ভারতীয় টেস্ট-ক্রিকেটে সাম্প্রতিক কোচিং
‘অবসর’ শীত সংখ্যার পরিকল্পিত সূচি অনুযায়ী এই লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার দিনই শুরু হবে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ। দশ বছর আগে এরকমই এক অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে ভারতের কোচ হয়ে গিয়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। শুধু সেবার নয়, ২০১৮র বিশ্বকাপ জয়ী দলের কোচও ছিলেন তিনি। সেই সময়ে কারা খেলেছেন তাঁর কোচিংয়ে? ঈশান কিষাণ, ঋষভ পন্থ, খলিল আহমেদ, আবেশ খান, ওয়াশিংটন সুন্দর, সরফরাজ খান, পৃথ্বী শ, শুভমান গিল, রিয়ান পরাগ, অভিষেক শর্মা, অর্শদীপ সিং-রা। এরপর যখন ভারতীয় সিনিয়র দলের কোচ হয়ে এলেন, বিভিন্ন সময়ে এদের অনেককেই পেলেন দলের সদস্য হিসেবে।
ভারতীয় ক্রিকেটে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ দ্রাবিড় বা দ্রাবিড়ের নিয়োগকর্তারা। সম্ভবত প্রথমবার ভারতীয় ক্রিকেটে এমন একজনকে সিনিয়র দলের কোচ করা হয়েছিল যিনি তার আগে প্রায় পাঁচ বছর ধরে একটা সিস্টেমের মধ্যে ছিলেন। কখনও অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ, কখনও ভারতীয় এ দলের কোচ তো কখনও জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির প্রধান। ফলে উঠতি এবং ভারতীয় দলের সমসাময়িক খেলোয়াড়দের সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা তার ছিল। আর সেই ধারণাটা টিভিতে বা গ্যালারিতে বসে তাদের খেলা দেখে তৈরী হওয়া ধারণা নয়, একদম কাছ থেকে, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে তৈরী হওয়া ধারণা। অনূর্ধ্ব ১৯ থেকে শুরু করে এনসিএ- গিল, সরফরাজ থেকে শুরু করে বিরাট, রোহিত – প্রত্যেককে নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সিনিয়র দলের কোচ হওয়ার আগেই, প্রত্যেকের খুঁটিনাটি, শক্তি-দুর্বলতা, – তা সে টেকনিক সংক্রান্তই হোক বা মানসিকতা সংক্রান্তই হোক, নিখুঁতভাবে উঠে এসেছিল তাঁর নিজস্ব ডেটাবেসে।
অনেকটা একইরকম ছবিটা আমরা দেখতে পেয়েছিলাম বাংলা ক্রিকেটেও। সৌরাশিস লাহিড়ীর মতো সদ্য প্রাক্তন ক্রিকেটারদের জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ভিশন ২০২০-এর সঙ্গে প্রায় ১২ বছর আগে। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে তিনি বাংলা অনূর্ধ্ব -২৩ দলের দায়িত্ব সামলে এখন রয়েছেন বাংলা সিনিয়র দলের সঙ্গে।
যেহেতু অন্তত সাদা বলের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রাহুল দ্রাবিড় ভারতের সেরা দেশীয় কোচ, ফলে প্রাথমিকভাবে এটা মনে করা যেতেই পারে যে এই পদ্ধতিটা সঠিক ছিল যদিও এই পদ্ধতিটাকেই যে ফলো করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা কোথাও নেই। তবে যেটা অনস্বীকার্য সেটা হলো, সিনিয়র জাতীয় দলের কোচ হওয়ার আগের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা কোচ দ্রাবিড়কে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।
ঠিক এমনই একটা প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সিনিয়র দলের কোচ হয়ে এলেন গৌতম গম্ভীর। বলতে কোন দ্বিধা নেই, এই পদটি তিনি যতটা তাঁর কোচিং দক্ষতার কারণে পেলেন তার থেকে অনেক বেশি করে পেলেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। এর আগে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে প্রশাসনিক পদে কেউ বসছেন শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার কারণে কিন্তু তা বলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ে একেবারে সরাসরি কোচের আসনে?
নাঃ, মনে পড়ছে না। যাইহোক, এর ফলে প্রধানত যেটা হলো সেটা হচ্ছে এই যে একটা সিস্টেম, যার মধ্যে দিয়ে কোচ হিসেবে দ্রাবিড় উঠে এলেন এবং যেটা তাকে এতটা সাহায্য করলো কোচিং কেরিয়ারে, সেগুলোকে আরব সাগরে ছুঁড়ে ফেলা গেল। সলিল সমাধি ঘটলো একটা ভালো প্রচেষ্টার।
এই অবধি পড়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে তাহলে কি গম্ভীর কোচ হিসেবে একেবারেই অযোগ্য? আর তাই যদি হয়, সেক্ষেত্রে তিনি কেকেআর-কে কিভাবে আইপিএল শিরোপা এনে দিলেন? এলএসজি (LSG – Lucknow Super Giant) কিভাবে তাঁর সময়ে একাধিকবার প্লে অফে পৌঁছলো?
কোচ দ্রাবিড়ের জামানা বা তার ঠিক আগের সময়ের ভারতীয় ক্রিকেটটা যদি দেখা যায়, তবে দেখা যাবে সেই সময়ে টেস্টে ভারতের হয়ে যে দলটা খেলতো তার নিউক্লিয়াসটাই সাদা বলেও খেলতো। ফলে বেসিক স্কিল লেভেলটা অনেকটা উঁচু ছিল। ২০২৩ একদিনের বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলা মূল দলটার মধ্যে সূর্যকুমার যাদব এবং কিছুটা শ্রেয়স আইয়ার, কুলদীপ বাদে সবাই তৎকালীন টেস্ট দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। এমনকি এর আগে ২০২৩ এর শুরুতে বাংলা দেশে গিয়ে টেস্ট সিরিজে কুলদীপ এবং শ্রেয়স রীতিমতো ভাল খেলেছিলেন এবং সিরিজ জয়ে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন।
২০২৪এর টি-২০ বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন দলটার ফাইনালে খেলা এগারো জনের মধ্যে ছয়জন নিয়মিত টেস্ট খেলোয়াড় এবং তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনকে ক্রিকেট দুনিয়া মনে রাখবে টেস্ট ক্রিকেটে তাদের অবদানের জন্য। অর্থাৎ সেই খেলোয়াড়দের নিয়েই টি২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম যারা আগে টেস্ট ক্রিকেটার, পরে টি২০ ক্রিকেটার।
আজকের টি২০ যুগে লাল বল এবং সাদা বলের ক্রিকেটের মূল পার্থক্যটা হলো একটা বেসিক স্কিল নির্ভর ফরম্যাট আর একটা ট্যাকটিক্যাল মুভ নির্ভর। একজন অভিজ্ঞ কোচ বারবার বলেছেন খেলাটা যত ছোট হবে, স্কিলের প্রাধান্য তত কমবে। আর ওইখানেই বৃদ্ধি পেতে থাকবে ট্যাকটিক্যাল লড়াই। আপাতভাবে মনে হয় এই জায়গাটায় গম্ভীর খুব শক্তিশালী। তিনি চান ফুটবলের মতো ক্রিকেটেও কোচ বা ম্যানেজার মাঠের বাইরে বসে খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে কিন্তু ক্রিকেটের বড় ফরম্যাটে এটা খুব একটা চলে না। এমনকি ফুটবলেও মাঠে এটা প্রতিভাবান ফুটবলারদের সঙ্গে চলেনা। ভাবতে পারেন কোচ বাইরে থেকে মেসি বা রোনাল্ডোকে বলে দিচ্ছেন যে কীভাবে ফ্রিকিক মারতে হবে বা পেনাল্টি বক্সে কখন কাকে বল পাস করতে হবে? এটা একেবারেই খেলোয়াড়দের নিজস্ব তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত যার গুণগত মানের ওপর দলের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে।
তবুও এটা ঠিক যে ম্যাচআপ, কম্বিনেশন, রণনীতি ইত্যাদি দিয়ে টি২০ ম্যাচ তবু হয়তো জেতা যায়, টেস্ট ম্যাচ নয়। সেখানে প্রয়োজন হয় দক্ষতর খেলোয়াড়ের এবং কোচ-অধিনায়কের গেমসেন্স-এর। এই সেদিনকেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজের একটা ম্যাচে দেখছিলাম কুলদীপ যাদব একটা ইনিংসে ২৮ওভার বল করেছেন ৭টা স্পেলে, পাঁচ ওভারের বেশি কোন স্পেল নেই। অথচ টেস্ট ক্রিকেটের প্রাথমিক শিক্ষা বলে স্পিনারদের দিয়ে লম্বা স্পেলে বল করাতে বা স্পিনাররাও সেটা পছন্দ করেন। একজন ব্যাটারকে সেট করে আউট করতে হলে লম্বা স্পেলে বল করতে হয়। ওয়ার্ন, কুম্বলে, মুরলি, হরভজন, অশ্বিনরা ম্যাচের পর ম্যাচ এটাই করে এসেছেন। এই ফরম্যাটে একজন সেরা ব্যাটারের বিরুদ্ধে সেরা স্পিনারের লড়াইটা হচ্ছে অনেকটা দাবা বোর্ডের লড়াইয়ের মতো, ধৈর্য এবং বুদ্ধি এখানে মূলধন। একটা অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলে দুই পক্ষের মধ্যে। প্রস্তুত থাকতে হয় লম্বা লড়াইয়ের জন্য। সেখানে যখন দলের সেরা স্পিনারকে দিয়ে চার/পাঁচ ওভারের বেশি স্পেল করানো হচ্ছে না, তখন তাঁর কার্যকারিতা কমতে বাধ্য, আঘাত হানে বোলারের আত্মবিশ্বাসে আর এটাই টি২০ মানসিকতা। সবকিছু তাৎক্ষণিক চাই। ফলাফল আমাদের সামনে, ২০১৪ সালের পর প্রথমবার আইসিসির টেস্ট ক্ৰমতালিকায় প্রথম তিনের বাইরে টিম ইন্ডিয়া।
অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে মনে আছে? তিনি ঠিক যে স্ট্র্যাটেজিতে সাদা বলে অধিনায়কত্ব করতেন অনেকটা সেই একইভাবে গম্ভীর চাইছেন লাল বলে কোচিং করাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লাল বল আর সাদা বলের ক্রিকেটে জেতার শর্ত ভিন্ন। একটায় যেখানে বেশি রানের ভিত্তিতে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয় আর একটায় বিপক্ষের ২০টি উইকেট তুলতে হয় ম্যাচ জিততে গেলে। আর তাই ব্যাটার বোঝাই দল বা মাল্টিস্কিল্ড, কাজচালানো খেলোয়াড়ের থেকে টেস্ট দলে বিশেষজ্ঞ খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হয় বেশি করে। সেখানে যতই ওয়াশিংটন সুন্দর ব্যাট হাতে রান করুন, খেলানো প্রয়োজন হয় কুলদীপকে যিনি বিপক্ষের উইকেটগুলো তুলবেন। বাড়তি ব্যাটার খেলানোর তাগিদে সৌরভ গাঙ্গুলি ওডিআইতে দ্রাবিড়কে দিয়ে কিপিং করিয়েছিলেন, মাল্টিস্কিলে জোর দিয়েছিলেন অথচ অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ৪৯ টেস্টে ৯টা কিপার খেলালেও কোনদিন কাজ চালিয়ে দেওয়া কিপার ব্যবহার করেননি, হন্যে হয়ে একজন বিশেষজ্ঞ কিপার খুঁজে গেছেন। দুটো ফরম্যাটের মধ্যে যে পার্থক্য আছে সেটাকে মাথায় রেখেছিলেন, গুরুত্ব দিয়েছিলেন। একটা ফরম্যাটের থিওরি অন্য ফরম্যাটে টেনে আনেননি। শুধু তাই নয়, সেই নাইরোবি থেকে সারা ক্রিকেট দুনিয়া জানতো দলে সৌরভের অন্যতম প্রিয় পাত্রের নাম যুবরাজ সিং। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বহু ম্যাচ তিনি অধিনায়ক সৌরভকে জিততে সাহায্য করেছেন। অথচ অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্যি যে এহেন যুবরাজ অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বে মাত্র একটি ম্যাচে পূর্ণশক্তির ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন, বাকি তিনচারটি ম্যাচে খেলেছেন শচীনের অনুপস্থিতিতে। আর এই গৌতম গম্ভীর আমলে স্বজনপোষণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আজ যদি তাকে বিশ্ব-একাদশের কোচ বানিয়ে দেওয়া হয়, কাল তিনি সেই দলেও হরষিত রাণাকে নিয়ে নেবেন।
আসলে এই গম্ভীর, ম্যাকালামদের সময়ে বোধহয় ক্রিকেটের মূল দক্ষতাকে অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর। ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে শুধু মাটি দিয়ে একটা দুর্গাপ্রতিমা বানানো সম্ভব নয়। একটা কাঠামো বা দৃঢ় স্ট্রাকচার লাগে যেটার উপর মাটি এবং তুলির সংমিশ্রণে জীবন্ত হয়ে ওঠেন মা দুর্গা। ওই স্ট্রাকচারটা দৃঢ় না হলে কেউ দেখতেই পেত না আপনার বাড়ির ঝাঁ চকচকে ইন্টেরিয়র। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ওই কাঠামোটা হচ্ছে বেসিক স্কিল। যেটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল বলেই চরম অর্থোডক্স ক্রিকেটার হয়েও শচীন তেন্ডুলকার ঢুকে যেতে পারেন দুনিয়ার যেকোন টি২০ দলে আর সেটা নেই বলেই সূর্যকুমার যাদব বা হেনরিক ক্লাসেনরা দুনিয়ার কোন টেস্ট দলেই ঢুকতে পারবেন না যদি না সেই দলের কোচের নাম গৌতম গম্ভীর বা ব্রেন্ডন ম্যাকালাম হয়।
এই দেড় বছর আগেও যে টি২০ বিশ্বকাপ ভারত জিতলো, সেখানে একটু বোলিং সহায়ক উইকেট হতেই ভারতকে রান তোলার জন্য ভরসা করতে হলো রোহিত শর্মার উপর, ওই ফরম্যাটে তৎকালীন দুনিয়ার এক নম্বর ব্যাটারের উপর নয়। ফাইনালে কঠিন পরিস্থিতিতে রান গেলেন কোন এক কোহলি। আবার শেষ কথা বললো বেসিক স্কিল, কোন ম্যাচআপ বা কোন টেকনিক্যাল মুভ বা স্কুপ শট খেলার বাড়তি দক্ষতা নয়।
আর এই প্রাথমিক স্কিলকে ভিত্তি করেই এগোচ্ছিল ভারতীয় ক্রিকেট, এই পন্থাতে খেলেই দ্রাবিড় জামানায় সাদা বলে এসেছে অবিশ্বাস্য সাফল্য, সেই সঙ্গে ছিল টেস্ট ক্রিকেটেও আধিপত্য। চ্যাম্পিয়ন না হতে পারলেও পরপর দুবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলেছিল দলটা। আর সেখান থেকে সরে আজ আমরা টি২০ বা সাদা বলের নিউক্লিয়াস ব্যবহার করে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চলেছি। টি২০ ফরম্যাটের স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করে টেস্ট ম্যাচ খেলছি। এই বিশ্বটেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সত্তর শতাংশ ম্যাচ উপমহাদেশের মাঠে খেলতে হবে জেনেও আমরা অশ্বিনকে অবসর নিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরী করি। আর তার জায়গায় যাকে খেলাই তাকে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচপিছু (ইনিংস নয়) ১৫ ওভারের বেশি বল করাতে পারি না, তিনি সারা বছরে ৯টি টেস্টে ১১টি উইকেট নেন আর রবিচন্দ্রন অশ্বিন ঘরে বসে পডকাস্ট করেন। এঁরা আবার খুব বড় স্ট্র্যাটেজিস্ট বলে পরিচিত।
‘টিম ইন্ডিয়া’র বাইরে যদি একটু তাকান, গত টেস্টবিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলা দুটো দলের দিকে দেখলেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। দক্ষিণ আফ্রিকা লর্ডসে চ্যাম্পিয়ন হলো এবং তারা ২০২৪ টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলো – অর্থাৎ দুই ফরম্যাটেই তাদের সাফল্য আছে কিন্তু দুটো ফরম্যাটে খেলার পদ্ধতিতে দেখুন বিস্তর ফারাক। যে ফরম্যাটটা যেভাবে খেলার প্রয়োজন সেইভাবেই খেলছে। অস্ট্রেলিয়াও তাই করছে, তারাও দুই ধরনের ক্রিকেটেই সাম্প্রতিককালে সাফল্য পেয়েছে। টেস্টে তাদের পুরো দলটা কিন্তু ট্রেভিস হেডের মতো করে ব্যাট করছে না। আর এই জায়গাতেই গণ্ডগোল করছে বর্তমান ভারতীয় দল। টেস্টে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রিকেট খেলছে না। খেললে ওয়াংখেড়েতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে হারতে হতো না, জয় থেকে ৩০রান দুরে থাকা অবস্থায় সেট হয়ে যাওয়া শেষ প্রতিষ্ঠিত জুটির ব্যাটার অপ্রয়োজনীয় শট খেললেন। একইরকম ভাবে ড্রয়ের সম্ভবনা শেষ হয়ে গেল মেলবোর্নে। উল্টোদিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রিকেটটা খেললো বলেই পার্থে জয় আসলো, ড্র হলো ম্যানচেস্টার টেস্ট।
এখনও অবধি শুভমন গিলকে দেখে বেশ পিছনে থাকা গোত্রের অধিনায়ক বলেই মনে হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা – এইটা বলার মতো চরিত্র তিনি নন। গাঙ্গুলি বা কোহলি ধাঁচের অধিনায়ক তিনি নন, ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে দলে কোচের কোথাই শেষ কথা। আর বর্তমান কোচ সম্ভবত এটাই চেয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মধ্যে এমন একটা দল তৈরী করেছেন যেখানে বুমরা ছাড়া সেই অৰ্থে কোন সিনিয়র দলে নেই, রোহিত-কোহলি একদিনের দলে আছেন বটে তবে এমন পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে কিছুদিন আগে পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই তাদের ভাবতে হচ্ছিলো। অর্থাৎ দলে সেই অৰ্থে এমন কেউ নেই যিনি গম্ভীরের কোন সিদ্ধান্তকে নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। অশ্বিনের কথা আগেই লিখলাম, কোহলি যদি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে প্রস্তুত থাকতেন, তাহলে গত বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে মুম্বইয়ের নেটে বাঙ্গারকে ডেকে লাল বলে প্র্যাকটিস করতেন না, রোহিত যদি সত্যিই ২০২৭ বিশ্বকাপের ভাবনায় থাকেন, তাহলে তো তাঁরই অধিনায়ক হিসেবে যাওয়া উচিত। কিন্তু এগুলো সব হলে তো ‘মাই ওয়ে’ তে কোচিং করানো যাবে না। এমনকি সূর্যকুমার যাদবও সম্ভবত এতটা ‘ইয়েসম্যান’ নন যতটা গিল। তাই খুব একটা অবাক হবো না এই টি২০ বিশ্বকাপের পর তাঁর চাকরিটা গেলে। ফলে এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্য বা ব্যর্থতার দায় অনেকটাই কোচের।
আর অনেকটা ঠিক একইরকমভাবে টিম ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছায় চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে কয়েকবছর আগে টি২০ এর আদলে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নেমেছিল ইংল্যান্ড। প্রথমদিকে কিছু চমকপ্রদ সাফল্যও পেয়েছিল। কিন্তু ক্রমশঃ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকে বাজবল নামক সার্কাসের আসল চেহারা। বিশ্বটেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ সাইকেল থেকে এখনও অবধি হিসেবে করলে তাদের জয়ের থেকে হারের সংখ্যা বেশি। ধীরে ধীরে ফিরতে হচ্ছে প্রকৃত টেস্ট ক্রিকেটের ধারেকাছে। করতে হয়েছে প্যাকেজিংয়ের নাম বদল, বাজবল থেকে এখন হয়েছে ‘বাজবল উইথ ব্রেইন’। অর্থাৎ বকলমে তারা স্বীকার করে নিয়েছেন যে আগে যে ক্রিকেটটা খেলা হচ্ছিলো তাতে অনুপস্থিত ছিল ‘ব্রেইন’ বা সোজা কথায় বললে আগে খেলছিলেন ‘ব্রেইনলেস ক্রিকেট’। এটা আমি বলছি না, নতুন নামকরণের মধ্যে দিয়ে তারা নিজেরাই বলছেন। আর এটাই ব্রেন্ডনের ক্রিকেট ব্র্যান্ড। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে এখন বাজবলের সঙ্গে ব্রেইন যোগ করেও সুরাহা হচ্ছে না। সদ্য সমাপ্ত অ্যাসেজ তার জ্বলন্ত প্ৰমাণ। প্রায় অর্ধশক্তির অস্ট্রেলিয়ার কাছেও পর্যুদস্ত হতে হলো, এতটাই বেহাল দশা হয়ে গেছে দলটার।
কিন্তু আসল ক্ষতিটা অন্য জায়গায় হলো, গত কয়েকবছরে ইংল্যান্ডের উঠতি ক্রিকেটাররা ডাকেট, জ্যাক ক্রলিদের ক্রিকেটেই উদ্বুদ্ধ হলো, ভাবলো এটাই হয়তো আগামীদিনের টেস্টক্রিকেট খেলার ধরণ। বলতে গেলে জো রুটের মত এক সর্বকালের সেরা ইংরেজ ক্রিকেটার প্রায় অবহেলিতই রইলেন।
ঠিক একই ভুল ভারতে করছেন গৌতম গম্ভীর, বিপদ ডেকে আনছেন ভারতের সামগ্রিক ক্রিকেট সিস্টেমের। বুঝছেন না যে টেস্ট ক্রিকেটটা জিততে গেলে স্পেশালিস্ট লাগে। এখানে কাজ-চালানো গোছের ক্রিকেটারদের দিয়ে খুব সুবিধে হবে না। এখানে ব্যাটিং অর্ডারে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন চলে না, টেস্ট ক্রিকেটটা একটা ভিন্ন মানসিকতা।
টি২০ ক্রিকেটের সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের কোন বিরোধ নেই। আজকের দিনে এটা মোটামুটি ভাবে স্বীকৃত যে টি২০ ক্রিকেট না থাকলে বা সিরিজগুলো না হলে, টেস্ট ক্রিকেট অনুষ্ঠিত করার খরচ আসবে না। কিন্তু তাই বলে টি-২০র মতো মানসিকতা নিয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে যাওয়াটা ভুল। তার মতো করে টেস্ট ক্রিকেটে স্ট্র্যাটেজি তৈরী করতে যাওয়াটাও আরও বড় ভুল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে গম্ভীরের মতো কোচরা সেটাই করে যাচ্ছেন। যে অনুষ্ঠানে বেনারসী পরতে হয় সেখানে বিকিনি পরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন গম্ভীর, ম্যাকালামদের মতো কোচরা। আর এই চেষ্টাটা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ওই ঘরের মাঠে একের পর এক টেস্ট সিরিজ হারতে হবে। আর যে এশিয়া কাপে আফগানিস্তান বাদে বাকি যে কোন প্রতিপক্ষকে যে কোন দিন এই ফরম্যাটে পাঞ্জাব বা মুম্বাইয়ের মতো দলগুলো হারিয়ে দেবে মাঝে মধ্যে সেই এশিয়া কাপ জেতার ক্ষণিক আনন্দকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

1 Comment