আম্পায়ারদের ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত এবং ক্রিকেট-প্রেমীদের মানসিকতা

আম্পায়ারদের ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত এবং ক্রিকেট-প্রেমীদের মানসিকতা

বাংলাভাষায় নন-ফিকশন ক্রিকেটীয়-সাহিত্যের (আমার মতে) সেরা লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসু রচিত ও ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত, “ক্রিকেট সুন্দর ক্রিকেট” নামক বইতে আম্পায়ারদের নিয়ে “ক্রিকেটের পুরোহিত” শীর্ষক একটা রচনার কথা কয়েকদিন আগেই হঠাৎ ক’রে মনে পড়ল – আগে অনেকবার পড়া লেখাটা আবার একবার পড়লাম। ঘটনাচক্রে এরই দিনকয়েক বাদে ইন্টারনেটে ‘ভুল’ আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষ কিছু তথ্য-সম্বলিত দুয়েকটা লেখাও নজরে এল – সেই data-set-টা পরে দিলাম, একটা table-এর মাধ্যমে – এগুলো নিয়েই আমার আজকের এই ‘অনধিকারচর্চা’।

তো সেই ষাটের দশকে আম্পায়ারদের সম্বন্ধে একটা বড়সংখ্যক দর্শকদের ধারণা ও মনোভাব কেমন ছিল, তার একটু নমুনা দিই, শঙ্করীপ্রসাদের রচনাংশের সাহায্য নিয়ে। কিঞ্চিৎ বিশদেই দিই, কারণ শঙ্করীপ্রসাদের লেখা আজকাল কতজন বাংলাভাষী ক্রিকেট-প্রেমী পড়ে থাকেন, তা নিয়ে একটা survey করা যেতেই পারে। তা সেকথা এখন থাক, রচনাংশের উদাহরণগুলো পেশ করি।

দর্শকদৃষ্টিতে আম্পায়ারের বহুমুখী রূপ নিম্নলিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে:

(১) প্রহরী। খেলা আরম্ভ ও পুনরারম্ভের পূর্বে উইকেট পর্যবেক্ষণকারী উৎসাহী ব্যক্তি, অটোগ্রাফশিকারী বিদ্যালয়বালক, এবং উদাসীন পথচারীদের বিতাড়নে নিযুক্ত।

(২) ভ্রাম্যমাণ বস্ত্রাগার। কিংবা টুপি ও সোয়েটারের সচল আলনা।

(৩) ট্রাফিক কন্ট্রোলার। বোলারকে বিশ্রাম দিতে এবং ফিল্ডারের মাঠের এধারে ওধারে বেড়াবার সুযোগ দিতে ওভারের‘ সঙ্কেতকারক

(৪) মৃৎতত্ত্ববিখেলার পূর্বে ও পরে পিচের মাটির পরীক্ষাকার

(৫) আবহাওয়াতত্ত্ববিৎ। আবহাওয়া বা আলো খেলার উপযোগী কি না স্থির করার অধিকারী।

(৬) সময়রক্ষক। খেলার শুরু ও শেষের সময়, ব্যাটসম্যানের নামার সময়, ইনিংস শেষে দলের নামার সময়, প্রভৃতির হিসাব-রক্ষক।

(৭) যাদুকর। পুরানোর বদলে নতুন বল, খারাপের বদলে ভালো বল, হারানোর বদলে পুরানো বল – ইচ্ছামত হাজির করতে সমর্থ।

৮) স্কোরারদের নিকট বার্তা প্রেরণের সঙ্কেতযন্ত্র

(৯) অন্তর্যামী৩৭, ৪০, ৪১ এবং ২৬ সংখ্যক নিয়মভঙ্গে ইচ্ছুক ব্যাটসম্যান, বোলার ও ফিল্ডারের অন্তর্যামী

(১০) মহান্যায়াধীশ। এই সর্বোচ্চ ভূমিকায় যে-কোনো ক্রিকেটারকে নির্বাসন দিবার অধিকারী।

দর্শকদের বিচারে আম্পায়ারের গুরুত্ব নিয়ে দু’-চার কথা, রসিকতার ছলে সহজ সত্যি।

আম্পায়ারের জন্য কেউ পয়সা খরচ করে খেলা দেখতে যায় না। ক্যাপ্টেনদের টস করা, খেলোয়াড়দের পা মিলিয়ে মাঠে আবির্ভাব সব কিছু সাদর অভ্যর্থনা পায় – কিন্তু আম্পায়ার মাঠে প্রবেশ করলে কোনো উত্তেজনা ঘটে না। দর্শকদের কাছে তাঁরা আর কিছু নন, আম্পায়াররা আমাকে ক্ষমা করবেন, মহিমান্বিত গ্রাউন্ডসম্যান। মাঠের ওপর রোলার ঠেলে নিয়ে যাওয়া আর উইকেটের মাথায় বেল পরিয়ে দেওয়া – দর্শকবিচারে এ দুইয়ের মধ্যে কোনো তফাত নেই।

হিন্দু বিয়েবাড়িতে পুরোহিতের ঐ একই অবস্থা। উৎসবের অগ্নিসাক্ষী ও মন্ত্রপাঠ যিনি করান, তিনি কে, কী রকম দেখতে, তা কি ভালো করে দেখা হয়? তিনি না এলে চেঁচামেচি, থাকলে খেয়াল নেই। কাজকর্ম মিটবার পরে ভক্তিমতী স্থুলাঙ্গী বাড়ির গৃহিণী গলায় কাপড় দিয়ে হাঁসফাঁস করে তাঁকে প্রণাম করেন, এবং গৃহিণী যদি অধিকন্তু হৃদয়বতী হন, তাহলে মিছরির জলের সঙ্গে পান্তুয়ার অর্ডার দিয়ে শোরগোল তোলেন— তারপর জানিয়ে দেন বিগলিত শ্রদ্ধায়, “ঠাকুরমশাই, আর কিছু খাবেন না।

দিকে যে সব ছেলেছোকরারা কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে পরিবেশন করেছে, নেকে ঘুরিয়েছে সাতপাক, পাউডার-ঘসা ঘাড় উঁচু করে বরের ফ্রেন্ডরূপে বিয়ে দেখতে গিয়ে ভালো করে দেখেছে কনের ফ্রেন্ডদের – তাদের কাছে চিরকালই পুরুতবেটা পাজি, মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে টাকা হাতাবার যম। দয়া করে তাঁরা যদি বিবাহ-সম্পর্কিত আর্য ব্রাহ্মণটিকে কত ধরে দেওয়া হচ্ছে খোঁজ নিতেন! আম্পায়ারের মাহিনাকি খোঁজ নিয়েছেন আপনারা? হে অটোগ্রাফলুব্ধ বালক-বালিকাগণ, কতবার তোমরা  ক্রিকেটের পুরোহিতের একটা হস্তাক্ষরের জন্য খাতা খুলেছ?

আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ক্রিকেট-মাঠের ডন’ তাঁর কী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন, তার এক ভগ্নাংশ।

ব্র্যাডম্যান বলেছেন, ভালো খেলার পক্ষে ভালো আম্পায়ার অপরিহার্য। এবং ভালো আম্পায়ারিংহওয়া অসম্ভব খেলোয়াড়দের সহযোগিতা না থাকলেআম্পায়ারদের সম্বন্ধে ব্র্যাডম্যানের তাই সুবিনীত ঔদার্য আছে। তিনি প্রায় কিশোরীর মতো মুগ্ধ আম্পায়ারদের আচরণে। বেদনাকাতর কণ্ঠে বলেছেন, লোকে আম্পায়ারদের ভুলের নিন্দে করে গলা ছেড়ে, কেউ কি কোনোদিন প্রশংসা করে তার ভালো সুকঠিন সংগত বিচারের? ব্যক্তিগতভাবে তিনি বহুবার বিনা আউটে আউট হয়েছেন। আনকেরা নতুন ব্যাট নিয়ে খেলতে নেমেছেন, প্রথম বলেই লেগ বিফোর, ব্যাটের কানায় কিন্তু বলের টকটকে লাল দাগ – হাসতে হাসতে ফিরে এসেছেন। ড্রেসিংরুমে আম্পায়ারদের বিচারবিভ্রাট নিয়ে আলোচনা তিনি পছন্দ করেন না, তা নিয়ে মিলার দুঃখ করেছেন। ডনের সিদ্ধান্ত: আম্পায়ারদের ভুল থেকে শাস্তি ও সুবিধাপ্রাপ্তির হার পঞ্চাশ-পঞ্চাশ।

আম্পায়ারদের ভূমিকা নিয়ে ‘ক্রিকেট-সাহিত্যের ডন’ কী বলে গেছেন, সেটাও রইল।

আম্পায়ারদের ক্ষোভ – সেই বেদনার সুর বেজেছে কার্ডাসের একটি রচনায়। ক্রিকেটের অবজ্ঞাত অপরিহার্যদের রূপ ফোটাচ্ছেন এই বিখ্যাত লেখক:

ক্রিকেট শুরু হয়েছে, উইকেটের দিকে হেঁটে গেছেন আম্পায়ার, অসাধারণ জ্যামিতিজ্ঞানের পরিমিতিবোধ নিয়ে তাঁরা স্ট্যাম্প সাজিয়েছেন। খেলা হোকএই শব্দ সুনির্দিষ্ট মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।

আম্পায়াররা মূর্তিমান ক্রিকেট-নিয়ম। শ্রেষ্ঠতম ক্রীড়ার মহান নীতির প্রতিনিধি। খেলা তৈরি বা নষ্ট, দুইই তাঁরা করতে পারেন। মন্দ আম্পায়ার মানে মন্দ মেজাজের ক্রিকেটার, সুতরাং মন্দ খেলা। অথচ তাঁর সম্বন্দে আমাদের মনোযোগ কত সামান্য। তিনি ভুল করলেই মাত্র বুঝি তিনি আছেন। জঘন্য সিদ্ধান্তক্রিকেটারদের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু কদাচিৎ আমরা তাঁর ভালো সিদ্ধান্তের গুণগান করি।

ক্রিকেটের আম্পায়াররা বাথরুমে গরম জলের যন্ত্রের মতো। সেটা ছাড়া চলে না, অথচ খারাপ হয়ে না গেলে সেটার কথা মনে থাকে না। আসল কথা হল, মাঠের মধ্যে আম্পায়ারই সবচেয়ে দরকারি মানুষ। তিনি খেলার অর্কেস্ট্রার পরিচালক।

খেলার দীর্ঘ সময়। বলের পর বল পড়ে। আম্পায়ারকে খেলার প্রতিটি অংশে তীব্রভাবে মন রাখতে হয়। খেলোয়াড়দের অবসর আছে। নিজেদের দল ব্যাট করার সময় কেউ কেউ রীতিমতো ঘুমিয়ে নেয়। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হলে কিছু সময়ের জন্য খেলার কথা ভুলে থাকতে পারে ক্রিকেটাররা। আম্পায়ারের অব্যাহতি নেই। যতক্ষণ না খেলা শেষ হচ্ছে, কিংবা আবহাওয়ার জন্য পরিত্যক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ তাঁর শুধু – দেখে যা আর দেখে যাখেলা দেখ, পিচ দেখ, গ্রাউন্ডসম্যানকে দেখ। প্রতিদিন যে মাপের মনোযোগ তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, তা মানুষের সহনশক্তির যেকোনো সীমার বাইরে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁটিনাটি প্রতিটি ব্যাপারে আম্পায়াররা যে পরিমাণ মনোযোগ দিয়ে থাকেন, যদি কোনো দেশের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ কাজে তার অর্ধেকও মন দেয়— তা হলে সে দেশের উন্নতির সীমা না জানি কোন স্বর্গ স্পর্শ করবে।

নেভিল কার্ডাসের তাই বিনীত আবেদন – আম্পায়ারদের সর্বপ্রকার সাহায্য কর। জান না কি যে, একটি ভুলের জন্য তাঁর চাকরি চলে যেতে পারে? “তাঁর কাজ কি এমনিতেই যথেষ্ট কঠিন নয় যে, তোমরা হঠকারিতা করে বা মেজাজ দেখিয়ে তাকে কঠিনতর করে তুলবে।”

তাহলে শঙ্করীপ্রসাদের ছ’দশক আগেকার তৈরি ‘আয়না’-তে দর্শক হিসেবে নিজেদের তৎকালীন ‘মুখচ্ছবি’ তো দেখা হ’ল। এবার তাহলে এই শতকের ছবিটা একটু দেখা যাক, সংক্ষেপেই দেখাই, কারণ শঙ্করীপ্রসাদের লেখনী আর এই অধমের লেখনী তুলনায় যেন ১৯৯৮-এর “শারজা মরুঝড়” সচিন আর ঘরের মাঠে ১৯৮৩-৮৪ ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট-সিরিজের “ফোন-নম্বরী ব্যাটার” জিমি!

আম্পায়ারদের, বিশেষ ক’রে প্রাক-DRS আমলের আম্পায়ারদের, সম্বন্ধে একটা বড়সংখ্যক ক্রিকেট-প্রেমীদের ধারণাটা কেমন, সেই প্রসঙ্গে সঙ্গের এই data-set-টা একটা নমুনা হিসেবে দেখাতে চাই। পরিস্কার জানাই যে এখানে সচিন একজন ‘প্রকৃষ্ট উদাহরণ’ মাত্র, কারণ উনি সাধারণত সচেতনভাবে আম্পায়ারদের সমালোচনা ক’রে পাদপ্রদীপের আলোয় আসবার চেষ্টা করেননি বলেই জানি। ক্রিকেটের ব্যাটিং-সংক্রান্ত যে কোনও আলোচনায় বিগত সাড়ে-তিন দশক যাবৎ ক্রিকেট-দুনিয়ার সর্বাধিক আলোচিত পাঁচজনের উনি অবশ্যই একজন। তাই ওঁর ক্রিকেট-জীবনের তথ্যই নিয়েছি – “There is no malice towards him whatsoever.” – এই disclaimer-টা দিয়ে রাখা জরুরি।

আম্পায়ারদের সেই ৩৮টা ভুল যা মেনে নিতে হয়েছিল!

তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৪ বছরের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৬৬৪টা ম্যাচ খেলেছেন, ৭৮২টা ইনিংসে ব্যাট করেছেন এবং মোট ৩৪,৩৫৭ রান সংগ্রহ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১০০টা শতরান ও ১৬৪টা অর্ধশতরান। তাঁকে যে ‘ক্রিকেটের ঈশ্বর’ (Cricketing God) বলা হয় এবং প্রায় সব ক্রিকেটপ্রেমীই (বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে, যেখানে সূর্যোদয়ের মতোই এ এক ধ্রুব সত্য) তাঁকে সর্বকালের সেরা বা ‘GOAT’ (Greatest of All Time) ব্যাটার হিসেবে গণ্য করেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই! হ্যাঁ, কার কথা বলা হচ্ছে তা বুঝতে সংশয়ের লেশমাত্র নেই — তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং সচিন রমেশ তেন্ডুলকর (SRT)।
এই অজেয় নায়কের বিরুদ্ধে মাঠের মধ্যে (যেমন শন পোলক, গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, চামিন্ডা ভাস, অ্যালান ডোনাল্ড, কোর্টনি ওয়ালশ, জেমস অ্যান্ডারসন, জেসন গিলেস্পি, মন্টি পানেসার, গ্রেম সোয়ান প্রমুখ) এবং সংবাদমাধ্যমের গ্যালারি থেকে (যেমন ইয়ান চ্যাপেল ইত্যাদি) অনেকেই ‘প্রতিকূল’ আচরণ করবার চেষ্টা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ‘খলনায়ক’ নাকি ছিলেন সেই ‘সাদা কোট পরিহিত মানুষগুলো’, অর্থাৎ আম্পায়াররা (যেমন ড্যারিল হার্পার, ইয়ান রবিনসন, স্টিভ বাকনর, অশোক ডি সিলভা, সাইমন টাওফেল, আলিম দার, আসাদ রউফ, কুমার ধর্মসেনা প্রমুখ)। এমনকি স্বয়ং বচ্চন-সাবকেও তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে হয়ত এত বেশি সংখ্যক ‘খলনায়ক’-দের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি! এহেন অনুযোগের কারণটা একটু বলি, উদাহরণ সহযোগে।
মোট ৭৮২টা ইনিংসের মধ্যে (৭৪টা অপরাজিত ইনিংস বাদ দিয়ে) SRT মোট ৭০৮ বার আউট হয়েছিলেন। একদল ক্রিকেট-প্রেমী (সচিন-ভক্ত বললেই বোধহয় বেশি মানানসই হয়!) ‘দাবি’করেন [তথ্যসূত্র উল্লেখ করাটা প্রয়োজন, তাই জানাচ্ছি – https://m.rediff.com/sports/mar/30cri2.htm এবং https://sportscafe.in/blogs/cricket-curiosities/the-what-if-scenario] যে, এর মধ্যে ৩৮ বার (যা মোট আউট-সংখ্যার ৫.৩৭ শতাংশ ক্ষেত্র) বিভিন্ন আম্পায়ার তাঁকে ভুলভাল আউট দিয়েছিলেন। এই হারটা অন্যান্য ‘ক্রিকেট-দীর্ঘজীবী’ বিখ্যাত ব্যাটারদের তুলনায় কি ‘অস্বাভাবিকভাবে বেশি’? আমি সঠিক জানিনা। আর তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-জীবনের শেষ ১৭ বছরেই এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। নিচে সেই ৩৮টা ঘটনার এক সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো। [যেসব আম্পায়ারের নাম হলুদ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁরাই এ ধরনের ‘ক্ষতি’-র জন্য ‘সরাসরি দায়ী’ এমনটাই ‘জনমত’।]

সেই ৩৮টা ভুলের তালিকা

আম্পায়ারদের হয়ে বিনীত (নাকি দুর্বিনীত!) কয়েকটা প্রশ্ন – “জবাব চাই, জবাব দাও!”

প্রথমে একঝলক মনে করিয়ে দিই কয়েকটা কথা। [তথ্যসূত্র: ESPNCricInfo ও Hindu Sportstar]

  • টেস্ট-ক্রিকেট-মঞ্চে তৃতীয়-আম্পায়ার বা টিভি-আম্পায়ার পদ্ধতির আগমন ১৯৯২-৯৩ মরশুমে দক্ষিণ আফ্রিকায়, ভারতের বিরুদ্ধে ডারবান-টেস্টে, এবং রান-আউট সাব্যস্ত হয়ে তার প্রথম ‘শিকার’ SRT স্বয়ং। ব্যাপারটা নেহাতই কাকতালীয়।
  • DRS নিয়মের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ২০০৮ মরশুমে শ্রীলঙ্কায়, ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট-সিরিজে, এবং তার প্রথম ‘বলি’ বীরেন্দর সেহবাগ, এলবিডব্লিউ মুরলি।
  • বিসিসিআই-এর সঙ্গে বেশ কিছু টানাপড়েনের পর ২০১২ মরশুম থেকে আইসিসি DRS ‘বাধ্যতামূলক’ করলেও বিসিসিআই একগুঁয়েমি চালু রাখে – “… the BCCI remained an implacable opponent of the DRS until 2016, when changes in leadership, both on and off the field, promoted a rethink and the DRS finally became universally accepted.” অতএব DRS-এর সর্বময় কর্তৃত্বের আমল সবেমাত্র এক-দশক, যদি তার প্রভাব নানাবিধ ও সুদূরপ্রসারী।

এবার ফিরে আসি ‘অভিযোগ-তালিকা’ পর্বে। এই তালিকার ওপর ভিত্তি ক’রে আমি কয়েকটা প্রশ্ন রাখতে চাই, যেগুলো অবশ্যই SRT-র উদ্দেশ্যে নয় (কারণ তাঁর স্বাভাবিক ভদ্রতাবশত মাঠে-দেওয়া আম্পায়ারিং সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা তিনি সাধারণত করতেন না), বরং তাঁর সেইসব কট্টর ভক্তদের জন্য যাঁরা আম্পায়ারদের দোষারোপ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

  • মনে তো হচ্ছেনা যে, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সাত বছরে, ১৯৯৬-৯৭ মরশুম অবধি, তিনি এমন কোনো ‘মারাত্মক ভুল’ সিদ্ধান্তের (howler) মুখোমুখি হয়েছিলেন। তো ঐ সাত বছর সময়টতে কি আম্পায়ারিংয়ের মান ‘খুবই দক্ষ’ ছিল, নাকি নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আম্পায়াররা ও বিপক্ষীয় ফিল্ডাররা তাঁর প্রতি ‘অতিরিক্ত সদয়’ ছিলেন, অথবা তাঁকে ‘টার্গেট’ না করে কোনোভাবে ‘পার পেয়ে যেতে’ দিচ্ছিলেন (টিভি-আম্পায়ার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও)?
  • তাঁর মোট ৭০৮টা আন্তর্জাতিক আউটের মধ্যে ১৪.৪১% (১০২টা) ছিল এলবিডব্লিউ (LBW); এর মধ্যে ২৬টা (অর্থাৎ ‘ভুলভাল’ সিদ্ধান্তের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ২৫.৫%) ছিল ‘সন্দেহজনক’ সিদ্ধান্ত, এবং ১৯৯৮ সালের পর থেকেই তিনি এমন পরিস্থিতির শিকার হতে শুরু করেন! ঐ সময়ের পর থেকেই কি তিনি কিছুটা বেশি ‘LBW-প্রবণ’ হয়ে পড়েছিলেন, নাকি আম্পায়াররা (বিপক্ষীয় ফিল্ডারদের মতনই) তাঁর উইকেটটা নেওয়ার জন্য ‘মরিয়া’ হয়ে উঠেছিলেন?
  • দেখে যেন মনে হয়, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে এবং বাংলাদেশে ওঁর খেলা মোট ৯৪টা আন্তর্জাতিক ম্যাচের ম্যাচ-পরিচালনাকারী আম্পায়াররাই ছিলেন সবচেয়ে ‘দক্ষ’। এর মধ্যে সত্যতা কতটা?
  • এটা মোটামুটি ‘স্পষ্ট’ যে, আম্পায়ারদের দিয়ে ‘জোর ক’রে’ এমন ‘জঘন্য’ সিদ্ধান্ত দেওয়ানোর ক্ষেত্রে অজিরাই (১০ বার) প্রধান ‘অপরাধী’ – ভুল সিদ্ধান্তের দুই-তৃতীয়াংশ তাদেরই জন্য; তাদের ঠিক পরেই রয়েছে পাকিস্তান (আটবার) ও শ্রীলঙ্কা (সাতবার)। ক্রিকেট মাঠে, বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে, এই তিনটে দল কি তবে সবচেয়ে ‘অখেলোয়াড়সুলভ’ আচরণকারী দলগুলোর মধ্যে পড়ত? নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটাও (ছ’বার) আসলে ততটা ‘খেলোয়াড়সুলভ’ ছিলনা, যতটা আমাদের বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছে?
  • আরও দেখা যাচ্ছে যে, স্টিভ বাকনর নন (যদিও ক্রিকেট-বিশ্বকে অনেকেই তা বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন), বরং অশোক ডি সিলভাই SRT-র সবচেয়ে বেশি ‘সরাসরি ক্ষতি’ করেছিলেন। বাকনর এখন কেমন বোধ করবেন যখন দেখবেন যে তাঁর সেই ‘কুখ্যাত মুকুট’ (dirty crown) ডি সিলভার দখলে চলে গেছে?
  • এমন ঘটনা ভারতের মাঠে মোট ১২ বার (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩১.৫৮%) ঘটেছে। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর নিজের শহরে (বম্বে বা মুম্বাই) এমন ‘বাজে সিদ্ধান্ত’ দেওয়ার ‘সাহস’ কোনও আম্পায়ারই দেখাননি! এটা কি নিছকই ‘কাকতালীয়’? নাকি ডব্লিউজি ব্যাট করবার সময় টিকিটের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া বা ডন আউট হয়ে গেছেন শুনলে মধ্যাহ্নভোজের পর টিকিটের বিক্রি কমে যাওয়া, অথবা জাভেদ মিয়াঁদাদের পাকিস্তানের মাঠে ১১৫ বার আউটের ক্ষেত্রে ১৫ বার এলবিডবলু (১৩.০৪%) – করাচি-তে ৩১ বারে চারবার (১২.৯০%) – এই জাতীয় কোনও ‘জনতা-প্রভাবিত’ ব্যাপার?

 

“খুব জানতে ইচ্ছে ক’রে”

সব ball (বা feather) sports (যেমন ক্রিকেট, টেনিস, টেবিল-টেনিস, ফুটবল, বাস্কেটবল, বেসবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, হকি, প্রভৃতি) খেলা-চলাকালীন আম্পায়ার/রেফারি (খেলোয়াড়দের মতনই) কিছু ভুল করবেন, বিশেষত ক্রিকেটের মতন জটিল আইনের খেলায়, এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই ভুল নিয়ে কিছুসংখ্যক ‘ক্রিকেট-প্রেমী’ সমাজমাধ্যমের কল্যাণে বাকনর-কে (নাকি ডি সিলভা-কে!) সারাজীবন ধ’রে “চোর চোর, (সচিনের) রান চোর” জাতীয় মন্তব্য ক’রে যাবেন, এটা সচিন-এর মতন প্রকৃত ভদ্রলোকের কাছেও বেশ অস্বস্তিকর ব্যাপার ব’লেই আমার মনে হয়।

পেশাদার আম্পায়াররা তাঁদের এই thankless job এবং occupational hazard সম্বন্ধে পুরোপুরিই ওয়াকিবহাল, তাই তাঁরা তাঁদের হয়ে আমার এই তুচ্ছ defense নিয়ে যে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন, এটা তো অবধারিত। তবে আম্পায়ারিংয়ের এই সুকঠিন কাজটার চাপটা সম্বন্ধে ক্রিকেট-প্রেমীদের একটা বড় অংশের সচেতনতার অভাব যে বিগত ছ’দশকেও বিশেষ বদলায়নি, এটা বুঝতে অসুবিধে হয়না।

মোদ্দা কথাটা হ’ল যে, আম্পায়ারের কোনো ‘হতবাক করা’ সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের ‘প্রিয়’ ব্যাটার যদি ‘অন্যায়ভাবে ও অসময়ে’ আউট হয়ে যান এবং তাতে আমরা হতাশ, বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হই, তবে সেই একই ব্যাটারের বিরুদ্ধে ফিল্ডিং দলের করা ‘জোরালো ও কানঘেঁষা’ আবেদন আম্পায়ার যখন নাকচ করে দেন, তখন আমাদের স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা অনুভব করাও উচিত – মুদ্রাটা হাতে নিলে তার দু’টো পিঠই নিতে হয়, শুধুমাত্র Head-টা নেওয়া যায়না, Tail-টাও সঙ্গে আসে।

একটা প্রশ্ন আমার কাছে বেশ ইঙ্গিতবহ: বোলার-ফিল্ডারদের সঙ্গে দ্বিমত হয়ে আম্পায়াররা যে অনেকবার ব্যাটারদের ‘বাঁচিয়েছেন’, এটা অধিকাংশ ক্রিকেট-প্রেমীই সাধারণত খেয়াল রাখেন না – পরিসংখ্যান তো (পেশাদার প্রশিক্ষকরা বা তথ্য-বিশ্লেষকরা বাদে) প্রায় কেউই পাননা। অতএব যেমন জানা থাকেনা কোন ফিল্ডার কত রান বাঁচিয়েছেন (বা গলিয়েছেন) বা ক’টা ক্যাচ ফেলেছেন, অথবা কোন ব্যাটার কোন ইনিংসে কতগুলো সুযোগ দিয়েছেন, ইত্যাদি – আম্পায়ারিং নিয়ে এই তথ্যও তেমনি জানা থাকেনা।

তাই মাঝেমধ্যে আমার খুব ইচ্ছে হয় যে, কেউ (বা কেউ কেউ) যদি উদ্যোগী হয়ে এমন সব ঘটনার একটা ‘তালিকা’ তৈরি করতেন, যেখানে SRT-র (বা লারা / পন্টিং / ক্যালিস / সাঙ্গাক্কারা / গুচ / মিয়াঁদাদ এঁদের মতন বিখ্যাত ব্যাটারদের) বিরুদ্ধে ফিল্ডিং-দলের করা ‘জোরদার (strong) ও কানঘেঁষা (close)’ আবেদনগুলো আম্পায়াররা নাকচ করে দিয়েছিলেন। সেটা কি একটু বেশিই ‘অন্যায় আবদার’ হয়ে যাবে? জানি যে এমন post-facto তালিকার কোনও মূল্য নেই, তবুও ‘বেছে-বেছে আম্পায়ার-বিদ্বেষী ভক্তকুল’ কী বলেন!

জন্ম কলকাতায়, ১৯৫৯ সালে, কর্মজীবনের বেশির ভাগও সেখানেই অতিবাহিত। স্কুল-জীবন কাটে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চলের তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। পাড়ার ক্লাবে ও স্কুলের ক্রিকেট দলে নিয়মিত খেলবার অভ্যাসটা ছিল। কলেজ-জীবনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র – ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে স্নাতক, কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে স্নাতকোত্তর। তিন দশক তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসূত্রে দেশে-বিদেশে প্রচুর ঝাঁকিদর্শন করে, তারপর সপ্তবর্ষব্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা অন্তে ২০১৯ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই ‘ক্রিকেট-প্রেমিক’। বর্তমানে ‘নন-ফিকশন’ বইয়ের প্রতিই বেশি আকর্ষণ, যদিও সবচেয়ে প্রিয় তিন বাংলা কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবরাম চক্রবর্তী। ক্রিকেট-বিষয়ক বইয়ের একনিষ্ঠ পাঠক, সংগ্রাহকও বটে। প্রিয় ক্রিকেট-লেখকদের মধ্যে আছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু, রে রবিনসন, টনি কোজিয়ার, ডেভিড ফ্রিথ, গিডিওন হেগ, জ্যারড কিম্বার প্রমুখ। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের প্রথম বই "ক্রিকেটের খেরোর খাতা"; ২০২৪ সালে এসেছিল “ক্রিকেটের খেরোর খাতা: ফলো-অন”, ও (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “Our Cricketing Odyssey with Kapil”; ২০২৫ সালে এসেছে “ক্রিকেটের খেরোর খাতা”-র দু’খন্ডের দুই ই-বুক; এবং ২০২৬ সালে এল (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “কপিল দেব: গতিদেবতার সঙ্গে ক্রিকেটের আশ্চর্য ভ্রমণ”” ও ই-বুক “ক্রিকেটের কুড়িটা ওভার”। “অবসর” ওয়েব-ম্যাগাজিনে নিয়মিতই লিখে থাকেন। কিছুদিন যাবৎ ক্রিকেট-সম্বন্ধীয় বাংলা YouTube ভিডিও-চ্যানেল “উইলোর উইল”-এর কথকের ভূমিকাও পালন করছেন। মাঝেমধ্যে লিখছেন “উত্তরবঙ্গ সংবাদ” পত্রিকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *