প্রসন্নময়ী ও প্রিয়ম্বদা

মাতা প্রসন্নময়ী কন্যা প্রিয়ম্বদা – এক অনন্য জীবন পরিক্রমা

প্রিয়ম্বদা দেবী

প্রিয়ম্বদা দেবী – একাধারে কবি, শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক – পাশাপাশি সমাজসেবী। রবীন্দ্র সমসাময়িক যুগের এই প্রতিভাবান মহিলাটির অস্তিত্ব আজ বাঙালির স্মৃতিতে অস্পষ্ট। সাহিত্য বা সমাজসেবা শুধু নয়, তাঁর সমগ্র জীবনটি নিয়ে আলোচনা করতে বসলে দেখা যায় ‘নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা!’ জন্ম থেকে মৃত্যু – তেষট্টি বছরের জীবনে প্রিয়ম্বদার পাশে চিরসাথী হয়েছিলেন মা প্রসন্নময়ী। পারিবারিক শোক প্রিয়ম্বদার জীবনকে বারেবারে তছনছ করে দিয়েছে – তবু তিনি নিজের জীবনশিখাকে নিষ্কম্প রেখে ‘শুভ কর্মপথে’ চলেছেন। পাশে ছায়াসঙ্গী মা প্রসন্নময়ী।  

প্রিয়ম্বদার জীবনের থেকেও বৈচিত্র্যময় জীবন ছিল মা প্রসন্নময়ীর। জন্ম পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে, ১৮৫৪ সালে অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহের আগে। পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী। দুর্গাদাসের প্রথম সন্তান, জ্যেষ্ঠা কন্যা প্রসন্নময়ী। দুর্গাদাস উদার মনোভাবাসম্পন্ন হলেও পরিবারের রীতি মেনে কৌলীন্যপ্রথা অনুযায়ী প্রসন্নময়ীর বিবাহ হয়েছিল মাত্র দশ বছর বয়সে। কিন্তু গ্রামীণ আচার আচরণের জন্য শ্বশুরবাড়িতে থাকেননি একটানা বেশিদিন। কুলীন কন্যাদের পিতৃগৃহে বসবাস অবশ্য তখনকার দিনে রীতিমত প্রচলিত ছিল। কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় দুর্গাদাসকে পরিভ্রমণ করতে হত। প্রসন্নময়ী পিতৃগৃহে না থেকে দুর্গাদাসের বিভিন্ন কর্মস্থলেই পিতার সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন। তাই প্রিয়ম্বদার জন্ম হয়েছিল দুর্গাদাসের তৎকালীন কর্মস্থল যশোহরে। প্রিয়ম্বদার জন্মের পরই তাঁর পিতা কৃষ্ণকুমার বাগচী মানসিক অসুস্থতার শিকার হন, তাই আজীবন প্রসন্নময়ী কন্যাকে নিয়ে পিতৃগৃহেই কাটিয়েছেন। অল্প বয়েসেই স্বামীর অসুস্থতা ও মৃত্যুতে কন্যার গভীর দুঃখে বিচলিত হয়েছিলেন দুর্গাদাস। তাই অত্যন্ত সমাদরে কন্যা ও দৌহিত্রীকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। হয়তো অল্পবয়েসে কন্যার বিবাহের জন্য নিজেকে দায়মুক্ত করতে পারেননি দুর্গাদাস। তাই আর কোনও বাধানিষেধ না মেনে কন্যার জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন মেমসাহেব শিক্ষয়িত্রী রেখে। তাই প্রসন্নময়ী সে যুগের মেয়েদের তুলনায় রীতিমত উচ্চশিক্ষিত ছিলেন।

প্রসন্নময়ী দেবী

পরিবারে কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা থাকলেও দুর্গাদাস চৌধুরী নিজে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও মুক্তমনের পুরুষ। নিজের ছেলেদের তিনি বিলেতে পাঠাতে কুণ্ঠিত হননি। তাঁর পুত্ররাও কৃতী। জ্যেষ্ঠ পুত্র আশুতোষ বিলেতফেরত ব্যারিস্টার – রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি প্রতিভার সঙ্গে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। কনিষ্ঠ পুত্র প্রমথ চৌধুরী বিখ্যাত লেখক ও তৎকালীন প্রখ্যাত ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর স্ত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীও রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি।

পিতা ও ভ্রাতাদের কাছ থেকে বাংলা ভাষা ও পাশাপাশি মেম শিক্ষিকার কাছ থেকে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা লাভ করেন প্রসন্নময়ী। মাত্র ষোলো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘আধ-আধ-ভাষিণী।’ ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী প্রসন্নময়ী কিশোরকালেই লিখেছিলেন ‘হবে নাকি এই দেশে ব্রাহ্মধর্মাচার।’ তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘বনলতা,’ ‘নীহারিকা,’ উল্লেখযোগ্য। সিপাহী বিদ্রোহের পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস ‘অশোক’ তাঁর বিশিষ্ট রচনা। ‘পূর্ব্বকথা’ নামক আত্মস্মৃতি সে যুগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দলিল। প্রসন্নময়ীর গদ্য রচনা ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল। বিশেষ করে সমাজকে সুচারুভাবে নিরীক্ষণ করে সাহিত্য রচনা সে যুগে নারীদের মধ্যে তো বটেই পুরুষ লেখকদের মধ্যেও খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু প্রসন্নময়ীর গদ্যে বিশেষ করে ‘পূর্ব্বকথা’য় সেকালের গোঁড়া সামাজিক আচার ব্যবহার আর রীতিনীতির তীব্র সমালোচনা লক্ষ্যণীয়।  

সুশিক্ষিতা বলে প্রসন্নময়ীর পরিচয় ছিল স্বর্ণকুমারীর পাশাপাশি। বিদ্বৎসমাজে এক ডাকে তাঁকে চিনতেন সবাই। সমকালে তিনি লেখিকা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির পাশাপাশি সে যুগের আর এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রসন্নময়ী সুন্দর একটি কবিতা রচনা করেছিলেন।

সন্দেশ এসেছে রে থালা নিয়ে আয়
খোকা খুকী দাদা দিদি আয়রে ত্বরায়
এ সন্দেশ টপ করে মুখে তুলে দিলে
খাইতে পারিনে রস একেবারে গিলে
মার কাছে ভাইবোন সকলে বসিয়া
ধীরে সুস্থে মিষ্টি রস লইব চুষিয়া
খাজা গজা রসগোল্লা আবার খাবার,
বাজারেও মিলিবে না এমন আবার।।

পিতার আলোকপ্রাপ্ত মনের প্রভাব প্রসন্নময়ীর স্বভাবের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত। সংস্কারবিহীন কর্তৃত্বপরায়ণতা ও আত্মসম্মানের প্রকাশ ছিল প্রবল। ভাইরাও তাঁকে সমীহ করে চলতেন। চৌধুরী পরিবারে পারিবারিক সম্মেলনের রীতি ছিল। পাশ্চাত্য দিনপঞ্জি অনুসারী প্রতিমাসের প্রথম রবিবারে চৌধুরী গৃহে সবাই মিলিত হতেন সেখানে প্রসন্নময়ীর স্থান ছিল সবার উপরে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘চলমান জীবনে’ এই ব্যাপারে বক্র আলোচনা দেখতে পাই। প্রসন্নময়ীকে লক্ষ করে বহু ব্যঙ্গাত্মক রচনাও লেখা হয়েছিল সেই যুগে। প্রবল প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্যই দৃঢ় এবং কঠিন মূর্তি বজায় রাখতে হয়েছিল প্রসন্নময়ীকে এ কথা বলাই বাহুল্য।  

সাহিত্য ও সমাজমূলক কর্মে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন প্রসন্নময়ী। পাশাপাশি চালিয়েছিলেন একমাত্র কন্যার বিদ্যাচর্চা। জন্ম থেকেই প্রিয়ম্বদার জীবন আর পাঁচটা বাঙালি শিশুর থেকে আলাদা। জন্ম হয়েছিল না পিতৃগৃহে না মাতুলালয়ে। বেড়ে ওঠা মাতামহের কাছেই। তবে দুর্গাদাস যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই কন্যা ও দৌহিত্রীর প্রতিপালন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে প্রসন্নময়ী ও তার কন্যাকে যাতে আর্থিক অসুবিধার সম্মুখীন না হতে হয় সেই উদ্দেশ্যে জমিদারের আয়ের একটি সুনির্দিষ্ট অংশের ব্যবস্থাও করে দিয়ে গিয়েছিলেন। 

কন্যাকে উন্মুক্ত শিক্ষা ও স্বাতন্ত্র্য দিয়ে বড় করেছিলেন প্রসন্নময়ী। মেধাবী ছাত্রী ছিলেন প্রিয়ম্বদা। ছোটো বয়সে কৃষ্ণনগরে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর ১৮৮২ সালে এগারো বছর বয়সি প্রিয়ম্বদা ভর্তি হন কলকাতার বেথুন স্কুলে। সেখান থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে অনার্স নিয়ে স্নাতক। কন্যার বিবাহ কিন্তু অল্পবয়সে দেননি প্রসন্নময়ী বরং সে যুগের তুলনায় একটু বেশি বয়েসেই প্রিয়ম্বদার বিবাহ হয়। বিবাহের তিন বছরের মধ্যে স্বামীর মৃত্যু হয় ক্ষয়রোগে। একমাত্র পুত্র এক বছরের তারাকুমারকে নিয়ে প্রিয়ম্বদা স্বামীগৃহ মধ্যপ্রদেশের রায়পুর থেকে কলকাতা মায়ের কাছে ফিরে আসেন।

শোকার্ত বিধবা কন্যাকে গভীর শোক আর সামাজিক আচার আর অনুশাসনে নিমজ্জিত হতে না দিয়ে হাতে কাগজ কলম তুলে দেন মা। দুঃখে উদ্বেল হয়ে অন্যের সহানুভূতি আদায় নয় – সংযতভাবে শোক সহ্য করে ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলি সযত্নে গোপন রেখে নিজেদের কাজে ব্যস্ত রাখার আদর্শ পেয়েছিলেন প্রিয়ম্বদা মায়ের কাছ থেকে। অকালপ্রয়াত জামাতার একটি জীবনচরিত লেখেন প্রসন্নময়ী। ‘মানসী’ পত্রিকায় এই লেখাটি ধারাবাহিকভাবে প্রায় একবছর ধরে প্রকাশিত হয়। জামাতার প্রতি স্নেহ, প্রীতি, ও শ্রদ্ধার ছাপ এই আলেখ্যর পাতায় পাতায়।

প্রাথমিকভাবে দুটি ধারায় লেখা শুরু করেন প্রিয়ম্বদা।

প্রথমতঃ কবিতা। কবিতাতেই মূলত প্রিয়ম্বদার উপলব্ধি বা ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তাঁর কবিতা কখনো বিষাদকরুণ কখনও ঈশ্বরের কাছে আত্মনিবেদনে মগ্ন আবার কখনো বা কবিতায় গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন। 

দ্বিতীয়তঃ শিশু-কিশোর সাহিত্য। প্রিয়ম্বদা হয়তো প্রথমে পুত্র তারাকুমারের জন্যই লেখা শুরু করেন। তবে পরবর্তীকালেও এই ধরনের শিশু-কিশোর উপযোগী বহু গদ্য বা কবিতা তিনি লিখেছেন যেগুলি মানের দিক থেকে যথেষ্ট উচ্চ।

সাহিত্য চর্চা আর সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রেখে স্বামী হারানোর শোককে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছিলেন প্রিয়ম্বদা। বেশ কয়েক বছর এমন কাটল। কিন্তু পারিবারিক বা সাংসারিক সুখ প্রিয়ম্বদার কপালে লেখা ছিল না। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে প্রিয়ম্বদা হারালেন একমাত্র সন্তান তারাকুমারকে। কাশীর সেন্ট্রাল স্কুলের শিক্ষার্থী তারাকুমার তখন মাত্র বারো বছরের বালক। স্কুলের বোর্ডিংএই কলেরায় মৃত্যু হয় তারাকুমারের। শেষ সময়ে পৌঁছোতেও পারেননি প্রিয়ম্বদা। 

ব্যক্তিগত জীবনে কন্যা দুঃখ পেলে সে দুঃখ শতগুণ হয়ে জননীর বুকে বেঁধে। অন্য যে কোনও মা হলে হয়তো নিজেই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়তেন। কিন্তু প্রসন্নময়ী ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। এই নিদারুণ দুঃখেও কিন্তু শোকে আবদ্ধ থাকতে না দিয়ে প্রসন্নময়ী কন্যাকে বোঝালেন যে জগৎ জুড়ে অনেক কাজ আছে। সেই কর্মযজ্ঞে অবশ্য ইতিমধ্যেই কিছুটা নিয়োজিত হয়েছিলেন মা মেয়ে। পরিস্থিতির প্রতিকূলতায় নতুনভাবে নিজেদের উজ্জীবিত করে আরও মনোনিবেশ করলেন সাহিত্য ও সমাজে। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল দুর্গাদাস চৌধুরীর পরিবারের। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম ও সভাসমিতিতে যোগ দিতেন প্রিয়ম্বদা। কর্মদক্ষতা ও কর্তব্য পরায়ণতায় তিনি সুদক্ষ ছিলেন কিন্তু স্বভাবটি ছিল আত্মপ্রচারবিমুখ। যখনই কোনো কাজের ভার নিয়েছেন বিনা কোলাহলে, সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তীব্র একাকীত্ব থাকলেও সামাজিক নিঃসঙ্গতা ছিল না প্রিয়ম্বদার। সামাজিক জীবনে কাছে পেয়েছিলেন বহু বিদগ্ধ সাংস্কৃতিক মনোভাবের মানুষকে। পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রনাথের ও জাপানি কবি ওকাকুরার সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেখানেও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন প্রিয়ম্বদা। শান্ত, সংযত জীবনকে সবসময় নিজের সাহিত্য আর সমাজ সচেতনতার মধ্যে নিয়োজিত করেছিলেন।

নারীদের মানসিক চর্চা ও কিছুটা আর্থিক স্বনির্ভরতার উদ্দেশ্যে স্বর্ণকুমারী দেবী ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ‘সখিসমিতি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। প্রসন্নময়ী ও প্রিয়ম্বদা দুজনেই এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন। ১৯০৬ সালে স্বর্ণকুমারীর কন্যা হিরন্ময়ী দেবী প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বিধবা শিল্পাশ্রম’ – পরে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম হয় ‘মহিলা শিল্পাশ্রম।’ পুত্রের মৃত্যুর পর ওই প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছুটা সময় নিজেকে নিযুক্ত রাখতেন প্রিয়ম্বদা। ১৯১০ সালে সরলা দেবী ‘ভারত – শ্রী মহামণ্ডল’ স্থাপন করেন। এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জন্মলগ্ন থেকে যুক্ত ছিলেন প্রিয়ম্বদা। পরবর্তীকালে একা হাতে ‘মহিলা শিল্পাশ্রম’ ও ‘ভারত – শ্রী মহামণ্ডল’ এর মতো দুটি বিশাল কর্মকেন্দ্র পরিচালনা করেছেন। বালিগঞ্জের বাড়ি ‘তারাবাসে’ প্রসন্নময়ী ও প্রিয়ম্বদা বাস করতেন। সেখানে বিধবাশ্রম ও ছাত্রীনিবাস খুলেছিলেন প্রিয়ম্বদা। শুধুমাত্র কলকাতাতেই নয় ময়মনসিংহের সেরপুরে পরোপকারী জমিদার গোপাল দাস চৌধুরী অনাথ বিধবাদের জন্য নিজের পিতার নামে ‘গোবিন্দকুমার হোম’ প্রতিষ্ঠা করলে প্রিয়ম্বদা সেই প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মের প্রচুর সহায়তা করেন। প্রসন্নময়ী ও প্রিয়ম্বদার বাড়িতে তাঁদের উভয়েরই পিতৃকুল, মাতৃকুল, ও শ্বশুরকুলের বহু ছাত্র প্রতিপালিত হতেন, আশ্রয় পেতেন বহু দুঃস্থ মানুষ।

চৌধুরী পরিবার স্বদেশী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। আশুতোষ চৌধুরী গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন বলে জানা যায়। তাঁর সানি পার্কের বাড়িতে দেশাত্মবোধক যাত্রাগান করতে আসেন চারণকবি মুকুন্দদাস। তাঁর দেশপ্রেম আর সঙ্গীত আকৃষ্ট করেছিল প্রিয়ম্বদাকে। পরবর্তীকালে মুকুন্দদাসের সঙ্গে প্রিয়ম্বদার স্নেহ ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বয়সে সাত বছরের ছোটো মুকুন্দদাস ‘মা’ বলে সম্বোধন করতে প্রিয়ম্বদাকে। অকালেই পত্নীবিয়োগ হয় মুকুন্দদাসের। তাই কারারুদ্ধ হবার সময় সাত বছরের শিশুকন্যা সুলভাকে কোথায় রেখে যাবেন ভেবে খুবই যখন তিনি চিন্তাগ্রস্ত – তখন প্রিয়ম্বদা সানন্দে আশ্রয় দিয়েছিলেন সুলভাকে। এই ঘটনা ব্রিটিশ শাসক খুব একটা ভালো নজরে দেখেননি। কিন্তু ভয় পাননি প্রিয়ম্বদা।

সাহিত্যিক প্রিয়ম্বদা ও তাঁর রচনা নিয়ে আলোচনা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয় – তবুও তাঁর রচনা সম্ভারের বিভাগগুলি একটু ছুঁয়ে যাওয়া যাক।

প্রিয়ম্বদার লেখাগুলিকে মূলত ভাগ করা যায় কবিতা, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণমূলক রচনা, মৌলিক ও সত্য ঘটনামূলক গল্প, শিশুপাঠ্য গল্প, ও সরাররি অনুবাদ বিভাগগুলিতে। বাংলা ও ইংরাজি উভয় ভাষাতেই তিনি সুদক্ষ ছিলেন। ইংরাজি ভাষায় ওকাকুরাকে লেখা চিঠিগুলির গুণগত উৎকর্ষ উচ্চমানের।

প্রসন্নময়ীর চারিত্রিক সবলতা ও ব্যক্তিত্বের জোর পিতৃগৃহবঞ্চিত, স্বামীহীনা প্রিয়ম্বদাকে কখনও অসহায় বোধ করতে শেখায়নি। প্রিয়ম্বদার সহজ আত্মনির্ভরতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটেছিল মায়ের সংস্পর্শেই।  নিষেধের বাঁধন বা অত্যধিক আদর কোনোটিতেই না আগলে রেখে নিজস্ব মর্যাদাবোধে কন্যার মননশীলতাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন প্রসন্নময়ী। সমাজের নিন্দা ও সমালোচনা উপেক্ষা করার শিক্ষাও প্রিয়ম্বদা পেয়েছিলেন মায়ের কাছেই।

তীব্র শোকের মধ্যেও কন্যার মনটিকে সাহিত্যকর্ম অভিমুখী করেছিলেন প্রসন্নময়ী। কন্যার জীবনের শেষ দিনটি অবধি পাশে থেকেছেন তিনি। এক শতাব্দী আগে ব্যক্তিগত ছিন্নভিন্ন সংসারবৃত্তে মাতা কন্যার এই সুচারু সম্পর্ক আধুনিক সমাজজীবনেও বিরল।

———-

তথ্যঋণ

১) চক্রবর্তী, সুমিতা। (১৯৯৬)। শব্দ নৈঃশব্দ্যের চিত্র। কলকাতাঃ ওয়েব ইমপ্রেশন।

২) গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র। (১৯৫৬)। চলমান জীবন। কলকাতাঃ বিদ্যোদ্যয় লাইব্রেরি প্রাইভেট লিমিটেড।

৩) শীল, রবীন্দ্রকুমার। (২০১২, ২০শে সেপ্টেম্বর)। সার্ধশততম জন্মদিবসের আলোকে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। কলকাতাঃ পুরশ্রী।

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

অদিতি পেশায় গণিতের অধ্যাপক। নেশা লেখালেখি। বাস আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, বাংলা লাইভ, অপার বাংলা, বাতায়ন, শব্দের মিছিল, ও কলকাতা, ড্যাশ পত্রিকা সহ পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। আমেরিকা থেকে প্রকাশিত 'অভিব্যক্তি নিউ জার্সি' পত্রিকার সম্পাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *