সাহিত্যিক মণিশঙ্কর ও আমার অনুভূতি-আখ্যান (পর্ব ১)
সাহিত্যিক শঙ্করের লেখা পড়ে দেখার তাগিদ আমি অনুভব করেছিলাম বাবার কাছ থেকে যখন শুনেছিলাম ওঁর লেখা উপন্যাস থেকে ওঁর জীবদ্দশাতেই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সিনেমা করেছেন। তখন আমি সদ্য কলেজ-জীবনে পা রেখেছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার সেই বয়সে ‘জন অরণ্য’ বা ‘সীমাবদ্ধ’ ভালো লাগেনি। মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে যখন বিবাহ-পরবর্তী জীবনে আবার এই দুটি উপন্যাস পড়লাম তখন বুঝেছিলাম সব উপন্যাসই পড়ার একটা সময় আছে, বয়স আছে,পরিণতি আছে। সিনেমা দুটিও দেখেছিলাম এবং প্রতি মুহূর্তে সাহিত্যিক শংকর বা মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ জীবনবোধকে অনুধাবন করেছিলাম।
শংকরের সামাজিক উপন্যাসগুলি তৎকালীন সময়ে বিবাহের উপহার হিসেবে খুব জনপ্রিয় ছিল বলে শুনি। আমার ক্ষেত্রে এই বিষয়ে খুব মজাদার একটি অভিজ্ঞতা আছে। আমার মা-বাবাও বিয়েতে শঙ্করের একাধিক বই উপহার পেয়েছিলেন। আমাদের শহরতলির বাড়িতে একদিন বাবা’র সঙ্গে বইএর তাক গোছাতে হাত লাগিয়েছিলাম। আমি তখন অনেকটাই ছোটো। ক্লাস থ্রি বা ফোর। ‘কত অজানারে’ আর ‘চৌরঙ্গী।’ কিন্তু ভিতরে শুধু মা – বাবার নাম লেখা। আমার নাম নেই। হাপুস নয়নে কাঁদতে বসেছিলাম। আমার এখনও মনে আছে বাবা আমার সামনে অতি যত্নে ‘কত অজানারে’ বইটির মধ্যে ওঁদের নামের পাশে আমার নামটা লিখে দিয়েছিলেন। আমরা তখন এখনকার জেন-আলফার মতো টেক-স্যাভি ছিলাম না। তাই কোনওভাবে এই ঘটনার পরেও কেন আমাকে মা-বাবার বিয়েতে ওঁদের মতোই উপহার দেওয়া হয়নি তা আর খোঁজ করে দেখিনি। এখন এই ঘটনা ভাবলে হাসি পায়। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে ছোটবেলার এই অম্লান স্মৃতিতে জড়িতে রইলেন শংকর, তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দিয়ে।
পরে বড় হয়ে যখন বইগুলি ‘সঠিক’ বয়সে পড়েছি তখন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম কেন বিবাহের উপহারে শঙ্করের বই উপহার দেওয়া হত। খুব বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এবং আটপৌরে, নির্মেদ লেখনী দিয়ে আশেপাশের মানুষের হাসি,কান্না, প্রেম, ভালোবাসা, ঈর্ষা সবকিছুর তিনি যেন অক্ষর-অঙ্কন করতেন। মানুষ ভীষণভাবে নিজের সঙ্গে রিলেট করতে পারত বা প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে পারত। তাই অনেকেই মনে করতেন যৌথজীবনের শুরুতে এই সামাজিক আখ্যানগুলি নবদম্পতিকে আনন্দ দেবে। আমি মা-এর মুখে শুনেছি শংকরের যা উপন্যাস ওঁরা উপহারে পেয়েছিলেন, অনেক সময়ে তা একসঙ্গেও পড়েছেন। আবার একজন পড়েছেন, অন্যজন শুনেছেন – এরকমই ছিল শংকর ম্যাজিক।

আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল গত কয়েকবছরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় সাহিত্যিক শংকরকে দেখার স্মৃতি। প্রথমবার তো দেখে চমকে গেছি। তখন ময়দানে বইমেলা। দে’জ স্টলের সামনে একজন বসে চেয়ারে। খোলা মাঠের হাল্কা ঠান্ডায় সন্ধে নামছে। মাথায় একটা হাল্কা উলের টুপি। সামনে বই হাতে পাঠকের লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে। বাবা চিনিয়েছিলেন, “দেখে নে, উনি হলেন শংকর।” এরকম একজন অতি-জনপ্রিয় লেখক কিভাবে এত মাটিতে মিশে থাকতেন দেখে অবাক হতে হয়। এরপর এল সেলফির যুগ। আমি অবশ্য দূর থেকেই দেখতাম। ২০২৫ এর বইমেলাতেও দেখেছি, দে’জ এর বাইরে। ছবি তুলতে চাইলে হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে পোজ দিতেন, এটাই ছিল ওঁর ট্রেডমার্ক।
অনেকেই হয়ত জানবেন না, সামাজিক উপন্যাসের পাশে পাশে শংকর গুটিকয়েক ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। দেশে এবং বিদেশে নিজের ঘুরে বেড়ানো এবং অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করেছেন ‘যেখানে যেমন’ নামক ভ্রমণগ্রন্থে। এখানে যেমন কর্মসূত্রে বিদেশযাত্রাতে বাইরের দেশের কিছু জায়গা দেখার বিবরণ আছে, তেমনই দেশের ভিতরেও অনেক রাজ্যে বেড়ানোর গল্প আছে। আমার নিজের ভ্রমণসাহিত্যের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকার দরুণ বইটি খুব ভালো লেগেছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে মানুষের কৃতকর্ম, জীবদ্দশায় তাঁর চলন ও ব্যবহার, মানুষের কাছে তাঁর গ্রহনযোগ্যতা নির্ধারণ করে মরণোত্তর পর্যায়ে তাঁকে মানুষ কিভাবে মনে করবেন। এক্ষেত্রে শংকর যাকে বলে ‘came out with flying colours’। সকল বাঙালি পাঠককুলের মনে ও মননে শংকর চিরস্থায়ী হয়ে রয়ে গেলেন, তাঁর পর্যবেক্ষণ, লেখনী ও অন্তর্দৃষ্টির অতুলনীয়তার জন্য।
———-
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
