তালগাছের মাথায় ছয়-হাঁকানো ভারতীয় ক্রিকেটার

তালগাছের মাথায় ছয়-হাঁকানো ভারতীয় ক্রিকেটার

শুরু করছি ভারতীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে একটা ক্যুইজ দিয়ে – পাঁচটা প্রশ্ন:

1. টেস্ট-দ্বিশতরান প্রথম কে করেছিলেন?
2. ৩,০০০ টেস্ট-রানের মাইলফলক প্রথম কে ছুঁয়েছিলেন?
3. ১০টা টেস্ট-শতরান করবার মাইলফলক প্রথম কে ছুঁয়েছিলেন?
4. ৫০টা টেস্ট-ম্যাচ খেলবার মাইলফলক প্রথম কে ছুঁয়েছিলেন?
5. শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিরুদ্ধে একই টেস্ট-ম্যাচে শতরান করবার ও পাঁচ-উইকেট নেওয়ার বিরল কৃতিত্ব প্রথম কে অর্জন করেছিলেন?

যেসব বাংলা-ভাষী ক্রিকেট-প্রেমীদের বয়স পঞ্চাশ-বা-তার-কম, তাঁদের অনেকেই হয়ত ভাবছেন যে সানি-কপিল-সচিন-বিরাট-অ্যাশ এঁরা থাকতে এসব প্রশ্নগুলোর আবার কোনও গুরুত্ব আছে নাকি! তাঁদের জ্ঞাতার্থে সবিনয়ে জানাই যে যখন ভারত মোটামুটি দেড়-দশক জুড়ে গোটা-পনেরো টেস্ট-সিরিজ মিলিয়ে জনা-দশেক অধিনায়কের নেতৃত্বে গোটা-পঁয়ষট্টি ম্যাচ খেলছিল, তখন এই রেকর্ডগুলো করা সহজ কাজ ছিলনা। এ নিয়ে তর্কের অবকাশ অবশ্যই আছে, কারণ বিভিন্ন যুগের ক্রিকেটারদের মধ্যে তুলনা করাটা বড়ই কঠিন এবং অনেকাংশেই তা কম বস্তুনিষ্ঠ হয়ে থাকে।

তুলনামূলক তর্কের জটিলতা সরিয়ে রেখে ফিরে আসি ক্যুইজটাতে। এই পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর একটাই – ‘Palm-tree Hitter’ নামে পরিচিত পহলান রতনজি (‘পলি’) উমরিগর, বিগত ২৮শে মার্চ যাঁর জন্মশতবার্ষিকী ছিল। আজকে পলি-কে নিয়েই একটা দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করা যাক – খেলোয়াড়, ক্রীড়া-প্রশাসক, নির্বাচক, মাঠ- তত্ত্বাবধায়ক এমন নানা ভূমিকায় ভারতীয় ক্রিকেটে যাঁর অবদান প্রচুর।

পলি মারা যাওয়ার পর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে ভারতের এক টেস্ট-ওপেনার বলেছিলেন: “I have learnt so much from him that I can’t pinpoint one particular thing. He once told me that I try and take my first run too early. He told me to take at least the first few runs safely.” – ব্যক্তিটির নাম সুনীল গাভাস্কর।

শোলাপুরে শিক্ষার শুরু

বছর বারো-তেরোর ছেলে গেছে বড়দের স্থানীয় এক ক্রিকেট-ম্যাচ দেখতে। এক দলের একজন খেলোয়াড় না আসায় তাকে মাঠে নামিয়ে ডিপ-ফাইন-লেগ অঞ্চলে ফিল্ডিং খাটতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হ’ল। দলের নড়বড়ে উইকেট-কিপারের ফস্কানো বলগুলোর বাউন্ডারি হওয়া বাঁচাতে প্রচুর দৌড়ে বেড়িয়ে ম্যাচের শেষে ছেলেটার প্রাপ্তি অধিনায়কের প্রশংসা, “Polly, you have a good cricket future. You are a very promising boy.”
পান্ডে নামক এক ক্রিকেট-কোচের উৎসাহে ম্যাটিং-পিচে খেলা শেখা শুরু। পিচে চক দিয়ে গোল দাগ দেওয়া, তার ভেতরে বল ফেলতে হবে – এইভাবে লাইন-লেংথ বজায় রাখবার বোলিং-শিক্ষা। এই শিক্ষা পরবর্তী ক্রিকেট-জীবনে বেশ কাজে এসেছিল। ব্যাটিং করবার সময় সিং নামক ছ’ফুট-উচ্চতার এক বোলারের নতুন বলে পেস-বোলিং খেলা (থাই-প্যাড, আর্ম-গার্ড বা হেলমেট তখন ছিলনা), আর বাহুতে ও ঊরুতে মাঝেমধ্যেই লাল-বলের জোরসে গুঁতো খাওয়া – কিন্তু নেটের পেছনে দাঁড়িয়ে-থাকা পান্ডে-স্যরের কড়া নির্দেশ ছিল যে বলের লাইন থেকে সরলে চলবে না। পরবর্তী জীবনে, বিশেষত পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ও ষাটের দশকের গোড়ায়, লিন্ডওয়াল-ডেভিডসন বা হল-গিলক্রিস্ট বা ট্রুম্যান-স্ট্যাথাম বা ফজল-হুসেন এঁদের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে গিয়ে এই শিক্ষার ভিত অনেক সুফল দিয়েছে।

বম্বে থেকেই উত্থান

কর্মসূত্রে বাবা বদলি হলেন বম্বে, ছেলেকে ভর্তি করলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখানে কোচ ভাগাদুর কাপাডিয়া পলি-কে তাঁর ক্লাবেই খেলতে নিলেন আর তার ব্যাটিংয়ের ধরণ বদলাতে তিনি চেষ্টা করলেন না। এইখান থেকেই পলির ম্যাচ খেলবার অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকল বম্বে শহরের মাঠে মাঠে খেলে। ১৯৪৪-৪৫ ও ১৯৪৫-৪৬ মরশুমে পেন্টাঙ্গুলার প্রতিযোগিতায় পার্সি দলের হয়ে এবং ১৯৪৬-৪৭ ও ১৯৪৭-৪৮ মরশুমে রোহিন্টন বারিয়া ট্রফিতে বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে ধারাবাহিক সাফল্য আসতে লাগল। ১৯৪৬-৪৭ মরশুমে রঞ্জি ট্রফিতেও অভিষেক হ’ল, বম্বে দলের হয়ে। পলি তখন ক্রমশ হয়ে উঠেছেন এক উদীয়মান প্রতিশ্রুতিময় তরুণ ক্রিকেটার। বড় এক সুযোগ এল পরের মরশুমে।

স্বাধীনতার পর ভারতে প্রথম বিদেশি দলের ক্রিকেট-সফরে, ১৯৪৮-৪৯ মরশুমে, পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিরুদ্ধে ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে পলি করলেন শতরান, দুটো উইকেট নিলেন, ধরলেন খান-দুয়েক ক্যাচ। সাজঘরে এসে অভিনন্দন জানালেন প্রবাদপ্রতিম ক্যারিবীয় ব্যাটার জর্জ হেডলি: “You have wonderful cricket in you. Keep it up.”

ঐ শতরানটাই বোধহয় ভারতীয় টেস্ট-দলের দরজা খুলে দিল, দিল্লির প্রথম-টেস্টে ১৪ জনের দলে জায়গা পেলেন পলি। তবে প্রথম একাদশে সুযোগ হয়নি, সেটা ঘটল বম্বের দ্বিতীয়-টেস্টে। সফরকারী দলের বিশাল ৬২৯/৬ডি ইনিংসের জবাবে ভারত তখন ১৫০/৬ হয়ে গিয়ে খাবি খাচ্ছে। চতুর্থ-দিনের শুরুতে পলি মাঠে নেমে ফাদকর-এর সঙ্গে ৭৯ রানের এক জুটিতে কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেন। যদিও ফলো-অন বাঁচেনি, কিন্তু ম্যাচটা শেষ অবধি ড্র হয় আর ৩০ রানের ঐ ইনিংসটা বাড়িয়ে দিল পলির আত্মবিশ্বাস: “With India in deep trouble, Phadkar asked me not to go for shots and asked me to stay until lunch. … It was the first time in Test cricket when I felt that I could also achieve something in the game.” তবে পাঁচ-ম্যাচের ঐ টেস্ট-সিরিজে পলি আর একটা ম্যাচও খেলতে পাননি, যদিও “The Hindu” পত্রিকার বাৎসরিক ক্রিকেটপঞ্জী “Indian Cricket”-এর নির্বাচিত ঐ মরশুমের পাঁচ সেরা ক্রিকেটারদের মধ্যে তিনি থাকলেন।

১৯৪৯-৫০ ও ১৯৫০-৫১ মরশুমে পলি অবশ্য সফরকারী কমনওয়েলথ দলের বিরুদ্ধে বেসরকারি টেস্ট-ম্যাচগুলোতে নিয়মিত খেললেন, মোটামুটি ধারাবাহিকভাবে রানও পেলেন। ওরেল-ট্রাইব-রামাধিন-লেকার-শ্যাকলটন-ডুলান্ড এঁদের বোলিং-আক্রমণের বিরুদ্ধে বম্বে ও মাদ্রাজে দু’টো শতরান করলেন, দ্বিতীয়টা করবার সময় ৯০ থেকে ১০২ রানে পৌঁছেছিলেন ওরেল-কে পরপর দু’টো ছয় মেরে। ১৯৫০ সালে হাজারে-মানকড়-হেডলি-ওরেল-উইকস-রামাধিন এঁদের সঙ্গী হয়ে কমনওয়েলথ দলের সঙ্গে ইংল্যান্ডে ছোট এক সফরে গেলেন [ নীচের ছবিতে, দাঁড়িয়ে বাঁ-দিক থেকে ২য় জন], সেই দেশে প্রথম খেলবার অভিজ্ঞতাও হ’ল।

পলি, দাঁড়িয়ে বাঁ-দিক থেকে ২য়

মাদ্রাজের মোড়-ঘোরানো ম্যাচ

১৯৫১-৫২ মরশুমে সফরকারী ইংল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট-সিরিজের প্রথম চারটে ম্যাচের ছ’টা ইনিংসে (তার মধ্যে পাঁচবারই তিন-নম্বরে নেমে) মোট ১১৩ রান (গড় ১৮.৮৩), ফলে মাদ্রাজের পঞ্চম-তথা-শেষ ম্যাচে একাদশে জায়গাই হচ্ছিল না। কিন্তু অধিকারি-র কব্জিতে চোট দলে পলি-র জায়গাই শুধু করে দেয়নি, তাঁর কপালও খুলে দিল।

ম্যাচের তৃতীয়-দিন সকালে, বিপক্ষের ২৬৬ রানের জবাবে ভারত যখন ২১৬/৫, পলি নামলেন এবং সাড়ে-চার-ঘন্টায় ১৩০* রানের এক ইনিংস খেলে, প্রথমে ফাদকর ও পরে গোপিনাথ এঁদের সহায়তায় দলকে নিয়ে গেলেন ৪৫৭/৯ডি স্কোরে। তারপর মানকড়-গুলাম স্পিনার-জুটি ১৮৩ রানে বিপক্ষকে খতম করে দিলেন। ভারত পেল তার সর্বপ্রথম টেস্ট-জয় – সিরিজ রইল ১-১ অমীমাংসিত, ভারতের টেস্ট-ইতিহাসে এই প্রথমবার সিরিজ-হার এড়ানো গেল।

ঐ শতরানটা দিয়েই ব্যাটার পলি ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের জীবনের মোড় ঘোরালেন। আর তাই হয়ত তুলনামূলকভাবে-দুর্বল ইংরেজ বোলিং-আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর এই ইনিংসটাকেই তাঁর জীবনের সেরা ব’লে তিনি মনে করতেন, যদিও এর থেকে বেশি শক্তিশালী বোলিং-আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর আরো বেশ কয়েকটা শতরান আছে।

বিলেতে বিড়ম্বনা-জড়িত বদনাম

১৯৫২ মরশুমের ইংল্যান্ড-সফরে পলি বুঝলেন যে কত ধানে কত চাল। সেই সফরে ইংল্যান্ডের মাঠে তাঁর ব্যাট থেকে মোট ১,৬৮৮ রান এল (দলের মধ্যে সর্বোচ্চ) ল্যাঙ্কাশায়ার, কেন্ট এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে দ্বিশতরান সমেত। কিন্তু পাশাপাশি, শক্তিশালী পেস-বোলিংয়ের বিরুদ্ধে, গতি ও স্যুইং, দুর্বলতার কিছু লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার প্রভাব পড়ল টেস্ট-ম্যাচগুলোয়।

১৯৫১-৫২ মরশুমে সফরকারী ইংল্যান্ড দলে, বাঁদিক থেকে ষষ্ঠ , বাঁদিক থেকে দ্বিতীয়, পঙ্কজ রায়

চার-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে, সাত ইনিংসে (চারবার বোল্ড আউট হয়ে) তাঁর মোট রান হ’ল ৪৩, গড় ৬.১৪ – হতাশার চরম। ট্রুম্যান-এর সম্মুখীন হয়ে তিনি নাকি স্কোয়্যর-লেগের দিকে পিছু হটতে থাকেন আর টনি লক লেগ স্লিপ থেকে ব্যঙ্গ করেন: “I say Polly, do you mind going back? I can’t see the bowler.” – লজ্জাজনক! ট্রুম্যানের হাত থেকে বাঁচলেও রেহাই নেই, কারণ অন্য প্রান্তে বল হাতে অ্যালেক বেডসার অপেক্ষমাণ। সময়টা ছিল যেন দুঃস্বপ্নের মতো। ম্যাঞ্চেস্টার-টেস্টে তাঁর ব্যাটিং নিয়ে ভারতীয় ক্রীড়া-সাংবাদিক এস কে গুরুনাথন লেখেন: “(He held) the bat out to each ball, missing it like a beginner.”

উন্নত মানের পেস-বোলিংয়ের বিরুদ্ধে দুর্বল – এই সফরের পর এমন বদনামের মোকাবিলা তাঁর বাদবাকি গোটা ক্রিকেট-জীবন ধ’রেই পলি-কে করতে হয়েছে, কতকটা যেন তাঁর প্রথম টেস্ট-অধিনায়ক লালা-র মেজ ছেলে জিমি-র মতন। তবে জিমি মূলত তিন-নম্বরে খেলেই পরবর্তীকালে ক্রিকেট-দুনিয়ার সম্ভ্রম আদায় করলেও, পলি-কে খানিকটা অন্য পথ নিতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি ব্যাটিংয়ের জায়গা বদলান। এই ব্যাপারটাতে চট ক’রে একবার একটু নজর দেওয়া যাক।

পলি-র টেস্ট-জীবনের ৫৯ ম্যাচের মোট ৯৪ ইনিংসে ৩,৬৩১ রান, গড় ৪২.২২ (১২টা শতরান, ১৪টা অর্ধশতরান) এই পুঁজির এক-তৃতীয়াংশেরও কম [৩৬ ইনিংসে ১,০৯২ রান, গড় ৩৩.০৯ (দু’টো শতরান, পাঁচটা অর্ধশতরান)] এসেছিল তিন-নম্বরে খেলে। পরিসংখ্যান বলছে যে ঐ তিন-নম্বরী ভূমিকায় মোট ৩৩ বার আউটের মধ্যে দু’বার রান-আউট বাদে ১৭ বার কট ও ১৩ বার বোল্ড হয়েছেন তিনি, ২৪ বার উইকেট হারিয়েছেন পেসারদের হাতে। আবার ভারতের সর্বপ্রথম টেস্ট-দ্বিশতরানটাও তিন-নম্বরে নেমেই তিনি করেন, তবে বিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড দল যাদের বোলিং-আক্রমণ ছিল বেশ দুর্বল। টেস্ট-ব্যাটার হিসেবে পলি-র সাফল্য মূলত পাঁচ (বা ছয়) নম্বরে, অর্থাৎ মিডল-অর্ডার ব্যাটার হিসেবে খেলে – ৫১ ইনিংসে ২,২৬৩ রান, গড় গড় ৪৮.১৪ ((ন’টা শতরান, আটটা অর্ধশতরান) – এটা তো অনস্বীকার্য।

ব্যাটিং-ফর্মের চড়াই-উৎরাই

তাঁর টেস্ট-জীবনের আরম্ভটা যে মোটেই ধারাবাহিক ছিলনা, তার প্রমাণ ১৯৪৮-৪৯ মরশুম থেকে শুরু ক’রে তিনটে মরশুমে মোট তিনটে সিরিজ – দু’টো স্বদেশে (বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড) আর একটা বিদেশে (ইংল্যান্ড) – ১০টা ম্যাচে ১৫টা ইনিংসে মোট ৩১৬ রান (গড় ২২.৫৭), একটা শতরান, কোনও অর্ধশতরান নেই।

১৯৫১-৫২ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐ ১৩০* রানের ইনিংসটা বাদ দিলে আরো করুণ অবস্থা – ১৪টা ইনিংসে মোট ১৮৬ রান (গড় ১৩.২৮), কোনও শতরান বা অর্ধশতরান নেই, সর্বোচ্চ ইনিংস ৩৮ রানের! বুঝতেই পারা যায় পলি ঐ ইনিংসটাকে কেন তাঁর জীবনের সেরা ব’লে মনে করতেন। ওটা না খেলতে পারলে হয়ত পলি-র টেস্ট-জীবনের অকাল পরিসমাপ্তি ঘটে যেত।

ব্যাটার পলি-র টেস্ট-জীবনের বাকি এক দশকের একটা প্যাটার্ন দেখানোর চেষ্টা করি। এই সময়টাকে, ১৯৫২-৫৩ মরশুম থেকে ১৯৬১-৬২ মরশুমকে, মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করি – লক্ষ করুন তাঁর ফর্মের ওঠা-পড়া।

 

  • প্রথম ভাগের চার সিরিজের দু’টো স্বদেশে (বিপক্ষে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড) আর দু’টো বিদেশে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান)
  • দ্বিতীয় ভাগের চার সিরিজের তিনটে স্বদেশে (বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া দু’বার ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ) আর একটা বিদেশে (ইংল্যান্ড)
  •  তৃতীয় ভাগের তিন সিরিজের দু’টো স্বদেশে (বিপক্ষে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড) আর একটা বিদেশে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

বিলেত-ফেরত ব্যাটারের ব্যাটিং-নামা

১৯৫২ মরশুমের ইংল্যান্ড-সফর শেষে দেশে ফিরে পলি তাঁর ব্যাটিং-প্রকরণ নিয়ে পড়লেন, কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর টেকনিকের খামতি পূরণের প্রচেষ্টায়। তাঁর ব্যাটিং-স্ট্যান্স একটু ঝুঁকে-পড়া থেকে পাল্টে আরেকটু খাড়া-হওয়া করলেন। এতে তাঁর অফের দিকে শট খেলায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা এল, কিন্তু রক্ষণ হ’ল আরো মজবুত আর তাঁর অন-সাইডে শট খেলবার জোর বা দক্ষতায় কোনও খামতি হয়নি।

সুফল পেলেন ১৯৫২-৫৩ মরশুমের বম্বের তৃতীয়-টেস্টে, সদ্য-টেস্ট-অভিষিক্ত সফরকারী পাকিস্তান-দলের বিরুদ্ধে, পৌনে-তিন-ঘন্টায় ১০২ রানের ইনিংস খেলবার পথে চতুর্থ উইকেটে অধিনায়ক হাজারে-র সঙ্গে ১৮৩ রানের জুটি করলেন, ভারত ম্যাচটা জিতল ইনিংসে এবং সিরিজে এগোল ২-১ ম্যাচে। ঐ ফলাফলেই পাঁচ-ম্যাচের সিরিজে ভারতের টেস্ট-ইতিহাসে সর্বপ্রথম টেস্ট-সিরিজ জয়।

এরপর আরো বড় প্রাপ্তি এল ঐ মরশুমেরই শেষদিকে ভারতের সর্বপ্রথম ক্যারিবিয়ান-সফরে, পলি টেস্ট-ব্যাটার হিসেবে ধারাবাহিক ও পরিণত ব’লে গণ্য হলেন। কিং-গোমেজ-ওরেল-ভ্যালেন্টাইন- রামাধিন এঁদের কার্যকরী বোলিং-আক্রমণের বিরুদ্ধে পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে তুললেন মোট ৫৬০ রান (গড় ৬২.২২), দু’টো শতরান ও চারটে অর্ধশতরান সমেত। সিরিজের শুরুতেই ত্রিনিদাদ-টেস্টে রামাধিনের বলে ছক্কা মেরে শতরান পূর্ণ করলেন। তাঁর পূর্ণশক্তির ড্রাইভ ও জোরালো পুলশট, এবং বড়-ছয় মারবার ক্ষমতা – “Polly was a great hitter who could send the ball high over the boundary”, বলেছিলেন সহ-খেলোয়াড় জি এস রামচাঁদ – এগুলোর কারণেই ক্যারিবীয়-দর্শকমহলে তাঁর ডাকনাম হয় ‘Palm-tree Hitter’ – আন্তর্জাতিক-ক্রিকেটে চার বছর খেলবার পর, পলি একজন ‘class act’ হিসেবে গণ্য হলেন।

১৯৫৪-৫৫ মরশুমে পাকিস্তান-সফরে টেস্ট-সিরিজে ব্যাটিংয়ে পলি বেশ সাফল্য পেলেন, লাহোর-এর তৃতীয়-টেস্টে ৭৮ করলেন ও পেশাওয়ার-এর চতুর্থ-টেস্টে (তিন-নম্বরে নেমে) ১০৮ রানের এক লড়াকু ইনিংস খেললেন। আবার ভাওয়ালপুর-এর দ্বিতীয়-টেস্টে দেখা গেল এক আলাদা পলি-কে – অফ-কাটার দিয়ে বোলিং ওপেন ক’রে ৫৮ ওভারে ৭৪ রান দিয়ে ৬টা উইকেট তুলে নিয়ে যেন মনে করালেন যে এক দশক আগে মূলত-বোলার হিসেবেই পেন্টাঙ্গুলার-ক্রিকেটে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল!

অমরনাথ-এর তত্ত্বাবধানে এবং মানকড়-এর অধিনায়কত্বে ভারতীয় দলের সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক পাকিস্তান-সফরটাকে একবার পলি-র নজরে দেখে নিই: “There was a fear psychosis about touring an unfriendly country. Some players were scared to go, but I wasn’t. There was security. When we went to a cinema there would be cops all around us.”

বেশ ভালোরকম আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা নিয়েই তাঁরা দেশে ফেরেন। লায়ালপুর-এ হোটেল না থাকায় খেলোয়াড়দের রেলের বগিতে থাকতে হয়েছিল বটে, কিন্তু বাদবাকি সব শহরে তাঁরা ভাল হোটেলেই ছিলেন। সর্বত্রই খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত ছিল চমৎকার। লাহোরে ঘুরে দেখলেন কিছু জায়গা: “There were people taking us to some homes and pointing out `these are yours’ – homes from where the Hindus had fled during Partition.” ভারতীয় সমর্থকদের থেকে রিকশাওয়ালারা নাকি ভাড়া নিতেন না: “Rickshaw-wallahs would not take money from Indian fans. `Hamare bhai aaye hain’ they would say.” মাঠের দর্শকদের ব্যবহারও ছিল সৌজন্যসূচক: “There was no hooting by the crowds, no jeering. There was no cheering when we hit a four. But we didn’t mind.” এসব তো সাত দশক আগেকার কথা – দেশভাগের গভীর ক্ষত তখনও দগদগে, তবুও কোথাও হয়ত যেন কিছু ‘পিছুটান’ ছিল, কে জানে!

অমরনাথ ও (করমর্দনরত) মানকড়-এর সঙ্গে পাক-রাষ্ট্রনায়ক আইয়ুব খান, শিয়ালকোট, ১৯৫৪-৫৫ সফর

১৯৫৫-৫৬ মরশুমে ভারত সর্বপ্রথম মুখোমুখি হ’ল নিউজিল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে, দেশের মাটিতে পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে। হায়দ্রাবাদ-এর প্রথম-টেস্টে প্রায় সাড়ে-আট-ঘন্টা-ব্যাপী ইনিংস খেলে পলি করলেন ২২৩ রান, টেস্ট-ক্রিকেটে সর্বপ্রথম ভারতীয় দ্বিশতরান। দেশে ও বিদেশে পরপর কয়েকটা সিরিজে ধারাবাহিক ব্যাটিং-সাফল্যের পুরস্কার হিসেবেই হয়ত গুলাম আহমেদ-এর অনুপস্থিতিতে এই সিরিজের বাকি চারটে ম্যাচে তাঁকেই করা হ’ল অধিনায়ক। ব্যাট-হাতে আর তেমন সুবিধে করতে না পারলেও তাঁর অধিনায়কত্বে ভারত ২-০ ম্যাচে সিরিজটা জিতল, দু’টো জয়ই ইনিংসে।

অধিনায়কত্বের অনেক অস্বস্তি

১৯৫৬-৫৭ মরশুমে দেশের মাটিতে তিন-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে সর্বপ্রথম ভারত-সফরকারী অস্ট্রেলিয়া দলের বিরুদ্ধে বম্বে-টেস্টে ৭৮ রানের ছ’-ঘন্টা-ব্যাপী ইনিংসটা বাদে বাকি পাঁচ ইনিংসে অধিনায়ক ও তিন-নম্বর ব্যাটার পলি মোট ৯৭ রান করলেন, হয়ত অধিনায়কের বাড়তি দায়িত্ব ও বিপক্ষের বোলিং-শক্তি (লিন্ডওয়াল-বেনো) এই যৌথ কারণেই। সিরিজটাও ০-২ ম্যাচে হারতে হ’ল।

১৯৫৮-৫৯ মরশুমে দেশের মাটিতে পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে, ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে ‘অধিনায়কত্বের জাতীয় নাগরদোলা’ (পাঁচ ম্যাচে চার অধিনায়ক, বম্বে-র প্রথম-টেস্টে পলি সমেত!) ও হল-গিলক্রিস্ট-রামাধিন-সোবার্স আক্রমণ সামলে মূলত তিন-নম্বরী ভূমিকায় ৫৫ ও ৩৬, ৫৭ ও ৩৪, ২৯, ৭৬ রানের ইনিংসগুলো যথেষ্টই কৃতিত্বব্যঞ্জক। সিরিজটা অবশ্য ভারত হারল ০-৩ ম্যাচে।

হঠাৎ-অবসর-নেওয়া গুলাম-এর জায়গায় প্রধান-নির্বাচক অমরনাথের সিদ্ধান্তে মাদ্রাজ-এর চতুর্থ-টেস্টে পলি-ই আবার অধিনায়ক হলেন, এবং জানালেন যে অফ-স্পিনার জাসু প্যাটেল-কে দলে রাখলে তিনি অধিনায়কত্ব করবেন না। ম্যাচের আগের দিন এক ভোজসভায় পলি তাঁর অধিনায়কের ভাষণ দিলেন এবং হোটেলে ফিরে জমা দিলেন তাঁর পদত্যাগপত্র! পরদিন নির্বাচকমণ্ডলী ও বোর্ড-সভাপতির শত চেষ্টাতেও রোরুদ্যমান পলি দলকে নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করলেন। জোরজার ক’রে বুঝিয়ে বয়স্ক মানকড়-কে অধিনায়ক করা হলেও খাদ্য-বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভিনু ম্যাচের শেষ তিনদিন মাঠেই নামতে পারলেন না, সামাল দিলেন রামচাঁদ। দিল্লি-র পঞ্চম-তথা-শেষ-টেস্টে অধিনায়ক হলেন হেমু অধিকারি। পলি নাকি শপথ করেছিলেন যে আর কখনও তিনি দেশের অধিনায়কত্ব করবেন না।

বিলেতে আংশিক শাপমুক্তি

১৯৫৯ মরশুমে ইংল্যান্ড-সফরে গেলেন সাত বছর আগেকার ‘ক্ষতচিহ্ন’ নিয়ে, সাগ্রহে-অপেক্ষমাণ ট্রুম্যান-স্ট্যাথাম পেস-জুটির মোকাবিলা করতে, দলের ব্যাটিংয়ের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে। সফরের প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচগুলোতে গত-সফরের মতনই সাফল্য এল, কিন্তু পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে, ট্রেন্ট-ব্রিজ ও লর্ডস, তিন-নম্বরে নেমে চার ইনিংসে মোট রান করলেন ৪২ – ট্রুম্যান ও স্ট্যাথাম তাঁকে দু’বার ক’রে শিকার করলেন। হেডিংলি-র তৃতীয়-টেস্টে পাঁচ-নম্বরে নেমে হালে খানিকটা পানি পেলেন, বেশ খানিকক্ষণ উইকেটে থাকলেন, রান করলেন ২৯ ও ৩৯, ট্রুম্যান-এর হাতে আউট হলেন না (স্ট্যাথাম খেলেননি)। তবে এর মধ্যে ০-৩ হেরে ভারত সিরিজ খুইয়ে ফেলল।

ওল্ড ট্র্যাফোর্ড-এর চতুর্থ-টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে প্রায় সাড়ে-পাঁচশো রানের বোঝা নিয়ে ভারত যখন ১৪৬/৩ – টেস্ট-অভিষেককারী তরুণ আব্বাস আলি বেগ চমৎকার খেলছেন – পলি নামলেন। দলের ১৭৩/৩ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ৮৫ রানে পেসার রোডস-এর বাউন্সারে কপালের ডানপাশে চোট পেয়ে সাময়িক অবসর নিতে বাধ্য হলেন বেগ, একটু পরেই ১৮০ রানের মাথায় আউট হলেন বোরদে। লড়ে গেলেন পলি, সঙ্গে নাদকার্নি – ২৩৬/৪ নিয়ে ভারতের চতুর্থ-দিন শেষ। পঞ্চম-তথা-শেষ-দিনে নাদকার্নি ফিরে গেলে বেগ আবার এলেন, এবং সাহসের সঙ্গে খেলতে লাগলেন। অপরদিকে পলি ইংল্যান্ডের দর্শকদের সামনে অবশেষে তাঁর ব্যাটিং-দক্ষতার প্রদর্শন মেলে ধরলেন এবং শতরানও করলেন। বেগ-উমরিগড় জুটি ভারতকে আশার ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছিল। কিন্তু দলীয় ৩২১ রানের মাথায় মিড-অনে ডেক্সটার-এর চমৎকার ফিল্ডিংয়ে রান-আউট হলেন বেগ (১১২), পলি তখন ৯৪ রানে। এরপর উইকেট-রক্ষক যোশি তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেও পলি পেলেন ইংল্যান্ডে তাঁর প্রথম-এবং-একমাত্র টেস্ট-শতরান – শর্ট-পিচ বলে জোরদার পুল-শট ও পিচড-আপ বলে দর্শনীয় ড্রাইভ খেলে – এতদিনের মনের জ্বালা-যন্ত্রণার হয়ত কিছুটা উপশম হ’ল। পলি যখন আউট হলেন, ভারতের তখন ৩৫৮/৮, ইনিংস শেষ হ’ল ৩৭৬ রানে – ঘন্টা-তিনেকের কিছু বেশি সময় বাকি থাকতে ইংল্যান্ড জিতল ১৭১ রানে, ৪-০ ম্যাচে সিরিজে এগিয়ে গেল।

জ্যাক হবস-এর হাত থেকে এক অনুষ্ঠানে পলি উপহার পেলেন ১০০ গিনি মূল্যের এক চেক

ঐ শতরানের দৌলতে প্রবাদপ্রতিম ইংরেজ ক্রিকেটার জ্যাক হবস-এর হাত থেকে এক অনুষ্ঠানে পলি উপহার পেলেন ১০০ গিনি মূল্যের এক চেক, এক ভারতীয় কেক-প্রস্তুতকারী সংস্থার তরফে [সঙ্গের ছবি]। এক কাউন্টি-ম্যাচে আঙ্গুলে চোট পাওয়ায় সফরের বাকি ম্যাচগুলো থেকে তাঁকে স’রেই থাকতে হয় – ওভাল-এর পঞ্চম-তথা-শেষ-টেস্টেও খেলতে পারলেন না, ভারত আবার হারল। টেস্ট-ক্রিকেটে সর্বপ্রথমবার ভারত ‘সিরিজে চুনকাম’ (০-৫) হ’ল, শতরান ক’রেও পলি-র শাপমুক্তি রইল অসম্পূর্ণ।

দেশের মাঠে ঘুরে দাঁড়ানো

১৯৫৯-৬০ মরশুমে রিচি বেনোর নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলীয় দল যখন ভারত-সফরে আসে, তখন ব্যাট হাতে পলি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলেন – পাঁচ-ম্যাচের সেই টেস্ট-সিরিজের প্রথম তিন ম্যাচে খেলে পাঁচ ইনিংসে পলি-র সংগ্রহ ছিল মাত্র ৫২ রান, তিনবার বাঁ-হাতি পেসার ডেভিডসন-এর শিকার। তবে ছোট-কিন্তু-গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পাঁচ-ম্যাচের সেই টেস্ট-সিরিজে পালন করেছিলেন, বল-হাতে। অজিদের বিপক্ষে ভারতের সর্বপ্রথম টেস্ট-জয়ের ম্যাচে কানপুর-এর দ্বিতীয়-টেস্টে ১৪টা-উইকেট-শিকারি জাসু প্যাটেল-এর সঙ্গে জুটি বেঁধে অফ-স্পিন বোলিং করে চতুর্থ ইনিংসে তিনি চারটে উইকেট (২৫-১১-২৭-৪) দখল করেন – ২২৫ রান তাড়া করতে-নামা অজিরা যখন এক উইকেট খুইয়ে ৫০-ছুঁইছুঁই, হার্ভে-ও’নীল-ম্যাকে এই তিন ব্যাটারকে পরপর ফিরিয়ে দিয়ে পলি বিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে ৬১/৪ ক’রে দিলেন, এরপর ১০৫ রানে তাদের ইনিংসটা মুড়িয়ে দেন মূলত প্যাটেল। শেষ অবধি ১-২ ম্যাচে সিরিজটা হেরে গেলেও বম্বে ও কলকাতার দুই ড্র-টেস্টে ভারতীয় দল লড়াইটা ভালই করেছিল।

১৯৬০-৬১ মরশুমে ঘরের মাঠে সফরকারী পাকিস্তান দলের বিপক্ষে পাঁচ-ম্যাচের নিষ্ফলা (০-০) টেস্ট-সিরিজটা অবশ্য পলি-র জন্য ব্যক্তিগতভাবে ছিল সাফল্যময় – ছ’টা ইনিংসে তিনটে শতরান – ৩৩, ১১৫, ১ ও ৪, ১১৭, ১১২ – যদিও পেসার মামুদ হোসেন-এর শিকার হলেন তিনবার।

১৯৬১-৬২ মরশুমে টেড ডেক্সটারের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে ভারত ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে, যদিও প্রথম তিনটে ম্যাচই ড্র হয়েছিল। বম্বে-র প্রথম-ম্যাচটা না খেললেও কানপুর-এর দ্বিতীয়-ম্যাচে পলি করলেন ১৪৭* যদিও এরপর ব্যাট-হাতে তাঁর সময়টা তুলনামূলকভাবে বেশ সাদামাটাই (পাঁচ ইনিংসে ১০৭ রান) কাটল। তবে দলে তাঁর উপস্থিতি ও পরামর্শ তরুণ অধিনায়ক নরি কন্ট্রাক্টর-কে অনেক সাহায্য করেছিল সিরিজটা জিততে।

ওস্তাদের মার শেষ সিরিজে

অবশেষে, ১৯৬১-৬২ মরশুমের শেষভাগে এই অভিজাত ব্যাটারের বর্ণাঢ্য টেস্ট-জীবনের শেষ অধ্যায়টা এল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে, ভারতীয় দলের এক বিপর্যস্ত পর্বের মাঝে – পাঁচ-ম্যাচের টেস্ট-সিরিজে ভারত ০-৫ হারল। কিন্তু দীর্ঘকায় পলি রইলেন তাঁর উঁচু মাথা নিয়ে, ১০ ইনিংসে তুললেন ৪৪৫ রান (গড় ৪৯.৪৪) একটা শতরান ও তিনটে অর্ধশতরান সমেত – বিপক্ষের বোলিং-আক্রমণে ছিলেন হল-স্টেয়ার্স-ওয়াটসন-কিং-ওরেল-ভ্যালেন্টাইন-সোবার্স-গিবস। পিঠের ব্যথা নিয়েও চারটে ইনিংসে মোট ১৫৬ ওভার বোলিং করলেন, নিলেন ন’টা উইকেট (গড় ২৭.৬৬), সিরিজে মোট চারটে ক্যাচও ধরেছিলেন।

তাঁর চৌকশ-প্রদর্শনের শিখরস্পর্শী সময়টা এসেছিল ত্রিনিদাদ-এর চতুর্থ-টেস্টে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪৪৪ রানের প্রথম ইনিংসে তিনি ৫৬ ওভার বল ক’রে ৫/১০৭ নিয়েছিলেন। এরপর ব্যাট-হাতে ভারতের ১৯৭ রানের ইনিংসে (একসময় হল-এর দাপটে ৩০/৫ হয়ে গেছিল) তিনি দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫৬ রান করেছিলেন। ভারত ফলো-অন করতে বাধ্য হয় এবং পরিস্থিতি যখন দুরাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল (১৬২/১ থেকে ২৩৬/৬), তখন পলি তাঁর ক্যারিয়ারের ‘যথার্থই-সেরা’ ইনিংসটা উপহার দিয়েছিলেন। চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধ’রে ব্যাট করে তিনি করলেন ১৭২* – সেই সময়ে দলের মোট ২৩০ রান সংগৃহীত হয়েছিল – ২৭৮/৮ থেকে দলকে টেনে নিয়ে গেলেন ৪২২/১০ অবধি। সবশেষে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ১৭৬ রানের জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছল, তখন পলি-র বোলিং-হিসেব ১৬-৮-১৭-০ – এমন কীর্তি টেস্ট-ক্রিকেটে তখন অবধি আর মাত্র একজন ভারতীয় খেলোয়াড়রই ছিল, তিনি স্বনামধন্য ভিনু মানকড়।

এই অসাধারণ কীর্তি ১৯৫২ মরশুমে লর্ডস-টেস্টে মানকড়ের সেই বিখ্যাত প্রদর্শনের সমতুল্য, যদিও পলি-র এই কীর্তি সেই একই মাত্রায় মহিমান্বিত বা আলোচিত হয়নি — হয়ত তৎকালীন ‘ক্রিকেট-কৌলীন্য’-এর মাপকাঠিতে পোর্ট-অফ-স্পেন যথেষ্ট উচ্চমানের ব’লে গণ্য হ’তনা, সেই কারণে!

সেই সিরিজের পঞ্চম-তথা-শেষ ম্যাচটিই ছিল উমরিগরের টেস্ট-জীবনের বিদায়ী ম্যাচ। জ্যামাইকা-তে সেই ম্যাচেও ভারত আবার হারল ১২৩ রানে। হল-কিং-ওরেল-সোবার্স-ভ্যালেন্টাইন-গিবস এইসব বোলারদের বিপক্ষে – প্রথম ইনিংসে ন’নম্বরে নেমে [২৫৩ রানের সম্মুখীন হয়ে দল তখন ১১২/৭] ৩২ রান ক’রে পলি টানলেন ১৭১/৮ অবধি, আর দ্বিতীয় ইনিংসে সাত-নম্বরে নেমে [৩৫৯ রান ‘তাড়া’ ক’রে দল তখন ৮৬/৫] ৬০ রান ক’রে পলি টানলেন ২৩৫/১০ অবধি। তাঁর বিদায়ে ভারতীয় টেস্ট-ব্যাটিংয়ের একটা অধ্যায়ের ওপর যবনিকা পড়ল।

অবসর-জীবনেও ভারতীয় ক্রিকেটের নিরলস সেবক

তাঁর খেলোয়াড়ি-জীবনে ইতি টানার পরও পলি ক্রিকেট থেকে মোটেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। ভারতীয়-দলের একাধিক লম্বা বিদেশ-সফরে – ১৯৭৫-৭৬ মরশুমে নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর এবং ১৯৭৭-৭৮ মরশুমে অস্ট্রেলিয়া-সফর – তিনি দলের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই দায়িত্ব পালনেও তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর সমস্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা।

১৯৭৮ সালে তিনি নির্বাচক-কমিটির প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যে পদটা তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাহী-সচিব হওয়ার আগে অবধি টানা পাঁচটা মেয়াদ ধ’রে রেখেছিলেন। বম্বে-র ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং অত্যন্ত যত্নসহকারে পিচ ও আউট-ফিল্ডের পরিচর্যা করতেন। পরবর্তী ক্রিকেট-প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন ‘পলি কাকা’—একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, যিনি জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি এবং ক্রিকেটের নানা বিষয়ের সঙ্গে ভালমতন জড়িত ছিলেন। তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ থেকে ভারতীয় ক্রিকেট দীর্ঘকাল ধরে উপকৃত হয়েছে!

মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অমায়িক। রবি শাস্ত্রী তাঁর উদারতার কথা স্মরণ করেন – যখন এই তরুণ অলরাউন্ডার তাঁর আচমকা টেস্ট-অভিষেকের জন্য ১৯৮০-৮১ মরশুমের নিউজিল্যান্ড-সফরে যাওয়ার অতিদ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন পলি রবি-কে নিজের ভারতীয় সোয়েটারটি উপহার দিয়েছিলেন। নিজের ক্রিকেট-জীবনের শেষে সেই সোয়েটার রবি ফেরত দেন, যেটা ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়া-র সংগ্রহশালায় রাখা ছিল। 

গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ পলি-র সেইসব মূল্যবান পরামর্শগুলোর কথা স্মরণ করেন [“Don’t watch the ball all the time, take a break in between. Go into the dressing-room, try some skipping, get your eye moving with some exercises.”], যা ভিশি-কে ১৯৭৫-৭৬ মরশুমের বিদেশ-সফরের ধারাবাহিকতার অভাবের সময় কাটিয়ে ফর্মে ফিরতে সাহায্য করেছিল।

নিজের অবসর-জীবনের প্রসঙ্গে তাঁরই জবানিতে কিছু কথা: “১৯৬২ সালের পর আমি খেলা ছেড়ে দিই এবং ক্রিকেট-প্রশাসনে যুক্ত হই; প্রথমে বম্বে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (MCA)-এর একজন নির্বাচক হিসেবে, এবং পরবর্তীকালে আমি ভারতীয় দলের সফর-ব্যবস্থাপকের দায়িত্বও একাধিকবার পালন করি। MCA-এর সম্মানসূচক যুগ্ম-সম্পাদক হওয়ার আগে, আমি এই অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালন-সমিতির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছি। পরবর্তীতে, যখন শ্রীযুক্ত ওয়াংখেড়ে একটা স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে এলেন, তখন আমি ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ি এবং এই কাজের পেছনে প্রায় প্রতিদিনই সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতাম।“ পিচ এবং মাঠ প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর ধারণা জানতে গেলে উৎসাহী পাঠকরা এখানে দেখতে পারেন: https://www.mumbaicricket.com/preparation-cricket

তাঁর লেখা প্রশিক্ষণ-বিষয়ক বইটা উঠতি ক্রিকেটারদের ব্যাটিং শেখার ক্ষেত্রে কীভাবে সহায়তা করতে পারে সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য: “বইটা অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় ও ভঙ্গিতে আমি লিখেছি এবং এটা দেশের সব স্কুল-কলেজ এবং ক্রিকেট-পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর কাছে, এমনকি বোর্ডের আওতার বাইরের সংস্থাগুলোর কাছেও, পাঠিয়ে দিয়েছি। খেলাটার প্রতি এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার দায়বদ্ধতা থেকে আমি কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই। পিচ বা উইকেটের প্রস্তুতি নিয়ে আরেকটা বই লেখার ব্যাপারেও আমি অনুপ্রাণিত।

এমন বহুবিধভাবে ভারতীয় ক্রিকেটের সেবা খুব কম-সংখ্যক জাতীয়-স্তরের ক্রিকেটার করেছেন বা করছেন, একথা বলতেই হবে। ১৯৯৮ সালে পলি ভূষিত হন “CK Nayudu Lifetime Achievement Award” সম্মানে, যা প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটারদের জন্য বিসিসিআই-এর প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান।

অপরদিকে তাঁরই নামাঙ্কিত “Polly Umrigar Award for International Cricketer of the Year “ পুরস্কার বিসিসিআই-এর তরফে প্রতিবছরই দেওয়া হয়ে থাকে, পুরুষ ও মহিলাদের  সেরা ভারতীয় ক্রিকেটারকে – ২০০৭ সালে শচিন তেন্ডুলকর-কে দিয়ে শুরু, আর ২০১৭ সালে হরমনপ্রীত কউর মহিলা-ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বপ্রথম এই সম্মান পেয়েছেন।

কেমন ক্রিকেটার ছিলেন তিনি: কিছু মূল্যায়ন

এখানে জানিয়ে রাখা দরকার যে পলি-কে আমি কখনও খেলতে দেখিনি, তাই অভিজ্ঞ বহুদর্শী কয়েকজন ক্রিকেট-সাংবাদিকের রচনা/বক্তব্য থেকে মতামত/মূল্যায়ন ধার করতে হচ্ছে।

মূলত পঞ্চাশের দশকে দেশের প্রধান ব্যাটার হিসেবে তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর পূর্বসূরি মহান তারকাদের আদর্শের এক সুযোগ্য বাহক হিসেবে তাঁর অবস্থান নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ ছিল না – বিজয় হাজারের পর ভারতের প্রধান ব্যাটার পলি-ই সেই জায়গা দখল করেন। একজন বড় মাপের রান- সংগ্রহকারী, যিনি প্রতিপক্ষের কাছে ছিলেন এক সম্ভ্রমসূচক নাম।

পলি যখন ক্রিজে থাকতেন, তখন তাঁর সংগৃহীত রান নজর তো কাড়তই, তাঁর খেলার ধরনটাও ছিল সমান আকর্ষণীয়। তিনি ভারতীয় ব্যাটিংয়ের রূপরেখা বেশ খানিকটা বদলে দিয়েছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় ব্যাটিং মূলত ‘মার্চেন্ট-হাজারে ঘরানা’-র ছায়ায় বেড়ে উঠেছিল, যে ঘরানায় কারিগরি (technical)  উৎকর্ষের ওপর ভিত্তি করে ইনিংস গড়ার ওপরেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হ’ত। পলি-র মধ্যে এইসবের সঙ্গে ছিল আরও কিছু বাড়তি বৈশিষ্ট্য। স্পিনারদের দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি যেভাবে বলকে মাঠের ফাঁকা জায়গাগুলোর ওপর দিয়ে তুলে মারতেন, সেই ধরণটাই তাঁকে দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল – ‘পাম-ট্রি হিটার’ খেতাবের সেটাই ছিল ভিত্তি –  তাঁর হাঁকানো কিছু ছয়  গিয়ে পড়ত সেইসব গাছের আশেপাশে, যেগুলো তৎকালীন ভারতের অনেক ক্রিকেট মাঠকে ঘিরে থাকত।

পলি-ই সম্ভবত ছিলেন প্রথম ভারতীয় ব্যাটার, যিনি সনি রামাধিনের স্পিন-বোলিং-রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিলেন – রামাধিন-কে তিনি যেভাবে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে, এমনকি কিছুটা আগ্রাসী ভঙ্গিতেই, মোকাবিলা করতেন, তা পরবর্তী ব্যাটারদের জন্য এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল। পলি-র কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই রহস্য-স্পিনারের বোলিংয়ে দুর্বোধ্য বা ধাঁধার মতো কিছুই প্রায় ছিলনা – ক্রিজ ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত অবলীলায় ও দাপটভরে তিনি বলকে সীমানার বাইরে পাঠাতে চেষ্টা করতেন।

তবে আক্রমণের ওপর তাঁর এই জোর দেওয়ার অর্থ এমন নয় যে, ব্যাটিংয়ের মৌলিক নীতিগুলোকে পলি উপেক্ষা করতেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় কারিগরি দক্ষতা। তাঁর বলশালী শারীরিক গঠন — চওড়া কাঁধ ও পেশীবহুল বাহু, বলিষ্ঠ দেহ এবং উচ্চতা — বলের নাগাল পেতে তাঁকে সাহায্য করত, ফলত তিনি বলের ওপর জোরদার আঘাত হানতে পারতেন। মূলত শক্তিশালী ড্রাইভ-শট-খেলা ব্যাটার ছিলেন আর তাঁর কাট-শটগুলো হ’ত পরিপাটি, এবং দৃষ্টিনন্দন গ্ল্যান্স-শটগুলো ছিল ব্যাট ও কবজির অল্প-মোচড়ে-খেলা। টেস্ট-জীবনের প্রথমদিকে তাঁর স্ট্যান্স ছিল কিছুটা কুঁকড়ে-থাকা নিচু ধরনের; কিন্তু ১৯৫২-৫৩ মরশুমে তিনি সেই ভঙ্গি পাল্টে খানিকটা খাড়া-হয়ে-দাঁড়ানো শুরু করেন। ফলে তাঁর অফ-সাইডের কিছু স্ট্রোক খানিকটা সীমিত হয়ে পড়লেও তাঁর রক্ষণ আরও আঁটোসাঁটো হয়, আর এই বদল তাঁর সহজাত জোরদার অন-সাইড শটগুলোর জন্য বিশেষ কোনও অসুবিধে তৈরি করেনি। সব মিলিয়ে দেখলে শক্তি ও কার্যকারিতার বিচারে মাঠের অন-সাইড শট খেলার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে দক্ষ ভারতীয় ব্যাটার তখন আর কেউ ছিলেননা। স্পিনারদের তুলে-ভাসিয়ে-দেওয়া (tossed-up) বলগুলোর মোকাবিলা করতে ক্রিজ ছেড়ে কয়েক গজ এগিয়ে আসতে তিনি কদাচিৎ দ্বিধা করতেন – স্পিন-বোলিং যতই বিশ্বমানের হোক না কেন, তার বিপক্ষে তিনি ছিলেন সদা-প্রস্তুত।

এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, তিনি পেস-বোলিং খেলতে পারতেন না। ১৯৫২ মরশুমে ইংল্যান্ড-সফরে তাঁর হতাশাজনক ব্যর্থতার পর পেসারদের মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাঁর ধারাবাহিক উন্নতি এবং ক্যারিবিয়ান পেসারদের বিপক্ষে তাঁর চমৎকার ধারাবাহিক রেকর্ড তেমনটাই প্রমাণ করে। তবে এই ‘দুর্নাম’-এর কালো ছায়া পুরোপুরি তাঁর ওপর থেকে সরাতে তিনি পারেননি, কারণ ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া পেস-শক্তিশালী এই দু’দলের বিরুদ্ধে তাঁর সম্মিলিত টেস্ট-ব্যাটিং-পরিসংখ্যান ২৩ ম্যাচে ৩৯ ইনিংসে ৯৯৭ রান, গড় ২৬.৯৪ – সুবিধের নয়।

 

বিখ্যাত ক্রিকেট-সাংবাদিক কে এন প্রভুর মতে, উমরিগর ছিলেন দুই প্রজন্মের সংযোগসূত্র – যদিও তিনি বিজয় মার্চেন্ট ও বিজয় হাজারের ‘ঝুঁকিমুক্ত’ ব্যাটিংয়ের ধারায় দীক্ষিত হয়েছিলেন, তবুও তাঁর স্ট্রোকের বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডার, জোরালো শট খেলার ক্ষমতা – ড্রাইভ, কাট, পুল – তাঁর ব্যাটিং-শৈলীতে ত্রিশের দশকের সেই দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর আমেজের স্মৃতি জাগিয়ে তুলত। উপরন্তু, দর্শকদের কাছে তাঁর এক বড় আকর্ষণ ছিল স্পিন-বোলিংয়ে বিশাল ছয় হাঁকানোর অসাধারণ দক্ষতা।

জন আর্লট তাঁকে বর্ণনা করেছেন যে কোনও বোলিং-আক্রমণের (সুতীব্র ও উচ্চতম মানের পেস-বোলিং ছাড়া) একজন সুস্থির ও দক্ষ ঘাতক হিসেবে। তাঁর ক্রিকেট-জীবনে প্রধানত ফ্রেড ট্রুম্যান-ই তাঁকে সমস্যায় ফেলতে পেরেছিলেন।

১৯৬২ সালে টেস্ট-ক্রিকেট থেকে পলি অবসর নেওয়ার সময় এস কে গুরুনাথন বলেছিলেন: “ভারতের টেস্ট-ক্রিকেটের তিন-দশকের ইতিহাসে এমন আর কেউ নেই, যিনি পলি উমরিগর-এর মতন এত বিশাল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড, দলের সবচেয়ে অসাধারণ ফিল্ডার এবং এক বিচক্ষণ অধিনায়ক। তাঁর কীর্তিগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে“– এবার মনে করুন এই রচনার একদম শুরুর ক্যুইজটা, মিলছে তো!

পলি-র প্রতি সম্ভবত সবচেয়ে চমৎকার শ্রদ্ধাঞ্জলি এসেছিল সুবিখ্যাত ক্রীড়া-সাংবাদিক ডিকি রুত্নাগরের কাছ থেকে: “এমনকি যখন তিনি ব্যাট হাতে রান পাচ্ছিলেন না, তখনও দলে উমরিগর-এর উপস্থিতি তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে সর্বদা আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকত।

একজন মহান ক্রিকেটার, একজন দক্ষ নেতা, একজন আদর্শ ‘টিম-ম্যান’ ও সর্বোপরি এক অমায়িক মানুষ হিসেবে ভারতীয় ক্রিকেটে ‘পলি-কাকা’ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন – ওঁর জন্মশতবার্ষিকী (২৮শে মার্চ, ১৯২৬) উপলক্ষে এক ক্রিকেট-প্রেমী হিসেবে এই সামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্যের মাধ্যমে এটাই জানাতে চাই।

আজ শেষ করি “The Hindu” সংবাদপত্রে ক্রীড়া-সাংবাদিক/-সাহিত্যিক সুরেশ মেনন-এর গত ১৮ই মার্চ তারিখে প্রকাশিত একটা লেখার অংশ তুলে দিয়ে: “Umrigar was the bridge between origins and modernity, He played his first Test under independent India’s first captain, Lala Amarnath, in a team with Indian cricket’s early heroes Vijay Hazare and Vinoo Mankad. His final Test came under Tiger Pataudi, who ushered in modernism. … Today, he would have been an IPL star too!” –

২০২৬ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে ১৯তম আইপিএল শুরু হওয়ার দিনটাতে ভারতের বর্তমানকালের ক্রিকেট-প্রেমীরা কথাটা আশাকরি একবার অন্তত খেয়াল করেছিলেন —!

তথ্যসূত্র

  1. https://www.cricketcountry.com/articles/polly-umrigar-the-backbone-of-indias-batting-through-the-1950s-and-early-1960s-24559/
  2. https://www.cricketcountry.com/articles/magic-moments-of-indian-tours-to-england-part-5-of-16-abbas-ali-baig-polly-umrigar-and-indias-audacious-chase-at-manchester-153674/
  3. https://www.espncricinfo.com/cricketers/polly-umrigar-35577
  4. https://www.espncricinfo.com/story/fergie-s-flipper-and-railway-carriage-nights-139641
  5. https://www.espncricinfo.com/story/i-was-very-sure-of-my-ability-267156
  6. https://www.espncricinfo.com/story/a-gentleman-and-a-great-student-of-the-game-267141
  7. https://www.mumbaicricket.com/preparation-cricket
  8. https://timesofindia.indiatimes.com/i-learnt-a-lot-from-umrigar-gavaskar/articleshow/368382.cms
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Polly_Umrigar_Award

চিত্রসূত্র –  অন্তর্জাল 

জন্ম কলকাতায়, ১৯৫৯ সালে, কর্মজীবনের বেশির ভাগও সেখানেই অতিবাহিত। স্কুল-জীবন কাটে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চলের তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। পাড়ার ক্লাবে ও স্কুলের ক্রিকেট দলে নিয়মিত খেলবার অভ্যাসটা ছিল। কলেজ-জীবনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র – ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে স্নাতক, কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে স্নাতকোত্তর। তিন দশক তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসূত্রে দেশে-বিদেশে প্রচুর ঝাঁকিদর্শন করে, তারপর সপ্তবর্ষব্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা অন্তে ২০১৯ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই ‘ক্রিকেট-প্রেমিক’। বর্তমানে ‘নন-ফিকশন’ বইয়ের প্রতিই বেশি আকর্ষণ, যদিও সবচেয়ে প্রিয় তিন বাংলা কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবরাম চক্রবর্তী। ক্রিকেট-বিষয়ক বইয়ের একনিষ্ঠ পাঠক, সংগ্রাহকও বটে। প্রিয় ক্রিকেট-লেখকদের মধ্যে আছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু, রে রবিনসন, টনি কোজিয়ার, ডেভিড ফ্রিথ, গিডিওন হেগ, জ্যারড কিম্বার প্রমুখ। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের প্রথম বই "ক্রিকেটের খেরোর খাতা"; ২০২৪ সালে এসেছিল “ক্রিকেটের খেরোর খাতা: ফলো-অন”, ও (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “Our Cricketing Odyssey with Kapil”; ২০২৫ সালে এসেছে “ক্রিকেটের খেরোর খাতা”-র দু’খন্ডের দুই ই-বুক; এবং ২০২৬ সালে এল (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “কপিল দেব: গতিদেবতার সঙ্গে ক্রিকেটের আশ্চর্য ভ্রমণ”” ও ই-বুক “ক্রিকেটের কুড়িটা ওভার”। “অবসর” ওয়েব-ম্যাগাজিনে নিয়মিতই লিখে থাকেন। কিছুদিন যাবৎ ক্রিকেট-সম্বন্ধীয় বাংলা YouTube ভিডিও-চ্যানেল “উইলোর উইল”-এর কথকের ভূমিকাও পালন করছেন। মাঝেমধ্যে লিখছেন “উত্তরবঙ্গ সংবাদ” পত্রিকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *