‘সায়ানাইড মল্লিকা’

সায়ানাইড মল্লিকা

আপনি যখন ভিড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন কিংবা সন্ধের পরে অন্ধকার নিঝুম গলি দিয়ে কাজ থেকে বাড়ি ফিরছে। আপনার আশেপাশে তখন কিছু নিরীহ মানুষজন দেখতে পেলেন। তাদের মধ্যে হঠাৎ একজন আপনার পিছু নিয়েছে। সে হয়তো সিরিয়াল কিলার! তখন আপনি কী করবেন? আসুন, আজ তবে জানার চেষ্টা করি এমনই এক সিরিয়াল কিলিংয়ের গায়ে কাঁটা দেওয়া সত্যি ঘটনা।

এখন ক্রাইম থ্রিলার আর ওয়েব সিরিজ দেখে আপনারাও সিরিয়াল কিলারের ব্যাপারটা জেনেই গেছেন। এরকমই অনেক বিখ্যাত সিরিয়াল কিলার আছে যারা কালেভদ্রে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্কের ঘন অন্ধকার সৃষ্টি করেছিল। আজ সেরকমই একজন ভারতীয় সিরিয়াল কিলারের ব্যাপারে জানাব আপনাদের। তার ওপর সে আবার মহিলা। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, একজন মহিলা সিরিয়াল কিলার! মনে হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে একজন মহিলা কীভাবে সিরিয়াল কিলার হয়ে পারে? উত্তরে বলি, মহিলা বলে কি কেউ অপরাধী বা সিরিয়াল কিলার হতে পারে না? এ কেমন পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা? হ্যাঁ! একজন মহিলা সিরিয়াল কিলারের কথাই বলব আজ…   

ভারতের প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার

কেডি কেম্পাম্মা। নামটা অচেনা লাগছে তো? হ্যাঁ! এটি একটি দক্ষিণী নাম। কিন্তু, ওকে সবাই চেনে ‘সায়ানাইড মল্লিকা’ নামে। মনে আবারও প্রশ্ন আসতেই পারে, এরকম অদ্ভুত নাম কেন? সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

সায়ানাইড মল্লিকার জন্ম ১৯৭০ সালে, কর্নাটকের কাগাল্লিপুরা অঞ্চলে। তার পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে সে খুব গরিব পরিবারে জন্ম নিয়েছিল এবং তার বাবা দিন মজুরের কাজ করতেন। পরবর্তীকালে তার অপরাধমূলক কাজকর্মের জন্য পরিবারের সকলেই তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। কেডি কেম্পাম্মা ছোট থেকেই নিজের দারিদ্র্য নিয়ে ক্ষুণ্ণ ছিল এবং ধনী মানুষদের মন থেকে ঘৃণা করত। সে বরাবর চেয়েছিল যার সঙ্গে তার বিয়ে হবে সে যেন অন্তত ধনী হয়। কিন্তু, তার এই স্বপ্নও পূরণ হল না। কারণ তার কৈশোরবেলা শেষ হয়ে না হতেই তার বিয়ে হল এক দর্জির সঙ্গে, যিনি কেম্পাম্মার স্বপ্ন পূরণ করতে অপারগ ছিলেন।

বিয়ের পরে কেম্পাম্মা তিন সন্তানের জন্ম দিল। স্বাভাবিকভাবেই তার স্বামীর একার রোজগারে দিন চালানো অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে কেম্পাম্মাকেও ছোটোখাটো কাজ করতে হত। এই কাজগুলো সে করত শহরের আশেপাশের কলোনিতে, বিশেষ করে যেখানে শহরের বেশিরভাগ ধনীরা বসবাস করত। এই সব জায়গায় কাজ করতে করতে কেম্পাম্মা তাদের জীবনযাত্রাকে অনুভব করতে শুরু করে। কেম্পাম্মা যে সব বাড়িতে কাজ নিয়েছিল সেখানে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে প্রচুর টাকা পয়সা এবং সোনার গহনা থাকত। এইসব দেখে তার মাথায় চুরি করার বুদ্ধি এল! সে ভাবল যদি প্রত্যেকটা পরিবার থেকে একটু একটু সোনার গয়না চুরি করে তাহলে মালিকেরা ধরতে পারবে না। কারণ তাদের সম্পত্তির পরিমাণ অনেক। ভাবামাত্রই কেম্পাম্মা এই বুদ্ধিটা কাজে লাগিয়ে, প্রত্যেক পরিবার থেকে অল্প অল্প সোনার জিনিস চুরি করতে শুরু করল। 

প্রথমে তার সোনার বাজারদর সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। তাই প্রথমবার সোনা বিক্রি করার পরে টাকার পরিমাণ দেখে সে অবাক হয়ে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে সে নিজের ছোটবেলার স্বপ্নপূরণ হবার রাস্তা দেখতে পাচ্ছিল। কেম্পাম্মা কিন্তু চুরির একটা টাকাও অপচয় করেনি, উল্টে এই টাকা দিয়ে সে নিজের স্বামীর সঙ্গে খুলে ফেলল একটা চিট ফান্ডের ব্যবসা। যেহেতু তার স্বামী এলাকার অনেককেই চিনতেন, তাই ভালোভাবেই জানতেন কারা কারা তাদের ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। এরপর হলও সেটাই! তাঁর স্বামীর কথা শুনে অনেকেই এই চিটফান্ডে নিজের টাকা ঢেলেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে কেম্পাম্মা তাদের ফান্ডের সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। এদিকে যারা তাদের কোম্পানিতে টাকা ঢেলেছিল, তারা তাদের টাকা ফেরত চাইতে শুরু করল! যার কারণে একদিন একটা নির্দিষ্ট বাড়ি থেকে সে অনেকটা পরিমাণ সোনা একসঙ্গে চুরি করে ফেলে এবং সেই বাড়ির মালিকের নজরে ব্যাপারটা চলে আসে। তিনি পুলিশে খবর দেন এবং চুরির কিছুদিন পরে সোনা বিক্রি করার সময় কেম্পাম্মা হাতে-নাতে ধরা পড়ে। এরপরে তাকে শাস্তিস্বরূপ ছমাস জেলে কাটাতে হয়।

কিছু নিউজ আর্টিকেলের খবর অনুযায়ী কেম্পাম্মা ওই ঘরের বাধা দূর করার জন্য ঘরে লক্ষ্মীপূজা করানোর উপদেশ দেয় সেই বাড়ির মালিককে এবং সমস্ত গহনা একটা ঘরেই রাখতে বলে। কিন্তু মালিকের অনুপস্থিতিতে যখন কেম্পাম্মা চুরি করছিল, তখনই সে হাতে-নাতে ধরা পড়ে। এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে সেটা জানা যায়নি। এরপরে ছমাস জেলে কাটানোর পর যখন সে নিজের বাড়ি ফিরে যায় তখন জানতে পারে যে পুরো এলাকাতে তার চিটফান্ড এবং চুরির ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়েছে। জেল থেকে আসার পরে, কেম্পাম্মার স্বামী তাঁকে বাড়ি থেকে বার করে দেন। একাধিক ঘটনা পরপর ঘটে যাবার পরেও কেম্পাম্মা অদ্ভুত রকমের শান্ত ছিল। যেন এসব ঘটনা তার জীবনে কোনোই প্রভাবই ফেলেনি। এরপরে এখান থেকেই শুরু হয় তার আসল অপরাধের কর্মকাণ্ড…  

আগের ঘটনা অনুযায়ী আমরা ২০০১ সালের কথা জানতে পারি। কিন্তু আমাদের আরেকটু পিছিয়ে যেতে হবে ১৯৯৯ সালে! ১৯ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে কর্ণাটকের হোসকোট নামক এক জায়গায় মমতা রাজন নামের এক মহিলা থাকতেন। তাঁর দৈনন্দিন জীবনে নানা রকমের সমস্যা চলছিল। তাই তিনি পুজো করতে আসতেন নিজের গ্রামের মন্দিরে। সন্ধের দিকে যখন মন্দিরে ভিড় কম থাকত, তখন তিনি হামেশাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে একাই পুজো করতেন। তাঁর এই প্রতিদিনকার পূজাপাঠ নজরে পড়ে কেম্পাম্মার। একদিন যখন মন্দিরে কেউ ছিল না, তখন কেম্পাম্মা মন্দিরের সিঁড়িতেই মমতাকে খুন করে। এই সবটাই করেন মমতার গলায় ঝুলতে থাকা সোনার মঙ্গলসূত্রের জন্য। খুন করার পরে কেম্পাম্মা ওই মঙ্গলসূত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। যেহেতু তার এবং মমতার মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল না, তাই সেই যাত্রায় সে বেঁচে যায়। পরবর্তীকালে পাওয়া রেকর্ড হিসেবে এটাই ছিল তার প্রথম খুন। আবারও ফিরে আসা যাক ২০০১ সালে, যখন কেম্পাম্মাকে তাঁর স্বামী বাড়ি থেকে বার করে দেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরে কেম্পাম্মা নিজের শহর ছেড়ে দেয় এবং আবারও ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করে। 

কেম্পাম্মা এরপরে কাজ করার জন্য যোগ দেয় একটি সোনার দোকানে। যেখানে সে দুটো জিনিসের ব্যাপারে জানতে পারে—প্রতিদিনকার বাজারদর অনুযায়ী সোনার আসল দাম এবং এমন একটা রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, যা সোনা গলাতে ব্যবহার করা হয় এবং যার অতিরিক্ত সেবনে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেটি ছিল সোডিয়াম সায়ানাইড। সায়ানাইডের ব্যাপারে জানার পরে কেম্পাম্মা আরেকটা জিনিস লক্ষ করেছিল। ওই সব অঞ্চলে বিশেষ করে ধনী পরিবারের মানুষজন সমস্যায় পড়লেই ভগবানের কাছে ছুটে আসে। পরবর্তী সময়ে কেম্পাম্মা এই ব্যাপারটার ফায়দা তুলতে চেয়েছিল। এই করতে গিয়ে কেম্পাম্মা প্রায় দুমাসে, আগেরটা নিয়ে মোট পাঁচজন মহিলাকে খুন করে। ইতিমধ্যেই আপনারা জেনে ফেলেছেন যে ১৯৯৯ সালে কেম্পাম্মার প্রথম শিকারের নাম ছিল মমতা রাজন, যাকে মন্দিরের সিঁড়িতে খুন করা হয়েছিল। 

কেম্পাম্মার দ্বিতীয় শিকার ছিল এলিজাবেথ, যাঁর বয়স ৫২ বছর। এলিজাবেথ সাতানূরে থাকতেন। এলিজাবেথের কাছে নাতনিই ছিল তাঁর দুনিয়া। কিন্তু আচমকা একদিন তাঁর নাতনি ঘর থেকে গায়েব হয়ে যায়। পুলিশ অনেক খোঁজ করেও তাঁর নাতনির খোঁজ পাচ্ছিল না। এরপর আর উপায় না দেখে এলিজাবেথ চার্চের পাশাপাশি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করার জন্য মন্দিরে গেলেন। সেখানে কেম্পাম্মারও নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কেম্পাম্মা এলিজাবেথকে লক্ষ করে। এরপরে চালাকি করে এলিজাবেথের সঙ্গে আলাপ করে তাঁর বিশ্বাস অর্জন করার জন্য তাঁর সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট সবই মন দিয়ে শোনে। তারপরে এলিজাবেথকে বলে যে সে কিছু রীতিনীতি এবং পূজার্চনা জানে, যা করলে ভগবান সন্তুষ্ট হবেন এবং তাঁর নাতনিও তাঁর কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র অবশ্যই দরকার। তার প্রথম শর্ত ছিল, এলিজাবেথকে সেই অবস্থায় আসতে হবে যেমনটা তিনি নিজের বিয়ের দিনে সেজে এসেছিলেন। দ্বিতীয় শর্ত ছিল, তাঁকে ভগবানের জন্য নিজের হাতে খাবার বানিয়ে আনতে হবে। তৃতীয় এবং শেষ শর্ত ছিল যে তিনি সকাল থেকে পুজো না হওয়া পর্যন্ত জলও খেতে পারবেন না এবং এই উপোস তখনই ভাঙবে, যখন কেম্পাম্মা নিজের হাতে তাঁকে জল পান করাবে।

এতক্ষণে হয়তো আপনারা বুঝেই গেছেন কেম্পাম্মার আসল মতলব। সে আসলে সেই সব মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিল, যাঁরা সত্যি সত্যি কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁদের কাছে তখন কেম্পাম্মা একজন দেবদূতের মতোই। আর কেম্পাম্মার সবাইকে বিয়ের সাজে আসতে বলার কারণও এটাই ছিল—বিয়ের দিনেই মেয়েরা সবথেকে বেশি গয়না পরে। এর পাশাপাশি খালি পেটে থাকতে বলার কারণ হল, যাতে কেম্পাম্মার দেওয়া জল সরাসরি শরীরে মিশে যায়, যেটাতে আগে থেকেই মেশানো থাকবে সায়ানাইড!

কেম্পাম্মার কথা অনুযায়ী এলিজাবেথ খালি পেটে, হাতে তৈরি খাবার নিয়ে বিয়ের সাজে পৌঁছে গেলেন তার বলে দেওয়া ঠিকানায়। এলিজাবেথ পৌঁছানোর পরে কেম্পাম্মা পুজোর নাটক করল এবং এলিজাবেথের উপোস ভঙ্গ করার জন্য তাঁকে নিজের হাতে সায়ানাইড মেশানো জল ‘চরণামৃত’ বলে খাওয়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এলিজাবেথ সায়ানাইডের বিষক্রিয়ার মারা গেলেন! কেম্পাম্মা তারপর এলিজাবেথের সমস্ত গয়না চুরি করে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।

কেম্পাম্মার তৃতীয় শিকার ছিল যশোদাম্মা, যাঁর বয়স ছিল ৬০ বছর। যাঁর মৃত্যু হয় ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে, সন্ধ্যার সময় কর্ণাটকের সিদ্ধাগঙ্গা মঠ কিয়াতা নামক একটি জায়গায়। যশোদাম্মার অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগ ছিল। তাই তিনিও নিয়মিত মন্দিরে যেতেন নিজের সুস্থতার জন্য। কেম্পাম্মার সঙ্গে তাঁরও পরিচয় হয় মন্দিরে। সেখানে কেম্পাম্মা যশোদাম্মাকেও তার রীতিনীতির ব্যাপারে বলে এবং এলিজাবেথের মতোই একইভাবে যশোদাম্মাও কেম্পাম্মার কথার জালে জড়িয়ে পড়েন। কারণ কেম্পাম্মা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল যে সে তাঁর হাঁপানি রোগ ঠিক করে দেবে। আর এলিজাবেথের মতোই যশোদাম্মাও ঠিক একইভাবে বলি হন কেম্পাম্মার হাতে। 

এরপর কেম্পাম্মার সঙ্গে পরিচয় হয় বছর ষাটের মুনিআম্মার, যাঁর শখ ছিল ভজন গাওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ সময় শরীর খারাপ থাকার কারণে তিনি ঠিক করে চলতে পর্যন্ত পারতেন না। মুনিআম্মা প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়ায় ছিলেন, যখন তাঁর পরিচয় হয় কেম্পাম্মার সঙ্গে এবং তাঁর পরিণতিও বাকিদের মতোই হয়। কেম্পাম্মা ছিল খুবই চালাক মহিলা। সে কখনোই নির্দিষ্ট একটা জায়গায় থাকত না। সে জানত কখন কোথা থেকে কোথায় পালাতে হবে, কখন নাম পরিবর্তন করতে হবে। একেকটা খুনের পর কেম্পাম্মা বুদ্ধি করে নিজের নাম ও ঠিকানা বদলে নিত। ফলে পুলিশ যখন তাকে খুঁজত, ততক্ষণে সে নাম পরিবর্তন করে অন্য শহরে চলে গেছে। 

কেম্পাম্মার পঞ্চম শিকার ছিল নাগাভেনি নামের এক গৃহবধূ, যাঁর বয়স ছিল মাত্র তিরিশ বছর। নাগাভেনি বিয়ের পরে অনেক বছর ধরে সন্তানের জন্মের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও কিছু হচ্ছিল না। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর পরিচয় হয় কেম্পাম্মার সঙ্গে। সে তাঁকেও একইভাবে বলে, তার রীতিনীতি অনুসরণ করলে শুধু সন্তানই নয়, নিশ্চিতভাবে পুত্রসন্তানই জন্ম নেবে। এরপরে নাগাভেনিও বাকিদের মতো একইভাবে কেম্পাম্মার লোভের শিকার হন। এতগুলো খুনের পর কেম্পাম্মার হাতে প্রচুর পরিমাণে সোনা ও টাকা চলে আসে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে সে কখনোই ধরা পড়েনি। কারণ সে আগের মতোই এবারেও নিয়মিত নিজের নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করছিল। 

অপরাধী যতই চালাক হোক না কেন, ক্রিমিনাল সাইকোলজি বলে সে কখনও না কখনও ভুল করবেই। ঠিক তেমনই ২০০৬ সালে কেম্পাম্মার একটা ভুল হয়েছিল, যা পুলিশকে কেম্পাম্মার কাছে নিয়ে আসে। কর্ণাটকের কোলার জেলার, ২২ বছর বয়সী এক তরুণী রেণুকা নিজের বাড়িতে একাই থাকতেন। তাঁর স্বামী দুবাইয়ে থাকতেন ব্যবসার কাজে, তিনি মাঝেমধ্যে দেশে ফিরতেন। রেণুকার সেখানে একা থাকতে ভালো লাগত না, তাই তিনি নিজের বোন মানির কাছে থাকতেন। দুর্ভাগ্যবশত মানি আর কেম্পাম্মা একে অপরকে চিনত। কেম্পাম্মা লোকের সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলার জন্য ছোটখাটো কাজ করত। তেমনই এক জায়গায় কাজ করতে করতে তার পরিচয় হয় মানির সঙ্গে। ওদিকে ধীরে ধীরে কেম্পাম্মা ও মানি একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। কেম্পাম্মা মাঝেমধ্যেই মানির বাড়ি যেত, যেখানে তার পরিচয় হয় রেণুকার সঙ্গে। কেম্পাম্মা জানতে পারে রেণুকার সদ্য বিয়ে হয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নার্ভাস থাকতেন। রেণুকা চাইতেন তাঁর প্রথম সন্তান যেন পুত্রসন্তান হয়। ব্যস! কেম্পাম্মা এরকমই একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। রেণুকাকেও একই রীতিনীতির জালে জড়িয়ে তার ষষ্ঠ খুনটা করে সে। ৭ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে যখন রেণুকা তাঁর সমস্ত গয়নাসহ নিখোঁজ হন, তখন তাঁর মায়ের প্রথম সন্দেহ হয় কেম্পাম্মার ওপরে এবং তিনি থানায় অভিযোগ জানান। ৯ ডিসেম্বর রেণুকার স্বামী দেশে ফিরে আসার পরে থানায় আরেকটি এফআইআর দায়ের করেন। পুলিশ বেশ কয়েকদিন খোঁজার পরে রেণুকার মৃতদেহ উদ্ধার করে।

রেণুকার হত্যার খবর যখন কর্ণাটকের বিভিন্ন খবরের কাগজে এবং টিভিতে প্রচারিত হয়, তখন সেই হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি দেখে বাকি মৃতদের পরিবারের সদস্যরাও সামনে এসে একই অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁরা সবাই প্রায় একই রকম মহিলার তথ্য দিচ্ছিলেন, যার শুধু নামটাই আলাদা ছিল। কিন্তু চেহারা ও অন্যান্য বিবরণ সম্পূর্ণ মিলে যাচ্ছিল। তবে তদন্ত বেশ ভালোভাবে শুরু হলেও কেম্পাম্মাকে প্রথমে ট্র্যাক করা বেশ মুশকিল হচ্ছিল। এরপরে যাঁরা খুন হয়েছিলেন, তাঁদের ছবির সঙ্গে চুরি যাওয়া গয়নার ছবিও পুলিশ টিভিতে ও খবরের কাগজে দিতে শুরু করে, যদি কেম্পাম্মার কোনো সূত্র পাওয়া যায়। পুলিশের ভাবনা মতোই, রেণুকার সেই চুরি যাওয়া গয়নাগুলোই শেষে প্রধান সূত্র হয়ে দাঁড়ায় কেম্পাম্মার অ্যারেস্ট হওয়ার পেছনে।

৩১ ডিসেম্বর ২০০৮। কেম্পাম্মা শেষবার গায়েব হওয়ার প্রায় দুবছর পরে জয়ম্মা নামের এক মহিলার খবর পায় পুলিশ। ওই মহিলা নাকি কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দোকানে বেশ অনেক পরিমাণে সোনা বিক্রি করছিল। একদিন কেম্পাম্মা সোনা বিক্রি করার সময় যখন একটি দোকানে যায়, তখন দোকানের মালিক লক্ষ করলেন যে এই একই রকম দেখতে গয়না তিনি খবরের কাগজে বা টিভিতে কোথাও একটা দেখেছিলেন। সোনার দোকানের মালিক ব্যাপারটা গোলমেলে দেখে সোনা কিনতে মানা করে দেন। তারপরে পুলিশকে ওই সোনার বিবরণ এবং মহিলার ব্যাপারেও জানিয়ে দেন।

জয়ম্মাও হয়তো কিছু আঁচ করতে পেরেছিল, তাই সেও বাকি সব সোনা অন্যত্র বিক্রি করে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল পালানোর জন্য এবং ঠিক ওই সময়েই পুলিশ তাকে ওখান থেকেই গ্রেফতার করে। এই জয়ম্মা আর অন্য কেউ না, সে ছিল ভারতের প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার কেম্পাম্মা। কেম্পাম্মার কাছে পুলিশের প্রথম প্রশ্ন ছিল যে সে আদৌ এসব খুন করেছে কি না। পুলিশকে অবাক করে বরফশীতল গলায় কেম্পাম্মা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সব খুনের দোষ স্বীকার করে। পুলিশ যখন তাকে এসব খুনের কারণ জিজ্ঞাসা করে, সে তখন বলে যে সে শুধু চুরি করতে চেয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সে তাঁদের অজ্ঞান না করে মারল কেন, তার উত্তরে সে বলে যে সে চেয়েছিল যাতে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ না খোলে, তাই সে সবাইকে খুন করেছিল। শেষ প্রশ্ন ছিল যে সে কতজনকে এইভাবে খুন করেছে? কেম্পাম্মা পরিষ্কারভাবে এর কোনো উত্তর দিতে পারেনি। যেহেতু পুলিশে এফআইআর হওয়ার পরে প্রায় দুবছর পর কেম্পাম্মা ধরা পড়েছিল, তাই পুলিশ অনুমান করে প্রায় ২২ জনকে কেম্পাম্মা খুন করেছিল। কারণ শেষ দুবছরেও অনেক মহিলা ঠিক একই কায়দায় খুন হয়েছিলেন।

এরপরে ২০১০ সালে কেম্পাম্মাকে একাধিক খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আরও দুবছর মামলা চলার পরে কেম্পাম্মাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণে কর্ণাটক কোর্টে কেম্পাম্মার নাম দেওয়া হয় “সায়ানাইড মল্লিকা।” কেম্পাম্মা শুধু কর্ণাটকেই নয়, স্বাধীন ভারতবর্ষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া প্রথম এবং একমাত্র মহিলা আসামি। কিন্তু এরপরে মানবাধিকার কমিশন এবং বিভিন্ন মহিলা সংগঠনের হস্তক্ষেপে ২০১৩ সাল থেকে আবারও মামলা শুরু হয়। অবশেষে ২০১৪ সালে কর্ণাটক কোর্ট ফাঁসির সাজা ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়।

“সায়ানাইড মল্লিকা” ওরফে কেম্পাম্মার ঘটনা আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ দারিদ্র্য আমাদের দেশের এখনও একটা বড় সমস্যা। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের সিংহভাগ মানুষের দুবেলা ঠিক করে খাবার জোটে না। পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও তথৈবচ অবস্থা! এর ফলে অপরাধীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একজন সাধারণ গরিব মানুষ—পুরুষ বা মহিলা, যেকোনো সময়ে ভুল পদক্ষেপ নিয়ে নিতেই পারে। এর ফলে আজকের দিনেও কেউ একজন কেম্পাম্মা হয়ে যেতে পারে। সে হয়তো ঘুরে বেড়াবে আমাদের সঙ্গে সমাজের আশেপাশেই। হয়তো তার পরের শিকার আপনি, আমি বা আমাদের মতো সাধারণ কোনো মানুষ।

———-

তথ্যঋণ

সংবাদ সংস্থা। (২০২২, অগাস্ট ২৪)। “Cyanide Mallika: সায়ানাইড দিয়ে পর পর খুন! ধনী হওয়ার নেশায় সাধারণ মহিলা থেকে হয়ে উঠেছিলেন সিরিয়াল কিলার।” আনন্দবাজার ডট কম। https://www.anandabazar.com/india/how-an-ordinary-woman-becomes-indias-first-woman-serial-killer-dgtl/cid/1365072

Dutta, P. K. (2017, February 17). “Cyanide Mallika: Sasikala’s Neighbour in Jail, Jayalalithaa’s Fan and India’s First Female Serial Killer.” India Today. https://www.indiatoday.in/india/story/cyanide-mallika-sasikala-jayalalithaa-bengaluru-jail-961260-2017-02-17

“KD Kempamma.” (2026, February 26). Wikipedia. https://en.wikipedia.org/wiki/KD_Kempamma.

Parashar, K. (2023, July 8). “Solving Crime: How India’s ‘First Woman Serial Killer’ Cyanide Mallika Evaded Police Eye for Nearly a Decade.” The Indian Express. https://indianexpress.com/article/cities/bangalore/solving-crime-indias-first-woman-serial-killer-cyanide-mallika-evaded-police-eye-decade-8810684/

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

জন্ম ও বাসস্থান কলকাতা। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসা এবং নিজস্ব কোম্পানিতে নিযুক্ত। বাড়িতে রয়েছে আলাদা একটি লাইব্রেরি ঘর। সংগ্রহে রয়েছে হাজারের ওপর গল্পের বই। আঁকা, লেখালেখি ও বাগান করা মূলত শখ! কবিতা, প্রেম, সামাজিক, ভৌতিক, এবং থ্রিলার গল্পের লেখক হিসাবে বিশেষ পরিচিত। সাহিত্য ও অঙ্কনের জন্য পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার। এরমধ্যে 'ম্যাজিক বুক অফ্ রেকর্ডস্ ২০২১ (ভারত),' 'বঙ্কিম সাহিত্য পুরস্কার ২০২২,' 'সন্ধ্যা রজনী পুরস্কার ২০২৩,' 'মালাধর বসু স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪,' এবং 'রেনেসাঁস সাহিত্য সন্মান (হাজারদুয়ারি সাহিত্য উৎসব, মুর্শিদাবাদ) ২০২৫' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সংবাদ পত্র, ম্যাগাজিন সহ বিভিন্ন সংকলনে লেখার পাশাপাশি এখনও অবধি প্রকাশিত হয়েছে মোট পাঁচটি বই। 'C/O কলকাতা,' 'মৃত্যুদূত,' 'ইমারত এজলাসে কোলাহল,' 'জিঘাংসী,' এবং 'রক্ততন্ত্র।’ লেখকের রচিত 'রক্ততন্ত্র,', 'দ্য ক্যাফে টেবিল' থেকে প্রকাশিত তৃতীয় বই। যেটি ভৌতিক-অলৌকিক-থ্রিলার বিষয়ে লেখা গল্প ও উপন্যাস সংকলন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *