গোধূলি

সেদিন সন্ধের সময় আমাদের পাড়ার এক স্বল্পপরিচিত ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী এসেছিলেন মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করতে। নিজেদের বাড়ীর প্রথম বিয়ে, অনেক উৎসাহ, হই হই করে অনেক কথা বললেন। ভদ্রামহিলা বললেন, “দাদা, গোধূলি লগ্নে বিয়ে, তাড়াতাড়ি চলে আসবেন।”
গোধূলি লগ্ন… গোধূলি…
ধুলোর আস্তরণের পিছন থেকে বহু পুরনো একটা ছবি মনের সামনে এসে দাঁড়ালো। আমাদের বাড়ির পাশে হরি দত্তর বাড়ির সামনের তিন চারটে সিঁড়ি বেয়ে ওদের দুটো গরু নেমে আসছে, চোদ্দ-পনেরো বছরের রাখাল ছেলেটা সামনে দাঁড়ানো, সে আরও অনেক গরুর সঙ্গে এই দুটোকেও মাইল খানেক দূরে গঙ্গার ধারে একটা মাঠে চরাতে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ষাট বছর আগের বহরমপুরের ছবি। আমাদের বাড়ির সামনে মহাকালী পাঠশালায় শুরু হবার ঘণ্টা বেজে গেল, রাস্তার ভিড় কমেছে। এই সময়ে যাদের বাড়িতে গোয়াল আছে তাদের গরু বের করে চরাতে নিয়ে যাবার কাজে দু’তিন জন রাখাল ব্যস্ত। গরুরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে কখন মনু এসে হাঁক দেবে, দরজা খুলে দেবে বাড়ির কেউ আর দত্তবাবুর দুটো গরু, ধলা আর কালো সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে যোগ দেবে চরতে যাবার মিছিলে। সেই মিছিল যত এগোয় আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে আরও গরু যোগ দেয়। মনে পড়ে একবার আমি গুনেছিলাম প্রায় একশ গরু মাঠে চরছিল। না, গরুর সংখ্যা গুণতে আমি যাইনি। পাশের মাঠে আমরা খেলতাম, একদিন কয়েকজন বন্ধু এই নম্বরটা খেয়াল করেছিলাম।
আমাদের বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তাটা পাড়া পার হয়ে, নতুন বাজারের মাঝখান দিয়ে রাধারঘাট হয়ে মাঠের দিকে যায়। বাজারের কাছে খুব ভিড় থাকে আর রাস্তা জুড়ে চলে গোরুর মিছিল ওই রাস্তা দিয়েই – বাজারের মাঝখান দিয়ে। কিন্তু কোনো গোলমাল নেই, যথেষ্ট ধৈর্য্য সহকারে লোকেরা সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দেয়। গরুরাও কোনোদিন অসভ্যতা করেছে বলে শুনিনি। রাস্তায় যাবার পথে যদি কলাটা মুলোটা পায় খায়, কিন্তু বাজারে আশেপাশে অনেক লোভনীয় বস্তু থাকা সত্বেও তারা মুখ বাড়িয়েছে বলে জানা নেই।
মাঠে পৌঁছে তারা ঘুরে বেড়ায়, ঘাস পাতা খায়, গঙ্গার ধারে গিয়ে জল খায়, গরমকালে একটা ছায়া খুঁজে গোল হয়ে শুয়ে জাবর কাটে, আর একটু দূরে রাখালরা বসে নজর রাখে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার পালা। রাস্তার কেরোসিনের আলো জ্বলে ওঠার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। ফেরার সময় রাখালদের তাড়নায় গরুগুলো তাড়াহুড়ো করে। ফলে আমাদের সামনের কাঁচা রাস্তা ধুলোয় ধূসরিত হয়ে ওঠে। সন্ধের মুখে, অন্ধকার হয়ে যাবার আগে ধুলোয় আচ্ছন্ন আকাশই গোধূলি বলে পরিচিত।
“দাদা, আমরা এবার উঠি। আপনারা কিন্তু নিশ্চয় করে আসবেন।”
সম্বিত ফিরে পেলাম। অল্প সময়ের জন্য কোথায় হারিয়ে গেছিলাম জানি না। আজ খুব কম লোকই পাওয়া যাবে যারা গোধূলি প্রত্যক্ষ করেছে। এখন শহরের কারো বাড়িতেই গরু থাকে না। তাই রাখালদের গরু চরাতে নিয়ে যাবার কোনো প্রশ্নও নেই। গোধূলি বেঁচে রইল বিয়ের লগ্নেই।
নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যার মুখে সেজেগুজে বিয়েবাড়িতে গেছিলাম। ও মা, সব ভোঁ ভাঁ। কেউ কোথাও নেই। শুধু দু’জন ইলেকট্রিকের লোক একটা মই নিয়ে গেটের বাল্ব পালটাচ্ছে।
বিয়ে শুরু হতে সেই রাত সাড়ে আটটা। পুরোহিত ছিল আমার পরিচত হারু পণ্ডিত। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই কি আপনাদের গোধূলি লগ্ন হল?”
হারু পণ্ডিত দাড়ি নেড়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বললেন, “আজ সূর্যাস্ত ছিল পাঁচটা বাইশ মিনিট তের সেকেণ্ডে। ওই এক সেকেণ্ডে কি আর বিয়ে হয় বাবা? পাঁজিতে একটা রেঞ্জ দেওয়া থাকে, আজ আটটা পঞ্চাশ মিনিট পর্যন্ত লগ্ন আছে। তার মধ্যে বিয়ে শুরু হলেই সব নিয়ম রক্ষা।”
ব্যাস, গোধূলি বিদায় নিল বিয়ের লগ্ন থেকেও।
———-
ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
