“খারাপ ছেলে” কি ভাল অধিনায়ক ছিলেন?

“খারাপ ছেলে” কি ভাল অধিনায়ক ছিলেন?

সূত্রপাত

একটা কাল্পনিক আন্তর্জাতিক টেস্ট দল বানাচ্ছিলাম, ২০২২-র ৪ঠা মার্চ রাত এগারোটা নাগাদ বসে বসে। সফরকারী দলটা শেষমেষ দাঁড়াল এইরকম – (১) ভিক্টর ট্রাম্পার [৩৮], (২) আর্চি জ্যাকসন [২৪], (৩) কেন ব্যারিংটন [৫১], (৪) ফ্র্যাঙ্ক ওরেল [৪৩], (৫) কোলি স্মিথ [২৬], (৬) অব্রে ফকনার [৪৯], (৭) ম্যালকম মার্শাল [৪১], (৮) শেন ওয়ার্ন [৫৩], (৯) অমর সিং [৩০], (১০) ওয়ালি গ্রাউট [৪১], (১১) হেডলি ভেরিটি [৩৮], (১২) কেন ফার্নস [৩০] – মাঠের চরিত্র অনুযায়ী খেলবেন অব্রে ফকনার (স্পিন-সহায়ক) বা কেন ফার্নস (পেস-সহায়ক) – আর পাঁচজনের রিজার্ভ বেঞ্চে কেন ওয়াডসওয়ার্থ [৩০], জিম বার্ক [৪৯], রামন লাম্বা [৩৮], ওয়াসিম রাজা [৫৪] ও ফিল হিউজ [২৬]; প্রয়োজনে বাঁ-হাতি ব্যাটার রাজা খেলতে পারেন ফকনারের জায়গায়। দলটা মন্দ নয়, কি বলেন?

এই দলের সতেরো জনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ছ’জন, ইংল্যান্ডের তিনজন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের তিনজন, ভারতের দু’জন, আর দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তান থেকে একজন করে। দলে পেস-বোলার ও বাঁ-হাতির সংখ্যা কমই; কিন্তু জনা আটেক অল-রাউন্ডার-ধরণের খেলোয়াড় রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে আছেন তিনজন লেগ-স্পিনার (ফকনার, রাজা, ওয়ার্ন,), দু’জন পেসার (অমর সিং, মার্শাল), দু’জন অফ-স্পিনার (স্মিথ, বার্ক) ও একজন বাঁ-হাতি মিডিয়াম-পেসার / স্পিনার (ওরেল); রয়েছেন দুজন দক্ষ উইকেট-কিপার (গ্রাউট, ওয়াডসওয়ার্থ) যাঁদের ব্যাটিংয়ের হাত চলনসই।

হঠাৎ করে এমন ‘আজব’ দল কেন? উত্তরটা জানতে গেলে গিয়ে প্রথমেই দলগঠনের দিনটা-সময়টা খেয়াল করুন, আর খেয়াল রাখুন যে এই দলের সবাই পরলোকগত। শুধু পরলোকগতই নয়, এঁদের মধ্যে সবাই গত হয়েছেন ‘কম’ বয়সে – ২৪ থেকে ৫৪-র মধ্যে – (আনুমানিক) বয়সগুলো নামের পাশে পাশে দিয়ে দিয়েছি। কি নাম দেব দলের? “অকালপ্রয়াত টেস্ট-ক্রিকেটারবৃন্দ”? সে নিয়ে আপনারা ভাবুন, নির্বাচক হিসেবে আমার মাথাব্যথা অধিনায়কত্ব নিয়ে।
অনেকেই হয়ত বলবেন ওরেল থাকতে চিন্তা কি – উনিই হবেন অধিনায়ক! কিন্তু আছে আছে, চিন্তা আছে – বুঝিয়ে বলি। টেস্ট-দল হলেও এই দল খেলতে চলেছে একবিংশ শতাব্দীর ম্যাচ; একদিনের ক্রিকেটের পাঁচ দশকের বেশির ফলাফল-কেন্দ্রিক আগ্রাসী মনোভাবের প্রভাব, আর টি২০ ক্রিকেটের দেড় দশকের নিত্যনতুন উদ্ভাবনী মানসিকতার ছোঁয়া-লাগা একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের টেস্টম্যাচে কি শুধুমাত্র দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ধাঁচের অধিনায়কত্ব দিয়েই হয়ে যাবে! চাই নতুন যুগের নতুন মানসিকতার দিশারী অধিনায়ক, চাই শেন ওয়ার্ন।

অধিনায়ক ওয়ার্ন?

বোলার ওয়ার্নকে নিয়ে ক্রিকেটের স্বীকৃত সেরা বিশেষজ্ঞ (expert) থেকে আরম্ভ করে সমাজ-মাধ্যমের স্বঘোষিত নিয়মিত প্রভাবক (influencer) এঁরা সবাই অ-নে-ক কিছু লিখে ফেলেছেন বিগত কয়েক সপ্তাহে – তাঁর ‘ball of the century’, শচীনের হাতে ‘ধোলাই’, ভারতের মাটিতে ‘ব্যর্থতা’ এইসব পড়ে আমরা, বিশেষত ভারতীয়রা, বাড়তি পরিতৃপ্ত হয়েছি কারণ প্রথমটা আমাদের ‘উপনিবেশবাদী শাসক’-দের বিরুদ্ধে এক আকস্মিক বৃহৎ আঘাত, দ্বিতীয়টা ঘরের ছেলে ‘ক্রিকেট-বিশ্বের দেবতা’-র সুদীর্ঘকালব্যাপী জয়যাত্রার এক মহান অংশ, আর তৃতীয়টা আমাদের ‘সম্মিলিত ক্রিকেটপ্রজ্ঞা’-র পরিসংখ্যানগত অনুমোদন যে উনি ‘এমন কিছু মহান স্পিনার ছিলেননা’!

আমি এই গিজগিজে ভিড় থেকে একটু সরে যেতে চাই, একঝলক আলো ফেলতে চাই “the best captain Australia never had” এই বিতর্কিত মন্তব্যের ওপর, জানাতে চাই তাঁর অধিনায়কত্বের কিছু জানা-অজানা কাহিনী। কেমন অধিনায়ক ছিলেন তিনি? তাঁর পৃথিবী-বিখ্যাত বোলার-সত্তাকে জোর করে দূরে সরিয়ে রেখে একবার সেই খোঁজটাই নেওয়া যাক।

এই খোঁজ নিতে গিয়ে আমি মূলত তিনটে বইয়ের সাহায্য নিয়েছি – (১) “My Illustrated Career” [2006 edition, Cassell Illustrated], (২) “Spun Out” [2006 edition, Bantam Press], এবং (৩) “No Spin” [2018 edition, Ebury Press] – সবকটাই ওয়ার্ন-কেন্দ্রিক এবং আমার ব্যক্তিগত সংগ্র্রহের অংশ। এছাড়া ইন্টারনেটের কিছু তথ্য, খবর ও ছবির সাহায্য যে নিয়েছি, তা বলাই বাহুল্য।

অধিনায়কত্বের ইতিহাস – স্বদেশে

১৯৯৬ সালের মে মাসে, লাহোরের মাঠে শ্রীলঙ্কার প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের কিছুদিন পরে, ওয়ার্ন যখন ভিক্টোরিয়া রাজ্যদলের অধিনায়ক নিযুক্ত হন তখনই তাঁর ডানহাতের আঙ্গুলের অপারেশন হয়েছে। নভেম্বর মাসে যখন প্রথমবার তিনি দল নিয়ে মাঠে নামেন, প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক অ্যালান বর্ডার লেখেন: “The more I watch Shane Warne, the more I am convinced he will make a wonderful Australian captain. It must surely be long odds-on that he will follow Mark Taylor … I have been impressed with his tactical flair … but more importantly the players love him. When he is present there is a spark that lights up a dressing room.” ঐ সময়েই আরেক প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক, ইয়ান চ্যাপেল, ওয়ার্ন-কে ‘sooner rather than later’ অধিনায়ক করবার সুপারিশ করে যেতেন। প্রাক্তন টেস্ট-খেলোয়াড় রডনি হগ ও ডিন জোন্স এমন ধারণা প্রকাশ করতেন। সেই ধারণাগুলোকে ওয়ার্নও উৎসাহভরে গ্রহণ করতেন। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত একটা বইতে এই ব্যাপারে তাঁর মতামত দেন – তিনি এটাও জানান, “The best captains are those who trust their gut feelings and act on them before the moment slips away.

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের (ACB) কর্তাব্যক্তিরা অন্যরকম ভাবতেন। তৎকালীন নির্বাচকমণ্ডলীর সভাপতি, প্রাক্তন টেস্ট-খেলোয়াড় ট্রেভর হন্স, চাইতেন যে স্টিভ ওয় পরবর্তী অধিনায়ক হন এবং ১৯৯৭ সালেই ওয়-কে তৎকালীন অধিনায়ক মার্ক টেলর-এর সহকারী ব’লে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে একদিবসীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট (ODI) থেকে টেলর অবসর নিলে ওয় অধিনায়ক হন এবং ওয়ার্ন হন তাঁর সহকারী।

অধিনায়কত্বে অভিষেক এবং …

১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে সিডনিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা ODI-তে ওয়ার্ন প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্ব করেন – দল সহজেই জেতে ১৩১ রানে।

১৯৯৮-৯৯ মরশুমে দেশের মাঠে, আহত ওয়-র অনুপস্থিতিতে ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ত্রিদেশীয় ODI প্রতিযোগিতায় ওয়ার্ন ১০টা ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন, তাঁর সহকারী ছিলেন আরেক ওয়, স্টিভের যমজ ভাই, মার্ক। অস্ট্রেলিয়া একটা মাত্র ম্যাচ হারে – ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে, বাকি ন’টাতেই জেতে – এবং ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। সাংবাদিক মাইক হোরান Herald Sun পত্রিকায় লেখেন ওয়ার্ন-এর অধিনায়কত্ব ‘ … exciting, inspirational and successful’; এই প্রতিযোগিতায় একটা ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে ওয়ার্ন দর্শকদেরও কতটা প্রিয় ছিলেন।

মেলবোর্নে একটা ম্যাচে, একদল ইংরেজ সমর্থক (Barmy Army) মাতাল হয়ে মাঠে খেলোয়াড়দের দিকে গল্ফ বল ও বিয়ারের পাত্র ছুঁড়ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া তখন জয়ের পথে এবং Barmy Army-র কিছু সদস্যের সেটা মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না। ইংরেজ অধিনায়ক অ্যালেক স্টিউয়ার্ট ওয়ার্নের সাহায্য চান। ব্যাটার মার্ক ওয়-র হেলমেটটা ধার নিয়ে মাথায় দিয়ে দর্শকাসনের ঐ অংশের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তিনি তাঁদের নিরস্ত করেন। স্টিউয়ার্ট পরে বলেন: “I just thought Warney is a God in Melbourne – bring him out, calm the crowd down and get on with the game.

অপরদিকে, তাঁর অধিনায়কত্বের বিরোধিতা ক’রে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক ম্যালকম কন লেখেন: “Serious concerns linger at the highest levels of Australian cricket about Warne’s emotional maturity to do the job (of captaincy) … He is a terrific team player … However, he can be moody and has a great capacity to spit the dummy, sometimes blaming others, usually the media, for his problems.

শেষে ১৯৯৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, ACB-র এক সভায় ১৪ জন ডিরেক্টর মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্টিভ ওয়-কে অধিনায়ক করতে মনস্থ করেন এবং পরদিন ওয়-কে তা জানানো হয়। ওয়ার্ন থাকেন তাঁর সহকারী হয়ে।

কিন্তু এরপর ২০০০ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডে মহিলাঘটিত এক কেলেঙ্কারির কারণে সেপ্টেম্বর মাসে ACB তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার সহ-অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেয়, যদিও নির্বাচকমন্ডলী (হন্স, বর্ডার, জিওফ মার্শ ও অ্যান্ড্রু হিলডিচ) চেয়েছিলেন তিনি ঐ পদে থাকুন, খুব সম্ভবত কারণটি সম্পূর্ণভাবেই অক্রিকেটীয় বলেই হয়ত। এরপর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক পদের জন্য তাঁকে আর কখনও বিবেচনা করা হয়নি বলেই জানা যায়।  

অতএব দেশের অধিনায়ক হিসেবে শেন ওয়ার্নের ODI রেকর্ড এইরকম: ১১টা ম্যাচে ১০টা জয়, একটা পরাজয়, সাফল্যের হার ৯০.৯১ শতাংশ।

প্রসঙ্গত একটা ঘটনার উল্লেখ করি – ২০০১ সালের মধ্য-মার্চের অবিস্মরণীয় সেই ইডেন টেস্টে ওয়ার্ন কিন্তু ভারতকে ফলো-অন করাবার বিপক্ষে মত দেন বলে জানা যায়। তাঁর কথা অনুযায়ী তিনি চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া আবার ব্যাট করুক যাতে দলের বোলাররা ঐ গরমে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তাজা হয়ে চতুর্থ ইনিংসে আরো চাপে-পড়া বিপক্ষকে শেষ করতে পারেন। কিন্তু তৎকালীন অধিনায়ক ওয় দ্রুত ম্যাচ জেতবার জন্য এতই অধীর ছিলেন যে এই ‘ক্রিকেটীয় কাণ্ডজ্ঞান’ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতকে ফলো-অন করান। তারপরের বাকিটা তো সর্বজনবিদিত ইতিহাস। আগ্রহী পাঠকের জ্ঞাতার্থে ওয়ার্নের আত্মজীবনী থেকে এই সংক্রান্ত কিছু অংশ সঙ্গে দিলাম, যদিও এই ম্যাচে ভারতীয় দলের অসাধারণ পাল্টা-লড়াইকে তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন, বিশেষত লক্ষ্মণ ও দ্রাবিড়ের মহাকাব্যিক জুটির, হরভজনের (ও শচীনের) বোলিংয়ের এবং গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বের।

 

অধিনায়কত্বের ইতিহাস – বিদেশে

২০০০ সালের এপ্রিল মাসে ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির হয়ে খেলা শুরু করেন। তার আগে ইংল্যান্ডে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময়েই তাঁর সঙ্গে ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টির সভাপতি জ্যাক সিমন্স-এর কথাবার্তা অনেকদূর এগোয়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে হ্যাম্পশায়ারের তৎকালীন অধিনায়ক ইংল্যান্ডের প্রাক্তন টেস্ট-ব্যাটার রবিন ‘The Judge’ স্মিথ তাঁকে রাজি করান হ্যাম্পশায়ারের হয়ে খেলতে।

হ্যাম্পশায়ার হয়ে ওঠে তাঁর ক্রিকেট-জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাউদাম্পটনে তিনি একটি বাড়ি কেনেন, রোজ ব্যোল-এর নতুন মাঠের এই কাউন্টি ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর এক সখ্যতা গড়ে ওঠে। ২০০৩ সালে রবিন স্মিথ অবসর নিলে ২০০৪ সালে তিনি এই দলের অধিনায়ক হন – দল সেবার প্রথম ডিভিশন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় স্থান অধিকার করে।

২০০৫ সালে, তাঁর অধিনায়কত্বে, দল প্রথম ডিভিশন কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে (নটিংহ্যামশায়ারের থেকে) মাত্র আড়াই পয়েন্টে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয় স্থান পায়; আর একদিনের প্রতিযোগিতা চেলটেনহ্যাম-অ্যান্ড-গ্লস্টার ট্রফির ফাইনালে লর্ডসে ওয়ারউইকশায়ার-কে ১৮ রানে হারিয়ে বিজয়ী হয় – ১৩ বছর বাদে ক্লাব কোনও ট্রফি জেতে।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও, তিনি হ্যাম্পশায়ার-এর অধিনায়ক থাকেন। সেই বছরে তাঁর অধিনায়কত্বে, দল ফ্রেন্ডস প্রভিডেন্ট ট্রফির ফাইনালে লর্ডসে ১২৫ রানে ডারহাম-এর কাছে হেরে যায়। পরবর্তী ২০০৮ মরসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে তিনি অবসর নেন।

এই প্রসঙ্গে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর মনোভাবের কিছু অংশ তাঁরই জবানিতে তুলে দিই: “Cricket produces reams of statistics, but the two columns that matter to me are the W and L columns. As a captain I’ll always try to create a winning situation, even if a declaration opens the possibility of defeat. That’s how you improve. You win some and but lose some, but I will back my players to come through more often than not … It is good for youngsters to play under the pressure of tyring to win at all times. That constant winning mentality can only improve players.

অল্পক্ষণের জন্য একবার সামান্য একটু পিছিয়ে যাই – ওপরের অংশটার সঙ্গে একটু মিলিয়ে দেখি এই লেখার প্রথমদিকে আমার অধিনায়ক নির্বাচনের যুক্তি: “চাই নতুন যুগের নতুন মানসিকতার দিশারী অধিনায়ক, চাই শেন ওয়ার্ন।“ – আশা করি বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চেয়েছিলাম।

অধিনায়কত্বের ইতিহাস – এদেশে

২০০৭ সালে, প্রথমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ও পরে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে, অবসর নেওয়ার পর, শারীরিক ধকলে ক্লান্ত ও মানসিক দিক থেকে (ক্রিকেটীয়) অনুপ্রেরণাহীন ওয়ার্ন-কে একদিন ফোন করেন তৎকালীন বিখ্যাত ক্রিকেট-ধারাভাষ্যকার টনি গ্রেগ – বলেন যে ভারতে শুরু হতে চলেছে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (ICL), ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত এক টি২০ প্রতিযোগিতা যেখানে মহাতারকা খেলোয়াড় হিসেবে ওয়ার্ন-কে প্রয়োজন, এবং প্রতিযোগিতাটি তৎকালীন টেন স্পোর্টস (পরবর্তীকালে সোনি-র মালিকানাধীন) টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত হবে। ওয়ার্ন তাঁর অনিচ্ছার কথা জানান কিন্তু নাছোড়বান্দা গ্রেগ হাল ছাড়বার পাত্র নন।

কয়েক সপ্তাহ পরে, ওয়ার্নের ভাল বন্ধু, নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক, স্টিফেন ফ্লেমিং, তাঁকে জানান যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) ললিত মোদি-র কথামতো ভারতে আরেকটা টি২০ প্রতিযোগিতার কথা চলছে, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL), যা পরিচালিত হবে BCCI-র মাধ্যমে, এবং প্রতিযোগিতাটি স্টার টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা, আর ললিত ভীষণভাবে চান যে ওয়ার্ন সেখানে খেলেন। এবারও ওয়ার্ন তাঁর অনিচ্ছার কথা জানান কিন্তু ফ্লেমিং-ও হাল ছাড়বার পাত্র নন, এমনকি তিনি ওয়ার্ন-কে ICL খেলতে রাজি হতেও বারণ করেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই ওয়ার্নকে যোগাযোগ করেন তাঁর স্কুলের সহপাঠী ও মেলবোর্নের সেন্ট কিল্ডা ক্লাবের সহ-খেলোয়াড় রবি কৃষ্ণান, এবং জানান যে তিনি (রবি) সহ-সভাপতি হিসেবে জয়পুরের IPL দল রাজস্থান রয়্যালস-এ (RR) যোগ দিয়েছেন। রবি তাঁকে IPL প্রতিযোগিতাটার ধরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত বলেন, আর জানান যে RR-এর প্রধান মালিক মনোজ বাদালে-র কাছে রবি সুপারিশ করেছেন ওয়ার্ন-এর নাম RR-এর অধিনায়ক-এবং-প্রশিক্ষক হিসেবে।

এরপরের ‘লম্বি কহানি’-টা বাদ দিয়ে বলি যে শেষ পর্যন্ত বাদালে-র এই প্রতিশ্রুতিতে ওয়ার্ন RR-এ যোগ দেন যে, “We will make you captain/coach with the final say in all cricketing matters, including, of course, selection. You will run the cricketing aspect of the business and we will ensure that you won’t be distracted by anything outside of that. Everything cricket, you’re in charge.” – অর্থমূল্য জানা যায় সাড়ে-চার লক্ষ (মার্কিন) ডলার। বাদালে এইভাবে ওয়ার্নকে চ্যালেঞ্জও জানান, “… it gives you the chance to show you were the best captain that Australia never had. That’s an opportunity you shouldn’t miss.” ব্যস, তাঁর ক্রিকেট-জীবনের একদম শেষপ্রান্তে এসে ভারতের মাটিতে ঊনচল্লিশ-ছুঁইছুঁই ওয়ার্ন আবার নতুন চ্যালেঞ্জ নিলেন।

২০০৮ সালে বাকি সাতটা দলকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের IPL প্রতিযোগিতা জিতল মূলত অল্পখ্যাত সামান্য-ইংরেজি-জানা ভারতীয় উপমহাদেশের যুবকদের নিয়ে গড়া তারকাবিহীন রাজস্থান রয়্যালস দল। আর এই সাফল্যের মূল স্থপতি ছিলেন সেই “খারাপ ছেলে” ‘বুড়ো ঘোড়া’ শেন ওয়ার্ন – সঙ্গে ছিলেন মহম্মদ কাইফ, স্বপ্নিল আসনোদকর, রবীন্দ্র জাদেজা, মুনাফ প্যাটেল, ইউসুফ পাঠান, সিদ্ধার্থ ত্রিবেদী, তরুবর কোহলি; (পাকিস্তানের) কামরান আকমল ও সোহেল তনভির; তাঁদের চমৎকার সঙ্গ দিয়েছিলেন আরেক শেন, তরুণ অস্ট্রেলিয়ান অল-রাউন্ডার শেন ওয়াটসন। অভিজ্ঞ বিদেশীদের মধ্যে ড্যারেন লেহম্যান, মর্নি মর্কেল, গ্রেম স্মিথ ও ইউনিস খান দলে থাকলেও, মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন ঐ তরুণ-ব্রিগেড। এই বিস্ময়কর ফল দেখে সারা ক্রিকেট-দুনিয়া আশ্চর্য হয়ে যায়। জানিনা ACB-র বিংশ শতাব্দীর শেষদিককার ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিককার ছয়-সাত-আট বছর সময়কার কর্তাব্যক্তিরা কি ভাবছিলেন! চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ওয়ার্ন ভালমতই দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন! ২০০৯ সালের IPL-এও ওয়ার্ন RR-কে নেতৃত্ব দেন, তবে সেবার দল পায় ষষ্ঠ স্থান।

 

 

এই দুই IPL-এ ওয়ার্নের অধিনায়কত্ব নিয়ে Cricbuzz ওয়েব-সাইটে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যা লেখা হয়েছিল, তার থেকে কিছু অংশ তুলে ধরি: “His captaincy has been wonderfully spontaneous, aggressive and articulate. His ability to assess situations and think ahead of the game has put him in a league apart. The fact that he has tasted tremendous success with a bunch of virtual unknown Indian cricketers speaks volumes of his ability to bring out the best in his men.That Munaf Patel and Yusuf Pathan have been able to play at a higher level under him than at any time previous while playing for India is a testament to Warne. Ravindra Jadeja, too, has blossomed. In fact, any one and every one under Warne has been able to express himself.

IPL-এর ২০০৮ সালের প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় শেন ওয়াটসন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ”The incredible skill that Shane Warne had was seeing what people’s roles were and then tapping into that role. For me, that was why he was an incredible leader, because he knew how to tap into a player’s best version.

 

এই প্রসঙ্গে জানাই যে সেবারে প্রথম ম্যাচেই দিল্লি ডেয়ারডেভিলস-এর (DD) কাছে দল হারে ন’উইকেটে, পাঁচ ওভার বাকি থাকতেই। ম্যাচ শেষে, সাংবাদিক সম্মেলন শেষ করে ফিরে এসে ওয়ার্ন দেখেন ওয়াটসন এক কোণে বসে কাঁদছেন। এর পরবর্তী সামান্য কিছু অংশ ওয়ার্নের কথাতেই বলি: “’I am so much better than this,’ he (Watson) said. ‘Well, bloody well show me then!’ I fired back. With the exception of that brief exchange, the general silence in the room was deafening. I said, ‘Boys, are we okay? Listen, we lost a game of cricket, it’s not the end of the world. We are better than we were today, much better, and we’ll prove it. The (team) bus leaves in 20 minutes, be on it.’ And that was that. Played one, lost one.” আর প্রতিযোগিতায় বাকি ১৫টা ম্যাচে (সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল সমেত) ১৩টা জিতে তাঁর দল প্রমাণ করে দেয়, “(they) are better than (that), much better,” – ওয়ার্ন তাঁর দলের ওপর ভরসা করতেন এবং সেটা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি, teamwork-এর গোড়ার কথা তাঁর আত্মস্থ ছিল।

পরবর্তী ম্যাচে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব-এর (KXIP) বিরুদ্ধে খেলার ৪৮ ঘন্টা আগে, দলের ভারতীয় খেলোয়াড়দের প্রত্যেকের সঙ্গে তিনি আলাদা করে কথা বলেন, এক এক জনের ভূমিকা ও দায়িত্ব আবার বুঝিয়ে দেন, তাঁদের প্রস্তুতি কেমনভাবে হয়েছে মনে করিয়ে দেন এবং নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পরের দিনটা তিনি কথা বলেন দলের আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের সঙ্গে, সেখানে তাঁর বার্তা ছিল সহজ: “Lift, guys, lift!” আর নিজের বোলিংয়ের সঠিক ছন্দ ফিরে পেতে, তাঁর ভাষায়, “I bowled my own arse off in the nets,”” – যেন মনে করিয়ে দেয় Mike Brearley-র “The Art of Captaincy”-র কোনও কোনও অংশ।

সেই বছর, প্রতিটি ম্যাচেই দল জিতলে, দলের ভারতীয় খেলোয়াড়দের কাছে দেওয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি –  “Yep, every time we win there’s a party, guys.’ – অনুযায়ী, দলের প্রধান মালিক মনোজ বাদালে আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা করতেন। দলের সকলের সঙ্গে ওয়ার্ন নিজেও সমানতালে উৎসবে মেতে উঠতেন – ম্যানেজমেন্টের team building / bonding তাঁকে বই পড়ে বা ক্লাস করে শিখতে হয়নি, বোঝাই যাচ্ছে।

আবার সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন কঠোর। নিয়মিত দেরি করবার জন্য ‘boy wonder’ ও (ওয়ার্ন-উবাচ) ‘rockstar’ রবীন্দ্র জাদেজা ছিলেন মার্কামারা। প্রথমবার তাঁকে ছাড় দেওয়ার পর দ্বিতীয়বার কি হয়েছিল ওয়ার্নের মুখেই শোনা যাক: “the bus left at 9 am for training and he (Jadeja) wasn’t on it, so he had to make his own way to the ground and, of course, was late again. On the way back after training, I stopped the bus half-way to the hotel and said, ‘Guys, we had someone late again this morning. Ravi, mate, get off here and walk home.’ One of his mates made a fuss, so I told him to get off too and they could walk back to the hotel together. No one was late after that.” – জাদেজার সেই ‘অবাঞ্ছিত পদযাত্রা’-র সঙ্গী নাকি ছিলেন ইউসুফ পাঠান।

দুয়েকটি কথা উল্লেখ না করলে ওয়ার্নের অধিনায়কত্বের কৌশলগত উৎকর্ষের জায়গাটা সঠিকভাবে ফুটে উঠবেনা। তাঁরই ভাষায়: “One of the things I thought we needed in such a short cricket match was a series of set plays we could turn to under pressure: things like the first and sixth ball of overs, when the bowlers would go full and wide, short and wide, straight bouncer, or slower bouncer, leg-stump yorker, or wide yorker. These options depended on the batsmen and the pitches, of course, and I would always ask the bowler for his preference. So if the answer was short and straight, I’d say short, or whatever, to the guys and the fielders would revert to the positioning we’d planned before the game. … Obviously, the success of this depended on execution by the bowler and reaction from the batsmen. The point was that with so little time we had to focus everyone’s brain quickly and this discipline really helped.” – মনে রাখবেন সালটা ছিল ২০০৮, টি২০ ক্রিকেটের প্রায় শৈশব, আর এটা ছিল ওয়ার্নের প্রথম টি২০ প্রতিযোগিতা। আশা করি এই লেখার প্রথমদিকে আমার অধিনায়ক নির্বাচনের যুক্তি: “চাই নতুন যুগের নতুন মানসিকতার দিশারী অধিনায়ক, চাই শেন ওয়ার্ন।“ – খানিকটা হলেও হয়ত বোঝাতে পেরেছি।

“লোকে বলে বলে রে … কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার”

এবার শেষ করতে চাই গোটা-দুয়েক উদ্ধৃতির উল্লেখ করে। উদ্ধৃতিগুলো অনুবাদ করতে গিয়ে কথার ধার ও ভার যাতে কমে না যায়, তাই সচেতনভাবেই সে চেষ্টায় গেলাম না।

  • ওয়ার্নের স্কুলের (Mentone Grammar School) ১৯৮৭ সালের সালতামামিতে লেখা আছে: “Shane Warne’s captaincy was to be one of the major reasons for our successful season. He believed there was only one way to play the game and that was to attack. He led by example and was able to get the best out of the team. He was justly rewarded with the captaincy of First XI.”
  • তাঁর আত্মজীবনীতে ওয়ার্ন লিখেছেন: “I have given my heart and soul to Australian cricket and like to think I’ve earned the respect of the ACB. I have helped to put a few backsides on seats and made spin bowling more interesting. … I have played in an aggressive, animated, emotional way which reflects the pride I take in representing my country. That should have counted for something, I would have thought.
জন্ম কোলকাতায় এবং বেশির ভাগ (কু)কর্মও সেখানেই। স্কুল-শিক্ষা প্রধানতঃ দেশপ্রিয় পার্ক / প্রিয়া সিনেমা চত্বরে। কলেজ-জীবনে ঘোর ‘যদুবংশীয়’ – ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে স্নাতক, কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে স্নাতকোত্তর। তিন দশক তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসূত্রে দেশে-বিদেশে প্রচুর ঝাঁকিদর্শন করে, তারপর সপ্তবর্ষব্যাপী ইঞ্জিনীারিং কলেজে অধ্যাপনা অন্তে ২০১৯ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ। ‘ক্রিকেট-প্রেমিক’ (বিশেষতঃ টেস্ট ও একদিবসীয় ক্ষেত্রে), কারণ খুব সম্ভবতঃ শৈশবে ইডেনে জীবনের প্রথম পদার্পণেই সোবার্সের শতরান দর্শন। ‘নন-ফিকশন’ বইয়ের প্রতিই বেশি আকর্ষণ। সবচেয়ে প্রিয় তিন বাংলা কথাসাহিত্যিক হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবরাম চক্রবর্তী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *