গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

সূর্য সেনগুপ্ত

[লেখক পরিচিতি: জন্ম কলকাতায়। মূলতঃ নাট্যকার। প্রবন্ধ ও কবিতাও লেখেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবিতকালে কবিতা 'কৃত্তিবাস' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম প্রকাশিত পুস্তক A Rendenvouz with History – ভারতে প্রথম বিদেশী ব্যাঙ্কের ১৮৬০ থেকে ১৯৯৩ সাল অবধি দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস। দ্বিতীয় প্রকাশিত পুস্তক তাঁর নিজের তিনটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নাটকের সংকলন। বর্তমানে পুণেবাসী। নাট্যদল ‘অগ্নিমিত্র’ চালনা করেন। ‘পুণে বঙ্গদর্পণ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ]

যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।
— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।
–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না

গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮)

[১]

ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। শুঁড়িখানায় কিয়ৎকাল অতিবাহিত করে পূর্ণমত্ত অবস্থায় বাগবাজারে গৃহ অভিমুখে পা বাড়াতেন। অধিকাংশ দিন ভাড়ার গাড়ি পেতেন না। রাস্তায় গড়াগড়ি খেতেন। উপকারী পথচারী হয়তো তুলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতেন। একবার রাস্তায় আর এক মাতাল তাঁকে বললে, ‘এই শালা মাতাল…।’ ভদ্রলোক টলতে টলতে উঠে গিয়ে সেই ব্যাটার কলার ধরে বললেন, ‘মদ খেলে তুইও মাতাল, আমিও মাতাল… মদ না খেলে আমি গিরিশ ঘোষ, তুই শালা কে রে?’

এই স্পষ্ট আত্মসম্ভ্রম ছিল গিরিশের চরিত্রের অন্যতম অলঙ্কার। যে সময় গিরিশ মাতালের কলার ধরে বলেছিলেন ‘আমি গিরিশ ঘোষ,’ সেই সময় তাঁর সেই কথা বলার অধিকার ছিল, কারণ তিনি তখন বাংলা নাট্যজগতকে একা স্কন্ধে বহন করে নিয়ে চলছিলেন। নাট্যকার হিসেবে, প্রযোজক হিসেবে, পরিচালক হিসেবে। উৎপল দত্ত বলেছেন, “আঙ্গিক ও রূপরীতির প্রশ্নও শেষমেষ শ্রেণীগত প্রশ্ন, এই কথা স্মরণ রেখে তবে নাট্যশালায় গিরিশের বিস্ময়কর পরীক্ষানিরীক্ষার বিচারে আমাদের প্রবৃত্ত হতে হবে। এবং সামান্য আলোচনাতেই এ-কথা প্রতিভাত হবে যে, গিরিশ বঙ্গনাট্যশালার শ্রেষ্ঠ প্রয়োগাচার্য।” যিনি এই কথা বলেছিলেন তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর শুধু বাংলার নয়, সারা ভারতের স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ নাট্যপরিচালক।

উপরন্তু তৎকালীন খ্যাতনামা নট ও নাট্যনির্দেশক অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রসূত পুস্তক রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর-এ লিখেছেন, “গিরিশচন্দ্র এদেশের নাট্যশালার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন মানে – তিনি অন্নদ্বারা ইহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছিলেন; বরাবর স্বাস্থ্যকর আহার দিয়া ইহাকে পরিপুষ্ট করিয়াছিলেন; ইহার মজ্জায় মজ্জায় রস সঞ্চার করিয়া ইহাকে আনন্দপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছিলেন; আর এই জন্যই গিরিশচন্দ্র father of the native stage – ইহার খুড়ো, জ্যাঠা, আর কেহ কোনদিন ছিল না।” রূপকালঙ্কারের সাহায্যে এ এক অতীব বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ। তথাপি আমি বলব যে ‘জ্যাঠা আর কোনদিন ছিল না’ বক্তব্যটি প্রতিবাদযোগ্য।

বাংলার নাট্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ১৭৯৫ সালে ঘেরাসিম লেবেদেফ-এর উদ্যমে যে প্রথম বাংলা নাটক দুটি হয়েছিল উভয়েই অনুবাদ নাটক। উহার পর মধুসূদনের আগমনের প্রাক্কালে প্রচুর অনুবাদ নাটক কলকাতায় মঞ্চস্থ হয়েছে। সেক্সপীয়ার ও সংস্কৃত নাটকের বঙ্গানুবাদ অথবা বঙ্গীয়করণ করেছেন একাধিক নাট্যকার যাঁর মধ্যে মূলত ছিলেন হরচন্দ্র ঘোষ ও প্রাতঃস্মরণীয় কালীপ্রসন্ন সিংহ।

গিরিশ (জন্ম ১৮৪৪) যখন এক অষ্টমবর্ষীয় বালক, তখন বাংলা পেশাদার মঞ্চে সত্যিকারের মৌলিক নাটকের আবির্ভাব হল। একই বছরে (১৮৫২) দুই অদ্যাবধি অখ্যাত নাট্যকার তারাচরণ শিকদার ও যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত প্রণীত নাটক যথাক্রমে কীর্তিবিলাস ও ভদ্রার্জুন মঞ্চস্থ হল। অজিত কুমার ঘোষ মশাই তাঁর পাথব্রেকিং পুস্তক, বাংলা নাটকের ইতিহাস-এ লিখেছেন, “ইহারাই (কীর্তিবিলাস ও ভদ্রার্জুন) হইল বাংলা নাটকের আত্মপ্রতিষ্ঠার গৌরবান্বিত পথিকৃত। দুর্বল হউক, দরিদ্র হউক, ইহারা যে অনুবাদের পরবশ্যতা কাটাইয়া উঠিতে পারিয়াছিল তাহাই ইহাদের অসীম শক্তি ও অমেয় সম্পদ।”

এদের মধ্যে একটি নাটকের কিঞ্চিৎ নমুনা দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত রচিত ‘ভদ্রার্জুন’ নাটকটি মহাভারতের (সুভদ্রা ও অর্জুন) কাহিনি নিয়ে রচিত। তাতে যেসব বিবরণ আছে সাধারণ পয়ার ছন্দে রচিত। পাঠ করলেই বোঝা যাবে মহাভারতের কোন অংশ থেকে এটি গৃহীত।

জননী আজ্ঞায় বিয়া করি পঞ্চজন।
কিছুদিন পরে করে হস্তিনা গমন।।
ইন্দ্রপ্রস্থে রাজপুরী নিৰ্ম্মাণ করিয়া।
আনন্দে করেন রাজ কৃষ্ণকে লইয়া।।
ভীমসেন অর্জুন নকুল সহদেব।
চারি ভাই অনুগত সখা বাসুদেব।

এরই দু’বছর পর বঙ্গমঞ্চ পেল রামনারায়ণ তর্করত্নকে (নাটুকে রামনারায়ণ) তাঁর ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নিয়ে। মৌলিক নাটক এবং সামাজিক নাটক যেখানে বাস্তব সমাজচিত্র অত্যন্ত দক্ষতার (একটু যেন অশ্লীল) সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।

[ ২ ]

কবি হিসেবে মাইকেলের খ্যাতি যখন মধ্যগগনে তখন তিনি রামনারায়ণের নাটক দেখলেন, দেখে বিরক্ত হলেন এবং বিরক্ত মাইকেল নাটক লিখবেন ঠিক করলেন। রামনারায়ণের নাটকের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা তথা অভক্তি কলকাতার নাট্যমহলে প্রবল অস্বস্তি সৃষ্ট করল, যদিও মাইকেল রামনারায়ণের নাটক বা নাট্যকারের সম্বন্ধে কোনও অবমাননাকর মন্তব্য করেননি। মাইকেল তাঁর এই অভিপ্রায়ের কথা জানিয়েছিলেন তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু গৌরদাস বসাককে। খ্রিষ্টানধর্মাবলম্বী, পাশ্চাত্যকাব্যবিলাসী, বঙ্গভাষায় অনভিজ্ঞ মাইকেল উপহাসিত হতে লাগলেন, এতদ্ব্যাতিত আরও নানা ঘটনা ঘটেছিল যা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। স্বল্পকালের মধ্যে মাইকেল ‘শর্মিষ্ঠা’ লিখলেন। তাঁর এই প্রথম নাটকই তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে পরিগণিত হয়। নাটকের ভূমিকায় মাইকেল লিখলেন –

অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।

উপরোক্ত অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় উল্লেখিত গিরিশের জ্যাঠামশাই যদি কেউ থেকে থাকেন, তাহলে তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তাঁর স্থান হল সর্বপ্রথম। শর্মিষ্ঠা যখন লিখিত ও মঞ্চস্থ হল তখন গিরিশ পনের বছরের কিশোর এবং তখনো নাটক থেকে অনেক দূরে। তিনি তখন জোড়াসাঁকোর ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে লেখাপড়া করছেন। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি, রবীন্দ্রনাথও এই স্কুলে কিছুদিন পাঠগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু, এই পঞ্চদশ বর্ষীয় কিশোর একদিন ‘শর্মিষ্ঠা’ পরিচালনা করবেন এটাই নাট্যদেবতার মনোবাসনা ছিল।

গিরিশের জ্যাঠামশায়ের খোঁজে পুনর্বার ফিরে তাকাই বাংলার নাট্য-ইতিহাসের দিকে এবং দেখতে পাই এক শামলা আঁটা হ্যান্ডসাম উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীকে, যিনি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ। ইনি হলেন দীনবন্ধু মিত্র, যিনি কিছু ল্যান্ডমার্ক বাংলা নাটক লিখে গেছেন। বঙ্কিম তাঁর বন্ধু সম্বন্ধে লিখেছেন, “লোকের সঙ্গে মিশিবার তাঁর অসাধারণ শক্তি ছিল, তিনি আহ্লাদপূর্বক সকল শ্রেণী সঙ্গে মিশিতেন।”

তাই নীলকর-নিপীড়িত অসহায় দুঃস্থ রায়ত, পরমুখাপেক্ষী দয়াপ্রার্থী ঘরজামাই, মূর্খ হাস্যাস্পদ ডেপুটি, রঙ্গরসরতা পরিচারিকা, গুলিখোর বকাটে যুবক, বিপথগামী ইয়ংবেঙ্গল – এই সকল শ্রেণীর মানুষের চরিত্র অঙ্কন করতে তাঁর কোন স্বল্পতা ছিল না। দীনবন্ধু বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর নাটক ‘নীলদর্পণ,’ যাহাতে বর্ণিত নীলকর সাহেবদিগের অত্যাচারের কথা একদা ব্রিটিশ পার্লিয়ামেন্টে নিন্দিত হয়েছিল চার্লস ডিকেন্স সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু আমাদের এই আলোচনার জন্য তাঁর ‘সধবার একাদশী’ নাটকটি বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক।

নীলদর্পণ সংক্রান্ত হট্টগোল স্তিমিত হলে দীনবন্ধু ‘সধবার একাদশী’ লিখলেন। আমার মতে ‘সধবার একাদশী’ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রহসন। এই তালিকার পরেই খুব কাছাকাছি আছে মাইকেলের ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ।’ ১৮৬৬ সালে ‘সধবার একাদশী’ প্রকাশকালে গিরিশের বাইশ বছর বয়স। তার বহু পূর্বে, বাল্যকালেই গিরিশ পিতৃমাতৃহীন হন। নিজের চেষ্টায় এন্ট্রান্স অবধি পড়া চালিয়ে শেষমেষ সেই বাগবাজারনিবাসী অনাথ যুবক, এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফেল মেরে অ্যাটকিনসন-টিলকন কোম্পানিতে বুক-কিপারের কাজ নিল। সে কাজে তার খ্যাতি হল খুব। গিরিশ যা করতেন উৎকৃষ্টতার সঙ্গে করতেন, কোয়ালিটি কনশাস আরকী। কিন্তু মহাকবি গিরিশচন্দ্র বুক-কিপারি করতে জম্মাননি। প্রথমে হাফ-আখড়াইয়ের দলে বাঁধনদার, তারপর মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের জন্য গীতিকার হয়ে এবং দীনবন্ধুর ‘সধবার একাদশী’তে নিমচাঁদের ভূমিকায় অভিনয় করে থিয়েটার পাড়াতে নাম করে ফেললেন। সধবার একাদশী পুস্তকের ভূমিকায় ভূমিকাকার লিখেছেন, “অভিনেতারা যেমন দীনবন্ধুকে পেয়ে লাভবান হয়েছিলেন, তেমনি আবার অন্যদিক থেকে বলা যায় দীনবন্ধুর নাটকগুলিও কয়েকজন অসাধারণ কুশলী অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত হয়েছিল বলে এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গিরিশ ও অর্ধেন্দুর মত অভিনেতার অভিনয় তখনকার দর্শকদের মধ্যে যে শুধু বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল তা নয়, সেই অভিনয় একটি ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল যার ধারা আধুনিক কাল পর্যন্ত চলে এসেছে। বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের প্রায় সকল সেরা অভিনেতা দীনবন্ধুর নাটকের কোন না কোন ভূমিকায় অবতরণ করেছেন এবং তাঁদের অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে তাঁর চরিত্রগুলি জনমানসে চির-উজ্জ্বল হয়ে আছে।”

নীলদর্পণ নাটকে গিরিশের অভিনয়ের কথা বলতে গিয়ে অপরেশবাবু লিখেছেন, “গিরিশচন্দ্রের উডসাহেবের ভূমিকাভিনয়ে চরিত্রোপোযোগী হাবভাব, আদব-কায়দা এবং প্রবেশ-প্রস্থানে – এরূপ একটি জীবন্ত ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছিল যে, কাহারও কাহারও সন্দেহ হইয়াছিল বুঝিবা ম্যাকনামারা সাহেবের চেষ্টায় কোন বাঙলা জানা সাহেব আজিকার অভিনয়ে যোগদান করিয়াছে।”

‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের জন্য গান লিখবার সময় টিন-এজার গিরিশের সঙ্গে তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্ক ব্যারিস্টার মাইকেলের সাক্ষাতকার ঘটেছিল কিনা, সে ইতিহাস আমার জানা নেই।

ক্রমশ বিভিন্ন ধারায় গিরিশের প্রতিভা পরিস্ফুট ও প্রবাহিত হতে লাগল। ‘সধবার একাদশী’তে পাড়ার ছেলে গিরিশকে সরাসরি নিমচাঁদের ভূমিকায় নামিয়ে দিলেন বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের পরিচালক (নাম পাইনি)। সন্দেহ নেই যে গিরিশ ইতিপূর্বেই তাঁর কাছে অভিনেতা হিসেবে নিজের ক্রেডেনশিয়ালস প্রমাণ করেছিলেন। বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের ‘সধবার একাদশী’ প্রযোজনায় বাংলার নাটকের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি ঘটনা ঘটেছিল। বাগবাজারের নাটক-পাগল আর এক যুবক, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফির সাথে গিরিশের মিলন হল।

পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বাড়িতে অর্ধেন্দুর নাটক জীবনের শুরু। তখনও অর্ধেন্দু হেয়ার স্কুলের ছাত্র (জন্ম ১৮৫০ – গিরিশের চেয়ে ৬ বছরের কনিষ্ঠ)। তাঁর অভিনীত প্রথম নাটক ছিল পাথুরিয়াঘাটার সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর বিরচিত ‘কিছু কিছু বুঝি।’ এটা ছিল একটি ক্যারিকেচারধর্মী নাটক, যাদের নিয়ে ক্যারিকেচার, তাদের মধ্যে অনেকেই দর্শকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা, এমন কি অর্ধেন্দুর পরিবারের লোকজনও এতে ক্ষুব্ধ হন। তাতেও অর্ধেন্দুশেখরকে নাটক থেকে বিচ্যুত করা গেল না। তিনি পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ি পরিত্যাগ করে নিজের পাড়ার বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারে এসে যোগ দিলেন এবং গিরিশের সঙ্গে একত্র হলেন। দুজনের এই বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতা তাঁদের জীবনের শেষদিন অবধি চলেছিল।

যদিও অর্ধেন্দুশেখর গিরিশের চেয়ে ছ’বছরের ছোট ছিল, তথাপি তিনি গিরিশের মৃত্যুর চার বছর পূর্বেই গত হন। বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের ‘সধবার একাদশী’ প্রযোজনায় বাংলার নাট্যশালায় দুই সূর্যের উদয় হল – একদিকে গিরিশ নিমচাঁদ, অন্যদিকে অর্ধেন্দুশেখর একাধারে চারটি ভূমিকায় অভিনয় করলেন – একজন নীলচাষি, জমিদার গোলকবাবু, মহিলা চরিত্র গোলকবাবু পত্নী, এবং মিঃ উড। অতএব নিঃসন্দেহে দীনবন্ধু মিত্রকে গিরিশের দ্বিতীয় জ্যাঠামশাই আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

পরে গিরিশ সাফল্যের সঙ্গে মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ এবং ‘মেঘনাদবধ’ মঞ্চস্থ করেছিলেন। মেঘনাদবধে বিনোদিনী প্রমীলা করতেন (এবং আরও ক’টি ছোট ভূমিকায়)। গিরিশ অসাধারণ দক্ষতায় ও পরিশ্রমের দ্বারা বিনোদিনী ও অন্যান্য অশিক্ষিতা অভিনেত্রীদের অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং তৎসম কঠিন শব্দের উচ্চারণ শিক্ষা দিতেন তার উল্লেখ বিনোদিনীর আমার কথা পুস্তকে লিখছিলেন। কিন্তু একথা মানতেই হবে যে দীনবন্ধু মিত্রর নিমচাঁদ গিরিশকে অভিনেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তৎকালে নানা সমালোচক ইঙ্গিত দেন যে নিমচাঁদ মধুসূদনের চরিত্র অবলম্বনে রচিত। এই প্রশ্ন দীনবন্ধুর কাছে উত্থাপিত হলে তিনি সহাস্য বলেছিলেন, “মধু কখনো নিম হতে পারে?” ১৮৭৭ সনে, তেত্রিশ বছর বয়সে গিরিশ তাঁর প্রথম নাট্যরচনায় হাত দেন, নাম ‘আগমনী।’ গ্রেট ন্যাশনালে সেটি মঞ্চস্থ হল। কিন্তু জমল না। তখন তিনি সেই স্টেজের ম্যানেজার…, কিন্তু সে পরের কথা। দীনবন্ধু মিত্রর পর এবং নাট্যকার গিরিশের আগে বাংলা সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য নাট্যকার হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর – মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র ও রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ।

বাংলার সব দুঁদে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক নাট্যকারদের মাঝে জোড়াসাঁকোর সুপারলেটিভ সূক্ষ্ম প্রতিভার অধিকারী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথমে গ্রিক এবং ফরাসি নাটক অবলম্বনে বাংলা নাটক লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর প্রথম নাটক ‘পুরুবিক্রম।’ বাংলা নাটকের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব অমৃতলাল বসু লিখেছেন, “গ্রেট ন্যাশেনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার পর আমরা একে একে দীনবন্ধু ও মাইকেল মধুসূদনের নাটক, প্রহসনগুলি অভিনয় করিয়াছিলাম। তাহার পর অভিনয়যোগ্য উৎকৃষ্ট নাটক আর খুঁজিয়া পাই নাই – বাঙ্গালা নাট্যসাহিত্যের তখন এমনই দুর্দশা। এই সময় পুরুবিক্রমের ন্যায় উৎকৃষ্ট নাটক প্রকাশিত হইতে দেখিয়া আমরা আনন্দে উৎফুল্ল হইলাম।” কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সর্বাপেক্ষা সফল নাটক হল ‘সরোজিনী।’ নাটকটি রানি পদ্মিনী ও আলাউদ্দিনের লিজেন্ডের ভিত্তিতে রচিত এবং এটির মূল অবলম্বন ছিল গ্রীক নাট্যকার Euripides এর ট্র্যাজেডি Iphigenia in Aulis। নটী বিনোদিনী সরোজিনীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তিনি লিখেছেন, “সরোজিনী নাটকখানির অভিনয় ভারি জমত। অভিনয় করতে করতে আমরা একেবারে আত্মহারা হয়ে যেতাম।”

[ ৩ ]

অষ্টাদশ শতাব্দীর একদম শেষভাগ (১৭৯৫) থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তর দশক (১৮৭৭) – বাংলা নাটমঞ্চ যে সময়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বড় হয়ে উঠছে সেটাই ছিল গিরিশচন্দ্র ঘোষের উত্তরাধিকার। অজিত কুমার ঘোষ লিখেছেন, “গিরিশচন্দ্র যে সময়ে নাট্যরচয়িতার আসনে অধিষ্ঠিত হইলেন, তখন বাংলা নাট্যসাহিত্যের শৈশব ও কৈশোর অতিক্রম করিয়া যৌবনের সূচনা দেখা দিয়াছে।”

আমি উপরে গিরিশের পূর্বতন যে তিনজন নাট্যকারের কথা উল্লেখ করলাম, এটা বলা যায় যে তাঁরা সরাসরি গিরিশের নাট্যকাহিনি নির্ণয়, নাটকীয়তার প্রসার এবং তাঁর নাট্যধারা অনুসরণকে প্রভাবিত করেছিলেন। গিরিশ নাট্যগবেষক কুমুদবন্ধু সেনকে তাঁর নাট্যরচনার সূচনার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে তিনি নাটক রচনা আরম্ভ করেছিলেন দায় পড়ে, out of sheer necessity। যখন মাইকেল, বঙ্কিম ড্রামাটাইজ করা শেষ হল, স্টেজে আর কোন অভিনয়োপযোগী নাটক মিললো না, তখন বাধ্য হয়ে গিরিশ নাট্যরচনায় হাত দিয়েছিলেন।

সিপাহি বিদ্রোহ কেটে গেছে বেশ কিছুদিন হয়েছে। রানির হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে কোম্পানি। কলকাতার ইন্টেলেকচুয়াল মহলের একাংশ সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে সন্দেহগ্রস্ত ছিল। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাই সিপাহি বিদ্রোহকে সমর্থন করেননি। কিন্তু কলকাতার সাহিত্য, নাটমঞ্চ, নানা সঙ্কেতের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার কথা বলেছে। বঙ্কিম ১৮৮২, ’৮৪, ও ’৮৭ সালে যথাক্রমে ‘আনন্দমঠ,’ ‘দেবীচৌধুরানী,’ ও ‘সীতারাম’ লিখলেন, জাতীয়তাবাদকে ধর্মের মোড়কে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলেন। গিরিশ মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ করেছিলেন তাঁর নাট্যনির্দেশনার গোড়ার দিকে। তারপর তিনি ‘মেঘনাদবধ’কে নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চস্থ করলেন। রাবণ প্রথম অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে বলছেন,

রিপুদলবলে দলিয়া সমরে
জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?

রাম-রাবণের যুদ্ধ যে রাবণের জন্মভূমি রক্ষার্থে সংগ্রাম, এই দৃষ্টিকোণ দিয়ে মাইকেল ‘মেঘনাদবধ’ রচনা করেছিলেন এবং স্বভাবতই এটির নাট্যরূপ দেবার সময় পরাধীন ভারতের কথা হয়তো জেগেছিল গিরিশের মনে। তাই ‘মেঘনাদবধ’ হয়ে উঠেছিল আগ্রাসনের কাহিনি, প্রতিরোধের কাহিনি। এর পরবর্তীকালে বেশ কিছু নাট্যকার পৌরাণিক কাহিনিকে ভারতের পরাধীনতার কথা ইঙ্গিতে প্রকট করেছিলেন। মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ নাটকটি (১৯৩০) কারাগারের অন্তরালে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম অবলম্বনে রচিত হয়েছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এটিকে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। গিরিশ সরাসরি মাইকেলকে অনুসরণ করে ‘মেঘনাদবধ’ নাটক রচনা করেছিলেন।

গিরিশের নাটকে যদি আগ্রাসন আর প্রতিরোধের কথা ওঠে, তবে তাঁর পৌরাণিক নাটক ‘জনা’র কথা উঠবেই। অজিত কুমার ঘোষের মতে ‘জনা’ গিরিশের শ্রেষ্ঠ পৌরাণিক নাটক। ‘জনা’র কাহিনি মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্ব থেকে গৃহীত, কিন্তু কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকৃত মহাভারতে এই কাহিনি নেই। ‘জৈমিনি-ভারত’এ ‘জনা’র কাহিনী পাওয়া যায়। এটা মনে করা হয় যে কাশীরাম দাস ‘জৈমিনি-ভারত’ থেকে ‘জনা’র কাহিনি আহরণ করে তাঁর রচিত মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন। গিরিশ তাঁর ‘জনা’কে পেয়েছেন কাশীরাম দাসের মহাভারত থেকে। কিন্তু সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। জনাকে তিনি একদিকে পুত্রশোকাতুরা জ্বালাময়ী রূপে তৈরী করেছেন, অন্যদিকে জনা অর্জুনের নেতৃত্বে আক্রমণকারী পাণ্ডব সৈন্যের বিরুদ্ধে তেজস্বী নেত্রীর ভূমিকায় নেমেছেন।

পুত্রের মৃত্যুর পর জনা বলছেন –

শুন শুন প্রতিজ্ঞা আমার-
মহেশ্বর, চক্রধর, দণ্ডধর কিমবা,
বজ্রহাতে ঐরাবতে দেব পুরন্দর,
সবে মিলি হয় যদি অর্জুন সহায়,
পুত্রহন্তা অরাতিরে রক্ষিতে নারিবে।
স্বর্গ, মর্ত্য, রসাতলে রোষানল মম
প্রবেশিবে দহিতে অর্জুনে।

জনার স্বামী, মহারাজ নীলধ্বজ যখন অর্জুনের সেনানীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এবং কৃষ্ণের আগমন হেতু নগরে উৎসব আয়োজনের নির্দেশ দিলেন, তখন জনা যা বললেন তা যেন পরাধীন ভারতের অধিকাংশ জনতার নির্বিকারত্বে বর্ণনা –

উন্মত্তের প্রায়
শিকল পরিয়া পায়ে বিষম উল্লাস।
ধন্য ধন্য মহারাজ
দাসত্বে আনন্দ তব বহু।

‘জনা’ রচিত ও মঞ্চস্থ হয় ১৮৯৪ সালে। এরই ঠিক ১১ বছর পর বঙ্গভঙ্গ নিয়ে সারা বঙ্গভূমি উত্তাল হয়ে ওঠে এবং তার ৩ বছর পর ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির ঘটনা দিয়ে বাংলায় অগ্নিযুগের সূচনা হয়।

গিরিশ ৮৬টি নাট্য রচনা করেন। তার মধ্যে ছিল পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, এবং সামাজিক নাটক। সাধারণ বাঙালির মত কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারত তাঁর মানসিক সংস্কৃতি গঠন করেছিল। পিতৃ-মাতৃহীন গিরিশের খুড়িমা শিশুকালে তাঁকে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত পড়ে শোনাতেন। সেই ভাষা, সেই পয়ার ছন্দের সুর গিরিশের অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে থেকে গিয়েছিল।

কুমুদবন্ধু সেন মশাইয়ের সাথে এক দীর্ঘ কথোপকথনে গিরিশ বলেন, “…কাশীরাম দাস, কৃত্তিবাস আমার ভাষার বনিয়াদ, আমার লেখায় তাঁদের প্রভাব দেখতে পাবে।” কৃত্তিবাসের রামায়ণ অবলম্বনে গিরিশ একাধারে ‘রাবণ বধ,’ ‘সীতার বনবাস,’ ‘লক্ষ্মণ বর্জন,’ ‘সীতার বিবাহ,’ ‘রামের বনবাস,’ ও ‘সীতাহরণ’ – এই ছয়টি নাটক লিখেছিলেন। আশ্চর্য এই যে ১৮৮১ সালে ‘রাবণ বধ’ ও ১৮৮২ সালে ‘সীতাহরণ’ লিখে তিনি মাত্র এক বছরের সীমার মধ্যে মোট ছ’টি নাটক লিখেছিলেন।

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন গিরিশের সচিব। তাঁর মূলকর্ম ছিল গিরিশ মুখে-মুখে নাটক বলে যাবেন ও দেবেনবাবু তা খেরো খাতায় লিখে যাবেন। গিরিশের মনের মাঝে অতি দ্রুত দৃশ্যের পর দৃশ্য নির্মিত হতে থাকত এবং গিরিশ উচ্চৈস্বরে তা আবৃত্তি করে চলতেন, যেন তিনি প্রত্যেকটি ভূমিকা আলাদা করে অভিনয় করে চলেছেন। সেই সঙ্গে তিনি কক্ষের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি পদচারণা করতেন – আবৃত্তি বা পদচারণা কোনটাই থামতো না।

দেবেনবাবু কালি ও ঝর্ণা কলমে লিখতেন না, কারণ কালি ফুরিয়ে গেলে কলমে কালি ভরবার সময় পেতেন না। তিনি তিন-চারটে পেন্সিল কেটে পাশে রেখে দিতেন। মাঝে মাঝে তিনি গিরিশচন্দ্র কি বলেছেন তা বুঝতে পারতেন না। গিরিশচন্দ্র ক্রুদ্ধ হতেন এবং বলতেন রিপিট করলে তাঁর মুড খারাপ হয়ে যাবে। সেই শব্দটি বা বাক্যটির পুনরাবৃত্তি করতেন না। সেই স্থান বিন্দু দিয়ে ভরাট করে রাখতেন দেবেনবাবু। পরে সেই ‘বিন্দুস্থান’ পূর্ণ করে দিতেন গিরিশচন্দ্র।

গিরিশের প্রলিফিক প্রতিভার চূড়ান্ত নমুনার কথা লিখেছিলেন ভগিনী দেবমাতা তাঁর পুস্তক Days in an Indian Monasteryতে – “তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ছয়টি অঙ্ক বিশিষ্ট ‘বিল্বমঙ্গল’ তিনি কোন রকম বিরতি ব্যতিরেকে ২৮ ঘন্টার মধ্যে লিখে সম্পূর্ণ করছিলেন।” এছাড়া শোনা যায় যে ‘সীতার বনবাস’ তিনি এক রাত্রে লিখেছিলেন। ‘সধবার একাদশী’র ২৬টি গানও তিনি একরাত্রে শেষ করেছিলেন।

[ ৪ ]

গিরিশচন্দ্রের ঐতিহাসিক নাট্যরচনার মানসিকতাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটকের বীররস ও স্বদেশপ্রেমের দৃপ্ত সমন্বয় প্রভাবিত করেছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘সরোজিনী’ ও গিরিশের ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ – এই দুটি নাটক আবারও আগ্রাসনের আর প্রতিরোধের কাহিনি। ইতিহাসকে অতিক্রম করে দুই নাট্যকারই কিছু লিবার্টি নিয়েছিলেন, কিন্তু অন্তে দুটি অসাধারণ নাটক উপহৃত হয়েছিল। ১৯০৬ সালে গিরিশ সিরাজদ্দৌল্লা লিখেছিলেন। তখন বাংলা রঙ্গমঞ্চে ঐতিহাসিক নাটকের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। নাট্যকার হিসাবে দ্বিজেন্দ্রলালের আবির্ভাব হয়েছে। ১৯০৩ সালে থেকে ১৯০৬ তিনি ‘তারাবাই,’ ‘রাণা প্রতাপসিংহ, ও ‘দুর্গাদাস,’ নাটক লিখে ফেলেছেন। ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদও বেশ কিছু ঐতিহাসিক নাটক লিখেছিলেন। যার মধ্যে ‘প্রতাপাদিত্য,’ ‘আলমগির,’ ও ‘বাংলার মসনদ’ উল্লেখযোগ্য। গিরিশচন্দ্র প্রণীত ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ ছিল এই সব কটির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য এবং জনপ্রিয়। গিরিশের ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ শুধুমাত্র একটি ইতিহাস-ভিত্তিক রাজনৈতিক নাটক নয়। নাটকটিতে একটি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী ছিল। সিরাজ তাঁর প্রজাবর্গকে বলছেন,

ওহে হিন্দু মুসলমান -
এস করি পরস্পর মার্জনা এখন …
আমি মুসলমান, করি বাক্যদান
ভুলে যাব যাহা আছে মনে। …
কিন্তু সাবধান
নাহি দিও ফিরিঙ্গিরে সূচ-অগ্র স্থান…।
দাক্ষিণাত্যে বুঝহ ব্যভার
ছলে বলে বিস্তার করিছে অধিকার।…
বংগের সন্তান – হিন্দু মুসলমান,
বাংলার সাধহ কল্যাণ,
তোমা সবাকার যাহে বংশধরগণে
নাহি হয় ফিরিঙ্গি-নফর।

হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত স্মৃতিচারণ করে লিখছেন: “তিনি দেশাত্মবোধ রসে জারিত একাধারে ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ ও ‘মীরকাশিম’ লেখেন ও মিনার্ভাতে মঞ্চস্থ করেন। ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ ও ‘মীরকাশিম’ সেই প্রথম জাতীয়তার যুগে দেশের যুব সম্প্রদায়ের উপর যে অপূর্ব প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল তাহা ভাষায় শেষ করা যায় না। মীরকাশিম নাটকে সুশীলাবালা অবতীর্ণ হতেন বেগমের ভূমিকায়। অভিনয় করার সময় তকী খাঁ’র হাতে তরবারি তুলে দিয়ে গান ধরতেন, “বীর করে তরবারি ধরে” – তখন দর্শকরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে প্রেক্ষাগৃহে অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করতেন।”

তাঁর সামাজিক নাটকেও রাজনৈতিক ঐক্যের সাথে ধর্মীয় ঐক্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। “আমার মতে ভারতে রিলিজাস ইউনিটি ভিন্ন আর কোন ইউনিটি হতে পারে না।” (‘মায়াবসান’ নাটকে (১:৫) কালীকিঙ্করের সংলাপ, ১৮৯৮) 

[ ৫ ]

বাংলার নাটমঞ্চের ইতিহাসের মাঝখান থেকে ধরি – গিরিশ কুমুদবন্ধুবাবুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে (উপরে উল্লেখিত) বলেন, “মহাকবি সেক্ষপীরই আমার আদর্শ। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছি।” এদিকে বারবার মালিকানা বদলের পর বিশৃঙ্খল অবস্থার পরিণতি হিসাবে ৬ বিডন স্ট্রিটে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। স্বত্বাধিকারী মহেন্দ্রলাল দাসের কাছ থেকে খালি পড়ে থাকা সেই জমি লিজ নিয়ে একটি রঙ্গমঞ্চ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন পাথুরিয়াঘাটার প্রসন্নকুমার ঠাকুরের দৌহিত্র নাগেন্দ্রভূষণ মুখোপাধ্যায়। গিরিশচন্দ্রের সঙ্গে তখন স্টার থিয়েটারের সম্পর্ক তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে – নাগেন্দ্রভূষণ তাঁকে এই নতুন থিয়েটারের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান।

থিয়েটারের নাম হল ‘মিনার্ভা থিয়েটার’ – থিয়েটারের উদ্বোধন হল ১৮৯২ সালে। তারপর আজ থেকে ঠিক ১২৩ বছর আগে ১৮৯৩ সালের ২৮শে জানুয়ারি এই মিনার্ভা থিয়েটারের কলকাতার মাটিতে বাংলা ভাষায় প্রথম শেক্সপীয়ার অভিনীত হল – গিরিশ ঘোষ অনূদিত ম্যাকবেথ।’ নামভূমিকায় ও পরিচালনায় স্বয়ং তিনি। পরিচ্ছদ ও মঞ্চসজ্জা করেন সুদক্ষ ইংরাজ চিত্রকরগণ।

তারপর একে একে স্টার, এমারেল্ড, মিনার্ভা, ক্লাসিক, কোহিনুর – কলকাতার এমন কোন স্টেজ নেই যেখানে তাঁর পায়ের ছাপ পড়েনি। কিন্তু বারবার তিনি মিনার্ভাতে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর নিজের হাতে তৈরী মিনার্ভা। গিরিশ একদিকে যেমন বাংলার মহান সাহিত্যকে নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চে উপস্থাপিত করেছিলেন, যেমন বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী,’ ‘বিষবৃক্ষ,’ ও ‘দুর্গেশনন্দিনী,’ মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ও নবীন সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ,’ অন্যদিকে মৌলিক ঐতিহাসিক নাটক লিখে নাট্যমোদীদের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন।

১৮৭২ সনে বাংলার সাধারণ থিয়েটারের জন্ম হয়েছিল। নাট্যমোদী বাঙালি মধ্যবিত্ত কাছে বাংলা নাটকের দরজা খুলে গিয়েছিল গিরিশচন্দ্রের উপস্থিতি, তাঁর লিখিত নাটক নিয়ে, অত্যাধুনিক পরিচালনা দক্ষতা নিয়ে, মঞ্চসজ্জার বৈচিত্র্য নিয়ে, সেই নব আন্দোলনকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। একজন সামান্য নাট্যকর্মী হিসাবে তাঁর সেই মহৎ নেতৃত্বকে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের সাথে স্মরণ করি।

লেখকের অন্য লেখা:

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +