ও পি নইয়ার, যে জহুরি প্রথম চিনেছিলেন দুর্লভ প্রতিভাশালী আশাকে
আশা ভোঁসলে! সঙ্গীত জগতে এক বিরাট নাম! সব ধরণের গানই চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছে দিতে পারতেন তিনি, সে কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। প্রায় আশি বছরের সংগীত জীবনে আশা কাজ করেছেন অগুণতি সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে। পরবর্তী জীবনে যাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধে আশা সত্তরের দশক থেকে হিন্দি এবং বাংলা গানের জগতে আলোড়ন তুলেছেন – তাঁকে সব ভারতীয়ই জানেন। বাঙালি বলে আমাদের একটু যেন বেশি গর্ব তাঁকে নিয়ে – তিনি হলেন রাহুল দেব বর্মণ, পারিবারিক সম্পর্কেও আবদ্ধ হয়েছিলেন আশা তাঁর সঙ্গে। যে সব কালজয়ী গান এই জুটি আমাদের দিয়ে গেছেন তার জন্যে সমগ্র ভারতবাসী দীর্ঘকাল তাঁদের স্মরণ করবে। তবে রাহুলের সঙ্গে যখন আশা কাজ করতে শুরু করেন তখন কিন্তু তিনি রীতিমতো পরিচিত।
পরিচিতি তৈরি করার পথটা সব সঙ্গীতশিল্পীদের পক্ষেই কঠিন হয়, কিন্তু আশার লড়াইওটা ছিল একটু আলাদা রকমের। কারণ সবাই জানেন, বড়দিদি লতা মঙ্গেশকর! আশার যখন দশ বছর বয়েস তখন তিনি গান শুরু করেন, লতা ততদিনে গানের জগতে মোটামুটি একটা জায়গা করে নিয়েছেন। তবে আশা কি গান গাননি? যদি পরিসংখ্যান বিচার করা হয়, ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে আশার গানের সংখ্যা ২১৩৯, অপর দিকে লতার গানের সংখ্যা ১৮৭৭। তবে তফাত এই যে আশার গানগুলো হচ্ছে ওই যাকে বলে ফার্স্ট চয়েস তাই নয়, মানে ছবির সেরা গানগুলি পরিচালকরা দিতেন লতাকে। আশা নিজেও পরবর্তী জীবনে বলেছেন যে পরিবারে শুধু নয়, সর্বক্ষেত্রেই তাঁকে শুনতে হয়েছে, “ছোটি বহিন!”
জীবনের এই পর্যায়ে আশা একের পর এক গান করে যাচ্ছেন, কিন্তু মনোবল যেন কোথায় একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
আশা যখন গানের জগতে এসেছেন তখন সব পরিচালকদের একই কথা, বড়দিদির মতো গাইতে হবে! সেই মতোই তাঁরা সুর বাঁধতেন আর দাবি করতেন।
আশার সহজাত দক্ষতা কোথায় সেই ব্যাপারে কেউ আগ্রহ দেখাতেন না।
আশা নিজেই বলেছেন, “…they would ask me to sing at a higher pitch and scale!”
আসলে এই জগতে মানুষকে সব সময় যাচাই করা হয় সে কী পারে না, তার বিচারে – সে কী পারে সেটা নিয়ে কেউ মনোযোগই দেয় না। এই কথা শুনতে শুনতে মানুষের মনোবল এতটাই ভেঙে যায় যে, সে যেটা ভালো পারে সেটা একেবারেই ভুলে গিয়ে আত্মগ্লানিতে ভোগে। আশা নিজেই বলেছেন তিনি তখন ভুগতেন, “Lata phobia” তে।
কীভাবে গান গাইবেন তা নিয়েও ছিল সংশয়, একবার ভাবেন দিদির মতো গাইবেন, একবার গীতা রায়-দত্তের মতো আবার একবার ভাবেন সামসেদ বেগমের মতো!
এই সময়ই আশার সঙ্গীত জীবনে এক যাদুকরের প্রবেশ! সঙ্গীত পরিচালক ওংকার প্রসাদ নইয়ার, সংক্ষেপে ও পি নইয়ার। ও পিই প্রথম আশার কণ্ঠস্বরের যে সহজাত সৌন্দর্য (bass voice) তাকে যথাযথ সম্মান দিলেন। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মতে আশা বড়জোর ‘Mangeskar the second’ হয়েই থাকতেন যদি না সঙ্গীতজগতের খরস্রোতে তাঁর তরণীর কাণ্ডারী হয়ে ও পি না আসতেন!
আশার কণ্ঠ তখন ছিল uncut diamond (ছিলা না কাটা হিরে) ও পি নইয়ার সেই কণ্ঠে শত সূর্যের ঝলকানি এনে দিয়েছিলেন গায়িকার মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলে।
১৯৫২ সালে প্রথম নইয়ারের কাছে এলেন আশা। নিজেই বলেছেন, “‘ছম ছমা ছম’ ছবির একটা গান গাইবার জন্য ডাকলেন নইয়ারসাব। আমরা মিউজিক রুমে একসঙ্গে বসলাম। তিনি একটি কম্পোজিশন গাইতে দিলেন আমাকে – একবার গাইলাম। তিনি বললেন, ‘আবার গাও!’ দ্বিতীয়বার গাইবার পর হেসে বললেন, ‘পাস!’”
সেই প্রথম শোনাতেই খাঁটি সোনা চিনতে ভুল হয়নি সুদক্ষ সঙ্গীত পরিচালকের!
সালটা ১৯৫৪। লতা ঘোষণা করলেন তিনি নইয়ারের সুরে তিনি কোনো গান গাইবেন না। এমনকী সামসেদ বেগম, গীতা রায় দত্ত আর আশাকেও গাইতে দেবেন না। গীতা আর আশা প্রতিবাদ না করলেও সামসেদ বেগম কিন্তু জানালেন তিনি লতার কথা শুনতে একেবারেই বাধ্য নন, তিনি গাইবেন নইয়ারের সঙ্গীত পরিচালনায়। সামসেদের কথায় ভরসা পেয়ে গীতা আর আশাও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলেন নইয়ারের কাছে। নইয়ারের লক্ষ্য কিন্তু সামসেদ ছিলেন না, তিনি জানালেন, “In five years from now.., just wait and watch how I turn Asha Bhosle in to Lata Mangeskar’s match!”
এই ঘোষণায় সবচেয়ে অবাক হয়েছিলেন গীতা দত্ত, যিনি তখন নইয়ারের সবচেয়ে পছন্দের গায়িকা – গীতার মদির কন্ঠে নইয়ারের সেরা সেরা সুর! তবুও জহুরির হিরে চিনতে ভুল হয়নি! লম্বা রেসের ঘোড়া আশার ওপর একরকম যেন বাজিই ধরেছিলেন ও পি।
তাঁর ভবিষ্যৎবাণী ফলতে দেরি করেনি। ১৯৫৭ সালের ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড নিতে যখন মঞ্চে উঠেছেন নইয়ার, একের পর এক বাজছে বি আর চোপরার ‘নয়া দৌড়ে’র গান। ‘উড়ে যব যব জুলফে তেরি,’ ‘সাথি হাথ বাড়ানা,’’মাং কে সাথ তুমহারা!’
আশার গান, রফি সাহেবের সঙ্গে যুগলে!
এরপর একের পর এক। ১৯৫৭ সালেই ‘তুমসা নেহি দেখা’ সিনেমার ‘ইয়ু তো হামনে’ আবার ‘হাওড়া ব্রিজে’র “আইয়ে মেহেরবান!’
আশা সুপারহিট!
আশার রিহার্সালের প্রসঙ্গে ও পি নৈয়ার বলছেন, “আশার টেকনিক এতই পারফেক্ট যে প্রায় রিহার্সাল লাগে না বললেই চলে – রেকর্ডিং-এর আধঘণ্টা আগে, আমি নিশ্চিত যে আশা একেবারে যে নির্ভুল গাইবেন সেটা শুধু নয়, সূক্ষ্ম ডিটেলস পর্যন্ত যথাযথ থাকবে!”
নইয়ার যখন আশাকে গানের রিহার্সাল করাতেন তখন খুব মৃদু স্বরে গান গাইতেন। যা নিজের সাধারণ উদাত্ত কণ্ঠের একেবারেই বিপরীত।
আশার মতে নইয়ার সাহেব ছিলেন একজন উচ্চমানের সঙ্গীতশিল্পী সত্যি বলতে কী তাঁর গান নাকি তাঁর সুরে গাওয়া প্লে ব্যাক সিঙ্গারদের থেকেও অনেক ভালো ছিল।
আশার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন নইয়ার। অন্যান্য সঙ্গীত পরিচালকের সুরে গাওয়া আশার গানের প্রসঙ্গেও খোলা মনে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন।
সি রামচন্দ্রর সুরে একদিকে ‘নবরং’ সিনেমার ‘আ দিল সে দিল মিলাদে’ আবার একদিকে ‘আশা’ সিনেমার ‘ইনা মিনা ডিক!’ শচীনকর্তার সুরে ‘পেয়িং গেস্ট’ সিনেমার ‘ছোড় দো আঁচল…’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে “সাহেব বিবি গোলামে’র ‘ভোমরা বড়া নাদান!’
এই সবকটি গানের কথা বলতে গিয়ে নইয়ার বলেছেন গানের শব্দ নিয়ে যাদুকরীর মতো খেলেন আশা। স্থায়ী অন্তরা সঞ্চারীর প্রতিটি পদ সঠিক উচ্চারণে আর প্রকাশে শ্রোতার মনের গভীরে পৌঁছে দেন আশা।
‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ সিনেমার গান, ‘জিনে দো অউর জিও’ এই গানটি আশার মাদকতাময় কন্ঠে একবার যে শুনেছে সে বার বার শুনতেই থাকবে – এই ছিল নইয়ারের ধারণা। এই সমস্ত গানের পাশাপাশি সুফি গানেও আশার দক্ষতা অতুলনীয় ছিল সে কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন নইয়ার।
তবে আশা বলেছেন তাঁর শব্দ উচ্চারণ, প্রতিটি শব্দের অর্থ অনুযায়ী প্রকাশ, এর পুরোটাই ওপি-র শিক্ষায়। একদম শুরুতে আশার হিন্দি উচ্চারণে মারাঠি টান ছিল একটু। নইয়ার সাহেবের উর্দু ভাষায় জ্ঞান ছিল অগাধ, তিনিই আশাকে উর্দু উচ্চারণ আর ভাষার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করেছিলেন।
সঙ্গীতজগতে আশা ও রফিসাহেবের তুল্য শিল্পী আগামী ভবিষ্যতে কবে আসবেন জানি না কিন্তু আশা ও রফি দুজনেই বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন, নইয়ারের তৈরি করা সুর, যা নইয়ার গেয়ে শোনাতেন তার মাত্র আশিভাগ নাকি তাঁরা করে উঠতে পারতেন।
তবে মজার কথা কী যখনই রফি আশার ডুয়েট হত, প্রথম রেকর্ডিং এই কিন্তু সবসময় নইয়ার জানাতেন, ‘Okay! Perfect!’
ভীষণ গোছানো সুশৃংখল মানুষ ছিলেন নইয়ারসাব। আশা স্মৃতিচারণ করেছেন যে যখন হারমোনিয়াম বসেছেন পুরো লিরিক মুখস্ত তাঁর। হারমোনিয়ামে সুর উঠছে দ্রুত, লম্বা লম্বা বাক্য সুর মেখে বেরিয়ে আসছে নইয়ারসাবের সুরেলা কণ্ঠ থেকে। সকাল সাড়ে নটায় যেতেন আশা। ঘন্টা তিনেক। ব্যাস! সুর তোলানো আর তোলা শেষ। দুপুরে বাড়ি ফিরে এসে লাঞ্চ করতেন আশা।
এদিকে নইয়ার বলেছেন এই ঐশ্বরিক গুণের গায়িকার স্মৃতিশক্তি আর উদ্যমের কোনও তুলনা ছিল না। গাইতে গাইতে এমন আত্মমগ্ন হয়ে যেতেন আশা যে খাওয়ার কথাও মনে থাকত না!
নইয়ার সাহেবের সুরে আশার প্রিয় কোন কোন গান? অনেক অনেক জনপ্রিয় গান থাকলেও সাংবাদিকদের উত্তরে আশা বলেছেন ‘ঢাকে কে মলমল’ ছবিতে মধুবালার লিপে ‘যাদুগর সাঁওরিয়া,’ চাঁদ ওসমানির লিপে ‘মহব্বত জিন্দেগি হ্যায়’ ছবির ‘রাঁতো কি চোরি চোরি,’ আর ‘ইয়ে ও জাগে হ্যায়’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুরের কণ্ঠে ‘এ রাত ফির না আয়েগি!’
একের পর এক নইয়ারের সুরে আশার কন্ঠে বিখ্যাত সব গান। একটি গানের কথা না বলেই পারছি না, “ইয়ে রেশমি জুলফোঁকা অন্ধেরা!’ ১৯৬৫ সালে ‘মেরা সনম’ সিনেমায় মমতাজের লিপে গাওয়া আশার এই গানটি পঞ্চাশ বছর পরেও লোকের মুখে মুখে ফেরে!
অদ্ভুত বোঝাপড়া ছিল শিল্পী আর সুরকারের। গান গাইবার সময় আশা যদি সুরের একটু বৈচিত্র্য আনতেন যাকে বলে ইম্প্রোভাইসিং করা, তাতে নইয়ার সাহেবের চিন্তা ছিল না। পারিবারিক সঙ্গীতশিক্ষা, আশার সঙ্গীতচেতনা, বোধ, কণ্ঠের অপরূপ চলন আর সুর প্রয়োগের ক্ষমতার জন্য নইয়ার সাহেবের ভরসা হয়ে উঠেছিলেন আশা।
সব যুগেই শিল্পীরা হাঁটেন দড়ির ওপর দিয়ে – একটু ফসকালেই শেষ। সে যুগেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বাঘা বাঘা সঙ্গীত পরিচালক সে যুগের সবারই নিজস্ব সুরের ঢং, নিজস্ব স্টাইল – সেই নিয়মের বাইরে শিল্পীদের একটুও নড়াচড়ার উপায় নেই। সব নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে চলতে হবে। আশা নিজের স্মৃতিচারণে বলেছেন, “আমরা শিল্পীরা কিন্তু সবাই বাধ্য ছিলাম এবং প্রত্যেকেই প্রত্যেক সুরকারের আলাদা আলাদা স্টাইলে গান করা সাধ্যমতো মেনে চলার চেষ্টা করতাম!”
কিন্তু নইয়ার সাহেব ছিলেন একেবারে আলাদা জাতের তিনি মুখরা গানের প্রথম দুলাইন সুর করার পর আশাকে অন্তরার সুরটা হারমোনিয়ামে শুনিয়ে মজা করে বলতেন, “আচ্ছা গাও তো দেখি অন্তরাটা নিজের মতো করে!”
আশা বলেছেন, “This was real fun and a challenge. In my experiences the majority of music directors stopped singers from improvisation. But never Nayyarsaab.”
আশার এই স্বাধীনভাবে গান করার যে প্রবণতা তা কিন্তু অপমানিত হয়েছে অন্য সমসাময়িক অন্যান্য সঙ্গীত পরিচালকদের কাছে। লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল তো বলেই দিয়েছিলেন, “We don’t want you bringing the ‘OP harkat’ ( vocal movement) into an LP song; just cut it out!”
তবে নইয়ার যে স্বাধীনতা আশাকে দিয়েছিলেন তার জন্যই হয়তো আশা পরবর্তী কালেও বিভিন্ন রকম গানে নিজস্বতা ফুটিয়ে তুলে ছিলেন। একদিকে ‘পিয়া তু’ আর একদিকে ‘দিল চিজ হ্যায়’ বা ‘মেরা কুছ সামান’ এর মতো গান।
‘প্রাণ যায় পর বচন না যায়’ সিনেমার ‘চ্যান সে হাম কো কভি আপ নে জিনা না দিয়া!’ নইয়ারের সুরে এই গানটির জন্য ১৯৭৪ সালে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান আশা। এই গানটি তৈরি হবার সময় সঙ্গীত পরিচালক আর শিল্পী দুজনেই বুঝতে পারছিলেন এই শেষ যুগলবন্দি!
যে কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে অনেক রসায়ন থাকে – আর এই সব প্রতিভাবান মানুষের জীবনকে বিশ্লেষণ করা আমাদের মতো চুনোপুঁটির পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আশা সবসময় বলেছেন, “Say what you like, but he made me! What was I in front of Lata Mangeskar until Nayyarsaab took me in hand! He it was who rid me of my Lata phobia!’
তথ্যঋণঃ
1. Bharatan, Raju. Asha Bhosle, a musical journey. 2016. Hay House Publishers. New Delhi.
2. Sarma, Ramya. Asha Bhosle: A life in Music. 2025. Manjul Publishing House Pvt Ltd.
3. You Tube Videos.
.
