আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এলজিবিটিকিউ কমিকসের অস্তিত্বের লড়াই
পৃথিবীতে এখন কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রাফিক বই বা কমিকস প্রকাশিত হচ্ছে এ নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করেন তবে একটিই সর্বসম্মত উত্তর – এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+)।[i] ভাবতে অবাক লাগে একসময় এই ধারার গ্রাফিক শিল্পীকে প্রথম বিশ্বের দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে লুকিয়ে চুরিয়ে, বহু কষ্ট সহ্য করে নিজেদের কথা প্রকাশ করতে হয়েছে। আর আজ সেই ধারার কমিকসের গল্প নিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে ব্রডওয়ে শো হচ্ছে। ২০০৬ সালে প্রকাশিত অ্যালিসন বেকডেলের “Fun Home: A Family Tragicomic,” এক সমকামী নারী আর তার সঙ্গীনীর জীবন অবলম্বনে লেখা গ্রাফিক স্মৃতিকথা। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রডওয়েতে উপস্থাপিত নাটকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিউজিক্যাল সম্মান পেয়ে Fun Home ‘টোনি’ পুরস্কার পেয়েছে। এ এক দীর্ঘ পথ! এই পথে হাঁটতে হাঁটতে সমকামী পুরুষ, নারী, আর রূপান্তরী মানুষ নিজেদের সমস্যা আর অধিকারের দাবি নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে চেয়েছেন গ্রাফিক/কমিকসের মাধ্যমে।
এলজিবিটিকিউ+-এর জীবনালেখ্য নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কমিকস রচিত হয়েছে। ইউরোপে আর জাপানে এই বিষয়বস্তু নিয়ে কমিকস তৈরি করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু রক্ষণশীল মনোভাবগ্রস্ত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বারে বারে বিরাট আকারের বাধা সৃষ্টি করেছে – ফলে বাধ্য হয়ে শিল্পীদের আন্ডারগ্রাউন্ডে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এলজিবিটিকিউ+ কমিকসের উৎপত্তি আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই নিয়ে আজ আলোচনা করব।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে কমিকস-এর পত্তন খবরের কাগজে। এরপর যে ধরনের কমিকসের বই বেরোতে আরম্ভ করল সেগুলি সমাজের মূলস্রোতের বই – যৌনতা বর্জিত। একমাত্র ‘টিয়্যুয়ানা বাইবেলস (Tijuana Bibles)’ নামে একটি ব্যতিক্রমী কমিকস গোপনে প্রকাশিত হত। তবে এই কমিকস-এ আলাদা কোনও এলজিবিটিকিউ+ চরিত্র সৃষ্টি করা হয়নি। মেনস্ট্রিমে জনপ্রিয় ডোনাল্ড ডাক, পপ-আই, ইত্যাদি চরিত্রগুলির মাধ্যমেই নানারকম যৌনতার প্রকাশ ঘটত, সমকামিতাও বাদ যেত না। শিল্পের দিক থেকে এই কমিকসগুলি ছিল রগরগে বটতলামার্কা। কোনোরকম বক্তব্য ছাড়া পাঠককে যৌন-সুড়সড়ি দেওয়াই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য।
তখন মূল ধারার কমিকসের জয়জয়কার – কিন্তু সেখানেও কিছু কিছু ব্যতিক্রমী যৌনতার (queer) চরিত্র লুকিয়ে ছিল চোখের সামনে। মিল্টন ক্যানিফের লেখা বিখ্যাত কমিক স্ট্রিপ ‘টেরি অ্যান্ড দ্যা পাইরেটস’-এ ‘সাঞ্জাক’ নামে পুরুষের পোশাক পরা এক ফরাসি মহিলা চরিত্রকে দেখা গেল গল্পের মূল পুরুষ চরিত্রের গার্লফ্রেন্ড এপ্রিলের প্রতি খুব আগ্রহী। ১৯৩৪ সালে তৈরি হয় সাঞ্জাক চরিত্র, প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি।

‘সাঞ্জাক’ই কমিকস বিভাগের প্রথম লেসবিয়ান চরিত্র।
ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরী চরিত্রের উপস্থিতি তখন সাহিত্যেজগতে অনুপস্থিত। সেই সময় কমিকস আর্টিস্টরা ভাবলেন পুরুষালি নারী বা মেয়েলি পুরুষ, বা লিঙ্গপরিবর্তনের গল্প কমিকসে আনলে কেমন হয়! সেই ভাবনা থেকে ১৯৪০ সালে জন্ম নিল নতুন কমিকস, আর্ট পিনাজিয়ানের আঁকা এবং লেখা ‘ক্র্যাক কমিকস # ১!’ এর মুখ্য চরিত্র ‘রিচার্ড স্ট্যানটন’ নারীর পোশাক পরে, ‘ম্যাডাম ফেটাল’-এ রূপান্তরিত হয়ে, অপরাধের তদন্ত করত। না ছদ্মবেশ নয়, বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরাই ছিল তার রুচি। কমিকসের জগতে রিচার্ড স্ট্যানটনই প্রথম ‘ক্রস ড্রেসার’ চরিত্র। এই ধরনের চিন্তা কমিকসে সেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করল।
এর পরই এল শেলডন মায়ারের সৃষ্টি, মাঝবয়সি ‘মিসেস অ্যাবিগেল মাটিলডা ‘মা’ হ্যাংকল’ (১৯৩৯)। ‘সাঞ্জাক’-এর আগমনের দু’তিনমাসের মধ্যেই এই নতুন চরিত্র পাঠকের দরবারে উপস্থিত হল। ‘মা হ্যাংকল’ এমন এক নারীচরিত্র যে পুরুষের পোশাক পরে সুপারহিরো ‘রেড টর্নেডো’য় রূপান্তরিত হত। আধুনিক কালে ‘মা হাংকল’ বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু প্রথম মহিলা সুপারহিরো হিসেবে তার আসন চিরস্থায়ী।
মা হ্যাংকল-এর বিপুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার কমিকস সৃষ্টির কাজ এগিয়ে চলল। সেই একই বছরে আর একটি কমিকস-এ দেখা গেল সুপারম্যানের শত্রু, এক পাগলা বৈজ্ঞানিক, তার মস্তিষ্ক এক মহিলার শরীরে প্রতিস্থাপিত করল। ১৯৪৬ সালে এসে উইলিয়াম মার্সটন সৃষ্ট ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’-এর প্লট পাল্টে গেল। ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’-এর চিরশত্রু ‘ব্লু স্নোম্যান,’ এক ভয়ঙ্কর ভিলেন, প্রকাশ পেল এক মহিলা হিসেবে। সেই সময়কার কমিকস স্ট্রিপে এই ধরনের জেন্ডার রূপান্তর দেখা গেলেও তখন পর্যন্ত কোনো ট্রান্সজেন্ডার প্রধান চরিত্র কমিকসে আসেনি।
১৯৫৩ সালে প্রকাশিত চার্ল্টন কমিকসের ‘রূপান্তর (Transformation)’ কাহিনিতে প্রথম এল এক প্রকৃত ট্রান্সজেন্ডার চরিত্র। গ্রাফিক গল্পটি ‘স্পেস অ্যাডভেঞ্চার # ৭’ নামে প্রকাশ পেয়েছিল। পারমাণবিক যুদ্ধে পৃথিবী ধ্বংস হবার আগেভাগে, ‘লার্স ক্র্যান্সটন’ নামে ডাক্তার তার বান্ধবীর সঙ্গে মঙ্গলগ্রহে পাড়ি জমাল। সেখানে পৌঁছতে গিয়ে তাদের মহাযান ভেঙে পড়ল আর লার্সের বান্ধবীও হারিয়ে গেল। কিছুদিন পরে সেই ভাঙা মহাযানের গবেষণাগারে ঢুকে লার্স ‘লিঙ্গ রূপান্তরের নির্দেশিকা’ নামে একটি বই খুঁজে পায়। লার্স স্থির করে সে নারীতে পরিণত হবে এবং তাই ঘটে। যদিও এই কমিকসের ভাবনাচিন্তা নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু লিঙ্গরূপান্তর কমিকসে এই প্রথম।
হয়তো এই ভাবনা মূল ধারার কমিকসে আরও আসত, কিন্তু কমিকস জগতের সত্যিকারের ভিলেন হয়ে উদ্ভব হল আসলেন জার্মান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ডক্টর ফেডরিক ওয়েরথাম। তিনি সোচ্চারে ঘোষণা করলেন যে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে এসেছেন, কমিকসে আগ্রাস, সমকামিতা, এবং রূপান্তর দেখে যুবসমাজে অবক্ষয় ঘটছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা যদি ‘ব্যাটমান’ আর ‘রবিন’কে সমকামী প্রেমিক বা ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’কে সমকামী নারী হিসেবে দেখে তাহলে নতুন প্রজন্ম উচ্ছন্নে যাবে। এই সমস্ত ধারণাকে একত্রিত করে ১৯৫৪ সালে তিনি Seduction of the Innocent বইটি প্রকাশ করেন। এমনকি আমেরিকার সেনেট সাবকমিটিতে পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে কমিকস দেখে দেশের কিশোর-কিশোরীরা নষ্ট হচ্ছে। ফলে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হল কমিকস বুক ইন্ড্রাস্টিকে এ ব্যাপারে সত্বর কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।
ব্যস হয়ে গেল! ১৯৫৪ সালেই কমিকসের মূলধারার বেশ কিছু প্রকাশক একজোট হয়ে Comics Code Authority বা CCA স্থাপন করল। সাধারণভাবে The Code নামে প্রচলিত এই সংস্থা মারাত্মক সব নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দিল। শুধুমাত্র কমিকস বুক প্রকাশনাগুলি যে এই নিয়মের আওতায় এল তা নয়, বইব্যবসায়ীরাও পার পেলেন না। বইতে CCA-র স্ট্যাম্প থাকলে তবেই সে বই বাজারে বিক্রি করা যাবে। সে তো আর ইন্টারনেটের যুগ নয় যে আপনি অনলাইনে বই কিনবেন। সুতরাং এই ধরণের বই বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।
এককথায় বলতে গেলে The Code সব কিছুতে খবরদারি শুরু করল। কমিকসে যৌনতার গন্ধ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে বাতিল। সাধারণ পুরুষ-নারীর বাইরে অন্য কোনো লিঙ্গের চরিত্র রাখা যাবে না। Cross dressing মানে পুরুষ বা নারী কাউকেই বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরানো চলবে না, কোনও অশালীন ভাষা থাকবে না, রোমান্স থাকতে পারে কিন্তু বুঝিয়ে দিতে হবে যে বিয়ে আর ঘর বাঁধাই শেষ কথা – এরকম আরও হাজারখানেক নিয়মবিধির ফাঁস।
এই সব নিয়মের কঠোর শাসনে আমেরিকার কমিকসের স্বর্ণযুগের সূর্য অস্ত গেল। শুধুমাত্র ক্যুইয়ার কমিকস নয়, মূল স্রোতের কমিকসগুলিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। যে চরিত্রগুলি এতদিন জনপ্রিয় ছিল, নানা রকম ত্রুটি দেখিয়ে তাদেরও দিক বদলাবার নির্দেশ দিল The Code. সে আলোচনা অবশ্য এই প্রবন্ধের মুখ্য বিষয় নয়। বরং দেখা যাক LGBTQ কমিকসের কী হাল করল The Code.
যুগে যুগে শিল্পীরা নিয়মের চোখরাঙানিকে তোয়াক্কা করেননি। শিল্পের ইতিহাসে দেখি যখনই আঘাত এসেছে স্বাধীনতায় শিল্পীরা আড়ালে চলে গেছেন। তাই পরোক্ষভাবে The Code আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করল আর এক কমিকসের ধারা – যা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড কমিকস’ নামে প্রখ্যাত।
ছোট ছোট প্রকাশকরা তাদের কমিকস গোপনে ছাপালেন আর বিক্রি করতে লাগলেন মূল ধারার বিকল্প দোকানে। বেশির ভাগই সিগারেটের দোকানে। তবে অন্তরীণ কমিকসের সবগুলিই যে LGBTQ-এর কথা বা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করত তা নয়। বেশ কিছু কমিকস শুধুমাত্র রগরগে যৌনতা আর শরীর প্রদর্শন করত। বেশির ভাগ কমিকস শিল্পী মনে করতেন যে সমকামী বা রূপান্তরকামীদের নিয়ে কমিকস আঁকলে কেউ পড়বে না। সত্যি কথা বলতে কী, দীর্ঘদিন কমিকসে LGBTQ চরিত্র বা তাদের সমস্যার কথা উঠে এল না।
বেশ অনেক বছর পরে, ১৯৬৫ সালে অ্যালেন জে স্যাপিরো (ছদ্মনাম এ জে) সৃষ্টি করলেন তাঁর ‘হ্যারি চেজ’ চরিত্র। প্রথমে হ্যারিকে দেখা গেল একটি ছোট্ট কমিক স্ট্রিপ, ‘ড্রাম’ পত্রিকায়। এ জে ধারাবাহিকভাবে ড্রামের প্রতিটি সংখ্যায় ‘Harry Chess: That Man From A.U.N.T.I.E’ নামে একটি কমিকস সিরিজ শুরু করলেন। এই প্রথম কমিকসে সমকামী কমিউনিটি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কী ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তা দৃষ্টিগোচর হল।

ড্রাম-এর এই কমিকস প্রবলভাবে জনপ্রিয় হবার পর ‘দ্য অ্যাডভোকেট’ নামে একটি পত্রিকা শিল্পী জো জনসনের কমিকস প্রকাশ করতে লাগলেন – দুটি চরিত্র ‘মিস থিং’ আর ‘বিগ ডিক’ পাঠকদের কাছ থেকে ভালোই স্বীকৃতি পেল। ‘মিস থিং’ হল একজন পেলব, নারীসুলভ, সাজতে গুজতে ভালোবাসে চরিত্র আর ‘বিগ ডিক’ ঠিক তার উল্টো। সে পেশীবহুল, ম্যাচো, চামড়ার জ্যাকেট আর চাপা জিনস পরিহিত পুরুষ।
এই সমস্ত কমিকস পাঠকসমাজে মোটামুটি সাড়া জাগালেও সমকামী ও রূপান্তরীদের সমস্যা, দাবী, বা তাদের নিয়ে কমিকস চরিত্র বানানোর তেমন আগ্রহ তৈরি হল না। এইবার আমেরিকার ইতিহাসে এল এক নতুন বাঁক।
নিউ ইয়র্ক শহরে সমকামী কম্যুনিটির জন্যে ‘স্টোনওয়াল’ একটি বিখ্যাত বার/রেস্টুরেন্ট। সেই সময় পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই সমকামীদের ধরে নিয়ে অত্যাচার করত। ১৯৭১ সালে পুলিশ ‘স্টোনওয়াল’-এ ঢুকে বর্বরভাবে নির্যাতন চালাল উপস্থিত খদ্দেরদের ওপর।[ii] এর আগেও বহু নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা, কিন্তু এবারের আক্রমণের নৃশংসতা সব কিছু ছাপিয়ে গেল। ছ’দিন ধরে লাগাতার আন্দোলন চলল। পরের বছর এই দিনে শান্তিপূর্ণ মিছিল বেরোল আমেরিকার নানা শহরে। আজও প্রতিবছর জুন মাসে যে প্রাইড মিছিল বেরোয় তা এই স্টোনওয়াল রায়টের দিনটিকেই স্মরণ করে।
ফিরে আসি কমিকসের আলোচনায়।
মজার কথা এই যে The Code-ও নিজের নিয়মকানুনে পরিবর্তন আনল ১৯৭১ সালে। মোটামুটিভাবে বলা যায় The Code-এর অন্তিম যাত্রা শুরু হল এই সময়ই।
শুরু হল কমিকসের নতুন যুগ – যা আর্টের ইতিহাসে ব্রোঞ্জ যুগ নামে পরিচিত। কোড শিথিল হলেও মেন স্ট্রিম তাদের কমিকসের পাতায় LGBTQ চরিত্র আনার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারত না। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড আর্টিস্টরা এবার মরিয়া – ‘গে রাইটস মুভমেন্ট’ তাঁদের দিয়েছে নতুন উদ্দীপনা।
এইবার আসরে নামলেন মহিলা শিল্পীরা। পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষ সমকামীদের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত থাকে কমিকস। কিন্তু নারী সমকামীদের (লেসবিয়ান) কথা ভাববে কে? সূচনা হল বিখ্যাত ‘Wimmen’s Comix’-এর (পরে বানান পাল্টে নাম হল Wimmin’s Comix)। জীবৎকাল ১৯৭২ থেকে ১৯৯২। প্রথম সংখ্যায় ট্রিনা রবিনস লিখলেন কমিকস গল্প ‘স্যান্ডি কামস আউট’ – নিজেকে খোলাখুলি সমকামী বলে প্রচার করল ‘স্যান্ডি।’ এই প্রথম লেসবিয়ান চরিত্র, স্যান্ডি, এল কমিকসের পাতায়। সত্যঘটনা অবলম্বনে এই চরিত্রের সৃষ্টি। পাঠকসমাজে ব্যাপক সাড়া জাগাল ‘স্যান্ডি।’

১৯৭৩ সালে শিল্পী মেরি উইংস মঞ্চে প্রবেশ করলেন তাঁর ‘Come Out Comix’ নিয়ে। স্বপ্রকাশিত এই চোরাগোপ্তা কমিকসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেসবিয়ান গোষ্ঠী। এছাড়াও তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ডাইক শর্টস।’
১৯৭৫ সালে, Wimmin’s Comix-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লি মার্সের কমিকসের কেন্দ্রে রইল নারীবাদী রাজনীতি। তাঁর একটি প্রতিবাদী চরিত্র, মোটাসোটা, সতেরো বছরের কিশোরী ‘পাজ’-এর চোখ দিয়ে তিনি নারী এবং সমকামী অধিকারের লড়াইয়ের বিবিরণ দিয়েছেন। ‘পাজ’ যখন সমকামীদের মিছিলে যোগ দিতে যায় পুলিশ তাকে প্রায় গ্রেপ্তার করে।
সমকামী কমিকস ধারার ইতিহাসে আজীবন জ্বলজ্বল করবে ১৯৭৬ সাল। এই প্রথম মূল ধারার কমিকস, গ্যারি ট্রুডো-র ‘ডুনসবেরি’-তে স্থান পেল সমকামী পুরুষ চরিত্র – আইনজীবী ‘অ্যান্ডি লিপিনকট।’ রাজনৈতিক সমালোচনা করে ব্যাঙ্গাত্মক এই কমিক স্ট্রিপ সারা পৃথিবীতে প্রকাশিত হয়।

সমকামীদের দৈনন্দিন জীবনের রোজনামচা নিয়ে ডোনেলান সৃষ্টি করলেন ‘ইটস এ গে লাইফ’ কমিক স্ট্রিপ। তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে এই সৃষ্টি টানা ১৫ বছর চলেছিল।
রুপার্ট কিনার্ড (বিকল্প নাম প্রফেসার আই বি গিটেনডাউন), এক কৃষ্ণাঙ্গ, সমকামী কমিকস শিল্পী, পাঠকদের জন্যে সৃষ্টি করলেন কৃষ্ণাঙ্গ সমকামী চরিত্র। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পত্রিকায় উপস্থিত করলেন ‘ব্রাউন বম্বার’ নামে এক কিশোর সুপারহিরো আর ‘টুসে ফ্লাম্বে’ নামে তার লেসবিয়ান সহযোগী। এই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সমকামী পুরুষ ও নারী চরিত্র প্রবেশ করল কমিকস-এর পাতায়।
মেনস্ট্রিমে কমিকস বইয়ে এত দিন লেসবিয়ান চরিত্র দেখা যায়নি। ১৯৭৬ সালে গ্রাফিক বই ‘ডাইনামাইট ড্যামসেলস’-এ শিল্পী রোবার্টা গ্রেগরি আনলেন নারীবাদী লেসবিয়ান চরিত্র। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই DC Comics সামনে আনল রবার্ট ক্যানিগের ও জন রোজেনবার্গার-এর সৃষ্টি, ‘লেডি কপ।’ প্রধান চরিত্র ‘লিজা ওয়ার্নার’ একজন দক্ষ পুলিস অফিসার।

যাই হোক, আন্ডারগ্রাউন্ড আর্টিস্টরা কিন্ত মূলধারার ভরসায় থেমে থাকলেন না।
১৯৭৯ সালে ডেনিস কিচেন (কিচেন সিংক প্রেসের মালিক) ও হাওয়ার্ড ক্রুশ মিলে সৃষ্টি করলেন ‘গে কমিকস’ সিরিজ। এই কমিকসের সমস্ত চরিত্র ছিল সমকামী, আর তাদের সৃষ্টিকর্তা শিল্পীরাও ছিলেন গে বা লেসবিয়েন। ‘গে কমিকস’-এর ২৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল।
এলজিবিটিকিউ+ কমিকস মূল এবং অন্তরীণ দুই ধারাতেই ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৮৪ সালে টিম বারেলা তাঁর বিখ্যাত কমিকস স্ট্রিপ ‘লেনার্ড ও ল্যারি’ প্রকাশ করলেন। প্রবল জনপ্রিয় এই স্ট্রিপ পরবর্তীকালে ‘ফ্রন্টিয়ারে’র মতো পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে। ২০০২ সাল পর্যন্ত এই কমিকস ছাপা হত।
LGBTQ+ কমিকস বলতেই যাঁর নাম প্রথম উঠে আসে, তিনি হলেন অ্যালিসন বেকডেল। তাঁর কমিকস স্ট্রিপ, ‘ডাইকস টু ওয়াচ আউট ফর’ ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। মূল স্রোত এবং সমকামী গোষ্ঠী – দুই সমাজেই এই কমিক স্ট্রিপ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। শেষ অবধি বেকডেল নিজেই কমিক স্ট্রিপটিকে অনন্ত যাত্রায় পাঠিয়ে দেন। আগেই বলেছি, তাঁর কমিক শিল্পের ওপর ভিত্তি করে “Fun Home: A Family Tragicomic” ২০১৫ সালে শ্রেষ্ঠ মিউজিক্যালের সম্মান পেয়েছে।
ট্রাম্প সরকারের অপশাসন ও LGBTQ+ সমাজের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ২০১৭ সালে বেকডেল আরও তিনটি ‘ডাইকস টু ওয়াচ আউট ফর’ কমিক স্ট্রিপ তৈরি করেনঃ ‘পিএস দ্য রেসিস্তঁ,’ ‘পোস্টকার্ডস ফ্রম দ্য এজ,’ এবং ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট!’

১৯৮৯ সাল পর্যন্ত Code এর নিয়ম কঠিন ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে তা শিথিল হতে থাকে। কিন্তু গে-কমিকসের ওপর আঘাত হানতে লাগল অন্যরকম শত্রু – যারা নিজেরাই গে-কমিকস বানিয়ে তার মাধ্যমে এই কমিউনিটির অপপ্রচার করত। সে এক বিরাট কাহিনি।
এতকিছুর বাধা নিষেধের পরেও জয়ধ্বজা ওড়াচ্ছে এলজিবিটিকিউ+ কমিকস। এলজিবিটিকিউ কমিউনিটি তাঁদের রামধনু রঙে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে এই পৃথিবীতে সব মানুষের সমান অধিকার!
———-
তথ্যঋণ
Booker, K. M. (2010). Encyclopedia of comic books and graphic novels, 2 Vols. Santa Barbara, CA: ABC-CLIO.
Chute. H. (2017, December 11). “The rise of queer comics.” The Paris Review. Available: https://www.theparisreview.org/blog/2017/12/11/rise-queer-comics/
Dowers, M. (2010). “Introduction.” Newave! The underground mini comix of the 1980’s. Seattle, WA: Fantagraphics Books.
Nyberg, A. K. (1998). Seal of approval: The history of the comics code. Jackson, MS: University Press of Mississippi.
Palmer, J. (2006, October 16). Gay comics 101. www.AfterEllen.com.
Skinn, D. (2004). “Heroes of the Revolution.” Comix: The underground revolution. NY: Thunder’s Mouth Press.
ছবিঃ লেখক
———-
[i] লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুইয়ার এবং ব্যতিক্রমী যৌনতার কম্যুনিটিকে একজোটে এলজিবিটিকিউ+ বলা হয়।
[ii] স্টোনওয়াল বিদ্রোহ সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুনঃ “গর্বের মাস জুন।”
