‘রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি’: অনামা শহিদনামা
“সপ্ত সিন্ধু তেরো নদী পার
দ্বীপান্তরের আন্দামান,
রূপের কমল রুপার কাঠির
কঠিন স্পর্শে যেথায় ম্লান,
শতদল যেথা শতধা ভিন্ন
শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়ে,
যন্ত্রী যেখানে সান্ত্রী বসায়ে
বীণার তন্ত্রী কাটিছে হায়…”
(দ্বীপান্তরের বন্দিনী, কাজি নজরুল ইসলাম)
সেখানেই পাঠানো হ
চ্ছিল গোপাল ভাণ্ডারীকে। ১৮৬০ সালের জুন মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজের ওপর গোপন আক্রমণ চালাতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি। তাঁকে বন্দী করে জাহাজে তুলে করাচি থেকে আন্দামান পাঠানোর সময় গোটা যাত্রাপথে এক বিন্দুও তৃষ্ণার জল দেওয়া হয়নি। আন্দামানের উপকূলে যখন জাহাজ পৌঁছায়, তখন গোপাল নামলেন না। নামল তাঁর শব।
দ্বীপান্তরের আরেক বন্দীর নাম শের আলি। ভারতের চতুর্থ ভাইসরয় লর্ড মেয়োকে ছ’জন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে হত্যা করে ছুরি ফেলে দেন সমুদ্রের জলে। আদলতে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি আল্লার আদেশ পালন করেছি মাত্র। ১১ মার্চ ১৮৭২ তিনি শহিদ হন ফাঁসির মঞ্চে। দুঃখের বিষয়, মাউন্ট হ্যারিয়েটের পায়ে পোঁতা ফলকটাই শের আলির বিদ্রোহের একমাত্র স্মারক। আর তাতে লেখা আছে, এই স্থানে কয়েদি শের আলির ছুরিতে লর্ড মায়ো নিহত হন। আজও শের আলির লিখিত পরিচয় কয়েদি। শহিদ নয়।
এমনই শত শহিদের রক্তে রাঙা আমাদের স্বাধীনতা, যাঁদের অনেককেই মনে রাখিনি আমরা। আমরা প্রতিজ্ঞা করি, শহিদদের আমরা ভুলিনি, ভুলবনা। তাই মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব থেকেই নাম না জানা অথবা বিস্মৃতপ্রায় শহিদদের সঙ্গে পরিচয় করাতেই অনামা শহিদনামা বইটি লিখেছেন মুকুল সাহা। কর্মসূত্রে লেখক ঘুরে বেরিয়েছেন সারা ভারতের গ্রাম-শহরে, দ্বীপে, পাহাড়ে, জঙ্গলে। আর সেই সুযোগেই সংগ্রহ করেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে অনেক নতুন নতুন তথ্য। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন যাঁরা, সেই সকল চেনা ও না-চেনা মুক্তিসংগ্রামীর কথা লেখক বর্ণনা করেছেন এই বইতে। শুধু তাই নয়, দেশ ও দেশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আমাদের বহু ভ্রান্ত ধারণাকে দূর করার চেষ্টাও করেছেন লেখক।
লেখক জানিয়েছেন, অত্যাচারের যেমন কোনও জাত বা ধর্ম হয়না, অত্যাচারের বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন করেন তাঁদেরও কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে ভাগ করা যায় না। আজ স্বাধীন ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে যাঁরা দেশের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন, তাঁরা আসলে এদেশের শহিদদের এবং তাঁদের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে অপমান করছেন। একটি স্বাধীন দেশ কখনওই একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের দেশ হতে পারে না। ‘ওরা নাকি লড়েনি?’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক তুলে ধরেছেন ভারতের মুক্তিসংগ্রামে হিন্দু-মুসলমান জনগণের সংগ্রামী ঐক্যের ইতিহাস।
১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহ প্রসঙ্গে লেখক দেখিয়েছেন, দেশীয় শাসকবর্গের হাত থেকে ব্রিটিশ ভারতের শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ায় ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াইটা সেই দেশীয় রাজারাই লড়বেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লড়াইকে যাঁরা গণবিদ্রোহে পরিণত করেছেন সেই সকল সাধারণ মানুষদের কথা আমরা কতটুকু জানি? জমি হারানো কৃষক, ক্ষেত মজুর, প্রান্তিক মানুষ, আদিবাসী জনগণ নিজেদের জীবন জীবিকা বাঁচাতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যথাযথ স্থান পাননি। শহিদ তাঁরাও। আমরা আদিবাসী জনজাতি বিদ্রোহগুলির কথা যখন ইতিহাসের পাতায় পড়ি, তখন আমরা জানতে পারি বড়জোর দুই থেকে চারজনের নাম। অনামা শহিদনামার লেখক আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন মাম্মু খান, মির্জা উইলিয়াৎ হুসেইন খান, নিয়াজ মহম্মদ খান, সৈয়দ মৌলবি আলাউদ্দিন, হাতি সিং, ভীম নায়েক সহ অজস্র বিদ্রোহীর নাম। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন জেলের পিওন, কেউ ঝাড়ুদার, কেউ বা মুচি।
মহাবিদ্রোহে অংশ নেওয়ার অপরাধে যাঁদের দ্বীপান্তর হয়েছিল, তেমন ৩১০ জনের নাম ও পরিচয় পাঠককে মনে করিয়েছেন শহিদনামার লেখক। ওয়াহাবি আন্দোলন, নীল বিদ্রোহের ব্যাপক গণ-অংশগ্রহণের ছবিটাও তুলে ধরেছেন লেখক। মনে করিয়েছেন হেমাঙ্গিনী, প্যারিসুন্দরীদের মতো বিদ্রোহিণী নারীদের কথাও।
মুকুল সাহার বই আমাদের মনে করিয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার শহিদদের কথা। আঠেরো বছরের কিশোর বসন্ত বিশ্বাস রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জকে লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়েন। আদালতে প্রাথমিক বিচারে তাঁর শাস্তি হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য মিথ্যে তথ্য দিয়ে বসন্ত বিশ্বাসের বয়স বাইশ-তেইশ বলে প্রমাণ করে। ১৯ এ মে ১৯১৪, ফাঁসির দড়িতে শহিদ হন বসন্ত। দেশজুড়ে স্লোগান ওঠে- দিল্লি লাহোর অশান্ত, অমর শহিদ বসন্ত।
ঠিক তার পরের বছর, ১৯১৫ এর ঘটনা। গ্রেফতার হন গদর বিপ্লবী ভান সিং। শাস্তি হয় দ্বীপান্তর। সেলুলার জেলের সুপার ভারতীয় নারীদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করলে সাহেবের গালে চড় কষিয়ে দেন ভান সিং। সেই অপরাধে তাঁকে মঞ্চের ওপর ফেলে চাবুক মারতে থাকে জেলের সুপার। ভান সিং স্লোগান দিতে থাকেন বন্দেমাতরম। এক সময় থেমে যায় স্লোগান, অবিরাম চাবুকের আঘাতে প্রাণ দেন ভান সিং। চোখের সামনে সহযোদ্ধাকে এইভাবে চাবুকের আঘাতে শহিদ হতে দেখে চিৎকার করে কেঁদেছিলেন আরেক বিপ্লবী, বাইশ বছর বয়সী কেহর সিং। শুধুমাত্র কান্নার অপরাধেই তাঁকেও হাত পা বেঁধে মারতে থাকে জেলের চার-পাঁচজন ওয়ার্ডেন। অত্যাচারে শহিদ হন কেহরও। কেহরের বাবা-মা পাননি ছেলের মৃত্যুর খবরটুকুও। দীর্ঘ সময় অবধি কেউ জানতে পারেনি কারাবন্দী কেহর সিং কোথায় গেলেন, কী হয়েছিল তাঁর।
লেখক আলোচনা করেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের কলমধারী সৈনিকদের ভূমিকা, বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের কথা, সংগ্রামী নারীদের ও কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের অবদান। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মধ্যে যাঁরা ফাঁসির মঞ্চে শহিদ হয়েছেন, তেমন ৪০ জন বঙ্গসন্তানের তালিকা প্রদান করেছেন লেখক। ১৯০৯ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী থাকা ৫১৯ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম ও প্রাদেশিক পরিচয়ও তালিকাবদ্ধ করেছেন তিনি। লেখক দিয়েছেন ৫৭ জন কমিউনিস্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীর তালিকাও।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সংক্রান্ত আমাদের জানা ইতিহাসের কিছু বিপরীত তথ্য পাঠককে জানাতে চেয়েছেন অনামা শহিদনামার লেখক। তাঁর মতে, গান্ধিজি ভারতের প্রথম সত্যাগ্রহী নন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সত্যাগ্রহ পথের প্রবর্তন আসলে করেছিলেন রাম সিং। তিনি ছিলেন লুধিয়ানার বাসিন্দা। রাম সিং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। পড়েননি টলস্টয় বা রাস্কিনের লেখা। তিনি প্রথমে ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রী। তারপর যোগ দিয়েছিলেন শিখ রাজা নৌনিহাল সিং এর ফৌজে। হাজারা ফৌজের কাছে বালাক দাস নামক এক শিখ গুরুর শিষ্যত্ব নিয়ে গুরুর অন্যান্য শিষ্যদের সংগঠিত করে রাম সিং দাবি তোলেন ব্রিটিশকে ভারত ছাড়তে হবে। ব্রিটিশ আইন, সরকারি চাকরি, বিলেতি দ্রব্য বয়কটের ডাক দেন রাম সিং। এই ইতিহাস ১৮৭০ এর দশকের। অর্থাৎ জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠারও আগের সময়ে। ব্রিটিশ সরকার রাম সিং ও তাঁর সহযোদ্ধা সত্যাগ্রহীদের গ্রেপ্তার করে। রাম সিং এর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়, তাঁর ৪৯ জন সহযোদ্ধাকে কামান দেগে হত্যা করা হয়।
এই বইয়ের আরেকটি অজানা ইতিহাস অসহযোগ আন্দোলনের। চৌরিচৌরা ঘটনার পর গান্ধিজি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে সুযোগ পায় ব্রিটিশ প্রশাসন। অগ্নিসংযোগের অপরাধে গ্রামের ২২৫ জন বাসিন্দাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের ফাঁসি হয় এবং বাকিদের হয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। দুঃখের সঙ্গে শহিদনামার লেখক জানাচ্ছেন, ২২ জন পুলিশের মৃত্যুশোকে আন্দোলন প্রত্যাহত হলেও ১৯ জন শহিদের আত্মত্যাগকে একমাত্র মানবেন্দ্রনাথ রায়ের পত্রিকা ভ্যানগার্ড ছাড়া আর কেউ সেদিন মর্যাদা দেয়নি।
ইতিহাসের পাতায় আমরা জেনেছি, ১৯৩০ এর ২৬ জানুয়ারি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ দাবির প্রস্তাব ঘোষণা করেন জওহরলাল নেহেরু, এবং সেই দাবি পাশ হয়। আলোচ্য বইয়ের লেখক জানালেন, এই অধিবেশনের ৯ বছর আগে আমেদাবাদ কংগ্রেসে পূর্ণ স্বরাজের দাবিটি তুলেছিলেন মৌলানা হাসরাত মোহানি। তাঁর পরিচয় একজন কমিউনিস্ট এবং একজন কবি। অথচ স্বাধীন ভারতে কোনও স্বীকৃতি তিনি পাননি। দেশভাগের তীব্র বিরোধী ছিলেন হাসরাত মোহানি। কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, কমিউনিস্ট দল, কারুর সঙ্গেই একমত হতে পারেননি। স্বাধীন ও বিভক্ত ভারতে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছেন একলা ঘরে।
এমনই অনেক না জানা ইতিহাস জানানো এবং জানা ইতিহাসের বিপরীত কোনও দিক তুলে ধরা- এই দুই বৈশিষ্ট্যই মুকুল সাহার বইটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিগত ডিসেম্বরে এই বইয়ের প্রকাশের দুই বছর পূর্ণ হল। বইটির মর্মস্পর্শী লিখনশৈলী ও বর্ণনা গভীর দাগ কেটে দিয়ে যায় মনে। একাধারে গবেষকের নিষ্ঠা, লেখকের দক্ষতা আর গর্বিত এক ভারতবাসীর গভীর দেশপ্রেমের ফসল এই বই।
