পলাশের খোঁজে হুলুস্থূল অভিযান (প্রথম পর্ব)
যাত্রা
পলাশ ফুটেছে? ব্যাস, আর চুপচাপ বসে থাকার প্রশ্নই ওঠে না! কথায় আছে, “উঠল বাই, তো কটক যাই!” কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হল, “ফুটল পলাশ, তো ব্যাগ গোছাও আর পালাও!” আটজনের দুর্দান্ত দল তৈরি—কাণ্ডারী: মউ ও পার্থ (এঁদের নেতৃত্বে অভিযান কতদূর গিয়ে ঠেকবে, তা ভবিতব্যই জানে!) সাহসী সহযাত্রী: শীলা-সুমন্ত, মৈত্রীদি-দেবযানী, লাবণ্য-দেবমাল্য।
হাওড়া থেকে বন্দে-ভারত এক্সপ্রেসের টিকিট কনফার্ম, থাকার জন্য ‘ও২ রিসোর্টে ব্যাকআপ’, তিনদিনের জন্য দুটো গাড়ি ভাড়া—সব দিক থেকে ‘ফুলপ্রুফ’ প্ল্যানিং! কিন্তু সমস্যা একটাই—এই দলকে সামলাবে কে? ট্রেন ছাড়ার আগেই বোঝা গেল, এটা নিছক একটা “পলাশ ট্রিপ” নয়, বরং একেবারে “পলাশে পলাশে মহাভারত!”
পার্থ সাহেব ঘোষণা করলেন, “আমি যখন গাইড, চিন্তার কিছু নেই!” পিছন থেকে মউ-এর খোঁচা, “ওইটাই তো চিন্তার আসল কারণ!” এদিকে লাবণ্য রিসর্টের লোককে ফোন করে বলছে, “ভাই, গরম জল থাকবে তো?” ওপাশ থেকে উত্তর এল, “আশা করি, পলাশ দেখতে যাচ্ছেন, গিজার টেস্ট করতে নয়!” গাড়ির চালকও আমাদের দেখে কেমন যেন থমথমে মুখে বলল, “আপনারা ঠিক তিন রাত তিন দিন থাকবেন তো?” শীলা হাসতে হাসতে বলল, “আমাদের দেখে মনে হচ্ছে বেশি দিন থেকে যাব?” সবার মুখে হাসি, ব্যাগ ভর্তি উচ্ছ্বাস, আর সামনে এক দুর্দান্ত সফর!
পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমতম জেলা, ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ, যেখানে প্রকৃতি তার অনাবিষ্কৃত রহস্য ও অপরূপ সৌন্দর্য উন্মোচন করে। পাথুরে ও ঢেউখেলানো এই ভূ-প্রকৃতির প্রধান আকর্ষণ পাহাড়, অরণ্য এবং প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। পুরুলিয়া শহর থেকে মাত্র ১৯ কিমি দূরে অযোধ্যা পর্বতের ঢালে সবুজে মোড়া ধলভরু ও গজভরু পাহাড় নজর কাড়ে।
হেসলা থেকে বাঁ দিকে ১ কিমি এগোলেই গজভরু পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘ও২ জোন রিসোর্ট এবং অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প’, প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আদর্শ অফবিট গন্তব্য। ঢুকতেই মন কেড়ে নেবে মাটির ঘর, সবুজ প্রান্তর আর পিছনের পাহাড়। স্থানীয় সাঁওতাল, কুরমি, খেড়িয়া-শবর সম্প্রদায়ের সুর ও তাল এই ভূমিকে আরও মোহময়ী করে তোলে। সন্ধ্যায় গজভরুর পেছনে ডুবে যাওয়া সূর্যের রং বদল আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারার মেলা অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা এনে দেবে। দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসবে মাদলের মৃদু সুর।
বন্দে-ভারতের রাজকীয় যত্নআত্তি (বিকেলের চা-বিস্কুট থেকে শুরু করে রাতের মুখরোচক ডিনার) সব উপভোগ করেই প্রায় নির্দিষ্ট সময়, সন্ধ্যা ৭:৪৫-এ এসে পৌঁছলাম ঝকঝকে তকতকে পুরুলিয়া স্টেশনে।
প্ল্যাটফর্মে নামতেই দেখি, একগাল হাসিমুখে সরল সিধেসাধা তাপস, তার বলেরো গাড়ি নিয়ে একেবারে তৈরি আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। মিনিট দশেকের মধ্যে শহরকে পিছনে ফেলে, অন্ধকার ফুঁড়ে ছুটল আমাদের বলেরো। কিন্তু সত্যি বলতে, যা দেখে অবাক হতে হল—এত গ্রামের ভিতরে এত মসৃণ পিচঢালা রাস্তা! বিশ্বাসই হচ্ছিল না! অন্যান্য রাজ্যে ঘুরেছি, কিন্তু এমন চমৎকার রাস্তা কোথাও চোখে পড়েনি! মনে হচ্ছিল, গাড়ি না, কোনো রাজকীয় পালকি চড়ে চলেছি! তারপর মেঠোপথ ধরে একের পর এক গ্রাম পেরিয়ে, এক ঘণ্টা টানা জার্নির পর এসে পৌঁছালাম আমাদের থাকার জায়গায়। শহুরে ট্র্যাফিক আর গর্তভরা রাস্তার সঙ্গে তুলনা করলে, এ একেবারে ‘স্পেস-টাইম ওয়ার্প’ বলে মনে হচ্ছিল!
এখন রাত প্রায় সাড়ে নটা। ঘর গুছোতে খানিকটা সময় নিলাম, তারপর শুভ রাত্রি জানালাম। রাতের খাবারের পাট বন্দে-ভারতেই চুকে গেছিল।
পরের দিন ও তারপরের দিন
এই দু’দিন এমনভাবে চষে বেড়িয়েছি যে, মনে হচ্ছে গোটা মানভূম আমাদের পায়ের তলায়! এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়িয়েছি—ভিউ পয়েন্ট, অজন্তা পাহাড়, মুর পাহাড়, মার্বেল লেক, বাবনি ফলস, দুর্গা ফলস, কত রকমের ড্যাম, চরিতা গ্রাম বা মুখোশ গ্রাম, কেষ্টপুর বাজার, কাশীপুর রাজবাড়ি, জয়চন্ডী পাহাড়, গৌড় পঞ্চকোট, পাঞ্চেত, বাড়ন্তি ড্যাম, সীতা কুণ্ড, সেনাবোনা হাট… তালিকাটা এত লম্বা যে, এখনই যদি না থামি, আপনারা ভাববেন আমি কোনো ট্যুরিস্ট গাইডের বই মুখস্থ করে এসেছি!
তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে—সব জায়গা সমানভাবে মনে দাগ কাটতে পারেনি। কিছু জায়গায় গিয়ে মনে হয়েছে, “ও মা! এটুকুর জন্য এত হাঁটলাম?” আবার কিছু জায়গায় গিয়ে তো চোখ কপালে! মনে হয়েছে, “এটাই বোধহয় আমার দেখা স্বর্গ!”
তবে একটা জিনিস নিশ্চিত—এই সফরের শেষে আমার পা দুটো এখন ট্রাকের চাকা, আর শরীর যেন একদম ‘লো ব্যাটারি’ মোডে ঢুকে গেছে! কিন্তু তাও কিছু জায়গা আছে, যেগুলো মন থেকে নামবেই না। ওগুলো ঠিক মনে গেঁথে বসেছে, যেমন জুতোয় পাথর ঢুকলে বসে যায়।
জয়চণ্ডী পাহাড়
জয়চণ্ডী পাহাড়ের নাম শুনলেই মাথায় আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে!’ কিন্তু বাস্তবে এই পাহাড়ের রাজত্ব হাঁটু, পেশি আর নিঃশ্বাসের ওপরে চলে! পুরুলিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, চারদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রক ক্লাইম্বিংয়ের তীর্থস্থান—সব ঠিক আছে, কিন্তু আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় সিঁড়ি ধরার পর!
রঘুনাথপুর থেকে দু’কিলোমিটার, আদ্রা থেকে চার কিলোমিটার—দূরত্বটা শুনে ভাববেন, “আহা! এক পায়ে চলে যাব!” কিন্তু পাহাড়ের গায়ে ঠেসে বসানো ৫২০টা সিঁড়ি দেখে প্রথমেই বুঝে গেলাম, এ এক ভয়ংকর মিশন! শুরুতে ভাবলাম, ‘এ তো আমিও পারব! এত কিছু না!’ কিন্তু দশটা সিঁড়ি ওঠার পরেই মনে হল, ‘কেউ দয়া করে আমাকে পিঠে করে নিয়ে যাবে?’
আমার সঙ্গে ছিল মৌ আর দেবমাল্য। ওরা প্রথমে খুব উৎসাহ নিয়ে উঠছিল—যেন এভারেস্ট সামিট করতে যাচ্ছে! কিন্তু খানিক পরেই সিঁড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের উৎসাহও কমতে লাগল। ১০০ ধাপ উঠতেই দেবমাল্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “দাদা, আর একটাও সিঁড়ি উঠলে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে!” মৌও বলল, “আমি বরং নীচে বসে প্রকৃতি উপভোগ করি, তোমরা উপরে গিয়ে ছবি তুলে আনো!” ব্যাস, এরপর ওরা নামতে শুরু করল, আর আমি একলা ‘শেরপা মোড’-এ উঠে চললাম!
মনে মনে ভাবছিলাম, ‘অক্টোবরের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকের আগে এটা একদম পারফেক্ট ট্রেনিং!’ কিন্তু যখন ৫২০টা সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছলাম, তখন সত্যিই মনে হল, আমি যেন শিখর জয় করলাম! ওপরে পৌঁছে চোখের সামনে যে দৃশ্য এল, তাতে সব কষ্ট নিমেষেই উড়ে গেল! ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ের নীচে ছোট ছোট গ্রাম, দূরে অজস্র সবুজ আর দিগন্ত জোড়া মেঘের খেলা! মনে হল, ‘আরে! এতদিন এতো সুন্দর একটা জায়গা এড়িয়ে গেলাম কেন?’
চূড়ায় চণ্ডীমাতার মন্দির দেখে মনে হল, ‘এত ধকলের পর এখানে এসে পুজো না দিলে পাপ হবে!’ তাই মন দিয়ে প্রণাম সেরে নিলাম। এরপর শুরু হলো নামার পালা। মনে মনে বলছিলাম, ‘এবার সিঁড়ি নেমে গুনব, দেখি সত্যিই ৫২০টা নাকি দেড় হাজার!’
তবে জয়চণ্ডী পাহাড় শুধু পর্যটনের জায়গা নয়, এটা আসলে আপনার স্ট্যামিনার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একেবারে উপযুক্ত স্থান! যদি কেউ আপনাকে বলে, “আমার ফিটনেস খুব ভালো!” তবে তাকে এখানে এনে ৫২০টা সিঁড়ি ধরিয়ে দিন—সত্যিটা বেরিয়ে যাবে!
তবে বসন্তকালে এখানে আসা বেস্ট! কারণ তখন প্রকৃতির রঙ একদম চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। আর যদি আপনি সিঁড়ি দেখে ভয় না পান, তাহলে এখানে একবার আসতেই হবে! শুধু মনে রাখবেন, “পাহাড় ডাকবে, হাঁটু কাঁপবে, কিন্তু মন বলে উঠবে—আহা, এমন জায়গায় বারবার আসতে হয়!”
সেনাবোনা হাট
পুরুলিয়ার বুকে লুকিয়ে থাকা এক জাদুকরী জায়গা– সেনাবোনা হাট! কেউ যদি বলে, “হাট মানে তো স্রেফ কেনাকাটা, এতে এমন কী?” তবে তাকে এখানে একবার এনে ছেড়ে দিন, হাটের গন্ধেই তার মন বদলে যাবে! এটি শুধু একটি বাজার নয়, এটি এক বিশাল অভিজ্ঞতা—রঙে, গন্ধে, স্বাদে, সংস্কৃতিতে, আর মানুষে-মানুষে মিলনের এক অনন্য মিশ্রণ।
হাটের দিন এলেই আশপাশের গ্রামের মানুষ দল বেঁধে চলে আসে—হাতে নিজের ফলানো শাকসব্জি, গরুর দুধ, হাতে বানানো বাঁশের জিনিস, মাটির হাঁড়ি-কলসি, এমনকি কিছু হাঁস-মুরগিও থাকে! আর দাম? শুনলেই শহরের মানুষ আঁতকে উঠবে—এত কম দামে জিনিস! দামগুলো না হয় নাই বললাম, সকলকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রইলাম। এমন সস্তায় জিনিস দেখে মনে হচ্ছিল, পুরো হাটটাই কিনে ফেলি! তাই স্যাম্পল হিসেবে মাত্র পাঁচ টাকায় দু’আটি কাঁচা সবুজ ছোলা কিনে ফেললাম—সেই ছোলার স্বাদ যেন গ্রামবাংলার সরলতা নিয়ে এসেছিল জিভের ডগায়!
দেবযানী ও শীলা একসঙ্গে বলে উঠল, “এই, গরম জিলিপির গন্ধ, খেলে হয়!” অমনি শীলার কটমটে চোখ আমার দিকে, “তুমি ওদিকে একপাও যাবে না সুগার রিপোর্টটা মনে আছে তো!”
হাটের বিশেষ আকর্ষণ:
পকেট ফ্রেন্ডলি বাজার: দাম শুনে গড়াগড়ি খাবেন, শহরের এক কাপ কফির দামে এখানে গোটা সপ্তাহের বাজার হয়ে যাবে!
উল্লাসের গন্ধ: চিঁড়ে-মুড়ি, ঝালমুড়ি আর ঘুঁটের আগুনে সেঁকা মাংসের গন্ধে পুরো হাট মাতোয়ারা! এখানে ঢুকলেই পেট খিদেয় গর্জন শুরু করবে!
লোকসংস্কৃতির স্বর্গ: কখনও বাউল গান, কখনও ঝুমুর নাচ, কখনও বা গাজনের ঢাকের শব্দ—এই হাট যেন শুধুই বাজার নয়, এক জমজমাট মেলা!
খবরের আদান-প্রদান কেন্দ্র: এখানে শুধু পণ্য বেচাকেনা হয় না, কে কার গরু বেচল, কার শ্বশুরবাড়ি ঝগড়া করেছে, কে চুপিচুপি জমি কিনছে—এসব তথ্যও ফ্রিতে পাওয়া যায়!
এমন জমজমাট হাটের গন্ধ নাকে আসতেই আমার মনের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল! শৈশবের স্মৃতি দরজায় কড়া নাড়ল—হুট করে মনে পড়ে গেল বিহারের সমস্তিপুরের সেই ‘পেঠীয়া!’ আমাদের আমাদের ছোট্ট শহরের বাজারকে আমরা “হাট” বলতাম না, বলতাম ‘পেঠীয়া!’ প্রতি রবিবার জমত সে হাট, আর আমার ছোটোবেলার খুশি মানেই ছিল বাবার হাত ধরে বাজার ঘোরা!
কিন্তু আজ? আজ আমি মুম্বাইয়ের ইঁদুর দৌড়ে বন্দি, যেখানে সব আছে—মল, সুপারমার্কেট, ব্র্যান্ডের দোকান, কাঁচা বাজার, কিন্তু নেই সেই হাটের প্রাণ, নেই সেই সম্পর্কের উষ্ণতা! সেনাবোনা হাটে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, কেন পড়ে আছি োই ব্যস্ত শহরে? কেন হারিয়ে ফেললাম এই সরল, প্রাণবন্ত জীবন?
কিন্তু জীবন তো আর পুরোনো দিন ফেরায় না! তাই হাট থেকে ফিরে আসার সময় শুধু একটাই অনুভূতি হল, ‘শৈশব ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু কিছু মুহূর্ত হৃদয়ের কোণে রয়ে যায়, যেগুলো আবার কোনো এক সেনাবোনা হাটে গিয়ে প্রাণ ফিরে পায়!’
পুরুলিয়ার চরিতা গ্রাম – মুখোশের গ্রাম
পুরুলিয়ার গ্রামে-গ্রামে ছড়িয়ে আছে লোকশিল্পের অজস্র রঙিন ধারা, আর তারই অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি চরিতা গ্রাম—যাকে সবাই চেনে ‘মুখোশের গ্রাম’ নামে! এই গ্রাম যেন এক জীবন্ত শিল্পশালা, যেখানে কাগজ, মাটি, কাঠ, রং আর মানুষের হাতে তৈরি হয় অসাধারণ সব মুখোশ।
চরিতা গ্রামের লোকশিল্পীদের তৈরি মুখোশ শুধু পুরুলিয়াতেই নয়, সারা বাংলায় বিখ্যাত। মূলত ছৌ নাচের জন্য ব্যবহৃত এই মুখোশগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এর উজ্জ্বল রং, সূক্ষ্ম কারুকাজ, আর বৈচিত্র্যময় নকশা। পৌরাণিক কাহিনি, দেব-দেবতা, রাক্ষস, পশু-পাখি—সবকিছুরই প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে এই মুখোশে।
প্রথমে কাগজ, মাটি ও কাপড় দিয়ে তৈরি হয় মুখোশের কাঠামো। সেটিকে রোদে শুকিয়ে দেওয়া হয়, তারপর গাছের আঠা দিয়ে শক্ত করা হয়। এরপর আসে রঙের কাজ—তুলির এক একটা আঁচড়ে মুখোশ যেন প্রাণ ফিরে পায়!
এখানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুখোশ তৈরির কাজ হয়। গ্রামবাসীদের জীবিকা মূলত এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এখানকার মুখোশ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয়।
কথা হচ্ছিল শিল্পী গনেশ সূত্রধরের সঙ্গে। মুখোশের ওপর তুলির আঁচড় টানতে টানতে একটা ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিল।
জিজ্ঞেস করলাম, “কার্ডের ওপর লেখা অনু, তনু এরা কে?”
“আমার মেয়েরা!”
পাশে বসা মহিলাকে দেখে মনে হল তার বউ। দেখতে মিষ্টি, আঁকতে আঁকতে একবার আমার দিকে তাকায় একবার তার স্বামীর দিকে।
জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বউ?”
মুচকি হাসল গণেশ।
“আচ্ছা ও কতটা সাহায্য করে?”
“ওই তো বেশি করে। আমি যখন প্রতিমে গড়তে যাই তখন তো ওই সব দেখে। তাহলে ওর নামটা নেই কেন?” গণেশ আঁকতে থাকে, বউএর মুখটা খানিকটা রাঙা হয়ে উঠে আরও সুন্দর হয়ে উঠল। শীলাকে বললাম, “এখান থেকেই কেনো যা কেনার, আর দরদাম কোরো না!”
ওঠার আগে কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে গণেশের বউকে বললাম, “তোমার নামটা লিখে দাও।” কার্ডর পেছনে সে লিখে দিল ‘আলো সূত্রধর।” এদের এই সরল জীবন দেখে হিংসে হল।
মৈত্রীদি হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছিলেন, জিজ্ঞেস করলাম,”হয়ে গেছে সব কেনা?”
বললেন, “না একটা কিছু খুঁজছি!”
বললাম, “এখানে দেখতে পারেন।” বাকি সকলের হাতেই কয়েকটা প্যাকেট ঝুলছে।
পার্থ বলল, “আপনারা কিনুন আমি ততক্ষণে ভিডিওটা করেনি!”
এই গ্রামের বিশেষত্ব:
১) ছৌ নাচের প্রাণ: ছৌ নাচ মানেই বাহারি মুখোশ দেবতা থেকে অসুর, বীর থেকে দৈত্য—সব চরিত্রের মুখোশ তৈরি হয় এখানেই!
২) হাট-বাজারে বিক্রি: পুরুলিয়ার বিভিন্ন হাটে, বিশেষ করে বাঘমুন্ডি, বলরামপুর, বান্দোয়ান অঞ্চলের মেলায় এই মুখোশ দারুণ জনপ্রিয়!
৩) পর্যটকদের আকর্ষণ: এখন শুধু নাচের শিল্পীরা নয়, পর্যটকরাও এই মুখোশ সংগ্রহ করেন ঘর সাজানোর জন্য!
৪) লোকশিল্পের টান: আধুনিক ডিজিটাল যুগেও কিন্তু এই গ্রাম তার লোকশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
শহরের কৃত্রিম জীবনে ক্লান্ত? পুরুলিয়ার চরিতা গ্রামে একবার ঘুরে আসুন, লোকশিল্পের এক টুকরো স্বর্গ দেখে মন ভালো হয়ে যাবে!
বাঘমুন্ডিতে দুপুরের খাওয়া
দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন আমাদের সারথি তাপস জানাল, কাছেই বাঘমুন্ডিতে ‘মা তারা হোটেল’ নামে একটা ভালো জায়গা আছে। শুনে আমাদের কাণ্ডারী পার্থ বলল, “চালাও গাড়ি সেদিকে, একটু দেখে আসা দরকার। নাহলে যাত্রীদের বিক্ষোভ মিছিল আটকানো মুশকিল হবে!”
যেই কথা, সেই কাজ। পার্থর পছন্দ একদম ঠিকঠাক—হোটেল নতুন, তাই ঝকঝকে তকতকে। ঢুকতেই মনে হলো যেন সদ্য রং করা হয়েছে।
বসতে না বসতেই এল তালপাতার থালা। বড় বাটিতে এল ভাত আর কলাইয়ের ডাল। সঙ্গে দু’রকমের সবজি—তার মধ্যে একটাই চেনা, সেই বিখ্যাত পোস্তর তরকারি! আরও ছিল একটু শাক ভাজা, পোস্তর বড়া, মাছের ঝাল, পাঁপড়, চাটনি আর স্যালাড। দেখেই মনে হল, আহারে যেন বঙ্গভূমির সেরা সুধা!
খাবারের স্বাদ নিতে নিতে আমাদের মনে পড়ল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা—তিনি তো খাবারের ব্যাপারে বেশ রসিক ছিলেন। একবার নাকি তিনি বলেছিলেন, “পেট যত খুশি, মন তত প্রশান্ত।” আমাদেরও তখন ঠিক সেই অবস্থা! আর পোস্তর বড়া দেখে মনে হলো, বিদ্যাসাগর মহাশয় থাকলে নির্ঘাত বলতেন, “শিক্ষার থেকেও এই বড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ!”
আর দাম? সে তো এমন যে শুনলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে! সত্যি বলছি, এমন আহার একবার খেলে অন্তত মাস দু’য়েক গল্প করার মালমশলা জুটে যায়।
শেষ পর্বঃ ফেরা
তিন দিনের চকচকে সফরটা যে কখন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল, টেরই পেলাম না! আহা, বেড়াতে যাওয়া তো একেবারে সিনেমার শুরুর মতো—উত্তেজনা, আনন্দ, আর একরাশ রঙিন মুহূর্ত! আর ফেরার সময়? সে তো যেন সিনেমার ট্র্যাজিক ক্লাইম্যাক্স—সব রং হঠাৎ ফ্যাকাসে!
সত্যি বলছি, বেড়ানোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ফেরা।
“ভ্রমণ আনন্দদায়ক, কিন্তু ঘরে ফেরা বিষাদময়”—এ কথা বোধহয় কোনো বুদ্ধিমান পর্যটকই বলে গিয়েছিলেন! আর আমার তো মনে হয়, ব্যাগ গোছানো আর মন গোছানো, দুটোই সমান কঠিন।
সকালে যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বলছিলাম, “ওহ! জীবন কত সুন্দর!” সন্ধ্যায় ব্যাগ গুছাতে গুছাতে তখন মনে হচ্ছে, “ওহ! জীবন কত নিষ্ঠুর!” আবার সেই রুটিন, সেই ট্রাফিক, সেই অফিসের কাজের চাপ! আহারে, ছুটির দিনগুলো এত ছোটো আর মাসের কাজের দিনগুলো এত লম্বা কেন? এটা কি ভ্রমণপ্রেমীদের ওপর প্রকৃতির নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্র নয়?
———-
ছবিঃ লেখক। শেষ ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
