ঝাড়খন্ডের ডায়েরি

ঝাড়খন্ডের ডায়েরি

পুজো পুজো গন্ধতে মন বসে না ঘরে,
চল মন তবে আসি একটুখানি ঘুরে

প্রথম দিন 

২০২০, করোনার ঘরবন্দিত্বের ক্লান্তি কাটাতে শারদ চতুর্থীর খুব ভোরে নিজস্ব বাহনে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছিলাম ছোটোনাগপুরের উদ্দেশে। কোলাঘাট পেরিয়ে থামলাম একটা ধাবাতে, রসদের প্রয়োজনে। প্রকৃতির চেহারাও তখন বদলাচ্ছে, পথের দু’পাশে সবুজ মাঠের হাত ছাড়িয়ে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে খয়েরি টিলার সারি, যেন হাতছানি দিয়ে ডাক দিয়েছে আমাদের। পুরি সবজি, ডিমসেদ্ধ আর চা খেয়ে চললাম শিল্পনগরী জামশেদপুরের পথে। হাইওয়ের ওপরেই হোটেলে বুকিং করাই আছে রাত্রিবাসের জন্য। পেট সকলের ভর্তি, তাই সোজা চললাম লেক চান্ডিল। রাস্তার মাঝখানে খানিকটা পথ রেখে পথের দু’ধারে চলছে কর্মযজ্ঞ। যন্ত্র আর মানুষের যৌথ পরিশ্রমে আগামীর পথ প্রশস্ত হচ্ছে। গাড়ি এগিয়ে চলল চান্ডিলের পথে, সুবর্ণরেখা আর হুড্রু ফলসের জলধারায় পুষ্ট এই চান্ডিল ড্যাম। হাইওয়ে থেকে নেমে কিছুটা এবড়ো খেবড়ো পথ পাড়ি দিয়ে এলাম ৩৫০ ফিট উচ্চতায়, চান্ডিলের কাছে গাড়ি রেখে এবার কিছুটা পথ নামতে হল জেটির দিকে। পৌঁছেই নৌকা বিহার। পার হেড একশো টাকার টিকিট কেটে, লাইফ জ্যাকেট পরে উঠলাম স্পিড বোটে। সবুজের ঘনঘটায় ঘেরা, ২২০মিটার উচ্চতায় এই প্রাকৃতিক লেক। সুবিশাল বিস্তৃত জলরাশির লেকে নৌ-বিহারের জন্য সীমায়িত করা আছে মাত্র ২৫ বর্গমিটার। লেকের একদিকের জল ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘন সবুজ বৃক্ষরাজির পাদদেশ, উল্টোদিকে পাহাড়ি টিলার সারি ছায়া ফেলেছে লেকের জলে‌, আর মাঝখানে নীলাকাশ আর নীল জলের আলাপচারিতা। বর্ষাকালে চান্ডিলের জল ছাপিয়ে যায় তার কূল আবার গরমে ডিমনার জল কম পড়লে তাকে চান্ডিলের দ্বারস্থ হতে হয়। স্পিড বোটের ঘর্ষণে তৈরি সাদা ফেনা সমন্বিত অজস্র জলরাশি আকৃষ্ট করে রেখেছিল মনকে, টনক নড়ল যখন একটা বৃত্তাকার জলভ্রমণের শেষে ফিরে এলাম ডাঙায়। লেকের পেছন দিকেই সুবর্ণরেখার ওপর তৈরি চান্ডিল ড্যাম, বেশ বড়ো ড্যাম, বোধহয় ন’টা গেট আছে, তবে ড্যামের কাছে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়াল জল কাদা আর অজস্র ছোটো বড়ো মাঝারি নুড়ি পাথরের রাস্তা। এক বিশাল সৌন্দর্যের অপরিসীম ব্যাপ্তিকে মনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে নিয়ে এলাম। এদিকে সকালের জলখাবার কখন হজম হয়ে গেছে, অগত্যা পথের ধারেই এক হোটেলে পেটপুজো সেরে ফিরলাম জামশেদপুর, সরাইখানা অপেক্ষায় আছে আমাদের জন্য তার রাতের আরাম নিয়ে। 

দ্বিতীয় দিন

রাত কেটে ভোরের আলো ফুটতেই ইলেকট্রিক কেটলিতে করা গরম চায়ে গলা ভিজিয়ে ভোরেই বেরিয়ে পড়া হল পথে। জামশেদপুর ছেড়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে পিচ ঢালা কালো পথে, আজ রাতের ছাউনি নেতারহাটের পাহাড়ে। কিন্তু পথের প্রান্তেই তো শুধু আমাদের মঞ্জিল নয়। সে তো ছড়ানো আছে পথের দুই ধারে। দু’দিকের মাঠ ঘাট, সবুজ গাছের সারির ফাঁক দিয়ে লালচে মাটির লোহা পাথরের পথ  আমাদের ডাকছে “আয় আয়!” বড়ো আকর্ষণ করছিল পিচের কালো সর্পিল পথ, দূরে সবুজ পাহাড়ের সারি আর পাশের জানলায় ক্রমপরিবর্তিত দৃশ্যপট। রাস্তায় মাঝে মাঝেই ঝাড়খন্ড সরকারের পথ নির্দেশ লেখা বোর্ড রয়েছে। বেশ খানিকটা পথ পেরোতেই গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরল দশম ফলসের লাল পাথুরে মাটির পথে। এক জায়গায় বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে তিরিশ টাকার বিল কাটার বিনিময়ে পৌঁছে গেলাম দশমের কাছে। রাঁচি জেলার বুন্ডু থানায় গ্রামের নামটি তাইমারা। তাইমারা জনজাতির মানুষের বাস এই গ্রামগুলোতে। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঞ্চী নদীর ধারায় তৈরি হওয়া এই দশম ফলসের উচ্চতা ১৪৪ ফীট। খুব বেশি নয়, কটা ছোটো ছোটো ধাপের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই প্রথমে কানে এলো নির্ঝরের সঙ্গীত, তারপরেই দশমের সঙ্গে মোলাকাত। ভালো লাগল কয়েক ধাপ ছাড়া ছাড়া রেলিং দেওয়া বারান্দায় তৈরি করা দশমের ভিউ পয়েন্ট। আমরা তিন নম্বর বারান্দায় নেমেই থমকালাম, ছোটোরা নামল আরও কিছু দূর, আরও উচ্চতা থেকে দশমকে দেখবে বলে। একাধিক জলধারা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে এসে কোথাও কম, কোথাও বেশি উচ্চতা থেকে গড়িয়ে পড়ছে নীচের পাথরের ওপর। তারপর নিজেদের সমূহধারা এক করে আরো নীচে লাফিয়ে পড়ছে তার সফেদ ফেনায়িত জলধারা। উৎসাহের চোটে আরো একটা ধাপ নেমে নীচের বারান্দায় এলাম। যতই নীচে নামছিলাম, ততই দশমের চঞ্চলতা উপভোগ্য লাগছিল। সূর্যের আলো পড়ে এক অসাধারণ রামধনু প্রতিচ্ছবিত হচ্ছিল অনেকটা নীচের বহতা জলে, উপভোগ করলাম আকাশের সৌন্দর্যকে মাটির কাছে। কানে বাজছে দশমের সুর তান। মাথার ওপরের রোদ পাথরের গা দিয়ে পিছলে পড়ে খেলা করছে ঝরনার নীলচে সবুজ জলে, তৈরি হয়েছে রামধনুর আভা।

আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে স্মরণ করলাম ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে…

“ঝর্ণা ঝর্ণা, সুন্দরী ঝর্ণা
তরলিত চন্দ্রিকা, চন্দন বর্ণা!”

আলাপ হল রাঁচির এক কলেজের ছাত্রদলের সঙ্গে, এসেছে পাহাড়ে ভোজন সারতে, ছোটোখাট কয়েকটা চা আর চিপসের দোকান, খাওয়ার জায়গা সবই রয়েছে। কিন্তু ঘড়ি বলছে সময় পেরিয়ে গেছে এক ঘণ্টারও বেশি। অতএব ফিরে এলাম আমরা, চড়ে পড়লাম গাড়িতে। ভোজন না হয় যথাতথা হবে। বেশ খানিকটা রাস্তা ফিরে এসে আবার মেন রোড; কিন্তু এবারে আবার খানিকটা পথ এগিয়ে ঢুকলাম লোহারদাগা শহরে। বাহন আর বাহিত দুজনেরই খাদ্যের দরকার ছিল, দরকার ছিল আরো কিছু। কে বলে বাঙালি ঘরকুনো প্রজাতির মানুষ? মেদিনীপুরের বাসিন্দা দু’জন ছেলে লোহারদাগার ভোজনালয়ে সযত্নে তৃপ্ত করল আমাদের দেহ-মন-আত্মা।

এবারে কিন্তু রাস্তা ধীরে ধীরে উঠতে নামতে লাগল পাহাড়ের ঘাটি বেয়ে। মাঝে মাঝে তো বেশ চড়াই উৎরাই পাচ্ছিলাম। পাশের পাহাড়ের লাল রুক্ষ মাটি ভেদ করে সবুজের কত যে রং মিলে মিশে খেলা করছিল তার ইয়ত্তা নেই। এখানকার আদিবাসী জনজাতি মানুষের কঠোর জীবন যাত্রার প্রতীক যেন এই বৃক্ষসারি। কালো পাথরে খোদাই করা মানুষগুলো যেমন পাথরের বুক চিরে অঙ্কুরিত করা সবুজ ফসলে সাজিয়ে তুলেছে এই জমিকে, তেমনি এই আকাশছোঁয়া ‌গাছের দলও পাহাড়ের বুক চিরে মাটির অতল অভ্যন্তর থেকে কী অসীম পরিশ্রমে জল সংগ্রহ করছে তা ভেবে অবাক হচ্ছিল মন। আসলে মানুষ আর গাছ দুইই যে প্রকৃতির সন্তান, একথা বোধহয় আমরা ভুলে গেলেও প্রকৃতি ঠিক মনে করে রাখে। ঝাড়খন্ড সরকারের চেষ্টায় রাস্তার ধারে ধারে তো বটেই, যতদূর সম্ভব গ্রামের ভেতরেও কলের জল পৌঁছেছে। উঁচু লোহার ফ্রেমের ওপর জলের নীল কালো প্ল্যাস্টিক ট্যাঙ্ক থেকে জল সরবরাহ হচ্ছে দেখে  ভালো লাগছিল। পথের দু’ধারে ভ্রাম্যমাণ অজস্র লালমুখো বাঁদরের দল। গাছে গাছে, মাটির ওপরে এমনকি সময় বিশেষে পথের ওপরেও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দু’প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে কয়েক জায়গাতেই গাড়ির গতি কমিয়ে বাঁদরের বাঁদরামি আপ্যায়ন করা হল। অদূরেই দৃশ্যমান হচ্ছিল আমাদের গন্তব্য। টিক,পাইন ও আরো নানান গাছে ঘেরা নেতারহাটের এই পাহাড় শ্রেণি উচ্চতায় ১,০৭৬ মিটার। আমরা যখন পৌঁছলাম, পশ্চিম আকাশে তখন রং ধরতে শুরু হয়েছে। গুগল জানাল সামনেই সূর্যাস্তের সময়। হোটেল রইল মাথায়, পর্যটন দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী ছুটলাম, হোটেলের পুরো উল্টো দিকে‌; ম্যাগনোলিয়া সানসেট পয়েন্টে। এক আদিবাসী যুবক ও শ্বেতাঙ্গিনী ম্যাগনোলিয়ার প্রেমের স্মৃতিতে বানানো হয়েছে এদের যুগল মূর্তি। গাড়ির ভিড় এড়িয়ে জায়গা খুঁজে নিতে একটু সময় লাগল। পার্কিং-এ গাড়ি রেখে যখন এগোলাম, তখন ভিড়ে ভিড়াক্কার সেই জায়গা। তবুও দাঁড়ালাম আর মনটা ভালো হয়ে গেল। অর্ধেক সোনালি আর অর্ধেক কমলা রঙের একটা বল দ্রুত তার রং বদলাচ্ছে। তারই ছটায় পশ্চিম আকাশ তখন আলোকিত। আর পেছনের পূবের আকাশে তখন পাইনের লম্বা ছায়া। আস্তে আস্তে সোনলি থেকে পুরো কমলা আর তারপর লাল হয়ে যাওয়া সুয্যিমামা টুপ করে ডুব দিলেন নীল সাদা মেঘের রাজ্যে, কয়েক ঘণ্টার ছুটি নিয়ে। পুরো সময়টা মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর হাতের রং তুলির কাজ দেখছি। সূর্যদেব পাটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও আজকের মতো ফিরলাম নেতারহাটে হোটেলের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।

তৃতীয় দিন

তিরিশ বছর আগে চাকরিসূত্রে রাঁচিতে তিন বছর থাকলেও যাওয়া হয়নি নেতারহাটে। মাত্র দু’রাতের জন্য হলেও এবারের ঝাড়খন্ড সফরে আমাদের পাখির চোখ ছিল নেতারহাট। ঝাড়খন্ডের লাতেহার জেলায় ৩৫১৪ ফুট উচ্চতার এই মালভূমি শহর হল ঝাড়খন্ডের রানি। গতকাল ভোরে হোটেল ছেড়েছি। পথের বাঁকে বাঁকে সৌন্দর্যের রহস্য উন্মোচন করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছানোর উত্তেজনায় ক্লান্ত দেহকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল নেতারহাট হোটেলের উষ্ণ বিছানা। ঘুম ভাঙল যখন ভোর এসে ডাক দিল ‘দোর খোলো’ বলে।

শাল জড়িয়ে বেরিয়ে এলাম হোটেলের পূর্বদিকের ব্যালকনিতে। সামনের সানরাইজ পয়েন্টে জড়ো হয়েছে পুরো নেতারহাট। হোটেলের বারান্দাগুলোতে উৎসুক মুখের ভিড়। কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ দেখে মনখারাপের মেঘ আমাদের মনেও। হঠাৎই দেখি নববধূর গোলাপি ওড়না জড়িয়ে আকাশ মৃদু হাসছে। মুহূর্তে মুহূর্তে পোশাক বদলানোর মতো আকাশ শুরু করল রং বদলের খেলা। বিস্ময়ে নির্বাক আমরা দেখতে লাগলাম এক অদৃশ্য শিল্পীর নিপুণ হাতের তুলির কাজ। নীচের দিকে সাদা মেঘের আস্তরণে ঢাকা শিশু রবি ততক্ষণে লাল জামা গায়ে মেঘের আড়াল থেকে লুকোচুরি খেলছেন আমাদের সঙ্গে, অপেক্ষার আরো কয়েকটা মুহূর্ত, তারপর? টুক করে ভেসে উঠলেন আদিত্যদেব। পুব আকাশে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর আলোর ছটা। সংবদ্ধ হাতে উচ্চারণ করলাম,

ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম।
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম।।” 

ইচ্ছে করছিল প্রিয় সঙ্গীটির হাত ধরে শুকনো পাতা মাড়িয়ে খালি পায়ে পাইনের বনে হাঁটি, কিন্তু বাইরে বেশ ঠান্ডার আমেজ, অগত্যা মনের ইচ্ছেকে মনেই ঘুম পাড়িয়ে, এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে গিয়ে ঢুকলাম কম্বলের তলায়।

আমাদের হোটেলের চারপাশটা সবুজ বনানীতে ঢাকা পাহাড় দিয়ে ঘেরা, চোখের পক্ষে বড়ো তৃপ্তিদায়ক। তার ফাঁকে ফাঁকে আছে ন্যাসপাতি বাগান, নেতারহাট সরকারি রেসিডেনসিয়াল স্কুল, শ্যালেট হাউস, আপার আর লোয়ার ঘর্ঘরি ফলস, ব্রিটিশ আমলে তৈরি গেস্ট হাউস যা আজও যথেষ্ট ওয়েল মেইনটেইনড। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম নেতারহাট ঘুরতে। ঠিক করাই ছিল নিজেদের শরীর আর গাড়ির ওপর চাপ না দিয়ে যতটুকু হয় ততটুকুই ঘুরব। প্রথমেই কোয়েল নদীর ভিউ পয়েন্ট। বুনো ফুলের রঙে গন্ধে ভরা পাইনের এই উপত্যকার আকাশে মেঘ আর রোদের লুকোচুরি চলছেই। তারই ফাঁকে সূর্যের আলোয় চকমকিয়ে উঠল কোয়েলের জল। আবারও কিছুক্ষণের জন্য কোয়েল নিজেকে ঢেকে নিল সাদা কুয়াশার চাদরে। আবারও অপেক্ষা আর এবার কুয়াশার ঘোমটা খুলতেই বেশ অনেকটা দূর থেকে দেখলাম সরল পাহাড়ি তরুণীর চাপল্যে কোয়েল দৌড়ে চলেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। পাশেই চায়ের দোকানের আদিবাসী যুবক জানালেন, বর্ষায় উচ্ছলিত কোয়েলের যৌবন জলতরঙ্গ নিজের দু’কূল ছাপিয়ে উপছে ভাসিয়ে দেয় তীরভূমি। এখান থেকে নেতারহাট লেক, লাল মাটির পথ ধরে বিশাল লেকের কিছুটা অংশকে পাশে রেখে বেশ কিছুটা গ্রামের পথে ঘুরে, কিছু হোটেল, আর কয়েকটা মনে হল হোমস্টেও‌ আছে। পাশ  কাটিয়ে আমরা এলাম ন্যাসপাতি বাগানে। অজস্র সতেজ নাসপাতি ছড়ানো ছিল বাগানে। এক জায়গায় দেখলাম ন্যাসপাতি গাছের তলায় চার পাঁচ জন পুরুষ মহিলা মিলে একটা প্লাস্টিক চাদর ধরে আছেন দেখলাম; একজন গাছ ঝাঁকিয়ে ফল পাড়ছে ওই প্লাস্টিক চাদরে। পথে কিছু ধানের চাষও চোখে পড়ল, পাহাড়িয়া নিয়মে ধাপ কেটে জুম চাষ করা হয়েছে।

এখান থেকে ঘুরে নেমে আসছিলাম সরকারি আবাসিক স্কুলের দিকে। হঠাৎই গাড়ি ঘুরল পাইন বনের মধ্যে দিয়ে লাল মাটির পথে। একটু পাথুরে মাটির পথ, শুকনো পাতায় ছাওয়া, পাশের সরকারি বোর্ড অনুসারে লোয়ার ঘর্ঘরি ফলসের পথ এটা। দু’পাশে বেশ ঘন জঙ্গল, যদিও এক দু’জন সন্তান কাঁধে পিঠে আদিবাসী মহিলার দেখা মিলল। ক্রমশ রাস্তা এগোতে থাকল তার নিজের গতিতে, জায়গায় জায়গায় বেশ উঁচু নিচু, মাঝে মাঝে বেশ সরুও বটে আর তার সঙ্গে খুব কম জায়গা নিয়ে পাক খেয়ে সে পথ কখনো উঠেছে, আবার কখনো নেমেছে। মাঝে মাঝেই সরু অনামী কিছু জলের ধারা পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে ঝিরঝির করে নেমে এসে রাস্তা এপার ওপার করছিল। একটা দুটো জায়গায় পথ একটু ভাঙা, না দেখে পেরোতে যেতেই গাড়ির চাকা বসে যাওয়ার উপক্রম। অতএব সাধু সাবধান! খেয়াল করলাম গাছেরা শিকড় জড়িয়ে বড়ো যত্নে বেঁধে রেখেছে তাই, নাহলে পথ এখানে বেশ বেশিই নরম। আমরাও অনেকটাই চলে এসেছি এই পথে, চারপাশের জঙ্গলও ঘনতর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর গাছের জঙ্গলের মাঝখানে শুধুই আমরা ক’জন, সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে একেবারে ঢুকছে না এমন যদিও নয়, তবুও মাঝে মাঝেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আকাশের আলো। অন্য কোনো পর্যটক গাড়ি বা স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎ নেই। পথের ঠিকানা হারিয়ে ফেলে নির্জন বন্ধুর পথে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের বাহন। গাড়ি থেকে নেমে সরেজমিনে দেখে আসা হল সামনের পথ বুঝতে পারছিলাম, আমরা পথ ভুল করে জঙ্গলের খানিকটা ভেতরে ঢুকে এসেছি, কোনো সরকারি বোর্ডও চোখে পড়ছিল না। এক মুহূর্তে মনে হল, কেউ কি জানতে চাইবে না,

“পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?”

আরো একটু ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল ঠিকই, কিন্তু সরু রাস্তা, ভিজে মাটিতে গাড়ির চাকা বসে যাওয়ার ভয় আমাদের বাধ্য করল ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে। খানিকটা দূর থেকে কানে আসছিল জলের কুলুকুলু ধ্বনি। কিন্তু আমরা তখন পাইন বন ঘেরা জঙ্গলে সঠিক পথের সন্ধানে… তার মধ্যেই কুড়োনো হল বেশ কয়েকটা পাইন ফল। বেশ খানিকটা পথ পিছু হটে এসে কিছুটা জায়গা পেয়ে গাড়ি ঘোরানো হল, আমরাও এতক্ষণ নিঃশব্দে স্মরণ করছিলাম পথের দেবতাকে, এবারে আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে নিশ্চিন্ত হলাম। জঙ্গলের অন্ধকারে সময় বোঝা যাচ্ছিল না, হাতঘড়ি বলে দিল দুপুর একটা।

হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে আবার বেরিয়ে পড়লাম পথে। লোধা ফলস আরো খানিকটা উঁচুতে, কিন্তু পথ বেশ চড়াই। যদিও ভীষণ সুন্দর দৃশ্য সেখানকার, তবুও তার বদলে ঘুরে এলাম এখানকার সরকারি রেসিডেনসিয়াল স্কুল আর শ্যালেট হাউস। অসাধারণ আশ্রমিক পরিবেশে এই স্কুলটি তৈরি হয়েছে ১৯৫৪ সালে। স্কুলের চারপাশে ছাত্রদের থাকার জন্য কটেজের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল খেলার মাঠ, আহা যেন ঠিক আশ্রমের মতো মনোরম পরিবেশ।

শ্যালেট হাউস। বেশ বড় কম্পাউন্ড ঘেরা বাগানের ভেতর সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি। বড়ো বড়ো ঘরগুলোতে পুরোনো দিনের ফায়ার প্লেস লাগানো। আদিবাসীদের হাতে তৈরি নানানরকম ব্যবহারের জিনিস দিয়ে সাজানো বাড়িটি। বাগানে কাজ করছিল একটি মানুষ, তাঁর মুখে শুনলাম কোনো ইংরেজ সাহেবের বাড়ি, যিনি আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করতেন। কিন্তু এর বেশি কিছু জানতে পারলাম না। সন্ধের অন্ধকার নেমে গেছে, ডাকবাংলোর পাশের রাস্তা দিয়ে আরো খানিক ঘুরে ফিরে এলাম হোটেলে। 

পরেরদিন সকালেই যাত্রা শুরু হবে, ফিরব ঘরের পথে। কিন্তু তার আগে আরো একবার ভোরের সূর্যকে প্রণাম তো জানাতেই হবে। তাই শুভরাত্রি।

চতুর্থ দিন

পথের পাশের পাথর বলছে, “চুপটি করে শোনো, ইতিহাসে পাতায় কী লেখা আছে জানো…”

হোটেলে বলাই ছিল। ব্রেকফাস্ট করে রওনা যখন হলাম তখন ঘড়িতে আটটা বেজে আরো তিরিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। প্রথম দিকটা ওপর থেকে নীচে নামা, পাহাড়ি রাস্তা পাক খেয়ে খেয়ে নামছে, কখনো আবার কিছুটা উঠছেও,সেই একই পথে আমরা ফিরছি। কিন্তু পাহাড় বড়ো রহস্যময়ী, একইসঙ্গে বড়ো আকর্ষকও বটে। দু’দিন আগেই যে পথে সফর করেছি বিকেলের আলোয়, আজ সকালে সে দেখা দিল মিষ্টি উষ্ণতার আদর মাখা অনন্য রূপে। পথের প্রতিটি বাঁকেই মনে হচ্ছিল আবারও নতুন কিছু অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। সঙ্গে পথের মাঝে মাঝে খাবার চাওয়া বাঁদরদের উপস্থিতি দিচ্ছিল বাড়তি আনন্দ। উজ্জ্বল আবহাওয়া, রোদের সোনালি তাত, পথের ধারে লম্বা গাছের সারি, সবুজ পাতায় ঘেরা নাম না জানা বুনো ফুলের ঝোপ -সবাই যেন আমাদের বলছিল, “আবার এসো! আমরা অপেক্ষা করব।”

কথা দিলাম মনে মনে।

চড়াই উৎরাই সত্ত্বেও রাস্তা বেশ চওড়া, তবুও উল্টো পথে গাড়ির হর্ন শুনলেই নিজের অজান্তেই টানটান হয়ে বসছিলাম। কোথাও কোথাও বড় সূক্ষ্ম বাঁক, ছেলে মাঝেমাঝেই হাতের ইশারায় কথা বলতে নিষেধ করছিল, আমি টেনশনে, ছেলের বাবা আরেকটু বেশি জোরে জোরে সাবধান করছিলেন, “মুখ বন্ধ, মুখ বন্ধ, কেউ কথা বোলো না!” পাহাড় থেকে নেমে যাচ্ছি,যাব বেতলার সংরক্ষিত জঙ্গলে। কিন্তু কিছুটা সমতলে নেমে পথের দু’ধারের জঙ্গলের সৌন্দর্য শিহরিত করল আমাদের। পালামৌ ডিস্ট্রিক্টের এই অঞ্চলের অসাধারণ রূপ সঞ্জীববাবুর লেখায় আগেই পড়া ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এর বর্ণনা বোধহয় হয় না, এ শুধু অনুভবের, আত্মস্থ করার, তাই সে চেষ্টা আমার মতো অর্বাচীনের পক্ষে না করাই ভালো। বেতলায় হোটেল ঠিক করাই ছিল, ঢুকেই লাঞ্চ করতে সোজা ডাইনিং হলে।

বেতলাতে ইচ্ছে ছিল ফরেস্ট রেস্ট হাউসে আরণ্যক পরিবেশে দুটো রাত কাটাব। কিন্তু বুকিং পাওয়া যায়নি ফলে পাঁচিল ঘেরা জঙ্গলের উল্টো দিকে হোটেল নেওয়া হয়েছিল এক রাতের জন্য। সুতরাং খেয়ে উঠেই বেরোন জঙ্গল সাফারিতে। তবে হোটেল ম্যানেজার বললেন, আগে পালামৌ ফোর্ট দেখে নিতে। ফোর্ট মানে অবশ্য কেল্লার ভগ্নাংশ। দুটি কেল্লা মুখোমুখি নির্মিত রয়েছে, একসঙ্গে বলা হয় পালামৌ ফোর্ট। মেদিনী রায়ের (১৬৫৮-১৬৭৪) আমলে এই ফোর্টের নির্মাণ হয়।

কেল্লা দুটি, বিশেষ করে পুরোনোটা যথেষ্ট ভাঙা এবং জঙ্গলে ঢাকা। অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় থাকা নতুন কেল্লাটির প্রধান ফটকের নাম নাগপুরী গেট। গেটটি চল্লিশ ফিট লম্বা ও পনেরো ফিট চওড়া। বলা হয় একসময় এই কেল্লাটির ছাদ থেকে প্রাচীর পর্যন্ত অশ্বারোহণের উপযোগী প্রশস্ত পথ নির্মিত ছিল। কেল্লাটির স্থাপত্যে মুঘলশৈলী এবং আরবীয় ক্যালিগ্রাফির কাজ লক্ষ করা যায়। কেল্লার গায়ে বিভিন্ন আঘাতের দাগ বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেল্লা দুটির উঁচু উঁচু কারুকার্যময় খিলান, চওড়া প্রাচীর, ওই রাজবংশের গরিমাময় সময়ের কথা কিছুটা হলেও মনে করায়।

খুব উঁচু উঁচু সিঁড়ি আমাদের কেল্লারোহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও ছেলে আর বৌমা উঠেছিল একটা কেল্লাতে আর আমি তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টায় ছিলাম। যেটুকু তথ্য পেয়েছি, তা স্থানীয় এক প্রৌঢ় ব্যক্তির মুখে শোনা এবং ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজমের বোর্ডের লেখা থেকে পাওয়া। 

ফোর্ট দেখা বা বলতে গেলে শোনা সেরে দেখলাম ঘড়ির কাঁটা তিনটে পনেরো। সিদ্ধান্ত হল আজকেই হবে জঙ্গল সাফারি। গাড়ি এসে দাঁড়াল সংরক্ষিত অঞ্চলের বিশাল গেটের সামনে, দুটি হাতি এবং একজোড়া বুনো মোষ দণ্ডায়মান আমাদের স্বাগত জানাতে। আহা! ভয়ের কিছু নেই। ওগুলো মূর্তি, আসল নয়। শুনলাম করোনাকালে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর এই মাস দুয়েক হল জঙ্গলে ঘোরার অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে।

হাতি সাফারি এখন আর হয় না, ১২০০ টাকা ভাড়ায় গাইড, ড্রাইভার সমেত জিপ পাওয়া গেল এক ঘণ্টা সাফারির জন্য। লাতেহার আর পালামৌ জেলার এই বিশাল জঙ্গল ২৩১.৬৭ বর্গ কিলোমিটার এরিয়া কভার করলেও গাইড বললেন, মাত্র পঁচিশ বর্গ কিমির মতো গএকটা সামান্য অংশই নির্দিষ্ট ‌করা আছে দর্শকদের ঘুরে দেখার জন্য। আমরাও তার বাইরে নই।

তবে জঙ্গলের নিজস্ব সৌন্দর্য আর একটা থমথমে ভাব আছে সেটা আমরা নেতারহাট থেকে বেতলা নামার পথেই বেশি পেয়েছি বলে আমার মনে হয়েছে। বিশেষত বিশেষ রক্ষী বাহিনীর আধিকারিকরা যখন গাড়ি থামিয়ে নাম ধাম রেকর্ড করে নিচ্ছিলেন, তখন খুব বেশি করেই মনে হচ্ছিল সেকথা। যদিও হঠাৎ একটা হাতি বা বাইসনের দেখা পেলে কী হতে পারে সেটা ভাবতেই খুব থ্রিলিং লাগছিল। প্রচুর হরিণ, বাঁদর, ময়ূর দেখতে পেলেও বাঘ বাবাজির দর্শন পাওয়া যায়নি। শুনলাম চোরাশিকারীর উৎপাতই এর কারণ। তবে গাইডের কথা মতো ওরা নাকি ছত্তিশগড় জঙ্গলেও চলে যেতে পারে। কারণ জঙ্গলগুলো সব ইন্টারকানেক্টেড। হাতির দল হতাশ করলেও দুটো বাচ্চা হাতি আর একটা মাঝবয়সী হাতি আমাদের আফশোস একটু হলেও কমিয়ে দিয়েছে। জঙ্গলে নিজস্ব ঝরনা আর প্রাকৃতিক কিছু লেকের জল পশুদের জন্য আছে ঠিকই, তবে খুব গরমের দিনে জল শুকিয়ে গেলে বন দফতর নাকি ট্যাঙ্কে করে জল ভরে দিয়ে রায় জঙ্গলে পশুপাখিদের জল খাওয়ার জায়গায়। নানান গল্প শুনতে শুনতে কখন যেন জিপ ফিরে এসে দাঁড়ালো গেটের সামনে। বেতলার রাস্তায় খানিকটা এলোমেলো ঘুরে আজকের মতো আমরাও ফিরে চললাম হোটেলের ঘরে। কিন্তু তার আগে একটা ধান ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম এক অপূর্ব অসাধারণ সূর্যাস্ত যা পশ্চিমাকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনটাকেও রাঙিয়ে দিয়ে গেল।

পঞ্চম দিন

রাঁচি, আমাদের পরের গন্তব্য। সময় লাগবে অনেকটাই, প্রায় ঘণ্টা ছয় সাত। তাই ভোর ভোর বেরোতেই হবে ঠিক করেছিলাম আমরা। সেই অনুযায়ী বেতলাকে টাটা করে গাড়ি স্টার্ট দেওয়া হলো পাক্কা সকাল ছটায়। শারদ ভোরের হাল্কা হিমেল হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়া সোঁদা মাটির গন্ধ মনে করাচ্ছিল আজ অষ্টমীর সকাল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই প্রথমবার বোধহয় অঞ্জলী দিতে পারলাম না। কিন্তু অদ্ভুত লাগছিল, মনে কোনো কষ্ট হচ্ছে না। প্রকৃতি মায়ের কোলের কাছে গিয়ে তাঁর রূপ-রস-গন্ধ বর্ণের আস্বাদ নেওয়াও তো পুজোই। অনেক অনেক যুগ আগে তো আমরা, আদিম মানুষেরা এই গাছ, পাথর, মাটি, জল, আগুন -এদেরই পুজো করতাম ।

যাত্রা হল শুরু। মাঝ পথে একটা ঠেকে ব্রেকফাস্ট করতে বসে ঠিক হল এবার মিশন পাত্রাতু।

এক অসাধারণ উপত্যকা ঝাড়খন্ডের পাত্রাতু ভ্যালি, উচ্চতা ৪০৫ মিটার। পাথরের বুক চিরে কালো সর্পিল পথ পাহাড়ি টিলাটাকে বেড় দিয়ে চড়াই উৎরাই ভেঙে এগিয়ে চলেছে। কখনো সে চড়াই বেশ খাড়াই, শক্ত হাতে চালকের সিটের পেছনটা ধরে রাখতে হচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে ঘন সবুজের সমারোহ মনকে টেনে রাখছে। একটু দূরের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে সবুজ রঙের কার্পেট বিছানো আছে। লেকের কাছাকাছি এসে পড়লে অবশ্য আইসক্রিম ফুচকা এবং কিছু খাবার দোকান চোখের রসভঙ্গ করছে কিন্তু রসনার তৃপ্তির কথাও তো ভুললে চলবে না। লেকের বিস্তৃত নীল জলের অপূর্ব সৌন্দর্য শুধু চোখ মেলে দেখার, লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে রঙিন বোটের সারি, জলের সামান্য খানিকটা ভেতরে একটা হোটেল, মনে হচ্ছিল কোনো ক্যালেন্ডারের ছবি দেখছি। পাত্রাতু শুধু লেক বা রিসর্ট নয়, এখানকার থার্মাল পাওয়ার স্টেশনের জন্যও যথেষ্ট বিখ্যাত। এই অঞ্চলের আসেপাশে কিছু বেশ ভালো হোটেল থাকলেও রাত্রিবাসের জন্য আমরা ফিরব রাঁচির ঠিকানাতেই। মন ভালো হয়ে গেল, যখন দেখলাম লেকের ঠিক মাঝামাঝি খুব সুন্দর একটা ভাসমান হোটেল, বেশ ক্যালেন্ডারের ছবি ছবি লুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর লেকের পাড়ে দাঁড় করানো কিছু মোটর বোট। যথেষ্ট বড় আর গভীর লেকের নীল রঙা জল মন কেড়ে নিচ্ছে। ‘ছবির মতো’ কথাটা বোধহয় এই ঝাড়খন্ডের প্রকৃতিকে দেখেই সৃষ্টি হয়েছে। আইসক্রিম দিয়ে মুখশুদ্ধি করেই গাড়ি ঘোরানো হল রাঁচি শহরের দিকে। 

বিকেলের গল্প একটু আলাদা। একত্রিশ বছর আগে এই শহরের যে বাড়ি, যে পাড়া, যে প্রতিবেশীদের ছেড়ে গেছিলাম, এসে দেখা করলাম তাঁদের সকলের সঙ্গে। সত্যি বলতে কী এবারের যাত্রাপথে রাঁচিকে রাখা একমাত্র সেই কারণেই, ওঁদের আমন্ত্রণেই এবার যাওয়া। কী অসম্ভব আনন্দে আদর আর আন্তরিকতা নিয়ে ওঁরা আমাদের স্বাগত জানালেন, সেটা প্রকাশ করার জন্য কোনো শব্দবন্ধই যথেষ্ট নয়। বাহ্যিক আলাপচারিতা নয়, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মতো আড্ডা মারলাম আমরা। রাত ন’টায় যখন ছুটি পেলাম তখন ভাবলাম এতটা সময় কী করে কেটে গেল। কত কথাই বাকি রয়ে গেল যে! হোটেলে ওঠার জন্য যথেষ্ট বকুনি খেয়ে, আবার দেখা হবে, এই আশ্বাসের সঙ্গে ফিরে এলাম হোটেলে।

এবারের মত সফরের দি এন্ড। তবে হ্যাঁ, প্রতি পদক্ষেপে আমাদের সঙ্গে ছিলেন মিঃ গুগল। তা না হলে আটবছর বয়সে রাঁচি ছেড়ে চলে আসা আমার ছোট্ট ছেলেটা, বড়ো হয়ে আজ আবার আমার অতীতের ভালো দিনগুলোর সঙ্গে আমার দেখা হয়তো এতটা সহজে করাতে পারত না। নবমীর সকালে আবাসনের মণ্ডপে মায়ের চরণে প্রণাম জানাতে উঠে বসলাম গাড়িতে। জামশেদপুরে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা নিউটাউনের বাড়িতে ল্যান্ডেড। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন বলছে – “চলো যাই আবারো।”

———-

ছবিঃ লেখক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *