প্রাচীন ইজিপ্টে ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শন
আমার কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল, হুড়মুড় করে ঘরে পা রেখে দেখি আমাদের হিস্ট্রি সোসাইটির অন্য সবাই এসে গেছে, চা-সিঙ্গাড়া প্রায়ে শেষের দিকে। উদয়দার বাড়িতে আজকের আসর, উনিই আজকের নিমন্ত্রনকর্তা ও বক্তা। আমার দিকে ও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ইজিপ্ট সম্বন্ধে পিরামিড ছাড়া আরো তিনটে জিনিসের নাম কর, নাহলে দেরি করে আসার জরিমানা হবে তোর।”
ইতিহাসটা আমার ঠিক আসে না। আমতা আমতা করে বললাম, “নীলনদী, ফ্যারাও আর ক্লিওপ্যাট্রা।” ক্লিওপ্যাট্রার নাম বলতেই একটা চাপা হাসির আওয়াজ পেলাম।
উদয়দা বলল, “ক্লিওপ্যাট্রার অনুরোধে জরিমানা মকুব হল তোর।”
নীরব ঘরের বাতাস প্রত্যাশায় আর ধূপের সুগন্ধে ভারী। বাইরে গাছের পাতায় জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়ছে।
উদয়দার গম্ভীর আওয়াজ নীরবতা ভাঙল।
“প্রথমে একটু গৌরচন্দ্রিকা করেনি। আমাদের মধ্যে অনেকে বেড়াতে গিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে দেন ‘আমি অমুক জায়গায়।’ অথবা পাথর দিয়ে দেওয়ালে নিজের নামটি খোদাই করে আসেন, যদিও এটি vandalism। কয়েকমাস আগে সংবাদ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে শোরগোল তুলেছিল একটি খবর। প্রায় হাজার দুই বছর আগে, এক তামিল পর্যটক ইজিপ্টের Valley of Kings এর দেওয়ালে, ব্রাহ্মী লিপিতে, তামিল ভাষায়, নিজের নামটি খোদাই করে আসে।[১] এই খবরটা তোমাদের মধ্যে কে কে পড়েছ?”
অঞ্জনদা, দিবাকর, ও গৌতমদা ইতিহাসে ধুরন্ধর, বোধহয় সকাল বিকেল ইতিহাস খায়। ওরা সটান হাত তুলল। আমি এই খবরটা পড়িনি, তাই চুপ করে বসে থাকলাম।
উদয়দা বলল, “তবে সংবাদ মাধ্যম যা নিয়ে হইচই করেছে, তা আসল গবেষণার একটি টুকরো মাত্র, একটি মোটা বইয়ের কয়েকটি পাতা। প্রাচীন ইজিপ্টে যে ভারতীয়দের একটা উপনিবেশ ছিল, সেটার উল্লেখ করেনি।”
“তার মানে, আরো অন্য ভারতীয় লিপি বা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে?” দিবাকর প্রশ্ন করল।
“ঠিক তাই।” উদয়দা বলে চলল, “কিন্তু কী রকম সেই ভারতীয় লিপি বা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি? কত পুরোনো তারা? কী লেখা আছে সেইসব লিপিতে? ভারতীয়রা কেন ইজিপ্টে আড্ডা গেড়েছিল? কোন জায়গায়? আজকের বক্তৃতায় এই সব প্রশ্নগুলির উত্তর দেবার চেষ্টা।”
প্রশ্নের তরঙ্গ সবার মনের দরজায় কড়া নাড়ল। মনোযোগ বেড়ে গেল কয়েকগুণ।
“আজ থেকে একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালে ইজিপ্টে Valley of Kings-এ প্রায় ২০০০ গ্রীক ও লাতিন graffiti লিপির সন্ধান পান Jules Baillet।[২] সেই তালিকায় অবশ্য তামিল বা অন্য ভারতীয় ভাষার উল্লেখ নেই, কিন্তু Jules Baillet-র মনে হয়েছিল তিনি কিছু কিছু লিপি দেখেছেন যা ভারতীয় কোনো ভাষায় হতেও পারে। তিনি বা ইজিপ্টের গবেষকেরা এই নিয়ে আর কিছু লেখেননি।”
উদয়দা একটু থেমে জিজ্ঞাসা করল, “সম্রাট অশোক ইজিপ্টে দূত পাঠিয়েছিলেন, এটা তাঁর কোন শিলালিপিতে আছে? কে বলতে পারে?”
দিবাকর ইতিহাসে এম এ, তাই তক্ষণাৎ উত্তর দিল, “সম্রাট অশোকের তের নম্বর শিলালিপিতে এর উল্লেখ আছে। সম্রাট অশোক তাঁর ধর্মবিজয়ের জন্য যাদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ইজিপ্টে এসেছিলেন রাজা Ptolemy-র সময়, আনুমানিক ২৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।”
“ঠিক, সম্রাট অশোক তের নম্বর শিলালিপিতে যে কয়জন বিদেশি রাজার উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে একজনের নাম শিলালিপিতে ‘তুলময়’ লেখা আছে। তিনি আসলে ইজিপ্টের গ্রিক রাজা Ptolemy II Philadelphus। যদিও এর আগের থেকেই ভারতীয়রা ইজিপ্ট সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল, সম্ভবত বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে, না হলে সম্রাট অশোক ইজিপ্টে দূত পাঠাবেন কেন!
“ইজিপ্টের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের উল্লেখ প্রথম খ্রিষ্টাব্দে লেখা Periplus of the Erythraean Sea নামের এক প্রাচীন গ্রিক-রোমান বইয়ে পাওয়া যায়। এতে ভারতের পশ্চিম উপকূলের ভরুকচ্ছ (বর্তমান ভুজ) থেকে শুরু করে বর্তমান কেরল ও তামিলনাডুর প্রাচীন বন্দরগুলির সঙ্গে ইজিপ্ট ও ইথিওপিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগের উল্লেখ আছে। প্রাচীন নাবিকরা মৌসুমী বায়ুর গতিপথের সাহায্য নিয়ে সাগর পাড়ি দিতেন, তার উল্লেখও পাওয়া যায়।

“প্রাচীন ইজিপ্টের লোহিত সাগরের (Red Sea) তীরবর্তী বন্দরগুলির মধ্যে Quesir-al-Qadim (প্রাচীন নাম Myos Hormus) এবং Berenike (প্রাচীন নাম Berenice Troglodytica) ছিল সেই যুগের দুই বিখ্যাত বন্দর। ভারতীয় পণ্য এই বন্দরগুলি থেকে সড়ক ও নদীপথে Alexandria যেত, তারপর জাহাজে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে রোম পৌঁছত।
“প্রাচীন Quesir-al-Qadim বন্দরে ১৯৬৮ সালে তিনটি লিপির সন্ধান পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে একটি কোনো ভাঙ্গা মৃৎপাত্রের টুকরোয় লেখা ব্রাহ্মী লিপিতে প্রাকৃত ভাষায় লেখার অংশ, যার অনুবাদ নিয়ে মতভেদ আছে। ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও V S Wakankar[৩] এবং Richard Salomon[৪,৫] এর ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদ করেছেন। অন্য দুটির ভাষার পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে, একটি সম্ভবত তামিল ও অন্যটি কন্নড় অথবা তুলু ভাষায়।”
উদয়দার ফ্লাস্কে স্পেশাল বিদেশি সুগন্ধী গ্রিন টি থাকে। সেটা কাপে ঢেলে সড়াৎ শব্দে একচুমুকে গলা ভিজিয়ে আবার শুরু করল।
“ভারত থেকে ইজিপ্ট যাবার পথে লোহিত সাগরের মুখে Socotra নামে একটা দ্বীপ পড়ে, Horn of Africa থেকে বেশি দূরে নয় (আগের ছবি দেখুন)। এই দ্বীপটি ছিল নাবিক ও বনিকদের একটা বিশ্রামের জায়গা। এই দ্বীপে Hoq Cave গুহাতে গ্রিক, ব্যাক্ট্রিয়ান ভাষার সঙ্গে ব্রাহ্মী ভাষার প্রচুর শিলালেখ পাওয়া গেছে।[ছবি ২] পথিকরা তাদের নাম লিখে গেছে গুহার গায়ে। কয়েকটা নাম পড়ে শোনাচ্ছি – সংঘনন্দী, বিষ্ণুসেন, রুদ্রদত্ত, কুমারসেন, অর্যমাভূতি, সূর্যসিংহ…।”

দিবাকরের ক্ষুরধার বুদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে নামরহস্য বুঝে ফেলল। “তার মানে সেই যুগে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় প্রথম-তৃতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধ, বৈষ্ণব, শৈব, কুমার অর্থাৎ কার্তিক উপাসক, সূর্য উপাসক, এরা সবাই সমুদ্র বাণিজ্য করেছেন।”
গৌতমদা যোগ করল, “তার মানে সব ধর্মের মেলামেশা ছিল এবং কালাপানির ভয় নিষেধের বাধা ছিল না, তাই বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী এবং উদ্যোগী পুরুষ লক্ষ্মীলাভ করে, এই আপ্তবাক্যেই জনতা বিশ্বাস করত।”
আমি যে সব কথা বুঝতে পারছিলাম তা নয়, কিন্তু একটা খটকা লাগল। জিজ্ঞাসা করলাম, “অর্যমাভূতি বলে আরো একটা নাম তালিকায় ছিল, ইনি কোন দেবতার উপাসক?”
আমার প্রশ্ন শুনে সকলে একযোগে অট্টহাসি দিল। বুঝলাম একটা বড়ো ভুল করেছি। অঞ্জনদা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যে প্রাচীনকাল হলে ব্রহ্মতেজে ভস্ম হয়ে যেতাম। আমার প্লেটের দিকে নজর দিয়ে বলল, “ওরে কে আছিস, ওর শিঙাড়া কেড়ে নে তো!” গুণীজনের বকুনি আশীর্বাদস্বরূপ, তবু আমি দ্রুত দু’হাত দিয়ে আমার শিঙাড়া গড় রক্ষা করলাম।
দিবাকর বলল, “এই জন্যই তোকে বলি কোহলি আর ক্রিকেট ছেড়ে ভারতের ইতিহাস পড়। অর্যমা হচ্ছেন একজন বৈদিক দেবতা, বর্তমানে কেবল মন্ত্রের মাঝেই বেঁচে আছেন।” তারপর কী একটা সংস্কৃত মন্ত্র বলল, সেটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। কিন্তু আমি একটা কথা হাড়েহাড়ে বুঝলাম, সব রকমের ভারতীয় সেকালে সমুদ্রযাত্রা করেছেন।
আমার শিঙাড়া গড়ের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হল না দেখে, উদয়দা আবার শুরু করল।
“এতক্ষণ যা বললাম সেটা ছিল ভূমিকা, আসল চমকটা হচ্ছে Berenike-র খোঁড়াখুঁড়ি থেকে পাওয়া ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি। লোহিত সাগরের Berenike বন্দরটির ইতিহাসও বৈচিত্র্যপূর্ণ। এর শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গ্রিক রাজা Ptolemy II-র আমলে। ইনি সেই রাজা, যাকে সম্রাট অশোক দূত পাঠিয়েছিলেন। তারপর ইজিপ্ট রোমান শাসনে আসার পরেও (৩০ খ্রিস্টপূর্বের পর), এটি হয়ে ওঠে ইজিপ্ট ও ভারতের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান বন্দর। দ্বিতীয় শতকের পরে এর জৌলুস কিছুটা কমে যায়, তারপর আবার চতুর্থ শতকে বাড়ে। পঞ্চম শতক থেকেই এর অবস্থা পড়তির দিকে এবং মধ্য-ষষ্ঠ শতকে এটি পরিত্যক্ত হয়। Berenike-তে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয় ১৯৯৪ সালে এবং এখন অবধি এই প্রাচীন বন্দরটির কেবল একটি ছোট অংশেই খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে।
“প্রাচীন বন্দর Berenike-র সবচেয়ে উঁচু অংশটিতে ছিল একটি মন্দির, দেবী আইসিস-এর (Isis) মন্দির। ১৪-৩৭ খ্রিস্টাব্দে, Marcus Laelius নামে এক রোমান বণিকের দাক্ষিণ্যে তৈরি। আর সেই মন্দিরেই বেশ কিছু ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে।”
অঞ্জনদা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, “আইসিস, যিনি প্রাচীন ইজিপ্টে মাতৃত্বের দেবী এবং যার জনপ্রিয়তা একসময় সারা ইয়োরোপে ছড়িয়ে পড়ে, তার মন্দিরে পাওয়া গেছে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন?”
“ঠিক, তবে আইসিস ছাড়াও অন্য অনেক দেবদেবীর মূর্তি এখানে পাওয়া গেছে। এই মন্দিরের কিছু অংশ সম্ভবত স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হত।” উদয়দা আবার শুরু করল। “তার বিভিন্ন অংশে পাওয়া গেছে একটি বুদ্ধ মূর্তি, বুদ্ধের মাথা ও তার কিছু ভগ্নাংশ, একটি সংস্কৃত ভাষায় ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা শিলালিপি, দুটি সাতবাহন মুদ্রা, এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ আরো এক পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন – পাথরে খোদাই করা তিন ভারতীয় দেবতা, খুব সম্ভবত বলরাম, কৃষ্ণ ও অন্য এক বৃষ্ণি বীর।[৬] কপিরাইটের কারণে সব ছবিগুলি দেওয়া গেল না।”

উদয়দা এক নিশ্বাসে সব বলে গেল আর তালিকা শুনে সবাই হতবাক, যাকে বলে বাক্যি হরে গেল!
গৌতমদার পরের প্রশ্নটাও দারুণ, “এই বুদ্ধ মূর্তি কি ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?”
অঞ্জনদা এর উত্তরটা দিয়ে দিল।
“না, মাথার পেছনে Disk, যেটা আমরা Nimbus বলি, সেটা দেখো ভালো করে। এটা রোমান স্টাইলের সঙ্গে বেশি মেলে, এই মূর্তি স্থানীয় শিল্পীর দ্বারা ইজিপ্টে তৈরি।”
আমি খালি অবাক হয়ে এদের মুখের দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি, কি লেভেলে পড়াশোনা থাকলে এই ধরনের প্রশ্ন আর উত্তর পাওয়া যায়।
উদয়দা যোগ করল, “ঠিক বলছে সবাই। আরো একটা তথ্য, এই মূর্তি তৈরি হয়েছিল স্থানীয় Anhydritic Gypsum দিয়ে। আরো খেয়াল করলে দেখা যাবে Berenike বুদ্ধের চোখ ও ঠোঁট অন্যান্য গ্রিক-রোমান দেবতাদের মতো। তার মানে বোঝো ভারতীয় সভ্যতা কতটা গভীরে শেকড় গেড়েছিল, যে স্থানীয় শিল্পী বুদ্ধমূর্তি তৈরি করেছিল। তার কাছে ভারতীয় বুদ্ধের নমুনা নিশ্চয় ছিল, কিন্তু সে তাতে নিজস্ব স্বকীয়তা জুড়েছে। অসামান্য!”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কিন্তু কবেকার এই মূর্তি, কোন যুগের?”
সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি কোনো জলজন্তু, ডাঙ্গায় উঠে এই সভায় যোগ দিয়েছি।
দিবাকর বলল, “প্রথমেই শুনেছিস দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বাণিজ্যের কথা, তারপর শুনলি সাতবাহন মুদ্রা পাওয়া গেছে। তার মানে বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখতে গেলে, প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে। কত বার তোকে বলছি, ভারতের ইতিহাস পড়, আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর কথা, বর্তমানের মাঝে কেমন ভাবে অতীত লুকিয়ে আছে, সেই সব জানতে পারবি। কিন্তু আমার কথা তো শুনবি না।”

দিবাকরের গজগজ থামিয়ে দিয়ে উদয়দা বলে চলল, “এবারে আসছি ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা একমাত্র শিলালিপির প্রসঙ্গে।(ছবি-৪) লিপিটির অনেক অংশ পড়া যায় না ও গবেষকরা কিছুটা পুনর্নির্মাণ করেছেন। এর অর্থ হচ্ছেঃ[৭]

প্রথম লাইনঃ- (গ্রিক) শুভ (ভাগ্য?)।
দ্বিতীয়-চতুর্থ লাইনঃ- (সংস্কৃত) সিদ্ধম। রাজা ফিলিপের ষষ্ঠ বৎসরে, শুক্লপক্ষে ৫ম দিনে আশ্ব(উজ)… এই দিনে ক্ষত্রিয় বাসুল […] প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করেছিল সকলের মঙ্গল ও হিতের জন্য।
পঞ্চম লাইনঃ- (গ্রিক) বাজুলা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
“একটা জিনিস লক্ষ্য কর, প্রথম ও শেষ লাইন গ্রিক ভাষায় লেখা। অর্থাৎ স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভারতীয়দের সম্বন্ধ বেশ ভালো ছিল। আর সাল তারিখ তো লিপিকার নিজেই দিয়ে গেছেন, এবং সেটা ভারতীয় অব্দে নয়, রোমান সম্রাট ফিলিপ-১-এর (রাজত্বকাল খ্রিঃ ২৪৪-২৪৯) রেফারন্সে। এই লিপির সঠিক তারিখ হচ্ছে সেপ্টেম্বর ৯, ২৪৮ খ্রিস্টাব্দ।[৮] গবেষকরা মনে করেন ক্ষত্রিয় বাসুল বুদ্ধমূর্তি স্থাপনা করেছিলেন।[৯] এর থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রাচীন ইজিপ্টে ভারতীয়দের সংখ্যা ও সম্মান দুটোই কম ছিল না।”
আমি অনেকক্ষণ থেকে একটা প্রশ্নের জন্য উসখুস করছিলাম, “এই সবই হয়েছিল বাণিজ্যের জন্য। কিন্তু কিসের বাণিজ্য হতো সেটা জানতে পারলাম না?”
ভালো প্রশ্ন, উদয়দার মাথা নেড়ে appreciation আমার মনে আনন্দ তরঙ্গ তুলল।
“Berenike-তে খোঁড়াখুঁড়ির সময় একটা জিনিস পেয়ে পুরাতাত্ত্বিকেরা অবাক হয়ে যান। সেটা হচ্ছে ১৬ পাউন্ড গোলমরিচ ভরা একটা মাটির কলসী।[১০] রোমানদের কাছে গোলমরিচ ছিল কালো সোনা, একেবারে শ্রেষ্ঠ মশলা। রোমানরা ভারত থেকে সোনা দিয়ে কিনে নিয়ে যেত গোলমরিচের মতো মসলা, মসলিন, সিল্ক, রত্ন পাথর, মুক্তো, হাতির দাঁত। এমনকি ভারতীয় হাতি বা বাঘের মতো জানোয়ারও বিক্রি হত রোমে। বদলে রোম থেকে আসত সোনা, রূপো, মদ, কাঁচের তৈরি Exotic সব জিনিসপত্র।[১১] রোমের এক গুণীজন Pliny the Elder দুঃখ করে বলেছিলেন ‘রোমের আদ্ধেক সোনা তো ভারতেই চলে যাচ্ছে! ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, মূলত উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রচুর রোমান স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। প্রাচীন তামিল সাহিত্যে সমুদ্র বাণিজ্যের উল্লেখ আছে। কিন্তু যেগুলো বললাম সেছাড়াও আরো অন্য কিছু রোম থেকে ভারতে আমদানি হতো। কেউ আন্দাজ করতে পারো?”
সবাই অনেক কিছু বলল, কিন্তু উদয়দা সব উত্তর বাতিল করে দিল।
“মানুষ – গ্রিক-রোমান সৈন্য, mercenaries এবং ক্রীতদাস ক্রীতদাসী।”[১২] এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল রমাদি আর টিংকুদি। উত্তরটা এলো সেদিক থেকে।
“একেবারে ঠিক, রোমান সৈন্যদের কদর ছিল ভারতে, আর তারা খুব অনুগত ছিল। কিন্তু তোমরা জানলে কি করে?” উদয়দা একটু অবাক হল।
“বাজে প্রশ্ন, সরস্বতী আর মহামায়ার অজানা কী থাকতে পারে? তার চেয়ে বরং তামিল লিপির কথা, যেটা কাগজে বেরিয়েছিল, সেটা বল।” রমাদি উত্তর দিল।
“সরস্বতী আর মহামায়াদের প্রণাম করি। ধৈর্যং রহু রাই, সবুর করো, আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। তবে আমাদের সভা শেষের পথে। অন্নপূর্ণাদের অগ্রিম জানিয়ে রাখছি।

“এইবার Berenike থেকে দৃশ্যপট বদলে আমরা যাবো ইজিপ্টের Valley of Kings, বর্তমানে যা Luxor (প্রাচীন নাম Thebes) শহরের কাছে। এখানেই আছে টুটানখামুন, দ্বিতীয় রামেসিস, আরও অনেকের সমাধি। আসলে প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগেও, আজকের মতো Valley of Kings একটি tourist attraction ছিল। যারা বাণিজ্য করতে আসতেন তারা এগুলি দেখতে যেতেন। তাদের মধ্যে চিকাই কোরটান (Cikai Kortan) নামে এক তামিল বেশ কয়েকটি সমাধিতে নিজের নাম লিখে গেছেন ‘চিকাই কোরটান এখানে এসেছিল এবং দেখেছিল।’ Rameses IX–এর সমাধির দেওয়ালে তামিল লেখাটি প্রায় ১৬-২০ ফুট উঁচুতে লেখা, তার মানে মই বেয়ে উঠে লেখা। তবে কেবল তামিল নয়, ইন্দ্রনন্দী বলে এক ভারতীয় অন্য এক সমাধিতে সংস্কৃতে নিজেকে ক্ষহরত রাজার দূত পরিচয় দিয়ে লিখে গেছেন। এখানে বলে রাখি ক্ষহরত রাজারা ছিলেন পশ্চিম শকদের একটি শাখা, যারা পশ্চিম ভারতে রাজত্ব করতেন। ছটি সমাধির দেওয়ালে চারিটি ভারতীয় ভাষায় লেখা প্রায় ৩০টি লিপি (graffiti) পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে মোট ২০টি প্রাচীন তামিল ভাষায় ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা।[ছবি-৫] বাকিগুলি প্রাকৃত, খরোষ্টী, ও সংস্কৃত ভাষায় ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। তবে কেবল তামিল নয়, গ্রিক ও আরামাইক ভাষাতেও প্রায় ২০০০ graffiti আছে, এবং এই ভিড়ের মাঝে তামিল ও অন্য ভারতীয় ভাষার লেখাগুলি লুকিয়ে থাকাতে ২০২৪ সালের আগে খুঁজে পাওয়া যায় নি।”[১৩]
আসরের শেষ প্রশ্নটা এল গৌতমদার কাছ থেকে। “একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তামিল ছাড়াও অন্য লিপি ছিল এবং Berenike-তে কতো কিছু পাওয়া গেছে, তাহলে কেবল তামিল লিপির কথা সংবাদ মাধ্যমে ফলাও হল?
“তার প্রথম কারণ, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চেন্নাইয়ে ‘International Conference on Tamil Epigraphy’-তে এই বিষয়ে বলেন Prof. Charlotte Schmidt এবং Prof. Ingo Strauch। সেখান থেকেই কথাটা প্রচার হয়। দ্বিতীয় কারণটি আমার মতে রাজনৈতিক, কাজেই আমাদের সভার নিয়ম অনুযায়ী আর কিছু বলছি না।” উদয়দা তার বক্তব্য শেষ করল।
সভার শেষে রমাদি ও টিংকুদির তত্ত্বাবধানে ভোজন পর্ব প্রায় শেষের দিকে, মিষ্টির আয়োজন চলছে। সেই সময় উদয়দা রমাদিকে যা বলল, সেটা আমার পক্ষে একেবারে প্রাণঘাতী।
“রমা, আজ বাবুলকে একটার বেশি রসগোল্লা দিও না, ও ইতিহাস পড়াতে ফাঁকি দিচ্ছে।”
“আমার ভাইকে আমি কটা রসগোল্লা দেব সেটা আমি ঠিক করব।” আমার মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে রমাদি বলল, “মিষ্টি খায় বলেই তো ওর গানের গলা এত মিষ্টি।”
“ঠিক আছে, তাহলে খাওয়ার পর কয়েকটা গান শুনিয়ে যাস,” অঞ্জনদার আদেশ, তাতে সবাই সায় দিল।
আমি একটা রসগোল্লা মুখে দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেতে লাগলাম আর উদয়দা ও অঞ্জনদা আমার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের ডায়াবেটিক খাবারে মন দিল।
———-
তথ্যপঞ্জি
১) Charan, N. Sai. (2026, February 12). “Tamil Brahmi inscriptions found in Egypt’s Valley of the Kings shed light on ancient trade links.” The Hindu. Available: https://www.thehindu.com/news/national/tamil-nadu/tamil-brahmi-inscriptions-found-in-egypts-valley-of-the-kings-shed-light-on-ancient-trade-links/article70619929.ece
২) Baillet, J. (1926). Inscriptions grecques et latines des tombeaux des rois ou syringes. Paris, France: Imprimerie de L’Institus Francais D’Archelogie Orientale.
৩) Chatterjee, S. K. (1968). India and Ethiopia: From the Seventh Century B.C. Issue 15, Vol. 15 of Monograph series, India. Calcutta: Asiatic Society.
৪) Salomon, R. (1991). “Epigraphic Remains of Indian Traders in Egypt.” Journal of the American Oriental Society, 111, 731–736. https://doi.org/10.2307/603404.
৫) Salomon, R. (1993). “Addenda to ‘Epigraphic Remains of Indian Traders in Egypt.’” Journal of the American Oriental Society 113, 593–593. https://doi.org/10.2307/605790.
৬) Sidebottom, S. E., Ast, R., et al, (2025). Indians in Roman Berenike. Jahrbuch des Deutschen Archäologischen Instituts, 140, 1-126, 237-238. https://doi.org/10.34780/n31wrw90
৭) Ibid, 272-273.
৮) Ibid, 274-275.
৯) Strauch, I., and Schmid, C. (2026, February 11-14). “From the Valley of the Kings to India: Indian inscriptions in Egypt.” Presentation at the International Conference on Tamil Epigraphy, Chennai, India. YouTube. https://www.youtube.com/live/ats1HPTaV64?t=4947s
১০) Sidebottom, S., and Wendrich, W. (Eds), (2007). Berenike 1999/2000: Report on the excavations at Berenike, including excavations in Wadi Kalalat and Siket, and the survey of the Mons Smaragdus Region. Los Angeles, USA: The Costen Institute of Archaeology, UCLA.
১১) Warmington, E. H. (1974). The commerce between the Roman Empire and India (2nd Ed). Delhi, India: Vikas Publ.
১২) Ibid, pp. 261-262.
১৩) Ibid, Strauch and Schmid.
ছবিঃ লেখক।
