নাম রেখেছি বনলতা...

বেশ করেছেন রেখেছেন, কিন্তু একটু ভেবেচিন্তে করা উচিত ছিল কাজটা। কী থেকে যে কী হয়, বলা তো যায় না। জানা নেই বোধহয় যে স্রেফ এই নামকরণের জন্যই প্রখ্যাত শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে হারাতে হয়েছিল এক দারুণ সুযোগ – তাঁর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে চলে গেছিলেন আরেক প্রখ্যাত, শিল্পী শ্যামল মিত্র? আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর আগে অর্থাৎ ১৯৬১ তে প্রতিভাবান সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত ঠিক এই কান্ডটাই ঘটিয়েছিলেন তাঁর লেখা “নাম রেখেছি বনলতা যখন দেখেছি” গানটায়। ধনঞ্জয়বাবুকে গানটা গাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হল যখন, উনি দুঃখের সঙ্গে জানালেন তা সম্ভব নয়। কারণ আর কিছুই না – ধনঞ্জয়ের শাশুড়ির নাম বনলতা দেবী। অতএব যে গানের ছত্রে ছত্রে বনলতা সম্পর্কে অমন রোম্যান্টিক কথাবার্তা বলা আছে তা তিনি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন কী করে? অগত্যা শ্যামলবাবুকে ধরা হল এবং তিনি লুফে নিলেন। বনলতার বদলে গীতিকার “চারুলতা” বা “কমললতা” লিখলে কি আর এ-জিনিস হত?
তাই বলি, নামকরণের আগে দু’বার কেন, পাঁচবার ভাবা উচিত। কিন্তু লোকে তো শোনে না! যেমন, ছেলের নাম যাঁরা রাখেন ‘রমাপদ’ বা ‘উমানাথ’ বা ‘গৌরীপ্রসন্ন’, তাঁদের কি একবারও মনে হয় না যে অনিবার্য সংক্ষিপ্তকরণের ফলে নামগুলো শেষ অবধি কী দাঁড়াবে আর তার দরুণ একটা মানুষকে সারাজীবন কতটা অস্বস্তিতে থাকতে হবে? ঠিক তেমনি, কারুর নাম ‘পুলিনবিহারী’ হলে তাকে বয়সকালে ছেলেছোকরারা ফাজলামি করে ‘parcel’ বলে ডাকতেই পারে (যদি অবশ্য ‘পুলিন্দা’-র এই ইংরেজী প্রতিশব্দটা তাদের জানা থাকে, যা আজকালকার যুগে বিরল)। নামের এই কাটছাঁট-জনিত বিভ্রাট সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ‘মণিমোহন,’ ‘মণিশঙ্কর,’ ‘মণিকা,’ আর ‘মনীষা’ নামধারীদের সবাইকেই বন্ধুমহলে বা পারিবারিক গণ্ডিতে ডাকা হচ্ছে ‘মণি’ বলে – এই উদাহরণ তো খুব পরিচিত। সুতরাং মুখোমুখি আলাপের আগে নামগুলোর এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ শুনে যদি অচেনা কেউ লিঙ্গসংশয়ে ভোগেন, তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। একই সমস্যা ‘রাধাকান্ত,’ ‘রাধারমণ,’ ‘রাধারাণী,’ আর ‘রাধাশ্রী’কে নিয়েও। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আমার অধ্যাপক জীবনের একটি ঘটনা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি যে বিভাগে, সেখানে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রছাত্রীরা ডক্টরেট করতে আসার আবেদন করে – ভারতীয় উপমহাদেশ থেকেও। সেই ভারতীয় আবেদনকারীদের একজনের নাম যে রাধা এবং তার আবেদন যে মনজুর হয়েছে, সেকথা কীভাবে যেন চাউর হয়ে যাওয়ায় ছাত্রমহলে তুমুল উৎসাহ আর গুঞ্জন তাকে নিয়ে। ওই বয়সের অবিবাহিত যুবকদের যা হয় আর কি। তারপর যখন দেখা গেল নবাগতর পুরো নাম রাধাকৃষ্ণণ শ্রীকুমার নাগরাজন, তখন বেচারাদের চুপসে যাওয়া মুখগুলো দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম।
নাম কাটছাঁটের আদৌ দরকার পড়ত না যদি এক বা একাধিক মধ্যনাম (middle name) যোগ করে নামটাকে দীর্ঘায়িত না করা হত। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে এই মধ্যনামের বহর আর তার কারণ হয়তো আলাদা – কোথাও পিতৃপুরুষের নামের একাংশ ঢুকিয়ে দেওয়াটা ঐতিহ্য, কোথাও আবার কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের পরিচয়বাহী এক বা একাধিক শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়াটা রীতি, কোথাও হয়তো গ্রাম বা জেলার নাম। আমাদের বাঙালিদের ক্ষেত্রে (অন্ততঃ পশ্চিমবঙ্গে) এগুলোর কোনোটাই নেই, তবু ‘চন্দ্র,’ ‘কুমার,’ বা ‘কান্তি’র ছড়াছড়ি নামের মাঝখানে। ‘শেখর,’ ‘ভূষণ,’ আর ‘প্রতিম’ও মিলবে অনেক। দৈনন্দিন ব্যবহারের সময় আজকাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওগুলো উহ্যই থেকে যায়, অথচ ‘পবিত্র কান্তি’র সঙ্গে ‘পবিত্র কুমার’কে অথবা ‘বিধুভূষণ’-এর সঙ্গে ‘বিধুশেখর’কে গুলিয়ে ফেললেই নামের মালিকের গোঁসা। আচ্ছা মুশকিল তো! আপনি স্টাইল করে কাঁচি চালিয়ে লিখবেন ‘Pabitra K. Roy’ (সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর আজীবন নিজেকে “নীরদ সি চৌধুরী’ বলে পরিচয় দেওয়ার মতো), আর ‘K’ মানে কান্তি না কুমার না কচ্ছপ না কেউটে সেটা আমি জ্যোতিষী হয়ে ঠিকঠাক বুঝে নিতে না পারলেই দোষ? এই জন্যই এই মধ্যনাম জিনিসটাকে মাঝে মাঝে অ্যাপেন্ডিক্স বা আক্কেলদাঁতের মতো মনে হয় – কাজে লাগে না, শুধু ঝামেলা পাকাতে ওস্তাদ।
অবশ্য শুধু মধ্যনামকে দায়ী করে লাভ নেই। পদবী নিয়েও হাজার রকম সমস্যা। আমাদের ক্ষেত্রে তার একটা বড় কারণ একশো নব্বই বছরের ব্রিটিশ শাসন। মুখোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, আর চট্টোপাধ্যায়কে মুখার্জি, ব্যানার্জি, আর চ্যাটার্জি বানালি যখন তোরা, সামঞ্জস্য রাখার জন্য গঙ্গোপাধ্যায়কে গ্যাঙার্জি আর শুধু উপাধ্যায়কে আর্জি বানিয়ে যা। তা নয় – কোথা থেকে আমদানি হল গাঙ্গুলি। তার ওপর আবার ইংরেজিতে লেখার সময় একেকটা পদবীর একগন্ডা করে বানান। মুখার্জি লিখতে k-এর পরে h লাগবে কি লাগবে না, তার ঠিক পরেই a হবে না e হবে, শেষকালে ji না jee – এগুলো নিয়ে মতৈক্য বিধানসভা বা লোকসভায় সরকারপক্ষ আর বিরোধীপক্ষের বড় বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে মতৈক্যের চেয়েও দুর্লভ। ব্যানার্জি আর চ্যাটার্জিরও একই হাল। তাদের তৎসম রূপগুলো ইংরেজি হরফে লিখতে গিয়েও কেন যে মানুষ ‘padhyay,’ ‘paddhyay,’ ‘padhaya,’ ইত্যাদি জটিলতা বাধিয়ে রেখেছে, কে জানে। ভট্টাচার্য আর চক্রবর্তীতেও নিস্তার নেই। ‘charya’ না ‘charyya,’ ‘barti’ না ‘borty,’ না ‘bortti’ – সেই নিয়ে সংশয় আর বিভ্রান্তির ঝুলি সবসময়েই ভর্তি (তার সঙ্গে আবার ‘varty’ আর ‘verty’ এসে জোটায় আরোই ঘেঁটে ঘ)। অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট পদবীগুলোও কম জ্বালায় না। ‘De’ বনাম ‘Dey,’ ‘Roy’ বনাম ‘Ray,’ কিংবা ‘Pal’ বনাম ‘Paul’-এর মামলা কি কোনোদিন নিষ্পত্তি হবে? এই শেষোক্ত দুটোকে অর্থাৎ রায় আর পাল-কে অবশ্য ইংরেজিতে যে বানানেই লেখা হোক তার গায়ে একটা বিদেশি বিদেশি গন্ধ থাকে। কিন্তু কর-কে ‘Kar’ না লিখে কায়দা করে ‘Kaur’ লিখতে গেলে যে ঝামেলাটা সেটা সম্পূর্ণ দেশি – বাংলা বনাম পঞ্জাব।
কর-এর কথায় মনে পড়ল, কিছু কিছু ক্রিয়াধর্মী পদবী চিরকালই হালকা মজার খোরাক। যেমন, ছাত্রজীবনে নীচু ক্লাসে পড়ার সময় আমাদের ক্লাসে এক শান্ত গোবেচারা-টাইপের ছেলে ছিল, যে পড়াশোনায় খুব সিরিয়াস। ওকে ক্লাসের বিচ্ছু ব্যাকবেঞ্চাররা নিয়মিত ‘মুরগি’ করত, অর্থাৎ নিজেরা হোমওয়ার্ক ফাঁকি দিয়ে পরের দিন সকালে ক্লাস শুরুর আগে বা টিফিনের সময় ওকে দিয়ে করাত আর ও মিউমিউ গলায় প্রতিবাদ করলে ওরা দাবড়ে চুপ করিয়ে দিত। তো এর ফলে অচিরেই ক্লাসে ওর নাম (সুশান্ত কর) পাল্টে আমাদের মুখে মুখে হয়ে গেল ‘হোমওয়ার্ক কর।’ যাইহোক, এরকম জুলুম তো আর অনন্তকাল চলতে পারে না। একসময় ওর বাবা-মার কানে পৌঁছল ব্যাপারটা, ওঁরা এলেন হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছে অভিযোগ করতে। তারপর ও এই প্রাত্যহিক ‘দাসত্ব’ থেকে রেহাই পেলেও নতুন নামকরণ আটকানো গেল না – ‘নালিশ কর।’ আরও নীচু ক্লাসে অর্থাৎ মর্নিং সেকশনে পড়ার সময় দেখতাম সচ্ছল পরিবার থেকে আসা আমার এক সহপাঠী (যে প্রতিদিন প্রাইভেট গাড়িতে করে স্কুলে আসত-যেত) বেশ বড়সড় ঝকঝকে টিফিন-ক্যারিয়ারে করে রোজ অনেক নতুনরকম খাবার-টাবার আনত। ছেলেটার মনটা ছিল ভালো, তাই আমরা ওর বাক্সে আকর্ষণীয় কিছু দেখে কখনোসখনো ওর সঙ্গে আমাদের খাবার বদলাবদলি করার প্রস্তাব দিলে খুশিমনেই রাজি হত (এই যেমন, ওর অরেঞ্জ স্পঞ্জকেকের বদলে আমার কড়াপাকের সন্দেশ, ওর ডিমের ডেভিলের বদলে অন্য কারোর আলুভাজা, ইত্যাদি)। ওর আসল নাম বিশ্বদীপ দে, কিন্তু আমরা আড়ালে ওকে ডাকতাম ‘টিফিন দে।’ বেশ কয়েক বছর পরে ক্লাস টুয়েলভে অর্থাৎ হায়ার সেকেন্ডারিতে যখন আমরা, স্কুলে একজন নতুন শিক্ষাকর্মী বহাল হলেন। তাঁর কাজ ছিল শুধু আমাদের সায়েন্স ল্যাবরেটরিগুলোয় (পদার্থবিদ্যা-রসায়ন-জীববিদ্যা) মাস্টারমশাইদের সবরকমভাবে সাহায্য করা। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস চাকরিটা নেবার সময় একটা বিশেষ কাজের কথা তিনি কল্পনাও করেননি। বায়োলজি সিলেবাসের একটা বড় অংশ ছিল জুওলজি, সেখানে ব্যাঙ কাটা থাকবেই – সে আমাদের ঘেন্নায় বমি আসুক আর না আসুক। এবং মাঝেমাঝেই প্র্যাকটিকাল ক্লাসে ব্যবচ্ছেদের জন্য ছাত্রদের মধ্যে ব্যাঙ বিতরণ করতে অ্যাকোয়ারিয়ামের ডালা খুললেই বন্দিদশা (তথা আসন্ন মৃত্যু) থেকে মুক্তির এই সুবর্ণ সুযোগ তারা লুফে নিত আর একলাফে সেখান থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়েই সোজা দরজার দিকে চম্পট দিত। তখন তাদের পিছু ধাওয়া করে দুহাতে খপাখপ ধরে এনে আবার অ্যাকোয়ারিয়ামে ভরবে কে? কেন, নিখিলদা। হ্যাঁ, আমাদের সেই নবনিযুক্ত শিক্ষাকর্মীর নাম ছিল নিখিল ধর। কিন্তু প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বায়োলজি ল্যাবে তাঁকে যেটা করতে হত, তারপর তার জন্য একটাই ‘নিকনেম’ বরাদ্দ ছিল আমাদের মধ্যে। ‘ব্যাঙ ধর।’
ব্যাঙের কথা উঠল যখন, আমার কলেজ জীবনের একটা গল্প না শুনিয়ে পারছি না। আমার এক বছরের সিনিয়র ব্যাচে উদ্দীপ্ত সরকার নামের একজন পড়ত। তখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুম্বইয়ের দিলীপ বেঙ্গসরকার। উদ্দীপ্তদা ছিল ওর দারুণ ভক্ত। তবে কলেজের গোটা ছাত্রমহল যে ওকে ডাকত ‘ব্যাঙ সরকার’ বলে, তার কারণ শুধু সেটা নয়। ওর চলাফেরা আর বাচনভঙ্গীর মধ্যে একটা অদ্ভুত তিড়িংবিড়িং ভাব ছিল, সেজন্যও হয়তো। এই সরকার প্রসঙ্গেই মনে আসছে কলেজে আমার আরেক সিনিয়রের কথা। আশির দশকের শেষ দিকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সে পাড়ি দিয়েছিল উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারে তখন (প্রয়াত) প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ক্ষমতাসীন পাঁচ বছর ধরে, কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানিতে, সেই বছরের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী জোটের জেতার সম্ভাবনা প্রবল। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে আমার সেই সিনিয়র দাদাটি যখন প্রথমবারের জন্য অল্পদিনের ছুটিতে বিদেশ থেকে কলকাতা ফিরল, এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই দেখে দেয়ালে দেয়ালে ওর নামে বড় বড় করে স্লোগান লেখা – ওর কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার, ওকে বঙ্গোপসাগরে বা ভারত মহাসাগরে ফেলে দেওয়ার। বলাই বাহুল্য, স্লোগানগুলো রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে, কিন্তু কী আর করা যাবে? আমার সেই সিনিয়রটির নামও যে রাজীব সরকার।
সবশেষে আবার ফিরি গানের কথায়। যে শ্যামল মিত্র “নাম রেখেছি বনলতা”র মতো অমর একটি গান ফাঁকতালে পেয়ে গেছিলেন শুধু “বনলতা” শব্দটা থাকার কারণে, তিনি অবশ্য তাঁর উজ্জ্বল সংগীতজীবনে নাম-সংক্রান্ত গান কম গাননি। “কী নামে ডেকে বলব তোমাকে?,” “হংসপাখা দিয়ে ক্লান্ত রাতের তীরে নামটি তোমার লিখে যাই,” “তুমি কি ডাকবে মোরে, চেনা সে নামটি ধরে,” ইত্যাদি। সাধে কি আর তাঁকে নামী গায়ক বলি আমরা?
———-
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
