শৈলেন মান্না প্রথম পর্ব

শৈলেন মান্না - প্রথম পর্ব

আজ পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে কোন একজনের নাম উল্লেখ করতে গেলে আমার মনে হয় নি:সন্দেহে শৈলেন মান্নার নামটাই উঠে আসবে। শৈলেন মান্না প্রায় দুই দশক ধরে ভারতীয় ফুটবল দলের রক্ষণভাগে এক বিরাট স্তম্ভ ছিলেন। স্বাধীনতার পরই ১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে খালি পায়ে তাঁর খেলার দাপটে ফ্রান্স দলকে প্রায় আটকে দিয়েছিলেন। শেষ মিনিটের গোলে ভারত হার স্বীকার করে। ১৯৫১ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান গেমসে শৈলেন মান্না ছিলেন বিজয়ী ভারতীয় ফুটবল টিমের অধিনায়ক। খেলার শেষে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধি মাঠে নেমে শৈলেন মান্নাকে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে শুধু মোহনবাগান ক্লাব নয়, বাংলা ও ভারতীয় দলেরও তিনি ছিলেন একমাত্র অধিনায়ক।

“Sailen Manna was the only Asian Footballer to be named among the Ten Best Captains in the world by the English FA in 1953.”

ভারত সরকার ১৯৭১ সালে শৈলেন মান্নাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেন। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন ২০০০ সালে বিংশ শতাব্দীর সেরা ভারতীয় ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে শৈলেন মান্নাকে নির্বাচিত করে। ২০০১ সালে মোহনবাগান ক্লাব শৈলেন মান্নাকে “মোহনবাগান রত্ন” আর  ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার “বঙ্গবিভূষণ” সম্মান দেন।

সৌভাগ্যবশত খেলাধূলার সূত্রে শৈলেন মান্নার সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচিতি ছিল। শৈলেন মান্না ও ওঁর ভাই ধীরেন মান্না দুজনেই একদম ছোটবেলা থেকেই ওঁদের মামার বাড়িতেই মানুষ হয়েছিলেন। দুই মামার নাম – ইন্দুভূষণ সামন্ত ও  ফণীভূষণ সামন্ত। ওঁদের বাড়ি ছিল হাওড়া বেলগাছিয়ায়। আমার জন্ম হাওড়া দাশনগরে। দুটো বাড়ির দূরত্ব মাত্র মাইল খানেক। ১৯৪৮ সালে লন্ডন যাবার আগে ভারতীয় অলিম্পিক ফুটবল দল দাশনগরে এক প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ খেলে। তখন আমার বয়স আট বছর আর ওই বয়সেই শৈলেন মান্নার খেলা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। শৈলেন মান্নাই হয়ে যান আমার আইডল। পরে ফণীভূষণ সামন্ত পরিচালিত হাওড়াতে শৈলেন মান্নার ক্লাবে খেলতে শুরু করি আর শৈলেন মান্নার সঙ্গে পরিচয় হয়। আমার মনে পড়ে মোহনবাগানের খেলার দিন পাড়ার ছেলেদের জ্বালায় আমি সাইকেল করে সকাল সাতটার মধ্যে মান্নাদার বাড়ি হাজির হতাম ডে স্লিপের জন্য। ওটা মোহনবাগান গেটে দেখালেই বিনা পয়সায় মাঠে ঢোকা যেত। আমাকে দেখেই মামাবাবু ফণীভূষণ সামন্ত বারান্দা থেকেই চেঁচিয়ে বলতেন, “ওরে খেঁদি, ঘন্টি এসেছে!” মান্নাদা একটু বাদেই একটা ছোট্ট সাদা কাগজে allow two বলে সই করে আমাকে দিয়ে দিতেন। আমি সেইটা পাড়ার ছেলেদের দিতাম। এখানে বলে নিই যে শৈলেন মান্নার মামার বাড়ীর পোষাকি ডাকনাম খেঁদি হলেও আমাদের সবার কাছে উনি মান্নাদা বলেই পরিচিত।

চিত্রঃ মোহনবাগান ক্লাবে শৈলেন মান্নার সঙ্গে ১৯৭৮

শৈলেন মান্নাকে নিয়ে আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে শৈলেন মান্নার পরিচয় দেওয়া। সেই সময় টেলিভিশন না থাকার ফলে আমাদের সব খবরের জন‍্য খবরের কাগজের ওপর নির্ভর করতে হত। তবে খবরের কাগজেও ঠিকমতো খেলোয়াড় পরিচিতি বেরোত না। মাস কয়েক আগে আমার বুক সেলফে একটা পুরোনো ম্যাগাজিন খুঁজে পেলাম। ম্যাগাজিনটা ২০০৪ সালে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখক সূচিতে দেখলাম শৈলেন মান্নার নাম। ছোটোবেলা থেকেই শৈলেন মান্না সম্বন্ধে বিভিন্ন কাগজে বা ম্যাগাজিনে যত রকমের লেখা বেরোত আমি যোগাড় করে রাখতাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি কোনোদিন শৈলেন মান্নার নিজস্ব কোন লেখা পাইনি। এক নিমেষে পড়ে ফেললাম। আমার মনে হল লেখাটা এক অতি বিরল অমূল্য সম্পদ। লেখাটির প্রচার হওয়া দরকার। তাই আমার এই প্রচেষ্টা।

লেখাটির মাধ্যমে শৈলেন মান্না তুলে ধরেছেন তিনি কী করে মোহনবাগান ক্লাবে খেলা শুরু করলেন। তিনি লিখেছেন “চীনের প্রাচীর” গোষ্ঠ পাল সম্বন্ধে। সেই সময় ইংরেজ রাজত্বে খালি পায়ে বুট পরা গোরাদের বিপক্ষে ফুটবলের মাধ্যমে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াই। আছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা। আর আছে বাকিংহাম প্যালেসে সেই রাজকীয় নিমন্ত্রণের কথা। শৈলেন মান্না ভীষণ বিনয়ী ও অমায়িক ছিলেন। তাই বাকিংহাম প্যালেসে নিমন্ত্রণের ব্যাপারে আমি একটু বিশদভাবে বলতে চাই যেটা শৈলেন মান্না নিজের কথায় লেখেননি।

১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী প্রতি দেশের তিন কিংবা চারজন প্রতিনিধিদের বাকিংহাম প্যালেসে এক নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান তখনকার ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ আর রানি। ভারতকে বলা হয় তিনজন প্রতিনিধিকে পাঠাতে। কিন্তু তখনকার রাজকুমারী এলিজাবেথ (পরে বাবা মারা যাওয়ার ইংল্যান্ডের রানি হয়েছিলেন। বর্তমানে প্রয়াত বছর কয়েক আগে) ও তাঁর বোন রাজকুমারী মার্গারেট বিশেষ অনুরোধ জানান ভারত সরকারকে যে এই তিনজনের মধ্যে একজন হবেন শৈলেন মান্না। দুই রাজকুমারী ভারত ও ফ্রান্সের খেলার দিন মাঠে উপস্থিত না থাকলেও পরের দিন সব খবরের কাগজে শৈলেন মান্না কী করে খালি পায়ে তাঁর দাপুটে খেলার মাধ্যমে বুট পরা ফ্রান্স দলকে প্রায় রুখে  দিয়েছিলেন, তার খবর পড়ে মুগ্ধ হয়ে যান এবং শৈলেন মান্নার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। আমার  মনে হয় এই রকম সম্মান আর কোন খেলোয়াড়ের জীবনে ঘটেছে কিনা সন্দেহ। আমাদের ছোটোবেলায় এই ঘটনাটা এক কিংবদন্তি গল্প হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে রাজকুমারী এলিজাবেথ শৈলেন মান্নার পা টিপে দেখেছিলেন পা-টা রক্ত মাংসের না লোহার। সত্যি কি রাজকুমারী এলিজাবেথ শৈলেন মান্নার পা টিপে দেখেছিলেন? এবার শৈলেন মান্নার নিজস্ব লেখায় আসা যাক। পড়া  যাক শৈলেন মান্না নিজে এ ব্যাপারে কী লিখেছেন। নিচের অংশটি শৈলেন মান্নার কলম থেকে নেওয়া।

সুদূর আমেরিকা থেকে অনুরোধ এসেছে আমার জীবনের কোনও একটি ঘটনা নিয়ে লেখার। দেশ ছেড়ে ওখানে গিয়ে বাঙালিদের সম্মেলনে কিছু বলার সুযোগ পেলেও আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, অন্তত আমার এই বয়সে। বাল্টিমোরের ড: শংকর বসু (আমার ফুটবল mentor শ্রী হেমন্ত দে-র শ্যালক) আমাকে লেখা পাঠাতে বলেছে, আগামী বছর ২০০৪ সালের বঙ্গ সন্মেলনের ম্যাগাজিন প্রকাশ করার জন্য। এবছরের ‘থিম’ও নির্বাচন করেছে ‘সীমানা ছাড়িয়ে।’ প্রথমেই আমার মনে পড়ে যায়, এই বাংলা বা ভারতের সীমানা পেরিয়ে আমি যখন পৃথিবীর আর এক প্রান্তের উদ্দেশে প্রথম পাড়ি দিয়েছিলাম সেই ১৯৪৮ সালের কথা। সেবার লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয় দল খেলতে যাবে। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ ভারতবর্ষ।

আমি তখন মোহনবাগান ক্লাবে খেলি। এই ক্লাবের ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে যায় প্রবাদপ্রতিম খেলোয়াড় শ্রদ্ধেয় গোষ্ঠ পালকে। ১৯১১-র আই এফ এ শিল্ড জয়ের সূত্রে মোহনবাগান তখনই জাতীয় প্রতিষ্ঠান। গোরা টিমগুলোর সঙ্গে মোহনবাগান খেলত, খালি পায়ে গোষ্ঠ পাল লড়াই করতেন গোরা সৈনিকদের বুট পরা পায়ের সঙ্গে। বাঙালি মনে করত তারা যেন স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। মোহনবাগান মানেই তখন ভারত। আর সেই ভারতের লড়াইয়ের অন্যতম সৈনিক গোষ্ঠ পাল। তাঁকে টপকে গোল করা যেত না বলে ব্রিটিশ সাংবাদিকরা তাঁর নাম দিয়েছিল ‘Chinese Wall!’

মোহনবাগান টিমে খেলার কথায় পরে আসছি। আমার খেলোয়াড় জীবনে হাতেখড়ি কিন্তু হাওড়ারই এক ক্লাব হাওড়া ইউনিয়নে। আমার বাড়ি হাওড়া জেলার ব্যাঁটরায়। সেখানেই আমার জন্ম। আমার মামা ইন্দুভূষণ সামন্ত ছিলেন মোহনবাগানের গ্রাউন্ড সেক্রেটারি। আমি তখন ব্যাঁটরার মধুসূদন পালচৌধুরি স্কুলে পড়তাম। হাওড়া ইউনিয়ন ক্লাব তখন পরিচালনা করতেন হাওড়া মোটর কোম্পানির মালিক ও আই এফ এ -র প্রাক্তন হেমন্ত দে। হেমন্তদা একদিন আমার মামাকে ডেকে বললেন, “ইন্দু, শুনলাম তোমার ভাগ্নে বেশ বড় খেলোয়াড় হয়েছে। ওকে দিয়ে দাও আমার টিমে।” একটু দ্বিধায় পড়লেন আমার মামা। অভয় দিলেন হেমন্তদা “কোনও ভয় নেই। ও অনেকদূর পর্যন্ত যাবে।” এর পর আর কী বলার আছে। সেই ১৬ বছর বয়সে আমি হয়ে গেলাম কলকাতার দ্বিতীয় ডিভিশনে ক্লাবের খেলোয়াড়।

ততদিনে ম্যাট্রিক পাশ করে আমি রিপন কলেজে আই এ ক্লাসে পড়ি।তখন বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল ছিল খুব বিখ্যাত। উঠতি খেলোয়াড়রা তাকিয়ে থাকত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় শিল্ডের দিকে। কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে নিজের অজান্তে আমি একদিন সুযোগ পেয়ে গেলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলার।

গোষ্ঠ পাল ১৯১২ সালে মোহনবাগানে আসেন। অবসর নেন ১৯৩৫ সালে। তারপর ব্যাকে খেলতেন শরৎ দাস ও ডা: মন্মথ দত্ত। দুজনেই বড় খেলোয়াড়। কিন্তু আরও একজন ভাল ব্যাক খুঁজছিলেন গোষ্ঠ পাল। ওই পজিশনে তিনি খেলেছিলেন বহুদিন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলছি তখন, আমার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে গোষ্ঠ পাল ডেকে পাঠালেন আমার মামাকে, “ইন্দু, তোমার ভাগ্নে সামনের বছর থেকে আমাদের হয়ে খেলবে। এখন থেকেই ঠিক করে রাখো।” কিন্তু মোহনবাগানে খেলতে দেওয়ার ব্যাপারে আমার মামার রীতিমতো আশঙ্কা ছিল। কিন্তু গোষ্ঠ পালের ইচ্ছা মানে আদেশ। অগত্যা কী আর করা? ১৯৪২ সালেই মোহনবাগানের খেলোয়াড় হয়ে গেলাম আমি।

গোষ্ঠ পালের সময়ে অর্থাৎ ১৯১২ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কোনও ট্রফি কিন্তু ঘরে আনতে পারেনি মোহনবাগান। গোষ্ঠপালের ফুটবল প্রতিভা ট্রফির সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না। তবু কেন গোষ্ঠপালকে নিয়ে এত মাতামাতি? কেন গড়ের মাঠের বুকে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর এক দীর্ঘাবয়ব মূর্তি? শতবর্ষ পেরিয়েও ভারতের ফুটবল ইতিহাসে তিনি কেন কিংবদন্তির সম্মান পান? আসলে তখন বাঙালির সামনে অনেক চরিত্র। সুভাষচন্দ্র বসুকে সামনে রেখে বাঙালি তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কবিতা ও সংগীতে নজরুল ইসলাম এবং ডি এল রায়ের নাটকে শিশির ভাদুড়ি। আর রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেন সবার উপরে। খেলার মাঠে এঁদের জায়গাটা নিয়েছিলেন গোষ্ঠ পাল। নগ্নপদে তিনি ব্রিটিশ দলগুলোর সঙ্গে যে লড়াইটা করতেন, তা ছিল সেদিনের স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর খেলার মধ্যে একটা আসুরিক শক্তি ছিল, যাকে অতিক্রম করা তো দূরের কথা । যার পায়ে বার বার পদানত হতে হত সাহেবদের দলগুলোকে যারা বুট পরে খেলত এবং সবসময় পেত রেফারির দাক্ষিণ্য। বিদেশের এই দলগুলোর বিরুদ্ধে গোষ্ঠর লড়াই-ই তাঁকে সর্বভারতীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল। এতটাই যে, তাঁর খেলা না দেখেই তাঁকে চিনতে পারেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি মোহনবাগানকে একবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে একটা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার জন্য। খেলার পরের দিন গুরুদেবের ঘরে চায়ের নিমন্ত্রণ মোহনবাগানের। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে কবিগুরু জানালার দিকে মুখ করে বসা। মোহনবাগান খেলোয়াড়রা ঘরে ঢুকতেই রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, “কই তোমাদের মধ্যে গোষ্ঠ কোথায়? ‘Chinese wall,’ সে এসেছে?” গোষ্ঠকে সবাই এগিয়ে দিতেই রবীন্দ্রনাথ ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “চীনের প্রাচীরই বটে। আশীর্বাদ করি তোমায়, আরও সুনাম পাও!”

পরিণত বয়সে ফরিদপুরের গোষ্ঠ পাল বলতেন, “ট্রফি পাওয়ার কথা আমরা না যত চিন্তা করছি, সাহেব গো হারামু কী কইরা, তখন তার থেইক্যা বেশি চিন্তা করছি। ট্রফি পাই নাই বইল্যা আমাকে দুখ্য নাই।” এই পটভূমিকা স্মরণ করে বিদেশের মাটিতে সাহেব দলগুলোকে পরাভূত করার মানসিকতা সঞ্চয় করে প্রথম আমরা বিদেশে পাড়ি দিলাম পরিচিত গণ্ডী বা সীমানা ছাড়িয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন সবে প্রায় শেষ হয়ে ভারত সদ্য স্বাধীনতা পেয়েছে। প্রথম অলিম্পিকে স্বাধীন ভারত খেলবে ১৯৪৮ সালে লন্ডনে। উৎসাহ উদ্দীপনায় সারা ভারত ভরপুর – ট্রেনিং ক্যাম্প বসেছে পাহাড় ঘেরা শিলং শহরে কারণ লন্ডনের সঙ্গে আবহাওয়ার মিল রয়েছে। ট্রেনিংয়ের কোচ হিসাবে রয়েছেন বলাইদা অর্থাৎ বলাইদাস চট্টোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন সব খেলাতেই সমান পারদর্শী। দীর্ঘকায়, স্বাস্থ্যবান এবং ভাল বক্সারও।

অলিম্পিক ট্রায়ালে ফুলব্যাক পজিশনে খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছি ১৫ জন কিন্তু টিমে নেওয়া মাত্র তিনজনকে। আমাকে চরম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হল। সকালে একজন কড়া Military Officer এর তত্ত্বাবধানে আমাদের পিটি হত আর বিকেলে ফুটবল নিয়ে বলাইদা ট্রেনিং দিতেন। অনভ্যাসের জন্য এই কায়িক পরিশ্রম অনেকেই করতে সক্ষম হল না। ফলে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হল। আমাদের নির্বাচন কমিটির তিনজন সদস্য ছিলেন – এম. দত্তরায় (বেচুদা), জিয়াউদ্দিন ও জ্যোতিষ গুহ। তিন সপ্তাহ ধরে ক্যাম্প চলার পর এবং কয়েকটি ট্রায়াল ম্যাচ হওয়ার পরে ফাইনাল ট্রায়াল ম্যাচ হল কলকাতায়।

বিকেলে ফাইনাল ম্যাচের পরে সেদিন রাতে টিম হলেও আমরা জানতে পারলাম পরের দিন সকালে খবরের কাগজ পড়ে। মামাদের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। বাড়ির সবাই এবং পাড়ার অনেকেই এসে জড়িয়ে ধরলেন। আমার জীবন ধন্য। স্বাধীনতার পরেই ভারত অলিম্পিকে ফুটবল খেলতে যাচ্ছে সেই দেশে যে দেশ ২০০ বছর পরাধীন করে রেখেছিল আর যারা শুরু করেছিল আমাদের দেশে ফুটবল খেলা।

নির্বাচিত টিম হল: গোলে বরদারঞ্জন (মহীশূর) এবং সঞ্জীব (বোম্বে )। ফুল ব্যাক: তাজ মহম্মদ (বাংলা), পাপু (বোম্বে), শৈলেন মান্না (বাংলা)। হাফ ব্যাক: এস. বসির (মহীশূর), ডা: টি. আও (বাংলা), মহাবীর প্রসাদ (বাংলা), অনিল নন্দী (বাংলা), কাদির (বাংলা)। ফরওয়ার্ড: বজ্রভেলু (মহীশূর), আমেদ খান (মহীশূর), এস. রামন (মহীশূর), পি. নায়ার (বেম্বে), এস.  মেওয়ালাল (বাংলা), ধনরাজ (মহীশূর), রবি দাস (বাংলা)। অধিনায়ক: ডা: টি.আও, কোচ: বলাইদাস চট্টোপাধ্যায় (বাংলা)। ম্যানেজার : এম.দত্তরায় (বাংলা)।

(চলবে)

তথ্যসূত্র

১/ https://sportstar.thehindu.com/magazine/indias-greatest-footballer/article29646644.ece

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *