোর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর তাঁকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেন এলমহার্স্ট।
হ্যাঁ, শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে পরিস্ফুট হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্পোর সেই প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ, মহাকালের বুকে থমকে থাকা সে যেন এক অসম্ভব, অবর্ণনীয় মধুর ক্ষণ। কেমন ছিল সে মাহেন্দ্রক্ষণের ছবি?
শ্রীযুক্ত এলমহার্স্টের সঙ্গে প্রাথমিক এই কথাবার্তার পর আমরা পৌঁছলাম রবীন্দ্রনাথের ঘরে… ভয়ে ভয়ে আমি ভাবছি, কী লাভ এই দেখাশোনায়! একটা কথাও বলছি না। ভীরু মানুষরা সমস্ত জীবন ভ’রে সবচেয়ে বেশি ক’রে যা চায়, ভাগ্য তাকে প্রায় আয়ত্তের মধ্যে এনে দিলে ভয় পেয়ে যায় তারা। আমাকেও চেপে ধরল সেই ভয়,ইচ্ছে হলো পালিয়ে যাই।
আমার এত আকুলতার যিনি কারণ, এই অস্বস্তিজনক প্রতীক্ষার দ্রুত অবসান ঘটালেন তিনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে এলেন; নীরব, সুদূর, তুলনাহীন বিনীত। ঘরে এসে তিনি দাঁড়ালেন, আবার এও সত্যি যে ঘরে যেন তিনি নেই। তাঁর ধরণধারণে একটা ঔদ্ধত্যও ছিল, খানিকটা যেন লামার মতো। লামার দিকে কেউ তাকালে ওরা যেমন তাদের তাচ্ছিল্য নিয়ে দেখে, অনেকটা সেই রকম. কিন্তু ওই ঔদ্ধত্যেরই সঙ্গে আছে এক সর্বহারী মাধুর্য। তেষট্টি বছর বয়স, প্রায় আমার বাবার বয়সী, অথচ কপালে একটিও রেখা নেই, যেন কোনো দায়িত্বভারই নষ্ট করতে পারে না তাঁর সোনালি শরীরের স্নিগ্ধতা। সুগোল সমর্থ গ্রীবা পর্যন্ত নেমে এসেছে উছলে-ওঠা ঢেউ-তোলা শাদা চুলের রাশি। শ্মশ্রুমণ্ডলে মুখের নিচের দিকটা আড়াল, আর তারই ফলে ওপরের অংশ হয়ে উঠেছে আরো দীপ্যমান। মসৃণ ত্বকের অন্তরালে তাঁর সমগ্র মুখাবয়বের গড়ন এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য রচনা করেছে, তেমনি সুন্দর তাঁর কালো চোখ, নিখুঁত টানা ভারি পল্লব। শুভ্র কেশদাম আর স্নিগ্ধ শ্মশ্রু, এর বৈপরীত্যে জ্বলে উঠছে তাঁর চোখের সজীবতা। দীর্ঘ দেহ, শোভন চলন, তাঁর প্রকাশময় দুটি অতুলনীয় শুদ্ধ হাতের সুধীর সুষমা যেন অবাক ক’রে দেয়, মনে হয় যেন এদের নিজেদেরই কোনো ভাষা আছে। অনেকদিন পর যখন মৃণালিনী সারাভাইয়ের নাচ দেখি, তখন জেনেছি যে সত্যিই ভারতীয় নৃত্যে হাতের মুদ্রা কথা বলে তার নিজের ভাষায়।
সুধীজন, এ যেন ঠিক ভ্যান গগের একটি স্বর্গীয় চিত্রকল্প অথবা মিকেল এঞ্জেলোর একটি অমর স্থাপত্যের জীবন্ত বর্ণনা; সময় পথ ভুলে ফিরে দাঁড়ায়, তাই না? বলতে দ্বিধা নেই যে বইয়ের ওই অংশটা আমি সযতনে চিহ্নিত করে রাখি, তারার দেশে হারিয়ে যাওয়া আমার মায়ের হাতের লেখা একটা মিষ্টি চিঠি ওখানে দুই পাতার মাঝে শুয়ে থাকে, আমার অকিঞ্চিৎকর জীবনের অম্লান পাথেয়, আমার পথচলার পরম আনন্দ।
অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে সেদিন হোটেল থেকে রীতিমতো জোরাজুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন ওকাম্পো তাঁর খুড়তুতো ভাইয়ের বাড়ি “মিরালরিও”-তে। বুয়েনোস আইরেস থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরের সান ইসিদ্রোতে উঁচু এক মালভূমির ওপর বাসাটি দাঁড়িয়ে আছে। এর সম্মুখ ও পশ্চাতে বিশাল প্রাঙ্গণ। সবুজ ঘাসের গালিচা দিয়ে মোড়া এই প্রাঙ্গণটির সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। মাঝে মাঝে ফুলের মালঞ্চ এবং বহু বিচিত্র পুষ্পের বর্ণচ্ছটায় সমস্ত প্রাঙ্গণটিকে যেন মোহময় করে রেখেছে। প্রাঙ্গণের সীমানারেখার চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে বয়ঃবৃদ্ধ ওক গাছ আর দীর্ঘ পাইন বন। বাড়ির উত্তর দিক ধ’রে কয়েক পা এগোলেই দেখা যায় তটরেখা-বিহীন অপরূপ নদী “রিও দে লা প্লাতা”। স্প্যানিশ ভাষায় প্লাতা শব্দের মানে “রূপা”। আদি অভিযাত্রীরা মনে করতেন সে নদীর উজানে নাকি রূপার সমৃদ্ধ মজুদ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ওই নাম।
১২-ই নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ যেদিন সান ইসিদ্রোতে অতিথি হয়ে এলেন, সেদিনের এক অনুপম বর্ণনা আমাদের সামনে তুলে ধরেন ওকাম্পো।
বিকেল তিনটেয় গেলাম ওঁকে ফিরিয়ে আনতে। সমুদ্রবাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটায় কালাও স্ট্রিট তখন বিপর্যস্ত। গাছের নতুন পাতা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, পথের ধার থেকে উড়িয়ে আনছে শুকনো ধুলো আর ছেঁড়া কাগজের রাশি। আকাশ কোনোখানে হলুদ, কোথাও বা সীসার মতো ধূসর। পথচলতি মানুষের পক্ষে এ যেন এক সতর্কবাণী: ঘরে ফেরো, ঘরে ফেরো। সান ইসিদ্রোর দিকে চলেছি আমরা, ধুলোর ঝড়ে ভরে গেছে গাড়ি। কিন্তু যখন এসে পৌঁছলাম সান ইসিদ্রোতে, সমস্ত দৃশ্য যেন পাল্টে গেল এই বাড়িটির সামনে, সব কেমন ঠাণ্ডা, ছিমছাম। মোমের গন্ধ, টাটকা ফুলের গন্ধ। বাইরের গাছে বাতাসের দাপাদাপি, তারই ফলে আরো ঘন হয়ে উঠছে ভিতরের নীরবতা। যেন শঙ্খের মধ্যে শুনছে কেউ সমুদ্রধ্বনি। সদর দরজা বন্ধ হলো। ঘরের শ্বেত নির্জনতায় আমাদের ঘিরে ধরল গোলাপ আর সোনালি হথর্নগুচ্ছ।
সেই বিকেলে আকাশ ক্রমেই আরো হলুদ হয়ে আসছিল, আর বিশাল ঘন কালো মেঘ। এমন ভয়ঙ্কর গুরু মেঘ, অথচ এমন তীব্র ভাস্বর- কখনো এমন দেখিনি। আকাশ কোথাও সীসার মতন ধূসর, কোথাও মুক্তোর মতো, কোথাও বা গন্ধকের মতো হলুদ, আর এতেই আরো তীব্র হয়ে উঠেছে নদীতট, আর তরুশ্রেণীর সবুজ আভা। উর্ধ্ব আকাশে যা ঘটছিল, জলের মধ্যে তাই ফলিয়ে তুলেছিল নদী। কবির ঘরের বারান্দা থেকে দেখছিলাম এই আকাশ, এই নদী, বসন্তের সাজে ভরা প্রান্তর। বালুচরের উইলো গাছগুলো খেলা করছিল ছোটো ছো্টো হাজার নম্র পাতায়।
ঘরে ঢুকতেই ওঁকে নিয়ে এলাম অলিন্দে, বললাম: নদীটি দেখতেই হবে। সমস্ত প্রকৃতি যেন আমার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে দৃশ্যটাকে ক’রে তুলল পরম রমণীয়। আলোর পাড়ে বোনা প্রবল মেঘপুঞ্জের অন্তরালে কে যেন এক প্রতিফলক সাজিয়ে ধরেছে আকাশে।
———-
তথ্যসূত্র:
ঘোষ, শঙ্খ। (১৯৭৩)। ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ। কলকাতাঃ দেজ পাবলিশিং।
ডাইসন, কেতকী কুশারি। (১৯৮৫)। রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে। কলকাতাঃ দেজ পাবলিশিং।
Meyer, Doris. (1979). Victoria Ocampo, Against the wind and the tide, with a selection of essays, by Victoria Ocampo. NY: G. Braziller
