উপত্যকার স্বপ্ন: জম্মু-কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠত্বের উপাখ্যান

উপত্যকার স্বপ্ন: জম্মু-কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠত্বের উপাখ্যান

সূচনা:-

ভ্রমণপিপাসু জনসাধারণের একটি অত্যন্ত পছন্দের স্থান রাজ্যটি। পাঠানকোট হয়ে জম্মুতে প্রবেশ। স্থানীয় সিম কার্ড থাকলে ভালো, নাহলে লোকাল কোনো দোকান থেকে নিতে হবে নতুন সিম কার্ড। এরপরে উধমপুর, বানিহাল পেরিয়ে হিমেল পরশ অনুভব করতে করতে গাড়ি কিছুদূর এগোলে আপনি দেখতে পাবেন ডাল লেক। একটা ভয়ঙ্কর ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে আপনি পা রাখবেন মূল শ্রীনগরে। এরপরে টুরিস্টদের পছন্দের জায়গা পাহালগাম, গুলমার্গ, শোনমার্গ।

যাঁরা কখনো জম্মু-কাশ্মীর গিয়েছেন হলফ করে বলতে পারি তারা চেনা ক্রিকেটের ছবি দেখতে পাননি কখনোই। ওই যেমন একটা বড়ো মাঠে দুটো পিচ বানিয়ে খেলা হচ্ছে। অভিজ্ঞ কোচের অধীনে শিক্ষানবিশরা তালিম নিচ্ছেন, কেউ ওয়ার্ম-আপ করছেন ইত্যাদি দৃশ্য সেখানে বিরল। রাজ্যটির ব্যাপারে আলোচনা হলে উঠে আসে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দর্শনীয় স্থান, কাশ্মীরি কেহওয়া চা, কাশ্মীরি খানা প্রভৃতি। খেলাধুলোয় তার বিশেষ স্থান নেই বললেই চলে। ক্রিকেটের কথা বললে ৬২ বছরের রাজ্যভিত্তিক ক্রিকেটের ইতিহাসে উজ্জ্বল তিনটি নাম। জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার পারভেজ রসূল, একদা স্পিডস্টার হিসেবে খ্যাতিমান উমরান মালিক এবং পাওয়ার হিটার আব্দুল সামাদ।

একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার কমেন্ট্রি বক্সে বলছিলেন তাদের খেলোয়াড় জীবনের কথা। জম্মু-কাশ্মীরের বিপক্ষে খেলা থাকলেই তারা পুলকিত হতেন। রঞ্জি ট্রফির গ্রুপ স্তরের ম্যাচ চারদিনের। তারা ধরেই নিতেন যে দুই বা আড়াই দিনে খেলা শেষ এবং তারপরে তারা গুলমার্গ, পাহালগাম ভ্রমণ করে নিজেদের একটু মানসিকভাবে চাঙ্গা করে নেবেন। এই জিনিস শুধুমাত্র নব্বই-এর দশক নয়, বরং ২০১৬-১৭ মরশুম অবধি এই ভাবধারা নিয়েই চলেছে শক্তিশালী দলগুলি। এরপরে রাজ্যস্তরের ক্রিকেটে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। যা একেবারেই হঠাৎ নয়। বরং সময়ব্যাপী, পরিকল্পনা-কেন্দ্রিক। যে উপত্যকায় ক্রিকেট ছিল এক প্রান্তিক স্বপ্ন, তার সঠিক বাস্তবায়ন আজ পরশ ডোগরার নেতৃত্বাধীন জম্মু-কাশ্মীরকে করেছে ভারতসেরা।

পর্দার পেছনের কারিগররা:

জম্মু-কাশ্মীর সম্পর্কে ধারণা বদলাতে শুরু করে ২০১২-১৩ সাল নাগাদ। সেই সময়ে আইপিএলে সদ্য সফলতা পেয়েছেন পারভেজ রসূল। ঘরোয়া ক্রিকেটে ইয়ান দেব সিং, আদিল রেশি, হারদীপ সিং রান করেন নিয়মিত। অল-রাউন্ডার হিসেবে সামিউল্লাহ বেগ রসূলকে বেশ যোগ্য সঙ্গ দেন। বল হাতে মহম্মদ মুদাসীর, রাম দয়ালরা উইকেট পান।

কিন্তু নিজেদের নাম ঘোষণা করা থেকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পাওয়ার লড়াইটা ছিল বেশ কঠিন। প্রতিকূল পরিস্থিতি, ক্রিকেটের পরিকাঠামোর অনুপস্থিতির মতো ফ্যাক্টরের বিরুদ্ধে অসম লড়াই করতে নেমেছিলেন পারভেজ রসূল। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন প্রাক্তন আন্তর্জাতিক অল-রাউন্ডার ইরফান পাঠানকে। পরে এই ব্যাটন হাতে নেন হেড কোচ অজয় শর্মা

ইরফান পাঠান নিজের ক্রিকেট কেরিয়ার শেষ করেন জম্মু-কাশ্মীর দলের হয়ে খেলে। ২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী দুই বছর তার ওপর দায়িত্ব পড়ে দলের মেন্টরশিপের। ইরফান জানতেন তার চ্যালেঞ্জ সহজ নয়। তাকে প্রথম যে জিনিসটার সম্মুখীন হতে হয় তা হলো অঞ্চল ভিত্তিক প্রভেদ। তিনি দেখেছিলেন জম্মুর ক্রিকেটাররা একটা গোষ্ঠী হিসেবে থাকেন এবং কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা আলাদা। তিনি প্রথম যে পরিবর্তন আনেন তা হলো ক্রিকেটারদের জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটার হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করা। এরপরে তিনি জম্মু-কাশ্মীর মিলিয়ে মোট ২০টি জেলায় তিনি ট্রায়াল প্রোগ্রাম চালান।

অনন্তনাগ, কুপওয়ারা, বরামুল্লা, গান্ডেরবল প্রভৃতি জেলা থেকে ক্রিকেটার আসতে থাকেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলেন বরামুল্লার আকিব নবি। এছাড়াও আব্দুল সামাদ, উমর নাজির মির প্রমুখদের উঠে আসা এই ট্রায়ালের হাত ধরেই। এরপরে ২০১৯ সালে যখন জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা জারি হয়, তখন দলকে নিয়ে বরোদায় চলে আসেন পাঠান। তিনি বুঝেছিলেন রাজ্যব্যাপী লকডাউন চলায় মরশুম শুরুর আগের প্র্যাক্টিস কঠিন। তিনি পুরো দলকে বরোদায় প্র্যাক্টিস ম্যাচ খেলাতে নিয়ে যান এবং সেখানে বরোদা রাজ্যদলের বিপক্ষে কয়েকটি বেসরকারি ম্যাচ জিতে আসে তারা যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। জম্মু-কাশ্মীরের অন্যতম সমস্যা ছিল তাদের রাজ্যে লাল মাটির উইকেট না থাকা। এর জন্য দলকে বরোদার মতি বাগ মাঠে প্র্যাক্টিস করাতেন পাঠান।

প্রধান কোচ হিসেবে যার অবদান অনস্বীকার্য তিনি অজয় শর্মা। দিল্লীর এই প্রাক্তন ক্রিকেটার নিজের কেরিয়ারে একটি টেস্ট, ৩১টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে করেছেন ১০১২০ রান। কিন্তু ঝলমলে একটা কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ২০০০ সালে আসা ম্যাচ ফিক্সিং-এর অভিযোগে। ২০১৪ সালে দিল্লী হাইকোর্ট সেই নির্বাসন তুলে নিলে কোচ হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেন অজয়। উল্লেখ্য অজয় শর্মাই হলেন সেই মুখ্য ব্যক্তিত্ব যিনি দলের মধ্যে একটা বড়ো পরিবর্তন এনেছিলেন। আগের জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটাররা মনে করতেন যে তাদের টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া একটা বড়ো ব্যাপার। দলের মধ্যে এই মানসিকতার একটা আমূল পরিবর্তন আনেন অজয়। তিনি দলের ক্রিকেটারদের প্রতিভা বা ক্ষমতাকে পারফরমেন্সে রূপান্তরের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন এবং সেই পারফরমেন্স বার করে আনেন তাদের থেকে।

এরপরে যার কথা না বললেই নয় তিনি পারভেজ রসূল। জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার ছিলেন বিজবেহেরার এই অল-রাউন্ডার। বর্তমানে তিনি দক্ষিণ কাশ্মীরে একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমি তৈরী করেছেন এবং তা সম্পূর্ণ নিজের খরচে।

পারভেজ রসূল
ইরফান পাঠান
অজয় শর্মা

ক্রিকেটাররা:

১) আকিব নবি:-

২০২৫/২৬ মরশুমের রঞ্জি ট্রফিকে আকিব নবির মরশুম বললে তা অত্যুক্তি হবে না। স্ট্যাট বলছে যে এর আগে মাত্র দুইবার রঞ্জি ট্রফিতে কোনো পেসার ৬০-এর বেশী উইকেট নিয়েছিলেন। ১৯৯৮/৯৯ সালে প্রথমবার কর্ণাটকের ডদ্দা গণেশ ৬২টি উইকেট নেন এবং ২০১৯-২০ সালে ৬৭টি উইকেট নেন সৌরাষ্ট্রর জয়দেব উনাদকট। আকিব এখানে অনন্য। কারণ তার নেওয়া ৬০টি উইকেটের ২৬টিই এসেছে তিনটি নকআউট ম্যাচে। প্রতিপক্ষ হিসেবে যদি মধ্যপ্রদেশ, বাংলা এবং কর্ণাটক থাকে তবে তা সেই পারফরমেন্সের উজ্জ্বলতা আরো বাড়ায় অবশ্যই।

মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২টি উইকেট নিয়েছিলেন আকিব। তার আগের দুটি গ্রুপ ম্যাচে সফলতা পাননি তিনি এবং কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বেশ কিছুটা চাপে অবশ্যই ছিলেন। সেই চাপ আরো বৃদ্ধি পায় যখন প্রথম ইনিংসে বোর্ডে মাত্র ১৯৪ রান তোলে জম্মু-কাশ্মীর। প্রথম দিনের শেষে মধ্যপ্রদেশ কোনো উইকেট না হারিয়ে তুলেছিল ২৮। আকিব দ্বিতীয় দিন বল করতে এসে প্রায় ১৫টি বল অফ স্টাম্পের বাইরে করেন ওপেনার হর্ষ গাওলিকে। এরপরে হঠাৎ একটা ইয়র্কার স্ট্যাম্পে চলে আসে ইনস্যুইং করে এবং তার কোনো উত্তর ছিল না গাওলির কাছে। এরপরেই আকিবের শিকার হন হিমাংশু মন্ত্রী। তার কিছু পরে আকিব পান দুটি বড়ো উইকেট যাদের নাম রজত পতিদার এবং ভেঙ্কটেশ আইয়ার। ইনিংস শেষ করেন ৭/৪০ বোলিং ফিগার নিয়ে এবং তার দল লিড পায় ৪১ রানের।

আকিবের দুইদিকে বল সুইং করানোর ক্ষমতা কতটা প্রভাবশালী তা সেমি-ফাইনাল ম্যাচে টের পান বাংলার ব্যাটাররা। প্রথম ইনিংসে বাংলার ওপেনার অভিমন্যু ঈশ্বরণ অফ-মিডল স্ট্যাম্প লাইনের একটা বল সোজা ব্যাটে খেলতে গেলে তা সামান্য আউটসুইং হয়ে নড়িয়ে দেয় তার অফ স্ট্যাম্প। দ্বিতীয় ইনিংসে সুদীপ চ্যাটার্জী একটি ইনসুইং করা বলে লেগ বিফোর হন। বাংলার অন্য একজন বাঁহাতি শাকির হাবিব গান্ধী একটা ভেতরে আসা বল বুঝতে না পেরে বোল্ড হন। বাংলার দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন আকিব।

আকিব নবি সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার পারভেজ রসূল বলেছিলেন “আকিব হাম তুমহারে কর্জেদার হ্যায়।” একটা রাজ্যের অধরা স্বপ্ন সত্যি করা কারিগর সম্পর্কে এই কথা বলা সত্যিই স্বাভাবিক। বিশেষত কোনো পূর্বতন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সম্পর্কে যিনি নিজের রাজ্য সম্পর্কে সমগ্র দেশের ধারণা পাল্টাতে দেখেছেন। হয়তো আকিব না থাকলে কোয়ার্টার ফাইনালই জেতে না জম্মু-কাশ্মীর। হয়তো বাংলার বিপক্ষে লিড খুইয়েও ম্যাচে ফিরতে পারতো না তারা। আচ্ছা যদি রঞ্জি ফাইনালে পরপর করুণ নায়ার এবং রবিচন্দ্রন স্মরণকে না ফেরাতেন আকিব? কাপ এবং ঠোঁটের দূরত্ব কি ঘুচত? বলা কঠিন।

২) পরস ডোগরা:

জম্মু-কাশ্মীরের এই দলে যার উপস্থিতি একান্তই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি হলেন পরস ডোগরা। ঘরোয়া ক্রিকেটে ডোগরা একজন পরিচিত নাম। তার প্রথম শ্রেণীর কেরিয়ার সিলভার জুবিলিতে পা দিয়েছে এই বছর। প্রথমে হিমাচল প্রদেশ, পরবর্তীতে পন্ডিচেরি এবং তারপর জম্মু-কাশ্মীর- তিনটি দলে নিজের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছেন পরস। চলতি বছর রঞ্জি ট্রফিতে দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ১০০০০ রান করেছেন পরস।

কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে এতো রান, ধারাবাহিকতার পরেও ভারতীয় দলের দরজা খোলেনি। ভারত এ দলের হয়েও পেয়েছেন খুব কম ম্যাচ। আইপিএলে সবমিলিয়ে তার ম্যাচ সংখ্যা ১৩। যে কয়জন ক্রিকেটার একটা সময়ে আর উচ্চতার শিখরে না ওঠার চেষ্টা করে একটা সময়ে নিজের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটা ট্রফি জেতার স্বপ্নে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তাদের একজন পরস। একজন অভিজ্ঞ এবং সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে তার কাজ ছিল দলকে এগিয়ে নিয়ে চলা। পরস শুধু আব্দুল সামাদ, শুভম পুন্ডির, আওয়ার হাসানদের অভিজ্ঞ দাদাই হয়ে ওঠেননি, বরং সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন। দিল্লী দলকে অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে প্রথমবার হারায় জম্মু-কাশ্মীর। নেপথ্যে ছিল পরস ডোগরার একটি অনবদ্য শতরান।

৩) আব্দুল সামাদ:-

২০২০ সালে যখন আব্দুল সামাদ প্রথম আইপিএলের স্পটলাইট পান, তখন তার সুনাম হয়েছিল একজন ছক্কা মারার স্পেশালিস্ট হিসেবে। তার আগের বছর রঞ্জিতে মোট ৩৭টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। কিন্তু এই জিনিসটি কোথাও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রধান কোচ অজয় শর্মার। কারণ সামাদ প্রধানত টিটোয়েন্টি স্টাইলে নিজের ব্যাটিং তৈরী করায় বড়ো ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
অজয় তাকে দল থেকে একবার বাদ দেন। পরবর্তীতে তাকে বোঝান যে রঞ্জি ট্রফিতে রান না করলে কোনোভাবেই ভারতীয় ক্রিকেটে তারকা হয়ে ওঠা যাবে না। এর ফলে সামাদের মধ্যে যে পরিবর্তন আসে তা হলো তিনি নিজের উইকেটের দাম বোঝেন। চলতি বছরের রঞ্জি ট্রফির রান সংখ্যার লিডারবোর্ড দেখলেই তার সেই পরিপক্কতার প্রতিফলন দেখা যায়। ৭৪৮ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছেন তিনি।  বাংলার বিরুদ্ধে তার ৮২ রানের ইনিংসটা তার খেলার ধরণের একটি বড়ো সুবিধা দেয় জম্মু-কাশ্মীরকে। ৩২৮ রানের জবাবে যখন ১৩/৩ হয়ে দল ধুঁকছে, তখনই স্ট্রোক খেলে ৮২ রান করে চাপ হাল্কা করেন সামাদ।

৪) কামরান ইকবাল:-

কামরান ইকবালের অবদান জম্মু-কাশ্মীরের ট্রফি জয়ের ক্ষেত্রে খুবই ছোট হলেও তার যাত্রা এবং দলের সাথে যোগ দেওয়া একান্তই একটি গল্প।

রঞ্জি ট্রফি ফাইনালের আগের পর্যন্ত দলের ওপেনার ছিলেন অভিজ্ঞ শুভম খাজুড়িয়া এবং ইয়াওয়ার হাসান। দুজনে রান না পেলেও ম্যানেজমেন্ট টিম কম্বিনেশন ভাঙতে উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু বিপত্তি ঘটে ম্যাচের আগের দিন শুভম চোট পেয়ে ফাইনাল থেকে ছিটকে যাওয়ায়। ওদিকে কামরান তখন জম্মু-কাশ্মীরের এক ক্রিকেট কর্তার সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে ডিসিপ্লিন জনিত কারণে দলের বাইরে। তিনি ফিরে গিয়েছিলেন তার শ্রীনগরের বাড়িতে।

ফাইনালের আগেরদিন ফোন যায় তার কাছে। প্রথম এগারোয় থাকা নিশ্চিত, কিন্তু তার জন্য যেতে হবে শ্রীনগর থেকে হুব্বালি। যাত্রা করতে হবে ২৭০০ কিলোমিটার। সময় বারো ঘন্টার কিছু কম। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটি ফ্লাইট ধরে কামরান পৌঁছন মুম্বাই। সেখানে চার ঘন্টার লে ওভারের পর একটি ফ্লাইট ধরে হুব্বালি এবং তারপরে গাড়িতে চেপে টসের ঠিক কুড়ি মিনিট আগে যুক্ত হন দলের সাথে।

প্রথম ইনিংসে তার জেট ল্যাগ বোঝা গেলেও পরবর্তী ইনিংসে একটা দুর্দান্ত কামব্যাক করেন কামরান। দ্বিতীয় ইনিংসে শুরুতে দুটি উইকেট পেয়ে যখন প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ-বিদ্যাধর পাটিলরা রক্তের স্বাদ পেয়ে গিয়েছেন, তখনই তাদের সামনে প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দেন কামরান। তার ব্যাট থেকে আসে একটি ঝকঝকে অপরাজিত ১৬০, যা কর্ণাটককে আর ম্যাচে ফিরতে দেয়নি।

 

৫) আবিদ মুস্তাক:-

জম্মু-কাশ্মীরের ডোদাতে জন্মগ্রহণ করা এই বাঁহাতি অর্থোডক্স বোলার এবং বাঁহাতি অল-রাউন্ডার চলতি রঞ্জি ট্রফিতে ব্যাট হাতে একটি শতরান এবং একটি অর্ধশতরান সহ করেছেন ৪৪৫ রান। বল হাতে ২৬.১৯ গড়ে তার উইকেট সংখ্যা ২৩। একজন অল-রাউন্ডার হিসেবে এই পারফরমেন্স খুবই ঈর্ষণীয় না হলেও বেশ ভালোই বলা যায়।
কিন্তু এসবের বাইরেও মুস্তাকের কাছে এই মরশুমটা যেন শাপমোচনের। গত বছরের রঞ্জি ট্রফি কোয়ার্টার ফাইনালে কেরলের বিরুদ্ধে মাত্র এক রানের জন্য প্রথম ইনিংস লিড খুইয়ে পরাজিত হয় জম্মু-কাশ্মীর। কেরলের ব্যাটার সলমন নিজারের ক্যাচ হাতছাড়া করেন মুস্তাক এবং শেষ উইকেটে ৬০ রান তুলে নির্ধারিত লিড তুলে নেয় কেরল। তবে এবার মুস্তাক দলের জয়ে সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। হিমাচল প্রদেশের বিরুদ্ধে নিজের কেরিয়ারের শ্রেষ্ঠ ১৭৭ রান করার পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেওয়াও তার অবদানের একটি নমুনা।

৬)সুনীল রাম কুমার:-

আকিব নবির নতুন বলে বল করার সঙ্গী এই বাঁহাতি পেসার আদতে এখনুরের কাঠার গ্রামের বাসিন্দা। প্রথমে কস্কো বলে খেলা শুরু করে পরবর্তীতে ক্রিকেট বলে খেলা শুরু করেন তিনি। বলে স্বাভাবিক সুইং থাকায় তিনি জাহির খান, ইরফান পাঠানকে দেখে শেখা শুরু করেন। তার জীবনে আসল পরিবর্তন আসে ইরফান জম্মু-কাশ্মীরের মেন্টর হয়ে আসায়। তিনি যে জেলাভিত্তিক ট্রায়াল শুরু করেন, তার থেকে উঠে আসেন সুনীল।

জম্মুতে খেলার মাঠ বলতে শুধু গান্ধী মেমোরিয়াল সায়েন্স কলেজ গ্রাউন্ড। সেখানেই জম্মুর ক্রিকেটারদের ক্যাম্প চলতো। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া সেই ট্রায়ালে যোগ দিতে সকাল ৮টা ১৫-এ বেরিয়ে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার স্কুটি চালিয়ে মাঠে পৌঁছতেন সুনীল। এরপরে ২০২১ সালে সিনিয়র রাজ্যস্তরের খেলায় অভিষেক।
২০২৫/২৬ মরশুমে আকিব নবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন বলে উইকেট নিয়েছেন সুনীল। নবির বোলিং রেকর্ডের পাশে তার নেওয়া ৩১টি উইকেট ফিকে লাগলেও কিছু উইকেট ছাড়া জম্মু-কাশ্মীরের জয় হয়তো সহজে আসতো না। যেমন সেমিফাইনালের দ্বিতীয় ইনিংসে সুদীপ ঘরামির উইকেট।

উপসংহার:-

পারভেজ রসূল যখন জম্মু-কাশ্মীর থেকে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেন, তখন শতাধিক ক্রিকেটার তার থেকে অনুপ্রাণিত হন। রসূল যখন প্রশিক্ষক হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেন, তখন তিনি জানতে পারেন যে অনেক ছোটো ছেলে তার যাত্রাতে অনুপ্রাণিত হয় ক্রিকেট শেখা শুরু করে। তখনও দলগত সাফল্য আসেনি। রসূল শুধু ভারতীয় দলে খেলেছেন এবং তারপরে উমরান মালিক। আব্দুল সামাদ আইপিএলের আলোকে আলোকিত হয়েছেন।

এরকম কিছু ব্যক্তিগত সাফল্য থাকলেও দলগত সাফল্যের অভাব ছিল। এই দলগত সাফল্য এনে দিয়েছেন আকিব নবি, পরস ডোগরা, আব্দুল সামাদরা। নেপথ্যে ছিলেন প্রধান কোচ অজয় শর্মা, বোলিং কোচ পি. কৃষ্ণকুমাররা। জয়ের পর আব্দুল সামাদ বলছিলেন যে এই জয় বদলে দেবে জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটকে। যে রাজ্যের ক্রিকেটে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই, পরিস্থিতির প্রতিকূলতা রয়েছে, ভালো প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই, তাদের কাছে এই চ্যাম্পিয়নশিপ জয় সত্যিই ইতিহাস। এই সাফল্য উদ্বুদ্ধ করবে শতাধিক ক্রিকেটারকে। তারা বিজয়ী ক্রিকেটারদের দেখবে কোনো লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্র হিসেবে। তাদের মধ্যেও দানা বাঁধবে স্বপ্ন। রঞ্জি ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন। বড়ো দাদাদের পাশে নিজেদের নামও স্বর্ণাক্ষরে লেখার ইচ্ছে হবে তাদের।

কিছু জয় সত্যিই ঐতিহাসিক হয়। তা বদলে দেয় একটা গোটা রাজ্যকে। দেখতে শেখায় স্বপ্ন।

স্নাতকোত্তরের পাঠ নেওয়ার সময় টেক্সট কমেন্ট্রির মাধ্যমে ক্রিকেটের সঙ্গে পেশাদারভাবে যুক্ত হওয়ার শুরু, যা আজ চার বছরের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ক্রিকেটকে বিশ্লেষণ, মনস্তত্ত্ব, ডেটা এবং পরিসংখ্যানের মিশেলে দেখার ইচ্ছে।একজন ক্রিকেটারের শক্তি ও দুর্বলতা অনুধাবন করে তার পরিকল্পনা বোঝা এবং সেই প্রেক্ষাপটকে লেখায় তুলে ধরাই মূল আগ্রহ। ভবিষ্যতে ক্রিকেট কনটেন্ট ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরও গভীর ও প্রভাবশালী কাজ করার লক্ষ্য।

1 Comment

Avarage Rating:
  • 0 / 10
  • Kalarab Ray , April 15, 2026 @ 5:00 pm

    প্রয়োজনীয় লেখা – বিশেষত যাঁরা ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে জানতে উৎসাহী, তাঁদের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *