শিল্পী ভিন্‌সেন্টের জীবনে বরিনেজের ভূমিকা – দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

শিল্পী ভিন্‌সেন্টের জীবনে বরিনেজের ভূমিকা - দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব


সে বছরের মতো সাংঘাতিক শীত আর কখনো পড়েনি। ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ বাতাস অস্থিমজ্জা যেন জমিয়ে দেয়। কয়লা তোলাই যাদের কাজ তাদের ঘরে একটুকরোও কয়লা নেই, নেই একফোঁটা গরম জল বা একটুকরো গরম খাবার। প্রায়ই কেউ না কেউ যক্ষ্মায় বা নিউমোনিয়ায় মরছে, কাজ বাড়ে ভিন্‌সেন্টের, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজ।
সারাদিন ভিন্‌সেন্ট এখন কয়লা কুড়িয়ে বেড়ান, যেটুকু কয়লা পান বিলিয়ে দেন তিনি এ বাড়ি ও বাড়ি। মুখ, হাত সারা শরীর কয়লায় মাখামাখি তাঁর। অপরিচিতের চোখে খনিশ্রমিকের থেকে তাঁকে আলাদা করা যায় না।
এক সন্ধেতে পিঠের কয়লাগুলো সব বিলিয়ে দিয়ে ভিন্‌সেন্ট ঘরে ফিরলেন। নিজের সব জামাকাপড়গুলো একটা সুটকেসে ভরে বেরিয়ে এলেন পথে।
এক বৃদ্ধ শ্রমিককে তাঁর সুটটা দিয়ে দিলেন। শার্টগুলোকে বিলিয়ে দিলেন শিশুদের মধ্যে—সেগুলো কেটে কেটে বাচ্চাদের জামা করা চলবে। কয়েকজন যক্ষারোগীর হাতে তুলে দিলেন মোজাগুলো। মনে পড়ল সেই অন্তঃসত্ত্বা নারীটির কথা, যার স্বামী ক’দিন আগেই খনিতে ধ্বস চাপা পড়ে মরেছে। গা থেকে কোটটা খুলে তাঁকে দিলেন।
এই মর্মান্তিক ঠাণ্ডায় উপাসনা-গৃহ বন্ধ। তিনি নিজেই এখন এখন দিনশেষে ঘরে ঘরে যান—ধর্মের কথা যিশুর কথা শোনান। একটা নতুন কাজেও জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। কোথাও তিনি রোগীর সেবা করেন, কারো ওষুধের ব্যবস্থা করে দেন, কারো পথ্য রান্না করেন। বাইবেলটা আনার কথা মনে থাকে না। ঈশ্বরের গুণগান এখন বিলাসিতা।
এভাবে চলতে চলতে ভিন্‌সেন্টের শরীর একেবারে ভেঙে পড়ল। মাথা টলে রীতিমতো, আধপেটা খাওয়া, নির্ঘুম রাত, কয়লা তোলার অমানুষিক খাটুনি—তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। ঘরের কোণে খড় বিছিয়ে একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। শীতে বেঁকে গেল তাঁর শরীর, রাতে একফোঁটা ঘুম হল না। সকালে যখন উঠলেন তখন বুকে ব্যথা আর কাশি, লাল চোখদুটি কোটরের আরও গভীরে ঢুকে গেছে। ক’দিন ধরেই জ্বর আসছে, জ্বর আরও বেড়েছে, কয়লা তিনি যা কুড়োন সব বিলিয়ে দেন শ্রমিকদের ঘরে ঘরে, নিজের জন্য একটুকরোও আনেন না। কোনরকমে খানিকটা রুটি চিবিয়ে তিনি কাজে বেরিয়ে গেলেন।

বরিনেজে ভ্যান গখের প্রথম বাড়ি
পরের দিকে তিনি এই বাড়িতে চলে যান


বিদায় নিল মার্চ মাস, অবস্থার একটু উন্নতি হলো। রোদের তাপ বাড়ল, গলতে শুরু পড়ল বরফ। ঘরে ঘরে জ্বরের প্রকোপ কমল, মেয়েরা আবার জমায়েত হতে লাগল মার্কাস খনির কিনারে কিনারে। উনুনে উনুনে গনগনে আগুন, শিশুদের কলকাকলি, জীবনের স্পন্দন আবার ফিরে এসেছে।
ভিন্‌সেন্ট আবার উপাসনা-গৃহের দরজা খুললেন। বেদিতে দাঁড়িয়ে প্রাণখোলা গলায় ঘোষণা করলেন—আবার সুদিন এসেছে। এতদিন ঈশ্বর আমাদের পরীক্ষা করছিলেন, সে দুঃখের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি আমরা। আবার মাঠে-ঘাটে শস্য পাকবে, কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, বরফ গলেছে, প্রকৃতির উষ্ণ পরশে আমরা আমোদিত হবো।
এস ভাই মাথা উঁচু কর, চোখ তুলে তাকাও, ঈশ্বরের দিকে, তাঁর আশীর্বাদ তোমাদের জন্যেও আছে। তাঁরই প্রসাদে দু:খরাত কেটে গিয়ে নবপ্রভাত আসে। তাঁকে নমস্কার কর, তাঁকে ধন্যবাদ জানাও।
কয়েকদিন পরের কথা। হঠাৎ একটা কিসের যেন গোলমাল নজরে এল তাঁর। কী হয়েছে ওখানে? গোলমাল কীসের? এখনো তো তিনটে বাজেনি, ছুটির আগেই ওরা খনি থেকে উঠে আসছে কেন?
একটা ছেলে বলল—নিশ্চয়ই কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। খাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু ভেঙেছে।
গেটের কাছে ভিন্‌সেন্ট শুনল চিৎকার। সর্বনাশ। সর্বনাশ হয়েছে ঐ খাদটায়। সব গেছে। সবাই আটকা পড়েছে ঐ খাদে।
ছটা খাটাল। প্রত্যেকটায় অন্তত পাঁচজন করে। গেটের সামনে একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। এই গাড়িটা কতবার এখান থেকে মৃত মানুষদের বহন করে নিয়ে গেছে শ্রমিকদের ঘরে ঘরে! গাড়িটা ঘিরে দাঁড়িয়েছে ওরা। হতাশ বিষণ্ণ চোখে ওদের শূন্য দৃষ্টি। কোন মেয়ে হঠাৎ ককিয়ে উঠছে বুকচাপা আর্তনাদে। শিশুরা ফুঁপিয়ে কাঁদছে মায়ের পোশাক ধরে।
হঠাৎ গোলমাল থামল। কম্বলে মুড়ে মৃতদেহগুলি বের করে আনা হচ্ছে।
সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেখানে।
–কে গো ওরা? বেঁচে আছে? বল না গো। দেখাও, ওদের মুখ দেখাও। আমার স্বামী নয় তো? ওগো আমার দুটি বাচ্চা যে ছিল ঐ খাটালেই!
দেখাও, দেখাও ওদের মুখ। আমার ছেলে না কি? আমার মেয়ে? সে কোথায়? দেখছি না তো তাকে? সে তো গাড়ী ঠেলত খাটালে।
দুটি কিশোরীর দুটি মুখ। কালি মাখা ঝলসে-যাওয়া দুটি শরীর। তাদের বাবা মা হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আছড়ে পড়ল তাদের ওপর। গাড়িটা চলতে শুরু করল। পেছন পেছন ছুটছে ওদের বাবা মা। ছুটছিল ভিন্‌সেন্টও। পেছনদিকে তাকিয়ে ভিন্‌সেন্ট দেখল জ্বলন্ত আকাশ আর দমকে দমকে কালো বিষাক্ত ধোঁয়ার বিষাক্ত অভিশাপ। এতদিনের পুঞ্জীভূত বেদনা আজ প্রকাশের পথ পেয়েছে।
চারিদিকে মৃত্যু, হাহাকার আর আর্তনাদ। এতক্ষণে একজনও আর বেঁচে নেই। পৌঁছতেই পারবে না ওদের কাছে। জীবন্ত কবর হয়েছে ওদের। সব তো পাথরচাপা…
–কতজনের প্রাণ গেল?
–ওখানে তো সাতান্নজন ছিল। সবাই গেছে।
–সাতান্নজন!
–হ্যাঁ। সাতান্নজনই মারা গেছে।
শ্রমিকরা ধর্মঘট করল। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মৃতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দিন যায়। সপ্তাহ যায়। পেট যে আর চলে না। কতদিন আর না খেয়ে থাকা যায়। মাথা নিচু করে এক এক করে ওরা আবার গেল ঐ জীবন-মৃত্যুর করাল ছায়ায়। কোন উপায় নেই। কোন পথ নেই।
এতদিন ধরে ভিন্‌সেন্ট যা করতে চেয়েছে সব অর্থহীন বলে প্রমাণ হয়েছে। হৃদয় নিংড়ে নিংড়ে তিনি যত প্রার্থনা করেছেন বোবা আকাশে তা মিলিয়ে গেছে, বধির ভগবানের কানে তা পৌঁছায়নি। আর কোন সুখে তিনি এই বঞ্চিত সর্বহারাদের জন্য প্রার্থনা করবেন?
ব্যর্থতার এই চরম মুহূর্তে ভিন্‌সেন্ট হঠাৎ উপলব্ধি করলেন চরম সত্য—যা প্রকাশ না করলেও অনেকদিন ধরেই তার মনে ভেসে উঠছিল। ভগবান ও তাঁর আশীর্বাদ, তাঁর প্রতি বিশ্বাস, আত্মনিবেদন—সব মিথ্যা—শুধু স্তোকবাক্য, হতাশার কালো রাত্রির পথে মানুষের সুলভ আত্মপ্রবঞ্চনা। আর কিছুই নয়, কেননা ভগবান নেই। সাহায্যের জন্য ভিন্‌সেন্ট আবেদন পাঠালেন প্রচার সমিতিতে, কোন উত্তর এল না।
ওরা ভিন্‌সেন্টকে বলল—এই সাতান্নজন যে মারা গেল—ওদের আত্মার শান্তির জন্য একদিন প্রার্থনা করুন। নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পরে ভিন্‌সেন্টের ঘরে শ’খানেক লোকের জমায়েত হলো। দুর্ঘটনার পরে গত ক’দিন ধরে কয়েক চুমুক কফি ছাড়া শক্ত খাবার তিনি খাননি প্রায়। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর, চোখে অন্ধকার দেখছেন। কোটরে ঢোকা আগুনে চোখ, তোবড়ানো গাল, নোংরা মুখে খোঁচা-খোঁচা লাল দাড়ি। পোশাক নেই, গায়ে তাঁর চট জড়ানো। মেঝের ওপর খড়ের গাদার বিছানা।
তাঁর চারদিক ঘিরে একশোটি নিরন্ন, বুভুক্ষু প্রেতমূর্তি। বস্তা-ঝোলানো ফাটা তক্তার দেয়ালে ভুষি-মাখানো লন্ঠনের ছায়ায় কতগুলি কালো প্রেতচ্ছায়া।
কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে কোনরকমে মাথা উঁচু করে ভিন্‌সেন্ট অন্ত্যেষ্টি-প্রার্থনা শুরু করলেন। শুকনো, ভাঙা গলা। হতাশ ক্লান্ত চোখ মেলে শ্রমিকরা তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল—তাদের দৃষ্টি ঈশ্বরের খোঁজে, কোথায়, কোথায় ঈশ্বর?
হঠাৎ বাইরে বিরক্তিভরা চড়া মেজাজের গলা। দরজাটা খুলে একজন বলল,–এই যে, আপনারা আসুন, মশিয়েঁ ভিন্‌সেন্ট এখানে।
চুপ করলেন ভিন্‌সেন্ট। ভেতরে ঢুকলেন দুজন সুবেশধারী ভদ্রলোক। তাঁদের চোখেমুখে আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি। চেষ্টা করেও ভিন্‌সেন্ট উঠতে পারলেন না। ঐখানে বসে বসেই বললেন—আসুন, আসুন, রেভারেন্ড ডি জঙ, আসুন রেভারেন্ড ভ্যান ডেন ব্রিংক। মার্কাস খনিতে সাতান্নজন লোক মরেছে, তাদের নামে আজকের এই প্রার্থনা-সভা। সকলে বড় শোকার্ত। আপনারা এদের কাছে দুটো সান্ত্বনার কথা বলুন।
কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকানোর পরে ধর্মযাজকরা মুখ খুললেন। সযত্নে পালিত ভুঁড়িটার ওপর হাত চাপড়ে চিৎকার করে উঠলেন ডি জঙ।–-কী জঘন্য, কী বীভৎস।
খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলেন ভ্যান ডেন ব্রিঙ্ক।–-আফ্রিকার জঙ্গলে এসে গেলাম নাকি?
–ধর্মের নামে কী সর্বনাশটা করেছে দেখেছেন উন্মাদটা?
–যিশুর পথে ওদের ফিরিয়ে আনতে কত বছর যে লাগবে কা জানে!
দু-হাত ভাঁজ করে ভুঁড়ির ওপর চেপে ধরে ডি জঙ বললেন—আমি তখনই বলেছিলাম এ লোকটাকে চাকরি দেবেন না। পাগল, চিরকালের পাগল! প্রথম থেকেই আমি ধরতে পেরেছিলাম।
ধর্মযাজকরা বিশুদ্ধ ফরাসী ভাষায় কথা বলছিলেন, শ্রমিকরা এক বর্ণও বুঝতে পারছিল না। ভিন্‌সেন্ট বুঝলেও তাঁর অসুস্থ মস্তিষ্ক ঠিকমতো যেন ধরতে পারছিল না এঁদের কথাবার্তার মানে।
ডি জঙ ভিড় ঠেলে ভিন্‌সেন্টের কাছে এসে রুদ্ধ হিংস্র গলায় তাঁকে বললেন—এই নোংরা কুকুরগুলোকে হঠাও এখান থেকে।
–কিন্তু প্রার্থনা যে এখনো শেষ হয়নি!
–চুলোয় যাক তোমার প্রার্থনা। তাড়াও এদের।
শ্রমিকরা আস্তে আস্তে চলে গেল। দুজন ধর্মযাজক ভিন্‌সেন্টের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন।
এই গর্তের মধ্যে বসে কী করছ তুমি এসব? এর নাম প্রার্থনা-সভা! তুমি না একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক? এই তোমার রুচি? এই তোমার ব্যবহার? লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমাদের। এখানে বসে বসে ধর্মকে রসাতলে পাঠাচ্ছ তুমি।
ছেঁড়া চটের পোশাক পরে খড়ের গাদায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন ভিন্‌সেন্ট। তাঁর রক্তমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মযাজকরা তাঁদের শেষকথা শুনিয়ে দিলেন। তোমার চাকরি এই মুহূর্তে খতম হলো। তোমার বদলে নতুন লোক এখানে আসছে। তুমি পাগল কি না জানি না, তবে খ্রিস্টধর্মের চরম শত্রু।
স্তব্ধতায় ঢেকে গেল চারপাশ। আবার প্রশ্ন হলো—তোমার স্বপক্ষে কিছু বলতে চাও তুমি?
একটি শব্দও যোগাল না ভিন্‌সেন্টের মুখে।
ভ্যান ডেন ব্রিংক বললেন—লোকটার আর কোন আশা নেই। সময় থাকতে চলুন এখান থেকে। এই পোড়া জায়গায় একটা ভদ্রগোছের হোটেলও নেই রাত কাটানোর মতো।

Evening, after Jean-François Millet, 1889.


শ্রমিকদের একটা দাবিও মেটেনি। মাথা নিচু করে তারা কাজে ফিরে গেছে। ভিন্‌সেন্টের কাজ ফুরলো। অর্থ নেই, কর্ম নেই, নেই আদর্শ, উদ্দীপনা। যতদূরে তাকাও শুধু শূন্যতা।
শ্রমিকদের সঙ্গে আর তিনি কথা বলেন না, তারাও এড়িয়ে চলে তাঁকে। মনে মনে তারা বুঝেছে যে তাঁর কাজ শেষ হয়েছে।
দিন কাটে। ভিন্‌সেন্ট শুধু খায়, ঘুমোয়, আচ্ছন্নের মতো ঘুরে বেড়ায় একা-একা। একটু করে শরীরটা সারে, গায়ে জোর আসে। হাতের টাকা ফুরিয়ে এল। ছোট ভাই থিয়ো সাহায্য করলেন। চিঠিতে লিখলেন—বরিনেজে বসে বসে জীবনটাকে নষ্ট না করে এই টাকায় তিনি যেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন।
কেন সে পড়ে আছে বরিনেজে? আর কোথাও যাবার নেই বলে। ঈশ্বরকে তিনি হারিয়েছেন, হারিয়েছেন নিজেকেও।
আরো কয়েক সপ্তা কাটল। আস্তে আস্তে ভিন্‌সেন্ট ফিরে যাচ্ছেন তাঁর পুরনো নেশায়, বই পড়ার নেশা। তারই মতো শত শত সাধারণ লোক, জীবন-যুদ্ধে যারা কিছুটা জিতেছে, হেরেছে অনেকটাই—তাদের কথাই তিনি পড়েন। পড়তে পড়তেই তাঁর নিজের সম্বন্ধেও তাঁর ধারণাটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যর্থতার, হতাশার এই অন্ধকারটা কাটতে থাকে। মনে প্রশ্ন আসে—এবার আমি কী করব? কী নিয়ে জীবন কাটাব?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। উত্তর নেই। ভাবনার পর ভাবনা। নিরসন নেই। মাসগুলো কেটে যায় উদ্দেশ্যহীনতায়।
নভেম্বর মাসে এক সকালে ভিন্‌সেন্ট বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলোমেলোভাবে হাঁটতে হাঁটতে মার্কাস খনির দেয়ালের ধারে মরচে-ধরা বাতিল একটা লোহার চাকার ওপর বসলেন। শূন্য মন। শূন্য হাত। গেট থেকে বেরিয়ে এলেন বুড়ো এক শ্রমিক। হেঁট মাথাটার ওপর চোখ-ঢাকা টুপি, দু-হাত গোঁজা ছেঁড়া পকেটে, জরা আর দারিদ্র্যে ঝুঁকে পড়া দুটি কাঁধ। অবসন্ন পায়ে স্খলিত গতি। ভিন্‌সেন্টের মনে হলো কী একটা দুর্বার আকর্ষণে মানুষটি তাঁকে টানছেন। খেয়ালেই পকেট থেকে তিনি বার করলেন ছোট একটা পেন্সিল আর একটা খাম। খামের সাদা কাগজের ওপর পেন্সিলের শিস বুলিয়ে তাড়াতাড়ি তিনি এঁকে ফেললেন শূন্য মাঠের ওপর দিয়ে অপসৃয়মান লোকটির ছবি।
খামের ভেতর ছিল বাবার চিঠি। আর একটি লোক বেরিয়ে এল খনি থেকে। এ লোকটি তরুণ। কিছুক্ষণ সে দাঁড়াল কারখানার গেটে। ভিন্‌সেন্ট তাকেও আঁকলেন—তার তরুণ বলিষ্ঠ দেহের ভিন্ন ভঙ্গিমাটুকুকে বাবার চিঠির খালি উল্টো পিঠে এঁকে নেবার সুযোগটুকু তিনি হারাতে চাইলেন না।


ডেনিসদের বাড়িতে ফিরেই ভিন্‌সেন্ট যোগাড় করলেন কয়েকটা সাদা কাগজ আর মোটা পেন্সিল। দুটো স্কেচ দেখে তার অনুসরণে তিনি আঁকতে শুরু করলেন। আড়ষ্ট হাতে মাথায় যে রেখাটি আসে তা অবাধ্য অপটু আঙুলে কাগজের বুকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। বারবার আঁকেন আর মোছেন।
দেয়ালে পিন ফুটিয়ে স্কেচগুলোকে এঁটে দূর থেকে তাদের দেখতে লাগলেন। মনে কেমন যেন একটা উৎসাহ, চোখে দীপ্তি। মনে মনে বললেন—কিচ্ছু হয়নি, জঘন্য। যাচ্ছেতাই। আচ্ছে দেখা যাক, কাল হয়ত আর একটু ভালো হবে ছবিদুটো।
দেয়ালে আরও অনেকগুলো ছবির প্রিন্ট টাঙানো—গির্জা থেকে এনে তিনি টাঙিয়েছিলেন—কিন্তু চোখ মেলে তাকাননি তিনি এগুলোর দিকে। কতদিন পরে আবার তার ছবির দিকে চোখ পড়েছে। ছবি! এতদিন তিনি ছবি ভুলে ছিলেন কী করে? আজ রেখা আর রঙের জন্যে তাঁর মন কেমন করছে। রেমব্রাঁ, মিলেট, দেলাক্রোয়া, মারিস—এঁদের জীবনের নাড়িনক্ষত্র তিনি জানতেন। ছবি দেখার দারুণ নেশা ছিল তাঁর, সে ছবি বুঝতে চেষ্টা করার, তার প্রিন্ট সংগ্রহ করার! আবার কী তিনি রেখা পাগল হবেন না, হবেন না রঙ মাতাল?
পরদিন শেষ রাতের অন্ধকারে উঠে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বসে পড়লেন মার্কাস খনির গেটের ধারের সেই ভাঙা চাকাটার ওপর। সঙ্গে পেনসিল আর কয়েকটা কাগজ। আধো-অন্ধকারে শ্রমিকরা ঢুকতে লাগল কয়লা-খনির মধ্যে। ত্বরিত-হাতে ভিন্‌সেন্ট কাগজের ওপর পেন্সিলের রেখা চালাতে লাগলেন। শেষ শ্রমিকটি যখন চলে গেল তখন ভিন্‌সেন্টের হাতে পাঁচটা মনুষ্য মূর্তির আভাস। মুখ নেই তাদের—তারা শুধু বরিনেজের শ্রমিক-জীবনের ছায়া-নিদর্শন। এই ছবি তো তার আয়ত্তের মধ্যেই। এই পঞ্চমূর্তি, এদের তো তিনি চেনেন, এদের ভাবভঙ্গি, চিন্তা ভাবনা, আশানিরাশা—সব কিছুর সঙ্গে তিনি পরিচিত। তবু রেখায় কেন ধরা দেয় না তার কাছে? কতদিন আর অধরা থাকবে ওরা?
অ্যানাটমি সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই ভিন্‌সেন্টের। সামঞ্জস্যহীন কিম্ভুত অবয়বগুলির দিকে তাকালে তাচ্ছিল্যই আসে, কিন্তু এটুকু তিনি বোঝেন যে তিনি শুধু মানুষ আঁকছেন না—আঁকছেন বরিনেজের কয়লা-কুলিদের। আঁকেন আবার মুছে ফেলেন, আবার আঁকেন।
সারা সকালটা এইভাবে কাটল। কাগজ ফুরিয়ে গেল। দুটি ফ্র্যাঙ্ক মাত্র সম্বল। পথে বার হলেন ভিন্‌সেন্ট। মন্‌সে অন্তত কিছু ভালো কাগজ আর শুকনো ভুসি কালি পাওয়া যাবে। অন্তত দশ মাইলের পথ। গাড়িতে যেতে গেলে আর কাগজ কেনা হবে না, তাই হেঁটেই যেতে হবে। তাতে কী? মন্‌সের উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগালেন তিনি ।
মন্‌সে এক ছবিওয়ালার কাছ থেকে তিনি একটা হলদে কাগজের মোটা প্যাড, মোটা একটা পেন্সিল আর কিছুটা ভুসি কালি কিনলেন। দশ মাইল ফিরতি পথ। নিজের গ্রামে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা গেল। কালো-কালো টিলার ওপরে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। শরীর জুড়ে ক্লান্তি কিন্তু কীসের এক এক আনন্দ জেগেছে তাঁর মনে। কীসের আনন্দ তা তিনি জানেন না।
পরদিন সকালে উঠেই তিনি তিনি কাগজ-পেন্সিল হাতে গেলেন খনির কয়লা-পাহাড়ের ধারে। কোমর ঝুঁকিয়ে ঘাড় কুঁজো করে মেয়েরা কয়লা-কুচি কুড়োচ্ছে,–সারাদিন ধরে ভিন্‌সেন্ট তাদের আঁকলেন।
তিনি আবার শ্রমিকদের ঘরে ঘরে যেতে শুরু করলেন। এবার আর বাইবেল হাতে নয়, কাগজ-ক্রেয়ন হাতে। ঘরের মেঝেতে বাচ্চারা খেলা করে, মেয়ে, বৌরা ঘরকন্নার কাজ করে, দিনশেষে সারা পরিবার রান্নাঘরে খেতে বসে—ভিন্‌সেন্ট তাদের ছবি আঁকেন। কালো চিমনি, কালো মাঠ, দূরের খেতে লাঙল-চষা চাষী—এদেরও ছবি আঁকেন তিনি। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবেন, একটা দুটো ছবি ভালোই এঁকেছেন তিনি। পরদিন সকালে সেই ছবি দেখে আর ভালো লাগে না। নিজের কাজ দেখে নিজেরই লজ্জা করে। টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেন ছবিগুলো, আবার আঁকতে বের হন।
ব্যর্থতার যন্ত্রণা তিনি বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখতে চান। বাপ-ভাইয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে দিন কাটছে, এই লজ্জাটাও তিনি ছবি আঁকার মধ্যে দিয়ে ভুলে থাকতে চান।
ক্রমে ভিন্‌সেন্টের ইচ্ছে হলো অপর একজন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করার। কোথায় কোথায় তার ভুল আর ঠিক—সেগুলোর তো যাচাই হওয়া চাই। হঠাৎ তাঁর মনে হলো রেভারেন্ড পিটারসেনের কথা। তাড়াতাড়ি স্কেচের তাড়া থেকে তিনি নিজের আঁকা তিনটে ছবি বের করলেন। একটি একজন শ্রমিকের, আর একটা—একটি কুলি-বৌ রান্নাঘরে ঝুঁকে পড়ে উনুন ধরাচ্ছে, আর তৃতীয়টাতে আঁকা কালো পিরামিডের ধারে দাঁড়িয়ে কয়লা-দানা কুড়োচ্ছেন এক বৃদ্ধা। ছবি তিনটে গুছিয়ে তিনি ব্রুসেলস যাত্রা করলেন।
পকেটে তিনটি ফ্র্যাঙ্ক মাত্র সম্বল, ট্রেন ভাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। প্রায় পঞ্চাশ মাইল পথ তিনি হেঁটেই চললেল। দু-দিন তিনি প্রায় দিনরাত হেঁটেছেন, মাঝেমাঝে রাস্তার ধারে গা এলিয়ে বিশ্রাম করেছেন। পায়ের পুরনো জুতোটা বিশ্রীভাবে ছিঁড়ে যাওয়ায় পায়ের আঙুলগুলো রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। গায়ের কোট কাদামাখা, মাথার ঝাঁকড়া চুলভর্তি ধুলো আর ঝুল। শুকনো মুখ, কোটরাগত চোখ, তবু মনে আনন্দের শেষ নেই। শিল্পী তিনি, চলেছেন এক শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করতে।
পিটারসনের মেয়েটি দরজা খুলেই আগন্তুকের চেহারা দেখেই আঁতকে উঠল। দৌড়ে সে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।
রেভারেন্ড পিটারসেন কয়েক মুহূর্ত ভালো করে দেখে চিনতে পারলেন ভিন্‌সেন্টকে। দুহাত বাড়িয়ে হাসিমুখে বললেন—আরে, ভিন্‌সেন্ট নাকি, এসো, বাবা, এসো। কতদিন পরে এলে। বড় খুশি হলাম তোমাকে দেখে।
কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পরে ভিন্‌সেন্ট সলজ্জভাবে প্যাকেটটা খুললেন। বললেন—আজকাল আমিও কিছু কিছু স্কেচ করছি। তিনটে স্কেচ আমি এনেছি। আপনি একটু দেখে দেবেন?
ছবি তিনটে পিটারসেন যত্ন করে ইজেলের ওপর রাখলেন। তারপর দূর থেকে দেখতে লাগলেন একমনে। গলা শুকিয়ে এল ভিন্‌সেন্টের।
বেশ কিছুক্ষণ দেখে পিটারসেন বললেন—প্রথমেই আমার মনে হচ্ছে যে তুমি মডেলের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছবি আঁকো। কেমন, তাই তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, শ্রমিকদের ছোট ছোট খুপরির মধ্যেই আমাকে অধিকাংশ ছবি আঁকতে হয়।
–ঠিক, সেইজন্যই দেখছি তোমার আঁকায় পার্স্পেক্টিভের অভাব। মডেলের কাছ থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে ছবি আঁকতে পারবে, এমন একটা জায়গা ঠিক করতে পারবে না?
–হয়ত পারব।
বাঃ, তাহলে তো খুব ভালো হয়। আরও কিছুক্ষণ নিবিষ্ট মনে ছবিগুলো তিনি নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কি কখনো ড্রয়িং শিখেছ? আঁকবার আগে কি কাগজের সঙ্গে বিষয়বস্তুকে মিলিয়ে নেবার জন্য কাগজে মাপজোক করে নাও?
লজ্জিত ভিন্‌সেন্ট বললেন—দেখুন, এসব আমি কিছুই জানি না। আমার ধারণা, কাগজ পেন্সিল নিয়ে শুরু করলেই আঁকতে পারা যায়।
–তা কী করে সম্ভব, ভিন্‌সেন্ট? ড্রয়িং-এর প্রাথমিক নীতি আর পদ্ধতিগুলো তো আগে আয়ত্ত করতে হবে, তবেই না আস্তে আস্তে আঁকাটা সঠিক হবে।
পেন্সিল আর রুলকাট নিয়ে পিটারসেন মেয়েটির মুখ ও দেহ ঘিরে চতুর্ভুজ আঁকলেন। ভিন্‌সেন্টের শরীর ও মুখের মধ্যে যে কোনা আয়তনিক সামঞ্জস্য নেই তা তিনি ভিন্‌সেন্টকে বুঝিয়ে দিলেন। তারপর শরীরের অনুপাতে ছবি মাটিতে আঁকতে লাগলেন। বোঝাতে বোঝাতে আর আঁকতে আঁকতে একঘণ্টা কেটে গেল। তারপর কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ছবিটা ভালো করে দেখে বললেন—এবার দেখো তো। এবার মনে হচ্ছে দেহের ওপর মাথাটা ঠিক বসেছে।
কিছুটা দূর থেকে পিটারসেনের পাশে দাঁড়িয়ে ভিন্‌সেন্ট ছবিটা দেখতে লাগলেন। সত্যিই ছবিটা বেশ দাঁড়িয়েছে, মাথার সঙ্গে অন্য অবয়বের চমৎকার সামঞ্জস্য। কিন্তু ভিন্‌সেন্টের মনে হলো—বরিনেজের কয়লাকুড়ুনি সেই মেয়েটি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, এ যেন নিখুঁতভাবে আঁকা হেঁট হয়ে দাঁড়ানো সারা পৃথিবীর যে কোন একটা মেয়ে, আর কেউ নয়।
ভিন্‌সেন্ট কোন কথা বললেন না, ইজেলের ওপর দ্বিতীয় ছবিটাকে রাখলেন, যেটিতে শ্রমিক-বধূ উনুন ধরাচ্ছে। তারপর এসে দাঁড়ালেন পিটা্রসেনের পাশে।
পিটারসেন অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখলেন। তারপর বললেন—আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তোমার এই দ্বিতীয় ছবিটা আমাকে কেন টানছে? সত্যি বলতে কি, জঘন্য তোমার ড্রয়িং, আর্ট স্কুলের নতুন ছেলেও এ ড্রয়িং দেখে হাসবে, কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলবে। তবু কেন জানি না মেয়েটা আমায় টানছে। চোখ ফেরাতে পারছি না, ও যেন আমার অনেকদিনের চেনা।
ধীরে ধীরে ভিন্‌সেন্ট বললেন—ওকে আপনি দেখেছেন রেভারেন্ড। বিস্মৃতির অতল থেকে ও আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। –হয়ত বরিনেজে…?
চমকে ভিন্‌সেন্টের দিকে তাকালেন পিটারসেন। তারপর বললেন—ঠিক বলেছ, দেখেছি ওকে। ওর মুখ নেই কিন্তু মূর্তি আছে। ও বিশেষ কোন মেয়ে নয়। বরিনেজের সব শ্রমিক-বধূর ও প্রতিভূ। তুমি যেভাবে ওকে এঁকেছ, প্রকাশ করেছ তার দাম হাজারটা নির্ভুল ড্রয়িং-এর চেয়ে বেশি। ও নামহীনা চিরন্তনী। ওর গুরুত্ব সরাসরি আমার প্রাণে এসে বাজছে।
ভিন্‌সেন্টের বুক দুরদুর করছিল। পিটারেনের প্রশংসা—উনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, ওঁর কথার দাম আছে।
পিটারসেন আবার বললেন,–ছবিটা আমাকে দেবে নাকি ভিন্‌সেন্ট? মেয়েটির সঙ্গে ভাব করতে ইচ্ছে হচ্ছে যে!

১০
বরিনেজে ফিরে এসে পিটারসেনের নির্দেশ-মতো বড় একটা খালি জায়গা ভাড়া নিলেন। এই তাঁর স্টুডিয়ো। দেয়ালের এক ধারে মডেলকে দাঁড় করিয়ে অন্যদিকের দেয়ালের কাছে দাঁড়ালে মাঝে যে যথেষ্ট জায়গা থাকে তাতে দৃশ্যমান বস্তুকে সঠিক আকারে দেখা যায়। শ্রমিকদের বৌ মেয়েরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ওঁর কাজে সাহায্য করে। ভিন্‌সেন্ট দ্রুতগতিতে একের পর এক স্কেচ করতে থাকেন। শেষ রাত আড়াইটের সময় তিনি মার্কাসের গেটের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করেন। আধো-অন্ধকারে কাঁটাবেড়ার পাশ দিয়ে সরু পথ ধরে শ্রমিকরা খনির গহ্বরে ঢোকে। তিনি বড়-বড় করে ড্রয়িং করেন এই খনি-শ্রমিকদের। খনির বাড়ি, ক্রেন, কালো পাহাড়—ফুটিয়ে তোলেন তিনি। একটা বড় ড্রয়িং খুব যত্নে এঁকে ভাই থিয়োকে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। শিল্পের নেশা, সৃষ্টির নেশা তাঁকে ব্যর্থতার স্বাদ ভুলিয়ে প্রাণে খুশির জোয়ার তোলে।
দু-মাস এইভাবে কাটে। এরপর আবার তাঁর মনে হলো অন্য একজন শিল্পীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর সঙ্গে আলোচনার জন্যে। ছবি তো তিনি আঁকছেন, কিন্তু এগোচ্ছেন কি না তা ঠিক বুঝতে পারছেন না।
এদিকে পকেট একেবারে শূন্য, ছেঁড়া জামাজুতো পরে আর বেরোনো যায় না। পেট ভরে খাবার জোটে না। অথচ ছবি আঁকার জন্য তিনি প্রাণপাত করছেন। এত ধকল আর শরীর নিতে পারল না। ভেঙে পড়ল শরীর। উনি বুঝতে পারছেন এভাবে আর চলবে না। কী করবেন? দোকানদারি, ইস্কুলমাস্টারি, কেরানিগিরি কিছু একটা বেছে নিতে হবে।
ভেবে কুল পান না কিছু। এমনি এক দিনে তাঁর জীর্ণ ঘরের দরজা খুলে ঢুকলেন তাঁর ভাই থিয়ো।

১১
দরজা ঠেলে ঢুকে বিস্ফারিত চোখে থিয়ো চমকে তাকালেন ভিন্‌সেন্টের দিকে। এ কী চেহারা হয়েছে ভিনসেন্টের! মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সে প্যারিস ছেড়েছে—সেখানে তাঁর বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যের সমারোহ। এখানে এই ভাঙা ঘরে ছেঁড়া তোষকের ওপর একটা জীর্ণ কম্বল গায়ে দিয়ে প্রেতমূর্তির মতো শুয়ে আছেন ভিন্‌সেন্ট।
ক্ষীণ কণ্ঠে ভিন্‌সেন্ট বললেন—এসো থিয়ো, কী খবর?
থিয়ো তাড়াতাড়ি বিছানার কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে বললেন—কী ব্যাপার ভিন্‌সেন্ট? এ কী চেহারা হয়েছে তোমার?
–কিছু না। একটু অসুখে পড়েছিলাম, এখন ঠিক আছি।
ভাইয়ের কপালে থিয়ো তাঁর ডানহাতটা রাখলেন। চোখ ঠেলে আসা কান্না কোনরকমে সামলে নিলেন। মুখ দিয়ে কোন কথা বেরলো না।
–আচ্ছা, এবার বলতো ভিন্‌সেন্ট, কী হয়েছে তোমার? শরীরটার এমন দশা কীভাবে হোল?
ভিন্‌সেন্ট সব কথা বললেন।
–বুঝেছি। আসলে তোমার অসুখ দুর্বলতা। কতদিন পেট ভরে খাওনি বলতো? দেখাশোনা কে করে তোমার?
–লোকের অভাব নেই। শ্রমিক-বৌরা খুব যত্ন করে আমার দেখাশোনা করে।
–সে তো বুঝলাম। কিন্তু পথ্য? খাবার-দাবার তো কিছুই দেখছি না ঘরে।
–ওরা যা এনে দেয় তাই খাই। রুটি, কফি আর পনির।
কিন্তু ভিন্‌সেন্ট, রুটি আর কফিতে তোমার শরীর সারবে কী করে? মাংস, ডিম, মাখন এসব কিনতে পার না?
–এসব ভালো ভালো খাবারের দাম যে অনেক, ঠিক বলছি কি না বল?
গলা বুজে এল থিয়োর। ভাইয়ের হাতটা চেপে ধরে তিনি বলেন—মাপ কর ভাই, তোমার এই অবস্থা আমি ধারণাই করতে পারিনি।
লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন থিয়ো। আমি যতক্ষণ না আসি চুপ করে শুয়ে থাকো এখানে। একদম নড়বে না।
আধঘণ্টাটাক পরে থিয়ো ফিরে এলেন। সঙ্গে দুটো ছেলে, তাদের হাতে নানান জিনিসপত্র। শহর থেকে কিনে এনেছেন বিছানা, বাসনপত্র, খাবার-দাবার।
–তোমার উনুনটা কী করে ধরাও বলতো?
–গোড়ায় খানিকটা কাঠকুটোয় আগুন ধরিয়ে তারপর ওই যে কয়লা রয়েছে, –চাপিয়ে দাও।
–কয়লা? গুঁড়োগুলোর দিকে তাকিয়ে থিয়ো বললেন—একে তোমরা কয়লা বল না কি?
–হ্যাঁ, ঐ আমাদের কয়লা। থাক থাক, তুমি পারবে না। দাঁড়াও আমি উঠছি।
–একদম না। চুপটি করে শুয়ে থাকো। নড়বে তো মার দেব।
ভাইয়ের ধমক শুনে হাসি আসে ভিন্‌সেন্টের। অনেকদিন পরে আজ মনে খুশির আমেজ। থিয়ো উনুনটা ধরিয়ে নতুন কেনা বাটিতে দুটো ডিম সেদ্ধ করলেন, একটা বাটিতে কিছুটা সবজি রেখে অন্য বাটিতে দুধ গরম করলেন। তারপর উনুনে কয়েক পিস রুটি সেঁকে নিয়ে তাতে পুরু করে মাখন মাখালেন।
পথ্য রান্না করে থিয়ো টেবিলের ওপর সেগুলো সাজিয়ে ভিন্‌সেন্টের বিছানার সামনে নিয়ে এসে বললেন—নাও, মাথা তোল, খাইয়ে দিই।
ভিন্‌সেন্টের কোন আপত্তিই শুনলেন না থিয়ো। আস্তে আস্তে তিনি ভিন্‌সেন্টকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। কতদিন পরে তিনি সুখাদ্যের স্বাদ পাচ্ছেন। কতদিন পরে স্নেহ ভালোবাসার মমতাময় পরশ! খাওয়া শেষ হতে আরামে তিনি আবার এলিয়ে পড়লেন বিছানায়।
–এবার বল থিয়ো তোমার খবর। কেমন আছ তোমরা সবাই? কাজকর্ম কেমন চলছে তোমার?
–সব কথা পরে হবে। এখন তুমি ঘুমোও। এই ওষুধটা খেয়ে নাও, তাহলেই ঘুম আসবে।
সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি অকাতরে ঘুমোলেন। চোখ খুলে দেখলেন থিয়ো তাঁর আঁকা স্কেচগুলো দেখছেন। চুপ করে শুয়ে রইলেন তিনি অনেকক্ষণ। সুস্থ লাগছে শরীর, ভারি তৃপ্তি শরীর আর মন জুড়ে।
ভিন্‌সেন্ট বললেন—ছবিগুলো দেখলে? কেমন লাগল?
দাঁড়াও, আগে মাংসটা চড়িয়ে তোমার ঐ ঝোপের মতো দাড়িগুলো কামিয়ে দিই। তারপর বলছি।
দাড়ি কামাবার পরে ভিন্‌সেন্টকে অনেক ভালো দেখাচ্ছিল।
মনে মনে ভাবছিলেন থিয়ো। ভিন্‌সেন্টকে তিনি ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন নিজের কাছে। দাদা তার শিশুর মতো, কিছু বোঝে না, নিজের জন্যে কিছু করতে পারে না। যে ভাবেই হোক দাদাকে তিনি দাঁড় করাবেনই।
এতদিন পরে দেখা হয়ে কত কথাই না হচ্ছিল তাঁদের মধ্যে। ছোটবেলার কথাই বেশি। কী চমৎকারই না ছিল তাঁদের ছোটবেলাটা।
হঠাৎ যেন সব আবেগ ঝেড়ে ফেললেন থিয়ো।
–শোন ভিন্‌সেন্ট, এবার কাজের কথায় আসা যাক। তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তুমি নির্দিষ্ট একটা কাজ করতে চাও—যে কাজে তুমি তৃপ্তি পাবে, সে কাজের সাধনায় তুমি মুক্তি পাবে। তুমি কী চাও বল, আমি দেব মূলধন, তুমি দেবে কাজ। তোমার কাজের দামটা এখন আমি দেব, লাভটা আমি ভবিষ্যতে ঠিক পুষিয়ে নেব। মাথা ঠাণ্ডা করে বল—সারা জীবনের মতো এ ব্যবসায়ে তুমি লাগতে চাও?
আনন্দে উত্তেজনায় আবেগে থরথর করে কাঁপছিলেন ভিন্‌সেন্ট। অন্ধ রাতের শেষ তবে হতে চলেছে, ওই তো নতুন প্রভাতের আলো দেখা যাচ্ছে।
–শোন থিয়ো, এতদিন পরে সত্যিই আমি আমার কাজ খুঁজে পেয়েছি। ছবি আমাকে চিরকাল প্রচণ্ড আকর্ষণ করেছে, কিন্তু নিজের হাতে পেন্সিল ধরার সাহস হয়নি। অন্ধ ছিলাম এতদিন, ভুলেও বুঝিনি কী আমার আসল কাজ।
–কী এসে যায় তাতে? স্বাস্থ্য যদি আবার ফিরে পাও, মনের জোরে যদি এগোতে পার তবে তবে অন্যদের চাইতে তোমার কাজ হাজার গুণ ভালো হবে। সাতাশ বছরটা কিছুই নয়। সারাজীবন তো তোমার সামনে।
—হ্যাঁ, আরও অন্তত দশ বছর তো আমার হাতে আছেই। দশ বছরে কি কিছুই করতে পারব না?
–আলবাত পারবে। প্রাণপণে লেগে পড়। আর যেখানে খুশি সেখানে গিয়ে থাকো। প্যারিস, আমস্টার্ডাম, ব্রুসেলস, হেগ—যেখানে খুশি। মাসে মাসে আমি তোমাকে টাকা পাঠিয়ে দেব। যত বছরই লাগুক, আমি বলছি, ভিন্‌সেন্ট, তুমি পারবেই।
–থিয়ো থিয়ো, আমি আর ভয় পাব না, আর পিছু হটবো না। আমি শিল্পী হবই, শিল্প-সাধনাই আমার নিয়তি। এইজন্যেই অন্য সব কাজে আমি ব্যর্থ হয়েছি। এতদিনের বন্দিত্ব ঘুচেছে আমার, বন্ধ দ্বার তুমিই খুলে দিলে।
থিয়ো বললেন—আর কোন কিছুই আমাদের দূরে রাখতে পারবে না। আবার আমরা এক হয়েছি। তাই না?
–হ্যাঁ, থিয়ো, সারা জীবনের জন্য।
–এখন ক’দিন বিশ্রাম আর সুখাদ্য খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠো। তারপর তুমি যেখানে বলবে সেখানে তুমি গিয়ে কাজ করবে।
বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলেন ভিন্‌সেন্ট। কীসের বিশ্রাম! কী হয়েছে আমার? আজই রাত ব্রুসেল্‌সের একটা ট্রেন আছে।
উদ্দাম আগ্রহে ভিন্‌সেন্ট জামাকাপড় পরতে শুরু করলেন। থিয়ো বললেন—কী সর্বনাশ, তুমি কী পাগল হলে, তোমার না অসুখ!
–অসুখ! সে সব পুরনো কথা। এই মুহূর্তে আমি যতটা সুস্থ ততটা সুস্থ আমি কখনো ছিলাম না। চটপট সব গুছিয়ে নাও থিয়ো। শুধু খুব দরকারি জিনিসগুলোই নাও। দশ মিনিটের মধ্যে স্টেশনে পৌঁছতে হবে কিন্তু। দেরি নেই।

এখানেই শেষ হলো ভিনসেন্টের জীবনে বরিনেজ অধ্যায়। এর আগে ভিনসেন্ট ছবি আঁকলেও কখনো ভাবেননি শিল্পীই তাঁকে হতে হবে, এই তাঁর অমোঘ নিয়তি। বরিনেজে না এলে হয়ত তাঁর এই শিল্পীসত্তা সেভাবে বিকশিত হয়ে উঠতে পারত না, সেদিক থেকে দেখতে গেলে তাঁর জীবনে বরিনেজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে আমার মনে হয়েছে।
তাঁকে নিয়ে অজস্র লেখালিখি হলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে তুলনামূলকভাবে বরিনেজ অধ্যায়টি যেন অনালোচিত থেকে গেছে। আমি আমার সীমিত ক্ষমতায় তাঁর জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি নিয়ে একটু আলোচনা করলাম।

তথ্য সূত্র:

  • Lust For Life – By–Irving Stone
  • জীবন পিয়াসা – লেখক–নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়

চিত্রসূত্র 

অন্তর্জাল

জন্ম ১৯৬১ সালের ১৪ই অগাস্ট। সোনারপুর দক্ষিণ ২৪ পরপগণায় থাকেন। খেলাধূলার সঙ্গে যুক্ত। সাহিত্যপ্রেমী। অনুবাদ করতে ভালোবাসেন। দুটি মুদ্রিত বই ও একটি 'ই বই' প্রকাশিত হয়েছে। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়। ঐতিহ্যময় প্রকাশনা সংস্থা অভ্যুদয় প্রকাশ মন্দিরের বর্তমান কর্ণধার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *