হারিয়ে যাওয়ার পথে বাংলা প্যারোডি শিল্প

হারিয়ে যাওয়ার পথে বাংলা প্যারোডি শিল্প

ল্যাটিন শব্দ parodia থেকে প্যারোডি কথাটি এসেছে। ‘প্যারোডি’ একটি ইংরেজি শব্দ হলেও বাংলা সাহিত্যে ও গানে ক্ষেত্রে ‘প্যারোডি’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মজাদার শব্দে কোনো রচনাকে অনুকরণ করাকেই সাহিত্যের ভাষায় প্যারোডি বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে বলতেন ‘লালিকা।’ সোজা কথায় প্যারোডি বলতে সাধারণত ব্যঙ্গ করার জন্য বা নেহাতই মজা করার জন্য অতি পরিচিত কোনো গুরুতর রচনার হাস্যরসাত্মক অনুকরণ বা পুনর্নির্মাণকে বোঝায়। তবে এসব কথা বঙ্গবাসীকে বোঝাবার দরকার নেই, তারা প্যারোডি গান শুনেই বড় হয়েছেন। 

তবে এর কিন্তু গালভরা ইতিহাস আছে। অ্যারিস্টটলের মতে, থাসোসের হেগেমন ছিলেন বলতে গেলে প্যারোডির আবিষ্কারক। তিনি সুপরিচিত কবিতাগুলিতে শব্দের সামান্য পরিবর্তন করে সেগুলিকে হাস্যকরভাবে পরিবেশন করতেন। অনুমান করা হয়, প্রথম প্যারোডির শিকার হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত গ্রীক কবি হোমার। বিশ্বসাহিত্যের অনেক মহারথী প্যারোডি করেছেন, আবার নিজেরাও প্যারোডির শিকার হয়েছেন। ‘জন মার্সটন’ নামের ইংরেজ সাহিত্যিক তার ‘মেটামরফোসিস অফ পিগম্যালিয়নস ইমেজ’ কবিতাটিতে শেক্সপিয়ারের লেখা ‘ভেনাস এন্ড অ্যাডোনিস’ এর প্যারোডি করেছেন। এছাড়াও জন মিল্টন, ওয়াল্টার স্কট, এডগার অ্যালান পো, ওয়াল্ট হুইটম্যান সহ আরও অনেক খ্যাতিমান লেখকদের সৃষ্টিও তাদের সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগের লেখকরা প্যারোডি করেছেন।

১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকে, সেই সময়ের সঙ্গীতের রীতিনীতিকে উপহাস করে জনপ্রিয় গানের প্যারোডি তৈরি করেছিলেন স্ট্যান ফ্রেইবার্গ। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, এলভিস প্রিসলির “হার্টব্রেক হোটেল” গানে ‘অত্যধিক ইকো’ ব্যবহার করাকে ব্যঙ্গ করেছেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের শীর্ষস্থানীয় প্যারোডি সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন ইয়ানকোভিচ (“Weird Al” Yankovic), তিনি মাইকেল জ্যাকসন এবং লেডি গাগার মতো তারকাদের হিট গানের প্যারোডি তৈরি করেছেন। তবে মজার কথা যে বাখ, মোজার্ট আর স্যাটির মতো সুরকাররা শতাব্দী ধরে একে অপরের কাজের প্যারোডি করে এসেছেন।

বাংলা প্যারোডি শিল্পেরও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে, যা আঠারো শতক থেকে চলে আসছে। এই ধারা শুরু হয়েছিল আঠারো ও উনিশ শতকে, যখন বাংলায় কবিগান ও কবিয়ালের ঐতিহ্য বিকশিত হচ্ছিল। রঘুনাথ দাসকে কবিগানের প্রবর্তক হিসেবে ধরা হলেও গোঁজলা গুঁইকে ঈশ্বর গুপ্ত কবিগানের আদি কবি বলে উল্লেখ করেছেন। পরে হরু ঠাকুর, নিত্যানন্দ বৈরাগী, রাম বসু, ভোলা ময়রা এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গীর মতো প্রখ্যাত কবিয়ালরা এতে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেন। মূলত কবির লড়াই ছিল প্রতিযোগিতামূলক গানের পরিবেশনা যেখানে কবি আর কবিয়ালরা গানের মাধ্যমে কাব্যিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতেন। তারা প্রায়শই তাদের প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য প্যারোডি গান ও ব্যঙ্গ গান ব্যবহার করতেন। কখনও কখনও সেসব তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হত। এই পরম্পরা পরবর্তীতে একটি সম্মানিত শিল্পরূপ হিসেবে প্যারোডির বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। মূলত সমাজ ও সমাজে সেই সময়কার প্রচলিত রীতিনীতির ত্রুটি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাবু কালচার এবং অন্যান্য সামাজিক অসঙ্গতিকে হাস্যরসাত্মকভাবে কৌতুকের মাধ্যমে প্যারোডিতে তুলে ধরা হত। এক হিসাবে বাংলা প্যারোডি গানের প্রথম এবং অন্যতম সফল শিল্পী ছিলেন আজু গোঁসাই। তাঁর নাম-পরিচয়-জন্মসন কিছুই সঠিক জানা যায় না। তাঁর পরিবেশনায় তখন রামপ্রসাদী বা প্রচলিত লোকগান, টপ্পা, কৌতুক ও ব্যঙ্গধর্মী রচনার মাধ্যমে নতুন রূপ পেত, সেটাই হল বাংলা প্যারোডি গানের আতুরঘর। যেমন রামপ্রসাদ যদি লিখলেন, “আয় মন বেড়াতে যাবি/কালীকল্পতরুমূলে রে মন চারি ফল কুড়ায়ে পাবি।।” আজু গোঁসাই তার প্যারোডি করলেন, “কেন মন বেড়াতে যাবি।/কারও কথায় কোথাও যাস নে রে মন/মাঠের মাঝে মারা যাবি।।” মজার কথা হল ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কিন্তু এগুলির মধ্যেও সারতত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। আবার রামপ্রসাদের “ডুব দে রে মন কালী বলে” গানের প্যারোডি বাঁধলেন তিনি “ডুবিস নে মন ঘড়ি ঘড়ি।”

ইংরেজ আমলে পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং ধারণার বিস্তারের ফলে বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রসার ঘটে। লেখক এবং কবিরা ঔপনিবেশিক নীতি এবং শাসনের সমালোচনা করার হাতিয়ার হিসেবে প্যারোডিকে ব্যবহার শুরু করলেন। প্যারোডি গানগুলি তাদের মত প্রকাশ এবং ঔপনিবেশিক অযৌক্তিকতা তুলে ধরার একটি হয়ে হাতিয়ার হয়ে উঠল। উনিশ ও বিশের শতকের প্রথমার্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্যারোডি গান স্থান পেত । এই গানগুলো মূলত জনপ্রিয় গীতিকারদের মূল গানের সুর ব্যবহার করে নতুন এবং ব্যঙ্গাত্মক কথা দিয়ে তৈরি করা হত, যা দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের ভিন্ন স্বাদের আনন্দ দিত। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও রবীন্দ্রসংগীতের প্যারোডি তৈরি করেছিলেন । নিতাই ঘটক বলেছেন, ট্রেনে যেতে যেতে একবার রবীন্দ্রনাথের লেখা “আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো নমো হে নমো/তোমায় স্মরি হে নিরুপম” গানটির প্যারোডি তৈরি করেন নজরুল ইসলাম – “আহা ললিতা দেবী সলিতা পাকায়/বিশাখা ঝুলে হিজল শাখায়/বিন্দাদূতি পিন্দা ধুতি গোষ্ঠে গেছেন সাইজা রাখাল সাজে।” আর সেই প্যারোডিই পরে হয়ে উঠল সম্পূর্ণ নতুন এক গান, রবীন্দ্রসংগীত থেকে জন্ম নিল নজরুলগীতি। আর সেই গান রেকর্ডে করলেন রঞ্জিত রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্যারোডিকে অবহেলা করেননি। ‘চিরকুমার সভা’য় অক্ষয়ের গান মনে করুন, “কতকাল রবে বল ভারত রে, শুধু ডাল ভাত জল পথ্য করে।” মূল গানটি ছিল গোবিন্দচন্দ্র রায়ের “কত কাল পরে, বলো ভারত রে, দুখসাগর সাঁতরি পার হবে।” গোবিন্দচন্দ্র পরজীবী বাঙালি জাতিকে নিয়ে দুঃখ করলেও রবীন্দ্রনাথ এই পরজীবীদের তীব্র ব্যঙ্গে কষাঘাত করেছেন। তাঁর হালকা রচনা এবং হাস্যরসের গানে প্রায়শই সমাজ এবং মানব প্রকৃতির সূক্ষ্ম সমালোচনা থাকত। এগুলি তাঁর কাছে শুধুমাত্র হাস্যরসের বিষয় ছিল না, বরং সমাজের গভীর সমস্যাগুলি নিয়ে নির্মমভাবে প্রশ্ন করার একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপায় ছিল।

দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিতকে প্যারোডি ধারার মহানক্ষত্র বলা যেতে পারে। অতুলপ্রসাদ সেনের “মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা” গানের প্যারোডি লিখলেন দাদাঠাকুর,

আ-মরি বাংলা ভাষা,
তোমার বাঁচার নাই কো আশা।

নয় কো মোদের এ জ্ঞান যে সে
গঙ্গা ডুবিল Ganges এ,
Indus এল সিন্ধু দেশে
Beas হয়েছে বিপাশা।

আমরা নূতন মালা দিয়ে গলে
বাংলা এনেছি Bengal এ,
কলকাতায় কাল কাটিয়ে
Calcutta-য় বেঁধেছি বাসা।

বাজিয়ে বীণা নূতন তানে
বর্ধমান আজ Burdwan-এ,
হায়, চুঁচুড়ার অদৃষ্টে হল
Chinsurah-র সুরাতে ভাষা।

ভেবেছিল কেউ কি কবে
মেদিনীপুর Midnapore হবে,
কাঁথির মাথায় লাথি মেরে
Contai-এ করবে কোণঠাসা।

এই প্যারোডি শুধু একটি ব্যঙ্গ নয়, ঐতিহ্যবাহী বাংলা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর গর্ব আছে এ গানে, আছে জিজ্ঞাসাও, বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, যার সম্মুখীন আজ আমরা হয়েছে।

গানের পাশাপাশি হাত ধরে কবিতার প্যারোডিও তৈরি হয়েছে। তার কয়েকটি তো উল্লেখের যথেষ্ট দাবি রাখে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “সকল দেশের সেরা” বা “ধন ধান্য পুষ্প ভরা” কবিতা তথা গানের প্যারোডি লিখেছেন সতীশ চন্দ্র ঘটক “আমার কর্মভূমি” শিরোনামে।

ধনমান্য যশ-গাঁথা,
আমাদের এই কলিকাতা।
তার মাঝে এক অফিস আছে
সব অফিসের সেরা।
ও যে, ইট পাথরে তৈরি সেটি
রেলিং দিয়ে ঘেরা।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্যারডি

কবিগুরুর বিখ্যাত গান “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে” এর প্যারোডি করলেন নিবারণ চক্রবর্তী,

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই দ্বারে
বইব না আর বাজার বোঝা এই ঘাড়ে
চুকিয়ে দিয়ে মুদির দেনা,
সাঙ্গ করে কাপড় কেনা
প্রবাস যাত্রা করবো আমি এইবারে।

কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের “১৪০০ সাল” কবিতার প্যারোডি করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের আরেক বিখ্যাত কবিতা “উর্বশী” কবিতার “নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, সুন্দরী রূপসী,

হে নন্দন বামিনী উর্বশী” কবিতাটির প্যারোডি করে শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় লিখলেন ‘শ্যালিকা’ নামের কবিতা; “নহ প্রৌঢ়া নহ বৃদ্ধা, নহ শিশু, নহ নাবালিকা/হে তরুণী রূপসী শ্যালিকা।” বনফুল ‘শালা’ নামের কবিতায় লিখলেন, “সামান্য মনুষ্য নহ, নহ গৃহিণীর ভ্রাতা/হে শ্যালক, হে স্বভাব শালা।”

তবে বাংলা সাহিত্যের প্যারোডি রচয়িতাদের মাঝে সবার আগে সজনীকান্ত দাসের নাম চলে আসে। রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের ১২৬ সংখ্যক গানের প্যারোডি লিখলেন তিনি। মূল গানটি হল,

কাজল বিহীন সজল নয়নে
হৃদয় দুয়ারে ঘা দিয়ো।
আকুল অচিলে পথিক চরণে
মরণের ফাঁদ পাতিয়ো।

এর প্যারোডি করে সজনীকান্ত লিখলেন,

দন্ত বিহীন শুষ্ক বদনে
ফোকলা কান্না কাঁদিয়ো।
শাড়ির আঁচলে দোক্তা ও চুন
সযতনে প্রিয়া বাঁধিয়ো।

আবার নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্যারোডি করে সজনীকান্ত লিখলেন,

আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাং।
ভৈরব রসে বরষা আসিলে,
ডাকি যে ঘ্যাঙর ঘাং।
আমি ব্যাঙ।

আবার নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার প্যারোডি করে সজনীকান্ত লিখলেন ‘ভাণ্ডারী হুঁশিয়ার’।

চোর ও ছ্যাঁচোড়,
ছিচকে সিঁদেল দুনিয়া চমৎকার।
তল্পি তল্পা তহবিল নিয়ে,
ভাণ্ডারী হুঁশিয়ার।

সজনী কান্ত দাস মাইকেলের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ বইয়ের প্যারোডি করে লিখে ফেললেন ‘মাইকেল বধ কাব্য’।

জ্ঞানদাসের লেখা,

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু,
অনলে পুড়িয়া গেল।
অমিয় সাগরে সিনান করিতে
সকলি গরল ভেল।

এই কবিতাকে প্যারোডি করে সতীশচন্দ্র ঘটক লিখলেন,

ফলার লাগিয়া যে দই পাতিনু,
বিড়ালে খাইয়া গেল।
ছেলিয়া গুলিরে মানুষ করিতে
সকলি বকটি ভেল।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা সিনেমা এবং থিয়েটারের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে, প্যারোডি গান একটি নতুন বীজতলা খুঁজে পেয়েছিল। চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং নাট্যকাররা তাদের রচনায় হাস্যরস যোগ করার জন্য প্যারোডি ব্যবহার করতেন।

ভারতের স্বাধীনতার পরও কিন্তু প্যারোডি গানের বিবর্তন অব্যাহত ছিল। দ্রুত আধুনিকীকরণের ফলে সমাজে উদ্ভুত সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা মোকাবিলার জন্য এটি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে ওঠে। শিল্পীরাও জনপ্রিয় গানগুলি মজাদার এবং হাস্যরসাত্মকভাবে পরিবেশন করে প্রশংসা অর্জন করেছেন।

বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত সময়কে বাংলা প্যারোডি গানের এক স্বর্ণযুগ বলা চলে। এই সময়ে প্যারোডি গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন মিন্টু দাশগুপ্ত ওরফে জ্যোতিন্দ্রজিৎ দাশগুপ্ত (২৫ নভেম্বর ১৯৩১ – ২৩ নভেম্বর ২০০৬) । এই ‘আইকনিক’ গায়ককে ‘বাংলা প্যারোডি গানের রাজা’ বলা হয়। প্রতি বছর পুজোর সময় তাঁর নতুন নতুন প্যারোডি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হত। এই ধারার অন্যান্য বিখ্যাত গায়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল শিবদাস ব্যানার্জি, দীপেন মুখার্জি, লক্ষ্মীকান্ত রায়, অমল চ্যাটার্জী, রঞ্জিত রায়, অলোক রায় চৌধুরী, গুল মহম্মদ প্রমুখ। সত্তর দশকে সলিল দাস এবং তার স্ত্রী চায়না দাসও প্যারোডি গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। দীপেন মুখার্জি ছিলেন একজন গায়ক, সুরকার এবং গীতিকার। লক্ষ্মীকান্ত রায় এই ধারার রীতিমতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। রঞ্জিত রায়ের হিট অ্যালবামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য “আমি হজমি বটিকা।” অলোক রায় চৌধুরী ২০০৭ সালে “অবিস্মরণীয় প্যারোডি” শিরোনামে একটি প্যারোডি গানের অ্যালবাম সহ বহু গান গেয়েছেন।   

সমস্যা হচ্ছে, মিন্টু দাশগুপ্তের মতো শিল্পীর চলে যাওয়ার পর বাংলায় প্যারোডি গানের সেই জোয়ার আর দেখা যায় না। হাতে গোনা যে কয়েকজন শিল্পী বেঁচে আছেন তাঁরাও কাজ করছেন না, কারণ বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ধরনের গানের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। সব মিলিয়ে যে বাংলা প্যারোডি গান এক সময়ে বাঙালি সংস্কৃতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে ছিল, তা এখন অস্তাচলে।

তবে আশার কথা সাম্প্রতিক দশকগুলিতে কিছু কিছু ব্যান্ড ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রায়শই সাম্প্রতিক ঘটনা, রাজনীতি এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপর সচেতনতা তৈরিতে প্যারোডি ব্যবহার করছেন। সোস্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানের ফলে প্যারোডি সেসব গান সহজেই বহুসংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আবার শিল্পীরাও সময়োপযোগী প্যারোডি তৈরি করার পাশাপাশি দ্রুত শ্রোতার প্রতিক্রিয়া জানাতে পারছেন, যা এই ধারাটিকে আরও গতিশীল করে তুলছে। ফলে পরিবর্তিত বিশ্বে বাঙালি তার রসবোধ ও সাংস্কৃতিক বিনোদনের এই ধারাটির প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পারছে।

এবারে আমি আসব জনপ্রিয় প্যারোডি শিল্পীদের গানের তালিকা নিয়ে। এই দীর্ঘ তালিকা এই রচনার মেদ বৃদ্ধি করলেও আমি বলব এই কাজের জন্য এটা আমাকে করতে হত, কারণ আধুনিক ই-প্ল্যাটফর্মেও সব তথ্য এখনও সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি।

প্রখ্যাত প্যারডি গায়ক

মিন্টু দাশগুপ্তের মূল গানসহ কয়েকটি জনপ্রিয় প্যারোডি গান হল –

“আজি হঠাৎ উল্টালো সব” (“আজ রপট জায়ে তো”)

“যদি গ্রহের মিলনে সব পেত লয়” (“এই পথ যদি না হয়”)

“ট্রামের লেডিস সিটের দিকে” (“নাম রেখেছি বনলতা”)

“বিয়ের ছাদনাতলায় দাও উঁকিঝুঁকি” (“গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি”) 

“তিনটি মন্ত্র নিয়ে তাদের জীবন রকবাজি, গুলবাজি বিড়িতে দম” (“তিনটি মন্ত্র নিয়ে যাদের জীবন”)

“আজি এ সন্ধ্যায়” (“নিঝুম সন্ধ্যায়”)

“দন্তবিহীন থাকে না আর যেন হাড় চিবোনোর এই দিন” (“অন্তবিহীন, কাটে না যেন আর যেন বিরহের এই দিন”)

“এই তো যৌবন রয় না” (এই তো জীবন”)

“কেউ চোর ছাড়া আজ নেই” (“মন চুরি ছাড়া কাজ নেই”)

“কোথায় তোমার আস্তানা” (রুপ তেরা মস্তানা”)

“ও ভাই আবার ভোট গেল” (এ ভাই জরা দেখতে চলো”)

“আমার সাধের বৌ করাইলো মোরে গৃহত্যাগী’” (“সাধের লাউ”)

“সত্যি তোমার জন্য, করেছি কাজ জঘন্য” (“হয়তো তোমার জন্য”)

“শোনো গো বলি তোমায় কারো ভালো করো না” (“শোনো মন বলি তোমায়”)

“টানলে পরে কারণ সুধা” (“বিপিনবাবুর কারণ সুধা”)

“নেশায় মারো দম চিন্তা” (“দম মারো দম”)

“আজকালকার বিটিদের” (“বড়লোকের বিটি লো”)

“বাহার করে বাইরে ঘোরা” (“গোরি মেরা গাঁও বড়া প্যেয়ারা”)

“সংসারে পড়ে কলির কৃষ্ণ কাঁদে” (“ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে”)

“এ জন্মে ঠকালে প্রিয়া, প্রেমের সুযোগ নিয়া” (“কোন হ্যায় যো সপ্নো মে আয়া”)

“এবার এক নতুন দেশে” (“এক দিন বিক যায়েগা”)

“গুল সবই গুল” (“ভুল সবই ভুল”)

“কর কর যা খুশি কর” (জিলে লে জিলে লে”)

“শোনো গো প্রাণের রাণু” (“না তুম হমে জানো”)

“ঘুমায় গৌর নিতাই নদীয়াতে” (“আছে গৌর নিতাই নদীয়াতে”)

“বুড়োকে ব্লাফ দিয়ে” (“খোঁপার ওই গোলাপ দিয়ে”)

“আমি সুযোগ পেলেই” (“আমি যে কে তোমার”)

“সৃষ্টি সৃষ্টি সৃষ্টি” (বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি”)

“বৌয়ের ভাই শালা কাঁঠালি কলা” (“হায়রে কালা এ কী জ্বালা”)

“কী যে হাল হল দাদা” (কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা”)

“মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই” (“কোরা কাগজ থা এ মন মেরা”)

“হাসছে সবে হাসছে সবে রে বাবা” (“বাচকে রেহনা রে বাবা বাচকে রেহনা রে”)

“এই বৈশাখে ঘুরে ঘুরে মরি হায়” (“এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়”)

“তোমার ট্যারা-ব্যাঁকাটি চোখ” (“তোমার নীল দোপাটি চোখ”)

“অভাবেও ছিল আশা মনে জড়িয়ে” (“বেকারার করকে হামে”)

“চিঠি পেলাম হায়” (“চিঠঠি আয়ি হ্যায়”)

“শোনো আমার কাহিনি, কভু আমি যা চাহিনি” (“মেরা জুতা হ্যায় জাপানী”)

“হায়রে দাদা গো আমি চার যুগেরই শোনাই কাহিনি” (“আমি চার যুগে হই জনম দুখিনি”)

“তেলের শিশি ভাঙলো বলে খোকার উপর রাগ করো/তোমরা যেসব বুড়ো খোকা বোতল টেনে ফাঁক করো, তার বেলা” (“তেলের শিশি ভাঙলো বলে”)

“কাক কালো, কোকিল কালো/আর হনুমানের মুখটি কালো, কালোর আড়ালে চলেছে নিত্য কতই গ্যাঁড়াকল” (“মেঘ কালো, আঁধার কালো”)

“নীল আকাশের নীচে আছে কত দেশ/শুধু আমাদের ঘরে আছে হা-হুতাশ/তুমি শুনেছ কি” (“নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী”)

অলোক রায় চৌধুরীর বেশ কিছু জনপ্রিয় প্যারোডি গান আছে। যেমন—

“ওই সপ্তসিন্ধুর ওপার থেকে” (রচনা ‘দাদাঠাকুর’ শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “ওই সপ্তসিন্ধুর ওপার থেকে” গানের প্যারোডি)

“তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে” (রচনা কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারই গেহে পালিছ স্নেহে’ গানের প্যারোডি)

“যদি বারণ কর তবে হাসিব না” (“যদি বারণ কর তবে আসিব না”)

“সে আসে ধেয়ে, এন ডি ঘোষের মেয়ে, ধিনিক ধিনিক চায়ের গন্ধ পেয়ে” (রচনা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। রবীন্দ্রনাথের “সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে” গানের প্যারোডি)

“এখনো তারে চোখে দেখিনি শুধু কাব্য পড়েছি” (রচনা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। রবীন্দ্রনাথের “এখনো তারে চোখে দেখি নি, শুধু বাঁশি শুনেছি” গানের প্যারোডি)

“তুমি কেমন করে পান করো হে চুনি” (“তুমি কেমন করে পান করো হে গুণী”)

“Tea পাইনি” (রচনা পরিমল গোস্বামী। রবীন্দ্রনাথের গানের প্যারোডি)

“একবার বিদায় দে, কাঁহাতক দাঁত ছিরকুটে আর হাসব দেঁতো হাসি” (রচনা নলিনীকান্ত সরকার। “একবার বিদায় দে মা’ গানের প্যারোডি)

“জানালায় টিকটিকি তুই” (রচনা সজনীকান্ত দাস। নজরুলের “বাগিচায় বুলবুলি তুই”)

“আমি হজমি বটিকা” রঞ্জিত রায়ের সবচেয়ে পরিচিত প্যারোডি গানগুলির মধ্যে একটি, যা ‘বেঙ্গলি প্যারোডি হিটস’ অ্যালবামে প্রকাশিত হয়েছিল।

লক্ষ্মীকান্ত রায়ের প্যারোডি গানগুলোর পৃথক তালিকা খুব বেশি সহজলভ্য নয়। অন্যান্য জনপ্রিয় প্যারোডি শিল্পীদের মতো, তাঁর গানগুলো হয়তো বিভিন্ন অডিও অ্যালবামে বা সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল, তবে সেগুলোর নাম সবসময় প্যারোডি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে, বিভিন্ন সঙ্গীত প্ল্যাটফর্মে তাঁর কিছু গান পাওয়া যায় যা প্যারোডি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: ‘হবু বর আর কনে’: সম্ভবত এটিও একটি কমেডি বা প্যারোডি গান, যদিও এর তথ্য নিশ্চিত নয়।  লক্ষ্মীকান্ত রায়ের প্যারোডিগুলোও সম্ভবত একইভাবে তৎকালীন জনপ্রিয় গানের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল।

গুল মহম্মদের গাওয়া একটি প্যারোডি “বারান্দায় শত্রু, দাঁড়িয়ে আছে উনি প্রেমিকার বাবারে” (বারান্দায় রোদ্দুর গানের প্যারোডি)। বা “বাবা মাতাল ছেলে মাতাল মাতাল একমাত্র নাতি…” (“মন মাতাল সাঁঝ সকাল কেন শুধুই ডাকে” গানের প্যারোডি)।

সলিল দাস ও চায়না দাসের গাওয়া প্যারোডি “আমার বউ জলজ্যান্ত এক রাক্ষুসী” (“সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী”)।

তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলায় এমন অনেক শিল্পী এখনও বাংলা প্যারোডি শিল্পের ধারা বহন করে চলেছেন, যাদের খবর আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না নানা কারণে। সে সব শিল্পীর খোঁজ করে তাঁদের উৎসাহিত করা জরুরি। বাংলার লোকগানের ধারার মতো প্যারোডি শিল্পও বাংলার এক অনন্য ধারা যা সংরক্ষণের দাবি রাখে।

———-

তথ্যসূত্র

আনন্দবাজার পত্রিকা (২০২১, ডিসেম্বর ৮)। “কলকাতার কড়চা-জীবনশিল্পী।”

বসু, অঞ্জলি। (সম্পাঃ)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড। কলকাতাঃ সাহিত্য সংসদ।

Boyd, M. (2000). Bach. Oxford and New York: Oxford University Press.

চক্রবর্তী, সুধীর (সম্পাঃ)। (২০১১)। বাংলা গান, অদীন ভুবন কলকাতাঃ কারিগর।

ঘটক, নিতাই। (২০০৬)। নজরুলগীতির স্মৃতিকলকাতাঃ হরফ প্রকাশনী।

Hughes, G. (1959). The Music of Sir Arthur Sullivan. London: Macmillan.

Hutcheon, L. (1985). “The Pragmatic Range of Parody.” A theory of parody: The teachings of Twentieth-century art forms. IL, USA: Univ. of Illinois Press.

Larkin, C. (Ed.) (2009). “Yankovic, ‘Weird Al.'” Encyclopedia of Popular Music. England: Muze Inc and Oxford University Press.

ইউ টিউব ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার।

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *