যে মানহানি মামলায় বাদিনীর পক্ষে ক্ষতিপূরণ ধার্য হলো মাত্র এক আনা

যে মানহানি মামলায় বাদিনীর পক্ষে ক্ষতিপূরণ ধার্য হলো মাত্র এক আনা

প্রাচীন কলকাতা শহরের বুকে ঘটে যাওয়া অতীতের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে ঘিরে আমাদের আজকের কথকতা শুরু হতে চলেছে। পশ্চিমে হুগলি নদী আর তারই পূর্ব তীরে কলকাতা, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। প্রাচীনতম স্থাপনা, ফোর্ট উইলিয়াম, আর তাকে বেষ্টন ক’রে থাকা বিস্তীর্ণ, খোলা, সবুজ ময়দান। উত্তরে ডালহৌসি স্কোয়ার। তারও আরও উত্তরে হেদুয়া স্কোয়ার যা পূর্বে কর্নওয়ালিস স্কোয়ার নামে পরিচিত ছিল। বেথুন কলেজ এবং স্কটিশ কলেজ সেখানেই অবস্থিত ছিল। এখানে স্কটিশ চার্চ কলেজের নাম সম্বন্ধে দু’চার কথা বললে বোধয়  খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না, যদি হয়, তাহলে আমি শ্রোতাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ১৮৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজটি পূর্বে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত জেনারেল অ্যাসেম্বলির ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিত ছিল- প্রেসবিটারিয়ান মতের অনুসারী প্রোটেস্টান খ্রিস্টানদের দ্বারা পরিচালিত চার্চের নামানুসারে এই নাম।  তারপরে ১৮৪৩ থেকে -১৮৬৩ অবধি এর নাম হয় ফ্রি চার্চ ইনস্টিটিউশন, ১৮৬৩ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত ডাফ কলেজ হিসাবে উল্লেখ করা হত। এরপর, ১৯০৮ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এটি স্কটিশ চার্চেস কলেজ নামে পরিচিত ছিল এবং ১৯২৯ সালে এর বর্তমান নাম স্কটিশ চার্চ কলেজ গ্রহণ করা হয়। 

সেসময় কলকাতার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ছিল স্কটিশ প্রবাসীরা, তাঁরা মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কেউ সৈন্য, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ বা আবার পাট ও নীলজাত পণ্য সরবরাহকারী কৃষিবিদ, এছাড়া ছিলেন চার্চ অফ স্কটল্যান্ড এবং স্কটিশ ফ্রি চার্চ এই  দুই সংস্থার মিশনারিরা। পুরোনো কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটতে বসে কলকাতা হাইকোর্টের কথা আসবে না তা কী করে হয়। বিশেষত আজকের কাহিনিতে তার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৮৭২ সালে নির্মিত এই ভবনটি বেলজিয়ামের ইপ্রেস-এ অবস্থিত ১৩ শতকের ক্লথ হলের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ক্লথ হলটি ধ্বংস হয়ে যায়। শুনলে অবাক হতে হয়, বেলজিয়ামের স্থপতিরা ইপ্রেস-এ ভবনটি পুনর্নির্মাণের জন্য কপিটি অনুলিপি করতে কলকাতায় এসেছিলেন। পুনর্নির্মিত ভবনটি এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।    

আমাদের গল্পের নায়িকা ছেচল্লিশ বছর বয়সী অবিবাহিত মেরি হেনরিয়েটা পিগট। মেরি পিগট ১৮৩৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চন্দননগরে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯ নভেম্বর কলকাতার সেন্ট জনস চার্চে দীক্ষিত হন। তাঁর বাবা ছিলেন স্কটিশ নীলকর জুলিয়াস পিগট এবং তাঁর মা ফরাসি ডেসিরি ক্যাসাবন। জুলিয়াস ১৮৩২ সালের আগস্ট মাসে ডেসিরিকে যখন বিয়ে করেন, ডেসিরির বয়স তখন ছিল ১৬ বা ১৭ বছর এবং বিয়ের সার্টিফিকেটে তাঁর নাম কিন্তু ‘ডরোথি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁরা ১৮৪২ সালে বা তার আগে কলকাতায় চলে আসেন এবং মেরি সেখানেই বেড়ে ওঠেন। মেরি পিগট ‘মিশ্র জাতি’ বা ‘ইউরেশিয়ান’ হিসেবে বিবেচিত হন, যদিও জুলিয়াস বা ডেসিরির বংশপরম্পরা সম্পর্কে তেমন বেশি কিছুই জানা যায় না। তবে মেরি পিগট যে প্রকৃতপক্ষে মিশ্র বর্ণের ছিলেন তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হল যে তিনি যে তা ছিলেন না তেমন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায় না।

১৮৭০ সালে চার্চ অফ স্কটল্যান্ড মিশন মেরিকে স্কটিশ মহিলা মিশনের লেডি সুপারিন্টেন্ডেন্টের পদে নিয়োগ করে। স্কটিশ অরফানেজে তাঁর এই চাকরি গ্রহণের আগে মেরি বেথুন কলেজে শিক্ষকতা করতেন। মেরি ছিলেন একজন মহান সংগঠক, একটা অরফ্যানেজ, এবং বেশ কয়েকটা ডে স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি, তিনি মিশনে ভারতীয় মহিলা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি নিয়মিত ইউরোপিয়ান ও বাঙালি খ্রিস্টানদের মাসিক সামাজিক সভা আয়োজন করতেন। তাঁর শক্তি এবং উদ্যমের কারণে স্কটল্যান্ড এবং কলকাতা উভয় জায়গাতেই মেরি যথেষ্ট সমর্থন এবং সহায়তা পেয়েছিলেন।   

এবার আসুন সোজা ঢুকে পড়ি গল্পের ভিতরমহলে। সময়টা তখন ১৮৮৩ সাল, সেপ্টেম্বর মাস, কাগজে কলমে হেমন্ত হলেও বর্ষা মরসুম তখনও বিদায় নেয়নি। স্থান কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি উইলিয়াম নরিসের গুমোট আদালত কক্ষ যেখানে রুজু হয়েছে এক অশ্রুতপূর্ব মানহানির মামলা। বাদিনী মিশনারি মেরি পিগট, বিবাদী একচল্লিশ বছর বয়সী স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড উইলিয়াম হেস্টি।   

প্রশ্ন হল হেস্টির বিরুদ্ধে মেরি কেন এই মামলা করলেন! 

স্কটিশ মহিলা মিশনের লেডি সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসাবে গত দশ বছর ধরে তিল তিল করে যে মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মেরি প্রাণপাত চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন, মিশনের তহবিল সংগ্রহের কাজে, নারীদের শিক্ষিত করার ব্রতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন, হেস্টির বিদ্বেষপূর্ণ মিথ্যা বক্তব্যের কারণে সেই সাধের মিশন থেকে ১৮৮২ সালে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, হেস্টি তাঁর চরিত্রেও যথেচ্ছ কালিমা লেপন করেছেন। মেরির ভবিষ্যৎ এখন ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে। মেরি নিজে এই কলঙ্কজনক মিথ্যাচার মেনে নিতে চান না, নিজের আইনি অধিকার বুঝে নেবার দাবিতে তাই তিনি হেস্টির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। মেরির অভিযোগের উত্তর দিতে প্রতিপক্ষ হেস্টিও কোটের আস্তিন গুটিয়ে এগিয়ে এসেছেন। তিনি মেরির বিরুদ্ধে মহিলা মিশন পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা এবং অনৈতিকতার অভিযোগ এনে পাল্টা লড়াই ছুঁড়ে দিয়েছেন। এছাড়াও কিছু যৌন অসঙ্গত ব্যবহারের কারণ দর্শিয়ে হেস্টি আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা মেরিকে কাঠগড়ার দিকে ঠেলে দেন।   

উনিশ শতকের শেষের দিকের এই ঐতিহাসিক বিচার ‘ক্যালকাটা মিশন স্ক্যান্ডাল অফ এইটিন এইটিথ্রি’ নামে পরিচিতি পায়। ‘দা ক্যালকাটা ডিফেমেশন’কেস নামেও অনেক সংবাদমাধ্যমে এর উল্লেখ রয়েছে। মিস পিগটের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন মিঃ জ্যাকসন, মিঃ ট্রেভেলিয়ান এবং মিঃ ও’কাইনালি; এবং আসামীর পক্ষে উকিল ছিলেন মিঃ গ্যাস্পার এবং মিঃ পিয়ারসন।   

এই কেস নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু ক’রে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের গির্জা আদালত পর্যন্ত হুলুস্থুলু বেঁধে যায়। কট্টর পুরুষতন্ত্রের বাতাবরণের ভিত্তরে থেকেও এক মহিলার নিজ অধিকার আদায়ের জন্য একজন পুরুষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আইনি দাবি করছেন – সর্বযুগেই এ এক রীতিমতো বিনোদনের ব্যাপার! তাই না?  

কিন্তু, কেন এই মামলা লড়ালড়ি? এইরকম একটা ব্যক্তিগত ঝগড়াকে খোলাবাজারে পণ্য না ক’রে মিশনারি সম্প্রদায় কি নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে অভিযোগগুলো মিটিয়ে নিতে পারতেন না? আসলে মেরির বিরুদ্ধে আনা হেস্টির প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগগুলো প্রথমে স্কটল্যান্ডের মহিলা সমিতির কাছে পাঠানো হয়, তাঁরা কিন্তু সবকিছু পরীক্ষা করে মেরিকে সমস্ত দোষ থেকে অব্যাহতি দেন। মরিয়া হয়ে হেস্টি এরপর বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বেশ কয়েকটি চিঠি স্কটল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর নিজস্ব মন্তব্য দ্বারা চিঠিগুলোর বয়ানকে সমর্থনও করেন। এই চিঠিগুলিতে থাকা অভিযোগগুলি এতটাই গুরুতর ছিল যে, মেরিকে অতঃপর জানানো হয়েছিল যে তিনি যদি সেগুলি মিথ্যা প্রমাণ করতে না পারেন তবে তাঁকে অরফ্যানেজের দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করা হবে। বাধ্য হয়ে হেস্টির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন মেরি। স্কটল্যান্ডে পাঠানো এই নথিগুলির জন্য মেরি দায়ী করেছিলেন হেস্টিকে; এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ ধার্য করেছিলেন  ২০,০০০ টাকা। 

আচ্ছা কী ছিল হেস্টির পাঠানো সেইসব চিঠিতে? 

চিঠিগুলোতে ছিল মেরির বিরুদ্ধে জঘন্যতম অনৈতিকতার সব অভিযোগ, বিশেষ ক’রে এক বিবাহিত সহকর্মী ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে ব্যভিচার; একজন ভারতীয় ‘বাবু’র সঙ্গে অশালীন সম্পর্ক; এবং অরফ্যানেজের মেয়েদের মারধর ও তাদের উপর নির্যাতন। 

চলুন, দেখে নিই এই বিচারের ফলাফল কী হয়েছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৮৩ টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, মেরির বিরুদ্ধে আনা অন্তরঙ্গ ব্যবহারের অভিযোগগুলো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছিল, এবং যতদূর জানা যায়, সেই সংক্রান্ত চিঠি প্রকাশের ক্ষেত্রে আদালত মিঃ হ্যাস্টিকে ন্যায্যতা দিয়েছিল। বিচারপতি নরিস অভিযোগে উল্লিখিত স্কটিশ মিশনারি এবং বাঙালি বাবুর সঙ্গে কেবল নয়, বরং একজন স্থানীয় ডাক্তার চন্দ্র কুমার দে’র সঙ্গেও অপরাধমূলক অশোভনীয়তার জন্য মেরিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে স্কুলছাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের অভাব ছিল এবং নরিস বলেন, বাদীর পক্ষে রায় যাওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট। তবে মেরি তাঁর দাবি করা ২০,০০০ টাকার পরিবর্তে অনুকূল রায় এবং মাত্র এক আনা ক্ষতিপূরণ পাবেন, যা দুটি আধা আনা মুদ্রার সমতুল্য।

দেখুন আজ এই একুশ শতকের বুকে দাঁড়িয়ে মেরির বিরুদ্ধে আনা সেদিনকার অভিযোগগুলোকে খতিয়ে দেখলে যে জিনিসটা প্রথমেই মনে আসে তা হলো, মেরির সঙ্গে সেদিন যে অমানবিক কাজ হয়েছিল তা নতুন কিছু ছিল না। ভিক্টোরিয়ান যুগের শেষের দিকে, মেয়েদের জন্য কোনও ক্ষমতাসম্পন্ন পদে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। পতি-বশংবদ স্ত্রী এবং স্বার্থত্যাগিনী মা মানে যাকে বলা যায় “এঞ্জেল ইন দা হাউস” হিসেবেই মেয়েদের মানায় ভালো- এই ধারণাই সমাজের পিঠ চাপড়ানি পেত। আর্থিক জোর মেয়েদের স্বাধীনতার পথ সুগম করে, এই ধারণা এখন বেশ শক্তিশালী হলেও সেকালে তেমন পাত পেত না। একজন উচ্চবিত্ত মহিলার পক্ষে ঘরের বাইরে কোনও ক্ষমতায় থাকা যেন আরো কঠিন হয়ে উঠত। অপরদিকে, নিম্নবিত্ত মহিলারা যদিও প্রায়শই জীবিকা নির্বাহের জন্য ঘরের বাইরে কাজ করতে বাধ্য হতেন, তবু  তাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রচুর বিতর্কের অবসর আছে। এমত পরিকাঠামোতে যখনই একজন মহিলা ক্ষমতা দখল করতেন, তখন অবশ্যই সবসময় এমন সম্ভাবনা থাকত যে একজন পুরুষ তার কাছ থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। মেরির ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটেছিল। হেস্টি ছিলেন একজন কঠোর, অত্যধিক নাকউঁচু, স্টিরিওটিপিক্যাল ভিক্টোরিয়ান পুরুষ, যিনি মেয়েদের মানসিকভাবে দমন করতে ভালোবাসতেন, মেয়েদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ দাবি করতেন ও পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামোকে সযত্নে প্রতিপালন করতেন। স্বাধীনচেতা মেরির কার্যত সবকিছুর প্রতিই তাই হেস্টির চরম অনীহা জন্মেছিল। 

মেরি কিন্তু ১৮৭০ সাল থেকে দশটি বছর চুটিয়ে স্কটিশ লেডিস মিশনে চাকরি করেছেন। তিনি  ইউরোপিয়ানদের সমতুল্য বেতন পেতেন এবং সর্বক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে ইউরোপিয়ানদের সমকক্ষ আচরণই করা হত। অথচ সে সবই পাল্টে গেল, যখন ১৮৭৯ সালে হেস্টি স্কটিশ কলেজের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ হিসেবে খোদ স্কটল্যান্ড থেকে এসে কলকাতায় তাঁর কাজে যোগ দিলেন। আসা ইস্তক মেরির সঙ্গে তাঁর খিটিমিটি লেগে থাকত। উদাহরণস্বরূপ, হেস্টির বিচারে মেরি যে অরফ্যানেজ পরিচালনা করেন, তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মোটেই স্কটিশ মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে মেরির কিছুই হেস্টির পছন্দ হত না, মেরির নীতি, অনুশীলন, আচরণ সবেতেই হেস্টি খুঁটে খুঁটে ভুল ত্রুটি তুলে ধরতেন। এমনকি মেরি যেভাবে সোফায় বসতেন, হেস্টির চোখে সেটাও শিথিল, অশালীন, কুরুচিকর বলে মনে হত।   

মেরি যে নিৰ্ভেজাল ইংরেজ নন, হেস্টি আর তাঁর তাঁবেদারদের কাছে সেটাও অসহনীয় গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠেছিল। তাঁরা পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে তাঁদের মিশনের প্রধান হিসেবে একজন ইউরেশিয়ানের থাকা অনুচিত। এখানে লক্ষ করার ব্যাপার এই যে ১৮৭০ সালে মেরিকে যখন মহিলা মিশনের সুপারিনটেনডেন্ট পদে নিযুক্ত করা হয়, তখন কলকাতার সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সদস্যদের কাছে বা এডিনবার্গের মহিলা সমিতির সদস্যদের কাছে এটা একটুও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি যে মেরি ইউরেশিয়ান ছিলেন নাকি  ছিলেন না। তাঁদের কাছে এটাই বড় হয় উঠেছিল যে মেরি একদিকে যেমন ইউরোপিয়  রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত, তেমনি বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে তিনি সাবলীল। খ্রিস্ট্রিয় বার্তা প্রচারে মেরির মতো একজন মধ্যস্থতাকারী যে অপরিহার্য, সেই সত্য তাঁদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তার উপর তৎকালীন বাঙালি সমাজের বড় বড় মানুষ যেমন বুদ্ধিজীবী ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখদের সঙ্গে মেরির ভালোরকম চেনাশোনা ছিল। উচ্চবর্ণের বাঙালি পরিবারের সঙ্গে বিস্তৃত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি নজর কাড়া সংখ্যায় ”জেনানা” পড়ুয়াদের তাঁর মিশনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং, মিশনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে মেরির যথেষ্টই কদর ছিল। তবে, এ কথা মানতেই হবে যে ভারতে বসবাসকারী ইউরেশিয়ান এবং ইউরোপিয়ানদের মধ্যে অস্পষ্ট একটা পার্থক্য রয়েই গেছিল এবং মেরি হয়তো কিছুটা হলেও তার শিকার হয়েছিলেন।

হেস্টি এবং তাঁর সহকর্মীরা মেরির ধর্মান্তরিত করার পদ্ধতির সঙ্গেও একমত ছিলেন না, তাঁদের মত ছিল “প্রথমে শিক্ষিতকরণ, পরে ধর্মান্তকরণ।” এছাড়া ১৮৪৩ সালে চার্চ অফ স্কটল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ফ্রি চার্চের সদস্যদের প্রতি হেস্টির ছিল চরম বিরক্তি। কিন্তু তাঁদের প্রতি মেরির কোনো নাক সিঁটকানি ছিল না, মেরি তাঁদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে ওঠাবসা করতেন। এ তো গেল মেরির বিরুদ্ধে হেস্টির দায়ের করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের কিছু নমুনা। 

জাত্যাভিমানী হেস্টি মেরির উচ্চ বিদ্যালয় সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে লিখেছিলেন যে “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবৈধ অর্ধ-বর্ণের পড়ুয়ারা এখানে পড়াশুনা করত – এমন একটি শ্রেণী যার সঙ্গে মিস পিগটের স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক” রয়েছে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ কেনেথ বলহ্যাচেট হেস্টিকে “শাসক জাতির সদস্য হিসেবে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অযৌক্তিকভাবে সচেতন” বলে বর্ণনা করেছেন।

অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, পেশাদারিত্বের জায়গা ছাড়িয়ে মেরি ও হেস্টির মধ্যে মতানৈক্যের ফাটল শেষমেশ ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং তা বাড়তে বাড়তে একদিন বিশাল এক গহ্বরে পরিণত হয়। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে মেরি বা হেস্টি এই দুই ব্যক্তি সত্ত্বার কেউই যখন পিছু হটতে চাননি অনিবার্যভাবেই তখন যুদ্ধ দেখা দিল। এ আসলে ছিল রাজনীতি ও ক্ষমতার এক অসম লড়াই।

এবার আসি মেরির বিরুদ্ধে দায়ের করা সেদিন যৌন অপরাধগুলো কার্যকারণের খোঁজে। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে মেরির অনায়াস আচরণ তাঁর শত্রুপক্ষীয় ভিক্টরিয়ান পুরুষদের ধাতে সয়নি, সেটাকেই তাঁরা তাঁদের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছিলেন। সন্দেহ হয়, অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই হেস্টিমহলে কানাঘুষার মারফত পুষ্টি লাভ করেছিল | মেরিকে জড়িয়ে যে বিবাহিত মিশনারির কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কথা বলা হয়েছিল তিনি আর কেউ নন, স্কটিশ কলেজের বিগত দু’বছর ধরে অধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলে চলা মিস্টার জেমস উইলসন, যাঁকে সরিয়েই হেস্টিকে অধ্যক্ষ পদে আসন দেওয়া হয়েছিল। চার্চের উপরমহল থেকে কারণ দেখানো হয়েছিল যে, উইলসনের শিক্ষাগত যোগ্যতা মতে সেই পদের উপযুক্ত নয়। হেস্টি অনেক বেশি জ্ঞানীগুণী, ডিগ্রিধারী। উইলসন এই সিদ্ধান্তে অখুশি হলেও তিনি নিজের মনের ভাব চেপে রাখতে জানতেন। মজার কথা হচ্ছে  উইলসনের স্ত্রী ক্যাথারিন উইলসনের সঙ্গে মেরির এক দৃঢ় বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, উইলসনরা স্বামী স্ত্রী মিলে “সপ্তাহে অন্তত দুবার” মেরিকে অরফ্যানেজ চালানোর কাজে সহায়তা করতেন। মেরির প্রচেষ্টার প্রতি মিসেস উইলসনের অত্যন্ত উচ্চ ধারণাও ছিল। আমরা মিসেস উইলসনের চিঠি থেকে অরফ্যানেজ সম্বন্ধে উইলসন দম্পতির সুখকর স্মৃতিচারণার কথা জানতে পারি।

আর ওই ভারতীয় বাবু হলেন গিয়ে বাঙালি ব্যারিস্টার কালীচরণ ব্যানার্জী যাঁর সঙ্গে মেরির যোগাযোগ হয় ১৮৭৮-১৮৭৯ সাল নাগাদ। মেরি তাঁর অরফ্যানেজের মেয়েদের পড়াশুনা করতে বসার জন্য কয়েকটা বেঞ্চ আর তার সঙ্গে কিছু মাদুর, জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশন থেকে অথবা ফ্রি চার্চ অনাথ আশ্রম থেকে ধার চাইতে এসেছিলেন। তখনই ব্যানার্জীর সঙ্গে মেরির দেখা হয়। ১২৫ বৌবাজার-স্থিত আপার খ্রিস্টান স্কুলে পড়ানোর কাজে মেরিকে সাহায্য করতেন কালীচরণ। এঁদের দুজনের মধ্যে সুদৃঢ় একটা পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সরকারি  ট্যাক্স রিটার্ন তৈরি করা, পরীক্ষা পরিচালনা, খাতা দেখা, নম্বর দেওয়ার মতো কাজগুলো সবই ব্যানার্জির উপরি ন্যস্ত ছিল। এছাড়াও মেরি যখন উচ্চপদস্থ এবং ধনী বাঙালি ভদ্রলোকদের কাছে মিশনের জন্য অর্থসাহায্য চেয়ে চিঠি লিখতে চাইতেন, তখন মেরিকে এই ব্যানার্জিরই শরন্নাপন্ন হতে হতো, আর ব্যানার্জি তাঁকে যথাযথভাবে উদ্ধার করতেন, কারণ বাঙালি শিষ্টাচারের সূক্ষ্ম দিকগুলো সম্বন্ধে ব্যানার্জি ওয়াকিবহাল হবেন না তো কে হবেন? ১৮৮৩ সালের বিচার চলাকালীন একজন সাক্ষী মেরি এবং ব্যানার্জির একটি আকর্ষণীয় ছবি আঁকেন যেখানে তাঁরা দুজনে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে নীরবে তাকিয়ে ছিলেন, একে অপরের কোমরে হাত রেখে। ১৮৮২ সালের জুন মাসে মেরি যখন স্কটল্যান্ডে ছিলেন, আর ব্যানার্জি মেরির কাছ থেকে কোনো চিঠি না পেয়ে অভিযোগভরে মেরিকে একটা চিরকুট লিখেছিলেন, “একজন মা কি তার ছেলেকে ভুলে যেতে পারেন?” এই চিঠি থেকে এঁদের দুজনের মধ্যে যে একটা গভীর মনের মিলন হয়েছিল, সেটা বোঝা গেলেও সেখান থেকে কি আমরা কোনো আপত্তিজনক সম্পর্কের ছোঁয়া খুঁজে পাই? অদ্ভুত ব্যাপার, বোধয় সে যুগটাই অনেক অন্যরকম ছিল।

হ্যাঁ একথা সর্বৈব মিথ্যা ছিল না যে সময় সময় মেরি মাথা গরম করে ফেলতেন, একজন মহিলাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়ার জন্য কখনও কখনও অবশ্য তিনি মিশনের নিয়মও ভেঙেছিলেন। কিন্তু মেরি যে তাঁর ছাত্রী ও কর্মীদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, ছাত্রীভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য যে তিনি জান লড়িয়ে দিতেন এবং সেই কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তিনি যে বেশ সাফল্যও পেয়েছিলেন, এসব কথা তো অনস্বীকার্য ছিল। হেস্টি আসার আগে পর্যন্ত তো তিনি কলকাতা মিশন সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবেই স্বাধীন জীবনযাপন করছিলেন। কে না জানে, ভালো কাজ করতে গেলেই এই দুনিয়ায় এমনি এমনিই সমস্যা উজিয়ে আসে, সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়, মেরিই বা বাদ যাবেন  কেন? মেরি কিন্তু হেস্টির সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক তৈরি করার জন্য অনেকবারই চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সে গুড়ে বালি, সবেতেই হেস্টি বারংবার জল ঢেলে দিয়েছেন।  

আসল কথা, রেভারেন্ড হেস্টি মনে করতেন তিনি হলেন গিয়ে একজন খাঁটি স্কট, সামাজিকভাবে অভিজাত এক ব্রিটিশ। এডিনবরা ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের বিখ্যাত ছাত্র তিনি, বহুভাষাবিদ। তাঁকে নিয়োগ করেছে খোদ চার্চ অফ স্কটল্যান্ড। এতসবেই হেস্টির পায়াভারী হয় গিয়েছিল। মিশনারি সম্প্রদায়ে তিনি যে মেরি’র চেয়ে উচ্চপদে আসীন রয়েছেন, সেকথা তিনি নিজে যেমন কক্ষনো ভুলতেন না, তেমনি মেরিও সেকথা পলকের জন্য বিস্মৃত হন, তা তিনি  মোটেই বরদাস্ত করতে পারতেন না। তাঁর সুস্পষ্ট মনোভাব ছিল যে,  অধস্তনদের কাছ থেকে নির্জলা প্রভুত্ব তিনি আশা করতেই পারেন।  তিনি এও ধরে নিয়েছিলেন যে সবাই উঠতে বসতে তাঁকে  “যথা আজ্ঞা,” “জো হুকু্‌ম,’’‘’ইয়েস স্যার,’’ ইত্যাদি বলে সম্মান প্রদর্শন করবে, এবং স্কটিশ মিশনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরই তদারকি বহাল থাকবে। কিন্তু মেরি তাঁর সে মনোবাঞ্ছায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন, ব্যস, আর যায় কোথায়? মেরির নামে চাউর হওয়া ফুসুরফাসুরগুলোকেই হেস্টি শানানো অস্ত্র বানিয়ে রীতিমতো প্রমাণ হিসাবে মেরির বিরুদ্ধে তুলে ধরতে চাইলেন। মেরির কৃতিত্ব এবং স্বাধীনসত্ত্বা হেস্টি সহ্য করতে পারেননি, তাই তাঁকে কোণঠাসা করার জন্যই তাঁর কাজের পদ্ধতিতে ভুল ধরতে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিলেন, আর এই কাজটি করবারজন্য হেস্টি মেরির বিরুদ্ধে মূলত রেসিজমের কার্ডটাই সুচতুরভাবে ব্যবহার করেছিলেন।  

যদিও এ ঘটনার প্রেক্ষাপট উনিশ শতক, তবু রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং লিঙ্গ-সম্পর্কিত বিষয়গুলির প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গি আশ্চর্যজনকভাবে আজও প্রাসঙ্গিক। 

তথ্যসূত্রঃ

1. Two Coins: A Biographical Novel (Women of Determination and Courage). Sandra Wagner-Wright, 2019.  

2. European Missions in Contact Zones: Transformation through Interaction in a (Post-)Colonial World. Edited by Judith Becker, SSOAR. Open Access Repository, Vandenhoeck & Ruprecht, 2015 

3. Western Daughters in Eastern Lands: British Missionary Women in Asia. Rosemary E Seton. Praeger, 2013

4. Race, sex and class under the Raj: Imperial attitudes and their critics 1793-1905, Kenneth Ballhatchet, London & New York, 1980

নূপুর রায়চৌধুরীর জন্ম, পড়াশুনো কলকাতায়। বোস ইনস্টিটিউট থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করে প্রথমে পুরুলিয়ার নিস্তারিণী কলেজে ও পরে বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটির শিক্ষাভবনে, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৩ সালে আমেরিকায় বায়োমেডিক্যাল সাইন্স-এ গবেষণা করার জন্য ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়া, লস এঞ্জেলেসে এসে যোগদান করেন, তারপর ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানে চলে আসেন এবং দীর্ঘদিন সেখানেই গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মিশিগানের একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। বাংলায় লেখালিখির নেশা। প্রথম বই 'সেরেঙ্গেটির চোরাশিকারি' ২০২৪-এর বই মেলায় প্রকাশ পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *