‘আরণ্যক’-এ এক রাত

‘আরণ্যক’-এ এক রাত

বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বোধহয় ওদের ঠিক হয়েছিল এক রাতের জন্য কোথাও যাওয়া হবে এবং সেটা ২৪, ২৫ ডিসেম্বর। ওদের বলতে আমার ভাগ্নি মনিদীপা এবং ওর স্বামী দীপম। ছুটিছাটা হলেই ওরা কোথাও-না-কোথাও বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। দীপমের ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম চলছে ভালো রকম। ছুটি তেমন একটা পায় না, এমনকি শনি-রবিবার সাধারণত ছুটির দিন হলেও কোনো কোনো দিন ওই দিনগুলোতেও ওকে দরজা বন্ধ করে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হয়। এমনও হয়েছে, একেবারে সপ্তাহের মাঝখানে কোনো কোনো দিন দুপুরবেলাতে ঘর অন্ধকার করে ওকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছি। আবার রাত একটা-দুটোতেও, যদিও সেরকম কদাচিৎ হয়, ওকে কম্পিউটার খুলে বসতে হয় বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। এরকমই ওর কাজের ধারা। তাই মাঝেমধ্যে দু-একটা দিন নিখাদ ছুটি পেলে ওরা বেরিয়ে পড়ে। এবারের ২৪-২৫ ডিসেম্বর তেমনটাই ছিল। যদিও দীপম পুরোটা এনজয় করতে পারেনি। ২৪ তারিখ সারা সকালটা ওকে কাজ করতে হয়েছিল।

তাহলে বলতে হয় গোড়া থেকে। সপ্তাহ দুয়েক আগেই ঠিক হল ‘আরণ্যক’ নামে একটা রিসর্টে একটা রাত কাটানো হবে। বাগনান স্টেশন থেকে টোটো ধরে স্পটে যাওয়া। মনিদীপার দিকের আত্মীয়-স্বজন মিলে ওদের বেড়ানোর গ্রুপটা বেশ জোরদার। একেবারেই হুল্লোড়ে বলা যায়। মূলত মনিদীপার কাকার পরিবারের তরুণ সদস্যরাই বেশ জমিয়ে রাখে সারাক্ষণ। আমার বোন বুলা তো আছেই। পাকেচক্রে এবার বিশেষ একটা কারণে এক মাসের ওপর আমি বোনের বাড়িতে ছিলাম। দীপম এবং মনিদীপার জোরাজুরিতে আমাকেও এবার ওদের বেড়ানোতে অংশ নিতে হল। আমারও অনেকদিন বেড়ানো হয় না, ফলে এ যাত্রায় হয়ে গেল ফাঁকতালে। দীপম-মনিদীপার ছেলে বোবো। ২৩ তারিখ হয়ে ওর দশ দিনের ছুটি পড়ে গেল। ওইদিন স্কুল থেকে এসেই আমাকে বলল, “মাদাদু (ও ছোট থেকেই আমাকে মামাদাদুর বদলে ‘মাদাদু’ বলে) তোমার ব্যাগ গোছানো হয়নি? আমার কিন্তু হয়ে গেছে।” কথাটা বলেই এক ছুটে পাশের ঘর থেকে একটা নীল রঙের ব্যাগ নিয়ে এসে বলল, “এই দ্যাখো, আমি কী কী নিয়েছি সঙ্গে।”

বললাম, “কী কী দেখি।”

এবার ও একটা একটা করে জিনিস বার করল এবং কেন নিয়ে যাচ্ছে তাও বলল। একটা স্টোরিবুক—এটা দরকার মাঝে মাঝে যখন করার কিছু থাকবে না। একটা টর্চ—রাত্রিবেলা বাথরুমে অন্ধকার থাকে, ভয় লাগে, তখন দরকার হবে এটা। টুথব্রাশ টুথপেস্ট—এটা তো বুঝতেই পারছ। একটা ক্যামেরা (দাম ৫০০ টাকা), এটাতে আমি ছবি তুলব। চার্জার—ক্যামেরাটা চার্জ দিতে হবে।

বোবো বলল, “তোমার গোছানো হয়নি নিশ্চয়ই, গুছিয়ে নাও, দেরি কোরো না।” বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কিছুক্ষণ বাদেই একটা লাল রঙের ব্যাগ নিয়ে এসে বলল, “এটাতে তোমার জিনিস ভরে নাও।”

আমি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না।

আমাদের গন্তব্য ‘আরণ্যক’ রিসর্ট। আরণ্যক শুনলেই কালজয়ী লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের নাম মনে আসে। সেখানে গিয়ে অবশ্য দেখে নিতে হবে বিভূতিভূষণ কতটা আছেন সেখানে।

লোকাল ট্রেন ধরে বাগনান স্টেশনে নামতে হবে, সেখান থেকে টোটো ধরে গন্তব্যে পৌঁছানো।

সকাল সাড়ে আটটায় বেরোনোর কথা ছিল। বেরোতে বেরোতে ৮-৪৫ হয়ে গেল। একটা উবের বুক করা হল। যাত্রী মনিদীপা, আমার বোন বুলা, বোবো আর আমি। দীপম আমাদের সঙ্গে যেতে পারল না, ওর অফিস আছে। বিকেল থেকে সন্ধে নাগাদ ও আমাদের সঙ্গে জয়েন করবে।

আমরা ছাড়াও ছিল আরও দুটো পরিবার। একটা পরিবারের সঙ্গে আমরা হাওড়া স্টেশনে এসে মিট করলাম। সেই সময় আমরা সংখ্যায় ছিলাম মোট বারো জন। দীপম আর আমাদের গ্রুপের আরেকজন, বাবলু— বিকেলবেলা আসবে অফিস করে।

মেদিনীপুর লোকাল এল। প্রচণ্ড ভিড় তখন প্ল্যাটফর্মে। সেই ভিড়ের তাণ্ডবে সবাই একই কম্পার্টমেন্টে উঠতে পারলাম না। আমাদের কয়েকজন মেয়ে ছিটকে গেল লেডিস কামরায়, আমরা বাকিরা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠলাম। ট্রেন ছাড়ল দশটা নাগাদ। কামরাতে ভিড় সাংঘাতিক। আমরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। ফলে একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করার কোনো সুযোগ রইল না।

বাগনান স্টেশনে ট্রেন যখন পৌঁছল তখন ঘড়িতে বেলা ১১-১৫। মিনিট দুয়েকের বেশি গাড়ি দাঁড়াবে না স্টেশনে, তাই বেশ চিন্তায় ছিলাম সবাই ঠিকঠাক নামতে পারব কি না। তার ওপর লেডিস কামরায় আমাদের কয়েকজন আছে, তাদের সঙ্গে মিট করা আছে। ভিড় ট্রেনে উঠলে এইসব ব্যাপারগুলো থেকেই যায়।

বাগনান স্টেশনে নেমে কিছুটা হাঁটতে হল। ঘিঞ্জি রাস্তা, দুপাশে ফল, শাকসবজির বাজার। রাস্তাও তেমন মসৃণ নয়। প্রায় মিনিট ১০-১২ লাগল টোটোর নাগাল পেতে। তিনটে টোটো বুক করলাম আমরা, কারণ, আরণ্যক রিসর্ট ওখান থেকে বেশ দূর।

চার-চারজন করে তিনটে টোটোতে ভাগ হয়ে গেলাম। জনবহুল রাস্তা ছেড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা গ্রাম্য রাস্তায় ঢুকে গেলাম। উল্লেখযোগ্য বিষয়, চলার পথে কিছুটা ছেড়ে ছেড়ে দুপাশে দৃশ্যমান হচ্ছে ছোট-বড়ো পুকুর কিংবা ডোবা। তারই আশপাশে মাঝেমাঝেই দেখা যাচ্ছে পাকা বাড়ি, মাটির বাড়ি নয়। অর্থাৎ আধা গ্রাম বলা যেতে পারে। বাড়িগুলো মোটামুটি একতলা, যেখানে আকাশ দেখতে পাওয়া যায় বেশ অনেকটা। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, সোজা পথে কিছুটা এগোতে না এগোতেই মাঝেমাঝেই ডাইনে-বাঁয়ে অটো ঘুরছে চরকির মতো। যেন এক বিরাট গোলকধাঁধা। টোটো ছাড়া সরকারি বা বেসরকারি কোনো যানবাহন নজরে এল না। ফলে দূষণবিহীন এলাকা বলা যেতে পারে। 

রিসর্টের ভেতরে ফুলের বাগান
সবুজের সমারোহ

বারোটা নাগাদ আরণ্যক রিসর্টের সামনে আমাদের টোটোগুলো দাঁড়িয়ে গেল। একেবারে ফাঁকা জায়গা। বলা যায়, ওখানে রিসর্টটাই শুধু আছে, আর কোনো পাকা বাড়ি নেই। চারপাশে শুধু ধুধু বিস্তীর্ণ ফাঁকা অঞ্চল। ২২ বিঘা জমি নিয়ে গোটা রিসর্টটা। রিসর্টের বাইরে এবং ভেতরে বিচিত্র রকমের অসংখ্য ফুলের গাছ । এছাড়া রিসর্টের ভেতরে আছে নানারকম সবজির খেত, সবুজে সবুজে ছয়লাপ । দুইতলা রিসর্টের একতলা এবং দোতলাতে ডাবল-বেডেড এবং ট্রিপল-বেডেড রুম রয়েছে বেশ কয়েকটা। এছাড়া রয়েছে দুটো বিরাট বিরাট ডাইনিং হল এবং রান্নার জন্য আলাদা ঘর। বিরাট দুটো পুকুর রয়েছে তাদের একরকম দিঘি বলা যায়। একটাতে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেকটা ঘরের নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের এবং ‘পথের পাঁচালী’র বিভিন্ন চরিত্রের নাম ধরে করা হয়েছে। যেমন একটা ডাইনিং হলের নাম ‘সত্যচরণ’—আরণ্যক উপন্যাসের মূল চরিত্র যে মানুষটি। এছাড়া রয়েছে অপু, দুর্গা, হরিহর, ইছামতি, মেঘমল্লার, যুগলপ্রসাদ। বিভূতিভূষণ যেন ছড়িয়ে আছেন চারপাশে। সুন্দর ফুলের বাগান এবং সবজি খেত রয়েছে রিসর্টের ভেতরে। শীতের দুপুরের রোদ গায়ে মেখে পুরো রিসর্টটা একটা সত্যিকারের বেড়ানোর জায়গা।

সত্যচরণ ডাইনিং হল

২০২১ সালে আরণ্যক রিসর্টটা তৈরি হয়েছিল। তখন কোভিডের সময়। লোকজন তেমন হচ্ছিল না শুরুতে। পরে ধীরে ধীরে আরণ্যকের নাম ছড়িয়ে পড়ল। ওখানকার সার্ভিসের লোকজনদের ব্যবহার খুব ভালো। ঘরগুলো বেশ আধুনিক ধরনের। প্রত্যেকটা ঘর ওয়াইফাই কানেক্টেড।

দোতলায় আমাদের জন্য ছটা ঘর বুকিং ছিল। একটা ফ্যামিলি না যেতে পারাতে একটা ঘর ক্যানসেল করতে হল। ফ্যামিলি ওয়াইজ আমরা যে যার ঘরে ঢুকে গেলাম। আমি একটা ঘরে ঢুকলাম, যার নাম ছিল ‘ইছামতি।’ ঢুকতেই একটা সামান্য লম্বাটে প্যাসেজ, বাঁদিকে একটা ছোট্ট টেবিল, ওপরে কাচ, ডানহাতে বিছানা। একটু সামনে এগোতেই দেখলাম দেওয়াল-ঘেঁষা একটা দুপাল্লার আধুনিক প্যাটার্নের আলমারি, জামা-প্যান্ট সুন্দরভাবে রাখার জন্য বেশ কতকগুলো হ্যাঙ্গার, ডানদিক ঘুরতেই দারুণ আরামের একটা চেয়ার, তার পাশেই খোলা জানালা। আমার মনের মতো ঘর, ইচ্ছের সঙ্গে মিলে গেল দারুণ। ‘ইছামতি’ আমার মন ভালো করে দিল।

একটা রিসর্টে ঘরের এই নামকরণ বেশ মজার এবং সুবিধেজনক। কাউকে বলতে হলে বলার দরকার নেই দোতলায় উঠে বাঁদিকে গিয়ে দুটো ঘর ছেড়ে তিন নম্বর… এরকম না বলে ইছামতি বা হরিহর-এ উনি আছেন, চলে যান। বড়ো বড়ো হোটেলগুলোতে অবশ্য রুম নাম্বার ব্যাপারটা থাকে। তার চাইতে এরকম বিশেষ নামের ব্যবহার মন্দ নয়। অবশ্য প্রিয় লেখকের উপন্যাসের অংশবিশেষের ছোঁয়া থাকলে তো আর কোনো কথা থাকে না। সেইসঙ্গে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই নামকরণ হলে সোনায় সোহাগা। আরণ্যক সেই অর্থে একেবারে একশোতে একশো।

ঘরে ঢুকে জিনিসগুলো কোনোমতে রেখে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। এটা আমার বরাবরের অভ্যাস। জায়গাটা ভালো রকম এক্সপ্লোর না করতে পারলে আমার ঠিক স্বস্তি হয় না। তার ওপর সময়টা শীতকাল। বেলা ছোট, রোদ থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়া, যা করতে হবে দুপুরের খাওয়ার আগে সেরে ফেলতে পারলেই হয়।

ব্রেকফাস্টের জায়গা

ব্রেকফাস্টের জায়গাটা ভারী সুন্দর। ওরা চা দিয়ে গেল কিছুক্ষণ বাদে। দেরি করে আসাতে রিসর্টের ব্রেকফাস্ট আমরা মিস করেছি। সেটা আমরা ট্রেনেই সেরে নিয়েছিলাম। অবশ্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে একটা মজা হয়েছিল ট্রেনে। বারো জনের জন্য সবসমেত বারোটা প্যাকেট নেওয়া হয়েছিল রেলের ক্যান্টিন থেকে। মনিদীপার খুড়তুতো বোন টুসির স্বামী বাবলু রেলের সঙ্গে যুক্ত। ও-ই ব্রেকফাস্ট-এর বন্দোবস্ত করেছিল। প্রত্যেক প্যাকেটে পাঁচটা কচুরি আর একটা মিষ্টি, আলুরদম ছিল আলাদাভাবে। এবার ট্রেন ছাড়ার সময় সবাই একটা কামরাতে না উঠতে পারার ফলে আলুরদম চলে গেল অন্য কামরায়, আর কচুরির প্যাকেট আর একটাতে। কড়াইশুঁটির কচুরি এমনি খেতেও মন্দ লাগে না, মিষ্টি তো ছিলই, কিন্তু যাদের সঙ্গে শুধুই আলুরদম ছিল, তারা প্র্যাকটিক্যালি দুপুর বারোটা পর্যন্ত আমাদের হিসেবমতো কোনো ব্রেকফাস্ট করতে পারেনি। আমি অবশ্য কচুরির কামরাতে উঠে পড়েছিলাম, ফলে আমি কিংবা আমার মতো মানুষদের, যারা শুধু শুধু কচুরি খেতে অভ্যস্ত, ব্রেকফাস্ট করতে কোনো অসুবিধা হয়নি তাদের। অবশ্য কারুর কারুর আবার শুধু শুধু কচুরি খাওয়ার অভ্যাস ছিল না। আমি অবশ্য সর্বভুক সব অবস্থায়। তবে গব গব করে শুধুই আলুরদম খাব ব্রেকফাস্ট হিসেবে, সেটাও মেনে নেওয়া খুব মুশকিল।

যাই হোক, চা-পর্ব শেষ করে আমি একবার চক্কর মারলাম গোটা রিসর্ট এলাকা। আর ঘুরে ঘুরে প্রচুর ছবি তুললাম। অবশেষে রিসর্টের একপ্রান্তে এসে একটা দিঘির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দিঘির পাড়ে আটকানো ছিল দুটো প্যাডেল বোট। দুজনে বসে চালানো যেতে পারে। বহু বছর আগে বেড়াতে গিয়ে একবার এই বোট চালিয়েছিলাম, কিন্তু কোথায় বেড়াতে গিয়ে চালিয়েছিলাম মনে নেই এখন। এমনকি তখন বয়স কত ছিল, তাও মনে পড়ে না। হয়তো তখন আমার বয়স ছিল কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে কিংবা তিরিশ থেকে চল্লিশ। মনে করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই মনে এল না জায়গাটা বা আমার তখনকার বয়স। এখন আমি সত্তর পার করেছি, কিন্তু মনে হল এখনও আমি সেইদিনের মতোই বোট চালাতে পারব। দিঘির পাড়ে একা দাঁড়িয়ে আমি তখন খুবই উত্তেজিত ভেতরে-ভেতরে—বোট চালাতেই হবে। বাকিদের ডাকব বলে পেছন ফিরেছি, দেখলাম, আরেকটা ডাইনিং হল এবং সেটা বন্ধ। কাচের জানালা দিয়ে দেখলাম সারি সারি টেবিল আর চেয়ার। ডাইনিং হলের বাইরের দেওয়ালে একটা সাইনবোর্ড লাগানো—তাতে লেখা ছিল বোট চড়ার নিয়মাবলি। একসঙ্গে দুজন চড়তে পারবে, পার হেড ৫০ টাকা, সময় আধঘণ্টা। সঙ্গে সঙ্গে বাকিজনদের খবর দিলাম চেঁচিয়ে। আমার ডাকে তিনজন সাড়া দিল তখনকার মতো।

দিঘিতে বোটিং-এর ব্যবস্থা

মনিদীপার বোন টুসি লাফিয়ে উঠল বোট চড়া যাবে শুনে। ও আমার চাইতেও এককাঠি সরেস। ধারেকাছে রিসর্টের একজনকে দেখতে পেয়ে জানতে চাইল, বোট চড়া যাবে কি না। মজার ব্যাপার, যাকে জিজ্ঞেস করল সে-ই বোটের প্রধান লোক। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বলল, “হ্যাঁ, চড়বেন নাকি?” আমরা বললাম, “চড়ব বলেই তো এসেছি।” নিয়মকানুন আমরা জেনে গেছি তখন, তবুও লোকটি জানিয়ে দিল আমাদের সবকিছু। একটাতে টুসি একজনকে নিয়ে উঠল, আর অন্যটাতে আমি আর বুলা। প্যাডেল বোটের মাঝখানে একটা হ্যান্ডেল দাঁড় করানো থাকে। সেটা দিয়ে বোট কীভাবে চালাতে হয়, কীভাবে স্টিয়ার করতে হয়, সব দেখিয়ে দিল লোকটি। তারপর আমরা চালানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ চালানোর পর মনে হল, হাঁটুতে বেশ মালুম হচ্ছে। মাঝে মাঝে একটু থামলাম আবার চালালাম। এইভাবে গোটা দিঘিটা ঠিক তিনবার চক্কর মারলাম। ছবিও তুললাম বোট থেকে। একসময় পাড়ে চলে এলাম, কারণ সময় তখন শেষের পথে। এবার বোট থেকে নামতে হবে। কিন্তু তখনই ফিল করলাম, পা-দুটো বেশ ভারী হয়ে গেছে, বসা অবস্থা থেকে দাঁড়ানোটাই বেশ শক্ত ব্যাপার মনে হচ্ছিল, যেটা গোড়ার দিকে হয়নি। বুঝলাম, এতদিন পর অনভ্যাসের কারণে এবং অবশ্যই বয়সের কারণে এরকম হওয়াটা স্বাভাবিক। মনের বয়স না বাড়লেও শরীরের বয়স তো বেড়েছে। তা ছাড়া নিয়মিত মর্নিংওয়াক এখন আর করা হয় না, যদিও ঘণ্টাখানেক ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম আর একটু প্রাণায়াম করি নিয়মিত। যে-কোনো কারণেই হোক, বসা অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে ওঠাটা দরকারি, না হলে নামতে পারব না। আমার অপারগতা দেখে বোটের লোকটি বলল, “আপনি আমার হাত ধরুন, আমি আপনাকে টেনে তুলে নেব।” তাই করলাম এবং আমাকে টেনে ওঠানো হল ঠিকই, কিন্তু বোট থেকে মাটিতে নামার সময় জায়গাটা কিছুটা ঢালু এবং পিছল হওয়াতে এবং সর্বোপরি আমার পায়ে স্যান্ডেল থাকাতে একটু টাল খেয়ে গেলাম। ফলে পাড়ের ঢাল বরাবর একেবারে পপাত ধরণীতলে। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমি নীচে গড়িয়ে যাচ্ছি, আর বোটের লোকটি প্রাণপণে আমাকে ধরে টেনে ওঠানোর চেষ্টা করছে। আমার পড়ে যাওয়া অবস্থাতেই লোকটির সারা মুখমণ্ডলে একটা আতঙ্কের চেহারা দেখতে পেলাম। যদিও আমার মুখ আমি নিজে দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু অনুভবে বুঝতে পারছিলাম, আমারও মুখের চেহারা নিশ্চয়ই তথৈবচ। ওই অবস্থাতেই আমি বলে উঠলাম, “আপনার লাগেনি তো?” লোকটি কাঁপা কাঁপা গলায় (কারণ, সেই মুহূর্তে সে আমার উদ্ধারকাজে ব্যস্ত) উত্তর দিল, “না না, আমার লাগেনি, আপনি ঠিক আছেন তো?” আমার বোনের হালকা শরীর, সে ততক্ষণে উঠে গেছে। আমাকে ধরতে গিয়ে সে-ও কিছুটা আঘাত পেল হাঁটুতে। পাড়ের আশপাশের ঝোপঝাড়ে পড়ার ফলে আমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলে সামান্য ছড়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে ছোট্ট একটা বোরোলিনের কৌটো ছিল, একটু বোরোলিন লাগিয়ে নিলাম ক্ষতস্থানের জায়গাতে। এরকমভাবে কেন পড়ে গেলাম, সেটা ভাবতে গিয়ে মনে হল—শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তো আছেই, কিন্তু আরেকটা বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হল। সেটা হচ্ছে, পাড়ে পৌঁছেই আমি নৌকার লোকটিকে বলেছিলাম, “কীরকম চালালাম আমরা? কত নম্বর দেবেন আমাদের?” নৌকার লোকটি বলেছিল, “আপনারা তো দারুণ চালিয়েছেন—একেবারে একশোতে একশো।” সম্ভবত আমার মধ্যে একটা অহঙ্কার বা আত্মতৃপ্তি কাজ করছিল, তার পতন হওয়ার দরকার ছিল—আমি পড়ে গিয়ে ব্যালেন্স শিট মিলিয়ে দিলাম।

আরণ্যকের লাঞ্চের মেনু ছিল এককথায় অপূর্ব। কেউ নিল চিকেন, কেউ মাটন, কেউ মাছ। আমি নিলাম পাবদা মাছের ঝোল। দুটো পাবদা, হালকা রান্না অথচ অপূর্ব স্বাদ। এছাড়া মুগের ডাল, সঙ্গে ঝিরিঝিরি আলুভাজা, ফুলকপির ডালনা, মুখে দিলে যেন গলে যাচ্ছিল ফুলকপিগুলো, আর শেষপাতে চাটনি, মিষ্টি, পাপড়। বিকেলের দিকে জমিয়ে আড্ডা হল। সবাই চলে এল আমার ঘরে। দীপম আর বাবলু সন্ধেবেলা এসে আসর একেবারে জমিয়ে দিল। সন্ধেবেলা বারবিকিউ করা হল। সব মিলিয়ে হইহই হল বেশ ভালোই।

সেই রাত কাটিয়ে পরের দিন ব্রেকফাস্ট করে আমরা আরণ্যক ছাড়লাম। সব মিলিয়ে মনে হল আরও অন্তত একটা-দুটো দিন এখানে স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে দেওয়া যায়। তাতে ওই দুরন্ত খোলা প্রকৃতির সান্নিধ্য আরেকটু বেশি উপভোগ্য হয় প্রাণে ও মনে। বয়সটা কমে যায় এমন জায়গায় এলে। আর এর ফলে ভেতরে কিছু প্রয়োজনীয় রসদ ভরে নেওয়া যায় ভবিষ্যতের সুষ্ঠু জীবনধারণের জন্য।

———-

ছবিঃ লেখক। 

৫ জানুয়ারী ১৯৫৩ কলকাতায় জন্ম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পাঁচ বছর পড়াশোনা। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে পি এইচ ডি। ১৯৯১ – ২০০২ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন বিষয়ে তারাতলার ইন্সটিটিউট অব হোটেল ম্যানেজমেন্টে অধ্যাপনা। ২০০২ – ২০১৩ কলকাতার নেতাজীনগর ডে কলেজের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে অধ্যাপনা। তারপর প্রথাসম্মত অবসর। অবসরের পর পাঁচ বছর ধরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট লেকচারার। কলেজ জীবন থেকে লেখালেখি শুরু। প্রথমদিকে কবিতা, তারপর নিয়মিত গল্প লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, বইয়ের রিভিউ। এখন পুরো সময়টা কাটে সাহিত্য চর্চায়। ‘কণিকামাত্র’ এবং ‘অণুরেণু’ অণুগল্পের দু’টি সংকলন। ‘গল্প পঞ্চদশ’ পনেরোটি ছোটোগল্পের একটি সংকলন। এছাড়া খুব সম্প্রতি প্রকাশিত একটি উপন্যাস ‘কোভিডের দিনগুলি’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *