ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমান বিপ্লবীদের অবদান

আমি তখন ছোটো। ক্লাস সিক্স টিকসে পড়ি। বাবার চাকরির সুবাদে জন্ম থেকে বাইরে বাইরে ঘুরে কলকাতায় এসে একটা স্থায়ী স্কুলে ভর্তি হয়েছি। এতদিন ছাড়া গরুর মতো চরে বেড়িয়ে পড়াশোনায় একেবারেই মনোযোগ নেই। মনে আছে সেই সময়ে বাবা হঠাৎ হঠাৎ ঘোষণা করতেন, “xxx-দা বা xxx-দি কলকাতায় এসেছেন, দেখা করতে যাব। যাবি?” বাবার সেই অচেনা দাদা বা দিদির সঙ্গে আলাপ করার তেমন উৎসাহ না থাকলেও বিকেলে পড়া থেকে ছুটি পাবার আশায় তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যেতাম। তারপর গিয়ে দেখতাম ছোটোখাটো এক বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা কোনো ভাঙাচোরা বাড়ির একটা ঘরে তক্তপোশের ওপর বসে আছেন। একেবারে সাধারণ দেখতে। বাবাকে দেখে ‘আয়, আয়,’ করে আপ্যায়ন করতেন। অমন বুড়োবুড়ি আমাদের মধ্যবিত্ত পাড়ায় হরদম ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। ফলে খুব একটা ইম্প্রেসড হতাম না। বাবা বলতেন, “প্রণাম কর, আমাদের কল্পনাদি;” বা “প্রণাম কর, গণেশদা।” তারপর ওঁদের কথোপকথন চলত চট্টগ্রামের ভাষায়। আমার কাজ ছিল চুপ করে বসে থেকে হাতে করে আনা গল্পের বই পড়া।


সেই সময়ে কল্পনা দত্ত (যোশি), গণেশ ঘোষ, বা অন্যান্যদের মহিমা সঠিক বুঝিনি। তবে জানতাম এঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী, মাস্টারদার দলের লোক। বাবাও সেই দলে ছিলেন বলে জেলে খেটেছেন বহু বছর। তবে বাবার ভূমিকা ছিল পদাতিক সৈনিকের আর এঁরা ছিলেন সামনের সারির নেতৃবৃন্দ। পরে, বয়স হয়ে জ্ঞান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছি অবহেলায় কী পরশপাথর হারিয়েছি! ক্ষোভ হয়েছে কেন তখন আরেকটু খেয়াল করে এঁদের সঙ্গে কথা বলিনি, চেহারাগুলো কেন ভালো করে মনে গেঁথে রাখিনি!
এতদিন পরে নিজের অজ্ঞানতার শোক আবার জেগে উঠল একটি বই পড়ে। এবার কলকাতায় হাতে এল বিপ্লবী গণেশ ঘোষের লেখা মুক্তিতীর্থ আন্দামান।[i] বাবার গনেশদা। ১৯৩২ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি পেয়ে কালাপানির ওপারে আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। সেখানকার কুখ্যাত সেলুলার জেলে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। ইংরেজ শাসকের অমানবিক অত্যাচারের ঘাঁটি এই জেল সম্বন্ধে পরে গবেষণা করে, নথিপত্র জোগাড় করে, প্রামাণ্য বইটি লিখে গেছেন। কী অমূল্য সম্পদ যে এই বই তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ইংরেজ রাজত্বে বিপ্লবীদের আন্দামানে নির্বাসন দেওয়া হত জানা থাকলেও এই বইয়ে প্রকাশিত বেশির ভাগ তথ্যই আমার অজানা ছিল। পড়তে গিয়ে বারবার বিস্মিত হয়েছি। সেই সব চমকপ্রদ তথ্যের মধ্যে থেকে একটি বিষয় নিয়েই আমি আলোচনা করব।
আজকাল দেখি ভারতের একাংশ মানুষ সতীর্থ মুসলমান নাগরিকদের পদে পদে হেয় করে। মুসলমান ধর্মের একজন দুষ্কৃতিকারী কোনো কুকর্ম করলে তার দোষ বর্তায় গোটা গোষ্ঠীর ওপর। প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে পাড়া-প্রতিবেশীরাও তাদের কাছে বারবার দেশের প্রতি আনুগত্য, বিশ্বস্ততার প্রমাণ চায়। আর সেই সন্দেহের অবসান কিছুতেই হয় না। এমনও শুনি মুসলমান সম্প্রদায় নাকি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এতটুকুও অংশগ্রহণ করেনি; দেশের স্বাধীনতায় তাদের কোনো অবদান নেই। অর্থাৎ দেশকে তারা কখনোই ভালোবাসেনি। এ বড়ো ভীষণ অভিযোগ।
অথচ ডিকশনারি অফ মার্টার্স থেকে জানতে পারি,
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমান সম্প্রদায়ের অবদান গভীর। একেবারে প্রথমদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে আরম্ভ করে ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন অবধি তাঁরা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের ভূমিকা ছিল নেতা, সৈনিক, লেখক, এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবে। অনুমান করা হয় সেই সময়ে ৩০ শতাংশ বিপ্লবী শহীদ মুসলমান ছিলেন।[ii] (অনুবাদঃ লেখক)

স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন অগুনতি ইসলাম ধর্মাবলম্বী – তাঁদের অনেকের নাম ও কীর্তির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তাও কেন জানি না প্রচলিত হয়েছে এই বদনাম – স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণে মুসলমান সম্প্রদায় নিরাসক্ত ছিল। একটু গবেষণা করলে অবশ্যই ভ্রমটা ভেঙে যাবে।
কয়েকজন বিখ্যাত নেতার সঙ্গে পাঠকদের পুনঃপরিচয় করিয়ে দিই।
- মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট।
- ‘সীমান্তের গান্ধী’ নামে বিখ্যাত হন খান আবদুল গফর খান। অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি চল্লিশ বছর কারাবন্দি ছিলেন।
- সংগ্রামের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন শহীদ আশফাকুল্লা খান। কাকোরি ট্রেন মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
- ১৮৫৭ সালে লখনৌয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন অওধের বিপ্লবী রানি বেগম হজরত মহল। সামরিক পরাজয়ের পরেও নতিস্বীকার করতে অসম্মত হয়ে তিনি নেপাল থেকে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন।
- ব্রিটিশ দখলের প্রতিরোধ করে ১৭৯৯ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন মাইসোরের ব্যাঘ্র, টিপু সুলতান।
- ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের (১৭৬৩-১৭৮৬) অন্যতম নেতা ছিলেন সুফি সন্ত মজনু শাহ। আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ অমর করে রেখেছেন । কিন্তু সেই সঙ্গে উপেক্ষা করেছেন আরেকটি উত্থান – ফকির বিদ্রোহ। আমি যতদূর জানি, দুটি একই সঙ্গে মিলিতভাবে ঘটেছিল।
- ১৮৫৭ সালের বৃটিশ বিরোধী বিদ্রোহ সম্বন্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করার অপরাধে নির্ভীক সাংবাদিক মৌলোভি মহম্মদ বকিরকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়।
- ১৮৫৭ সালের সশস্ত্র উত্থানে নেতৃত্ব দেন ভক্ত খান আর মৌলভি আহমাদুল্লা শাহ। এই আন্দোলনের প্রতীকী নেতা ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফর।
- সেই সময়ে মৌলানা মাহমুদ হাসান আর উবাইদুল্লাহ সিন্ধি গড়ে তোলেন ‘রেশমি রুমাল তেহরিক’ নামে ব্রিটিশ বিরোধী একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংস্থা। আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে সচেষ্ট হয়েছিল এই সংস্থা।
- স্বাধীনতা সংগ্রামী ও উকিল আসফ আলি বিপ্লবী ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্তর হয়ে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে তিনি বহু বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে নেতাজির INA বাহিনীর সপক্ষে আইনজীবীদের সংগঠিত করেন তিনিই (convener)।
- ১৯১৯ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী ডঃ সাইফুদ্দিন কিচলুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জালিওয়ানওয়ালা বাগে জনসমাবেশ হয়েছিল। তারপর সেখানে কী ঘটেছিল তা নিশ্চয়ই কাউকে মনে করিয়ে দিতে হবে না।
- ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনির প্রবক্তা ছিলেন হসরত মোহানি। ১৯২১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে তিনিই প্রথম ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দাবি করেন।

নেতাজীর সঙ্গে INA-র নেতৃবৃন্দ - নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজে প্রথম সারির নেতা ছিলেন শাহ নোয়াজ খান, হাবিব উর রহমান, এবং আবিদ হাসান সাফ্রানি। এখন তো প্লেন থেকে টেলিভিশন শো, সব বক্তব্য আর পরিবেশনের শেষে উচ্চারণ করা হয় ‘জয় হিন্দ।’ এই অভিবাদনের সৃষ্টিকর্তা হলেন আবিদ হাসান সাফ্রানি।
- ভারতের জাতীয় পতাকার আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন সুরাইয়্যা তৈয়বজি।
- ১৯৩০ সালে গান্ধীজী গ্রেপ্তার হবার পর লবণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্বাস তৈয়বজি।[iii]
- ১৯৪৬ সালে রয়েল ইন্ডিয়ান নেভি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বোম্বে (এখন মুম্বাই) থেকে আরম্ভ হয়ে এই নৌবিদ্রোহ করাচি এবং কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহী জাহাজগুলিতে তিনটি পতাকা একসঙ্গে তোলা হয়েছিল – কংগ্রেস, ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি, এবং মুসলিম লিগ। কেন্দ্রীয় ধর্মঘট কমিটির সভাপতি ছিলেন এম এস খান।[iv]
এমনই আরও কত বিপ্লবীর নাম স্মরণ করব! ফিরে যাই বিপ্লবী গণেশ ঘোষের গবেষণামূলক বইটিতে।

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ছিলেন গণেশ ঘোষ। স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁরা আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন তাঁদের আখ্যান নিয়েই মুক্তিতীর্থ আন্দামান বইটি লেখা। তাই স্বভাবতই এই বইয়ে চট্টগ্রাম ও বাংলার বিপ্লবী ইতিহাস স্থান পেয়েছে বেশি। তবু অবাক হয়ে পড়লাম লেখক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, সব ধর্মের বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কীর্তি একই শ্রদ্ধায় লিপিবদ্ধ করেছেন। তথ্য পরিবেশনে এই নিরপেক্ষতা স্বাভাবিক। তবে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক পটভূমিকায় বইটি পড়েছি বলেই ‘অবাক’ হয়েছি।
গণেশ ঘোষ প্রথমেই লিখেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা বিদ্রোহের আখ্যান। চাকমা গোষ্ঠীর বেশির ভাগই ছিলেন কৃষক। জনবক্স খানের নেতৃত্বে ১৭৭৬ সাল থেকে আরম্ভ করে ষোল বছর তাঁরা ইংরেজদের শোষণভিত্তিক খাজনা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সহিংস আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। এই ক্রমান্বয় বিদ্রোহে শাসকরা কিছুটা হলেও সংযত হয়েছিল। জায়গায় জায়গায় এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও স্বাধীনতা লাভের জন্যে সংগঠিত কোনো প্রচেষ্টা তখনও আরম্ভ হয়নি।
ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছিল ১৮৫৭ সালে ১০ই মে তারিখে। ইতিহাসের বইয়ে এই বিপ্লবের উল্লেখ রয়েছে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নামে। বিপ্লবী গণেশ ঘোষ এই নামকরণকে ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচয় বলে যথাযথ কারণে চ্যালেঞ্জ করছেন। বিদ্রোহ বা রাজনৈতিক উত্থানকে ‘সামান্য ঘটনা,’ ‘সীমিত চাঞ্চল্য,’ ‘কিছু বদ লোকের গুণ্ডামি,’ ইত্যাদি বলে তার গুরুত্ব খর্ব করার প্রচেষ্টা সব উপনিবেশিকরাই করে থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু ভারতে প্রথম সংগঠিত বিপ্লব এটিই। বিদ্রোহ দমনের পর ১৮৫৮ সালে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ বন্দিকে আন্দামানে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল।[v] তখনও কুখ্যাত সেলুলার জেল নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়নি।[vi] শাসকেরা ধরে নিয়েছিল সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, খাদ্যের অভাবে, জঙ্গি অধিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সব নির্বাসিতরাই নিশ্চিত মারা যাবে। এবং সত্যি সত্যি তাই ঘটেছিল। শুধুমাত্র মীরজাফর আলি থানেশ্বরী কুড়ি বছর পরে দেশে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর তাঁর সম্বন্ধে আর কোনো খোঁজখবর কেউ রাখেনি।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে যে আড়াই হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র ২৯টি নামের একটি পার্শ্বিক তালিকা খুঁজে পান শ্রীগণেশ ঘোষ। এই ২৯ জনের মধ্যে দশজন (৩৪.৫ শতাংশ) ছিলেন মুসলমান ধর্মাবলম্বী। তাঁদের নাম আমি নীচে দিলামঃ
- আলামা ফজল হক – উত্তরপ্রদেশ
- গুলাব খান – মধ্যপ্রদেশ
- লিয়াকত আলি – উত্তরপ্রদেশ
- মৌলোভী সৈয়দ আলাউদ্দিন – হায়দ্রাবাদ
- মহিবুল্লা – মধ্যপ্রদেশ
- মীরজাফর আলি থানেশ্বরী – মধ্যপ্রদেশ
- নূরা – মধ্যপ্রদেশ
- কাইম খান – মধ্যপ্রদেশ
- সিরাজুদ্দিন – মধ্যপ্রদেশ
- শেখ ফরমাদ আলি – আসাম (ঘোষ, পৃঃ ২৮-২৯)
ইসলামের যে দু’টি প্রশাখা ইদানীং মৌলবাদের সঙ্গে যুক্ত, ওয়াহাবি এবং তিতুমীর, সেই দুটিই ঊনবিংশ শতকে গঠিত হয়েছিল ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামের উদ্দেশ্যে। ‘তিতু মিঞা’ নামে বিখ্যাত নিশার আলির উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্ম সংস্কার করে তাকে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসা এবং বিদেশি শক্তিকে দেশ থেকে উৎখাত করা (তিতুমীর আন্দোলন)। মুসলমান বিদ্রোহীদের দমন করতে ১৮৫০ থেকে ১৮৬৩ সাল অবধি ইংরেজ সরকার কুড়িটি সামরিক অভিযান চালায়। বহু বিদ্রোহীদের তখন আন্দামানে যাবজ্জীবন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে সরকারি নথিতে সাতজনের নাম পাওয়া গেছেঃ
- ইয়াহিয়া আলি (আমবালা, ১৮৬৪)
- আহমদুল্লা (পাটনা, ১৮৬৫)
- আমির খান (কলকাতা, ১৮৬৯)
- হাসমত (কলকাতা, ১৮৬৯)
- আমীরউদ্দিন (মালদা, ১৮৭০)
- ইব্রাহিম মণ্ডল (রাজমহল, ১৮৭০)
- মহম্মদ শের আলি (?) (ঘোষ, পৃঃ ৩৯)
এঁদের মধ্যে মহম্মদ শের আলিকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ভাইপার দ্বীপে নিয়ে গিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হবার পর পাশ্চাত্য ও পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় অভিবাসীরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গদর পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।
[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের]…সময়ে আমেরিকা, কানাডা, চিন ও দূর প্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাঞ্জাবের যে বহু সহস্র অধিবাসী ছিলেন, তাঁরাও গদর পার্টির অনুপ্রেরণায় আসন্ন বিদ্রোহে অংশগ্রহণের জন্য দ্রুত ভারতে চলে আসতে আরম্ভ করেন। গদর পার্টি কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে বর্মা, শ্যাম, মালয়, সিঙ্গাপুর, হংকং প্রভৃতি স্থানের ইংরেজদের অধীনস্থ শিখ ও মুসলমান সৈন্যরাও ভারতবর্ষের সিপাহিদের সঙ্গে একই সময় বিদ্রোহ ঘোষণা করে ওই সকল কেন্দ্রে ইংরেজদের হাত থেকে ক্ষমতা দখল করে নেবার জন্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন ও তদনুযায়ী বাস্তব অবস্থা গড়ে তুলবার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। (ঘোষ, পৃঃ ৬৭)
এঁরা ছাড়াও আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী মোপলা বা মাপ্পিলা মুসলমানেরা। ১৬শ শতাব্দীতে আরব দেশ থেকে এসে এঁরা কেরালার মালাবার সৈকতে বসবাস আরম্ভ করেন। সেই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিশে, বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে, তাঁরা সেখানেই স্থায়ী ভাবে থেকে যান। এঁরা বৃত্তিতে ছিলেন কৃষক। ইংরেজদের অমানবিক খাজনা আদায় ও অত্যাচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে চট্টগ্রামের চাকমাদের মতো এঁরা বাইশবার বিদ্রোহ করেছিলেন। তখন হিন্দু কৃষক এবং উচ্চবর্ণের শক্তিশালী গোষ্ঠীর কাছ থেকে কোনো সাহায্যই এঁরা পাননি (ঘোষ, পৃঃ ৯৯-১০৫)।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বাংলার সাজানো দুর্ভিক্ষের মতো উনবিংশ শতকের শেষে মাদ্রাজে ইংরেজ শাসকেরা খাদ্য সরিয়ে নিজেদের দেশে রপ্তানি করে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল। ১৮৭৫ সালে মাদ্রাজে খাদ্যাভাবে প্রাণ হারায় ৫০ লক্ষের বেশি নাগরিক। এই ধরনের অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৯২২ সালে হিন্দু ও মুসলমান নেতৃত্বে সংগঠিত হয় আঞ্চলিক জনজাতির রাম্পা বিদ্রোহ। রাম্পা বিদ্রোহের বহু নেতাকে আন্দামানে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
এই ছোট্টো প্রতিবেদনে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমান সম্প্রদায়ের অবদানের সামগ্রিক ইতিহাস তুলে ধরা অসম্ভব। বিপ্লবী গণেশ ঘোষের লেখায় এর সামান্য ইঙ্গিতমাত্র আমি পেয়েছি। যাঁরা লেখাটি পড়ে কৌতূহলী হলেন, আশা করি তাঁরা আরও গভীরভাবে এ বিষয়ে গবেষণা করবেন।
———-
পাদটীকা
[i] ঘোষ, গণেশ। ১৯৭৭।
[ii] Jamkhedkar et al. 2018.
[iii] অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
[iv] “রয়েল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ।” (২০২৫, অক্টোবর ১১)। উইকিপিডিয়া – মুক্ত বিশ্বকোষ।
[v] সম্পূর্ণ তালিকা সংরক্ষিত হয়নি।
[vi] সেলুলার জেল নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয় ১৮৯৬ সালে এবং শেষ হয় ১৯১০ সালে। তবে জেলে বন্দি রাখা আরম্ভ হয় ১৮৯৭ সাল থেকে। তখন বন্দিদের এই জেল তৈরির কাজে লাগান হয়েছিল।
———-
তথ্যঋণ
ঘোষ, গণেশ। (১৯৭৭)। মুক্তিতীর্থ আন্দামান। কলকাতাঃ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাঃ লিঃ।
Jamkhedkar, A. P., et al. (Eds.). (2018). Dictionary of Martyrs: India’s Freedom Struggle (1857-1947), 5 vols. New Delhi: Ministry of Culture, Government of India and Indian Council of Historical Research (ICHR).
“রয়েল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ।” (২০২৫, অক্টোবর ১১)। উইকিপিডিয়া – মুক্ত বিশ্বকোষ। Available: https://en.wikipedia.org/wiki/Royal_Indian_Navy_mutiny
Singh, H. (2018). The INA trial: A challenge to the legitimacy of the Raj. Historicity Research Journal, 4.
কিছু তথ্য অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
* ছবিঃ লেখক ও অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
