দার্জিলিং এর পথে পথে
মুখবন্ধ-
‘দীপুদা’-র দা হলো দার্জিলিং। এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যিনি দার্জিলিং যাননি। তাহলে সেই বাঙালির কোলবালিশ দার্জিলিংকে নিয়ে লিখলাম কেন!
আমিও আপনাদের মতো বেশ কয়েকবার দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছি। আপনাদের মতোই সোয়েটার আর মাঙ্কিক্যাপে কিম্ভুতকিমাকার সেজে মলে বসে গরম চা খেয়ে সময় কাটিয়েছি আর গাড়িতে ঘুরেছি সেভেন পয়েন্টস, ফাইভ পয়েন্টস, ঘুম, বাতাসিয়া ল্যুপ ইত্যাদি। কিন্তু এবারে দার্জিলিং যাবার আগে ঠিক করেই গেছিলাম আর থোড়বড়িখাড়া নয়, এবারে পায়ে হেঁটে দার্জিলিংকে এক্সপ্লোর করব। আর তা করতে গিয়ে আমি দার্জিলিংকে নতুন করে চিনতে পেরেছি, এতবার এসেও যে দার্জিলিং আমার অচেনা ছিল। তাই আমার নতুন চোখের দার্জিলিংকে সবার সামনে তুলে ধরতে ইচ্ছে হলো।
পুরনো সব দিন-
চৌদ্দ-পনের বছর বয়েসে প্রথম দার্জিলিং গিয়েছিলাম ফ্যামিলির সঙ্গে। তখন আমার কাছে দার্জিলিং মানে অনেক দূরের এক অলীকপুরের মতো। বুক দুরদুর করা উত্তেজনা নিয়ে দিনগুলো গুণে চলেছি, তখন আমাদের এই জায়গাটা গ্রামই ছিল, খুব বেশি লোক দার্জিলিং যায়নি, তাই বুক ফুলিয়ে দার্জিলিং যাবার কথা বলেও সুখ ছিল। নিজেকে কেউকেটা মনে হতো।
কিন্তু দার্জিলিং পৌঁছে একটু হতাশই হয়েছিলাম, কোথায় আমার সেই সুদূর বিপুল সুদূর! তার ব্যাকুল বাঁশরী তেমনভাবে বাজার আগেই তো চলে এলাম দার্জিলিং। এত সহজেই দার্জিলিং! অন্তত দশ-বারো ঘণ্টা পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরপাক না খেলে আর কীসের দার্জিলিং! সেখানে মাত্তর ঘণ্টাতিনেকেই গপ্পো শেষ! প্রত্যাশার ফোলানো-ফাঁপানো বেলুনটা চুপসে এইটুকুন একেবারে। তবে বাস থেকে নামতেই ঠাণ্ডাটা যে ধাক্কা মেরেছিল তা আমার হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, এলেম নতুন দেশে।
তখনকার দার্জিলিং ছিল অসামান্য। সত্যিই পাহাড়ের রানী। বাস থেকে নেমে হোটেলে যাবার রাস্তাটুকু হাঁটতে হাঁটতেই দার্জিলিং আমার বন্ধু হয়ে গেল। মন খারাপ-টারাপ সব ভ্যানিশ। বাসে আসতেই আসতেই পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা খেলনাবাটির বাড়িগুলোর বারান্দায় হাজারো রংবেরঙের ফুল দেখতে দেখতে ঘোর লেগেছিল চোখে। তবে অনেকটা রাস্তা জুড়ে পাহাড়ের গায়ে নাম-না-জানা হলুদ বড় বড় ফুলগুলোই আমার বেশি ভালো লাগছিল। রাস্তার গাড়ি চলাচলের বাতাসের ধাক্কাতেই দুলছিল ফুলগুলো, সে কে না জানে, কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখছি ওরা দু-হাত বাড়িয়ে আমায় ডাকছে এসো, এসো, এসো।
খুব আনন্দ করে সেবার দার্জিলিংকে প্রাণ ভরে উপভোগ করেছিলাম। রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে পাহাড়ের খাদের দিকে যে পাথুরে পায়ে-চলা রাস্তাগুলো নেমে গেছে সেই রাস্তা ধরে নেমে যেতাম। চা বাগান ধরে ছোট ছোট পাহাড়ি বস্তিগুলোতে পৌঁছতাম। বেশ কিছুটা এভাবে যাওয়ার পর ভয় ধরত, ওসব জায়গায় তো ট্যুরিস্ট কেউ যায় না, তাই একদম অজানা অচেনা পরিবেশে গা ছমছম করত, উঠে আসতাম তড়িঘড়ি। কিন্তু ঐ যে গা-ছমছমে অনুভূতি ওটাই আবার পরদিন আমাকে টেনে নিয়ে যেত, এবারে আরও একটু দূরে, ভয় কেটে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে।
বেশ মনে পড়ে, ফিরে আসার আগের রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে মন খারাপ হয়েছিল। এই ক’দিনেই দার্জিলিংকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। একে ছেড়ে আবার সেই আবার পরিচিত জায়গায় একঘেয়ে জীবনে ফিরে যেতে হবে ভাবতেই পারছিলাম না যেন। ভাবতে ভাবতেই একটা কথা মনে হল। এখানে তো খুব সহজেই আসা যায়। শিয়ালদা থেকে টিকিট কেটে এন যে পি নেমে পড়লেই তো হলো। তারপর শিলিগুড়ি এসে তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড থেকে টিকিট কেটে দার্জিলিং-এর বাসে উঠে পাহাড়ের কোলে চড়ে সাপখেলা দেখতে দেখতে পৌঁছে যাব দার্জিলিং। সঙ্গী পেলে ভালো, নাহলে একাই আসব। বাবা মা আপত্তি করবে না, সে আমি জানি। এত দূরে না এলেও আমি যে এদিক-ওদিক প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি–এই ব্যাপারটাকে ওঁরা বরং উৎসাহই দেন।
খরচের হিসেবটাও মনে মনে করে নিলাম। স্কুলে যাবার জন্য বাবা যে বাসভাড়াটা দেন সেটা বাঁচিয়ে সাইকেলে যাতায়াত করব। এতে যে টাকা জমবে তাতে দুটো রাত অন্তত সস্তার হোটেলে কাটাতে পারব। খাওয়া-দাওয়ায় সস্তায় সারব। আর পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াব যতটা পারব। এটা মাথায় আসতেই ফুরফুরে হয়ে গেলাম। তখন বয়েসটাই ছিল অমন। মনটা ছিল শরতের আকাশ, উৎসাহে ভরা আর অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমার নরম ভঙ্গুর থরো-থরো আবেগগুলো আলতো-হাতে না ছুঁলেই গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে যেত, মনখারাপের মেঘ কালো হয়ে আমার আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলত। কিন্তু তা অচিরেই কেটে যেত। কোন সে আলোর ছোঁয়ায় আবার সব মেঘ কেটে গিয়ে আমার সূর্যমুখী মন আবার ঝলমলিয়ে উঠত।
আবার দার্জিলিং
ফিরে এসে দেখতে দেখতে বছরটা কেটে গেল। গত বছরের দার্জিলিং যাবার দিনটাও এসে পড়ল। পয়সা বাঁচানোর জন্য সাইকেলেই স্কুলে যাতায়াত করেছি। কিন্তু সে পয়সা আর জমাতে পারলাম কই! কোথায় সব খর্চা করে ফেলেছি। আমার অত অধ্যবসায় নেই যে একমুখী হয়ে একটি একটি করে পয়সা একটা বিশেষ কাজের জন্য জমাতে পারি। কাজেই বছর বছর দার্জিলিং যাবার প্ল্যান ভণ্ডুল হয়ে গেল।
এরপরে দার্জিলিং গিয়েছিলাম আরো অনেক পরে, অন্তত পনের-ষোল বছর পরে। তখন আমার সে কৈশোরের রঙীন স্বপ্নগুলো কঠোর বাস্তবের সঙ্গে সংঘাতে হতশ্রী, বিপর্যস্ত। তাছাড়া অতিরিক্ত পর্যটকের ভার সামলাতে সামলাতে দার্জিলিং ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। সেই রূপসী দার্জিলিং ততদিনে বিগতযৌবনা, গাল-তুবড়োনো থসথসে ‘স্থূলাঙ্গী’ ।
পাউডার-পমেটম মেখে রঙ ফেরাবার একটা অক্ষম প্রয়াস আছে বটে, যা কুশ্রীতারই নামান্তর।
দার্জিলিং নিয়ে মোহ ঘুচল। তাই এরপর পাহাড় মানে, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, কেদারনাথ, পিণ্ডারি, ইত্যাদি কষ্টসাধ্য ট্রেকিং নির্ভর কিন্তু অসামান্য সুন্দর যাত্রা। পরিবার নিয়ে পেলিং, গ্যাংটক, লাভা, রিশপ, মুসৌরি, চোপতা ভ্যালি ইত্যাদি।
তারপরের তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে আবার একবার দার্জিলিং গিয়েছিলাম।
কিন্তু ইদানীং সেই কৈশোরের দার্জিলিং যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। প্রাচীন এই শরীরটায় সেই কিশোরটা কোথায় যে ঘাপটি মেরে পড়েছিল, সেই আবার চাগাড় দিয়ে ঠেলে তুলছে।
আমি প্রথমটা না না করলেও বুঝতে পারছিলাম, শেষ পর্যন্ত আর এ ডাককে উপেক্ষা করতে পারব না। দার্জিলিং নিয়ে ইউ টিউব ইত্যাদিতে একটু-আধটু স্টাডি করে আশা জাগল, এখনও দার্জিলিং একেবারে বাতিলের খাতায় চলে যায়নি। এখনও দার্জিলিং শহরের কিছু জায়গা আছে যা সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার দার্জিলিংকে মনে পড়িয়ে দেয়। তবে এ দার্জিলিংকে চিনতে জানতে গেলে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হবে শহরটা। আমার পক্ষে ভালোই হলো। হেঁটে বেড়াতে আমার ভালোই লাগে বিশেষ করে নতুন জায়গা হলে তো কথাই নেই। আমি দুভাবে ঘুরে বেড়াই। এক, পরিবার নিয়ে, না হলে একা। ঠিক করলাম এবারের দার্জিলিং ট্যুর আমি একাই করব, আর হেঁটে হেঁটে চষে ফেলব শহরটাকে।
নতুন করে পাব বলে
সোলো ট্রাভেলিং বা একক ভ্রমণের কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো যতটা সম্ভব মেনে চলা উচিত বলে আমি মনে করি। এর মধ্যে একটা নিয়ম হলো যতটা পার হাঁট। হাঁটতে হাঁটতে পরিবেশ, প্রকৃতি, সেখানকার জনজীবন যেভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাওয়া যায় তা গাড়িতে বেড়িয়ে আদৌ সম্ভব নয়। আর একটা নিয়ম হলো বাজেট ট্রাভেলিং। সাধারণ হোটেলের ডরমিটরিতে থাকা, কমদামী কিন্তু টাটকা খাবার খাওয়া, আর অবশ্যই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা। এগুলো কিপ্টেমি নয়, সোলো ট্রাভেলিংকে মর্যাদা দিতে গেলে এই নিয়মগুলোকে মেনে চলতে হয়। ধনী মানুষও যখন সোলো ট্রাভেল করেন এগুলো মেনে চলেন।
এইরকম প্ল্যান করে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের চার তারিখের মাস দুয়েক আগে মনে একরাশ আনন্দ নিয়ে দার্জিলিং মেইলের টিকিট কেটে নিলাম। বাচ্চা ছেলেদের মতো এখনও আমার বেড়াতে যাবার দশ বারো দিন আগে থাকতে একধরনের শিহরণ-মাখা আনন্দ হয়। বেড়ানো শুরু হয়ে যায় তখনই। সেই জায়গাটা সম্বন্ধে খোঁজখবর নেওয়া, আগে-যাওয়া থাকলে সেই বেড়ানোর মধুর স্মৃতিগুলো বারে বারে ঝালিয়ে নেওয়া–এগুলোর মূল্য আমার কাছে অমূল্য। আবেগ ছাড়া ভ্রমণ হয় না। শুধু নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট জায়গায় শরীরটাকে নিয়ে গেলাম আর নির্দিষ্ট দিনে শরীরটাকে আবার টানতে টানতে নিয়ে এলাম–এমন শরীরকেন্দ্রিক ভ্রমণে কোন অর্থই আমি খুঁজে পাই না।
নির্দিষ্ট দিনে ট্রেনে চড়ে বসলাম। দার্জিলিং মেইলের স্লিপার ক্লাস। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে একটু চিন্তা ছিল, বিশেষ করে টয়লেট নিয়ে। কিন্তু দার্জিলিং মেইল বনেদি ট্রেন, মাত্র চারটে স্টপেজে এন যে পি পৌঁছায়, তাই অবাঞ্ছিত ভিড়-ভাট্টা এই ট্রেনে কম হয়। আগাগোড়াই টয়লেট এবং ট্রেনের সামগ্রিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ ছিল।
সকাল সাতটা নাগাদ এন যে পি পৌঁছলাম। এন যে পি থেকে শেয়ার গাড়িতে তিরিশ টাকা ভাড়া দিয়ে শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড। দশ মিনিট পরেই একটা বাস আছে দার্জিলিংয়ের, কিন্তু একটাই মাত্র সিট খালি আছে, একেবারে পিছনের সারিতে। পিছনের সারিতে লং বাস জার্নি করা সত্যিই কষ্টকর। বিশেষ করে পাহাড়ি সাপখেলা রাস্তায়। পরের বাসের কথা জিজ্ঞেস করতে জানা গেল যে পরের বাস না এলে ছাড়ার কথা বলা যাচ্ছে না, এবং তখন পর্যন্ত পরের বাসের কোন খবরও ছিল না। অনেক দেরিও হতে পারে।
যত কষ্ট হয় হোক, এই বাসেই যাব, পাহাড়ের হাতছানি আর উপেক্ষা করতে পারছি না। টিকিট তো কেটে নিলাম, বাস ছাড়তে আর মিনিট পাঁচেক বাকি আছে। এদিকে কাল সন্ধে সাতটায় বাড়ি থেকে সেই যে খেয়ে বেরিয়েছিলাম তারপর থেকে তো আর পেটে কিছু পড়েনি। ভেবেছিলাম শিলিগুড়ি থেকে পেটপুরে খেয়ে নেব, দার্জিলিং গিয়ে হোটেলে উঠতে উঠতে আবার খিদে পেয়ে যাবে। যাই হোক, ব্যাগে বিস্কুটের প্যাকেট আর জল আছে, নো চিন্তা। ঐ দুটো আমার কাছে সবসময় থাকে। অনেকবার এমন হয়েছে বেড়াতে গিয়ে লাঞ্চ বা ডিনার করার মতো সময় বা পরিস্থিতি ছিল না, জল বিস্কুট খেয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিয়েছি।
দার্জিলিং চকবাজার থেকে লেবং-এর দিকে দু-কিমি দূরে থাকা একটা হোটেলের ডরমিটরিতে আমার বুকিং করা আছে। ইচ্ছে করেই চকবাজারের ক্যাকোফনি এড়িয়ে আউটস্কার্টের কোন হোটেলে থাকব ঠিক করেছিলাম। আমাদের ঘরে আটটা বেড, আমি জানলার কাছের বেডটাই বেছে নিলাম, দুটো পরিচ্ছন্ন বাথরুম, গিজারের সুবিধে সহ, এত কম ভাড়ায় আর কি চাই। হোটেলের সামনের রাস্তাটা নির্জন না হলেও খুব একটা ব্যস্তও নয়, যেন একটু গা এলিয়েই আছে। আর পেছনটাতো দারুণ সুন্দর, হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেটের দিগন্তজোড়া চা বাগান। ছাদের টেরেসটা আরও সুন্দর। রোদ ঝলমলে, সাজানো-গোছানো।
পরদিন ভোরে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল। মোরগের ডাকের সঙ্গে ভোরের সুরেলা যুগলবন্দীতে দিনের শুরু হয় এখানে। চা খেয়ে সকাল আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম মল থেকে বেরিয়েই অবজারভেটরি হিলের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা রাজভবন পর্যন্ত গেছে সে রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে এগোলে এখনও সেই পুরোনো দার্জিলিংকে নিবিড় করে পাওয়া যায়। এই রাজভবন, মানে মল থেকে রাজভবনের দিকে এলে রাজভবনকে ডানদিকে রেখে একটু এগোলেই পড়বে নাইটিংগেল পার্ক, আর তার পরেই চিড়িয়াখানা। এই চিড়িয়াখানার ঠিক নিচেই আমার হোটেল। তাই আমি চিড়িয়াখানা আর নাইটিংগেল পার্ককে বাঁদিকে রেখে রাজভবনের সামনে এসে বাঁদিকের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম মলের দিকে।
অপূর্ব এই রাস্তাটা! এ রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ডানদিকে অবজারভেটরি হিল, যার মাথায় বিখ্যাত মহাকাল মন্দির। আর বাঁদিকটা সম্পূর্ণ খোলা, দোকানপাট, বাড়িঘর প্রায় নেই বললেই চলে। প্রায় এক কিলোমিটার এই রাস্তা ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা এতই সুখকর যে সারাজীবন এর স্মৃতি আপনাকে আনন্দ দেবে। গোটা রাস্তাটা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, এই রাস্তায় তিনটে ভিউ পয়েন্ট (ছবি নীচে) আছে যেগুলো থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য অসামান্য। অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের সান্নিধ্যে গাড়িঘোড়াহীন প্রশস্ত এই রাস্তায় হাঁটতে সত্যিই দারুণ ভালো লাগে। এখানকার ভিউ পয়েন্টগুলোতে বসে বিশ্রাম করার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। চা কফি খেতে খেতে এখানে বসে সময় কাটানোর সময় নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হয়।
ঘিঞ্জি দার্জিলিংকে দু-হাতে ঠেকিয়ে রেখে দার্জিলিঙের একেবারে বুকে এই রাস্তাটির কৌমার্য বজায় রাখার জন্য এই শহরের কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। “কাঞ্চনজঙ্ঘা” সিনেমার দার্জিলিংকে এখনও যেন বুকে ধরে রেখেছে। আর চাইলে মনের মাধুরী মিশিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার সেই বাচ্চা নেপালি ছেলেটিকে রচনা করে তার মুখে সেই গানটিও শুনে নিতে পারবেন।
দার্জিলিং ঘোরাঘুরির একটা ভালো আইডিয়া দিই। আপনি যদি মলের কাছেই থাকেন তবে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন। মল থেকে বেরিয়েই অবজারভেটরি হিলের মাথায় জাগ্রত দেবতা মহাকালের মন্দিরে উঠে পড়ুন। একটু চড়াই, তবে এমন কিছু নয়, আমি তো যেমন কিছু কসরত না করেই উঠেছিলাম। দেব-দর্শন করে মন্দিরের পিছন-দিকটায় একটু ঘুরে আসুন। একটা ছোট কিন্তু চমৎকার পাইন বন আছে, ভালো লাগবে।
এবার নেমে আসুন। মল রোড ধরেই হাঁটতে থাকুন রাজভবনের যাবার রাস্তাটা ধরে। এই রাস্তাটার কথাই একটু আগে বলেছি। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে অসামান্য কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়ন-ভুলানো রূপ দেখতে দেখতে চলুন এগিয়ে যাই। গাড়ি করে বেড়ালে কিন্তু দার্জিলিং-এই মায়াবী রূপ আপনার অধরাই থেকে যাবে, কারণটা আগেই বলেছি। এই রাস্তায় শুধুমাত্র পথচারীদের জন্য। গাড়ি এই রাস্তায় নিষিদ্ধ। এবার রাজভবনকে ডানদিকে রেখে একটু এগোলেই দেখবেন একটা রাস্তা উঠে গেছে নাইটিংগেল পার্কে যাবার। এই পার্কে যাবার রাস্তাটা বেশ একটু উঁচু বলেই অনেকে যেতে চান না, গাড়িওলারাও এই জায়গাটা দেখাতে উৎসাহ দেয় না। ওদের যে নির্দিষ্ট কয়েকটা ভিউ পয়েন্ট আছে তার মধ্যে এটা নেই। কিন্তু পার্কটি সত্যিই খুব সুন্দর। প্রচুর ফুলের সমারোহ, যা এই প্রকৃতিকে আরো ঝলমলে আর রঙিন করে তুলেছে। কিন্তু এর আসল আকর্ষণ হলো এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন। শহর থেকে বেশ খানিক উঁচুতে এর অবস্থান বলে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন এখান থেকে হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারা যায়। তাই একটু কষ্ট করে হলেও নাইটিংগেল পার্কে আসুন।
নাইটিঙ্গেল পার্ক ঘুরে নেমে আসুন আবার মল রোডে। একটু এগোলেই পড়বে চিড়িয়াখানা। দার্জিলিং-এর চিড়িয়াখানা খুব পপুলার স্পট। মূলত, রেডপাণ্ডা দেখতেই লোকে এখানে ভিড় করেন।

এবারে নেমে আসুন লেবং কার্ট রোডে। চলুন না আর একটু হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলুন। খানিকটা হাঁটলেই বাঁদিকে পড়বে অতি বিখ্যাত সেন্ট যোসেফ স্কুল। অপূর্ব স্থাপত্য। দার্জিলিংএর রাস্তায় হাঁটার সময় একটু খেয়াল করলেই এখনও বেশ কিছু প্রাচীন বাড়ি চোখে পড়বে, যেগুলো অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। যেমন, চকবাজার থেকে এই রাস্তা ধরে এক কিমি মতো এগোলেই পড়বে দার্জিলিং কলেজ। এরও গঠনশৈলী অদ্ভুত সুন্দর।
সেন্ট যোসেফ স্কুল ছেড়ে আর একটু এগোলে ডানদিকে পড়বে রোপওয়ে। এখানে এত ভিড় থাকে যে চড়ার সুযোগ পাওয়াই মুস্কিল। অনেক আগে থাকতে এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়, অনেক সময় নষ্ট হয়। আর একটু হেঁটে চলুন যাই এই লেবং কার্ট রোড ধরেই। এবার পড়বে তেনজিং নোরগে ট্রেনিং সেন্টার। ছোট ছোট দুটি টিলার মতো পাহাড়ে মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং দেওয়া হয়, ভালো লাগবে।
এতক্ষণে চকবাজার থেকে মল রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে চিড়িয়াখানা হয়ে লেবং কার্ট রোড ধরে মোট প্রায় সাড়ে তিন কিমি হেঁটে ফেলেছেন। নিজেই বুঝতে পারবেন, এর আগে যতবার দার্জিলিং এসেছেন দার্জিলিঙের এই অসামান্য রূপ আপনার অধরাই থেকে গেছিল। ভাগ্যিস গাড়িতে ঘোরেননি, গাড়িতে ঘুরলে এত আনন্দ আর কোথায় পেতেন!
ভালো কথা, একটা সিক্রেট খবর দিই আপনাদের, এতে আপনার হাঁটার মজা আরও দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। দার্জিলিঙের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারের ছোট ছোট দোকানগুলির প্রত্যেকটা দোকানে দেখবেন বয়ামে মুড়ির মোয়া পাওয়া যাচ্ছে। সেই ছোটবেলাকার জিভে জল-আনা মুড়ির মোয়া! কতদিন খাওয়া হয়নি বলুন তো। যে কোন একটা দোকান থেকে এক একজন চার পাঁচটা করে মুড়ির মোয়া কিনে নিন। অপূর্ব এখানকার মুড়ির মোয়ার স্বাদ! একটা একটা করে মুড়ির মোয়া কুড়ুর-মুড়ুর করে চিবোতে চিবোতে এগিয়ে চলুন, কখন রাস্তা ফুরিয়ে যাবে টেরই পাবেন না।
আপাতত আর হাঁটতে বলছি না। আপনি এখন লেবং কার্ট রোডে দাঁড়িয়ে আছেন। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন রাস্তাটা লেবং-এ গেছে। দার্জিলিং থেকে মোটে আট কিমি দূরে লেবং। দার্জিলিংএর এত কাছে, যখন তখন এখানে এসে আবার দার্জিলিংয়ে ফিরে যাওয়া যায়, শেয়ার জিপ সবসময় যাতায়াত করছে, দার্জিলিং থেকে ভাড়া ৩৫ টাকা। আপনি এখন যেখানে আছেন সেখান থেকে আর চার সাড়ে চার কিমি মাত্র। ওখানেই হাত দেখিয়ে একটা জিপ থামিয়ে চলে যান লেবং। নির্জন লেবং গ্রামটি ভারী সুন্দর। লেবং-এ নেমে একটু ঘুরেফিরে নিন। মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেবে সুন্দরী লেবং। থেকেও যেতে পারেন লেবং-এ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সঙ্গী করে। খুব ভালো লাগবে। কয়েকটা হোম-স্টে গোছের আছে ওখানে।
লেবং থেকে ফেরার সময় চকবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিমি আগেই নেমে পড়ুন হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেটে। মেইন রোড থেকে নিচের দিকে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে চা বাগানে হারিয়ে যেতে নেই মানা। অপূর্ব সুন্দর চা বাগানটি দেখে দেখে আশ মেটে না, মন চায় আরও আরও একটু নামি। তবে মন চাইলেও হাঁটুর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া কিন্তু করে নিতেই হবে, নেমে তো এলেন তরতর করে, এবারে উঠতে হবে খাড়াই চড়াই বেয়ে। এই টি এস্টেটের ভেতরেও খুব গোনাগুনতি একটা দুটো গাড়ি যাতায়াত করে, ফলে অপার শান্তি মেলে এখানে।
এইভাবেই যতটা পারেন, নিজের শরীর বুঝে পদব্রজে দার্জিলিং কে একবার নতুন করে চিনে নিন। এখনও দার্জিলিঙের প্রাণকেন্দ্রে কয়েকটি স্পট আছে যা শরীর মনকে তাজা আনন্দে মাতিয়ে তুলতে পারে।
দার্জিলিং মলের ভীষণ বিখ্যাত দুটো রেস্টুরেন্ট: কেভেন্টার্স আর গ্লেনারিস। দুটোই অত্যন্ত ওভারহাইপড বলে আমার মনে হয়েছে, আমি ওখানে যাই না। বরং মলের প্রাণকেন্দ্রে অক্সফোর্ড বইয়ের দোকানে ঢুকে পড়ুন। দোকানটা বাইরে থেকে যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনই বড়সড় দোকানটায় হাজার হাজার বই। উল্টেপাল্টে বই দেখতে দেখতে কিনেই ফেলুন একটা দুটো বই।
এবারে মল থেকে নেহরু রোড ধরে কয়েক পা এগোলেই ডানদিকে দেখবেন দাস স্টুডিও। বহু প্রাচীন এই স্টুডিওটা অবশ্যই ঘুরেফিরে দেখবেন। সারা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত বিখ্যাত পাহাড়গুলোতে এঁরা নিজেরা গিয়ে ছবি তুলে এনেছেন। ছবিগুলো এত অপূর্ব যে স্তম্ভিত হতে হয়। একটু বেশি দাম হলেও এই স্টুডিওর একটা ছবি যদি আপনার ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখেন তো আপনার ঘরটা আলো হয়ে উঠবে।
ছুটি শেষ। কর্মক্ষেত্র ডাকছে। ঘরের সুখী কোণটির জন্যে মনকেমন করে উঠছে তো?
ফিরে আসুন, ফিরতে তো হবেই। আর ফেরার সময় আমি বলব জিপে ফিরুন, পাংখাবাড়ি রোড ধরে। জঙ্গল, ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম, নির্জন রাস্তাটা বড্ড যেন মন-কেমন করা, বড্ড ভালো লাগে।
