শিল্পী ভিন্সেন্টের জীবনে বরিনেজের ভূমিকা - প্রথম পর্ব
গৌরচন্দ্রিকা-
ভিন্সেন্ট ভ্যান গক নেদারল্যান্ডের বাসিন্দা হলেও একুশ বছর বয়েসে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় লন্ডনের গুপিল অ্যান্ড কোম্পানির শাখায়। সেখানে তিনি ছবি বিক্রির সেলস্ম্যানের কাজ করতেন। গুপিল অ্যান্ড কোম্পানি ছবি বিক্রির বিরাট প্রতিষ্ঠান, ইউরোপের সমস্ত বড় শহরে ওঁদের শাখা আছে। এখানে চাকরি করলেও আসলে ভিন্সেন্ট এখানে কাজ শিখছিলেন, গুপিল অ্যান্ড কোম্পানি ভ্যান গক পরিবারেরই ব্যবসা। ভিন্সেন্টের এক কাকা প্যারিস, বার্লিন, ব্রাসেলস-এর সমস্ত গুপিল গ্যারালিগুলোর অর্ধেক মালিক। ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে, ছেলেপুলেও নেই, তাঁর অংশের অন্তত অর্ধেক ভিন্সেন্টের কপালেই নাচছে। আর-এক কাকা হেনড্রিক ভ্যান গক হলেন প্যারিস ব্রাসেলস আর আমস্টার্ডামের বড় বড় শোরুমগুলোর মালিক, আর তৃতীয় কাকা কর্নেলিয়াস হল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আর্ট কারবারি। একদিন হয়ত এই সবই ভিন্সেন্টের করায়ত্ত হবে।
খুব মন দিয়ে ভিন্সেন্ট তাঁর কাজ করেন। লন্ডনে যে বাড়িতে তিনি পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন সেই বাড়ির মিষ্টি মেয়ে উনিশ বছরের উরশুলা-র প্রেমে পড়েছেন তিনি । কী মধুর এই প্রেমে পড়া! বাড়ি থেকে তার অফিসে যাবার রাস্তাটা তার এত ভালো লাগে! রাস্তার দু-ধারের ঘরবাড়ি, রাস্তার লোকজন সবাই যেন এই নব্য প্রেমিককে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।
শোরুমের তৃতীয় ঘরটা ভিন্সেন্টের কাজের এলাকা। এই ঘরে ছবির প্রিন্ট মেলে, তাই এই ঘরেই বিক্রি সবচেয়ে বেশি। ভিন্সেন্ট বোঝেন সবচেয়ে সস্তা মাল বিক্রির কাজ নিয়েই তিনি আছেন। নির্বোধ স্থূলরুচির ক্রেতার ভিড়ে থিকথিক করে তাঁর ঘর। তাতে অবশ্য তাঁর কিছুই যায় আসে না। বিক্রি নিয়ে কথা। যত বিক্রি করতে পারবে ততই অফিসে তাঁর খাতির বাড়বে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি উরশুলার উষ্ণ সান্নিধ্যে তৃপ্ত হন। উরশুলাকে বিয়ে করে তার মধুর সান্নিধ্যে জীবনটা কাটিয়ে দেবেন—এই স্বপ্নে তিনি মশগুল। তিনি শক্তসমর্থ, পরিশ্রমী যুবক, যথেষ্ট রোজগার তাঁর, ভবিষ্যতে রোজগার আরও অনেক বাড়বে। উরশুলাও তাকে ভালোবাসে। এই বিয়েতে কারুরই আপত্তি থাকার কথা নয়। নীল নরম স্বপ্নের মতো ভিন্সেন্টের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ভিন্সেন্টের ভুল ভাঙল। প্রগলভা উরশুলা তাকে নিয়ে যে খেলা করছিল তা তিনি বোঝেননি। সে অন্য কারুর বাগদত্তা। উরশুলার উস্কানিমূলক মূলক চাউনি, কথাবার্তা, হাবভাবকে ভিন্সেন্ট প্রেমের প্রকাশ বলে ভেবে মূর্খের স্বর্গে বাস করছিল। জীবনকে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে নিতে অভ্যস্ত ভিন্সেন্ট ভাবতেই পারে না যে প্রেমের মতো গভীর বিষয় নিয়ে কেউ ছেলেখেলা করতে পারে! বার বার সে উরশুলার কাছে প্রেম নিবেদন করে, তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন ভিন্সেন্ট। বারবারই প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। তীব্র কঠিন প্রত্যাখ্যান। লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন ম্রিয়মাণ রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি অফিসে যান। কর্মক্ষেত্রে এমনিতেই তিনি ছেঁদো-রুচির খরিদ্দারদের নিয়ে বিরক্ত ছিলেন, কিন্তু পেশার তাগিদে তিনি দেঁতো-হাসি হেসে তাদের বদরুচির প্রশংসা করে তাদের ছবি গছাতেন। কিন্তু এখন কেউ যদি সস্তা ছবি সম্বন্ধে তার মত জানতে চায় তিনি আর রেখে ঢেকে উত্তর দেন না, তাতে বিক্রি হোক আর না হোক। যেসব ছবিতে শিল্পীর অন্তর্বেদনা পরিস্ফুট হয় না, নিছক ঘরসাজানো-মনভোলানো সেসব ছবিকে তিনি আবর্জনার বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তবু এভাবে যাহোক চলে যাচ্ছিল, কিন্তু একদিনের একটা ঘটনা তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল।
একদিন তাদের দোকানে এক স্থূলদেহী ধনী মহিলার আবির্ভাব হলো। গায়ে ঝকমকে পোশাক, মাথায় পালক-গোঁজা ভেলভেটের টুপি। শহরে তাঁর নতুন বাড়ির জন্য ছবি কিনতে এসেছেন। তাঁর ভার পড়ল ভিন্সেন্টের উপর।
এসেই তিনি বললেন—দামের জন্য ভেব না। দোকানের সেরা মাল আমাকে দেখাও। আমার বসার ঘরটা পঞ্চাশ ফুট লম্বা, দুদিকের দেওয়ালের মাঝে এইখানে জানলা…
সারা বিকেলটা জুড়ে ভিন্সেন্ট তাঁকে কয়েকটা ভালো ছবির প্রিন্ট বিক্রির চেষ্টায় অপব্যয় করলেন—রেমব্রাঁ, টার্নার, করো, ডবিনি—এঁদের ছবির প্রিন্ট। কিন্তু যা কিছু ভালো ছবি তাকে নিমেষে বর্জন করে যা নিতান্ত সস্তা আর নোংরা তা পছন্দ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা মহিলাটির। তাঁর আচার-ব্যবহার আর স্থূল রুচিতে বিষাক্ত হয়ে উঠল ভিন্সেন্টের মন। পছন্দ শেষ করে আত্মপ্রসাদে ডগমগ হয়ে মহিলাটি বললেন—কী দারুণ ছবিগুলো বেছেছি, তাই নয় কি?
–নিশ্চয়ই, তবে কিনা এতক্ষণ ধরে এত কষ্ট না করে যদি চোখ বুঝে ক’খানা ছবি তুলে নিতেন এর চেয়ে ভালোই হত বোধ করি।
অপমানে লাল হয়ে উঠলেন মহিলাটি। –কী বললে? ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলতে শেখোনি দেখছি! গেঁয়ো ভুত কোথাকার।
প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শোরুমের ম্যানেজার মিঃ ওবাক বিরক্তিতে ফেটে পড়লেন। –কী ব্যাপার ভিন্সেন্ট? তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এত বড় খদ্দেরকে কী আক্কেলে তুমি অসম্মান করতে পারো? সপ্তাহের সবচেয়ে মোটা বিক্রিটাই মাটি। এর কী জবাবদিহি করব?
–জবাবদিহি আমিই করব। ভিন্সেন্ট আজ নির্ভীক। গলা তুলে তিনি বললেন—মূর্খ লোককে যাচ্ছেতাই ছবি গছিয়েই কী আমার জীবন কাটবে? কিছু পয়সাওলা লোক, ছবির ব্যাপারে যাদের বিন্দুমাত্র ধ্যানধারণা নেই তাদের খোসামোদ করে চলতে হবে? আর যারা সত্যিই ভালো শিল্পের সমজদার তারা একটা ভালো ছবির প্রিন্টও কিনতে পারে না, কেননা তারা গরীব। দোকানদার হলেও আমিও তো মানুষ। আমারও সহ্যের সীমা আছে।
জবাবদিহিই বটে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভিন্সেন্ট জবাবদিহি করেছিলেন কি না তা আমরা জানি না। কিন্তু জীবনদেবতাকে উনি জবাবদিহি করেছিলেন তাঁর জীবন দিয়ে। ছবির বেসাতি আর উরশুলার মতো মিষ্টি মেয়েকে বিয়ে করে সুখে ঘরকন্না করার জন্য যে তার জন্ম হয়নি তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গুপিল অ্যান্ড কোম্পানির চাকরি ওঁর পোষাল না।। ওদিকে উরশুলার বাড়িতে সব জানাজানি হয়ে গেছে। উরশুলার মা তাঁর উপর খুব বিরক্ত। ভিন্সেন্টকে ঘর ছেড়ে দিতে বলেছেন। বেকার ভিন্সেন্টের লন্ডনে থাকার কারণ ফুরিয়েছে। তবু ভিন্সেন্ট কিছুতেই উরশুলাকে ভুলতে পারেন না। তাই লন্ডনে আরেকটা বাড়িতে উঠে গিয়েছেন। তিনি থাকতে উরশুলা আর কাউকে ভালোবাসতেই পারে না, যে করেই হোক, এ বিয়ে তিনি আটকাবেন।
দিন গুজরানের জন্য একটা বইয়ের দোকানে সামান্য একটা কাজ নিলেন তিনি । সে কাজও ভালো লাগল না। উরশুলার পাড়ায় গিয়ে তার বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করেন। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে দরখাস্ত পাঠিয়ে আবার তিনি তিনি একটা চাকরি পেলেন, ইস্কুল মাস্টারির চাকরি। লন্ডন থেকে ট্রেনে চারঘণ্টার পথ, র্যামসগেট। সেখানেই মিঃ স্টোকসের স্কুল বাড়ি। দশ থেকে চৌদ্দ বছর বয়েসের চব্বিশটি ছাত্র। তাদেরকে ফরাসি, ডাচ আর জার্মান ভাষা শেখানোর কাজ, এছাড়াও তাদের দেখাশোনা করতে হবে। বিনিময়ে মিলবে আহার আর আশ্রয়। বেতন এক পয়সাও নয়। শুনশান মন-কেমন-করা জায়গা এই র্যামস্গেট। ব্যর্থ প্রেমিক তিনি, নির্বান্ধব নিঃসঙ্গ। তার মনোভাবের সঙ্গে মিলে গেছে জায়গাটা। এই নিঃসঙ্গতা তাকে উরশুলার স্মৃতিবেদনায় নিমগ্ন থাকতে সাহায্য করে।
এখানে আসার পর প্রথম শনিবার রাত থাকতে তিনি হাঁটা পথে লন্ডনের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে শেষ বিকেলে তিনি পৌঁছলেন ক্যান্টারবেরিতে। গির্জার বাইরে একটা বড় গাছের তলায় কিছুটা বিশ্রাম করে তিনি আবার চললেন। গভীর রাতে একটা দিঘীর ধারে পৌঁছলেন। ভোর চারটে অবধি সেখানে ঘুমিয়ে আবার শুরু করলেন হাঁটা। লন্ডনে উরশুলাদের বাড়ি যখন পৌঁছলেন সন্ধে নেমে এসেছে তখন। যে দেশে উরশুলা আছে সে দেশে আমিও আছি—সান্নিধ্যের এ এক অমোঘ আকর্ষণ। ঐ তো উরশুলার বাড়ি। ঐ তো তাঁর উরশুলার ঘরের দরজা। এই জন্যেই তো ইংল্যান্ডে আসা। চেয়ে থাকেন তিনি সে বাড়ির দিকে। একটা একটা করে উরশুলার বাড়ির আলোগুলি নিবে যায়। জোর খাটিয়ে উঠে পড়েন ভিন্সেন্ট। ভারী পা দুটিকে টানতে টানতে ফিরে চলেন তিনি আবার।
প্রতি সপ্তাহ-শেষে তার এমনি নিরাশ ব্যর্থ যাত্রা শুরু হলো। পকেটে গাড়িভাড়ার পয়সা নেই, তাই এই দীর্ঘ পদযাত্রা। শুধু উরশুলাকে মুহূর্তের চোখের দেখা পাবার আশায় তার এই কৃচ্ছ্রসাধন! সোমবার যখন তিনি র্যামস্গেটে ফিরে আসেন তখন তার মুমূর্ষু অবস্থা।
এখানে কয়েকমাস কাজ করার পরে ভিন্সেন্ট কাজ পেলেন আইলওয়ার্থে মিঃ জোনসের মেথডিস্ট স্কুলে। এ কাজটা একটু ভালো। মিঃ জোন্স মস্ত একটা এলাকার ধর্মযাজক। ভিন্সেন্ট শিক্ষক হিসেবে বহাল হলেও তাকে প্রায়ই গ্রাম্য পাদ্রির কাজ করতে হতো। মিঃ জোন্সের ছাত্ররা হতদরিদ্র। তারা থাকে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলের বস্তিতে। নোংরা পুতিগন্ধময়, দারিদ্র, ক্ষুধা আর ব্যাধির আঁতুড়ঘর সে বস্তি। মাইনে আদায় করার জন্য ধর্মযাজক তাঁকে পাঠান সেখানে। ভিন্সেন্ট খুশি হলো—লন্ডন মানেই উরশুলার সান্নিধ্য।
একটি পয়সাও আদায় হয় না, কত পরিবার ডাস্টবিনে ফেলে-দেওয়া পচা গলিত খাদ্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। তাদের করুণ কাহিনি শুনে খালি হাতে তিনি ফেরেন আইলওয়ার্থে। কিন্তু ভিন্সেন্টের অধ্যবসায় দেখে খুশি হলেন মিঃ জোন্স। তাকে আরও বড় দায়িত্ব দিলেন। নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন ভিন্সেন্ট। রিচমন্ডের গির্জায় উপাসনার কাজে। গির্জার প্রার্থনাকারীরা তার ভাষণে সন্তুষ্ট হলেন।
আজ তিনি সাফল্য পেয়েছেন। আজ তিনি জয়ী। সামান্য দোকানের কর্মচারী তিনি নন। তাঁর উপাসনার মধ্যে দিয়ে পীড়িত মানুষ শান্তির সন্ধান পেয়েছে। তিনি এখন পাদ্রী। আজ তাঁকে নিশ্চয় উরশুলা ফেরাতে পারবে না।
লন্ডনের পথে তিনি হাঁটা শুরু করলেন। পথে ঝড় নামল। আকাশ-ভরা কালো মেঘে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। আসার সময় টুপি ছাতা কিছুই তিনি নিয়ে আসেননি। ভিজে সপসপে হয়ে গেলেন তিনি। তবু দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চললেন।
কোন বাধাই আজ তাঁর কাছে বাধা নয়। নবলব্ধ সাফল্যের এই জয়-উচ্ছ্বাসকে তিনি সমর্পণ করবেন উরশুলার পায়ে।
লন্ডনে উরশুলাদের বাড়ির কাছাকাছি যখন পৌঁছলেন বিকেল পড়ে এসেছে। আপাদমস্তক কাকভেজা, জলে ডোবা ভারী বুটজুতো। সঙ্গীতের মূর্ছনা কানে এল, বাড়িটা আলো দিয়ে সাজানো। রাস্তায় অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সামনের ঘরটায় নাচ চলছে।
এক গাড়োয়ানকে তিনি জিজ্ঞাসা করল—কী হচ্ছে ও বাড়িতে?
উত্তর এল—বিয়ে।
একটা গাড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়ে তিনি দেখছিলেন। মাথায় লাল চুলের গুচ্ছ বেয়ে জলের ধারা বইছিল। একটু পরে বাড়ির দরজাটা খুলল। উরশুলা ও তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছিপছিপে যুবক। লোকজনের আনন্দ-কোলাহল। উরশুলা আর তার স্বামী গাড়িতে উঠল। গাড়োয়ান চাবুক মারল ঘোড়ার পিঠে। চলতে শুরু করল গাড়িটা। আত্মগোপন করে-থাকা ভিন্সেন্ট দেখলেন গাড়ির ভেতরে চুম্বনরত দম্পতিকে। গাড়িটা পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল, বৃষ্টিস্নাত সায়াহ্নে।
চরম মোহমুক্তি হলো তাঁর, ঘুচে গেল সব বন্ধন। পরিত্রাণ পেলেন তিনি।
অক্লান্ত বর্ষণের মধ্যে দিয়ে তিনি ফিরে এলেন আইলওয়ার্থে। তারপর ইংল্যান্ড ছেড়ে গেলেন চিরদিনের মতো।
বরিনেজ
১
দেশে ফিরে এসে তিনি ঠিক করলেন ধর্মপ্রচারকের কাজ করবেন। তাই শুনে তাঁর কাকা বললেন—বলো কী? ধর্মপ্রচারক? সে তো অশিক্ষিতের কাজ। চাষা ভুসো লোককে তারা ধর্মের বুলি আওড়ায়। তোমাকে পড়াশুনা করে গ্রাজুয়েট হয়ে পাদ্রি হতে হবে। আমাদের বংশে সবসময়েই কেউ না কেউ একজন পাদ্রির কাজ বেছে নিয়েছেন। শিক্ষাই তো আসল। তোমায় শিক্ষিত হতে হবে। সব ব্যবস্থা হবে।
আমস্টার্ডামের বিখ্যাত ধর্মযাজক রেভারেন্ড স্ট্রিকার এলেন। পরনে দামী কাপড়ের নিখুঁত পরিচ্ছদ। পরিচয়পর্বের পরে তিনি বললেন—মেন্ডিস ডি কস্টা তোমাকে গ্রিক আর ল্যাটিন শেখাবেন। ওঁর জোড়া পণ্ডিত দেশে আর নেই।
প্রত্যেকদিন সূর্য ওঠার আগেই ভিন্সেন্ট ঘুম থেকে উঠে বাইবেল পড়তে বসে। একটুকরো রুটি আর বিয়ারে প্রাতরাশ সেরে নিয়ে তিনি শুরু করেন গ্রিক ল্যাটিন ভাষা চর্চা। একটানা সাত ঘণ্টার সাধনা। মাথা ঝিমঝিম করে তাঁর। তারপর তিনি মেন্ডিস দি কস্টার কাছে যান।
শিক্ষককে দেখে ভিন্সেন্টের লুই পারেজের আঁকা ‘খ্রিস্টানুসরণ’ ছবিটার কথা মনে পড়ে। কোটরে-ঢোকা চোখদুটিতে গভীর জিজ্ঞাসা, নিরাসক্ত নির্লিপ্ত মুখ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রিক, ল্যাটিন, অঙ্ক আর ব্যাকরণ পড়ার মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে হয় শিক্ষকের সঙ্গে অন্য বিষয়ে কথা বলতে। বিশেষ করে ছবির কথা, শিল্পীর কথা। কিন্তু তার সময় কোথায়? শিক্ষকের মোটা বেতন যে জোটাচ্ছেন রেভারেন্ড স্ট্রিকার।
মেন্ডিস ডি কস্টা বোঝেন তার মনের কথা। তাই প্রায়ই পড়াশুনা শেষ করে বেরোন তাঁরা। হাঁটতে হাঁটতে তখন নানান গল্প হয়।
একদিন তিনি ভিন্সেন্টকে নিয়ে চললেন একটা নতুন রাস্তা দিয়ে যা ভিন্সেন্টের অচেনা। জনাকীর্ণ রাস্তাটায় অনেক কলকারখানা। অসংখ্য শ্রমিক-বস্তি। দরিদ্র অঞ্চল। ভিন্সেন্ট বললেন—এইসব অঞ্চলে পাদ্রি হতে পারলে খুব ভালো হয়।
মেন্ডিস বললেন—ঠিক বলেছ। ঈশ্বরের প্রয়োজন শহরের লোকদের চাইতে এদের ঢের বেশি।
–এ কথার মানে, মিনহার?
দুদিকে শীর্ণ হাত বাড়িয়ে মেন্ডিস বললেন—এরা দিনমজুর, দুর্দশার জীবন এদের। কাজ না জুটলে খেতে পাবে না। রোগ হলে চিকিৎসার সম্বল নেই। দুর্ভিক্ষের দুশ্চিন্তা নিয়ে দিন কাটে ওদের। জীবন ঠকিয়েছে ওদের। ঈশ্বর ছাড়া ওদের ভরসা আর কেই-বা আছে? এদের না আছে স্বাচ্ছন্দ্য না সঞ্চয়। শহরের মানুষদের যা আছে। তাদের কাছে ঈশ্বর দিব্যি গোলগাল পাকাবুড়ো বনেদি ভদ্রলোকটি।
সেদিন রাত্রিবেলা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবছিলেন। তাঁর মনে ভেসে উঠছিল লন্ডনের শ্রমিক বস্তির দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের কথা। তিনি তো নিজেকে ঐ সহায়-সম্বলহীনদের কাছে ঈশ্বরের প্রচারক হবেন বলেই ভেবেছিলেন, তাদের সেবায় উৎসর্গ করবেন নিজেকে। রেভারেন্ড স্ট্রিকারের গির্জার কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ল তার। সম্ভ্রান্ত মানুষেরা ওখানে উপাসনায় যান। নিশ্চিন্ত সুখী জীবন তাঁদের। ঈশ্বরের সান্ত্বনার আর কী প্রয়োজন তাদের?
ছ-মাস হল তিনি আমস্টার্ডামে এসেছেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি। গ্রিক আর ল্যাটিন, অঙ্ক আর গ্রামার—এই দুস্তর সাগর পেরোতে হবে তাঁকে, তবেই ধর্মযাজকের যোগ্যতা পেতে পারেন তিনি, ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবেন।
এইভাবে একটা গোটা বছর কেটে গেল। ভিন্সেন্ট হার মানলেন। এ হবার নয়। তাছাড়া একটা প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে। কেন এই পরিশ্রম? তিনি তো রেভারেন্ড স্ট্রিকারের মতো সম্ভ্রান্ত ধর্মযাজক হতে চান না। পড়াশুনা শেষ করতে এখনো পাঁচ বছর বাকি, এ গাধার বোঝা বয়ে নিয়ে তিনি কোথায় পৌঁছবেন?
মেন্ডিস বুঝেছিলেন তার ছাত্রের মনে একটা অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়ার সময় এসে গেছে। বললেন—চল, বাইরেটা আজ খুব সুন্দর। তোমার সঙ্গে একটু ঘুরেই আসা যাক।
দুজনে বেরলেন। পথে যেতে যেতে এক পাশে পড়ল পুরনো ধর্ম-মণ্ডলটি, তিন শতাব্দী আগে এখানে স্পিনোজা ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষিত হয়েছিল। আর একটু এগোতে রেমব্রাঁর পুরনো গৃহ।
বাড়িটার পাশ দিতে যেতে যেতে মেন্ডিস নিতান্তই সহজভাবে বললেন—দেখো, কত দারিদ্র্য আর অসম্মান নিয়ে লোকটা কীভাবে মরল!
তাঁর কথায় চমকে উঠল ভিন্সেন্ট। মেন্ডিসের কথার ধরনই এমন। সহজ কথার আড়ালে গভীর তত্ত্ব যেন লুকিয়ে থাকে।
কেটেকেটে ভিন্সেন্ট উত্তর দিল—তাতে তার দুঃখ ছিল না, মিনহার।
–ঠিক তাই। রেমব্রাঁর মৃত্যু সুখের মৃত্যু। সে যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে, তার চাওয়ার পথে কোন বাধাই সে মানেনি। তার অবদানকে সে ঠিকই বুঝেছিল। এই তো সাফল্য।
–কিন্তু মিনহার, এমনও তো হতে পারত যে শেষ পর্যন্ত তিনি অবহেলিতই থেকে যেতেন।
–তাতে বয়ে যেত তার। ওঁর কাজ ছিল ছবি আঁকা। সেখানেই তার সার্থকতা। শিল্পী যদি তার শিল্পের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে তবেই শিল্পের মূল্য পাওয়া যায়। তাঁর জীবন আঁকার মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল। কালের হাতে তাঁর ছবির কানাকড়ি দাম না মিললেও কিছুই যেত আসত না। শিল্পী না হয়ে আমস্টার্ডামের সবচেয়ে ধনী ব্যবসাদার হলেই কী তার জীবন সার্থক হয়ে উঠত?
–ঠিক বলেছেন মিনহার।
মেন্ডিস বলে চললেন—আজ যে সারা বিশ্ব রেমব্রাঁর শিল্পকে স্বীকৃতি দিয়েছে তা নিতান্ত অতিরিক্ত। মানুষ তার শিল্পকে কদর করল কি করল না সেটা কিছুই নয়, আসল কথা হলো, শিল্পীর আদর্শচ্যুতি ঘটল কি না।
একটু থেমে ভিন্সেন্ট প্রশ্ন করল—কিন্তু একজন যুবকের কথা ধরুন, মিনহার। যদি সে একটা বিশেষ পথে ব্রতী হয়ে পরে বুঝতে পারে যে সে ভুল পথ ধরেছে? এ পথ চলতে সে অক্ষম, অপারগ?
মেন্ডিসের কালো চোখদুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে তিনি বললেন—দেখো, অস্তগামী সূর্য মেঘগুলোকে কেমন রাঙিয়ে তুলেছে।
চলো বাঁধের ওপর দিয়ে জিবুর্গের দিকে এগোই। সেখানে ইহুদি কবরের ওপর একটু বসব। আমার পূর্বপুরুষরা সবাই ওখানে ঘুমোচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে মেন্ডিস ভিন্সেন্টের প্রশ্নের জবাব দিলেন এতক্ষণে। দেখো ভিন্সেন্ট, কী যে তোমার কাজ, কী যে তোমার ব্রত, এর উত্তর সারা জীবনেও তুমি পাবে না। যা তোমার করা উচিত সাহস আর নিষ্ঠা নিয়ে সে কাজেই নিজেকে সঁপে দিতে হবে। হয়ত ভুল করছ, তাতে কী? চেষ্টা তো করেছ। তাহলেই হলো। তুমি তোমার বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলো। এরই নাম আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাসকে ভয় করো না।
পরের দিন সন্ধেবেলা।
চব্বিশ ঘণ্টা ধরে ভিন্সেন্ট একটা কথাই ভেবে চলেছেন। দুঃখী, অবনতদের মধ্যে ঈশ্বরের কাজ করবেন, এই ছিল তাঁর ব্রত। কিন্তু কবে? আরও পাঁচ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে পণ্ডিত হবার পরে? না এখনই? উপাসনা সভায় বক্তৃতা দেওয়াই কি শুধু ঈশ্বরের কাজ? দীন, দুঃখী, আতুরদের সেবা, সাহায্য, শোকার্তকে সান্ত্বনা—এ কী কাজের মতো কাজ হবে না? এ জগতে তার পথের ঠিকানা তিনি জানেন। ঈশ্বরে আত্মোৎসর্গ এখনই শুরু হোক।
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠল। ভিন্সেন্ট তাঁর ব্যাগ গুছিয়ে কারো কাছে বিদায় না নিয়ে কাকার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।
২
খ্রিস্টিয় সুসমাচার প্রচারণী সংস্থার বেলজিয়াম সমিতি ব্রাসেলসে একটা নতুন স্কুল খুলেছিলেন। এখানে প্রচারকের শিক্ষা দেওয়া হবে। আহার ও বাসস্থানের জন্য ছাত্রদের সামান্য কিছু দক্ষিণা দিতে হবে। তিন ধর্মযাজক এই কমিটির সদস্য–ভ্যান ডেন ব্রিঙ্ক, ডি জঙ ও পিটারসেন। ভিন্সেন্ট এই কমিটির সঙ্গে দেখা করে এই স্কুলের ছাত্র হবার সুযোগ পেলেন।
পিটারসেন বললেন—তিনমাস এখানে পড়ো, তারপর তোমাকে প্রচারকের কাজ দেওয়া হবে। রেভারেন্ড ডি জঙ বললেন—তবে পরীক্ষায় কিন্তু সফল হতে হবে।
রেভারেন্ড ভ্যান ডেন ব্রিঙ্কের উপদেশ হলো, ভালো প্রচারক হতে গেলে খুব সুন্দর আর মনোগ্রাহী করে বক্তৃতা দেওয়া চাই। মনে রাখবেন, মিষ্টি মধুর বাণী দিয়ে লোককে আকর্ষণ করতে হবে।
সাক্ষাতকার শেষ হলে ভিন্সেন্টের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন রেভারেন্ড পিটারসেন। তার হাতে হাত রেখে বললেন—তোমার নির্বাচনে আমি খুব খুশি হয়েছি, ভিন্সেন্ট। যদি মন দিয়ে কাজটা কর, তবে বেলজিয়ামে তোমার কাজের শেষ নেই।
কৃতজ্ঞতায় গলে গেলেন ভিন্সেন্ট। মুখে অবশ্য কিছু বললেন না। পিটারসেন তাঁর বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ভিন্সেন্টকে বললেন—সন্ধেবেলা কাজ না থাকলে আমার কাছে এস। কথা বলব তোমার সঙ্গে।
স্কুলে ছাত্র মাত্র তিনজন। শিক্ষকের নাম মিঃ বকমা। বেঁটেখাটো তিরিক্ষে মেজাজের মানুষ। বাঙলার পাঁচের মতো মুখ।
ভিন্সেন্টের সহপাঠী দুজন আঠেরো উনিশ বছরে গ্রাম্য যুবক। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলেও ভিন্সেন্টকে হাসিমস্করা করাই ছিল তাদের বন্ধুত্ব-বন্ধন। কিন্তু ভয়ানক সমস্যা হলো মাস্টার বকমাকে নিয়ে। তিনি চাইতেন তাঁর ছাত্ররা যাতে ভালো উপস্থিত বক্তা হতে পারে। তাঁর নির্দেশ ছিল ছাত্ররা বাড়িতে ভালো একটা বক্তৃতা লিখে পরদিন সেটা না দেখে ঠিকভাবে যেন বক্তৃতা দিতে পারে। অন্য দুজন ছাত্র মিষ্টি মিষ্টি গালভরা বুলি লিখে মুখস্থ করে পরের দিন উগরে দিত। ভিন্সেন্ট তার অন্তরের সমস্ত আবেগ আর বেদনাকে উজাড় করে যা লিখত তা সহজবোধ্য করে প্রকাশ করতে পারত না। বকমা অসন্তুষ্ট হয়ে বকাবকি শুরু করলেন। চটজলদি বানিয়ে বলার যার ক্ষমতা নেই সে নাকি হবে প্রচারক!
কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ভিন্সেন্ট বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যেস রপ্ত করেত পারলেন না। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি অর্থময় ও ভাবগম্ভীর উপদেশ রচনা করেন, পরের দিন যখন রচনাটি পাঠ করতে যান, শুনতেই চান না শিক্ষক। ধমকে উঠে বললেন—আমার কাছে শিখে ছাত্ররা বক্তৃতা দিয়ে পাঁচ মিনিটে কাঁদিয়ে দিতে পারে, আর সেখানে তুমি…এক বছর আমস্টার্ডামে বসে বসে এই শিক্ষাই বুঝি পেয়েছিলে?
বকমার ধমক আর অপমান ভিন্সেন্টের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল, একদিন প্রতিবাদ করে উঠলেন তিনি। শিক্ষক হলেন শত্রু।
নভেম্বরে কমিটির সামনে হাজির হলো ছাত্ররা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ভিন্সেন্ট। মাস্টারের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া গেছে। এবার তিনি ঈশ্বরের কাজে নিজেকে নিয়োগ করতে পারবেন। কমিটিতে বকমা হাজির। চোখেমুখে বিরক্তি।
রেভারেন্ড ডি জঙ তার সহপাঠী দুজনকে প্রশংসা করে তাদের প্রচারকের কাজে নিযুক্ত করলেন। এবার ভিন্সেন্টের পালা।
রেভারেন্ড ডি জঙ বললেন—কমিটি তোমার কাজে খুশি নয়, ভ্যান গক। তাই এবারে তোমাকে কোন কাজ দেওয়া গেল না। তুমি আবার স্কুলে ফিরে ছ- মাস ক্লাস কর। তারপর দেখা যাক। পিটারসেন কমিটিতে ছিলেন, তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন।
মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন ভিন্সেন্ট। তারপর নীরবে তিনি গির্জা থেকে বেরিয়ে এলেন।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে তিনি আনমনে লাইকেন অঞ্চলে চলে এসেছেন তা নিজেই জানেন না। পাকা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁচা রাস্তা দিয়ে চলেছেন তিনি, দোকানপাট, লোকজনের ভিড় আর নেই। একটু হাঁটার পরে সামনে একটা ফাঁকা মাঠ পড়ল। হাড়-জিরজিরে একটা বুড়ো ঘোড়া ঘাস খুঁটছে, বয়েসের ভারে নড়বড়ে। একটু দূরে আর একটা ঘোড়ার সাদা সাদা হাড়ের কঙ্কাল। মাঠের ধারে একটা কুটির। কসাই বাড়ি।
এই ক্লান্ত করুণ দৃশ্য দেখে তার এতক্ষণের অসার মনটা একটু যেন নড়ে উঠল। একটা গুঁড়ির ওপর বসে পাইপটা ধরালেন। স্বাদটা তিতকুটে লাগছে। একটু আদর খাবার লোভে বুড়ো ঘোড়াটা তার দিকে গলাটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
যিশুর কথা মনে পড়ল তার। কত বাধা, কত বিপর্যয়–কোন কিছুই যিশুকে টলাতে পারেনি। যিশু বলেছিলেন—ভয় কি আমার! আমি তো একলা নই। ঈশ্বর আছেন আমার সঙ্গে। সান্ত্বনা পেল মনে মনে।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে দেখল পিটারসেন তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বললেন—আজ রাতে তুমি আমার বাড়িতে খাবে। তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি।
খেতে খেতে তিনি বললেন—বেলজিয়ামের দক্ষিণে মন্স্-এর কাছে বরিনেজ নামে একটা কয়লাখনি অঞ্চল আছে। সম্প্রতি আমি সেখানে ক’দিন কাটিয়ে এসেছি। আমি দেখেছি, সত্যিই যদি আশার বাণী ধর্মের বাণী কারো দরকার হয় তা এই বরিনেজের অধিবাসীদের।
আগ্রহী হলেন ভিন্সেন্ট। মন দিয়ে তিনি পিটারসেনের কথা শুনছেন। ভিন্সেন্ট, তুমি বরিনেজে যেতে চাও? তোমার মধ্যে আদর্শ আছে উদ্দীপনা আছে—সেখানে তোমার জন্য অনেক ভালো কাজ অপেক্ষা করে আছে।
–কিন্তু আমি? আমি কী করে যাব? কমিটি আমাকে তো আবার স্কুলে যেতে বলেছে।
–কমিটির ব্যাপারটা আমি আগেই জানতাম। তাই সবকিছু জানিয়ে তোমার বাবাকে চিঠি দিয়েছিলাম। আজই তার উত্তর এসেছে। তিনি তোমার বরিনেজে থাকার খরচ দেবেন।
লাফিয়ে উঠে ভিন্সেন্ট বললেন—তাহলে আমার একটা কাজ করে দেবেন আপনি?
–এখনি এত উতলা হয়ো না। বরিনেজে যদি তুমি ভালো কাজ পার কমিটি তোমাকে মনোনীত করবেই। ডি জঙ, ভ্যান ডেন ব্রিঙ্ক—সময়ে অসময়ে এদের অনেক উপকারে আমি তো আসি, আমার কথাও তাদের রাখতে হবে। পৃথিবীতে দুঃখী মানুষের অভাব নেই ভিন্সেন্ট, তোমার মতো লোকেরই দরকার তাদের জন্য।
৩
ট্রেন গন্তব্যে এসে গেছে প্রায়। দূরে কয়েকটা কালো কালো পাহাড় চোখে পড়ল। ফ্ল্যান্ডার্সের সমতলভূমি দেখে দেখে ক্লান্ত চোখদুটি আরাম পেল যেন। বেশ কিছুক্ষণ ঐ পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর কেমন যেন অদ্ভুত লাগল। ওগুলো কোন পর্বতমালার অংশ নয়—সমতল মাটিতেই হঠাৎ হঠাৎ খাড়া করে উঁচু হয়ে ওঠা।
পাশের সহযাত্রীটিকে তিনি শুধোলেন—ওখানে ঐ পাহাড়গুলো কী করে এল বলতে পারেন?
–ওগুলো পাহাড় নয়, কয়লার খাদের স্তূপ খনি থেকে কয়লার সঙ্গে যে আবর্জনাটা উঠে আসে ওটা তারই স্তূপ। দিনে দিনে আবর্জনা জমে জমে ঐরকম খাদের পাহাড় তৈরি হয়েছে।
ওয়াম্স্ স্টেশনে এসে গাড়ি থামল। ভিন্সেন্ট নামলেন স্টেশনে। নিঃস্ব, রিক্ত বিশাল একটা উপত্যকার মাঝখানে এই ওয়াম্সের খনি এলাকা। যতদূর চোখ যায় কয়লার ধুলোর কালো আস্তরণ। তার মাঝ দিয়ে সূর্যের আলো তার কুশ্রীতাকে যেন আরও প্রকট করছে। পাহাড়ের ধার বেয়ে দু-ধারে ইটের বাড়ি। একটু দূরে গিয়েই ইটের বাড়ি আর নেই, পুরনো ওয়াম্স্ গ্রামের শুরু এখানেই, মজুররাও এখানে থাকে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করেন ভিন্সেন্ট। জনপ্রাণীহীন রাস্তায় ক্বচিৎ দেখা যায় পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে আছে কোন স্ত্রীলোক।
ওয়াম্স্ গ্রামে একটাই পাকা বাড়ি। এখানকার বেকারির মালিক জন ব্যাপ্টিস্ট ডেনিসের বাড়ি সেটা। পিটারসেনের ব্যবস্থা অনুসারে সেখানেই ভিন্সেন্ট থাকবে। মাদাম ডেনিস উষ্ণ অভ্যর্থনা করে ভিন্সেন্টকে বাড়িতে স্বাগত জানালেন। টাটকা রুটির গন্ধভরা রান্নাঘরের পাশ দিয়ে তিনি তাকে তার ঘরে নিয়ে গেলেন। ছোট্ট ঝকঝকে ঘরটি, রাস্তার দিকে একটা জানলা আছে। খুব পছন্দ হলো ঘরটা ভিন্সেন্টের। গোটা পরিবেশটাই ভালো লাগছে। তর সইছে না তাঁর, বাঁধাছাঁদা খোলার আগেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। গতরাতে বরফ পড়েছিল, মাঠের ধারের কালো বেড়াগুলোর ওপর বরফ পড়ে বিশ্রী দেখাচ্ছিল। ডেনিসের বাড়ির পুবদিকে একটা মস্ত খাড়াই, তার গায়ে শ্রমিকদের কুটির, উল্টোদিকে প্রান্তর।
“সাপারের সময় আসবেন কিন্তু,” বললেন মাদাম ডেনিস। “আমরা পাঁচটার সময় সাপার খাই।”
ভিন্সেন্টের ভালো লাগল মাদাম ডেনিসকে। খুব সহজেই উনি কাউকে আপন করে নিতে পারেন।
“নিশ্চয় আসব মাদাম। এই একটু ঘুরে দেখেই আসছি।”
“আজ এখানে এমন একজন আসবেন যাঁর সঙ্গে আপনার অবশ্যই আলাপ হওয়া উচিত। আপনি আপনার কাজের জন্য যা কিছু জানতে চান তার অনেক কিছুই উনি আপনাকে বলতে পারবেন।”
গতরাতে বরফ পড়েছিল। কালো কয়লাগুঁড়ো-মাখা মাঠের ধারের বেড়াগুলোর ওপর বরফ পড়ে কুশ্রী দেখতে লাগছে। মার্কাস নামে এই খনিটাই সবচেয়ে পুরোনো আর বিপজ্জনক। দুর্ঘটনার জন্য এই খনিটার দুর্নামের শেষ নেই, হয় বিস্ফোরণ নয় বিষক্রিয়ায়, বা জল উঠে বা ধ্বস নেমে এই খনি কত মানুষের প্রাণ নিয়েছে যে তার আর লেখাজোখা নেই। চারদিকে গরীব খনি-শ্রমিকদের কুঁড়ে, কয়েকটা মরা গাছ, কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, স্তূপীকৃত কয়লার আবর্জনা, আর সর্বোপরি কালো কালো পাহাড়গুলো– মন খারাপ করা দৃশ্য।
“একে যে ওরা কালো দেশ বলে তাতে আর আশ্চর্য কী!” নিজের মনেই বললেন ভিন্সেন্ট। এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন ভিন্সেন্ট। শ্রমিকরা খনির গেট থেকে কাজ শেষে বেরিয়ে আসছিল। অপরাহ্ণের ক্ষীণ আলোতেও তারা চোখ পিটপিট করছিল, সেই রাত থাকতে তারা খনির অন্ধকারে কাজ করতে ঢুকেছিল, অর্ধ দৃষ্টি নিয়ে তারা নিজেদের মধ্য দ্রুততার সঙ্গে অবোধ্য ভাষায় কথা বলছিল তারা। ভিন্সেন্ট এখন বুঝল বিকেলে এই অঞ্চলটা কেন এত জনহীন লাগছিল।
“জাক ভার্নি একজন সফল মানুষ,” মাদাম ডেনিস সাপার-টেবিলে ভিন্সেন্টকে বলছিলেন, “তাহলেও খনি-শ্রমিকদের কিন্তু উনি ভুলে যাননি। হায়, সবাই যদি ওঁর মতো হতেন! ধর্মঘটের সময় একমাত্র উনিই শ্রমিকদের পাশে ছিলেন। ওঁর কথা ছাড়া শ্রমিকরা আর কারো কথাই শোনে না। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, এই মানুষটিই আর বেশিদিন বাঁচবেন না।”
“কেন? কী হয়েছে তাঁর?”
“সেই পোড়া ব্যারাম, বুকের দোষ। খনিতে যারা নামে তাদের এ রোগ না হয়ে আর যাবে কোথায়!”
একটু পরে জ্যাকেস ভার্নি এলেন। বেঁটে, আধকুঁজো লোকটি, গর্তে বসা চোখদুটিতে হতাশা আর বঞ্চনার প্রকট ছাপ। ভিন্সেন্ট একজন প্রচারক আর এখানকার লোকেদের নিয়ে কাজ করতে চান শুনে তিনি বললেন, “আঃ মশিয়েঁ, কত লোক আমাদের সাহায্য করতে চায়, কিন্তু আমাদের জীবনের অন্ধকার তাতে কাটে না।”
দু-একটা কথা বলতে না বলতেই শুরু হলো তার কাশির দমক। ভিন্সেন্টের মনে হলো তার ঝাঁঝরা বুকটা বুঝি এবার ফেটেই যাবে। দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে থুথু ফেলে এসে ঘরে বসলেন জ্যাক।
কিছুক্ষণ পরে ভিন্সেন্টকে নিয়ে উনি চললেন কুলিবস্তির দিকে। খাড়াইটা জুড়ে উঠে গেছে বস্তিটা। এক একটা কাঠের খুপরিতে এক একটা পরিবারের বাস। পরিকল্পনার বালাই নেই, এলোমেলোভাবে খুপরিগুলো গজিয়ে উঠেছে, আর তাদের ঘিরে অজস্র গলিঘুঁজি। মোড়ে মোড়ে আবর্জনা আর জঞ্জালের স্তূপ। তাদের বাঁচিয়ে পথ চলাই মুস্কিল, একটু অসাবধান হলেই পা ডুবে যায় আবর্জনায়। এই বস্তির একটা ঘরে—ঘর না বলে কাঠের খুপরি বলাই উচিত– গিয়ে জ্যাক কড়া নাড়লেন। সেটা ডিক্রুকের খুপরি।
দরজা খুলে দিলেন ডিক্রুকের স্ত্রী। পঁচিশ, ছাব্বিশ বছর বয়েস, শুকনো দড়ির মতো চেহারা। বস্তির অন্য খুপরির মতোই ডিক্রুকের খুপরিটা। মাটির মেঝে, কাঠের তক্তার ফাঁকগুলো থেকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে, ছেঁড়া চটের বস্তা দিয়ে ঠাণ্ডা আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা। অতি সস্তা ক’টা আসবাব, বাসনপত্র।
ডিক্রুক চেয়ারে বসে ছিল। জ্যাককে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, “আরে, জ্যাক, এসো, এসো। ইনি কে, তোমার বন্ধু বুঝি? আসুন স্যর, আসুন আসুন।”
তার খুব বড়াই, খনি তাকে মারতে পারেনি, পারবেও না। তার মাথায় একটা চৌকো ক্ষতচিহ্ন চকচক করছে। ঐটে তার জয়টিকা। ক্রেনের দড়ি ছিঁড়ে একবার সোজা খাঁচাটা নেমে পড়ে একশো মিটার নিচে খনির গহ্বরে। সেই একটিমাত্র লোক, যে সেই মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে ফিরেছিল, বাকি উনত্রিশজনের মধ্যে কেউ বাঁচেনি। একটা পা টেনে টেনে সে হাঁটে।
কয়লা-খাদের খুপরির কাঠের খুঁটি একবার ভেঙে পড়ে, কয়লার চাঙড় ধ্বসে তার পায়ের সামনের হাড়টা ভেঙে চার টুকরো হয়ে যায়। পাঁচদিন সে আটকে ছিল খুপরির মধ্যে। তবু মরেনি।
তার বুকের ডানদিকের অংশটা এবড়ো-খেবড়ো, উঁচুনিচু। তার মোটা ময়লা জামাটার ঐ অংশটা উঁচু হয়ে থাকে। চামড়ার তলায় সেখানে গুঁড়িয়ে আছে তিনটে পাঁজরা। একবার একটা বিস্ফোরণে একটা কয়লা-গাড়ির ওপরে সে ছিটকে পড়ে—এ তারই ফল।
মার খেতে খেতে সে মরীয়া হয়ে উঠেছে, ভয়ঙ্কর লড়াকু সে, জঙ্গি তার মেজাজ। মালিকদের চোখে চোখ রেখে সে সবচাইতে চড়া গলায় সে কথা বলে, তাই খনির সবচেয়ে বিপজ্জনক গলিঘুঁজির মধ্যে তার ডিউটি পড়ে। তবু ডরায় না সে, ওরা যত কষ্ট দেয় ওকে ওর রাগ ওদের বিরুদ্ধে ততই তেতে ওঠে।
ডিক্রুক বললেন,–মশিয়েঁ ভ্যান গক্, আপনি ঠিক আসল জায়গাটিতেই এসেছেন। আমরা যারা বরিনেজের এই মেয়ে-পুরুষ, কুলি কামিন আমরা ক্রীতদাসও নই, কারণ আমরা মানুষই নয়—আমরা স্রেফ জানোয়ার। রাত তিনটেতে আমরা খনির খোঁদলে ঢুকি, বিকেল চারটে পর্যন্ত ঐ খোঁদলেই। এই এগারো ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনির মধ্যে দুপুরে মাত্র পনের মিনিটের খাবার ছুটি। খনির ভেতরটা কয়লার মতো কালো আর চুল্লির মতো গরম। উলঙ্গ হয়ে আমরা কাজ করি—বাতাস বিষ আর কয়লাগুঁড়োতে ভরা—দম বন্ধ হয়ে আসে। সুড়ঙ্গের মধ্যে সারাদিন হামাগুড়ি দিয়ে কাটে—সোজা হয়ে দাঁড়াবার জায়গা নেই সেখানে—তাই সোজা হয়ে দাঁড়াতে ভুলে গেছি আমরা। আট বছর বয়েস থেকে এখানকার ছেলেমেয়েরা খনিতে নামতে শুরু করে, কুড়ি পেরোতে না পেরোতেই বুকের দোষ ধরে যায়, বড়জোর চল্লিশ অবধি বাঁচে। বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় তদ্দিনে—অবিশ্যি তার মধ্যে অপঘাতে মরলে তো আপদ চুকেই গেল।
কষ্টেসৃষ্টে ভাঙা পা-টাকে একদিকে সরিয়ে ডিক্রুক বললেন—আর এর বদলে আমরা কী পাই জানেন, মশিয়েঁ? এক ঘরের এই একটা খুপরি, পোড়া রুটি, কালো কফি, পচা পনির। বছরে একবার কি দুবার একটুকরো মাংস। মাইনে থেকে পঞ্চাশটা আধলা যদি কেটে নেয় তো না খেয়ে শুকিয়ে মরব, তাই দয়া করে ওটুকু আর কাটে না। অনাহারের ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জীবনটা কাটে। যে মরে সে কুকুরের মতো মরে—তার বৌ ছেলেমেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে। চল্লিশ বছর পরে এই ভবযন্ত্রণা ঘোচে—তখন ওই পাহাড়টার কোণায় দেহটার সঙ্গে সঙ্গে তার সব দু;খও মাটি চাপা পড়ে।
৪
এ এক নতুন শিক্ষা শুরু হলো ভিন্সেন্টের। এরা কয়লাখনির জাত-শ্রমিক। এরা অশিক্ষিত, অনেকে একেবারে নিরক্ষর। কিন্তু মূর্খ নয়, এদের বোধ আছে, বিবেচনা আছে, বুদ্ধি আছে। সাফ মগজ না থাকলে এ কাজ করা যায় না। জন্তুর মতো জীবন ওদের কিন্তু জন্তু নয় ওরা—ওদের প্রাণ আছে, মমতা আছে আর এখনও ওদের মধ্যে বেঁচে আছে আত্মসম্ভ্রমবোধ।
ভিন্সেন্টের ভালো লাগে এদের। সরল, সৎ, স্বভাবে নম্র, ভদ্র। বরিনেজের মাঠ-ঘাটের মরুপ্রকৃতি তাঁর ভালো লাগতে শুরু করেছে, এ রূপের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তিনি পরিচিত হচ্ছেন। কয়েকদিন পরে ভিন্সেন্ট তার প্রথম প্রার্থনা-সভার ব্যবস্থা করলেন। ডেনিসদের বেকারির পেছনে একটা খালি ছাউনি ছিল, ভিন্সেন্ট সেটাকে ভালো করে পরিষ্কার করে নিলেন, কয়েকটা বেঞ্চিও যোগাড় হয়ে গেল। দিনের শেষে যার যা শীতবস্ত্র সম্বল তাই গায়ে দিয়ে এল শ্রমিকরা তাদের স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে। দু-বগলের নিচে ঠাণ্ডা হাতদুটিকে পুরে দিয়ে শক্ত হয়ে বসে তারা মন দিয়ে দেখছিল তাদের নতুন পাদ্রিকে। বাইরে শীত, ঘর জুড়ে ছায়া-ছায়া অন্ধকার—এককোণে একটিমাত্র কেরোসিনের পুরনো লণ্ঠন।
শুরু হলো ভিন্সেন্টের ধর্মোপদেশ। তাঁর প্রতিটি শব্দ অর্থময়, প্রতিটি শব্দ ভাবগম্ভীর। অন্তর নিংড়ে ভিন্সেন্ট তাদের বলতেন—সুদিন আবার আসবে। ঈশ্বর আমাদের পরীক্ষা করেন, সেই দু;খের পরীক্ষায় আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে। এস ভাই, মাথা উঁচু কর, চোখ তুলে তাকাও, তাঁর আশীর্বাদ তোমার জন্যেও আছে। এ দুঃখরাত কেটে যাবে, তাঁর প্রসাদে নবপ্রভাত আসবে। তাঁকে নমস্কার কর, তাঁকে ধন্যবাদ জানাও।
শুরু হলো নতুন জীবন। সারা গ্রামে রোগীর অভাব নেই। সকাল হলে ভিন্সেন্ট বেরোন গ্রামের বাড়ি, বাড়ি। কাউকে দুধ, কাউকে রুটি, কাউকে মোজা, যাকে যা পারেন তাই তিনি বিলোন। তিনি তো ডাক্তার নন, তাই চিকিৎসা বিলোতে পারেন না, সেবা বিলোন। টাইফয়েডের মড়ক লাগে, ঘরে ঘরে বিকারগ্রস্ত রোগী, হতদরিদ্র শ্রমিক পরিবার চিকিৎসা কিনতে পারে না, ভিন্সেন্টের কাজ বাড়ে। সারা গ্রামে এমন একটিও বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তিনি যায়নি। সেবা নিয়ে গেছেন না হয় খাবার নিয়ে বা প্রার্থনা নিয়ে। গ্রামবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি।
বড়দিন এসে গেছে। খনির কাছে একটা পরিত্যক্ত আস্তাবলের খোঁজ পেলে তিনি। বড়সড় ঘরটা, একশো জনের মতো এঁটে যাবে। একটাও আসবাব নেই, ঠাণ্ডায় হিম হয়ে আছে ঘরটা। তবু প্রার্থনার দিনে সারা ঘরটা ভর্তি হয়ে গেল, আর একটুও জায়গা রইল না। যিশুখ্রিস্টের জন্মকাহিনি তার স্তব্ধ হয়ে শুনল, বেথেলহেমের আকাশে নতুন তারার উদয় হল। দিনে দিনে শ্রমিকদের অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে চলেছে, খ্রিষ্টের এই পূণ্য জন্মদিনে নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষদের হতাশ প্রাণে একটু আশার আলো আসুক, পরম শান্তির পথের সন্ধান পাক ওরা।
ভিন্সেন্টের কাজে খুশী হয়েছে কর্তৃপক্ষ। অত্যন্ত খুশী হলেন তিনি। তাঁর একান্ত ইচ্ছে ছিল ঈশ্বরের কাজে নিজেকে সমর্পণ করার, সেই কাজে ব্রতী হওয়ার তাঁর এই সাধনা বুঝি এতদিনে সফল হতে চলেছে।
একদিন জ্যাকেস বললেন—মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট, ছ-মাস হয়ে গেল আপনি আমাদের সঙ্গে আছেন, কিন্তু আসল বরিনেজের সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়নি এখনও। মানে আমি বলতে চাইছি, আপনি শুধু আমাদের মাটির উপরের জীবনটাই দেখেছেন, মাটির উপরে তো আমরা উঠি শুধু ঘুমোবার জন্য। আমাদের জীবনের সম্যক পরিচয় পেতে গেলে আপনাকে খনির নিচে নামতে হবে, যেখানে আমাদের কাজ।
ভিন্সেন্ট বললেন—আমি তো উৎসুক, কিন্তু কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেবে কী?
জ্যাকেস উত্তর দিল—সে জন্যে আপনাকে ভাবতে হবে না। কাল আমি মার্কাস খনিতে নামব। আপনি ভোর তিনটে নাগাদ ডেনিসদের বাড়ির সামনে অপেক্ষা করবেন, আপনাকে ডেকে নিয়ে যাব।
৫
রাত আড়াইটে নাগাদ ভিন্সেন্ট ঘুম থেকে উঠলেন। একটুকরো রুটি চিবিয়ে তিনি পৌনে তিনটের সময় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। জ্যাকেস এসে পড়লেন সময়মত। ভয়ানক বরফ পড়েছে রাতে, খনিতে যাবার রাস্তাটা ঢেকে গেছে একেবারে। বরফের ওপর দিয়ে আরও অনেক শ্রমিক চলেছে খনির দিকে, ঠাণ্ডায় বেঁকে গেছে তাদের শরীর, সস্তা পাতলা কাপড়ের তৈরি কোটে নাক অবধি ঢেকে কুঁজো হয়ে চলেছে তারা।
খনির কারখানায় প্রথম ঘরটাতে দেওয়ালে দেওয়ালে কেরোসিনের আলো ঝোলানো। প্রত্যেকটা আলোর নিচে এক-একটা সংখ্যা লেখা। শ্রমিকরা একটা একটা করে আলো তুলে নিচ্ছে। জ্যাকেস বললেন—দুর্ঘটনা ঘটলে কোন্ কোন্ লোক খনির মধ্যে আটকা পড়ে আছে তা আমরা বুঝতে পারি এই আলোগুলোর অনুপস্থিতি দেখে।
শ্রমিকদের পেছন পেছন তুষার-ছাওয়া উঠোন পেরিয়ে তাঁরা দুজন ঢুকলেন একটা চৌকো পাকা বাড়ির মধ্যে। সেখানে ক্রেন ঘুরছে, খাঁচায় করে লোক নামছে খনির মধ্যে। খাঁচাটার ছটা ভাগ, একের নিচে আরেকটা করে। প্রত্যেকটার মধ্যে একটা করে কয়লা-গাড়ি বসানো যায়। দুজন করে তাতে ভালোভাবে যেতে পারে কিন্তু আসলে পাঁচজনের গাদাগাদি। ঠিক যেন কয়লারই বস্তা।
খাঁচার ভেতরে ঢুকলেন তাঁরা। জ্যাকেস সাবধান করে দিয়ে বললেন—হাতদুটো সামনের দিকে রাখুন, মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট। পাশের দেওয়ালে একবার যদি লাগে তো হাত আর খুঁজে পাবেন না। সঙ্কেত দিতেই খাঁচা নামতে লাগল, অনভ্যস্ত ভিন্সেন্টের বুক তো শুকিয়ে কাঠ! একটু দুর্ঘটনা ঘটলেই সশরীরে পাতাল-সমাধি। চারদিকে মিশকালো অন্ধকার, মিটমিট করে জ্বলছে শুধু হাতের লন্ঠনগুলো।
জ্যাকেস বললেন—ভয় করছে? লজ্জার কিছু নেই। আমাদের সবারই এমনি ভয় করে।
ভিন্সেন্ট বললেন—আপনাদের তবু অভ্যেস আছে তো।
–অভ্যেস? খাঁচা ভেঙ্গে পড়ে মরবার ভয় অভ্যেসে যায় নাকি? তেত্রিশ বছর ধরে আমি খনিতে নামছি, আমারও আপনার মতো বুক কাঁপছে। মৃত্যুদিন পর্যন্ত এ ভয় আমাদের নিত্যসঙ্গী।
তিনশো পঞ্চাশ মিটার নামলে খনিকূপের ঠিক মাঝামাঝি নামা যায়। ততদূর নেমে খাঁচাটা একটু থামল, তারপর আবার নামতে শুরু করল। চারপাশের দেওয়াল থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে। অপরদিকে তাকিয়ে দেখলে ছোট্ট গোল মতো দেখাছে। খুব ভয় পেলেন ভিন্সেন্ট। ছশো পঞ্চাশ মিটার নামার পর খাঁচাটা আবার থামল। সেখান থেকে সুড়ঙ্গ বেয়ে প্রায় সিকি-মাইলটাক হাঁটার পরে জ্যাকেস বললেন—আসুন মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট, কিন্তু খুব সাবধান, পা যদি ফস্কান, দুজনেই মরব কিন্তু একসঙ্গে।
সামনে একটা অন্ধ গহ্বর,–যার মধ্যে একটা রোগা মানুষ কোনরকমে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। দড়ির একটা সিঁড়ি সেই গহ্বরটার গায়ে লাগানো রয়েছে। দেওয়াল বেয়ে সমানে ঝিরঝির করে জল গায়ে ঝরে পড়ছে। চটচটে শ্যাওলায় পিচ্ছিল হয়ে আছে দড়ির পা-দানিগুলো। গহ্বর যেখানে শেষ হলো সেখান থেকে আবার সুড়ঙ্গ। এত নিচু সে সুড়ঙ্গ যে মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে নাক প্রায় মাটিতে লাগিয়ে এগোতে হচ্ছিল। এপাশে ওপাশে ছোট ছোট খুপরি। কাঠের গোঁজ দিয়ে খুপরির ছাদগুলো তুলে ধরা। প্রত্যেকটা খুপরিতে পাঁচজন করে শ্রমিক। দুজনে কয়লা খুঁড়ছে গাঁইতি দিয়ে, একজন সেগুলো পেছনদিকে সরাচ্ছে, একজন কোদাল দিয়ে সেগুলো তুলছে ছোট ছোট গাড়ির মধ্যে, আর বাকি একজন গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে খুপরির বাইরে। দলে তিনজন ছেঁড়া মোটা কালো প্যান্ট পরা সমর্থ পুরুষ, একটি নেংটি পরা বালক, আর একজন মেয়ে। মেয়েটির কাজ গাড়ি ঠেলা।
খুপরির কাছ থেকে জল ঝরেই চলেছে। ঘুটঘুট্টি কালো অন্ধকার, আলো আসছে শুধু নিভু-নিভু লন্ঠনগুলো থেকে। বাতাস আসার কোন পথ নেই, জমাট-বাঁধা কয়লার কালো গুঁড়ো মেশানো কিছুটা বাতাস খোপরে খোপরে জমা হয়ে আছে। অসহ্য গরমে ঘেমে চান করে যাচ্ছে শ্রমিকরা।
ভিন্সেন্ট দেখলেন—প্রথম ক’টা খুপরিতে শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করছে, কিন্তু সুড়ঙ্গ দিয়ে যত এগোনো যায় খুপরিগুলোও তত নিচু হয়ে আসে। শেষে মাটি আর ছাদ এক হয়ে যায়, শ্রমিকরা উপুড় হয়ে শুয়ে কাজ করে। গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো গরম, ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে—প্রতিটা দমের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে কালো ধুলো, প্রতিবারের কাশির সঙ্গে বেরোচ্ছে তরল কালো ঝুল।
জ্যাকেস বললেন—এদের মজুরি জানেন? দিনে আড়াই ফ্রাঙ্ক, তাও যদি ইন্সপেক্টর এদের তোলা কয়লা পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হয় তবেই। আগে আধ ফ্রাঙ্ক বেশি পেত, মজুরি কমেছে সম্প্রতি।
একটা খুপরির মধ্যে ঢুকে জ্যাকেস ছাদের সঙ্গে ঠেকানো কাঠের খুঁটিগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন। শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—এতো দেখছি কাঠগুলো পচে গেছে একেবারে! একটা যদি ভাঙে তো গোটা ছাদটাই মাথার ওপর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। জ্যান্ত কবরে ঢোকার শখ হয়েছে বুঝি তোমাদের?
গাঁইতি হাতে এক শ্রমিক—এদের সর্দার, কুৎসিত ভাষায় গালি দিয়ে উঠল। বলল—কাঠগুলো বদলাবার পয়সা দেয় কোম্পানি? আর কাঠ যদি আমাদেরই বদলাতে হয় কয়লা তুলব কখন? একগাড়ি কম উঠলে মজুরি কাটবে না? তার থেকে ছাদ চাপা পড়েই মরি না হয়, দুটোই তো সমান।
আরও খানিকটা গভীরে নামলেন ভিন্সেন্ট। সুড়ঙ্গের মধ্যে কোনরকমে শরীরটাকে ঢুকিয়ে দেয়ালে ঘা মেরে মেরে কয়লা কেটে চলেছে শ্রমিকের দল। বাতাস আসার উপায় নেই, গরম এখানে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো। কালো কালো উলঙ্গ প্রেতমূর্তিরা অবিশ্রাম কাজ করে চলেছে, হাঁ থেকে শুকনো জিভ বেরিয়ে আসছে, চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। ঠোঁটের কোণে কোণে পাংশু রঙের গাঁজলা, মুহূর্তের জন্যেও থামা যাবে না, বরবাদ হবে মজুরি।
খনির আরও গভীরে নেমে জ্যাকেস দেখলেন গ্যাস জমে জমে আলো জ্বলছে। হাঁক পেড়ে তিনি বললেন—আলোগুলো সকাল থেকেই কি এভাবে জ্বলছে?
হ্যাঁ, তা জ্বলছে বৈকি। গ্যাসের কথা বলছ তো? ফাটবে একদিন, আমাদের ভবযন্ত্রণাও ঘুচবে সেদিন।
–গত রবিবার পাম্প হয়নি?
–হয়েছে তো। দাঁত বার করে হাসল শ্রমিকটি।–তাতেই বা কি? জমছে আবার। মিনিটে মিনিটে জমছে।
–কাল কাজ বন্ধ থাক। পাম্প করতে হবে।
সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল শ্রমিকরা।–ইয়ার্কি নাকি? ঘরে একটুকরো রুটি নেই, একদিন কাজ বন্ধ? শুকিয়ে মারতে চাও?
–ঠিক আছে, ঠিক আছে, কাজ বন্ধ কর এখন। খানা শুরু কর সব।
বীভৎসদর্শন কৃষ্ণ প্রেতের দল কাজ বন্ধ করে দেয়ালের ধারে ধারে ঠেসান দিয়ে বসল। হাতে পনের মিনিট মাত্র সময়। ঝুলি থেকে বেরোল দুটো করে কালো শুকনো রুটি আর খানিকটা করে পচা পনির। খিদের জ্বালায় হাউমাউ করে তাই খেতে লাগল ওরা—হাতের কালিঝুলি খাবারে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিল ওদের। শুকনো রুটি চিবোবার পর গলা ভিজোবার জন্যে এক ঢোক করে কালো কফি। এই কফি রুটি আর দুর্গন্ধ পনির—এরই জন্যে ওরা দিনে তেরো ঘণ্টা করে খেটে মরে এই অন্ধখনিতে।
ভিন্সেন্টের প্রায় ছ-ঘণ্টা কেটেছে এই নরকে। গরমে, পরিশ্রমে, দম-আটকানো আবহাওয়ায় তার গা বমি বমি করছে। ঝিমঝিম করছে মাথা। এই বুঝি তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ যন্ত্রণা আর তিনি আর বেশিক্ষণ সইতে পারবেন না। জ্যাকেস ফেরার কথা বলতে তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পরে ওঁরা একটা ক্রেনের নিচে পৌঁছলেন। এখান থেকে সোজা কয়লা উঠে যায়, মানুষও ওঠে।
কুয়োর মধ্যে থেকে বালতি যেমন ওঠে তেমনিভাবে উঠতে উঠতে ভিন্সেন্ট জিজ্ঞেস করলেন—বন্ধু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? এমনি খনির কাজ ছাড়া আর কি কোন কাজ নেই ওদের? কেন ওরা এ কাজ করে? অন্য কোন কাজে এরা পালাতে পারে না?
না, মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট, এ ছাড়া এখানে কোন কাজ নেই। আর এখান থেকে অন্যত্র যাবেই বা কোথায়? সে পয়সা কই? দশটা ফ্রাঙ্কও ওরা জমাতে পারে না। তাছাড়া খনিকে আমরা নেশার মতো ভালবাসি, মাটির তলার অন্ধকারের নেশা। এ আমাদের রক্তে মজ্জায় মিশে গেছে।
ক্রেন গিয়ে পৌঁছল মাটির ওপরে। হাতধোয়ার আয়নার দেখল তার সারা মুখ, সারা শরীর কুচকুচে কালো। হাতমুখ ধোয়ার মতো মন আর নেই। টলতে টলতে কোনরকমে খোলা মাঠে এসে মাটিতে বসে হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। ঈশ্বরের পৃথিবীতে এমনভাবে মানুষকে দিন গুজরান করতে হয়? না কি, এতক্ষণের অভিজ্ঞতা শুধু দুঃসহ দুঃস্বপ্ন?
তিনি চলেছিলেন শ্রমিকদের বস্তির দিকে। এক চেনা শ্রমিকের দরজায় ধাক্কা দিতে দরজা খুলে দিল একটি ছ-বছরের ছেলে। অস্থিসার দেহ, তার বাপেরই মতো তার জ্বালাধরা চোখ। আর দু-বছর যাবে না, বাপের মতো এও খনিতে নামবে।
রিনরিনে গলায় ছেলেটি বলল—মা কয়লা কুড়োতে গেছে মশিয়েঁ, আর আমি বাচ্চাদের দেখছি। আপনি একটু বসুন। মেঝের ওপর উলঙ্গ দুটি শিশু কাঠকুটো নিয়ে খেলছে। ঠাণ্ডায় নীল হয়ে গেছে তাদের দেহ। বড় ছেলেটি ঘর গরম করার ব্যর্থ চেষ্টায় উনুনে কয়লার ধুলো ফেলছে। ভিন্সেন্ট তাড়াতাড়ি ছেলেদুটিকে বিছানায় শুইয়ে দিল। ছেঁড়া কাঁথায় তাদের ঢেকে দিল। এই মর্মান্তিক দুর্গতির পরিবেশে তিনি কেন এলেন জানেন না। হয়ত কোনরকমে বোঝাতে চান যে তিনি এদের সমব্যথী।
হাতেমুখে ঝুলিকালি মেখে ওদের মা ঘরে ঢুকল। ভিন্সেন্টের কালিমাখা মূর্তি দেখে প্রথমে ওঁকে চিনতেই পারলেন না। তারপর দৌড়ে একটু কফি নিয়ে আধো গরম জলে তা গুলে নিয়ে তাঁকে দিলেন। ভিন্সেন্ট কালিমাখা দুহাত বাড়িয়ে তাঁর হাত থেকে নোংরা ঠাণ্ডা কফির পাত্রটা নিলেন।
ওদের মা বললেন—ধুলো ঘেঁটে ঘেঁটে আজকাল একদানাও কয়লা মেলে না, জানেন। কোম্পানি এমন কেপ্পন হয়েছে যে বলার নয়। বাচ্চাদেরকে যে একটু গরম কাপড় কিনে দেব সে সঙ্গতি নেই। সম্বল তো এই চট, চট গায়ে দিয়ে দিয়ে বাচ্চাগুলোর বুকে পিঠে ফোস্কা পড়ে গেল।
ঠেলে-আসা অশ্রুকে প্রাণপণে গোপন করলেন ভিন্সেন্ট, মুখে কোন কথা যোগাল না ওঁর। আজ এই প্রথম ওঁর মনে সংশয় জাগল—এই নারী তার সন্তানকে বুকে নিয়ে যদি শীতে জমে মারা যায় ধর্মের বাণী প্রচারের কী মূল্য তাহলে? ঈশ্বরের দৃষ্টি কি এদের ওপরে পড়ে না?
পকেটে যে ক’টা টাকা ছিল সব তিনি তুলে দিলেন মহিলার হাতে। ওদের জন্য কিছু ড্রয়ার কিনে দিয়ো।
অর্থহীন,–অর্থহীন এ হৃদয়াবেগ। তিনি জানেন সারা বরিনেজে শত শত শিশু এমনি শীতে কুঁকড়ে মরছে—তাদের ক’জনকে তিনি সাহায্য করতে পারেন? ড্রয়ার ক’টা ছিঁড়ে গেলে আবার এরা শীতে কাঁপবে।
ডেনিসদের বাড়ি ফিরে এলেন ভিন্সেন্ট। বরিনেজে এসে তিনি একজনের সুপারিশে ডেনিসদের বাড়িতে থাকতেন। ডেনিসরা সম্পন্ন গৃহস্থ। রান্নাঘর জুড়ে আরামদায়ক উষ্ণতা। মাদাম ডেনিস তাড়াতাড়ি করে হাতমুখ ধোয়ার জন্য জল গরম করে দিলেন, টেবিল সাজিয়ে খেতে দিলেন মাংসের গরম ঝোল। মানুষটা বড় ক্লান্ত হয়ে ফিরেছেন—তাই রুটিতে মাখিয়ে দিলেন মাখনের পুরু প্রলেপ।
দোতলায় নিজের ঘরে গেলেন ভিন্সেন্ট। খাটজোড়া নরম বিছানা, উৎকৃষ্ট খাদ্যে ভরাপেটের আরাম। দেয়ালে দেয়ালে নামী শিল্পীদের আঁকা ছবির প্রিন্ট। ঝকঝকে দেয়াল-আলমারিটা খুললেন ভিন্সেন্ট। প্যান্ট, কোট, শার্ট, সারে সারে সাজানো রয়েছে সব। আলনাতেও পোশাক ঝুলছে—এমনকি একটা ওভারকোটও ঝুলছে সেখানে। নিচের তাকে সাজানো রয়েছে অতিরিক্ত দু-জোড়া জুতো।
মিথ্যাচার করে এসেছেন তিনি এতদিন। নিতান্ত কাপুরুষের মতো মিথ্যাচার। হতভাগ্য খনির এই শ্রমিকদের কাছে তিনি প্রচার করেছেন দারিদ্রের ধর্ম—বলেছেন দারিদ্রকে ভূষণ কর—আর নিজে থেকেছেন তোফা আরামে। নিষ্প্রাণ অর্থহীন ফাঁকা বুলি আওড়ানো—এই বুঝি তাঁর পেশা? ক্লীব পলায়নী প্রবৃত্তি—এই বুঝি তাঁর ধর্ম?
শ্রমিকরা এতদিন তাঁকে সহ্য করেছে কী করে? দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়নি কেন? এক মিথ্যা আত্মপ্রসাদে তিনি ফুলে আছেন—শুধু ফাঁকি—ভালো পোশাক পরা, শ্রমিকরা সাতদিনে যে খেতে পায় না এক বেলায় তা উদরস্থ করা, নরম বিছানায় আয়েসে ঘুমোনো, আর মাঝে মাঝে ভালো মানুষের মুখোশ পরে লোকের মাঝে দাঁড়িয়ে ধর্মের ফুটো ঢাক বাজানো। ছি ছি ছি। আলমারি থেকে সমস্ত জামাকাপড় নিয়ে সে একটা থলির মধ্যে পুরলেন। আলনার জামা জুতো, বইপত্র, দেয়ালের ছবি, সব সে জড়ো করে একটা বাণ্ডিল বাঁধলেন। তারপর দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
উতরাইয়ের ধারে একটা পচা নালা। তারপর আবার একটা খাড়াই। মাঝখানে পাইন বন। বনের এখানে ওখানে কয়েকটা ইতস্তত শ্রমিক-কুটির। একটু খোঁজ করে ভিন্সেন্ট একটা খালি কুটির পেলেন। জরাজীর্ণ কাঠের ঘর, ছাদটা ঝুলে পড়েছে, দেয়ালের তক্তাগুলো এখানে-ওখানে ফাঁক হয়ে আছে। কাঁচা মাটির মেঝে, ভাঙা দরজা, জানলার বালাই নেই।
যে মহিলাটি তাঁকে নিয়ে ঘরটা দেখাতে এসেছিলেন তাঁর কাছ থেকে ভিন্সেন্ট জানলেন ঘরটির মালিক ওয়াম্সের একজন লোক।
ভাড়া কত?—শুধোলেন ভিন্সেন্ট।
–মাসে পাঁচ ফ্রাংক।
–ঠিক আছে। এ ঘরটা আমি নেব।
–কিন্তু মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট, এঘরে তো আপনি থাকতে পারবেন না।
–কেন?
–এ তো একটা যাচ্ছেতাই ঘর। এ ঘর কি কেউ নেয়?
–এ ঘরই আমার পছন্দ। এ আমার ঘর।
ভিন্সেন্ট ফিরে গেলেন ডেনিসদের বাড়িতে, জিনিসপত্রগুলো নিয়ে আসতে।
অবাক হয়ে মাদাম ডেনিস শুধোলেন—এ কী, মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট , চলে যাচ্ছেন যে! বাড়ি থেকে কোন দুঃসংবাদ এল নাকি?
–না, মাদাম, চলে যাচ্ছি না, আমি বরিনেজেই থাকব।
সব কথা শুনে মাদাম ডেনিস বললেন—আমার কথা বিশ্বাস করুন মশিয়েঁ ভিন্সেন্ট, ওভাবে আপনি থাকতে পারবেন না। যা অভ্যেস নেই তা করতে যাবেন না। বরিনেজের সব লোক আপনাকে বিশ্বাস করে, তারা জানে আপনার মধ্যে কোন মিথ্যে নেই।
ভিন্সেন্ট তাঁর মত বদলালেন না। ওই জীর্ণ ঘরটা ভাড়া নিয়ে ওখানেই উঠে গেলেন।
আগামী পর্বে সমাপ্য
তথ্য সূত্র:
- Lust For Life – By–Irving Stone
- জীবন পিয়াসা – লেখক–নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
