অনলাইনে শিক্ষকতা ও ছাত্রাবস্থা: একটি নিতান্ত ব্যক্তিগত আখ্যান

সৌমিক বন্দ্যোপাধ্যায়

[লেখক পরিচিতি: জন্ম ১৯৮৬। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত) ও এম ফিল; বর্তমানে গবেষণা করছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক চিন্ময় গুহর তত্ত্বাবধানে। পেশায় একটি সরকার-পোষিত কলেজের অধ্যাপক। এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি জার্নাল, অনুষ্টপ ইত্যাদি নানান পত্রপত্রিকায় ইংরেজি ও বাংলা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত প্রবন্ধ-গ্রন্থ: যুগান্তরের চিঠি: ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য (২০১৪)। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী। এই বিষয়ে বেশ কিছু মৌলিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের লেখক ও একটি গ্রন্থের সহ-সম্পাদক। ]

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় ধানের রং। বর্ষায় সজল আকাশের তলায় সবুজে-সবুজ ক্ষেত, নরম ভেলভেটের মতো মসৃণ আর উজ্জ্বল। তারপর, ঠিক পুজোর কাছাকাছি সময়, ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে যায় সেই প্রান্তর। শীতের শুকনো হাওয়া আর ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশা-মোড়া সকালে দেখি, আর ধান নেই; রিক্ত মাঠে পড়ে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রাণহীন ‘নাড়া’—কাটা ধানের গোড়া, হাঁটার পক্ষে বিপজ্জনক। এ-সবই দেখি ট্রেনের জানলার চৌকো পরিসরের ভিতর থেকে, প্রতিদিন।

যে-কলেজে আমি পড়াই, তার অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের কূল-ঘেঁষে। কলেজ থেকে সমুদ্রের দূরত্ব বড়জোর কুড়ি কিলোমিটার। আশেপাশের কিছু দ্বীপ থেকে আসে ছাত্রছাত্রীরা। তবে কলেজে ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রদের থেকে অনেক বেশি। আসলে দ্বীপের ছেলেরা সারা জীবন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যেই সরকারি স্কুলগুলিতে লেখাপড়া করে, আর স্কুলজীবন শেষ হলে বৃহত্তর জীবনের আস্বাদ পেতে নদী পেরিয়ে বড় শহরের কলেজে পড়তে যেতে চায়। তাই বেশির ভাগ মেয়েরাই পড়তে আসে আমাদের কলেজে। নামে ‘কো-এডুকেশন’ কলেজ হলেও, বস্তুত এখানে মেয়েদেরই ভীড়। একাধিক দ্বীপ নিয়ে একটি ব্লক, আর ব্লকে একটি মাত্র সরকার-অনুমোদিত কলেজ। ছাত্রীরা অধিকাংশই ভদ্র, বিনয়ী, লাজুক। ক্লাসের মধ্যে তাদের দিয়ে কথা-বলানো মাঝে মাঝেই দুষ্কর হয়ে ওঠে। গুটি কয়েক ছাত্রের মধ্যে বেশির ভাগই আবার ‘ইউনিয়ন’ করে। সংখ্যায় তারা বেজায় কম, কিন্তু একেবারে হাতেগোনা এই কটি ছাত্রদের বাচালতার সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খায় সংখ্যাগুরু প্রায়-নীরব লজ্জাবনত ছাত্রীরা।

ক্লাসে পড়াতে পড়াতে প্রকৃতি নিঝুম হয়ে আসে। কলেজের চারপাশে ফাঁকা প্রান্তরে বিকেলের রোদ মনোরম রূপ নেয়। সমুদ্রের দিক থেকে হু-হু করে ধেয়ে আসে হাওয়া। টেবিলের চৌকো চৌহদ্দির মধ্যে রইল বই, আর বইয়ের পৃষ্টায় লক্ষ লক্ষ অক্ষর। পৃষ্টাবদ্ধ ওই শব্দ, ওই বাক্য কি পৌঁছতে পারল টেবিলের ওপারে বসে-থাকা প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির বাড়িতে থাকা লাজুক মেয়েগুলির মনে? সংশয় নিয়ে বাড়ি ফিরি রোজ।

কথা, সংযোগ, বিনিময়।

এ-ছাড়া পূরণ হয় না শিক্ষকতার শর্ত। বিনিময় শুধু পাঠ্যবস্তুর নয়; দেওয়া-নেওয়া হতে হবে চিন্তার, বিচার-বিবেচনার ও কল্পনার। তবেই না প্রাণবান হবে শিক্ষাপ্রক্রিয়া, ছাত্র ও শিক্ষকের মন বেজে উঠবে সমান আবেগে, যুগ্ম সংবেদে আর গভীর প্রেরণায়!

এই সব ভাবতে-ভাবতে এখন এক আশ্চর্য চতুষ্কোণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি আমি। না—ট্রেনের জানলা নয়, যেখানে সীমিত পরিসরে মিলত অসীমের স্বাদ। ক্লাসের চৌকো টেবিল বা গ্রন্থের চেনা চতুর্ভুজও নয়, যার অস্তিত্ব ছিল স্পর্শযোগ্য ও বাস্তব। সেই সব পরিচিত চতুষ্কোণের স্থান নিয়েছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন, অথবা ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ।

ছাত্রছাত্রীদের সামনাসামনি দেখিনি প্রায় দশ মাস। নানান ‘অফিশিয়াল’ কাজে বেশ কয়েক বার কলেজে গেলেও ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়াইনি গত মার্চ মাস থেকে। ‘লকডাউন’ ঘোষণার পরের কয়েক মাস যেন থমকে গিয়েছিল সারা দেশ, হঠাৎ করেই থেমেছিল সময়ের নিয়ত যাত্রা। তারপর ধাতস্থ হয়ে যখন শুরু হল পথচলা, তখন আর আগের জগৎটা আর নেই। সেই স্পর্শগ্রাহ্য, চোখে-দেখা, মানবিক ও প্রত্যক্ষ সংযোগের ধারার বদলে এখন ভার্চুয়াল যোগাযোগ—আন্তর্জালিক পৃথিবীতে নতুন বিনিময়মাধ্যম।

এই নতুন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতার বিচিত্রতার নিরিখে আমি বেশ ভাগ্যবান। কেননা, এই নতুন বাস্তবতায় অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় নিজে লেখাপড়া করা এবং ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো—দু’ রকম সুযোগই আমার হয়েছে। শুধু পড়ানো নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে নিতে হয়েছে অনলাইন পরীক্ষা। আবার এই নতুন পদ্ধতিতে অংশ নিয়ে ফেলেছি কিছু ওয়েয়েবিনার ও ভার্চুয়াল বক্তৃতামঞ্চে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায়, অপ্রত্যাশিত সুযোগে নতুন ধারার শিক্ষামাধ্যমের চারটি দিক—অর্থাৎ, পড়া, পড়ানো, পরীক্ষা নেওয়া এবং আলোচনাচক্রে বক্তব্য পেশ করা—এই নিয়ে ভরে উঠেছে আমার অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার। ছাত্রছাত্রীদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাবের রকমফের নিয়েও বুঝেছি নানান কথা: কলেজে যেমন পরিণত ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে আমার উপলব্ধির পরিধি, তেমন নিজের বাড়িতে আমার ছোট্ট ছয় বছর বয়েসী মেয়ের দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে নিয়মিত অনলাইন ক্লাস করার সাক্ষী হচ্ছি আমি। আমার স্ত্রী একটি প্রাইভেট প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতারত; তাঁকেও জড়িত থাকতে হচ্ছে অনলাইনে শিক্ষাদানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থার একেবারে সূচনা থেকে কলেজে প্রথাগত পড়াশোনার পরিণতির প্রান্তে ছেলেমেয়েরা এই নতুন পদ্ধতিকে কেমন করে গ্রহণ করছে, সে-বিষয়ে অভিজ্ঞতা তো আমার প্রাত্যহিক যাপনেরই অঙ্গ। সেখান থেকে উঠে এসেছে চিন্তার কিছু সূত্র। সে-সবই পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেব এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে।

শিক্ষকতার প্রাথমিক শর্তই হল ভাল ছাত্র হওয়া। সুতরাং ‘পড়ানো’ নয়, অনলাইনে ‘পড়া’র অভিজ্ঞতার কথাই বলি প্রথমে।

কলেজ-শিক্ষকদের পাঠ্যবিষয়ের নতুন দিকগুলি সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে, এবং পাঠনপদ্ধতির অভিনবত্ব সম্পর্কে সচেতন করার অভিপ্রায়ে কিছু সময় অন্তর বিভিন্ন কোর্স করানো হয়। শিক্ষকতাজীবনে চালু-থাকা এই কোর্সগুলির নানান নাম আছে: ফ্যাকাল্টি ইন্ডাকশন প্রোগ্রাম, রিফ্রেশার্স কোর্স ইত্যাদি। এমনই এক ফ্যাকাল্টি ইন্ডাকশন প্রোগ্রাম করার জন্য আবেদন করেছিলাম মধ্যপ্রদেশের এক বিখ্যাত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবেদন মঞ্জুর হওয়াতে ত্রিশদিনব্যাপী দৈনিক আট ঘণ্টা ক্লাস করতে হল অনলাইনে জনপ্রিয় মাধ্যম ‘গুগলমিট’-এ। লাঞ্চের সময় একটু বিরতি। বাকি সময় টানা ক্লাস—বিবিধ বিষয়ের, বিচিত্র ধরনের, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যাপকের।

প্রথম কয়েক দিন তো রীতিমতো শরীর খারাপ হয়ে গেল: মাথা-ধরা, চোখে-ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গে একেবারে জেরবার। ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে ক্লাসের পঠনবস্তুতে মনোযোগী হলাম। সেই সকল বস্তু যে সবই পাঠযোগ্য বা স্মৃতিধার্য, সে-কথা বলতে পারি না; তবে কিছু তো শেখা হল বটেই। প্রায় জনা চল্লিশের শিক্ষার্থী অধ্যাপক, সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন কলেজে যাঁদের পেশাগত জীবন বিস্তৃত, ত্রিশ দিন ধরে ক্লাস করলাম একসঙ্গে। অফলাইনে এই ধরনের কোর্স করতে গেলে যেতে হত ইউনিভার্সিটিতে, থাকতে হত এক মাস। সিনিয়র অধ্যাপকের কাছে শুনেছি, এক মাস একসঙ্গে অত জন মিলে থাকা, ক্লাস করা, আর কোর্সের শেষে পরীক্ষা দেওয়ার এক গভীর সামাজিক আনন্দ ছিল। ক্লাসের ফাঁকে নতুন জায়গায় দল বেঁধে ঘুরতে যাওয়ায় মিলে যেত দৈনন্দিন জীবন থেকে হঠাৎ ছুটির আমেজ। এক মাসের বন্ধুত্বের কিছু রেশ থেকে যেত আজীবন। কলেজের কাজে বিকাশভবনে গিয়ে দেখেছি, আমাদের কলেজের সিনিয়র অধ্যাপক হঠাৎ তাঁর পুরনো কোনও কোর্সের পূর্বপরিচিত বন্ধুকে দেখতে পেয়ে কেমন উজিয়ে উঠেছেন, তাঁর চোখের উপর নিশ্চিত ভেসে উঠেছে বিগত আনন্দযাপনের মুহূর্ত।

অফলাইনে কোর্স করার এই সব আনন্দময় দিকগুলি তুলে ধরে আমি কিন্তু মোটেই প্রমাণ করতে চাইছি না যে অনলাইনের তুলনায় অফলাইন কোর্স অধিকতর ফলপ্রসূ। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিরর্থক। অনলাইন কোর্সেরও রয়েছে প্রভূত সদর্থক দিক। প্রথম কথা, এখানে অধিকাংশ ক্লাসগুলিই হয় ‘পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’-এর ধাঁচে। ফলত, তথ্যে-ঠাসা এবং নিরেট। অফলাইন ক্লাসের মতো খানিক পড়ানো, মাঝে মাঝে খানিক গল্প, ঠাট্টাতামাশার পরিসর বেশ সীমিত হয়ে যায় এই মাধ্যমে। আমি যে-কোর্সের কথা বলছি, সেখানে দিনের শেষে প্রতিটি ক্লাসের সারসংক্ষেপ লিখে ‘ফিডব্যাক ফর্ম’ পূরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। অতএব, ক্লাসের সারবস্তু লেখার জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ তো দিতেই হত। সব মিলিয়ে অনলাইন কোর্সে থাকত শক্ত বাঁধুনি—শিক্ষক ও ছাত্র, উভয়ের দিক থেকেই।

আর যদি বলি বন্ধুত্বের কথা? অন্তরঙ্গতার কথা? নেহাতই পারস্পরিক মানবিক সম্বন্ধের কথা, যা কিনা স্মৃতিগত হয়ে যায় সারা জীবনের জন্য? সে-সব কি নিতান্তই অনুপস্থিত অনলাইন কোর্সে?

আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু সে-কথা বলে না। অনলাইন কোর্স চালু হওয়ার প্রথম কয়েক দিনের আড়ষ্ঠতা কেটে গিয়েছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। নিজেদের মধ্যেকার সংযোগকে দৃঢ়তর করতে শিক্ষার্থীরা একটি ‘আনফিশিয়াল’ হোয়াটস-অ্যাপ গ্রুপ খুলে নিয়েছিলেন। সেখানে ক্লাসের সমান্তরালভাবে কথাবার্তা চলত, হত নানান বিষয়ে ঠাট্টাতামাশা। ঠিক যেমন ক্লাসরুমে বেঞ্চে বসে হয়। সেই গ্রুপটিতে মিলেছিল ভার্চুয়াল পরিসরের শীতলতার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ-সংযোগ-জনিত উষ্ণতার কিছু আভাস। যে-দিন কোর্সটি শেষ হয়, তার আগের দিন থেকেই মনখারাপের ছায়ায় মেজাজ বিষণ্ণ হয়েছিল। এই মনখারাপের অনুভূতি কিন্তু আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। কোর্স শুরুর সময়ের বিরক্তি ও নানান প্রতিবন্ধকতা থেকে যে ক্রমে ভাললাগা ও শেষে মনকেমনের অনুভূতির সঞ্চার হতে পারে—অন্তত অনলাইন কোর্সে—এ আমার ভাবনার ধারেকাছেও ছিল না। শেষ দিন সন্ধ্যে ছটা গড়িয়ে কথাবার্তা চলল রাত সাড়ে আটটা অবধি। একমাসব্যাপী ‘ভার্চুয়াল’ যৌথযাপনের শেষে সে-দিনের সেই গল্প-আড্ডা যেন শেষই হতে চায় না। বুঝলাম, মানুব-হৃদয়ের বটগাছের মতো অদম্য প্রাণসঞ্চারী এক ধর্ম আছে। অনলাইন কোর্সের কঠিন ও প্রাণহীন ইঁটের ভাঁজেও এতটুকু জলবাতাস পেলে সে পল্লবিত হয়; প্রাণের স্ফূর্তি থেকে তাকে কোনওভাবেই বিরত করা যায় না।

একটা মজার কথা বলে এই প্রসঙ্গ শেষ করি। ওই কোর্সে আমাদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি প্রায় প্রতিদিনই ক্লাসে একবার নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েই হঠাৎ উধাও হয়ে যেতেন। নিজের ‘ডিভাইস’-এর ক্যামেরা ও অডিও বন্ধ করে, বা কখনও কখনও মিটিং থেকে একেবারে লগ-আউট হয়ে গিয়ে, চলে যেতেন সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলত কোর্সের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁর কপালে জুটত বেদম বকুনি ও শাসন। বেচারা অধ্যাপক কাঁচুমাচু মুখে নিজের ক্যামেরা চালু করে ক্ষমা চাইতেন প্রত্যেক দিন। এভাবেই চলেছিল এক মাস। কোর্স শেষ হয়ে যাওয়ার বেশ কিছু দিন বাদে একটা সূত্র থেকে জানা গেল, ওই অধ্যাপকমশাই পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের কোনও একটি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক! শুধু ত-ই নয়, তিনি বর্তমান সরকারের পদাসীন মন্ত্রীও বটে। প্রতিদিন নিয়মমাফিক বকুনি খাওয়ার সময়ে ও তাঁর স-আকুতি ক্ষমা প্রার্থনার সময় আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি মন্ত্রীমশায়ের দাপটের আঁচ। মন্ত্রীমশাইও কখনও প্রকাশ করেননি তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়। যদিও তাঁর পক্ষে দিনে আটঘন্টাব্যাপী ত্রিশ দিন টানা ক্লাস-করা কার্যত অসম্ভব, তবু কখনও নিজের পদের অজুহাতে তিনি নিষ্কৃতি চাননি এই দায় থেকে। এই যে অপরিচয়ের আড়াল, একটা মানুষের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে না-জানতে পারা, আবার তাঁর সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করা—এ তো অফলাইনে কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। এই যে অপরিচয় বা আধো-পরিচয়ের প্রতিবন্ধকতা, এ তো অনলাইন কোর্সেরই অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এর থেকে যে নেহাতই কৌতুকোজ্জ্বল এক ঘটনার জন্ম দিতে পারে, সে-কথা আমার জানা ছিল না আগে।

এবার আসি অনলাইনে শিক্ষকতার প্রসঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গের যে-প্রান্তে আমার কর্মস্থান, সেখানে দিনের বেশির ভাগ সময়েই ইন্টারনেটের সংযোগ থাকে না। ফলে ‘গুগলমিট’, ‘জুম’ বা ওই ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, অর্থাৎ যে-মাধ্যমে মিলতে পারে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ, সেখানে ব্যবহার করার উপায় নেই বললেই চলে। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা মেইল ব্যবহার করতে পারে না, বা করতে জানলেও একটা মেইল পাঠালে অনির্দিষ্টকাল অতিবাহিত হয় সেই মেইল পৌঁছতে, পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড হতে চায় না, সেখানে অনলাইনে ‘লাইভ’ ক্লাস? হয়ত কিছু ছাত্রছাত্রী পারবে এর সুযোগ নিতে, কিন্তু অধিকাংশই রয়ে যাবে শিক্ষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। খেয়াল রাখা ভাল, আমি কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের প্রশিক্ষণের কথা তুলছি না। কারণ এ-কথা আমার ভালই জানা আছে যে নবীন প্রজন্ম প্রযুক্তির ব্যবহারে পূর্ববর্তী প্রজন্মের থেকে স্বভাবতই বেশি দক্ষ হয়। ডেস্কটপ হয়ত কারও ঘরে নেই, ল্যাপটপ থাকার তো প্রশ্নই নেই, কিতু স্মার্ট ফোন তো সবার হাতে-হাতে। হোয়াটস-অ্যাপ বা ফেসবুকেও অ্যাকাউন্ট আছে প্রায় সকলের, আর ওই সব বিষয়ে তাদের উৎসাহও অত্যুচ্চ। তবে লেখাপড়ার বেলাতেই কেন অনলাইনে অসুবিধার যুক্তি?

স্মার্ট ফোন এই যুগে কমবয়েসী ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশেরই হস্তগত হলেও সমস্যা তৈরি হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগের নিশ্চয়তার অভাবে। অন্তত পড়াশোনা চালাতে গেলে যেটুকু নিয়মিত পরিষেবা প্রয়োজন, তার অভাব থেকে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। অর্থাৎ ‘লাইভ’-এ ক্লাস করা, লেকচার ভিডিও ডাউনলোড করা, ই-বুক ডাউনলোড করা কিংবা পিডিএফ বা ওয়ার্ড ফরম্যাটে নোট্‌স বা অন্যান্য পাঠ্যবস্তু ডাউনলোড করতে ইন্টারনেটের যে-নিয়মিত পরিষেবার প্রয়োজন হয়, তার থেকে বঞ্চিত আমাদের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী। অবশ্য দক্ষতা-অর্জন বা প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে একেবারে উড়িয়েও দিচ্ছি না আমি, কারণ অনলাইন লেকচার বা ওই জাতীয় ব্যবস্থায় সরাসরি অংশ নিতে প্রযুক্তির যে-ন্যূনতম ধারণা থাকা দরকার, সেটাও নেই অনেকের মধ্যে। তবে এ-সমস্যা গৌণ। ছাত্রছাত্রীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে এই আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু ইন্টারনেট-সংযোগের নিশ্চিতি মিলবে কোথায়? কোনও নামজাদা কোম্পানি টাওয়ার বসালেও ছেলেমেয়েদের প্রয়োজনীয় ‘নেটপ্যাক’ ভরানোর অতিরিক্ত টাকা আসবে কোথা থেকে? দৈনিক এক বা দেড় জিবি ইন্টারনেট পরিষেবা যদি ক্লাস করতেই ফুরিয়ে যায়, তবে বই বা নোট্‌স ডাউনলোড হবে কীভাবে? বলা বাহুল্য, ঘরে-ঘরে ওয়াইফাই বা ব্রডব্যান্ড সংযোগের কথা ওই অঞ্চলে অকল্পনীয়।

সুতরাং ঝোঁকের মাথায় যদি এই দাবি করে বসি যে, যেহেতু সকল ছাত্রছাত্রীদের কাছে স্মার্ট ফোন এক প্রাত্যহিক ও নিত্য সময়ের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী এবং তারা নানান জনপ্রিয় অ্যাপ্লিকেশনে বেজায় উৎসাহী ও অতিশয় দক্ষ, তাই অনলাইনে লেখাপড়ার অসুবিধাটা নেহাতই বানিয়ে-তোলা অজুহাত, তবে সেই সিদ্ধান্ত হবে ভ্রান্তিকর।

আমাদের কলেজের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু দিন চিন্তাভাবনা চলল। অবশেষে, বহু দিক বিবেচনার পর, অনলাইনে পড়ানোর উপায় হিসেবে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক একাধিক হোয়াটস-অ্যাপ গ্রুপ তৈরি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। গ্রুপের পরিচালক হলেন বিভাগীয় প্রধান। সেখানেই দেওয়া হতে লাগল ছোট ছোট লেকচার ভিডিও, টেক্সট ও নোট্‌স। এতেও মিটল না সমস্যা। চার-পাঁচ মিনিটের ভিডিওতে কি জোর করে ঠেসে দেওয়া যায় আধঘণ্টা-চল্লিশ মিনিটের স্বাভাবিক ক্লাসের স্বচ্ছন্দ পাঠ-বিস্তার? একই দিনে যদি ভেঙে ভেঙে একাধিক ভিডিও আপলোড করি, তাহলে তো আর-এক সমস্যা: ফোনের ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গিয়ে যন্ত্রটি বিকল হতে সময় লাগবে না। অর্থাৎ রেকর্ড-করা ক্লাস নয়, ‘লাইভ’ ক্লাসই হতে পারত অনলাইনে লেখাপড়া চালানোর ক্ষেত্রে সর্বাধিক কার্যকরী। কিন্তু, আগেই বলেছি, গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের নিশ্চয়তা এবং দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত নেটপ্যাক ভরানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা না-করা পর্যন্ত লাইভ ক্লাস নেওয়া এক প্রকার দুষ্কর।

যাই হোক, উপায়ান্তর না-দেখে এভাবেই চলতে লাগল ক্লাস। আগের মতো কলেজ-ভবনে সামনাসামনি ক্লাস নেওয়ার সময় যে-সব লজ্জাবনত ছাত্রীরা কথোপকথনে ছিল নিতান্ত আড়ষ্ঠ ও অনিচ্ছুক, অনলাইন মাধ্যমে তারা হয়ে গেল সম্পূর্ণ নীরব এবং শিক্ষকের সঙ্গে ন্যূনতম সংযোগেও চূড়ান্ত অনিচ্ছুক। শুধু ভিডিও আপলোড করা, নোট্‌স দেওয়া, টেক্সট থেকে ছবি তুলে পোস্ট করা: এই হল আমার কাজ। আর অপর পক্ষে জারি রইল হিরণ্ময় নীরবতা। কলেজ যাওয়ার পথে ধানক্ষেতের অনুষঙ্গ, তার ছায়ানিবিড় প্রান্ত, মেঠো পথ, মাটির বাড়ি, পুকুর, বাগান, কলেজ-ভবনে ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা, কথাবার্তা, হইচই, শিক্ষকশিক্ষিকার নিজেদের মধ্যে অবসরকালীন গল্পগাছা, বিনিময়, একসঙ্গে আহার, বেলা-পড়তেই বাড়ি ফেরার উদ্যোগ, পথের ক্লান্তি—সব নিমেষে উধাও। আমি আছি, আর আছে ডিজিটাল স্ক্রিন—ব্যাস। আপসোস করছি না তবু: অত দূরে কলেজে যাওয়ার শ্রান্তি নেই, ফলে প্রয়োজনীয় কাজে এনার্জি দ্বিগুণ। লেখাপড়ার বাইরে বাড়তি চাপ প্রায় নেই, ফলে মনোযোগ একমুখী ও সূচাগ্র। ক্লাসে পড়ানোর ফাঁকে গল্প নেই, ফলে সংক্ষিপ্ত লেকচার ভিডিও তথ্য ও তত্ত্বে ঠাসা।

এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ এল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশ: ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা নিতে হবে দ্রুত। কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবে, তা ঠিক করবে কলেজগুলি। তবে ছাত্রছাত্রদীদের কলেজে আনা যাবে না কোনওভাবেই।

আমাদের মতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ কলেজগুলিতে এক শাঁখের করাতের প্রায় অবস্থা—অফলাইনে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না নির্দেশ অনুযায়ী, আবার অনলাইনে পরীক্ষাগ্রহণের পরিকাঠামোর অভাব। অনেক দিক ভেবেচিন্তে আমাদের অধ্যক্ষ ঘোষণা করলেন: ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যদি কেউ মনে করে যে অনলাইনে পরীক্ষা দিতে সে নিতান্ত অপারগ, তবে সে কলেজে আবেদনপত্র জমা দিক। কলেজের কোনও শিক্ষক সেই ছাত্র বা ছাত্রীর বাড়ির নিকটবর্তী কোনও স্থানে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা নিয়ে আসবেন। আর বাকি যারা অনলাইনে পরীক্ষা দেবে, তারা নিজেদের মেইল অ্যাড্রেসে এবং কলেজের ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট দিনে ও নির্ধারিত সময়ে প্রশ্নপত্র পেয়ে যাবে। বিষয়ভিত্তিক বিভাগীয় মেইল অ্যাড্রেসে এবং নির্দিষ্ট শিক্ষকের হোয়াট্‌স-অ্যাপে পাঠাতে হবে উত্তরপত্রের পিডিএফ ফাইল। অর্থাৎ সকল ছাত্রছাত্রীদের নিজস্ব মেইল অ্যাড্রেস তৈরি করতে হবে এবং উত্তরপত্রের একাধিক পৃষ্ঠার ছবি তুলে কীভাবে পিডিএফ বানানো যায়, শিখে নিতে হবে সেই কায়দাও।

বুঝে গেলাম, অনলাইন ব্যবস্থায় লেখাপড়া এবং পরীক্ষাগ্রহণকে গ্রামীণ ছাত্রছাত্রীরা কেমন করে গ্রহণ করছে, তার এক হাতেগরমে প্রতিক্রিয়া মিলবে এবার। তারাই ঠিক করবে অফলাইনে পরীক্ষা দিতে তারা বেশি স্বচ্ছন্দ, না কি অনলাইন-মাধ্যমে। আমরা মুখিয়ে আছি তাদের প্রতিক্রিয়ার আশায়। মনে রাখবেন, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু ভার্চুয়াল মাধ্যমে ক্লাস করতে একেবারেই আগ্রহী ছিল না। ইন্টারনেটের সমস্যা তো আছেই; তা ছাড়া দীর্ঘদিন তারা অভাব বোধ করেছে বন্ধুত্বের, মেলামেশার, কলেজপ্রাঙ্গণে একসঙ্গে ঘোরাঘুরির উষ্ণ আমেজের। যে-ন্যূনতম সামাজিক ও মানবিক পরিসর আমাদের প্রজন্মের প্রয়োজন, তার ঢের বেশি দরকার ওদের। বেড়ে-ওঠার সময়, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে গড়ে-ওঠা বন্ধুত্ব বা সমবয়েসীর সঙ্গ মানুষের স্মৃতিতে রেখে দেয় তার মৌরসি অধিকার। সে-সব থেকে দীর্ঘকাল বঞ্চিত তারা। তাই অনলাইনে পঠনপাঠনে বেজায় অনাগ্রহী এই ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই যে প্রযুক্তির খুঁটনাটি এড়িয়ে গিয়ে, নিশ্চিন্তমনে প্রথাগত ও পরিচিত উপায়ে প্রত্যক্ষভাবে পরীক্ষা দিতে উৎসাহী হবে—এটাই প্রত্যাশিত ছিল আমাদের কাছে।

কিন্তু আবার এক অপ্রত্যাশার ধাক্কা। পুনরায় কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা। প্রথম দিকে অফলাইন পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে ইতিউতি খোঁজখবর নিলেও শেষ অবধি দেখা গেল কোনও ছাত্রছাত্রীই অফলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার আবেদন জানাল না। একটি আবেদনপত্রও জমা পড়ল না কলেজের অফিসে। সকল প্রতিবন্ধকতা ও অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে প্রত্যেকে অনলাইন পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক। একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে এর আসল কারণ: অফলাইনে পরীক্ষাগ্রহণ করবেন শিক্ষকেরা, আর পরীক্ষার্থীদের তাঁদের সামনে বসেই পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু অনলাইনে তো সে-বালাই নেই। প্রশ্ন হাতে পেয়ে গেলেই মিলে যাবে ‘ওপেন বুক টেস্ট’-এর সুযোগ। অর্থাৎ নিজের বাড়িতে বসে যেমন খুশি উপায়ে দেওয়া যাবে পরীক্ষা। এ-সুযোগ কেউ ছাড়ে?

এ-পর্যন্ত পড়ে আপনাদের মনে হতে পারে, আমি বুঝি পরীক্ষার্থীদের এক অনৈতিক ও অনুচিত অভিপ্রায়ের দিকে ইঙ্গিত করে তাদের ‘ছোট’ করতে চাইছি। কিন্তু—স্পষ্ট করেই বলি—সেই উদ্দেশ্য আমার নয়। অনলাইন পরীক্ষার নতুন নিয়মে হঠাৎ করে যে-সুযোগ তৈরি হল, কেউ তার সুবিধা নিতে চাইলে সত্যিই কি তাকে আমরা ‘অন্যায়কারী’ বলতে পারব? লকডাউনে ভাল করে ক্লাস হয়নি দিনের পর দিন, সারা পৃথিবী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দ্বিধাকম্পিত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে যেন, গরিব মানুষের পেশাগত জীবনে ও দৈনন্দিনতায় নেমে এসেছে গভীর দুশ্চিন্তার ছায়া। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে যদি আমরা আশা করি তারা নতুন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত অপ্রত্যাশিত সুযোগকে কোনওভাবেই কাজে লাগাবে না, তাহলে তা ভাবের ঘরে চুরি। তবে সবাই কি বই দেখেই পরীক্ষা দেবে! তা নিশ্চয়ই নয়। মানুষের স্বভাবেই তো বিচিত্রতা, সুতরাং বিবেচনাবোধেও তারতম্য স্বাভাবিক।

সুতরাং সুপরিকল্পিতভাবে অনলাইনে পরীক্ষা সম্পন্ন হল। নির্দিষ্ট সময়ে হোয়াট্‌স-অ্যাপে উত্তরপত্রও পৌঁছে গেল। তবে উত্তরপত্রের মেইল ঢুকতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও করণীয় ছিল না কিছু, কেননা—আগেই বলেছি—নেটওয়ার্কের অস্থিরতায় ওই অঞ্চলে মেইলের গতি মন্থর। বলে রাখা ভাল, উত্তরপত্রের ছবি তুলে একাধিক পৃষ্ঠাকে সংহত করে কীভাবে একটিমাত্র পিডিএফে পরিণত করতে হবে, সেই সংক্রান্ত নির্দেশ দিয়ে একটি প্রশিক্ষণমূলক ভিডিও আমরা আগেই পৌঁছে দিয়েছিলাম সকল ছাত্রছাত্রীর কাছে।

যাই হোক, পরীক্ষাপর্বের সুসমাধান হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশের মান্যতা রইল, আবার রক্ষিত হল ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থও। এই ঘটনা থেকে বোঝা গেল: হয়ত সব দিক বাঁচিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া অসম্ভব নয় প্রত্যন্ত গ্রামেও, কিন্তু তাতে পরীক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের যাথার্থ রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। কারণ ‘ওপেন বুক টেস্ট’-এর জন্য যে ভিন্ন প্রশ্নকাঠামো, পাঠনপদ্ধতি এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনও অপ্রচল। আবার অনলাইনে পরীক্ষাগ্রহণের সময় সঠিক ইনভিজিলেশন বা পরিদর্শনের উপায়ও হস্তগত নয় আমাদের। যদিও সে উপায় আজকের পৃথিবীতে অসম্ভব নয়, কিন্তু তার বাস্তবায়নে ইন্টারনেট-সংযোগের যে স্থিরতা ও নিশ্চয়তার প্রয়োজন, কোথায় মিলবে তা? ঘুরেফিরে এসে পড়লাম সেই পূর্বের প্রসঙ্গে: প্রশিক্ষণ তো বটেই, কিন্তু অনলাইনে পঠনপাঠন ও পরীক্ষাব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনে দরকার ইন্টারনেট-পরিষেবার নিশ্চিতি। এ-শুধু টেকনিকাল সমস্যা নয়, এর মূলে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। শুধুমাত্র প্রকরণের কথা ভাবলে ‘অনলাইন’ শিক্ষা হয়ত চালিয়ে দেওয়া যাবে গায়ের জোরে, আর ‘অফিশিয়াল’ দিক থেকেও আমরা রয়ে যাব প্রশ্নহীন, কিন্তু শিক্ষার প্রার্থিত উদ্দেশ্য সেখানে সফল হবে কি?

মোদ্দা কথায় এই হল আমার অভিজ্ঞতার নির্যাস: সময়ের অপ্রত্যাশিত আঘাতে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে অনলাইনে কাজকর্মব্যতীত উপায় নেই আর। মানতেই হবে এই বাস্তবতাকে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে ইন্টারনেট-সংযোগপ্রাপ্তির সুযোগকে। হ্যাঁ, এটাও অধিকার—জীবন ও জীবিকার মতোই এই অধিকারের আওতায় আসুক সকলে। শুধুমাত্র ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার অভাবে কেন বঞ্চিত রয়ে যাবে অগণিত ছাত্রছাত্রী? এই প্রাথমিক চাহিদাটুকু না-মিটলে অনলাইন-শিক্ষাব্যবস্থা অচিরেই প্রহসনে পরিণত হবে। প্রহসন কখনও-কখনও ভাল লাগে, কিন্তু তা নিয়মে পরিণত হলে মন ও বুদ্ধির দিকে থেকে পঙ্গু হয়ে যাবে একটা গোটা প্রজন্ম। এ তো গেল বাহ্যিক সমস্যার কথা। অনলাইন শিক্ষায় অনুস্যূত এক স্পর্শহীন ও বিকল্প বাস্তবতার ধারণা যে সবচেয়ে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলেছে শিশুমনে, সে আমি প্রাত্যহিক জীবনে গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের থেকেও শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য অনেক বেশি দরকার স্কুলযাপনে বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রত্যক্ষ সাহচর্য। শরীর ও মনের যথাযথ বিকাশের উপযোগী পরিবেশ অনলাইনের মাধ্যমে কোন উপায়ে গড়ে তোলা সম্ভব, সে-ব্যাপারে গভীর বিবেচনার প্রয়োজন।

ট্রেনের জানলার চতুষ্কোণের ভিতর দিয়ে যেমন ধানক্ষেতের রং-বদল দেখতাম কলেজে যাওয়ার পথে, গ্রন্থের চতুর্ভূজাকৃতি সীমার ভিতরে যেমন মনস্ক পাঠক পেয়ে যান বোধ-মনন-কল্পনার সীমাহীন উড়ানের অবকাশ, স্মার্ট ফোনের স্ক্রিন বা ডেস্কটপের চৌকো ঘেরাটোপেও যেন ছাত্রছাত্রীরা পায় মনকে মেলে ধরার সুযোগ। প্রাণের স্ফূর্তিতে অনতিক্রম্যকে অতিক্রম করা, সীমার চৌহদ্দিকে ভেঙে ফেলে ভিন্ন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া, মানবিক সম্বন্ধের উষ্ণতায় নিজের বোধকে সতেজ রাখাই তো প্রকৃত শিক্ষা। সেই শিক্ষাই যেন দিতে পারি আমরা: সে অফলাইনেই হোক, বা অনলাইনে।

 

লেখকের অন্য লেখা:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    ২০২১ – নতুন আশা

    ভাস্কর বসু

    পরিকল্পনা মতই ১৫ই জানুয়ারি প্রকাশিত হল ত্রৈমাসিক ‘অবসর’ পত্রিকার ২০২১ এর ‘শীত সংখ্যা’। মাঘ মাস পড়ে গেলেও ‘মাঘের শীত বাঘের গায়ে’ পৌঁছেছে কিনা তা আদৌ বোঝা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে নবান্ন উৎসবের সমারোহ শুরু হয়েছে। বিগত অতিমারীর ভয়ংকর বছরটিকে পিছনে ফেলে নতুন বছরে পৃথিবী আবার ধীর পায়ে চলা শুরু করেছে। এবার প্রচ্ছদকথা – ‘শিক্ষা-দীক্ষা’। মাতৃভাষায় শিক্ষার […]

    Read More

    মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রস্তাবনা ও প্রয়াসের পুনর্মূল্যায়ন

    বিভাস ভট্টাচার্য

    শিক্ষাদানের মাধ্যম কী হওয়া উচিত তা নিয়ে শিক্ষাবিদেরা যেমন বিভিন্ন সময়ে চিন্তাভাবনা করেছেন, তেমনি সাধারণ মানুষকেও এই বিষয়টি নিয়ে, বলা ভালো এই সমস্যাটি নিয়ে, বিস্তর আলোচনা করতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক অতীতে; এমনকি এই সময়েও এ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। ভাষানীতি ও শিক্ষানীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি স্তরে পরিবর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি সেই বিতর্কে ইন্ধন জুগিয়েছে, কখনও কখনও বিভ্রান্তিও […]

    Read More

    হরফ-এর অবসর

    সুমিত রায় ও সুজন দাশগুপ্ত

    সুজনের কথা নতুন অবসর-এর সম্পাদক ভাস্কর-এর কাছ থেকে হুকুম এসেছে তথ্যের পুরোনো ওয়েবসাইট অবসর.নেট (abasar.net) -এর গোড়ার কথা লিখতে – কবে শুরু হল, কেন হল, পনেরো ষোলো বছর চালাতে কী অভিজ্ঞতা আমাদের হল, এই সব নিয়ে। সত্যি কথা বলতে কী, খুব চিন্তা ভাবনা করে অবসর শুরু হয়নি। সেসব করা সম্ভব যখন বাংলা ওয়েবসাইট তৈরি করার […]

    Read More

    সৌমিত্র সন্ধান – পরিচালক সুমন ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা

    অরিন্দম ঘোষ

    (সুমন ঘোষ জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙলা ছবির পরিচালক। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলি একই সাথে দর্শক এবং সমালোচকের সমাদর লাভ করেছে। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘পদক্ষেপ’। সেখানেই তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পেয়েছিলেন নায়ক রূপে। সৌমিত্র সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পরের ছবি ‘নোবেলচোর’ আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। পরে আরো তিনটি ছবিতে তিনি কাজ […]

    Read More

    “মংপু – ফিরে দেখা!”

    প্রিয়দর্শী সেন

    [ ভূমিকা – দার্জিলিং জেলার কার্সিয়াং সাবডিভিশনে, পাহাড়ের কোলে ছোট্ট মংপু (Mungpoo বা Mongpu) গ্রামটি বাংলা সাহিত্যে যে স্থায়ী আসন লাভ করেছে, তার প্রধান কারণ মৈত্রেয়ী দেবী। স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে এইখানেই একটি সুদৃশ্য বাংলোতে রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে চারবার এসেছিলেন। সেই সময়ের অনবদ্য স্মৃতি আমরা পাই ‘মংপু-তে রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে। তবে আমরা অনেকেই জানি না, ১৮৬৪ সাল […]

    Read More
    +