১৩ই জুলাই, লর্ডস এবং ইতিহাস

১৩ই জুলাই, লর্ডস এবং ইতিহাস

 

দুইদিন আগে পর্যন্তও লর্ডসের মাঠ এবং ১৩ই জুলাই- এই দুটো জিনিস বললেই আপামর ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমী সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতি রোমন্থন করতেন। মহম্মদ কাইফের সেই ওভারথ্রো এর দ্বিতীয় রান, ভারতের ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয় এবং ভারত অধিনায়কের জার্সি খুলে উল্লাস- এই নিয়েই ভারতীয় ক্রিকেটে ছিল এক বর্ণময় অধ্যায়।

কিন্তু এই বছর ইতিহাসের পাতায় আরো একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। স্নেহ রানার অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বলটাকে শরীর থেকে একটু দূরে ঠেলতে গিয়ে টার্নটা বুঝতে পারেননি সোফি এক্লেস্টোন। বলটা ভেতরের দিকে টার্ন করে এসে নড়িয়ে দেয় তাঁর উইকেট। এক্লেস্টোন, ইসাবেল ওঙ্গ, লরেন বেল এবং লরেন ফাইলার- ইংল্যান্ডের এই শেষ চারজন ব্যাটার দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছিলেন টেস্টের শেষদিন। ১৩৫/৭ হয়ে যাওয়ার পর ৪৫৭ রানের পাহাড়প্রমাণ টার্গেটের পিছু না করে তাঁদের লক্ষ্য ছিল কোনোক্রমে দিনটা পার করে দেওয়া। কিন্তু দীপ্তি শর্মা এবং স্নেহ রানা সেই অসাধ্য সাধনে বাঁধা দেন।

পিচ যে স্পিনারদের জন্য সহায়ক তার জানান প্রথম দিন থেকেই পাওয়া গিয়েছিল। ইংল্যান্ডের টেস্ট অভিষেককারী ম্যাডি ভিলিয়ার্স যে বলে ভারত অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌরের উইকেট নিলেন তাতেই বোঝা গিয়েছিল। তবুও ভারতীয় ব্যাটারদের কৃতিত্ব এখানেই যে তাঁরা স্কোরবোর্ড স্লো হতে দেননি। স্মৃতি মান্ধানা এবং জেমাইমা রডরিগেজ শুরু থেকেই আক্রমণ করে রানের গতি বাড়িয়ে দেন এবং দুজনেই সেট হয়েও আউট হলে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যান হারমানপ্রীত। ম্যাডির টার্নের কাছে ভারত অধিনায়ক দিশাহারা হয়ে পড়লে ইংল্যান্ডের স্পিনারদের যথেচ্ছভাবে সুইপ মারেন দীপ্তি শর্মা। ভারত প্রথম ইনিংসে ২৮৫ রান তোলে মূলত তিন অর্ধশতরানকারী ব্যাটারের জন্যই।

লর্ডসের পরিস্থিতি চেনা হওয়ায় অভিজ্ঞ ট্যামি বিউমন্ট, হিদার নাইট, মায়া বুশিয়ার, নাতালি সাইভার-ব্রান্টের কাছে রানটা সম্মানজনক হলেও কঠিন ছিল না। কিন্তু ক্রান্তি গৌড় সিমের ব্যবহার দিয়ে তাঁদের রান করা কঠিন করেন। নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা ট্যামির উইকেটই হোক বা মায়া বুশিয়ারকে যাস্তিকা ভাটিয়ার হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করা- দুটোই নিপ ব্যাকারে। ক্রান্তি এরপরে অ্যালিস ক্যাপসির উইকেটও পান নিখুঁতভাবে স্ট্যাম্প লাইন আক্রমণ করে। ন্যাট সাইভার-ব্রান্ট এবং অ্যামি জোন্স যখন প্রতিআক্রমণ করছেন তখন ন্যাটকে ট্র্যাপ করেন ক্রান্তিই। ইংল্যান্ড ১৭০ রানে নিজেদের সবকটি উইকেট খোয়ানোর পর ক্রান্তি বল হাতে যখন দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ফিরছেন, তখন করতালিতে ফেটে পরে ‘দ্য হোম অফ ক্রিকেট’। মধ্যপ্রদেশের এই পেসার ইতিহাসের পাতায় নাম তুলেছেন, লর্ডসে আয়োজিত মহিলাদের প্রথম টেস্টে কোনো ইনিংসে প্রথম পাঁচ উইকেট নেওয়া বোলার তিনি!

তবে এখানেই শেষ নয়। লর্ডসের আইকনিক অনার্স বোর্ড অপেক্ষা করছিল একজন ব্যাটারের আগমনের। স্মৃতি মান্ধানা প্রথম ইনিংসে আশা জাগিয়েও অনার্স বোর্ডে জায়গা করতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসেও তার অন্যথা হয়নি, তিনি থেমে গিয়েছেন ৩০ রান দূরে। কিন্তু তাঁর সতীর্থ যাস্তিকা ভাটিয়া কোনো ভুল করেননি। প্রথম ইনিংসে লরেন বেলের একটা সিম আউট বল মিস করে বোল্ড হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি করেই ফেললেন শতরানটা।

যাস্তিকা যখন ক্রিজে আসেন তখন স্মৃতি-শেফালীর ওপেনিং জুটি মঞ্চ প্রস্তুত করে দিয়েছে। তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল দুই ইংরেজ স্পিনার সোফি এক্লেস্টোন এবং ম্যাডি ভিলিয়ার্সকে সামলানো। যাস্তিকা তাঁদের বিরুদ্ধে নিজের সাবলীল স্ট্রোক খেললেন কিন্তু খুব সুন্দর পায়ের ব্যবহার করে। তিনি সামনে এগিয়ে এলেন এবং থ্রু দ্য লাইন শটে পেলেন বাউন্ডারি। তাঁর ইনিংসের ১৪টি বাউন্ডারির ছয়টি একই ভঙ্গিমায়। এরপরে ইসাবেল ওঙ্গকে কভার অঞ্চলে ঠেলে তিনি যখন ব্যাট তুলছেন, তখন ভারতীয় দল, সমর্থক, প্রতিপক্ষ- সকলের কাছ থেকে সম্মিলিত অভিবাদন পেয়েছেন বরোদার এই ব্যাটার। তিনি ১১৩ রানে আউট হওয়ার পরে ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৪৫৭!

যাস্তিকা ভাটিয়া
ক্রান্তি গৌড়

রান তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের প্রথম তিন ব্যাটারকে ফিরিয়ে দেন সায়ালি সাতঘারে এবং ক্রান্তি গৌড়। এরপর স্নেহ রানার ঘূর্ণির সামনে অসহায় হয়ে পড়েন ইংল্যান্ড ব্যাটাররা। ইংল্যান্ডের হয়ে দুই ইনিংসেই উজ্জ্বল ছিলেন উইকেটরক্ষক অ্যামি জোন্স, দ্বিতীয় ইনিংসে তাকে ফেরান স্নেহ। এছাড়াও তাঁর অন্য তিন শিকার ছিলেন ন্যাট সাইভার-ব্রান্ট, ম্যাডি ভিলিয়ার্স এবং সোফি।

সদ্য শেষ হওয়া টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ে ভরাডুবির পর ভারতীয় দলের জন্য আদর্শ হতো একটা জয় নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসা। লর্ডসে ২৮শে জুন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার ঠিক ১৫ দিন পর সেই হোম অফ ক্রিকেটেই ইতিহাস গড়ে ফেরা দলের জন্য ইতিবাচক। ৫ই জুলাই-য়ের লর্ডসে হারমানপ্রীতের হাতে ট্রফি থাকলে ভারতের এই সফরের একেবারে ‘ফেয়ারিটেল এন্ডিং’ হতো।

কিন্তু জীবনের নিয়মই এই। সব উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিণতি আশানুরূপ হয়না। হারমান-স্মৃতি-যাস্তিকা-রিচা-স্নেহ-ক্রান্তিরা ইংল্যান্ডের দুর্গে গিয়ে একটা ২৭০ রানের টেস্ট জয় উপহার দিয়েছেন। যথেষ্ট গর্বের বিষয় তো এটাই।

স্নাতকোত্তরের পাঠ নেওয়ার সময় টেক্সট কমেন্ট্রির মাধ্যমে ক্রিকেটের সঙ্গে পেশাদারভাবে যুক্ত হওয়ার শুরু, যা আজ চার বছরের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ক্রিকেটকে বিশ্লেষণ, মনস্তত্ত্ব, ডেটা এবং পরিসংখ্যানের মিশেলে দেখার ইচ্ছে।একজন ক্রিকেটারের শক্তি ও দুর্বলতা অনুধাবন করে তার পরিকল্পনা বোঝা এবং সেই প্রেক্ষাপটকে লেখায় তুলে ধরাই মূল আগ্রহ। ভবিষ্যতে ক্রিকেট কনটেন্ট ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরও গভীর ও প্রভাবশালী কাজ করার লক্ষ্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *