শংকরের স্বর্গ- ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’র মূল প্রেক্ষাপট
‘বাঁচবার ইচ্ছে যে জাতের আছে তাকে মারা যায় না। ভয়কে জয় না করলে ভয়েরই জয় হয়, আর তখনই মানুষ ক্ষুদ্র হতে আরম্ভ করে।’ – শংকর (আশা আকাঙ্ক্ষা)
আজ আমাদের দেশ জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুস্বাস্থ্য ইত্যাদি নানা আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হলেও অন্ততঃ একটা বিষয়ে পরিপূর্ণ স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পেরেছে, তা হল কৃষিজাত খাদ্য। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর কৃতিত্ব নিতে চাইলেও (অবশ্য তা চাইবে নাই বা কেন, কর্তার ইচ্ছে ছাড়া তো কর্ম হয় না!) এর সঙ্গে অনেকটাই জড়িয়ে আছে দুটি নাম। আমাদের দেশে গুরু-শিষ্য পরম্পরা চিরকালীন। কৃষ্ণের চিন্তাধারাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মরাজ্য স্থাপন করেছিলেন প্রিয়শিষ্য অর্জুন, চাণক্যের কূটনীতি প্রয়োগ করে সাম্রাজ্য-স্থাপনে সফল হয়েছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য- আর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সনাতনী ঐশ্বর্য প্রচার করে ভারতবর্ষকে স্বমহিমায় বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেন রামকৃষ্ণ-শিষ্য বিবেকানন্দ। দুর্ভিক্ষপীড়িত এদেশের চিরন্তন খাদ্যসমস্যা দূর করতে দায়িত্ব নেওয়া এরকমই এক জুটির কথা পাই আমরা শংকরের একটি উপন্যাসে, আজ তা নিয়েই কিছুটা আলোচনা করব।
জনপ্রিয় সাহিত্যিক শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ১৯৩৩-২০২৬) ১৯৭৩-এ একটি উপন্যাস লেখেন- ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’। এটি তাঁর স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ট্রিলজির অন্যতম। এই গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক লেখেন-
“বছর কয়েক আগে কোনো এক ছুটির দিনে বাংলার বাইরে গিয়েছিলাম। সেখানকার এক আধুনিক গবেষণাগারে কয়েকজন তরুণ বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে আকস্মিকভাবে পরিচিত হবার সুযোগ এসেছিল। সেই পরিচয় থেকেই এই উপন্যাসের সূত্রপাত। আমাদের এই ভারতবর্ষে তাঁরা নীরবে যে আশা আকাঙ্ক্ষার স্বর্গলোক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন তা সার্থক হোক, দেশজননীকে তাঁরা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করুন এই প্রার্থনা।”
উনি এর বেশি কিছু লেখেননি এ নিয়ে। বাংলার বাইরে বলতে উনি উল্লেখ করেছেন চন্দনপুর নামে এক কাল্পনিক শহরের যেখানে কলকাতা থেকে পৌঁছে দেয় দ্রুতগামী চন্দনপুর এক্সপ্রেস। আপাততঃ আমরা তাহলে রওনা দিই চন্দনপুরের পথে, আর যেতে যেতে উপন্যাসের পশ্চাৎপট সম্বন্ধে একটু আলোচনা করে নিই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য সৈন্যদের খাবার জোগাতে ব্রিটিশরা এদেশের খাদ্য-রসদের ভাণ্ডার প্রায় শেষ করে ফেলেছিল, দেশে নেমে এসেছিল মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। নদীবিধৌত ভারতের গঙ্গা-যমুনা-কৃষ্ণা-গোদাবরী উপত্যকার পাললিক জমি উর্বরা হলেও, ইংরেজ শাসনে পরাধীন ভারতের সেচ ব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। তাছাড়া নিয়মিত ফসল ফলাতে হলে মাটিরও তো খাদ্যের প্রয়োজন, মা নিজে যদি রক্তাল্পতা আর অপুষ্টিতে ভোগেন শিশুকে স্তন্য জোগাবেন কিভাবে? তাই প্রায়শ্চিত্ত বলুন বা স্বায়ত্তশাসনাধীন তৎকালীন ভারতবর্ষের মন্ত্রীদের চাপেই হোক, তারা এ দেশকে আবার সুজলা-সুফলা করে তোলার একটা উদ্যম নেয় ১৯৪৪-এ। কিন্তু যে মুহূর্তে এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটাবার আভাস পেল তারা, কর্মকাণ্ডে ভাঁটা পড়ল। বাংলার গা ঘেঁসে বিহারের কয়লা-সমৃদ্ধ অঞ্চলে একটা বিশাল রাসায়নিক সার কারখানার খসড়া তারা বানিয়ে গেলেও কাজের কাজ তখনও কিছুই হয়নি। ১৯৪৭-এ ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু দেশগঠনের রূপরেখা তৈরি করতে শুরু করেন। অনুমোদিত পরিকল্পনায় অ্যামোনিয়াম সালফেট, ডাবল সল্ট, ইউরিয়া আর সুপার ফসফেট উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে সিন্দ্রি সার কারখানার নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৪৯-এ, ‘৫১ সালে কারখানা তৈরি মোটামুটি শেষ হয়ে উৎপাদনের কাজ শুরু হয়ে যায়।
শংকর তাঁর গল্পে সার কারখানা, তার গঠন, পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে অনেক তথ্য সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন, সিন্দ্রি সার কারখানার পরিবেশে মানুষ হয়েছি বলে বুঝতে পারি যে এর মধ্যে কোন তথ্যের অতিরঞ্জন বা বিকৃতি তো নেইই, বিজ্ঞান সম্বন্ধে লেম্যানও সবকিছু জলের মতো বুঝতে পারবে। প্রসঙ্গত জানাই যে বিংশ শতকের ষাটের দশকে যুবক শংকর সারনগরী সিন্দ্রি আসেন একটি সাহিত্যসভার আমন্ত্রণে- তাঁর চন্দনপুর, অথবা কৃষিনগর অর্থাৎ বাংলা-সংলগ্ন বিহারের (অধুনা ঝাড়খণ্ড) ধানবাদ শহরের অনতিদূরের একটি আধা-শহর দামোদর-তীরের সিন্দ্রিতে। এই সারের সারবস্তু একটু সংক্ষেপে বলি, গোবর থেকে যে সার তৈরি হয় তাকে বলে কম্পোস্ট, সমস্ত দেশের চাহিদার তুলনায় তা আর কতটুকু? তবে সার গোবর থেকে হোক বা রাসায়নিক উপায়ে, তার মূল উপাদান হল K-P-N, অর্থাৎ পটাশিয়াম, ফস্ফোরাস আর নাইট্রোজেনের অন্ততঃ একখানা। অ্যামোনিয়া আর ইউরিয়া- এই দুটি বস্তুতেই আছে প্রচুর নাইট্রোজেন, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট আর সুপার ফসফেটে আছে ফসফোরাস। তখন দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর চোখে দেশকে কৃষি, ব্যবসা-শিল্পোদ্যোগ-বিজ্ঞান সবকিছুতে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার স্বপ্ন। ঝরিয়া-রানীগঞ্জের কয়লা, সিংভূমের লোহার আকর নিয়ে টাটারা জামশেদপুরে গড়ে তুলেছেন ইস্পাত-উদ্যোগ, এবার শস্য উৎপাদনে দেশকে আত্মনির্ভর করে তোলার ইচ্ছে নিয়ে সিন্দ্রিতে রাসায়নিক সার কারখানার পুরোপুরি একটা পরিকাঠামো গড়ে তোলা হল। কয়লা তো চারপাশেই আছে, তা দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করার জন্যে তৈরি হবে ৮০ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট, পরে অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্যে ডিভিসি থেকে একটি পাওয়ার গ্রিড জোড়া হবে তার সাথে। এছাড়া অ্যামোনিয়া তৈরির কাঁচা মাল হিসেবে চাই শুদ্ধ কয়লা, যাকে বলে কোক। সাধারণ বিটুমিনাস কয়লা থেকে কোক তৈরির জন্যে চালু হবে কোক-ওভেন প্ল্যান্ট। গরম কোক-কয়লার সাথে জলবাষ্প আর হাওয়ার নাইট্রোজেন মিশিয়ে বানানো হবে সেমি-ওয়াটার-গ্যাস। পরের বিক্রিয়াটা ঘটানো হবে ক্রোম-ম্যাগ্নেটাইট ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের স্তরের মধ্যে দিয়ে একটা নিয়ন্ত্রিত তাপমান আর চাপে। এই হল হেবার-বশের অ্যামোনিয়া-সংশ্লেষণ পদ্ধতি! কার্বন মনোক্সাইডকে জারিত করে পরিবর্তিত করা হবে কার্বন ডায়োক্সাইডে, যার সঙ্গে এই অ্যামোনিয়ার সংযোগ ঘটিয়ে তৈরি হবে ইউরিয়া, একটা উঁচু চিমনিসদৃশ মিনার যাকে বলে প্রিলিং টাওয়ার, তার থেকে তরল ইউরিয়া পড়ে স্ফটিকের রূপ নেবে। রাজস্থান থেকে আনা হবে খনিজ জিপসাম যার সঙ্গে অ্যামোনিয়া মেশাতেই তৈরি হবে অ্যামোনিয়াম সালফেট সার। মজার ব্যাপার হল, বাই-প্রডাক্ট হিসেবে তৈরি হবে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট বা প্রেসিপিটেটেড চক যা সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল। তাই বিখ্যাত সিমেন্ট সংস্থা ACC একটা সিমেন্ট কারখানা বসানোর সিদ্ধান্ত নিল পাশে- কাঁচামাল পরিবহনের খরচ বেঁচে গেল তাদের।
ইতিহাস তো শুরু সেই ১৯৪৪ থেকে, ’৪৯ সালে কারখানা তৈরি শুরু হয়ে ’৫১-এর ৩১শে অক্টোবর ৯৬০ টন প্রতি দিনের ক্ষমতা নিয়ে অ্যামোনিয়াম সালফেট নামে সার তৈরি শুরু হয়ে যায়। সার আর মাটি নিয়ে নানারকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যে চালু হয় প্ল্যানিং অ্যাণ্ড ডেভলাপমেন্ট (P&D) নামে গবেষণাকেন্দ্র। তারপর ‘৫৪ সালে গড়ে ওঠে কোক ওভেন প্ল্যান্ট যার ফলে অ্যামোনিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধি পায় আর ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যে কারখানা একধাপ এগিয়ে যায়। ইউরিয়া পাইলট প্ল্যান্ট আর ডাবল সল্ট (অ্যামোনিয়াম সালফেট-নাইট্রেট) প্ল্যান্ট চালু হয় ‘৫৬ সালে, ১৯৫৯-এ ইউরিয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন আর ট্রিপল সুপার ফসফেট উৎপাদন শুরু হলে উৎপাদন এশিয়ার যে কোন কারখানাকে ছাড়িয়ে যায়। কারখানার আধুনিকীকরণ হয়ে নতুন প্রিলিং টাওয়ার বসে ১৯৭৯-এ। আজকের স্বয়ংক্রিয় আর তথ্যনির্ভর যুগে এত দ্রুত এসব ঘটানো অস্বাভাবিক না মনে হলেও সে যুগে যখন সদ্যস্বাধীন দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত, বৈদেশিক মুদ্রা আর দেশীয় কারিগরিবিদ্যা আর কর্মদক্ষতা সীমিত, সর্বোপরি লাল ফিতের বাঁধন- কিভাবে ঘটল এই অসাধ্যসাধন, কে বা কারা মূল হোতা ছিল এর পেছনে জানতে আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক। ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’-য় এই স্বপ্নপূরণের কাহিনি কিছুটা আছে, তা কিন্তু শুধুমাত্র গল্প বা রূপকথা নয়।
কেবলমাত্র যন্ত্র আর তথ্য নিয়ে গল্প হয় না, আসলে এই কাহিনির মূল নায়ক দুজন- প্রতিভাবান কিন্তু পাগলাটে বিজ্ঞানী ডাঃ নোয়েল দিগম্বর বনার্জি আর তাঁর যোগ্য সহযোগী-শিষ্য তরুণ যন্ত্রবিজ্ঞানী ডাঃ কমলেশ রায়চৌধুরি। ডাঃ বনার্জি প্রায় পাগলের মতো কারখানা চালু করার দিনটিকে এগিয়ে আনতে চাইছেন আর এই অসম্ভব কাজকে সম্ভাব্য পরিণতি দিতে সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর দাবিকেও উপেক্ষা করে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন তাঁর যোগ্য শিষ্য কমলেশ। সাফল্য আসে আর তখনই জানা চায় এই অমানুষিক তাড়াহুড়োর পেছনের মূল রহস্য- ডাঃ বনার্জির ক্যান্সার ধরা পড়েছে, আয়ু সীমিত। যাবার আগে নিজের কাজের সাফল্য দেখে যেতে চান। এই দু’জনকে প্রায় রূপকথার অতিমানবের মত গল্পে উপস্থাপনা করা হলেও প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি, এঁরা আদতে রক্তমাংসের চরিত্র, যদিও গল্পের প্রয়োজনে তাঁদের পুনঃসৃজন করেছেন লেখক।
’আশা আকাঙ্ক্ষা’র নায়ক নোয়েল দিগম্বর বনার্জি চরিত্রটি শংকর যাঁকে দেখে সৃষ্টি করেছেন, প্রাচীন সিন্দ্রিবাসী জানেন যে তিনি আর কেউ নন, Sindri Fertilizers & Chemicals Ltd, যা পরবর্তীকালে Fertilizer Corporation of India Ltd নামে পরিচিত হয় তার প্রাণপুরুষ ডাঃ ক্ষিতীশ রঞ্জন চক্রবর্তী। ডাঃ চক্রবর্তীর জন্ম হয় ১৯১৬ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি করে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ সায়েন্স থেকে ডক্টরেট উপাধি নিয়ে ১৯৪৯-এ সিন্দ্রির নির্মীয়মাণ সারের কারখানায় বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন। তারপর এই তরুণ বিজ্ঞানী তাঁর মেধা, অসামান্য প্রতিভা, ধীশক্তি, অফুরন্ত উৎসাহ, দক্ষতা আর পরিশ্রম দিয়ে সিন্দ্রির কারখানায় সার উৎপাদন সম্বন্ধে গবেষণা আর উন্নতির পরামর্শের উদ্দেশ্যে, ফার্টিলাইজার প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট নামে সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন ও তার অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে সিন্দ্রিতে অ্যামোনিয়াম সালফেট সারের উৎপাদন শুরু করিয়ে দেন। সরকারি কাজের দ্রুততার বহর প্রধানমন্ত্রীর দফতরের জানা ছিল, সেই ভাবনা মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধন করতে পণ্ডিত নেহেরুর আসার দিন স্থির হয় মার্চ ১৯৫২-তে, অবিশ্বাস্যভাবে তার আগে ‘৫১র অক্টোবরেই উৎপাদন শুরু হয়ে যায়। সিন্দ্রি কারখানার স্থপতি যদি ব্রিগেডিয়ার কক্স আর বিসি মুখার্জি হন, সফল অ্যামোনিয়া সংশ্লেষণ, হেবার-বশ পদ্ধতিতে বিক্রিয়ার জন্যে অনুঘটক বা ক্যাটালিস্টের ডিজাইন, ইউরিয়া আর ডাবল সল্টের প্ল্যানিং ছাড়াও মাটির গুণবত্তা অনুসারে সারের গঠন আর প্রয়োগের জন্যে প্রযুক্তিমূলক ফার্মিং- এই সব কিছুর রূপকারই ডাঃ ক্ষিতীশ চক্রবর্তী। এই কাজের স্বীকৃতি আসে ১৯৫৪ সালে পদ্মশ্রী উপাধিপ্রাপ্তির মাধ্যমে। ভারতবর্ষের সবুজ বিপ্লবের কর্ণধার তিনি, দেশকে সারের উৎপাদনে স্বনির্ভর করার ক্ষেত্রে তাঁর নাম অগ্রগণ্য। পরে তিনি ভারত সরকারের প্রযুক্তি উপদেষ্টা নিযুক্ত হন আর ১৯৬৮ সালে CSIR থেকে ভারতীয় বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদের সেরা সম্মান শান্তিস্বরূপ ভটনাগর পুরস্কার পান। পুরস্কার উপলক্ষে যে বিবৃতি দেওয়া হয়, তার সারসংক্ষেপ আমি বাংলায় অনুবাদ করে রেখেছি, পড়ে দেখতে পারেন। একটু খটোমটো লাগবে অবশ্য, টেকনিক্যাল শব্দগুলোর যথাযথ বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া খুবই কঠিন।
“ডাঃ ক্ষিতীশরঞ্জন চক্রবর্তীর দেশীয় প্রক্রিয়া ও পণ্য সম্বন্ধে অসামান্য জ্ঞান, দক্ষতা ও অক্লান্ত কর্মের ফলে বিদেশী যন্ত্র, পণ্য ও প্রযুক্তির দেশীয় প্রতিস্থাপন এবং ঔদ্যোগিক স্তরে সার ও বৃহৎ রাসায়নিক শিল্পের পরিকল্পনা, স্থাপনা ও পরিচালনার প্রকৌশল উদ্ভাবনায় দেশীয় ক্ষমতা এবং দক্ষতার গঠন ও বিকাশ সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল দেশে নতুন নতুন ক্যাটালিস্টের উদ্ভাবন, উৎপাদন ও প্রয়োগের জন্য জ্ঞানের বিকাশ। এই ক্যাটালিস্ট তাঁর আবিষ্কৃত প্রক্রিয়ার উপর একটি নতুন তত্ত্বের ভিত্তিতে এবং সার কারখানার প্রকৌশলগত জ্ঞানের একীকরণের ভিত্তিতে সৃষ্ট। এই কাজ প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর পদ্ধতিতে সার-শিল্প প্রতিষ্ঠার দিকে দেশকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সার উদ্যোগের জন্য দেশী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম তৈরির প্রেরণা দিয়েছে। ডাঃ চক্রবর্তী ভারতের ফার্টিলাইজার কর্পোরেশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগকে একটি ব্যাপক এবং সমন্বিত বহু-কার্যকরী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দায়ী। এটি শুধুমাত্র ল্যাবরেটরির গবেষণাই নয়, পাইলট প্ল্যান্ট, পরিকল্পনা, নকশা, প্রকৌশল, সার প্ল্যান্টের স্থাপনা ও পরিচালনার বিভিন্ন আন্তঃসম্পর্কিত এবং আন্তঃসংযুক্ত ক্রিয়াপদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং প্রায় সম্পূর্ণরূপে সার শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রদান করেছে।”
১৯৯৪ সালে এই বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। তবে গল্পের নায়কের মত নাটকীয় ক্যান্সারে ভুগে নয়। তাহলে এই তাড়াহুড়ো কিসের ছিল যে নির্ধারিত দিনের চার মাস আগেই কাজ শেষ? না, এরমধ্যে চমক নেই, সত্যিকথা হল- দেশের জন্যে চিন্তা। দেশকে যত দ্রুত সম্ভব দুর্ভিক্ষমুক্ত করতে হবে। অবশ্য তিনি যে কাজ-পাগল বা workoholic ছিলেন সেটাও স্বীকৃত সত্য। ‘আশা-আকাঙ্ক্ষা’-র নোয়েল দিগম্বর বনার্জির চরিত্র যতই অতিরঞ্জিত মনে হোক, আমার মতে এটাই সত্য।
তবে তাঁর এই সহকারী কমলেশের চরিত্রের বাস্তব নায়কটিকে নিয়ে আমার মনে দ্বিধা আছে। তথ্য বলে কমলেশ কোনও একজন নন, একাধিক মানুষের একটি টিম। হয়ত মূল মানুষটি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের আই-সি-এস অফিসার বিসি মুখার্জি, তাঁরই আদলে গড়া হয়েছে কমলেশ রায়চৌধুরি চরিত্রটি, যদিও হিসেব মিলছে না কারণ মুখার্জিসাহেব ছিলেন চক্রবর্তীর চেয়ে বয়সে ও পদমর্যাদাতে বড়। এঁর জন্ম ১৯১০ সালে। ১৯৩৫-এর আই-সি-এস তিনি, স্বাধীনতার পরে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির শিল্পমন্ত্রকে জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন।
১৯৪৯-এ নেহেরু এঁকে ব্রিগেডিয়ার কক্সের জায়গায় সিন্দ্রি সার কারখানার জেনারেল ম্যানেজারের পদে নিয়ে আসেন, পরে ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন। আশা আকাঙ্ক্ষার বনার্জির মত ডাঃ চক্রবর্তী সার ও ক্যাটালিস্ট সংক্রান্ত গবেষণার আর কারখানার প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান হলেও তিনি মুখার্জির উপরওয়ালা ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সিন্দ্রি কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময়কার একটি স্মৃতিচারণে তিনি বিসি মুখার্জির অন্তর্দৃষ্টি আর কর্মক্ষমতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। সেই সময়ের কোম্পানির চেয়ারম্যান এ কে চন্দও ১৯৫৩-র বাৎসরিক সাধারণ সভাতে (AGM) শ্রীমুখার্জির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেবছরই তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টারের দায়িত্ব পান। তবে কারখানা নির্মাণের কাজে তিনি কড়া নজরদারি রাখলেও টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা ঘামাবার দায়িত্বে ডাঃ চক্রবর্তী নিজেই ছিলেন তাঁর টিম ও বিদেশি এক্সপার্টদের নিয়ে। মুখার্জি কারখানার কাজের তদারকের ফাঁকে স্টাফ কোয়ার্টার, কলোনির রাস্তাঘাট, টাউন ইঞ্জিনিয়ারিং, খেলাধূলা, মনোরঞ্জন, দোকানপাট, হাটবাজার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সব দিক দিয়ে শহরটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল বীরভূমে, শান্তিনিকেতন থেকে যদুনাথ নামে একজন দক্ষ মালীকে এনে তার হাতে তুলে দেন গাছপালা, ফুলবাগান, জলাশয় আর পার্ক দিয়ে নগরের সৌন্দর্যায়ণ আর পরিবেশ রক্ষার ভার। মুখার্জি একসময় আরা শহরে ডেপুটি কালেক্টার ছিলেন, সেখান থেকে পরিচিত কিছু বিহারী ব্যায়ামবীর এনে তাদের হাতে দেন কারখানা ও কলোনির সুরক্ষার দায়িত্ব (CISF আসে ১৯৬৯-এর পর), অবসর সময়ে তারা স্থানীয় কিশোরদের শারীরচর্চার ভার নেয়। একদল যাদব এসে গরু-মোষ এনে দুধের ব্যবসাও শুরু করে, লাভের আশায় ভিড় জমায় স্থানীয় ও মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর দল। ২০০ শয্যার হাসপাতালের শিলান্যাস করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজকুমারী অমৃত কৌর। ফলে ১৯৫৩-এর গোড়াতেই পূর্ব ভারতে টাটানগর, চিত্তরঞ্জন আর দুর্গাপুরের মত সিন্দ্রিও একটি আদর্শ শিল্পনগরীরূপে গড়ে ওঠে।
গল্পের সঙ্গে বাস্তবের যেমন মিল আছে ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত অমিলও আছে প্রচুর, সেই প্রসঙ্গে আসি। শংকর কিন্তু সিন্দ্রি এসেছিলেন ষাটের দশকের মধ্যভাগে, কারখানা স্থাপনার গোড়ায় নয়। তার আগে ১৯৫৯ সালে শুরু হয়েছে ইউরিয়ার উৎপাদন। মনে হয় উপন্যাসের ঘটনাটা সেই সময়ের, কারণ এতে প্রিলিং টাওয়ার বসানোর অধ্যায় আছে। সিন্দ্রির তখন স্বর্ণযুগ, কারখানা ও কলোনির খ্যাতি মধ্যগগনে। তখন কোম্পানির নির্দেশক ডাঃ ক্ষিতীশ চক্রবর্তী আর সিন্দ্রি সার ও রসায়ন (১৯৬১তে নাম বদলে হয় FCI) আর কারখানার জেনারেল ম্যানেজার আরেক টেকনোক্র্যাট ডাঃ সুবোধ কুমার মুখার্জি। আমার ধারণা, ইনিই কাহিনির সেই নায়ক ডাঃ কমলেশ কারণ এঁর সময়েই তথাকথিত ইউরিয়া প্রিলিং চালু হয়। ডাঃ সুবোধ মুখার্জির জন্ম ২০-র দশকে, উনি গোড়ার কয়েকবছর সিন্দ্রিতে ছিলেন, পরে দুর্গাপুর গিয়ে সেখানকার কারখানা চালু করান, আর ১৯৬৫-তে ট্রম্বের নবনির্মিত সার কারখানায় জেনারেল ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত হন। সেখানে গিয়ে তিনি সার আর কাঁচামালের পরিবহণ সমস্যার সমাধান করেন আর সেখানকার ইউরিয়া প্রিলিং চালু করেন। প্রিলিং টাওয়ার কমিশনিং-এর গোড়ায় কোন ঝামেলা হয়েছিল কিনা জানা নেই, সুজাতা আর জার্মান অফিসারের কাহিনি হয়ত কাল্পনিক, তবে ডাঃ মুখার্জির প্ল্যানিং, কর্মদক্ষতা আর সংগঠন-দক্ষতা কোন স্তরের ছিল তা জানা যায় ট্রম্বের তৎকালীন ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার রামারাও আন্নাভারাপু-র লেখা একটি ব্লগ থেকে।
নবনির্মিত প্রিলিং টাওয়ারটি ট্রম্বের প্ল্যান্টে বসানোর আগে তাতে একটি বড় গোলযোগ দেখা যায় যা সারিয়ে তোলা বেশ সময়সাপেক্ষ ছিল। এদিকে দেশের কৃষিজমি তখন ইউরিয়ার অভাবে ধুঁকছে। সেই মুহূর্তে গোরখপুরের নির্মীয়মাণ প্ল্যান্টে একই ধরণের একটি টাওয়ার প্রয়োজনের কিছু আগেই এসে পড়েছিল। সেটি গোরখপুরের মিটার গেজ লাইনে লোড করে মাঝে ব্রডগেজে ট্রান্সশিপ করে ট্রম্বে আনতে অন্ততঃ তিন সপ্তাহের হিসেব। কিন্তু ডাঃ সুবোধ মুখার্জির সঠিক প্ল্যানিং আর দক্ষ টিমওয়ার্কের ফলে এগারো দিনের মধ্যে পরিবহণ সুসম্পন্ন হয়ে সময়ে কাজ চালু হয়ে যায়। হয়ত এই ঘটনাই শংকর এই উপন্যাসে টেনে এনেছেন, কারণ তিনি যে সময় সিন্দ্রি এসেছিলেন ডাঃ মুখার্জি তখন বদলি হয়ে গেছেন, বিসি মুখার্জিও নেই। গল্পে যে ব্রিটিশ এক্সপ্লোসিভের কথা এসেছে, তার অস্তিত্ব ছিল সিন্দ্রির ৪০-৪৫ কিলোমিটার দূরের গোমিয়ায়- নাম Indian Explosives Ltd (IEL)। আমার পরিচিত একজন বিজ্ঞানী ডাঃ প্রদীপ ঘোষ সেখানে দ্বিগুণ মাইনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন- সেখানকার সমাজে কর্মচারীদের সঙ্গে মেলামেশার বিধিনিষেধ তিনি মানতে পারেননি। আমার ধারণা P&Dতে তাঁর সঙ্গে কথা বলে এই ঘটনার কথা লেখক জানতে পারেন ও গল্পে অন্যভাবে উপস্থাপিত করেন।
ডাঃ বনার্জির ক্যানসার-প্রসঙ্গ এই উপন্যাসে হয়ত কাল্পনিক কিন্তু এরকম একটা ঘটনা বাস্তবেও ঘটেছিল, এই শহরেই। সিন্দ্রিতে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বি-আই-টি (Bihar Institute of Technology, এখন বিহারের বদলে ‘বিরসা’) স্থাপিত হয় ১৯৪৯ সালে, খড়গপুরে প্রথম আই-আই-টিরও আগে। বি-আই-টির প্রথম নির্দেশক ছিলেন ডাঃ দত্তাত্রেয় দেশপাণ্ডে (১৯০৯-১৯৬১)। ১৯৩১ সালে ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টার থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ এম-এস-সি করে যখন ট্রাভাঙ্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডীনের পদে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তাঁকে সিন্দ্রির নবনির্মিত বিআইটিতে নির্দেশক পদে নিযুক্ত করেন। জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে এপ্রিল ১৯৬১-তে তাঁর অকাল-মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। ৬০-এর জুলাইয়ে পেটের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যে তাঁর ছুটি নিয়ে আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী যোজনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী BIT-কে স্বয়ংচালিত বিশ্ববিদ্যালয় করে গড়ে তোলার অঙ্গীকারে ছুটি নিলেন না, জানতেন তাঁর পর এই কাজ সম্পন্ন করার আর কেউ থাকবে না। শেষরক্ষা হল না, মাত্র ৫২ বছর বয়সে তিনি প্রাণ দিলেন এই কলেজের উন্নতির স্বার্থে।
সবশেষে সেই প্রসঙ্গে আসি যাতে এই আলোচনার মূল বক্তব্য আছে। এই দেশের আঙুলে গোনা যায় এমন কিছু ব্যক্তি দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে নিজেদের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে নিরলস সাধনা করে চলেছেন। তাঁদের লক্ষ্য এই দেশে, এই মাটিতে ‘স্বর্গ’ নামিয়ে আনার- এই নিয়ে ট্রিলজির ‘স্বর্গ’ অধ্যায়ের উপন্যাস ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’। মর্ত্য আর পাতালের প্রসঙ্গে যাচ্ছি না, যদিও অপ্রাসঙ্গিক কোনটাই নয়, বরং অন্য দুই উপন্যাস ‘সীমাবদ্ধ’ আর ‘জন অরণ্য’ নিয়ে ছায়াছবি বানিয়েছেন সত্যজিতের মত বিশ্ববরেণ্য পরিচালক। অথচ জীবন থেকে নেওয়া বাস্তব চরিত্র নোয়েল দিগম্বর আর কমলেশ রয়ে যাবে শুধু উপন্যাসের পৃষ্ঠায়- এঁদের চিনবে না কেউ?
কথাটা অতিরঞ্জিত নয়, ডাঃ কে আর চক্রবর্তী, আই-সি-এস বিসি মুখার্জি, ডাঃ সুবোধ মুখার্জি বা প্রফেসার দেশপাণ্ডের নাম নেট বা অন্যত্র খুঁজে দেখুন- একমাত্র জনশ্রুতি আর দুয়েকটা ‘অফিসিয়াল ডক্যুমেন্ট’ ছাড়া কোথাও এঁদের নাম পাবেন না। এঁরা তবু আছেন, তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝে। এঁরা অমর হয়ে আছেন তাঁদের কাজের মধ্যে আর পরিচিতজনের মনের মণিকোঠায়- যেটুকু আমরা দেখেছি, জেনেছি ততটুকুই।
শংকর এঁদের আসল নাম উল্লেখ করেননি কারণ তিনি জানতেন এঁরা নামের জন্যে এই পৃথিবীতে আসেন না। তাঁরা আকাশের বুকে নিজের ওড়ার ইতিহাস লিখে যাননি, উড়েছেন কিনা তাও জানা নেই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডানা দিয়েছেন ওড়ার- এইটুকুই তাঁদের উল্লাস।
