মহামানবের সাগরতীরে
১
দু’পা দিয়ে বৈঠা টেনে চলেছে এক বৃদ্ধা, মাথাটি ঢাকা ছাতার মতো ছড়ানো টোকা দিয়ে, বিশাল নিস্তরঙ্গ জলরাশির ওপর দিয়ে সে নিয়ে চলেছে আমাদের, যেন বৈতরণী পার করিয়ে দিচ্ছে। মধ্যে মধ্যেই জল থেকে জেগে উঠেছে উঁচু পাহাড়, তার মাথায় পরানো ঘন সবুজের মুকুট; যেন পাহারা দিচ্ছে এই শান্তির প্রতিচ্ছবিকে। আমার বোন আর আমি, এই নৌকোয় বসে যেন জীবনের সংজ্ঞা নতুন করে অনুধাবন করতে করতে চলেছি। অদ্ভুত এই জলজ পাহাড়, Halong Bay-কে ঘিরে রেখেছে রহস্যে, সময় যেন পার হয়ে যেতে পারেনি এই জলের সীমারেখা, এখানে এসে আটকে গেছে। নৌকোর যাত্রাপথে কোনো কোনো পাহাড় দু’পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে জলে, যেন সে কতো শতাব্দী আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলো।
পাহাড়ের পেটের তলা দিয়ে নৌকা চলে, এক গা অন্ধকার মেখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নীল আকাশের নীচে, আলোর মেলায়। পাহাড় কি বললো? সব শুনতে পেয়েছিলাম যখন নৌকো তার তলা দিয়ে চলছিলো।
সে কথা নৈঃশব্দ্য দিয়ে বলা, চাইলেও তার পুনরাবৃত্তি আমার কম্মো নয়।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের ভিয়েতনাম ভ্রমণের তৃতীয় দিনে। রাজধানী হ্যানয় থেকে বাসে হ্যাল্যং বে-তে আসার পরই আমাদের জলে ঘেরা বাসস্থান অর্থাৎ Amanda cruise vessel – এ অপার্থিব রাত কাটাই তারাদের সান্নিধ্যে। যাদের তারা দেখতে গেলে সিগারেট ও পানীয়ের দরকার, ছোট্ট ডিঙি নৌকো এসে বিভিন্ন deck-এর বাসিন্দাদের সেসব পৌঁছে দেয় – রাত একটার পর বেশ কিছুক্ষণ দড়িতে বাঁধা থলেতে মাল ওঠে ও পয়সা নামে।
এসেছি সদলবলে কলকাতা থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইটে। ভাবতে অবাক লাগছে, তাই না? এত অল্প সময়ে একটা সম্পূর্ণ অন্য দেশ, অন্য সংস্কৃতির আঙিনায় পৌঁছে যাওয়া যায়? করে দেখালো তো আমাদের পাইলট।
এই তেইশ জনের দলে তিনজন ছাড়া আর সকলেই আমার চেনা। আমার বোন-ভগ্নীপতির বন্ধু সকলে; এখন আমার খুব ঘন ঘন স্বস্থান ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে কলকাতা যাওয়া হয় বলে আমারও বন্ধু; তাই নতুন তিনজনের সঙ্গে অপরিচয়ের গণ্ডিটা তাড়াতাড়ি মুছে দিতে হলো।

২
দশ দিনের সফর। এত অল্প সময়ে একটা দেশকে সম্পূর্ণ বোঝা অসম্ভব তবু, যা ভোলার নয় তা থেকে গেছে স্মৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ভেসে উঠেছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে, এ দেশের বেদনা-জর্জরিত ইতিহাসের প্রতিটি পর্ব- যা এই স্বর্গীয় দৃশ্যাবলীর মৌনতায় প্রোথিত হয়ে আছে। বহু শতাব্দী ঔপনিবেশিকতার শিকার হয়েও ভিয়েতনাম যে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দেয়নি, তা প্রভূত প্রশংসনীয়।
এক শতক ভিয়েতনাম ফরাসিশাসিত হওয়ার পর আমেরিকা একে দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে করতলগত করার চেষ্টা করে বিফল হয়। কম্যুনিজমের অগ্রগতি রুখে দেওয়া ছিলো মার্কিন পুঁজিবাদীদের উদ্দেশ্য। সে চেষ্টায় তারা দেশটিকে দু-ভাগ করে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে। হো চি মিনের নেতৃত্বে এই ছোট্ট গরীব দেশটি আমেরিকান শক্তিকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয় এবং সে লড়াই শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সৃষ্টি হয় কম্যুনিজমের ছত্রতলে একীভূত ভিয়েতনাম।
তবে ভিয়েতনামের ওপর হামলায় কি না করেছে দাম্ভিক, শক্তিশালী আমেরিকা। ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছি সেই দীর্ঘমেয়াদী বর্বরতার কাহিনি। তার প্রচুর ছবি দেখেছি বাবার এনে দেওয়া ‘লাইফ’ ও ‘টাইম’ পত্রিকায়। হো চি মিনের স্থির লক্ষ্যে দেশবাসীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিরলস সাধনার কথা বাবার মুখে শুনেছি। আমাদের চোখের সামনে তখন চলছে আরেক বাঁধভাঙা প্রলয়, নকশাল আন্দোলন। সমান্তরাল ভাবে এই দুই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে আমাদের যৌবনের উত্তাল সমুদ্রে, প্রকাশ পায় আমাদের অনুভূতি ও অভিব্যক্তিতে। লেখা হয় “হায় ভালোবাসি” গান (মহীনের ঘোড়াগুলি); যেখানে বলা হয়,
“যখন দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে বন্দরে / শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে প্রান্তরে / তখন ভালো লাগেনা লাগেনা কোনো কিছুই / সুদিন, কাছে এসো / ভালোবাসি একসাথে সবকিছু”।

আমাদের ট্যুর-এর সপ্তম দিনে যখন Saigon এর war Remnants Museum – এ দেখলাম যুদ্ধের সমস্ত দৃশ্য, ছোটোবেলায় দেখা সমস্ত ছবি বিদ্যুৎগতিতে ফিরে এল মানসচক্ষে। তার পাশে museum এ রাখা পর পর ছবি, তুলে ধরলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ নৃশংসতা। দেখলাম কীভাবে একরের পর একর সবুজ অরণ্যভূমিকে নিষ্ফলা করে দেওয়ার জন্য সামরিক বিমান থেকে স্প্রে করা হয়েছে এজেন্ট অরেঞ্জ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক সংমিশ্রণ।
জঙ্গল ধ্বংস হলে দেখা যাবে ভিয়েতকংদের (ভিয়েতনামী কমিউনিস্ট যোদ্ধা), তারা সবুজে গা-ঢাকা দিতে পারবে না। শুধু জঙ্গল ও তার ভেতরে লুকিয়ে রাখা খাদ্যসামগ্রী ধ্বংস হয়নি, বহু মানুষ হাত, পা, চোখ খুইয়েছে এর ফলে। বহু বিকলাঙ্গ শিশুও জন্মেছে ঐ সব এলাকায়। যখন একই জায়গার ওপর দিয়ে বারবার স্প্রে করা হয়েছে, তখন ডায়ক্সিন, এজেন্ট অরেঞ্জ এর অন্যতম প্রধান বিষাক্ত উপাদান, শুধু যে উর্বর মাটিকে উষর জমিতে পরিণত করেছে তা নয়, আশপাশের পুকুর নদীর মধ্য এই বিষ ঢুকে গিয়ে মাছ, হাঁস, ইত্যাদি জলজ প্রাণীর ক্ষতি করেছে এবং মানুষ সেই প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
Museum-এ রাখা আছে কিছু বোমা যা আমেরিকা বর্ষণ করেছিল ভিয়েতনামের ওপর, বছরের পর বছর ধরে। আজ ২০২৬-এ এসেও প্রশ্ন থেকে যায় কমিউনিজমকে কতটা পরাস্ত করা গেলো ঐ ভারী ভারী ক্যাপিটালিজমের বোমা মেরে।
আমরা দেখলাম সায়গনের কাছেই জঙ্গলে কিভাবে তিন লেভেলে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ভিয়েতকংরা নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। প্রথম লেভেলটি সৈন্যদের জন্য, দ্বিতীয়টি রান্নার জন্য, তৃতীয়টি আহতদের চিকিৎসার জন্য। ২০০ কিলোমিটারের এই সুড়ঙ্গ, যা চু চি টানেল নামে বিখ্যাত, তৈরি করতে বহু বছর সময় লেগেছে। মাটির তলায় রান্না করতে গেলে তার ধোঁয়া নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। জঙ্গলে যে উইঢিপি থাকে তার এবড়ো খেবড়ো গায়ে ছোটো ছোটো ফুটো দেখা যায়। সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে রান্নার ধোঁয়াকে ঠিকমতো বিকল্প চ্যানেল করে নিয়ে এসে সেই ফুটো দিয়ে বার করে দেওয়ার রাস্তা তৈরি হয়, যা খুঁজে পাওয়া শত্রুসৈন্যের পক্ষে অসম্ভব ছিলো।
দিনের বেলা কৃষক সেজে ক্ষেতের কাজ করেছে যারা, তারাই হয়েছে রাতে ভিয়েতকং সেনাবাহিনী; গেরিলা যুদ্ধে তৎপর ও অসম্ভব দৃঢ় যাদের মনোবল।
মনে রাখা দরকার শুধু ফরাসী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনই সব নয়, তারও আগে চিন ভিয়েতনামের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল হাজার বছর ধরে (খৃস্টপূর্ব ১১১ সন থেকে ৯৩৯ খৃস্টাব্দ)। তখনও ভিয়েতনামীরা বারংবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। স্ট্যানলি কার্নো তাঁর ‘ভিয়েতনামঃ আ হিস্টরি’ বইতে লিখেছেন, “Over the centuries, they would repeatedly challenge Chinese domination. And that hostility entered their historic consciousness.”
৩
একাদশ শতাব্দী থেকে পাঁচশোর বেশি বছর কারুর অধীনে থাকেনি ভিয়েতনাম, মোঙ্গলদের ক্রমাগত আক্রমণ সত্ত্বেও। পঞ্চদশ শতকে চীনের অসীম শক্তিশালী মিং বংশ প্রভুত্ব করতে শুরু করে ভিয়েতনামের ওপর। যদিও ক্রূরতায় মিং বংশীয় রাজাদের তুলনা ছিলনা, তবুও ১৪০৭ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব স্থাপন করার পর ১৪২৮ খ্রিস্টাব্দে তাদের পরাস্ত হতে হয় এবং ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়।
প্রাচ্যে ষোড়শ শতাব্দী থেকেই শুরু হয় ইউরোপীয়দের আগমন, সঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারিরা; উদ্দেশ্য যথাক্রমে, ‘পরের ধনে পোদ্দারী’ও ধর্মান্তর।
এরই মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে চলতে থাকে যুদ্ধ, বাড়ে একে অপরের প্রতি অসহিষ্ণুতা। মনে পড়ে আরেকটি দেশের কথা; যেখানে বহু ছোট, বড় রাজ্যে আলাদা আলাদা রাজার রাজত্ব, তাদের মধ্যেও বৈরীভাব প্রকট। অথচ শিক্ষা-দীক্ষায়, সভ্যতা ও সংস্কৃতির চর্চায় তারা প্রত্যেকে অনন্য; বাণিজ্যে, যুদ্ধবিদ্যায়, সমুদ্রযাত্রায় পারদর্শী; লক্ষীর কৃপাধন্য। প্রাচীন কাল থেকেই দেশটির একটি সুসংহত identity না থাকায় যতবার বাইরের কোনো ক্ষমতা এসে হানা দিয়েছে, তাদের নতিস্বীকার করতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে প্রভূত ধনসম্পদ, অনন্য শিল্পকর্ম, সমাজব্যবস্থা, স্বগৌরবে উজ্জল ইতিহাস; যৌথ অবচেতনে প্রোথিত হয়ে গেছে বিদেশী প্রভুদের পা-চাটার অভ্যাস। যা আজও লালিত হয় ভারতীয় জনমানসেI
এই প্রাচ্যেই ছোট্ট একটি দেশ, নাম নিপ্পন, অধুনা জাপান, ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত থেকে, তাদের হাতে সূচগ্র্য মেদিনী অধিকৃত হতে দেয়নি। চীনও সে প্রচেষ্টায় আংশিকভাবে সফল।
সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ভিয়েতনামে বিভিন্ন স্বদেশী নেতৃত্বে চলে উত্তর ও দক্ষিণের ঐক্যসাধনের প্রয়াস। এরই মধ্যে খ্রিস্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরের চেষ্টা চলতেই থাকে, যদিও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে যথেষ্ট সচেতনভাবে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়।
এদিকে ভারতবর্ষে যখন অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, মুঘল সাম্রাজ্য পতনের সময় এগিয়ে আসছে। বহু চেষ্টা করেও আঞ্চলিক শক্তি হায়দ্রাবাদ, আউধ (Awadh), বাংলা, পাঞ্জাব ও মারাঠা সাম্রাজ্য দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থা সংগঠনে ব্যর্থ, তখন সুযোগসন্ধানী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ভারতে তাদের সাম্রাজ্য স্থাপনে। ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল’, পোহালে শর্ব্বরী রাজদণ্ডরূপে।’।
৪
উনবিংশ শতাব্দীতে প্রাচ্যে উপনিবেশ গড়ার কাজে ব্রিটিশ, ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপিয় শক্তি রীতিমতা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ফরাসী সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার দ্রুত প্রসার। সেই দৌড়ে তো পাল্লা দিতেই হবে। তাই ভিয়েতনামের ওপর শাসনব্যবস্থা জারি করতে হয়। উনবিংশ শতক শেষ হওয়ার আগেই ভিয়েতনামের লাগোয়া লাওস ও কাম্বোডিয়াতেও ফরাসি রাজত্ব কায়েম হয়ে যায়।
এই শাসনব্যবস্থায় তৈরি হয় এক শ্রেণীর মানুষ যারা ঔপনিবেশিক শোষণে ফরাসিদের সবরকম সাহায্য দিতে প্রস্তুত। এ প্রশিক্ষণ আমরাও পেয়েছি ব্রিটিশ শাসকদের থেকে, নইলে জালিওয়ানওয়ালাবাগে যখন জেনারেল ডায়ার হুকুম করলো “ফায়ার!”, তখন নিরস্ত্র দেশবাসীর ওপর গুলি চালালো কারা? ভারতীয়রাই তো!
ভিয়েতনাম বহুদিন আগে যেভাব হাজার বছরের চীনা আধিপত্য দূর করতে পেরেছিলো, সেভাবেই এগোতে থাকলো তাদের ফরাসিদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা।
একটা সুবিধ হয়েছিলো ফ্রান্স ১৭৬৩ সালে সেভেন ইয়ার্স ওয়ার-এ হেরে যাওয়ায়। সেটি ছিলো প্রকৃত পক্ষে পৃথিবীর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পৃথিবী জুড়ে ফ্রান্সের সাম্রাজ্য যত দুর্বল হয়ে পড়ছিলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তেমনি চলছিলো অবাধ বিস্তার। এই বিজয়ী দৌড় চলেছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কাল অবধি; সেই চূড়ান্ত যুদ্ধে হলো ব্রিটিশদের তুমুল বিপর্যয়; তখন তাদেরও….
কী বলতে গিয়ে কোথায় চলে এলাম —–
ব্যাক টু বেড়ানো…
যে বিষয়ে এত কথা বললাম তার উল্টোপিঠে মনুষ্যত্বকে গাঢ় মিষ্টি রসে ডুবিয়ে, ভালো করে ফুটিয়ে ভিয়েতনাম পরিবেশন করে চলেছে; ঘুরে দাঁড়নোর চেষ্টায়। বানা হিলসে যাবার অত্যাধুনিক কেবল কারে চড়ে নীচের সবুজ বনানীর ওপর ভাসমান মেঘের বুক চিরে যখন চলেছি তখন কান পাতলেই শুনতে পাচ্ছি সেই নিখাদ মনুষ্যত্বের সঙ্গীত;–
এখানে তৈরি করা এখানে হয়েছে গোল্ডেন ব্রিজ, – ছ’টি বিরাট হাতের মধ্যে ধরা আছে এই দীর্ঘ ব্রিজটি, যেন সমস্ত মানুষকে অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ।
সায়গনের ফুটপাথে, আসলে তার আধুনিক নামটি ধরে উল্লেখ করতে গেলে বলতে হয় হো চি মিন সিটির ফুটপাথে দাঁড়িয়ে, মুগ্ধ হয়ে দেখেছি একা মহিলা লোকাল পিৎজা বানিয়ে বিক্রী করছে নির্ভেজাল নিষ্ঠা নিয়ে। উনুনের ওপর চাটুতে রাইস পেপার গরম করছে, তার ওপর ছড়াচ্ছে পর্কের কুচি, খুব সরু করে কাটা বাঁধাকপি, গাজর, সেদ্ধ মাশরুম, নিখুঁত ভাবে তাকে টিস্যু (Tissue) পেপার মুড়ে খদ্দেরের হাতে দিচ্ছে। মুখে হাসি, পরণে ঝকঝকে পরিষ্কার শেফের টুপি থেকে শুরু করে এখন, অ্যাপ্রন, হাতে গ্লাভস, সব কিছুর মধ্য থেকে ফুটে বেরোচ্ছে কাজের প্রতি একাগ্রতা- জীবনকে শ্রদ্ধা জানানো।
এইভাবেই হয় আমার ঘোরা। মনুষ্যত্বের খোঁজে। যেখানেই যাই, খুঁজে বেড়াই তাকে।
