পৃথিবীর আধুনিক কবিতায় বারোক (Baroque) স্টাইলের প্রত্যাবর্তন - প্রথম পর্ব
ভূমিকা
ফ্যাশন নাকি ২০-বছরের কালক্রমে চলে – ৭০ দশকের ফ্যাশন ফেরত এসেছে ৯০-এর দশকে, Y2K ফ্যাশনের চল এখন। ফ্যাশনের এই পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের কারণগুলি নিয়ে অনেক রিসার্চ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। সংক্ষেপে বললে এই কারণগুলি হল –
১) নতুন প্রজন্ম তাদের বাবা-মাদের যৌবনের দিনগুলিতে আকৃষ্ট হয় এবং সেই সময়ের ফ্যাশনকে অনুসরণ করে, পুরোপুরি অনুকরণ না করলেও।
২) অর্থনৈতিক বা বিশ্বব্যাপী বড়সড় সংকটের সময় ফ্যাশন নস্টালজিয়া এক ধরনের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বা নিরাপত্তা যোগায়।
৩) আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম যেমন টিক-টক বা ফেসবুক বহু দশকের ফ্যাশনকে একসঙ্গে তুলে ধরে, আর সেই সহাবস্থান থেকে মিশ্র ফ্যাশনের সৃষ্টি হয়।
৪) যেহেতু সমসাময়িক ম্যাস ফ্যাশন (mass fashion) থেকে অনেকে আলাদা হতে চান, তাঁরা খোঁজেন রেট্রো ফ্যাশন (retro fashion) আর সেই বিপরীতমুখী চিন্তা একসময় তার নিজের ক্রিটিকাল ম্যাস (critical mass) পেরোয় আর নতুন ভাবে ফিরে আসে আবার পুরোনো ফ্যাশন।
কবিতার স্টাইলের মধ্যেও এ জিনিস দেখা যায়। কবিতার নস্টালজিয়ার কথা আমি নিজের লেখা পড়তে গিয়েই অনুভব করি। কলেজে পড়ার সময়, সবসময় ব্যাগে থাকত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’, তুষার চৌধুরীর ‘অলীক কুকাব্য রঙ্গে’ আর বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকা’। সেই নস্টালজিয়া মাঝে মাঝে আমার কবিতায় হাজির হয়, কিন্তু প্রভাব হিসেবে নয়, উল্লেখ করার বিষয় হিসেবে। একটা উদাহরণ দিই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শরীর অশরীরী’ কবিতার প্রথম দু’ লাইন হচ্ছে –
কেউ শরীরবাদী বলে আমায় ভর্ৎসনা করলে, তখন ইচ্ছে হয়
অভিমানে অশরীরী হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাই।
এই কবিতার স্মৃতি অদ্ভুতভাবে দেখা দিল আমার কবিতা “অ্যান্টি-লোলিটা”র প্রথম কয়েকটা লাইনে –
রেট্রো কবিতার মতন আমিও তাহলে শরীরবাদী হব
নরম মলাটে মিষ্টি পান, কাটারি ঝলক তোমার কন্ঠাস্থি
চন্দ্রযান আছড়ে পড়েনি এখনও
নাভির উপত্যকায়। কড়ি কোমল উল্লম্ব পিয়ার্সিং শুধু।
বন্দী ফণায় পুঁতি রিং, আমিও তাহলে
তোমাকে শেখাব গূঢ়,
গূঢ় অবিনীতা, অভিসন্ধি,
গূঢ় প্রগলভা বানাব তোমায়।
এই নস্টালজিয়া বা যৌবনে পড়া কবিতায় নতুন করে আকর্ষণের সময়সীমা কিন্তু এক প্রজন্মের – সে ২০ বছর হোক বা খুব বেশি হলে ৪০ বছরই হোক। তাই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক স্টেফানি বার্ট যখন বস্টন রিভিউতে ২০১৪ সালে লিখলেন,
https://www.bostonreview.net/articles/stephen-burt-nearly-baroque/
যে আমেরিকান কবিতায় সপ্তদশ শতাব্দীর বারোক (Baroque) স্টাইল ফেরত আসছে ‘প্রায় বারোক’ (Nearly Baroque) রূপে, আমি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলাম ওঁর বিশ্লেষণে। ৪০০ বছর আগেকার কবিতার ফর্ম আবার ফিরে আসছে কেন?
আর সেই কৌতূহল থেকেই এই প্রবন্ধটির জন্ম।
প্রবন্ধটির তিনটে পর্ব। প্রথম পর্বে থাকবে বারোকের পরিচয় – শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, এবং কবিতায় বারোক বলতে কী বোঝানো হয়, সেগুলি আমরা উদাহরণ দিয়ে দেখাব।
প্রথম পর্ব – শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, এবং কবিতায় আদি বারোক স্টাইল
বারোক (আনুমানিক ১৬০০–১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)
বারোক শিল্পধারার উৎপত্তি হয়েছিল রোমে, ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে পাল্টা-সংস্কার আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে। বারোক যুগের ঠিক আগেই ছিল রেনেসাঁস যুগ (আনুমানিক ১৪০০–১৬০০) যা মোটামুটি ভাবে যুক্তিভিত্তিক গঠন এবং ধ্রুপদী (গ্রীক ও রোমান) আদর্শের পুনর্জন্ম দিয়ে চিহ্নিত। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে বারোক যুগ আসে রেনেসাঁসের কঠোর নিয়মগুলো ভেঙে ফেলতে চেয়ে, আর তার সাথে নিয়ে আসে চরম নাটকীয়তা, তীব্র আবেগ, বিস্তৃত অলংকরণ, এবং প্রাণবন্ত, বৈপরীত্যপূর্ণ আলোকসজ্জা। এই শিল্পধারা ছিল সাহসী, নাটকীয় এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহী — পঞ্চেন্দ্রিয়ের সাহায্যে খুব সহজেই যাকে অনুভব, উপলব্ধি, এবং দর্শন বা শ্রবণ করা যায়। দর্শকের চেতনাকে অভিভূত করে চার্চের ক্ষমতা ও মহিমার প্রতি শ্রদ্ধা জাগানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তাই দর্শকের কাছ থেকে সরাসরি ও বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য গভীর ধর্মীয় উদ্দীপনা, চরম বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়েছিল।
শিল্পে এবং স্থাপত্যে বারোক শৈলী
শিল্পে এবং স্থাপত্যে বারোক শৈলী রেনেসাঁ যুগের স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসের পরিবর্তে বাঁকানো এবং তির্যক রেখার ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। কোনো দৃশ্যের নাটকীয় উত্তেজনা বাড়াতে এবং মনোযোগ আকর্ষণ করতে আলো ও ছায়ার চরম বৈপরীত্য ব্যবহার করা হতো। ক্যাথলিক counter-reformation বা প্রতি-ধর্মসংস্কার দ্বারা চালিত হয়ে শিল্পীরা বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করতে তীব্র আধ্যাত্মিক মুহূর্তগুলো চিত্রিত করেছিলেন। চার্চ এবং ইউরোপীয় রাজতন্ত্র উভয়েরই পরম ক্ষমতা ও মহিমা প্রদর্শনের জন্য জমকালো অলংকরণ এবং বিশাল আকারের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল।
বারোক চিত্রশিল্পের সবচেয়ে চেনা বৈশিষ্ট্য হলো আলো ও ছায়ার তীব্র প্রতিতুলনা (contrast), যাকে শিল্পতত্ত্বে বলা হয় কিয়ারাস্কুরো (chiaroscuro) এবং টেনেব্রিজম (tenebrism)। কিয়ারাস্কুরো দিয়ে দ্বিমাত্রিক (two-dimensional) ছবিতে ত্রিমাত্রিক (three-dimensional) গভীরতা আনা হয়। অত্যন্ত বাস্তবধর্মী চিত্ররূপ ও নিখুঁত শেডিংয়ের ব্যবহার তৈরী করে একধরনের দৃষ্টিবিভ্রম তৈরী করা হয়, যাকে ফরাসি ভাষায় বলা হয় Trompe l’œil (ট্রম্প-লয়) বা “চোখকে ঠকানো”।
টেনেব্রিজম আনে এক নাটকীয় কৌশল যাতে অস্পষ্ট— অনেক সময়ই প্রায় ঘুটঘুটে কালো— পটভূমি থেকে ছবির বিষয়বস্তু এমনভাবে বেরিয়ে আসে যেন কোনো তীব্র ও নির্দিষ্ট স্পটলাইটের আলোয় তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি ইতালিয়ান শিল্পী কারাওয়াজিওর (Caravaggio, ১৫৭১-১৬১০) বিখ্যাত ‘দ্য কলিং অফ সেন্ট ম্যাথিউ’ তৈলচিত্রের কথা, যাতে যিশু ট্যাক্স সংগ্রহকারী ম্যাথিউকে তাঁর অনুসারী হওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। বারোক ছবিতে সবসময়ই দেখবেন গতিময়তা ও আবেগের তীব্রতা, আনন্দের উচ্ছ্বাস বা যন্ত্রণার আর্তনাদ, এবং তার সাথে সাথে ঐশ্বরিক সাক্ষাতের পরম মুহূর্ত।
বারোক স্থাপত্য শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাদের বিশাল আকার ও প্রচুর অলঙ্করণ। কার্লো মাদের্নো (Carlo Maderno) ও জিয়ান লরেঞ্জো বার্নিনির (Gian Lorenzo Bernini) নকশায় পুনর্নির্মিত সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা ও চত্বর (ভ্যাটিকান সিটি/রোম, ইতালি) ইতালীয় বারোক শৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এই ব্যাসিলিকা এবং এর চারপাশের স্তম্ভ-ঘেরা চত্বরটি (১৬৫৬–১৬৬৭) তাদের বিশাল আয়তন ও দৃষ্টিভ্রম-সৃষ্টিকারী গভীরতা নিয়ে সরাসরি হাজির হয়েছিল আমাদের চোখের সামনে ২০২৩ সালের ইতালি ভ্রমণে। ২৮৪টি স্তম্ভের দুটি উপবৃত্তাকার সারি যেন দুই বাহু মেলে ধরে তীর্থযাত্রীদের আলিঙ্গন করছে — এবং একই সঙ্গে চার্চের ক্ষমতাকে বিশ্বের সামনে ঘোষণা করছে। এই স্থাপত্য কেবল সুন্দর নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তাবহ।
আমাদের তোলা দুটো ছবি দিলাম এখানে।
প্রথম ছবিটি ভ্যাটিকান সিটিতে অবস্থিত সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার সুদৃশ্য গম্বুজের। বিশিষ্ট ‘ডাবল-শেল’ (দ্বি-স্তরবিশিষ্ট) গম্বুজটির প্রাথমিক নকশা করেছিলেন রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলো বুওনারোটি; ১৫৪৭ সালে এর কাজ শুরু হয়েছিল। অবশেষে ১৫৯০ সালে স্থপতি জিয়াকোমো দেল্লা পোর্তা এবং ডোমেনিকো ফন্টানা এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। ব্যাসিলিকার মেঝে থেকে এর বাইরের দিকের ধর্মীয় প্রতীক ক্রুশ পর্যন্ত মোট উচ্চতা প্রায় ১৩৬ মিটার (৪৪৮ ফুট), যা এটিকে বিশ্বের সর্বোচ্চ গম্বুজে পরিণত করেছে।
আমাদের তোলা দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যাবে ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার অভ্যন্তরে অবস্থিত বিখ্যাত ও বিশাল বারোক-শৈলীর আচ্ছাদন বা ক্যানোপি (canopy)—’সেন্ট পিটার্স বাল্ডাকিন’। ১৬২৩ থেকে
১৬৩৪ সালের মধ্যে বার্নিনি এটি নকশা করেছিলেন; এটি বারোক শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। আমাদের তোলা ছবিটির অবস্থান গির্জার ঠিক কেন্দ্রস্থলে, মাইকেলেঞ্জেলোর বিশাল গম্বুজের নিচে এবং প্রথম পোপ সেন্ট পিটারের সমাধির ঠিক উপরে।
ব্রোঞ্জ নির্মিত চারটি সুউচ্চ ও প্যাঁচানো সলোমনিক স্তম্ভ (Solomonic Columns) জলপাই ও লরেল (তেজপাতা জাতীয় চিরহরিৎ গাছ) গাছের খোদাই করা শাখা-প্রশাখা দ্বারা অলঙ্কৃত; এই শৈলীটি প্রাচীন সলোমনের মন্দিরের স্তম্ভ দ্বারা অনুপ্রাণিত। স্তম্ভগুলোর ঠিক মাঝখান দিয়ে ‘ক্যাথেড্রা পেত্রি’ (সেন্ট পিটারের আসন) দৃশ্যমান; এটি বার্নিনির তৈরি আরেকটি বিশিষ্ট শিল্পকর্ম, যার সাথে রয়েছে উজ্জ্বল চিত্র-বিচিত্র কাচের (stained-glass) জানালা, যেখানে পবিত্র আত্মার প্রতীক হিসেবে একটি পায়রা চিত্রিত রয়েছে।
বারোক যুগের পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত
বারোক সঙ্গীত ছিল তার যুগের দৃশ্যশিল্পের মতোই শক্তিশালী, আবেগময় এবং অলঙ্কৃত — এবং এই যুগেই অপেরা, অরেটোরিও (oratorio), কান্টাটা (cantata), কনচেয়েরটো (concerto) ও ফিউগের (fugue) মতো সঙ্গীত রূপগুলো জন্ম নিয়েছিল। বারোক সঙ্গীতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কোনো একটা সঙ্গীতাংশ শুধু একটিই অনুভব জাগাবে শ্রোতার মনে – সে আনন্দ হলে শুধুই আনন্দ, বিষাদ হলে শুধুই বিষাদ। সঙ্গীতের এই নান্দনিক তত্ত্বকে বলে Affektenlehre বা doctrine of affections – অনুভূতির মতবাদ। পরে আমরা দেখব বারোক যুগের কবিতায় এই “একক-আবেগে”র কাব্য প্রতিরূপ।
অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র যেমন হার্পসিকর্ড বা অর্গান একদিকে যেমন এই নতুন সঙ্গীত জঁরকে প্রকাশ করতে সাহায্য করল, অন্যদিকে তাদের সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে পিয়ানোর মতন আঙুলের চাপ বদলে আওয়াজের মাত্রা পরিবর্তন করতে না পারা, terraced dynamics নামের নতুন টেকনিকের জন্ম দিল। শিল্পীরা সরাসরি উচ্চ বা নিম্ন ভলিউমে এক একটা সঙ্গীতাংশ বাজাতেন, হঠাৎ করে জোরে থেকে আস্তে বা আস্তে থেকে জোরে — কোনো রকম ধারাবাহিক পরিবর্তন ছাড়াই।
বারোক যুগের দুই প্রধান সুরকার আন্তোনিও ভিভালদি (Vivaldi, ১৬৭৮–১৭৪১) ও জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ (Bach, ১৬৮৫-১৭৫০)। ভিভালদি রিটরনেলো ফর্ম (Ritornello Form) ব্যবহারে বিশেষ ভাবে দক্ষ ছিলেন। ইতালীয় শব্দ ‘Ritorno’ থেকে রিটরনেলো শব্দের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ “সাময়িক প্রত্যাবর্তন” বা অল্পক্ষণের জন্যে ফিরে আসা। এই টেকনিকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অর্কেস্ট্রা দিয়ে বাজানো কোনো একটি প্রধান সুরের (রিফ্রেইন) বারবার ফিরে আসা। এই প্রধান অংশের ফেরার মাঝখানে একজন একক বাদক বা কয়েকজনের ছোট দল সম্পূর্ণ আলাদা সুর বাজায়, যাকে ‘এপিসোড’ বলা হয়। ভিভালদি তাঁর Four Seasons এ দ্রুতগতির মুভমেন্টগুলিতে (প্রথম এবং তৃতীয় মুভমেন্ট) রিটরনেলো ফর্ম ব্যবহার করেছেন। এই মুভমেন্টগুলিতে, সম্পূর্ণ অর্কেস্ট্রা একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্রধান থিম বাজায়, যা একক বেহালার বাজানো পর্বগুলির সাথে পর্যায়ক্রমে ফিরে ফিরে আসে।
উদাহরণ হিসবে লিঙ্ক দিলাম ভিভালদির Four Seasons থেকে La Primavera বা Spring কনচেয়েরটোর প্রথম মুভমেন্ট (Allegro) –
https://www.youtube.com/watch?v=ntMzK0VLMAo
এই উপচে পড়া আনন্দময় সঙ্গীতরূপের সঙ্গে তুলন করুন ওই ভিভালদিরই Four Seasons এর (L’Inverno) বা Winter এর বিষাদময় প্রথম মুভমেন্টটি –
https://www.youtube.com/watch?v=ZPdk5GaIDjo
এবার বলি বাখের রচনা করা ‘ফিউগ’গুলোর কথা। ফিউগ কথাটা এসেছে ল্যাটিন শব্দ fuga থেকে যার মানে “flight” বা “escape”। বাখের ফিউগগুলো Affektenlehre বা আবেগের মতবাদ-এর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ প্রতিটি মিউজিকাল মুভমেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে শুরু থেকে শেষ কর্ড পর্যন্ত একটিমাত্র নির্দিষ্ট আবেগকে ধরে রাখা যায়। আর সঙ্গীত রচনায় যে বৈচিত্র্য থাকে তাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত (Controlled Variety) – আবেগের ঘন ঘন পরিবর্তন না করে, বাখ সুরের key বা স্কেল পরিবর্তন এবং কাউন্টারপয়েন্ট কৌশলের মাধ্যমে বৈচিত্র্য তৈরি করেন। এই কাউন্টারপয়েন্ট টেকনিকে একাধিক স্বাধীন সুর একই সঙ্গে শোনা যায় — প্রতিটির নিজস্ব ছান্দিক প্রোফাইল রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব structure বা গঠন — কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা সবাই একটি সুরের ঐক্যে আবদ্ধ এবং প্রাথমিক আবেগকে আরও গভীর করে তুলছে। স্কেলের নিচের দিকে নামতে থাকা ক্রোম্যাটিক লাইনগুলো গভীর শোক প্রকাশ করে ফুঁপিয়ে কান্নার মতো, আবার স্কেলের ওপর দিকে লাফিয়ে ওঠা interval গুলো আনন্দ বা বিজয় প্রকাশ করে।
নীচে লিঙ্ক দিলাম Glenn Gould এর গ্র্যান্ড পিয়ানোয় বাজানো “The Art Of Fugue BWV 1080” – Contrapunctus I
ইংরেজি সাহিত্যে বারোক স্টাইল
বারোক শিল্প এবং সঙ্গীতের মতই বারোক কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে দেখা যায় পবিত্র ও অপবিত্রের সংঘর্ষ, এবং তার সঙ্গে অতিশয়োক্তি, বৈপরীত্য ও নাটকীয় সম্বোধন। আর তার সঙ্গে টেকনিক হিসেবে দেখা যায় এক স্বতন্ত্র কাব্যকৌশল, যার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-
১) মেটাফিজিকাল কনসিট (Metaphysical Conceit): সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী দুটি বিষয়ের মধ্যে বিস্তারিত, যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্য স্থাপন — কেবল সংক্ষিপ্ত রূপক নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী তার্কিক কাঠামো।
২) কথ্য অথচ জটিল বাক্যগঠন: এই কবিতার ভাষা বাইরে সরল মনে হলেও ভেতরে অত্যন্ত জটিল। বাক্য মাঝপথে শুরু হয়, বাধা পড়ে, আবার শুরু করে, যুক্তি দেয়। এই সিনট্যাক্স নিয়ে আমরা আরো আলোচনা করব।
ইংরেজি সাহিত্যে বারোক শৈলী বলতে আমরা মোটামুটি ভাবে সপ্তদশ শতাব্দীর মেটাফিজিক্যাল (metaphysical) বা অধিবিদ্যা-বিষয়ক কবিদের উদাহরণ দিই। এই যুগের প্রধান ইংরেজ কবিদের মধ্যে রয়েছেন:
• রিচার্ড ক্র্যাশ(-অ) (Richard Crashaw): ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি গভীর আবেগপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক ভাবসমৃদ্ধ ভক্তিমূলক কবিতা রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টিগুলোর মধ্যে রয়েছে “দ্য উইপার” (The Weeper) এবং “হিম টু সেন্ট টেরেসা” (Hymn to Saint Teresa)।
জন ডান (John Donne): মেটাফিজিক্যাল কবিদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয়।
প্রিয় কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে – The Good-Morrow, The Canonization, The Flea, এবং তাঁর Holy Sonnets থেকে (I) Thou hast made me, And shall thy worke decay? (X) Death be not proud এবং (XIV) Batter my heart, three person’d God।
এছাড়াও খুবই প্রিয় ডানের গদ্য, বিশেষ করে Devotions Upon Emergent Occasions থেকে Meditation অংশগুলি। তাঁর রচনায় দার্শনিক গভীরতা ও নাটকীয় টানাপোড়েনের পাশাপাশি পবিত্র ও পার্থিব বিষয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।
জর্জ হার্বার্ট (George Herbert): তাঁর কবিতায় দেখা যায় শান্ত অথচ গভীর আবেগ। বিশ্বাস, সংশয় ও ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কের ওপর রচিত জটিল ও রূপকধর্মী কবিতার জন্য তাঁর পরিচিতি। তাঁর সর্বাধিক সমাদৃত কাব্যসংকলনটির নাম “দ্য টেম্পল” (The Temple)।
অ্যান্ড্রু মার্ভেল (Andrew Marvell): কূটাভাস (paradox) ও রসবোধের (wit) এক অনন্য কারিগর। মার্ভেল রাজনৈতিক ভাষ্যের সাথে গীতিধর্মী ও সুবিন্যস্ত বারোক চিত্রকল্পের এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা হলো “টু হিজ কয় মিস্ট্রেস” (To His Coy Mistress)।
• জন মিল্টন (John Milton): মিল্টন নিজেই একটি বিশিষ্ট যুগ। তাঁর সাহিত্যকর্মকে প্রায়শই রেনেসাঁ ও বারোক— এই উভয় ধারার সংযোগস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও তাঁর রচনার ভিত্তি ছিল মূলত ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল, তবুও মিল্টন বারোক শৈলীর জাঁকালো ও মহিমান্বিত নান্দনিকতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন।
জন ডানের কবিতার সিনট্যাক্স নিয়ে আমরা এবার আলোচনা করব। এই আলোচনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কিভাবে আধুনিক কবিতায় বারোক স্টাইল আবার ফিরে আসছে।
ডানের কবিতা থেকে উদাহরণ দিয়ে দিয়ে সিনট্যাক্স চিহ্নিত করার আগে কবিতার সিনট্যাক্সের দুই প্রধান চলন – প্যারাট্যাকটিক (paratactic) এবং হাইপোট্যাকটিক (hypotactic) নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলা দরকার। এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি অবসরের আগের এক সংখ্যায় – লিঙ্ক দিলাম নীচে।
সিনট্যাক্সের রকমভেদ – প্যারাট্যাকটিক এবং হাইপোট্যাকটিক সিনট্যাক্স
প্যারাট্যাকটিক সিনট্যাক্স হলো পাশাপাশি সাজানো বিন্যাস – সহজ, সাধারণ ভালো বাংলা বাক্য – যেভাবে আমরা বাংলায় কথা বলি – একটা লাইন, তারপর আরেকটা লাইন, সরাসরি, সোজাসুজি, খোলামেলা।
একটা উদাহরণ দিই রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’ থেকে –
রাম বনে ফুল পাড়ে। গায়ে তার লাল শাল। হাতে তার সাজি। জবা ফুল তোলে। বেল ফুল তোলে। বেল ফুল সাদা। জবা ফুল লাল। জলে আছে নাল ফুল।
অন্যদিকে হাইপোট্যাকটিক লেখায় একটি প্রধান খণ্ডবাক্য (principal clause) থাকে যেটা বাক্যাংশ (phrase) এবং অধীন খণ্ডবাক্যের (subordinate clause) সাহায্যে নির্মিত হয়।
উদাহরণ দিই কমলকুমারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ থেকে –
বৈজুনাথ তাঁহার বাক্যে থতমত তূপীকৃত, কেন না বিচারের আঁচড় ইকড়ি ছাড়িয়া বেশ কিছুটা দুরে সে দাঁড়াইয়াছিল, এবং পরে, অতর্কিত কিছুটা দূরে পুনরায় সরিয়া গিয়া বলিল, “বিধান বল?…কাঁহাতক বুড়া মানুষটা হিম খাবে গো, আর মড়াবসার, মড়া পুড়ার গন্ধ শুকবে…বড় পুণ্যাত্মা গো, শুকনা ডালে পাখী দুটো বড় হিমসিম খায়।”
জন ডানের কবিতার বিশেষ আকর্ষণ হলো এক জটিল সিনট্যাক্স এবং একই কবিতার মধ্যেই পরিবর্তনশীল বাক্যগঠনশৈলী —যা গড়ে উঠেছে প্যারাট্যাকটিক এবং হাইপোট্যাকটিক উভয় কাঠামোর উপাদান নিয়েই। একটা উদাহরণ দিই The Canonization কবিতা থেকে
For God’s sake hold your tongue, and let me love,
Or chide my palsy, or my gout,
My five gray hairs, or ruined fortune flout,
With wealth your state, your mind with arts improve,
Take you a course, get you a place,
Observe his honor, or his grace,
Or the king’s real, or his stampèd face
Contemplate; what you will, approve,
So you will let me love.
এখানে একটা মাত্র বাক্য রয়েছে – যা গড়ে উঠেছে ১১টা স্বাধীন খণ্ডবাক্য (independent clause) নিয়ে, আর একেবারে শেষ লাইনটির আগে পর্যন্ত কোনো অধীন (subordination) খণ্ডবাক্য নেই। হাইপোট্যাকটিক রচনার এক বলিষ্ঠ উদাহরণ। লক্ষ্য করুন, কিভাবে ডান যুক্তির বিস্তার এবং দীর্ঘ রূপক বা ‘কনসিট’ (conceits) গড়ে তোলার জন্য হাইপোট্যাক্সিস বা জটিল বাক্যগঠনশৈলী ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘ ও সাবলীল বাক্যগুলো গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার আবহ তৈরি করে এবং পাঠকের মনকে কবির চিন্তাপ্রবাহের সাথে সাথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
যদিও এই কবিতার সামগ্রিক কাঠামোতে হাইপোট্যাক্সিসই প্রধান উপাদান, তবুও ডান কবিতাটির বিখ্যাত প্রথম পঙ্ক্তিতে কৌশলগতভাবে প্যারাট্যাকটিক উপাদান ব্যবহার করেছেন শ্বাসাঘাত প্রয়োগ করতে এবং একটা জরুরি ভাব বা নাটকীয়তার ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার জন্য। প্রথম লাইন “For God’s sake hold your tongue, and let me love”—এ দেখুন ডান কেমন দুটি জরুরি নির্দেশকে যুক্ত করে একটি নাটকীয় ও দ্বান্দ্বিক সুর তৈরি করেছেন। পুরো কবিতাটায় সহজ ও সরাসরি নির্দেশ (প্যারাট্যাকটিক) এবং বিস্তারিত যুক্তি-ব্যাখ্যার (হাইপোট্যাকটিক) মধ্যের এই টানাপোড়েন কবিতায় বর্ণিত প্রেমের জটিলতাকে এক নতুন ভাবে প্রতিফলিত করে।
আর একটি উদাহরণ দিই ডানের The Flea কবিতা থেকে
Mark but this flea, and mark in this,
How little that which thou deniest me is;
It suck’d me first, and now sucks thee,
And in this flea our two bloods mingled be.
Thou know’st that this cannot be said
A sin, nor shame, nor loss of maidenhead;
Yet this enjoys before it woo,
And pamper’d swells with one blood made of two;
And this, alas! is more than we would do.
এখানে জন ডান একটি পরজীবী পোকাকে কেন্দ্র করে এক সুনিপুণ এবং বর্ধিত রূপক (conceit) ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি এক নারীকে শারীরিক মিলনে প্ররোচিত করার চেষ্টা করছেন এবং যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, যেমন ওই পোকার শরীরে তাদের রক্ত মিশে যাওয়াটা কোনোভাবেই পাপ বা সম্মানহানির বিষয় নয়, ঠিক তেমনই তাদের শারীরিক মিলনের ক্ষেত্রেও কোনো পাপ বা সম্মানহানি হতে পারে না।
লক্ষ্য করুন বর্ধিত রূপক বা conceit ছাড়াও বারোক স্টাইলের অন্যান্য মূল বৈশিষ্ট্যগুলি কিভাবে এই কবিতায় প্রকাশ পায়
বাক্যগঠন: Mark but this flea — কবিতাটি শুরু হয় মাঝ-কথোপকথনে, একটি আদেশ দিয়ে। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো ধ্রুপদী বা পেট্রার্কীয় স্টাইলে প্রারম্ভিকতা নেই। আমরা দেখি বারোক শিল্পের আলো-আঁধারির খেলা – সহজ ও সরাসরি নির্দেশ (প্যারাট্যাকটিক) এবং বিস্তারিত যুক্তি-ব্যাখ্যার টানাপোড়েন প্রেমের জটিলতাকে এক নতুন ঝলকানিতে প্রকাশ করে।
শব্দচয়ন: sucks, pamper’d, swells — এগুলো অভিজাত শব্দ নয় অথচ ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির পাশে বসানো হয়েছে। আবার সেই পবিত্র ও অপবিত্রের সংঘর্ষ, এবং তার সঙ্গে অতিশয়োক্তি, বৈপরীত্য ও নাটকীয় সম্বোধন।
Affektenlehre: ভিভালদির সঙ্গীতের একক-আবেগ দেখবেন ডানের “দ্য ফ্লি” কবিতায় – সমস্ত কবিতা জুড়ে একটিই ব্যঙ্গাত্মক যুক্তি বজায় থাকে। তার সাথে কারাওয়াজিওর ‘সেন্ট ম্যাথিউর আহ্বান’ চিত্রের মতন সমগ্র কবিতাটি যেন একটিই নাটকীয় মুহূর্ত ধরে রাখে।
কাউন্টারপয়েন্ট: বাখের সঙ্গীতের কাউন্টারপয়েন্ট যেন দেখা দেয় কবিতায় বারোক কনসিট হিসেবে — কাউন্টারপয়েন্ট যেমন দুই বা তিনটি স্বাধীন সুরকে (ছন্দে ভিন্ন, চলনে ভিন্ন) জুড়ে একটি মধুর সুর গড়ে তোলে, ডানও তেমনি একটি মাছি ও একটি বিবাহ-সংস্কারকে – দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস – তাঁর বিস্তারিত যুক্তি সাজিয়ে একসাথে কাজ করতে বাধ্য করেন।
আমরা প্রথম পর্ব শেষ করব জন ডানের সবচেয়ে পরিচিত একটি বাক্যাংশ দিয়ে – For Whom the Bell Tolls – যাকে হেমিংওয়ে অমর করে রেখেছেন তাঁর একটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম হিসেবে ব্যবহার করে। অনেকের ধারনা এটি ডানের একটি কবিতার অংশ। এই ধারনাটি সম্পূর্ণ ভুল। এটি আসলে ডানের গদ্য Meditation এর অংশ – Meditation 17 থেকে এই অপূর্ব অংশটি দিচ্ছি এখানে –
“No man is an island, entire of itself; every man is a piece of the continent, a part of the main. If a clod be washed away by the sea, Europe is the less… any man’s death diminishes me, because I am involved in mankind, and therefore never send to know for whom the bell tolls; it tolls for thee.”
উদ্ধৃতির শেষ লাইনটি গৌতম বসু রূপান্তর করেছেন তাঁর “সুকুমারীকে না-বলা কথা” বইয়ের উৎসর্গে –‘আর সেহেতু, কদাচ সন্ধান করিও না, কাহার তরে আসিল ঘন্টাধ্বনির শমন, উহার লক্ষ্য, কেবল তুমিই’।
