প্রতিবন্ধী সমাজ

ভোটদান, মিছিলে যোগদান – ব্রাত্য প্রতিবন্ধী সমাজ

২০১৬ সাল আরম্ভ হল “বাথরুম বিল” দিয়ে।[1] নর্থ ক্যারোলাইনা রাজ্যে বিলটি পাশ হয়ে আইনে পরিণত হল। এই রাজ্যেই আমি বাস করি। আইন চালু হবার সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের একাংশ রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ল। শুধু সমকামী ও রূপান্তরী সমাজ (LGBTQ) নয়, তাদের মিত্র ও শুভাকাঙ্খীরাও ক্রুদ্ধ। সবাই হঠাৎ রূপান্তরী নাগরিকদের সামাজিক অধিকার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

এই ক্রান্তিকালে আমি একটি রেস্ট্যুরেন্টে খেতে গিয়েছিলাম – বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে প্রায়ই যাই। সেদিন কিছু বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল, কিছু বিষয়ে জমাটি আলোচনা হল, খেয়ে, পান করে, সবাই যথেষ্ট আনন্দ করছিলাম। খাওয়াদাওয়ার পর আমার দরকার পড়ল বাথরুমে যাওয়ার। গোটা সন্ধে খাদ্য আর পানীয় পেটে চালান দেওয়ার পর সবারই এই প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আমার পক্ষে ব্যাপারটা সহজ হল না।

আমার হুইলচেয়ার গড়িয়ে বাথরুমের দিকে গিয়ে খেয়াল করলাম দরজায় তালা দেওয়া। চোখ তুলে দেখলাম বন্ধ দরজায় একটুকরো কাগজ সাঁটা – ‘আমাদের শৌচাগার লিঙ্গ নিরপেক্ষ।’ একজন অ-প্রতিবন্ধী আর সিস্‌জেন্ডার (যার জৈবিক লিঙ্গ ও লিঙ্গ সচেতনতায় পার্থক্য নেই) মানুষের পক্ষে বাথরুম ব্যবহার করা কোনও সমস্যা নয়। কিন্তু আমি সিস্‌জেন্ডার হলেও প্রতিবন্ধী। আর একটু বিশদ করে বলি, চোট লেগে আমার শিরদাঁড়া ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে নিজের মূত্রস্থলীর (ব্লাডার) ওপর আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি। আমাকে বাথরুম ব্যবহার করতেই হবে – এক্ষুনি!

চারদিকে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম প্রতিবন্ধীদের জন্যে বাথরুম ব্যবহারের সুব্যবস্থা আছে কিনা। কিছু দেখতে না পেয়ে, হুইলচেয়ার গড়িয়ে আবার ক্যাশিয়ারের কাছে ফিরে গেলাম।

“আপনাদের বাথরুমে প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের জন্যে ব্যবস্থা আছে কি?”

লোকটি আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন আমি কোনও অজানা ভাষায় কথা বলছি। আমি আবার প্রশ্ন করলাম। সেই সঙ্গে যোগ করলাম –

“প্রতিবন্ধীদের জন্যে আপনাদের বাথরুম সুগম (accessible) কিনা তা কিন্তু কোথাও লেখা নেই। একজন প্রতিবন্ধী হিসেবে বাথরুম ব্যবহারের অধিকার আমার অবশ্যই আছে। জানেন তো, প্রতিবন্ধীদের জন্যে বাথরুমে সুব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক।”

উত্তর দিতে না পেরে লোকটি আরও কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। বোঝাই যায় ব্যাপারটা ওর ভাবনার ধারেকাছেও কোনওদিন ঘেঁষেনি। শেষে না পেরে আমি বললাম –

“চাবিটা আমাকে দিন, ঘুরে এসে আপনাকে জানাচ্ছি ব্যবস্থা আছে কিনা।”

লোকটার হাত থেকে চাবি নিয়ে ফিরে গিয়ে বাথরুমের দরজা খুললাম। ভেতরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল – প্রতিবন্ধীদের জন্যে ব্যবস্থা রয়েছে। বাথরুমের কাজ সারতে সারতে মনে হল, ‘আমিও তো LGBTQ সমাজের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী। আমিও রূপান্তরী সমাজের স্বপক্ষে প্রতিবাদ মিছিলে গেছি। প্রশাসনকে জানিয়েছি রূপান্তরী সমাজের নিপীড়ন আমরা সহ্য করব না। যার যা ইচ্ছে, যে লিঙ্গের সঙ্গে যার মানসিক সংযোগ, যে লিঙ্গ যার পরিচয় চিহ্ন বহন করে, সেই বাথরুমই তাকে ব্যবহার করতে দিতে হবে। তাতে কার কী ক্ষতি!’

আমার বিশ্বাস রূপান্তরীদের এই ব্যক্তি-অধিকার সমর্থন করা আমাদের কর্তব্য। নইলে যে কোনও রূপান্তরী বাথরুম ব্যবহারের জন্যে নিগ্রহের শিকার হতে পারে। বস্তুত কেউ এমন কষ্ট পাক আমি চাই না। কিন্তু বাথরুম যদি প্রতিবন্ধীদের জন্যে তৈরি না হয়, বাথরুমে যদি তেমন সুব্যবস্থা না থাকে, খোলাখুলি নিগৃহীত না হলেও আমার জন্যে বাথরুম তো অগম্যই থেকে যাবে। শরীরের বর্জ্যপদার্থে নিজের জামাকাপড় নষ্ট হলে সমাজ কি তা ভালো চোখে দেখবে? তা বুঝি নিগ্রহ নয়?

একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় সমাজের প্রতি স্তরে বৈষম্য রয়েছে। সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ হয় মিটিং, মিছিল করে বা অন্য কোনও ভাবে। কিন্তু তখন কি কেউ চিন্তা করে এই প্রতিবাদের স্থানগুলি প্রতিবন্ধীদের জন্যে সুগম কিনা! যদি প্রতিবন্ধীরা সেই প্রতিবাদে অংশ নিতে চায়, তাদের জন্যে কেউ পথ সহজ করে দেয় না। তারা সেখানে যোগ দেয় নিজের দায়িত্বে।

২০১৬ সালে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল – ডনাল্ড ট্রাম্প দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনের সন্ধেয় আমার পূর্ণ শরীরের বন্ধুরা একজোট হয়েছিল। সবাই নারী, বিভিন্ন বর্ণের, এবং অনেকেই সমকামী আর রূপান্তরী সমাজের সদস্য। প্রত্যেকেই সেদিন শঙ্কিত – কার অধিকার কতটা খর্ব হবে তাই নিয়ে সকলেই দুশ্চিন্তায় মগ্ন। বাদামী ত্বকের প্রতিবন্ধী নারী, আমি, নিজেও অধিকার হারাবো বলে খুবই উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম। নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছিলাম আমাদের প্রতিবাদ আরও জোরদার করে তুলতে হবে – কী ভাবে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। একটি দেশের নাগরিক হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা আমাদের কর্তব্য!

আমি কিন্তু সেদিন চিন্তিত হয়েছিলাম দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যে। তারা  নিজেদের অধিকার কতটা হারাচ্ছে, তাদের কীভাবে সংগ্রাম করতে হবে, এইসব সাতপাঁচ ভাবছিলাম। আশ্চর্য, প্রতিবন্ধী হিসেবে আমার নিজের সামাজিক অধিকার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেদিন মাথায় আসেনি।

প্রথমেই মনে পড়েছিল মুসলমান গোষ্ঠীর কথা। ভারতের হিন্দু সমাজের উত্তরসূরি বলে আমার বহু বন্ধুই ভারতের মুসলমান সমাজের মানুষ। ভাবছিলাম তাদের কী হবে! সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ সালের পর দেশে মুসলমান বিদ্বেষ প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেছে। তাই ভয় হচ্ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের যেভাবে কাঁটাতারের বেষ্টনীতে আটকে রাখা হয়েছিল, মুসলমানদেরও যদি সেইভাবে বন্দি করা হয়! এই নতুন প্রশাসন যখন মুসলমানদের অবাধ আসাযাওয়া নিষিদ্ধ করল, প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামল রাস্তায় – দেখে স্বস্তি পেলাম।

আমি যে শহরে বাস করি, সেখানকার এয়ারপোর্টে অভিবাসীদের আনাগোনা সীমিত। কিন্তু আমার বহু বন্ধুবান্ধব, প্রতিবন্ধী এবং সবল শরীরের, এই ধরনের অভিবাসনের সাক্ষী। কিন্তু আমার প্রতিবন্ধী বন্ধুদের অভিযোগ, তারা অভিবাসী নিগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মিছিলের শরিক হতে পারেনি, কারণ কেউই তাদের মিছিলের অংশীদার হিসেবে আহ্বান জানায়নি, তাদের অংশগ্রহণ সহজ করেনি। তারা দুঃখ পেয়েছিল তাদের প্রতিবাদ কেউ উল্লেখযোগ্য এবং প্রয়োজনীয় মনে করেনি বলে। অর্থাৎ অন্যেরা ধরে নিয়েছিল প্রতিবন্ধীরা সমাজ বহির্ভূত।

২০১৬ সালে আমার ঠিক এই রকম অনুভূতি হয়েছিল যখন প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে নারীদের প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়েছিল। সেদিন অ্যাসভিলের ডাউনটাউনে জনতা উপচে পড়ছে। সেখানে যোগ দিতে আমার একটু ভয়ও করছিল। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় গাড়ি রাখব, কেমন করে অংশগ্রহণ করব। ডাউনটাউনে প্রতিবন্ধীদের জন্যে গাড়ির পার্কিং-স্পট এমনিতেই কম, তার ওপর এই ভিড়ে জায়গা পাব কি? অথচ মনের ভেতর থেকে ভীষণ তাগিদ অনুভব করছিলাম। শেষে ঝুঁকি নিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেলাম। ভাবছিলাম প্রতিবন্ধীদের জন্যে গাড়ি রাখার জায়গা না পেলে বাড়ি ফিরে আসব আর সমাজ মাধ্যমের ভিডিওতে সবকিছু দেখব।

সেদিন এক আধ পশলা বৃষ্টি হলেও আবহাওয়া মোটামুটি ভালোই ছিল। প্রতিবন্ধীদের জন্যে সংরক্ষিত একটা বিশেষ পার্কিং স্পট পেয়ে গেলাম ঠিকই, কিন্তু অ্যাসভিলের নগর পরিকল্পনার নকশা অনুযায়ী জায়গাটা আমার পক্ষে উপযুক্ত নয়। আমি হুইলচেয়ার ব্যবহার করি, আমার ভ্যান থেকে ওঠানামার জন্যে লিফট ব্যবহার করতে হয়।

নিজেকে লিফটে করে নামিয়ে দেখি গাড়ির লিফট আদ্ধেক ফুটপাথে নেমেছে আর অর্ধেক নেমেছে গাছ শুদ্ধু একটুকরো কাঁচা মাটিতে। জানি বৃষ্টিতে মাটি ভেজা বলে ফেরার সময় কাদায় আটকে যেতে পারি। যাকগে, এসব পরে ভাবব ঠিক করে এগিয়ে গেলাম। এই মিছিলের অংশীদার হতে আমি তখন মরিয়া। সবার সঙ্গে একত্রে দেশের প্রেসিডেন্টকে জানাতে চাই আমাদের নাগরিক অধিকার তিনি ক্রোক করতে পারেন না। শুধু প্রতিবন্ধীদের অধিকার নয়, সবার অধিকার। গাড়ির লিফট থেকে নেমে আমি মিছিলের দিকে এগিয়ে গেলাম।

সেখানে পৌঁছে আমি গভীরভাবে নিরাশ হলাম। দেখলাম কেউই আশা করেনি কোনও প্রতিবন্ধী সেই মিছিলে যোগ দেবে। কিন্তু তা কেন ভাবল? তার কারণ চিরাচরিত নিয়মে জগতের চোখে আমরা অদৃশ্য – আমাদের অস্ত্বিত্ব নেই।

মিছিল আরম্ভের আগে কোনও জায়গা পেলাম না যেখানে প্রতিবন্ধীরা মিলিত হতে পারে। মিছিলের অন্যান্য প্রতিবাদীরা খেয়ালও করল না আমি তাদের পাশেই আছি। যেন আমার অস্তিত্বই অলীক। যেন কেউ ভাবতেই পারে না একজন প্রতিবন্ধী অন্যান্যদের মতো চেঁচিয়ে, স্লোগান আউড়ে, বিক্ষোভ দেখাতে পারে।

প্রতিবন্ধীদের উপেক্ষা করার এই প্রবণতা সমাজের প্রতি স্তরে, এমনকি সক্রিয় সমাজকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর চারদিকে বেশ কিছু কর্মশালার আয়োজন করা হল যেখানে সাধারণ মানুষকে সমাজ-সংগঠন শেখানো হবে। জনসাধারণের জন্যে কর্মশালাগুলি তৈরি করেছিল লাতিনো (যাঁদের মাতৃভাষা স্প্যানিশ) সম্প্রদায়। প্রতিটি কর্মশালায় প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণের জন্যে কোনও ব্যবস্থাই করা হয়নি।

সংগঠকদের ফোন করে আমি জানতে চাইলাম কর্মশালায় যোগ দিতে পারি কিনা। উত্তর এল না। দ্বিতীয়বার ফোন করলাম – উত্তর নেই। তৃতীয়বার – একই অবস্থা। চতুর্থবার বেশ বিরক্তিভরে একটা মেসেজ রাখলাম।

“আপনাদের কর্মশালায় আমি যোগ দিতে চাই। আমি প্রতিবন্ধী, তাই জানতে চাই কর্মশালায় আমার মতো মানুষের অংশগ্রহণের সুবিধে আছে কিনা। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, প্রতিবন্ধীরা এদেশের সবচেয়ে বৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে আমরা খুবই উৎসাহী। প্রশ্নের উত্তর জানালে খুশি হব।”

চতুর্থবারের পর একজন পুরুষ কল করলেন। উত্তর দিতে দেরি হওয়ায় ক্ষমা চেয়ে জানালেন, উনি অত্যন্ত লজ্জিত, প্রতিবন্ধী অংশগ্রহণকারীদের কিসে সুবিধে হবে তা নিয়ে ওঁরা চিন্তাই করেননি।

আজকের পৃথিবীতে আমরা অনেকেই নিজেদের সামাজিক অধিকার হারাবার ভয়ে ভীত। আমাদের সবাইকে হাত ধরাধরি করেই বাঁচতে হবে। দুঃখের কথা যাঁরা প্রতিবন্ধী নন, তাঁরা প্রতিবন্ধীদের সুখ সুবিধের ব্যাপারে একেবারেই সচেতন নন। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন কিছু জটিল বা কঠিন নয়। আমাদের জিজ্ঞেস করলেই আমরা মুখফুটে তাঁদের সবকিছু বলতে পারি। আমার অনুরোধ, লিখিত ভাবে আমাদের জানান, ‘এই মিটিং/মিছিল/কর্মশালায় প্রতিবন্ধীরা স্বাগত!’ অথবা ‘এখানে প্রতিবন্ধীদের জন্যে সব ব্যবস্থা রয়েছে।’ না হলে গ্রাফিক-ছবি ব্যবহার করুন। আমরা চাই সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে।

জনসাধারণের জন্যে সংগঠিত একটি কর্মশালায় যোগ দিতে গিয়ে আমাকে যতটা কষ্ট করতে হল তাতে আমি খুবই বিরক্ত হয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম সবাইকে দলে টানতে গ্রাসরুট সংগঠনগুলিকে আরও কতটা সচেতন হতে হবে। অবশ্য এই কঠিন সময়ে বেশির ভাগ দল নিদারুণ অর্থনৈতিক অভাবে দিন কাটাচ্ছে, ফলে সবকিছু সংশোধন করতে হয়তো সম্ভব নয়। এই অনিচ্ছাকৃত অপারগতা মানতে পারি, কিন্তু যখন ইচ্ছে করে আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয় তা ক্ষমার্হ নয়। এই ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা সমাজের প্রতি স্তরেই রয়েছে।

যেমন, ২০১৬ সালে দেখা গেল প্রতিবন্ধীদের যাতে ভোট দিতে সুবিধে হয় সেই রকম বেশ কিছু মেশিন অকেজো অবস্থায় নির্বাচনস্থলের কোনায় পড়ে রয়েছে। সেগুলি ব্যবহার করা গেল না। একটি ঘটনায় দেখা গেল ভোটিং মেশিনের ওপর ফুলের মালা রাখা। অর্থাৎ মেশিনটার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। নেব্রাস্কায় ক্যাথি হোয়েল নামে এক ৬২ বছরের প্রতিবন্ধী মহিলা, যাঁর চোট মস্তিষ্কে এবং হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, বহু যুগ ধরে ভোট দিতে পারেননি। হয় ভোটযন্ত্রের দুর্ঘট, নির্বাচলস্থলের দূরত্ব, বা ক্যাথির জড়ানো উচ্চারণের জন্যে নির্বাচনকর্মীরা তাকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বারবার বঞ্চিত করেছে। সবার ধারণা ভোট দেওয়ার মত বিচারক্ষমতা ক্যাথির নেই। ১৮৯০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল অবধি কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের যে সাক্ষরতার পরীক্ষা দিয়ে ভোটের অধিকার দাবি করতে হত, ক্যাথি সেই সম্মানটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। একজন সাধারণ নির্বাচনকর্মী বিনা মূল্যায়নে দাবী করেছে ক্যাথি ভোট দিতে অক্ষম।

এমনই ভাবে প্রতি নির্বাচনে প্রায় তিন কোটি পঞ্চাশ লক্ষ প্রতিবন্ধী নাগরিক নিজের দেশের সরকারের কাছে তাদের কণ্ঠ বা দাবি পৌঁছে দিতে পারেন না। জনসাধারণ আশা করে না প্রতিবন্ধী সমাজ নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্যে লড়াই করবে।

রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই অবধি নেব্রাস্কা রাজ্যের প্রতিবন্ধী গোষ্ঠীর মধ্যে ৭০ শতাংশ ভোট দিতে পেরেছেন। বাকিরা ইচ্ছে থাকলেও পারেননি। দেশের মধ্যে নেব্রাস্কাই কিন্তু এ ব্যাপারে এগিয়ে রয়েছে। সেই তুলনায় নিউ ইয়র্কে প্রতিবন্ধীদের মধ্যে মাত্র ৪৮ শতাংশ কোনও না কোনও নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছেন। বাকিরা বঞ্চিত।

আজকের দিনে গণতন্ত্রের রূপ হল ভোট দিয়েই মনে করি আমাদের কাজ শেষ। আর যাঁরা মনে করেন গণতন্ত্র মানে নির্বাচনে অংশ না নেবার স্বাধীনতা, তাঁরা তো ভোটই দেন না। এ কখনই সত্যিকারের গণতন্ত্র নয়। ক্যাথি হোয়েলের ভোট দেবার অধিকার খর্ব হবার ব্যাপারে বলেছেন –

“[ভোট না দিতে দিলে] সরকারের সবচেয়ে উঁচু পদে গিয়ে চিৎকার করে আমার অধিকার দাবি করি।”

পরে নির্বাচিত সরকারের সহযোগিতায় ক্যাথি আরও বহু প্রতিবন্ধী নাগরিকের ভোটের অধিকার পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছেন। 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকের কাজ কখনওই ফুরোয় না। আমাদের প্রতিবাদ জানাতেই হবে, আবেদনপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে, অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে সোচ্চার হতে হবে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সবাই যেন গণতন্ত্রের বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে পারে, নিজেদের ভোট দেবার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।

২০২৫ সালে এসে সাধারণ মানুষের অধিকার-রক্ষার লড়াই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতদিন ধরে সংগ্রাম করে মানুষ যে অধিকার আদায় করেছে তা আজ ধ্বংসের পথে। চোখের সামনে দেখছি আজকের প্রশাসন ধনীদের বিত্তবৃদ্ধি করতে গিয়ে বিত্তহীনদের খাদ্য এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা উপেক্ষা করছে। সমাজে যাদের সরকারি সাহায্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তারাই আজ সবচেয়ে বেশি অসহায়।

এখনও সমাজ পরিবর্তনের প্রধান উপায় নির্বাচনে ভোট দেওয়া। তাই প্রতিবন্ধী সমাজের ভোটের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে আমার সংগঠন, DIYabled, অন্য একটি সংস্থা, 10 Minutes a Day-এর সঙ্গে একজোটে কাজ করছে। মানবিক অধিকার কেউ হাতে তুলে দেয় না, তা ছিনিয়ে আনতে হয়। আজকের প্রতিবন্ধী সমাজ আর ব্রাত্য থাকতে নারাজ।

———-

[1] ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা রাজ্যে ‘বাথরুম বিল’ নামে একটি আইন পাশ করা হয়েছিল। আইনটির মূল বক্তব্য জন্মের সময় শিশুর যে লিঙ্গ নির্ধারিত হয়েছিল সেই অনুযায়ী তাকে সর্বসাধারণের জন্যে তৈরি বাথরুম ব্যবহার করতে হবে এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধে গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ রূপান্তরী ব্যক্তিরা যে লিঙ্গ বাতিল করেছেন সেই লিঙ্গকেই স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবেন। ২০১৭ সালে আইনটি খারিজ হলেও তা নতুন রূপে আবার হাজির করা হয়েছে।

*ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

[মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনসাধারণের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পত্রিকা, ‘দ্য মাইটি’তে এই প্রবন্ধটি ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। অবসরের জন্যে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন শমীতা দাশ দাশগুপ্ত।]

প্রিয়া রায় একজন গ্রাসরুট সমাজকর্মী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে DIYabled নামে প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কীত একটি সংগঠন স্থাপন করেছেন। এই সংগঠনের লক্ষ্য জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ এবং ক্ষমতা নির্বিশেষে একজোটে প্রতিবন্ধী সমাজের বিশেষ বিশেষ সমস্যার সমাধান করা। তার মধ্যে প্রধান হল প্রতিটি রেস্ট্যুরেন্ট, ব্যবসায়, অফিস, এবং অন্যান্য স্থান প্রতিবন্ধীদের যাতায়তের জন্যে সুগম করে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *