ক্রিকেটের বিশ্বায়ন – কিছু প্রশ্ন
ক্রিকেট ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট এখন হয়ে উঠেছে পয়লা বৈশাখ, গুড ফ্রাইডে, ঈদের মতো বার্ষিক উৎসব। যদিও দুর্গাপুজো বা ঈদ তার জৌলুস না হারালেও, এই ‘আসছে বছর আবার হবে’র চাপে পড়ে যথেষ্ট জৌলুস হারিয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট! অন্যদিকে যদি ফুটবল বিশ্বকাপের দিকে তাকাই তাহলে কিন্তু একথা একেবারেই বলা যাবে না। হাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝেও দুইমাস বাদে শুরু হতে চলা বিশ্বকাপ মানুষ দেখবেন রাত জেগে। সেই উন্মাদনায় কিন্তু এতটুকু ভাঁটা আসেনি।
পরবর্তীতে তুল্যমূল্য বিচারে ক্রিকেট প্রাধান্য পেলেও লেখকের সঙ্গে বিশ্বকাপ শব্দের পরিচয় ঘটেছিলো ১৯৯০ সালে, ইতালি বিশ্বকাপের সময়। সেবার প্রথম ম্যাচেই অখ্যাত ক্যামেরুন হারিয়ে দিয়েছিলো তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মারাদোনার আর্জেন্টিনাকে। এই মুহূর্তে আরও একটি বিশ্বকাপের কথা মাথায় আসছে, ২০০২। একটি গ্রুপ ম্যাচে বালাকের জার্মানি ৮-১ গোলে পর্যুদস্ত করেছিল সৌদি আরবকে আর তার ঠিক কুড়ি বছর বাদে কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দিলো সেই সৌদি আরব! সেবারই শেষ চারে পৌঁছে গিয়েছিলো তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া। তার চার বছর আগে সেমিফাইনাল খেলেছিল ক্রোয়েশিয়া, যারা আন্তর্জাতিক ম্যাপে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল তার মাত্র সাত বছর আগে। তারও চার বছরে আগে, ১৯৯৪-এ এক পরাজিত সেমিফাইনালিস্ট দলের নাম ছিল বুলগেরিয়া। তারা কিন্তু সেই অর্থে ফুটবল বিশ্বের প্রথম সারির দল নয়, কিন্তু বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা আছে।
এটাই ফুটবলের বিশ্বায়ন। যেখানে তথাকথিত ছোট দেশগুলো প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলেছে বা ফেলছে, শুধু অংশগ্রহণের জন্য বিশ্বকাপ খেলতে আসছে না। মার্টিন ক্রো -কে সামনে রেখে পথ চলতে শুরু করেছিল ইতালি। ২৭ বছর আগে চেন্নাইয়ে অসহ্য পিঠের ব্যথাকে সঙ্গে করে শচীন তেন্ডুলকার যখন ওই মহাকাব্যিক ইনিংসটা খেলছিলেন, তখন এক ইতালীয় ক্রিকেট উৎসাহী সেখানে বসে বোঝার চেষ্টা করছিলেন যে ক্রিকেট খেলাটা আদতে কী। আর সেখান থেকে এসে সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্ৰহণ করাটা অবশ্যই একটা সদর্থক বিষয় কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এরপর কী? ২০০২ থেকে ২০২২ এর সৌদি আরবের ফুটবলে যে উত্তরণটা ঘটেছে সেটা কি ভবিষ্যতে ইতালি বা নেপালের মধ্যে ঘটবে?
টি২০ ফরম্যাটকে সারা বিশ্বে ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে উপযোগী ফরম্যাট হিসেবে মনে করছে আইসিসি। প্রায় কুড়ি বছর হতে চললো এই ফরম্যাটে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। এখনও অবধি একবার আফগানিস্তান ছাড়া একটিও নতুন দল প্রতিযোগিতার শেষ চারে পৌঁছতে পারেনি। সাদা বলের দুই ফরম্যাটের বিশ্বকাপেই মাঝেমধ্যে বিক্ষিপ্ত কয়েকটা ম্যাচে বড় দলকে হারিয়ে অঘটন ঘটিয়েছে বেশ কয়েকটি দল কিন্তু কিছুটা আফগানিস্তান ছাড়া ধারাবাহিকতা কোন দলই দেখাতে পারেনি।
সমস্যা প্রধানত দুটো। ফুটবলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাইরেও একটা বিরাট জায়গা জুড়ে আছে ক্লাব ফুটবল। যেখানে ফুটবলের নিরিখে একটা তথাকথিত ছোট দেশের খেলোয়াড়ও যোগ্যতা থাকলে বড় ক্লাবে খেলতে পারেন, সুযোগ পান দুনিয়ার প্রথম সারির লিগে খেলার। ঠিক যেভাবে আনক্যাপড ভারতীয় খেলোয়াড়রা আইপিএলের সুবিধে পাচ্ছেন। কিন্তু বৃহত্তর ক্ষেত্রে? হ্যাঁ এটা ঠিক যে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে ইতালি দলের দুই খেলোয়াড় বিগ ব্যাশের অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু তার বাইরে? সারা দুনিয়া জুড়ে চলা এতগুলো প্রথম সারির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এসোসিয়েট দেশ থিম কতজন খেলার সুযোগ পাচ্ছেন? ফলে দিদিয়ের দ্রোগবারা প্রথম সারির ক্লাব ফুটবলে জায়গা পেলেও পরিকাঠামোগত কারণে জার্মানি বা উগান্ডার কোন প্রতিভাবান ক্রিকেটার আইপিএলের কোন দলে ঠাঁই পেয়েছেন, সেটা এখনও কষ্টকল্পনা। উল্টে বলা যায় গত শতাব্দীতে কাউন্টি ক্রিকেট এই ভূমিকায় যথেষ্ট সফল।
চলতি আইপিএলের কথাই ধরুন না! দশটা দলের প্ৰত্যেকটায় সর্বোচ্চ আটজন করে অর্থাৎ মোট আশিজন বিদেশী খেলোয়াড় আইপিএলের স্কোয়াডে থাকতে পারেন। এর মধ্যে এসোসিয়েট দেশ থেকে কতজন খেলোয়াড় আছেন? উত্তর হচ্ছে একজনও নেই। ক্রিকেটের যে ফরম্যাটকে সারা বিশ্বে ক্রিকেটটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বলে ভাবা হচ্ছে, সেই ফরম্যাটে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লিগে এসোসিয়েট দেশ থেকে জায়গা পান না একজন খেলোয়াড়ও! এর পক্ষে বা বিপক্ষে একাধিক যুক্তি দেওয়া যায় কিন্তু বাস্তব হচ্ছে ওই ছোট্ট তথ্যটা। শুধু এবারের আইপিএল নয়, আইপিএলের ইতিহাস ঘাঁটলেও কতিপয় খেলোয়াড়কে খুঁজে পাওয়া যাবে যাঁরা এসোসিয়েট দেশ থেকে উঠে এসে আইপিএল খেলেছেন! যদিও আইপিএলকে এর জন্য কোনভাবেই পুরোপুরি দায়ী করা যায় না কারণ তার স্ট্রাকচার এবং উদ্দেশ্য। যদিও একইসঙ্গে একথাও বলা যায় যে কিছুটা দায় তাদেরও আছে। আইপিএল দলগুলোর স্কোয়াডে (প্রথম এগারোয় নয়) অন্তত একজন করে এসোসিয়েট দেশের খেলোয়াড় বাধ্যতামূলক করাই যায়, বাকিটা সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের দক্ষতার উপর নির্ভর করবে। ভুলে গেলে চলবে না রশিদ খান, মহম্মদ নবিরাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলার অভিজ্ঞতা আজ আফগান ক্রিকেটকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আর একটা প্রথম সারির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এই নিয়ম চালু হলে হয়তো বাকিরাও ভাববে।
ফলে নজর রাখতেই হবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বাইরের চিত্রের দিকে। আইসিসি বা মহাদেশীয় ক্রিকেট সংস্থাগুলো এই বিষয়ে কতটা অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে?
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক, যেটাকে সম্ভবত একদিনের ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ বলা যায় – সেদিকে যদি একটু নজর দেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে তথাকথিত ছোট দেশের তকমা ছেড়ে অন্তত দুটো দেশ ক্রিকেট মানচিত্রে বড় শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। তাদের মধ্যে শ্রীলঙ্কা তো বিশ্বচ্যাম্পিয়নও হয়, জিম্বাবোয়েও এমন একটা শক্তিতে পরিণত হয় যারা নিজেদের দিনে যে কোন প্রতিপক্ষকে হারানোর ক্ষমতা রাখতো। দল হিসেবে ভারত, নিউজিল্যান্ডও আগের তুলনায় অনেক ধারাবাহিক হয়। যথেষ্ট ধারাবাহিক না হলেও বাংলাদেশ এবং কেনিয়া মাঝেমধ্যেই চমক দেখতে থাকে, শেষোক্ত দলটি তো ২০০৩ বিশ্বকাপের শেষ চারেও পৌঁছে যায়।
এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে অন্যান্য কারণের সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে চলা বহুদলীয় প্রতিযোগিতা। আশির দশক থেকে শুরু হলেও যেটা পূর্ণতা পায় নব্বইয়ের দশকে এসে, যেখানে তথাকথিত ছোট দলগুলো নিয়মিত বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলার সুযোগ পেত, নিজেদের দক্ষতা বা ক্ষমতাকে মাপার জন্য প্রকৃত মঞ্চ পেত। আজকের মতো পরিস্থিতি ছিল না যেখানে একজন আফগান ক্রিকেটারকে একজন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে খেলার জন্য কোন আইসিসি ইভেন্ট বা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের অপেক্ষা করতে হবে। আর এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আইপিএল মডেলকে দেখলেই বোঝা যায়। আজ ভারতের যেকোন আনক্যাপড খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সমপর্যায়ের বা সমপ্রতিদ্বন্দিতার সম্মুখীন হয়ে যাচ্ছে আইপিএল খেলার সুবাদে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে একসঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করা, কঠিনতর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত খেলা – তাদের নিজেদের ক্রিকেটস্কিলকে প্রতিদিন পরিমার্জন করতে সাহায্য করছে।
আর ঠিক এই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়ছে এসোসিয়েট দেশগুলো। তাদের খেলোয়াড়রা না পাচ্ছে প্রথম সারির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে যথেষ্ট সুযোগ, না খেলতে পারছে তারা পূর্ণশক্তির দলগুলোর বিরুদ্ধে ।
সমাধানসূত্র হিসেবে ভাবা যেতেই পারে এফ্রো এশিয়ান বা ইউরো এশিয়ান কাপের মতো কিছু প্রতিযোগিতা বা নিদেনপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ যেখানে একটি এসোসিয়েট দল থাকবে। যদিও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলবেন যে এইসব করার ‘উইন্ডো’ কোথায় কিন্তু বাস্তব এটাই যে, ক্রিকেট দুনিয়ায় প্রকৃত অর্থে বিশ্বায়নের হাওয়া ঢোকাতে হলে ‘জানালা’ খুঁজে বের করতেই হবে।
না হলে ওই মাস দুয়েক পরে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে বসে তথাকথিত ছোটদলগুলোর পারফরম্যান্সে উল্লসিত হবো আর ভাববো যে ক্রিকেটে এই শতকের সিকিভাগ কেটে যাওয়ার পরও একমাত্র কিছুটা আফগানিস্তান ছাড়া একটা দেশও সেভাবে উঠে আসেনি যারা বড় দলকে সেভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে, উল্টে কয়েকটা দেশ বিভিন্ন কারণে ক্রিকেট মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে!
আইসিসির ক্রিকেট বিশ্বায়নের বিষয়টা সম্ভবত অনেকটাই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের মতো! কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন যে প্রচুর পরিমাণে হয়েছে কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত উন্নয়নকে খুঁজলেও দেখা যাচ্ছে না!

1 Comment