চুইখিমের গল্পকথা

চুইখিমের গল্পকথা

নীল খামের মধ্যে রাখা থাকে ভ্রমণের রসদভরা ছোটো ছোটো চিরকুট। তাদের মধ্যে সব সফরনামার গল্প লেখা হয় না। কোনো এক অলীক মুহূর্তে অতীতচারী হয় মন আর হঠাৎ করেই সাদা পাতার কালো অক্ষরে লেখা হয়ে যায় সেই ভ্রমণকথা। ছোটোবেলায় ভূগোল বইয়ের পাতায় যখন ‘হিমালয়’ শব্দটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল, তখন কি আর জানতাম সে আমাকে বারবার ঘরছাড়া করবে! পরবর্তীতে সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ পড়ার পর আমার মনের ঘর দখল নেয় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপ্রান্ত। খানিক অবসর পেলেই উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স আর কাঞ্চনজঙ্ঘার ত্র্যহস্পর্শে বারবার ছুটে গিয়েছি তাদের কাছে। সভ্যতার বিজয়কেতন যত উড়েছে, ততই পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে নাগরিক বিলাসের বহর, যার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয়ে জীবনের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে দু-দণ্ড শান্তির জন্য, অন্তরের অন্তঃস্থলে চুপটি করে বসে থাকা অচেনা ‘আমি’-টিকে চেনার জন্য, নিষ্কলুষ প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের আবরণে মুড়ে ফেলার জন্য কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন মহৌষধ পাহাড়। মনখারাপের মারণরোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবার গন্তব্য ছিল চুইখিম। নাম শুনেই টুংটাং পিয়ানোর মিষ্টি ছন্দ মেশানো সুরে হৃদয় দোলায়িত হয়, যে সুরে ঝরে পড়ে শান্তি আর স্বস্তির বিষাদহীন সিন্ধু।

কিষাণগঞ্জ পেরোনোর পর ড্রাইভার দাদার কাছ থেকে ফোনে সময়মতো নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষার আশ্বাস পাওয়ার পর নিশ্চিন্ত হয়ে স্টেশনে নামি। প্রতিবার যখন নিউ জলপাইগুড়িতে ট্রেন এসে থামে, তখন অপূর্ব এক উৎসাহ আর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়; নিঝুম স্টেশনের হঠাৎ করে সচল হওয়া দেখে মন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। স্টেশন চত্বর তখন খণ্ড খণ্ড জীবনের ক্যালাইডোস্কোপ! চারদিক থেকে ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকিতে মনে পড়ে ফেলুদার গল্পের ‘ড্যাং-ক্যাং-গ্যাং’-এর কথা। তারপর পর্যটকদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ার পর স্টেশন আবার নিস্তব্ধপুরীতে পরিণত হয়। নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠে রওনা হই গন্তব্যের দিকে। মহানন্দা অভয়ারণ্যের বুক চিরে গাড়ি ছুটে চলেছে। সেবক কালীবাড়ি পেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবারের মতো এবারও সফল সফরের জন্য মনস্কামনা জানিয়ে দিই। কালীঝোরার কাছে তিস্তা লোয়ার ড্যাম অতিক্রম করে খাড়াই পথে কিছুটা এগোতেই চলে এলাম পানবু ভিউ পয়েন্টে, যা পর্যটকমহলে পানবুদারা নামে বহুল প্রচলিত। একসময় শুধুমাত্র ভিউ পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করতে এখানেও হোমস্টে গড়ে তুলে নতুন ‘অফবিট স্পট’ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে চাইছে। পানবুর অন্যতম আকর্ষণ নিস্তব্ধ পাহাড়ের সামনে রোমান্টিক নির্জনতায় দাঁড়িয়ে রেলিংঘেরা প্যানোরামিক ভিউ, যেখান থেকে দেখা যায় ঘন অরণ্যের বিস্তারের মাঝে একফালি উপত্যকায় রুপোলি ফিতের মতো পান্না-সবুজ জলের তিস্তার আপন ছন্দের চলন। দৃষ্টি যতদূর প্রসারিত হয়, ততদূর দেখা যায় সবুজের রাজপাট। এখানে পাহাড়ের চিরন্তন প্রবাদকে সত্যি করে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন ঘটিয়ে মেঘ-রোদ্দুর-কুয়াশা-বৃষ্টি এই চার বন্ধুর পালা ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। কার সঙ্গে কখন দেখা হবে, সেটা সম্পূর্ণভাবে তাদের মর্জি, খেলার স্থায়িত্ব আর পর্যটকদের ভাগ্যের উপর নির্ভর করে।

অনন্ত নীল আকাশের সুবিশাল ক্যানভাসে রঙিন মায়াজালের বিস্তার দেখে পাহাড়জোড়া প্রদর্শনীর এক নির্বাক দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আর নিসর্গের টুকরো টুকরো দৃশ্য মনের গোপন ঝাঁপিতে যত্ন করে তুলে রাখি। ভোরের প্রথম আলো যখন দূর পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, তখন মনে হয় প্রকৃতি আপন কর্মে নিমগ্ন শিল্পী, তুলিতে নতুন দিনের ছবি আঁকছে। কুয়াশার আবরণ ভেদ করে সূর্যের সোনালি আভা বনভূমির সবুজ গায়ে এসে তার প্রতিটি পাতা, ঘাসের ডগা, শিশিরবিন্দু জীবনের এক নতুন ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। সেই অপার সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সব কোলাহল, ব্যস্ততা, হিসাব-নিকাশ মুহূর্তের জন্য অর্থহীন হয়ে যায়। দূর আকাশে ভেসে চলা মেঘের দল, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা হিমেল হাওয়ার মৃদু স্পর্শ, অরণ্যের গভীর নীরবতা—সব মিলিয়ে এক অলৌকিক অনুভূতির জন্ম হয়—প্রকৃতির এই বিশাল মহাকাব্যের ক্ষুদ্র এক চরিত্র হয়ে শুধু তার সৌন্দর্যের পাঠ নিচ্ছি। একটা নতুন  দিনের সূচনার সাক্ষী হয়ে এগিয়ে চলি। অজানা পথের বাঁকে বাঁকে জমা হতে থাকে নতুন অভিজ্ঞতার রঙ, নতুন উপলব্ধির আলো। জীবনের ক্লান্তি, হতাশা কিংবা অপূর্ণতার অন্ধকারকে পিছনে ফেলে প্রতিটি প্রভাত নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। তখন মনে হয়, যতদিন এই আকাশ থাকবে, এই পাহাড় থাকবে, এই আলো-ছায়ার খেলা থাকবে, ততদিন মানুষের স্বপ্নও বেঁচে থাকবে—নবজন্মের আশায়, নতুন পথের সন্ধানে, অনন্তের দিকে অবিরাম যাত্রায়।

গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে থাকি পাহাড়ি জীবনযাপনের চিত্র। পাইন, ধুপি গাছের ফাঁকে মেঘ-কুয়াশা-রোদ্দুর-বৃষ্টির খুনসুটি দেখতে দেখতে সামথার বাজার পার হওয়ার সময় হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে চোখ পড়তেই দেখি ঝোপের ভিতর ক্যামোফ্লেজ হয়ে আর্মিদের লক্ষ্যভেদী আগ্নেয়াস্ত্রের মতো লম্বা লেন্সওয়ালা ক্যামেরায় চোখ রেখে কেউ কেউ বসে আছেন কিছু দুর্লভ পাখির সন্ধানে। ড্রাইভার দাদা না বলে দিলে বুঝতেই পারতাম না! নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক জমা-খরচের কেজো হিসাবকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রকৃতিকে আপন করে নিতে চাইলে তারাও দোসর হয়ে তাদের সৌন্দর্য সামনে মেলে ধরে। তাই তো রঙিন প্রজাপতি, বুনোফুল এ পথে ভরে থাকে বাহারি আলপনা হয়ে। একসময় পৌঁছে গেলাম চুইখিমে। হোমস্টের মালকিনের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ-পরিচয় পর্ব শেষে নির্ধারিত ঘরে প্রবেশ করি। ছিমছাম, সাদামাটা ঘর হলেও অতিথি আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি নেই।

মাত্র ৩,৫০০ ফুট উচ্চতার রূপকথাময় এক অলীক পাহাড়ি গ্রাম চুইখিম স্বেচ্ছা-নির্বাসনের সেরা ঠিকানা। লেপচা শব্দটির অর্থ ‘বিশ্রাম স্থান’। এক দক্ষ চিত্রকরের মতোই প্রকৃতি নিপুণ হাতে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটিকে। ট্যুরিস্ট-কন্টকিত নয়, তবে এখানে আসার পথটিতে যখন নাগরিক সভ্যতার কালো দাগের পিচ পড়তে শুরু করেছে, তার নিখাদ সৌন্দর্যে অচিরেই যে থাবা বসতে শুরু করবে, তা সহজেই অনুমেয়। কয়েক বছর পরে এসে হয়তো দেখব এই নবজাতিকার নাভিশ্বাস উঠে মেটামরফোসিস অবস্থা হয়েছে! যোগ্য সঙ্গত অবাধ প্রকৃতি নিধনের রাজসূয় যজ্ঞ। চাষবাস, গবাদি পশুপালন, ছোটোখাটো দোকান পরিচালনা, ট্রেকিংপথের গাইড আর হোমস্টে গড়ে তুলে জীবিকা নির্ধারণ—এই পাঁচমিশালি কাজই এই গ্রামের লোকজনের আয়ের প্রধান উৎস। দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে সহজ-সরল মানুষগুলো আনন্দে মেতে ওঠে বুদ্ধপূর্ণিমা, দশেরা আর দীপাবলির রাতে। নিরীহ মানুষগুলো উৎসবের আলোয় রঙিন হয়ে ছাঙের নেশায় নেশাতুর হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয় এ গ্রামে লিস্ট মিলিয়ে দেখার মতো কী আছে? এককথায় উত্তর ‘কিচ্ছু নেই।’ অন্যান্য জায়গার মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার আকুতিময় ইশারা নেই, দার্জিলিং-কালিম্পং শহরের সাইকেডেলিক নিয়ন আলোর রোশনাই নেই, জমকালো মনাস্ট্রি নেই, নিদেনপক্ষে গুমটি ঘরের মতো চা-মোমো-ম্যাগির একটা দোকানও নেই। কিন্তু এত সব ‘নেই’-এর রাজত্বের মধ্যেও রয়েছে অখণ্ড শান্তি, অনাবিল নীরবতা। আর তার সঙ্গে কিছু মানুষের নির্ভেজাল, নিখাদ ভালোবাসা, আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তা যা তথাকথিত সভ্য জগতের মেকি হাসি আর মুখোশপরা মানুষগুলোর থেকে একদমই আলাদা। ভ্রমণের আরেক অর্থ যদি নিরন্তর খোঁজ হয়, তাহলে এখানে এসে এমন একটি অপ্রত্যাশিত ‘খোঁজ’-এর সন্ধান পেয়েছিলাম। স্থানীয় মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনের গল্প শোনার সময় উপরি পাওনা হিসেবে পেলাম পবিত্রা খাওয়াসের পরিচয়, যাঁর অন্য রকম চিন্তাভাবনার ফলে এই গ্রামটির পুরো অর্থনীতিই বদলে যায়। পবিত্রার গল্প শুনতে শুনতে ভাবি এ হল “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”-এর সার্থক রূপায়ণ। এক্ষেত্রে বলতে হয়, গ্রামের উন্নতি ঘটিয়ে এখানকার মানুষগুলোর খুব সাধারণভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য তিনি এক মহাযজ্ঞে শামিল হয়েছিলেন সবার প্রথম এই গ্রামে হোমস্টে গড়ে তোলার মাধ্যমে। তার সুফল বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর এক আত্মীয়র বাড়িতেই আমাদের অস্থায়ী আবাস। ছোট্ট রান্নাঘরে বসে গল্পকথায় শুনলাম পবিত্রার জীবনকাহিনি। তবে ইতিহাসের পাতায় এই স্থান আলাদা করে স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ার দাবি রাখে, কারণ বিখ্যাত প্রাচীন রেশমপথে যাত্রার সময় ব্যবসায়ীরা এই স্থানকে বিশ্রামের জন্য বেছে নিতেন। বেশ কয়েক বছর পূর্বেও এখানে ঘোড়ায় চড়ে আসতে হত। বর্তমানে বাগরাকোট থেকে সিকিমের নাথুলা পর্যন্ত সরাসরি যাওয়ার রাস্তা তৈরি হচ্ছে। সেই কারণে পথের বেশ কিছু অংশ খারাপ।

দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে বেরিয়ে পড়ি গ্রাম্যপথে। হেঁটে যেতে থাকি সবচেয়ে উঁচু স্থানে নবনির্মিত বৌদ্ধ মনাস্ট্রির দিকে। সঙ্গী কালিম্পং শহরের বোর্ডিং স্কুলে পড়া ১০ বছরের স্মার্ট রাসু। ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে এগিয়ে যাই। পাখিদের নিজস্ব স্বরলিপির নিভৃত আলাপন শুনে রাসু একের পর এক নাম জানাতে থাকে। পক্ষীবিশারদ না হওয়ায় আমার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার ‘বেওকুফি’ দেখে রাসু হেসে প্রায় লুটোপুটি খায়। ওর সারল্যমাখা হাসি আর আমার ছেলের হাসিমুখ পাহাড় আর সমতলকে এক সরলরেখায় এনে দেয়। পকেট ডায়েরিতে নামগুলো টুকে রাখার সময় বুঝতে পারি এ হল পক্ষীপ্রেমীদের জন্য আদর্শ জায়গা। অজস্র এলাচ, তেজপাতার গাছ রয়েছে চারিদিকে। সিমেন্টের বাঁধানো সিঁড়ি চড়াইপথ বেয়ে কিছুটা উঠে একটা ভিউ পয়েন্টে গেলাম। সবুজ ঢেউ খেলানো পাহাড়ের মাঝখানে দেখা যায় এক শীর্ণকায়া নদী। প্রথমে তিস্তা মনে করলেও রাসু জানাল ওর নাম লিস নদী। ছোট্ট একটি গ্রামে ঝুম চাষও হচ্ছে।

অনাড়ম্বর সেই গ্রাম্য মনাস্ট্রির শান্ত পরিসর পরিবেশ দেখে থেকে ফেরার সময় একবার পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াই। গোধূলির আকুল আহ্বানে অরুণদেব তখন দিশাহারা পথিকের মতো ধীরে ধীরে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে চলেছেন। শেষ বিকেলের সোনালি আলো পাহাড়ের গায়ে, বনভূমির বুকে এবং নির্জন পথের ধুলোয় ছড়িয়ে দিচ্ছিল এক অপার্থিব বিষণ্ণতা। নেশাগ্রস্ত স্বপ্নচারীর মতো বৃক্ষের দীর্ঘ ছায়াগুলি ক্রমশ দীর্ঘতর হয়ে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ে। চারদিকে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, প্রকৃতি নিজেই দিনের শেষ অধ্যায় পাঠ করে শোনাচ্ছে। সেই মায়াময় আবেশ বুকে নিয়েই ফিরে আসি হোমস্টেতে। সারাদিনের পথচলার ক্লান্তি ধুয়ে দেয় ঘরোয়া আন্তরিকতার উষ্ণ স্পর্শ। ধোঁয়া ওঠা ভাত, সামান্য কয়েকটি পদ এবং পাহাড়ি মানুষের অকৃত্রিম আপ্যায়নে শরীর ও মন দুটোই পরিতৃপ্ত হয়ে ওঠে। বাইরে তখন রাত নেমেছে নিঃশব্দে; দূরের পাহাড় অন্ধকারের চাদরে মুখ লুকিয়েছে, আর জানালার ওপারে অগণিত তারা, জ্যোৎস্নার মৃদু আলো নিস্তব্ধতার সঙ্গে মিশে এক অনির্বচনীয় অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। সেই প্রশান্তির মধ্যেই শুয়ে পড়ি।

পরদিন আবার নতুন গন্তব্যের ডাক। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় গোছগাছ করে নেওয়ার ব্যস্ততা। বিদায়ের মুহূর্তে মনে হল, এই অল্প কয়েক দিনের পরিচয় যেন বহুদিনের আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা। হোমস্টের বারান্দা, জানালার কার্নিশ, উঠোনের নীরব কোণ—সবখানেই যেন এক অদৃশ্য মনখারাপ জমে আছে। কার্নিশে লেগে থাকা একাকিত্বের মতো সেই বিষণ্ণতা আমাকে ছুঁয়ে যায় গভীরভাবে। বিদায় জানাতে গিয়ে তাদের চোখের আন্তরিকতা, খাদা পরিয়ে স্নেহের প্রথা দেখে অদ্ভুত এক আবেগে ভরে ওঠে মন। সেই মুহূর্তেই কথা দিয়েছিলাম—ফিরে গিয়ে লিখব এই পাহাড়ি জনপদের কথা, লিখব মেঘ-ছোঁয়া পথের কথা, নির্জন সৌন্দর্যের কথা, নিখাদ ভালোবাসার কথা। লিখব সেই নিভৃত পাহাড়ি স্বর্গের দিনলিপি। তাই আজ কলম জন্ম দিল ‘চুইখিমের গল্পকথা।’

*******

কীভাবে যাবেন: শিলিগুড়ি, নিউ জলপাইগুড়ি, বাগডোগরা থেকে বাগরাকোট হয়ে সরাসরি গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য বেশ কিছু হোমস্টে আছে।

———-

ছবিঃ লেখক। 

পেশায় শিক্ষিকা। নেশা বিভিন্ন ধরনের বই পড়া, বেড়ান আর সিনেমা দেখা। পছন্দের ভ্রমণ তালিকায় প্রথম স্থানে আছে পাহাড়িয়া ছোট ছোট গ্রাম। আরও শখ সময় ও সুযোগ পেলেই পাহাড়ের সহজ-সরল মানুষগুলোর আতিথেয়তা গ্রহণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ে নির্জন প্রকৃতির মধ্যে থেকে নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখা। বেড়িয়ে এসে মনের আনন্দে টুকটাক ভ্রমণকথা লেখার চেষ্টা। লেখা প্রকাশিত হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, বাতিঘর অনলাইন ব্লগজিন, প্রবচন পত্রিকা, ‘পর্যটকের ডায়েরি’ নামক ভ্রমণ সংকলনে। পঙ্কজ উধাস, জগজিৎ সিং আর রশিদ খানের গান সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সফট রোম্যান্টিক গান বিশেষ পছন্দ। ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করলেও বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি প্রবল ঝোঁক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *