স্বর্ণমন্দিরের পথে

স্বর্ণমন্দিরের পথে...

সোনার মন্দির! ঠিক ‘সোনার কেল্লা’ সিনেমায় মুকুল যেমন অবাক বিস্ময়ে বলেছিল, ‘সোনা-আ-র কেল্লা,’ আমারও ঠিক তেমনই স্বর্ণমন্দির দেখে মনে হল সোনা-আ-র মন্দির। এর টানেই ছুটে যাওয়া অমৃতসরে। ২০২০র এপ্রিলে যাবার সব ঠিক করে টিকিট, হোটেল বুকিং রেডি থাকা সত্ত্বেও কোভিডের চক্করে লকডাউনের জন্য আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশেষে আবার সুযোগ এল যদিও অসময়ে। ওইসময় ওদিকে প্রোগ্রাম করে না কেউ আমাদের মতো পাগল ছাড়া। অগাস্ট মাসে পরপর কদিন ছুটি পেলে হাজব্যান্ড হুজুগ তোলেন আর আমি তো আছিই হুজুগে বাঙালি। অতএব চলো। ‘কাঁধে নিয়ে লোটাকম্বল চলো লছমনঝোলা!’ মজা করে বললাম। সঙ্গে ছিল চারজন ইয়াংম্যান, আমাদের বল-ভরসা।  

পাঞ্জাব রাজ্যের অন্যতম প্রধান শহর অমৃতসর – বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। এর প্রধান আকর্ষণ স্বর্ণমন্দির বা হরমন্দির সাহেব। বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে এই মন্দির। এর বিশালত্ব, বৈভব দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে মোড়ানো থাকার কারণে এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। এটি শিখ ধর্মের একটি প্রধান আধ্যাত্মিক স্থান এবং ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। ১৫৭৭ সালে গুরু রামদাস দ্বারা নির্মিত একটি পুকুরের চারপাশে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরে ১৮৩০ সালে মহারাজা রঞ্জিত সিং সম্পূর্ণভাবে সোনা ও মার্বেল দিয়ে এটি পুনর্নির্মাণ করেন। মন্দিরটি তার অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য সারা বিশ্ব থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে অনেক শিখ পাণ্ডুলিপি রয়েছে যার মধ্যে সুখমণি সাহেবের বাণী রয়েছে। এই গুরুদ্বারটি সকল দিক থেকে উন্মুক্ত, যা বোঝায়, স্বর্ণমন্দির সকল ধরনের মানুষের জন্য উন্মুক্ত একটি উপাসনালয়। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে ভারতীয় উপমহাদেশের ৬৮টি তীর্থস্থান পরিদর্শনের সমান এই স্বর্ণমন্দির পরিদর্শন। এটি বিভিন্ন দেশের শিখদের ঐক্যবদ্ধ করার ভূমিকার জন্য পরিচিত। এটি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মত ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গেও জড়িত। গুরুদ্বার কমপ্লেক্সটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে মনোনীত হয়েছে। প্রতিদিন ১৫০,০০০এরও বেশি মানুষ উপাসনার জন্য মন্দিরে যান। এখানে লঙ্গরখানায় বৈষম্য ছাড়াই সকল দর্শনার্থীদের জন্য নিরামিষ খাবার সরবরাহ করা হয়। 

অমৃতসর যাবার মুখ্য উদ্দেশ্য স্বর্ণমন্দির দর্শন। হোটেলের কাছেই এই মন্দির। বেরিয়ে পড়ি মন্দিরের উদ্দেশে। জুতো খুলে জলে পা ডুবিয়ে ধুয়ে ভিতরে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। স্থির করলাম সন্ধেবেলায় যাব। মন্দির সারাদিন সারারাত খোলা। ভাবলাম রাতে ভিড় কম হবে, তাই চলে গেলাম কাছেই হাঁটা দূরত্বে জালিয়ানওয়ালাবাগে। এটি ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দুঃখজনক স্থান যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯১৯সালে বৃটিশ দ্বারা পরিচালিত নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয় এই জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে। সমবেত নিরস্ত্র, নিরীহ জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। আজ এখানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি সেই আত্মত্যাগের সাক্ষ্য হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভয়ানক, মর্মান্তিক, ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। দিল্লির হাকিম আজমল খান তাঁর ‘মসিহ-উল-মূলক’ উপাধি ও ‘কাইসার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক ব্রিটিশ সরকারকে ফেরত দেন। এই কসাইখানার গণহত্যার চিহ্ন আজও বিদ্যমান। ভিতরে প্রবেশ করলে বুকের ভেতর থেকে কান্না ঠেলে আসে। কত নিরীহ, নিরস্ত্র, অসামরিক মানুষকে নির্বিচারে অকারণে মৃত্যুবরণ করে নিতে হয়েছিল। দেওয়ালে দেওয়ালে গুলির চিহ্ন আজও বিদ্যমান। বেশিরভাগ মানুষ বুলেট থেকে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আর তাই দেওয়াল ভেদ করে গুলি ছোঁড়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল সেনারা। ভাবলেই গা শিউরে ওঠে প্রায় ২০০০এর মত মানুষ হতাহত হয় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে। আর এতে খরচ হয়েছিল ১৬৫০ রাউন্ড গুলি। নিরীহ মানুষের রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিল সেই প্রাঙ্গণ। কী নিষ্ঠুর, কী বীভৎস এই হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত নগ্ন রূপের প্রকাশ পায়। গোটা বিশ্ব শিহরিত হয়ে পড়ে। দেশে বিদেশে সর্বত্র সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেখানে থাকাকালীন প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলার সময় মনে হয়েছে আহা, কত নিরীহ মানুষের রক্তে স্নাত এই প্রাঙ্গণ! সেই সময় সেই ১৯১৯ সালে শিখরা বৈশাখী উৎসব উদযাপনের জন্য স্বর্ণমন্দিরে সমবেত হয়েছিলেন। মন্দির পরিদর্শনের পর, অনেকেই রাওলাট আইন ও অন্যান্য নীতির প্রতিবাদকারী বক্তাদের কথা শোনার জন্য পাশের জালিয়ানওয়ালাবাগে চলে যান। ফলে বিশাল জনসমাগম হয়েছিল সেখানে। 

অগাস্ট মাস, বাইরে প্রচণ্ড রোদ ও গরম। আমরা ভোরবেলায় উঠে বেরিয়েছি, পৌঁছেছি বেলা ১১টা। গিয়ে পর্যন্ত ঘুরছি। গরমে, রোদে ঘেমে ক্লান্ত সবাই। কাছেই হোটেল, হাঁটাপথ। তবু একটু ফ্রেশ হবার জন্য সামনেই লস্যির দোকান দেখে লস্যি খেলাম সকলে। হঠাৎ নজরে পড়ল এক জীর্ণ পথকুকুর বোধহয় অভুক্ত অবস্থায় পথে পড়ে আছে। ঐ গরমে, না খাদ্য না পানীয়। একগ্লাস লস্যি কিনে ওর মুখের সামনে ধরলাম। তার তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া দেখে মনটা ভরে গেল। বসে বসেই খাচ্ছিল। শেষে লস্যি যখন গ্লাসের নীচের দিকে চলে গেল, খেতে পারছিল না। আমি গ্লাসটা কাত করে দিতে সে চেটেপুটে খেল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। জানি ওই একদিনে ওর কী-ই বা হবে, তবু একদিনই বাঁচুক। যাইহোক হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সারলাম ওখানকার বিখ্যাত অমৃতসরি ফিস সহযোগে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরোলাম নিকটবর্তী হল বাজারে, অমৃতসরের প্রাচীন বাজারে। এখানে বিখ্যাত ফুলকারি এমব্রয়ডারি, অমৃতসরি জুত্তি, গহনা, শুকনো ফল ইত্যাদি পাওয়া যায়। এর প্রবেশ পথে গান্ধি গেট আছে। আমরা গেলাম ফুলকারি কাজের জিনিস কিনতে। প্রচুর সুট, দোপাট্টা কেনা হয়ে গেল, বেশিরভাগই দেবার জন্য। অনেকটা সময় ওখানেই কেটে গেল। গেলাম পার্টিশন মিউজিয়াম। ঘুরে দেখলাম। মন খারাপ লাগে। হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ রেস্ট করে আমরা বেরোলাম গোবিন্দগড় দুর্গের পথে। দুর্গটি অমৃতসর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক সামরিক দুর্গ। এটি কিছুদিন আগে পর্যন্তও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে ছিল। ২০১৭ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মহারাজা রণজিৎ সিং, দশম গুরু, গুরু গোবিন্দ সিং-এর নামে এর নামকরণ করেন। আগে এটি ভাঙ্গিয়ান দা কিল্লা নামে পরিচিত ছিল। এটি সম্পূর্ণ ইঁট ও চুন দিয়ে নির্মিত। দুর্গটির প্রাচীরের উপর ২৫টি কামান বসানো ছিল এবং এটি ১৮০৫ সাল পর্যন্ত ভাঙ্গি শাসকদের অধীনে ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দখলে ছিল। ১৮০৫ সালে মহারাজা রণজিৎ সিং দুর্গটিকে আরও শক্তিশালী করেন। অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ব্যবহারকারী আক্রমণকারীদের হাত থেকে হরমিন্দর সাহেব এবং শহরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই দুর্গটি নির্মাণ করা হয়। কারণ আক্রমণকারীরা সাধারণত লুটপাটের উদ্দেশ্যেই শহরে হামলা চালাত। কথিত আছে, মহারাজা রণজিৎ সিং যে তোশাখানায় তাঁর ধনসম্পদ রাখতেন সেখানে বিখ্যাত কোহিনূর হিরা ও ভিতরে থাকা ২০০০ সৈন্যর জন্য রসদ মজুত ছিল। ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা দুর্গটি দখল করে। 

মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি শো, শের-এ-পাঞ্জাব, এখানে পরিদর্শিত হয়। এর জন্য আগে থেকে টিকিট কেটে রাখতে হয়। শো দেখার জন্য বিশেষ চশমা দেওয়া হয়। শো দেখে বেরিয়ে রাতের অন্ধকারে যেটুকু দেখা সম্ভব দেখে আমরা গেলাম একটা খোলা জায়গায় যেখানে স্থানীয় মহিলারা একসঙ্গে নাচ করলেন। তাঁরা পাঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য ও গান পরিবেশন করলেন। দর্শকদের জন্য চেয়ার পাতা ছিল কিন্তু অসহ্য গরমে বসে থাকা যাচ্ছিল না। বড় বড় ফ্যান, কুলার চালিয়ে দেওয়া হল। সেখানে দর্শকদের মধ্যে থেকে কেউ ইচ্ছে হলে সামনের স্টেজে উঠে তাদের সঙ্গে নাচতে পারে। অতিরিক্ত গরমে সবটা বসে দেখতে পারিনি। বেরিয়ে এলাম। আরেকবার স্বর্ণমন্দিরে গেলাম কিন্তু তখনও খুব ভিড়, শরীরও ক্লান্ত তাই পরদিন ভোরে যাব স্থির করে ফিরে এলাম। এরপর বাইরের একটা রেস্টুরেন্টে অমৃতসরের খাবারের স্বাদ নেবার জন্য গিয়ে হাজির হলাম। রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম, পরদিন যত তাড়াতাড়ি স্বর্ণমন্দিরের লাইনে গিয়ে দাঁড়ানো যায়। সকালে উঠে স্নান সেরে যেতে সেই ৭টা বেজে গেল। বিশাল লাইন। ঘুরে ঘুরে স্পাইরাল লাইনের মধ্যে দিয়ে লোক চলছে। যেন এগোচ্ছেই না। কিছুটা এগোতে শেডের নীচে ঢুকতে পারলাম। সেখানে অন্ততঃ পাখা আছে, গরমের হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই। একটা খুব সুন্দর সুব্যবস্থা রয়েছে দেখলাম ওখানে। সমানে ছোট ছোট স্টিলের গ্লাসে জল ভরে ট্রে করে নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ম্যানেজমেন্টের লোকেরা। যার তেষ্টা পাচ্ছে সে-ই খাচ্ছে। ওই ভিড়ে, গরমে জল তেষ্টা তো অহরহ পাচ্ছে। তা সে লাইন ঘুরছে তো ঘুরছে। মনে হচ্ছে এইবার বোধহয় ভেতরে ঢুকবো। কাকস্য পরিবেদনা। দীর্ঘক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেখানেও ওইরকম লাইন। অবশেষে পৌঁছলাম অমৃত সরোবরের ওপর তৈরি ব্রিজের লাইনে। যেটা থেকে গন্তব্যে পৌঁছনো যাবে অর্থাৎ স্বর্ণমন্দিরে। গর্ভগৃহটি সোনার পাত দিয়ে মোড়া। এটি সকল স্তরের সকল ধর্মের মানুষের জন্য একটি উন্মুক্ত উপাসনালয়। গর্ভগৃহটি দুইতলা বিশিষ্ট এবং এর উপরে একটি সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো গম্বুজ রয়েছে। গর্ভগৃহে প্রবেশ দ্বারটিকে দর্শনী দেউড়ি বলা হয়। গর্ভগৃহে বর্গাকার একটি মার্বেলের বেদি আছে। সেটি পুকুরের ভিতর অবস্থিত। শিখ ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেব প্রতিদিন প্রায় ২০ঘণ্টা নীচের বর্গাকার তলায় অধিষ্ঠিত থাকেন এবং ৪ ঘণ্টার জন্য এটিকে পালকিতে করে আকাল তখতের ভিতরে তার শয়নকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। গর্ভগৃহের উপরের তলাটি একটি সিঁড়ি দ্বারা যুক্ত। দরজাগুলি পাখি ও ফুলের মতো প্রকৃতির মোটিফসহ সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো তামার পাত। উপরের তলার ছাদ রত্ন দিয়ে সজ্জিত। দ্বিতীয় তলে শিশমহল নামে একটি মণ্ডপ অবস্থিত। গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া পথের প্রস্থান পথে প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা আছে। 

মন্দির চত্বরটি প্রাচীর ঘেরা দোতলা প্রাঙ্গণ, যার চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। স্বর্ণমন্দিরে প্রতিদিন বেশ কিছু শিখ আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। এই অনুষ্ঠানে ধর্মগ্রন্থকে একজন জীবিত ব্যক্তি, একজন গুরু হিসাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এটিকে একটি বিছানায় রাখা হয়। সেখানে প্রসাদ নিয়ে আমরা ফিরে আসি হোটেলে। হেভি ব্রেকফাস্ট করে আমরা চললাম দুর্গিয়ানা মন্দির দর্শনে।

এটি একটি বিখ্যাত হিন্দু মন্দির। এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গামাতা। এটি স্বর্ণমন্দিরের আদলে তৈরি  একটি পবিত্র সরোবরের মাঝখানে অবস্থিত। এর দরজাগুলি রুপোর তৈরি ও কারুকার্যময়। তাই একে ‘সিলভার টেম্পল’ বা রৌপ্যমন্দিরও বলা হয়। দেবী দুর্গা ছাড়াও এখানে লক্ষ্মীনারায়ণ এবং রাধাকৃষ্ণের মূর্তিও পূজিত হয়। এটি লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির বা শীতলা মন্দির নামেও পরিচিত। এখানে শিবঠাকুর ও হনুমানের মন্দিরও আছে। গেটের ভেতর ঢুকে দেখি সামনেই যে নকল ঝর্ণা তাতে জল নেই, শুকনো খটখটে, মাঝে ছিটেফোঁটা ময়লা জল পড়ে আছে। একটা কুকুর সেখানে ঢুকে জল খেতে যাচ্ছে কিন্তু পারছে না। আমাদের হাতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল ছিল, আমরা ওর মুখের সামনে তা থেকে জল ঢালতে লাগলাম। বোকা কুকুর, বুঝতে পারল না, ভয় পেয়ে পালিয়ে  গেল। আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল। বাইরে তখন প্রচণ্ড গরম, একটু জলের জন্য অবলা জীবটা কষ্ট পাচ্ছে অথচ তাকে খাওয়াতে পারলাম না। কয়েকবার চেষ্টা করলাম আমি আর মেয়ে মিলে। শেষে বিফল হয়ে এগোলাম। আমাদের সফরসঙ্গীদের মধ্যে  দুজন মুসলিম ছিলেন। তাঁরা মন্দিরে ঢুকবেন না, তাই বাকি দুজনও ঢুকলেন না। আমরা আমাদের জুতো ওঁদের কাছে খুলে রেখে মন্দিরের দিকে এগোলাম। সরোবরের মাঝে সেতুর ওপর দিয়ে মন্দিরে পৌঁছলাম। মন্দিরের গম্বুজটি সোনালি। মন্দির দর্শন করে প্রদক্ষিণ করে আমরা বেরিয়ে এলাম। জানলাম ওখানে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এটি হিন্দুদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। মন্দিরের প্রাঙ্গণে একটা গাছ আছে। কথিত আছে লব ও কুশ অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াকে ও হনুমানকে বন্দি করে ওই গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। যদিও অমৃতসরকে পবিত্র শহর হিসাবে গণ্য করা হয়নি, তবুও এই মন্দির এবং স্বর্ণমন্দিরের আশপাশের ২০০মিটারের মধ্যে তামাক, মদ ও মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছাড়াও দুর্গিয়ানা মন্দির তার জনহিতকর কার্যকলাপ ও সমাজসেবার জন্যও সুপরিচিত। ফিরলাম হোটেলে। 

বিকালে আবার ওয়াঘা বর্ডার। আমাদের সঙ্গীদের একজনের কাকার ছেলে ওখানে থাকে এবং সে অল্পবয়সেই বেশ একটা পরিচিতি তৈরি করে ফেলেছে। সে আমাদের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করে দিল যাতে আমরা সামনে বসে দেখতে পাই। একেবারে ভিআইপি সিট। সময়মত বেরিয়ে পড়লাম ওয়াঘা বর্ডারের উদ্দেশ্যে। ওয়াঘা সীমান্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবস্থিত একটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পারাপার যা পাঞ্জাবের অমৃতসর ও পাকিস্তানের লাহোরের মাঝে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে অবস্থিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত ‘বিটিং দ্য রিট্রিট’ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের জন্য সুপরিচিত। ভারত অংশে আত্তারি গ্রাম ও পাকিস্তান অংশে ওয়াঘা গ্রাম দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করে। শহর থেকে প্রায় ২৯-৩০ কিমি দূরত্বে অবস্থিত এই সীমান্ত। ওয়াঘা ভারত বিভাজনে, ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত রেখা র‍্যাডক্লিফ লাইনের নিকট একটি গ্রাম। ‘বিটিং দ্য রিট্রিট’ অনুষ্ঠানটি সূর্যাস্তের দু’ঘন্টা পূর্বে প্রতিদিন সীমান্ত গেটে অনুষ্ঠিত হয়। পতাকা অনুষ্ঠানটি ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) ও পাকিস্তানের রেঞ্জার্স(পিআর) দ্বারা পরিচালিত হয়। আমরা অনুষ্ঠান শুরুর বেশ খানিকটা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। নিজেদের সুবিধা মতো জায়গা বাছাই করে বসলাম। আমরা মোট সাতজন ছিলাম। সূর্য তখন পশ্চিম গগনে। খোলা আকাশের নীচে। একফোঁটা হাওয়া নেই। প্রচণ্ড গরম। অনুষ্ঠান দেখার আগ্রহে সব সহ্য করছি। মাঝে মাঝে হকারদের কাছ থেকে এটা-ওটা খাবার জিনিস কিনে খাচ্ছি সবাই মিলে। গ্যালারি ভর্তি হয়ে উঠছে ক্রমে। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই গ্যালারি পুরো ভরে গেল। ওদিকে পাকিস্তানের গ্যালারিতেও মানুষজন থাকলেও ইন্ডিয়ার মতো অত নয়, প্রচুর ফাঁকা ছিল। এই অনুষ্ঠানটি একটি প্রতিদিনের সামরিক প্যারেড। শেষ হয় সূর্যাস্তের আগে ভারত ও পাকিস্তানের পতাকা নামানোর মাধ্যমে। ১৯৫৯ সাল থেকে যৌথভাবে পালিত হয় এই অনুষ্ঠান বিএসএফ ও পাক রেঞ্জার্স বাহিনীর সুশৃঙ্খল প্যারেড, ড্রিল ও কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের মাধ্যমে। এটি দেশপ্রেম ও সামরিক ঐতিহ্যের প্রতীক, যা প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক দেখেন। এই প্রতিদিনের সামরিক অনুশীলন দেশপ্রেম এবং সৌহার্দ্যের এক প্রদর্শনী। দেশাত্মবোধক গান ও শ্লোগানে মুখরিত এক সুন্দর পরিবেশ। 

প্রথমে জওয়ানরা নেমে বন্দেমাতরম ধ্বনি তুললেন। মহিলাদের ডেকে সমবেত নৃত্যে অংশ নিতে বলা হলে অনেক মহিলা নেমে এলেন নিজেদের আসন ছেড়ে। ওদিকে সীমান্তর ওপরে পাকিস্তানিরাও শুরু করলেন কুচকাওয়াজ। ওঁদের পরনে কালো পোশাক, মাথায় কালো-সাদা উষ্ণীষ। আমাদের দেশের জওয়ানদের মাথায় পতাকার রঙের উষ্ণীষ। সীমান্ত রক্ষীদের উচ্চস্বরে চিৎকারের মাধ্যমে উভয় পক্ষের যুদ্ধের ডাক দিয়ে শুরু হয়। এই অনুষ্ঠানটি দুইদেশের মধ্যেকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার প্রতীক। নানারকম কসরত দেখাতে লাগলেন ভারতের জওয়ানরা। ঠিক তেমনই ওদিকে পাকিস্তানের জওয়ানরা। করতালিতে ফেটে পড়ছিল গ্যালারি। কী অবলীলায় জওয়ানরা তাদের পা মাথা পর্যন্ত তুলে ফেলছিলেন দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। জওয়ানদের কসরত দেখানোর পর এল প্রশিক্ষিত কুকুর। তারাও যে কতরকম কসরত দেখাতে লাগল! কোথায় কাকে নমস্কার জানাতে হবে, বসে পড়ে নমস্কার জানাল। স্ক্রিন টাঙিয়ে দিলে তাই বেয়ে উঠে পড়ল। কুকুরগুলোর যেমন সুন্দর টানটান চেহারা, তেমনই ওয়েল ট্রেইনড। খুবই মনোগ্রাহী ছিল অনুষ্ঠান। অগাস্ট মাসের গরম তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল এই অনুষ্ঠান দেখে। দু-দেশের জওয়ানরা দু’দিকে কসরত দেখাচ্ছিলেন কিন্তু গেটের ওপারে হওয়ায় আমরা ওঁদেরগুলো বিশেষ দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাছাড়া এদিকের অনুষ্ঠান থেকেও চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। চারদিকে বড় বড় স্ক্রিনে অনুষ্ঠান দেখানোর ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু আমরা একদম সামনে থেকে দেখছিলাম বলে আর স্ক্রিনের দিকে তাকাইনি। চারিদিকে পতাকা উড়ছিল। সূর্যাস্ত হলে সমস্ত পতাকা নামিয়ে নেওয়া হয়। দুইদেশের সীমান্তের লোহার গেট খোলা হয় এবং দুটি পতাকা একই সঙ্গে নামানো হয় ক্রস করে। পতাকাগুলো ভাঁজ করা হয় এবং উভয়পক্ষের সৈন্যদের মধ্যে করমর্দনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। এরপর গেটগুলি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম আনারুলের বাড়ি যে আমাদের ওয়াঘা সীমান্তে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার বাড়িতে ডিনারে নিমন্ত্রণ। গিয়ে দেখি সে এলাহি আয়োজন করে রেখেছে। দু-মাসের ছোট বাচ্চা নিয়ে তার স্ত্রী কিছুই করতে পারেনি। সব রান্না সে নিজের হাতে করেছে। কতরকম যে পদ বলার নয়। তার মধ্যে একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোমাদের এখানে ইলিশ পাওয়া যায়?” এতটাই আন্তরিক সে, ওই অগাস্ট মাসে ইলিশমাছ জোগাড় করে আমাদের ভেজে দিয়েছিল। আর কী অসাধারণ বিরিয়ানি যে রান্না করেছিল তা বলার নয়। আমি বিভিন্ন জায়গায় অনেক বড় বড় রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খেয়েছি কিন্তু এ যেন সবার থেকে উৎকৃষ্ট। বেড়াতে বেরিয়ে দুদিনের পরিচয়ে এত আন্তরিকতা পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। এ যেন প্রাপ্তি আমার। পৃথিবীর কোন প্রান্তে যে কে ডালা সাজিয়ে বসে আছে, তা আমার জানা নেই। তবে এটা একটা ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। আশা রাখি আরও কেউ কোথাও ঠিকই আছে আমার জন্য এমন আন্তরিকতায় আচ্ছন্ন করে তোলার জন্য। 

———-

ছবিঃ লেখক 

মানসী গাঙ্গুলী গৃহবধূ, শিক্ষাগত যোগ্যতায় ল'ইয়ার। লেখালেখির শুরু যখন ক্লাস থ্রি। সেসময় ইন্টারস্কুল কম্পিটিশনে গল্প লিখে পুরস্কার পেয়েছিলেন। বর্তমানে বেশ কিছু পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত। লেখিকার সাতটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে এ পর্যন্ত।  এছাড়াও বিভিন্ন গল্প সংকলনে তাঁর লেখা গল্প প্রকাশিত হয়েছে। 'ও কলকাতা' আয়োজিত লকডাউনের ওপর গল্প প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন, বাংলাদেশে আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও কমার্শিয়াল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা গত কয়েকবছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *