শম্ভু

শম্ভু

শম্ভু ও প্রতিপক্ষ

দুটো ষাঁড়ের লড়াইয়ের বিবরণ দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এই লড়াইয়ের সূত্রেই শম্ভুকে আমি চিনেছিলাম।

আমাদের কয়েকটা পাড়া মিলে একটা ষাঁড় ঘুরে বেড়াত। সে বড়ই নিরীহ, বয়সও হয়েছিল বিস্তর। নিজের কাজে তার কতটা পারদর্শিতা ছিল জানি না, কিন্তু তার সম্বন্ধে বিশেষ কোনো নালিশ মানুষজনের ছিল না বলেই জানতাম। বাধ সাধল পাড়ায় একটা অল্পবয়সি ষাঁড়ের আবির্ভাব।

বুড়োটা তার মৌরসিপাট্টা ছাড়তে নারাজ আর ছোটটা দখল নেবেই। অতএব, আমরা বইয়ে যা পড়েছি, সিনেমায় যা দেখেছি, তাই হল – অর্থাৎ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে গোয়ালপাড়া থেকে রাধার ঘাট পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল, সব দোকানপাট বন্ধ করতে হয়েছিল। মুহূর্মুহু হুঙ্কার আর শিং বাগিয়ে আক্রমণ, ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা রাজনৈতিক বোমাবাজি চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। প্রথমে লোকেরা খানিকক্ষণ লড়াই বন্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আশেপাশের বাড়ির ছাতে উঠে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কী পরিণতি হয় দেখতে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট যুদ্ধ চলার পর যা স্বাভাবিক তাই ঘটল। অল্পবয়স্ক ষাঁড়টা মাথা আকাশের দিকে তুলে লম্বা হুঙ্কার দিয়ে নিজের জয় ঘোষণা করল আর বুড়ো ষাঁড় রক্তাক্ত কলেবরে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে ধীরে ধীরে চলে গেল। তাকে আর কোনদিন কেউ দেখেনি। পাড়ার লোকেরা গাঁদা ফুলের মালা, সিঁদুরের টিকা দিয়ে বরণ করে নিল এই নতুন হিরোকে। তার নামকরণ হল ‘শম্ভু।’

শম্ভু রাস্তা দিয়ে রাজকীয় ভাবে চলাফেরা করত। রিক্সা বা গাড়িকে অপেক্ষা করতে হত যতক্ষণ না ও স্বেচ্ছায় রাস্তা ছাড়ে। সচরাচর শম্ভু কারোর দিকে সোজা তাকাত না, কিন্তু তাকালে দর্শিতর ভেতরটা কেঁপে উঠত – যদিও ওর মধ্যে হিংস্রতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। তবে দোষের মধ্যে শম্ভু ছিল তোলাবাজ। বাজারের মধ্যে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াত আর দোকানদার যতক্ষণ না কলাটা, মুলোটা, আলুটা, দিচ্ছে সামনে থেকে নড়ত না। এই ভাবে পেট না ভরা পর্যন্ত চলত তোলা আদায়।

একদিন কী কারণে জানি না, শ্রীকৃষ্ণ ফার্মাসির সামনে গিয়ে শম্ভু হাজির। হয়তো বা জ্বর টর হয়ে থাকতে পারে। ওই দোকানের কর্মচারী ‘ভোলা’ ছিল মহা দুষ্টু আর ফাজিল। সে কয়েকটা কাঁঠালি কলা এনে, ছাড়িয়ে, দোকানের অনেকগুলো এক্সপায়ার্ড হয়ে যাওয়া ঘুমের ওষুধ কলার গায়ে গুঁজে শম্ভুকে অফার করল। শম্ভুও মহা ফুর্তিতে ওর তোলার লিস্টে এই নতুন দোকানটা জুড়ে, কলা গিলে, জাবর কাটতে কাটতে অন্য দোকানের দিকে রওনা হল।

ফল টের পাওয়া গেল দুপুরের পরে। মহাকালী পাঠশালার সামনে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে শম্ভু গভীর নিদ্রায় মগ্ন। কেউ কিছু বুঝতেই পারছে না কী হয়েছে, রাস্তা পুরো বন্ধ। সবাই ভয় পাচ্ছে শম্ভুর অবস্থা দেখে। রাস্তা চালু করতে হলে তো প্রথমে শম্ভুকে সরাতে হবে! সেটা প্রায় অসম্ভব। শেষমেশ পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড এসে অনেক কায়দা করে শম্ভুকে রাস্তার মাঝখান থেকে সরাল।

শম্ভুকে সরানোর বৃহৎ যজ্ঞের সময় ভোলা একপাশে কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়েছিল। তারপর কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে স্বীকার করে ফেলল ও কী করেছে। ফলে বেশ কিছু চড়থাপ্পড় ওর ওপর বর্ষিত হল। অ্যানিম্যাল লাভারসরা সিদ্ধান্ত নিল ভোলাকে কোনদিন ক্ষমা করা হবে না। প্রায় ঘণ্টা চারেক পরে শম্ভু আস্তে আস্তে ঘুম থেকে উঠে, গলা দিয়ে একটা অন্য রকম ধ্বনি বের করে চলে গেল। ওই আওয়াজে বলে গেল এজাতীয় স্থূল রসিকতা ওর একেবারেই পছন্দ নয়। শম্ভু হয়তো কোনদিন ধরতে পারেনি আসলে কী হয়েছিল কিন্তু মাঝে মাঝেই ওকে দূর থেকে শ্রীকৃষ্ণ ফার্মাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যেত। আর ভোলা তো শম্ভু এদিকে আসছে খবর পেলেই দোকানের পিছন দিক দিয়ে পালাত। সকলের ধারণা হল শম্ভু একটু প্রতিহিংসাপরায়ণ, যদিও সেটা সঠিক ভাবে তখনো প্রমাণ হয়নি।

বাড়ির লাগোয়া বড়ো রাস্তার ওপর একটা ঘরে একসময় স্বপন কাগজের দোকান দিয়েছিল। থাকত ওপর তলায় আর ব্যাবসা ছিল নীচে। দোকান ব্যাপারটাকে ও কতটা সিরিয়াসলি নিয়েছিল জানি না, কিন্তু ওই ঘরে বসে চা খেয়ে আর রাজা উজির মেরে আমরা অনেক সময় কাটিয়েছি।

একবার স্বপন খুব ভাল কোয়ালিটির ২০ রিম এ-ফোর সাইজ কাগজের অর্ডার পেয়ে কলকাতায় গিয়ে অনেক খুঁজে সেগুলো নিয়ে এল। পরদিন সকালে ওর ঘুম ভাঙল দেরিতে। উঠে তাড়াতাড়ি দোকান খুলে, পুজোআচ্চা সেরে ওপরে গিয়ে জলখাবার খেতে বসেছে, এমন সময় হই হই কাণ্ড। সামনের রাস্তা দিয়ে শম্ভু নির্বিবাদে হাঁটছিল। যেতে যেতে স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে দোকানে উঁকি দিল। সেদিন বোধহয় তোলার ঝোলায় কিছুটা ঘাটতি ছিল, ফলে ওই নতুন আনা ভালো কাগজের প্যাকেটগুলো ওর খুব পছন্দ হয়ে গেল। দোকানে ঢুকে প্যাকেটগুলো ভ্যান্ডালাইস করে শম্ভু সবে কাগজ খেতে শুরু করেছে, এমন সময় রই রই চিৎকার। চেঁচামেচি শুনে স্বপন দৌড়ে নেমে এল। দেখেশুনে আর অবস্থা বুঝে ওর মাথায় রক্ত গেল উঠে। দোকানের ভেতর ছিল একটা লাঠি, ক্রুদ্ধ স্বপন সেটা নিয়ে শম্ভুকে বেধড়ক ঠ্যাঙাল।

শম্ভু নিশ্চয় বুঝেছিল কাজটা ভাল করেনি তাই বিশেষ প্রতিবাদ না করেই সরে গেল নেপালদার দোকানের দিকে। ইতিমধ্যে শম্ভুর গায়ে হাত তুলে স্বপনেরও খারাপ লাগতে আরম্ভ করেছে। তার ওপর কয়েকজন এসে বলে গেল, “স্বপন, চেয়ে দ্যাখ। মনে হচ্ছে শম্ভু সকলের সামনে মার খেয়ে অপমানিত বোধ করছে। এবার থেকে একটু সাবধানে থাকিস।” কথাটা স্বপনের মনে ধরল। তারপর থেকে একটু ও দেখেশুনেই চলাফেরা করতে থাকল। সবসময় মনে হত শম্ভু যেন ওর ওপর নজর রাখছে।

একদিন বিকেলে স্বপন ওপর থেকে নামছে, এমন সময়ে শুনতে পেল কেউ বলছে, “দাদা দাদা, নীচে যাবেন না। শম্ভু উঠোনে ঢুকেছে।” স্বপন ফিরে গেল ওপরে। ওদের বাড়ির কাজের বৌ খোলা ছাতের গাছগুলোতে জল দিতে দিতে লক্ষ্য করল গেট খোলা পেয়ে ঢুকে, উঠোনের এক কোনায় প্রমাণ সাইজের গন্ধরাজ ফুলগাছের নীচে শম্ভু চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ছাত থেকে স্বপনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতে হতাশার ভঙ্গিতে শম্ভু বেরিয়ে গেল। এইভাবে লুকোচুরি খেলে প্রায় মাস দুই কেটে গেল। আস্তে আস্তে স্বপনের ডিফেন্স মেকানিজমও দুর্বল হতে লাগল।

সেদিন দোকানে বসে স্বপন দেখল পাড়ার সলিলদা রিক্সা করে আসছে। হালে সলিলদার একটা ছোটখাটো হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে, আজই প্রথম বাইরে বেরিয়েছে। স্বপন তাড়াতাড়ি দোকান ছেড়ে, স্বভাবসিদ্ধ এমপ্যাথি নিয়ে সলিলদার কুশল সংবাদ গ্রহণে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রিক্সাচালক ইতিমধ্যে রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। স্বপন রিক্সাচালকের সিটের ওপর ভর দিয়ে কথা বলছে। হঠাৎ ওর মনে হল আশেপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেছে। পরমূহুর্তে টের পেল ও শূন্যে – বসে আছে শম্ভুর শিঙের ওপর। স্বপন হাউমাউ করে উঠল বটে কিন্তু সবাই এত হতচকিত, ওকে এসে যে নামাবে কেউ নড়াচড়াই করতে পারল না। ভাগ্য ভাল সলিলদার আর একটা হার্ট অ্যাটাক হয়নি। কতক্ষণ সময় গেছে কারও খেয়াল নেই। একটু পরেই আস্তে আস্তে স্বপনকে রাস্তায় নামিয়ে শম্ভু গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বের করল যা অবশ্যই অপরিসীম আত্মতুষ্টির ইঙ্গিত। তারপর নিজের কাজ সারতে হাঁটা দিল বাজারের দিকে। 

স্বপনকে ডাক্তার দেখাতে হয়েছিল, কিছুদিন বসতেও কষ্ট পেয়েছিল। তারপর… অবাক কান্ড! শম্ভু আর স্বপন হয়ে উঠল সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। প্রতিহিংসাপরায়ণতা চরিতার্থ হবার পর শম্ভু রোজ দু’তিনবার স্বপনের কাছে যেত। স্বপন ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিত, ও চোখ বন্ধ করে আদর খেত…।

কয়েকদিন আগে খবর পেলাম শম্ভু আর নেই। বয়সজনিত কারণে ইহলোক ত্যাগ করেছে। পাড়ার লোকেরা চাঁদা তুলে ওর উপযুক্ত ফিউনারালের ব্যাবস্থা করেছে।

———-

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

অচ্যুত মজুমদারের স্কুল শিক্ষা বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল-এ। তারপর শিবপুর বি ই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দস্তুর, লারসন ট্যুব্রো, ম্যাকনালি ভারত ইঞ্জিনিয়ারিং, ইত্যাদি সংস্থায় চাকরি করে সবেমাত্র অবসর গ্রহণ করেছেন। ২০২৬-এর বইমেলায় ওঁর প্রথম বই, ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’র অনুবাদ, দ্য ক্যাফে টেবিল প্রকাশ করেছে। উনি দুই কন্যার গর্বিত পিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *