এ কোন আলো
বর্ণালী কোলে-র ‘কীর্তন’-এ আমার কথারম্ভঃ
….. তোমার বইটি দেখে
আমি তাকে নিবিড়তায় ছুঁয়েছিলাম, বইয়ের মলাট চমকে উঠে বুঝেছিল
আমি রাধা
অমনি প্রতিটি অক্ষর বিহ্বল, মাতোয়ারা
এর পরই শুরু কৃষ্ণনাম, পরিক্রমা’
মোট ২৮টি গল্পের মধ্যে বেশ কয়েকটি টুকরো স্মৃতিকথা এবং ছ’টি ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে চন্দ্রকান্ত মন্ডলের ‘কুড়িয়ে পাওয়া গল্প সংগ্রহ’। যদিও ‘পথে যেতে’ শিরোনামে ভ্রমণ কাহিনীগুলোর স্বতন্ত্র উপস্থাপন এই বইয়ে, তবে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, আবেগ, অনুভূতি ও উচ্ছ্বাস গল্পগুলোতে ছড়িয়ে আছে। আবার অনেক গল্পও আত্মগোপন করে আছে এই ভ্রমণ কাহিনিতে। সবটুকু নিয়েই আমার এ পরিক্রমা।
আত্মজীবনী লেখার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ কোনদিনই আগ্রহী ছিলেন না। অনেক অনুরোধ-আবদার সত্ত্বেও কেন তাঁর এই আগ্রহহীনতা তার স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। তবে অনুসন্ধানী চোখে ধরা পয়েছে, যেহেতু রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সৃষ্টি একরকমভাবে আত্মজৈবনিক, তাই সন-তারিখ দিয়ে স্বতন্ত্র একটি আত্মজীবনী লেখার গুরুত্ব তিনি অনুভব করেননি। তাঁর ‘গোরা’ কেবলমাত্র শাশ্বত ভারতবর্ষের আবিষ্কার নয়, রবীন্দ্রনাথের অন্তরাত্মার উন্মোচনও বটে। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে বিচিত্র ভাব ও ভাবনার রবীন্দ্রনাথকে আমরা পেয়েছি। অতিথি গল্পের তারাপদ কি রবীন্দ্রনাথ নয়? রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তাঁর ‘ছোট আমি’ ও ‘বড় আমি’ কে তুলে ধরেছেন তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মাধ্যমে ঠিক সেই একইভাবে চন্দ্রকান্তবাবুকে আমরা খুঁজে পেতে পারি তাঁর গল্প ও ভ্রমণকাহিনীতে। এভাবে যে আত্মজীবনী লেখা যায় চন্দ্রকান্তবাবু নতুন করে আমাদের তা দেখিয়ে দিলেন।
তাঁর শৈশব-কৈশোরের কথা ছড়িয়ে আছে ‘হনুমানের দেশলাই ভক্ষণ’, ‘আঁধার রাতে’ ও ‘রূপোর ঝিলিক’ গল্পে। রাতে বারান্দায় ঠাকুরমার পাশে কিশোর লেখকের ঘুমের ভান করে পড়ে থাকা। নটা, সাড়ে নটার মধ্যে সারা গ্রাম ঘুমিয়ে পড়েছে। নারকেল গাছ থেকে একটা শুকনো পাতা খসে পড়লো। এই রে, যদি সবার ঘুম ভেঙে যায়? কিন্তু না, সব চুপচাপ। শুধু, মাঝে মাঝে হালকা নাক ডাকার শব্দ। খুব সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে সোজা তেঁতুল তলায়। তারপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে বন্ধুদের সঙ্গে বাঁশবুনেদের বাড়ি যাত্রা দেখতে যাওয়া। অন্ধকার পথে হোঁচট খেতে খেতে, রাশি রাশি জোনাকির জ্বলা আর নেভা সঙ্গী করে ধু-ধু ফাঁকা মাঠ অতিক্রম। ‘উপেন খুড়োর জানালার পাশ দিয়ে পথ। উপেন খুড়ো কেশো রুগী। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। জানলার ধারের পথটুকু পা টিপে টিপে পেরিয়ে হাবুলদার তালতলায় আসতেই হঠাৎ কে ধমকে ওঠে- কে যায়? বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। পরক্ষণেই মনে পড়ে, খুস! ও তো বাঁশিবুড়ো। চোরেরাও জানে, বাঁশিবুড়ো ঘুমের ঘোরে হঠাৎ হঠাৎ হেঁকে ওঠে- কে যায়?’ বার্ধক্যে উপনীত বর্তমান লেখক এই সেদিনও জানালেন, স্মৃতির সরণি বেয়ে আজও তিনি ওই পথেই হেঁটে চলেছেন। ‘হনুমানের দেশলাই ভক্ষণ’ যাত্রাপালা সেই কিশোরদের দেখা হয়নি। পরিবর্তে হরিনাম শুনতে শুনতে সেই আসরেই ঘুমিয়ে পড়া। তারপর ধাক্কাধাক্কিতে চোখ খুলতেই চারদিকে ঝলমলে সকালের রোদ।
‘আঁধার রাতে’ তিন কিশোর চলেছে পোলো চেপে মাছ ধরতে এক হাতে হ্যারিকেন, অন্য হাতে পোলো এবং কোমরে খাঁচা বেঁধে। নির্দিষ্ট অঞ্চলটির ভূগোল-ইতিহাস লেখক কিছুটা চিনিয়ে দিলেন। তখনও ক্যানিং অঞ্চলে উত্তরভাগের পাম্পিং স্টেশন হয়নি। এ অঞ্চল সারা বছর জলে ডোবা। মাঝে মাঝে গ্রামগুলো এক একটা দ্বীপের মতো। রাস্তাঘাট সব জলের তলায়। চলাচলের একমাত্র উপায় তাল গাছের ডোঙা বা শালতি কিংবা নামমাত্র দু’একটা নৌকা। এই জলা জমিকে বলা হতো বাদা যেখানে নানারকমের প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। সেখানে দাঁড়িয়ে চারদিকটা চিনিয়ে দিলেন লেখক, ‘পূর্বদিকে আমাদের গ্রাম রাধানগর।…. উত্তর-পূর্ব কোণে দাঁড়িগাছি, তারপাশে উত্তরে ডিহি, অনেকদূরে উত্তর-পশ্চিম কোণে নয়াবাদ।….. দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেক দূরে খুঁড়িগাছি, তারপাশে সোনারপুর। রাধানগরের খুব কাছে চাঁদপুর। তার পাশে কালিকাপুর’। একটা তথ্যচিত্রের মতো ছবি পাওয়া যায় সেই সময়ের, সেই যাপিত জীবনের এবং তাদের নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতিরও।
‘নিধিরাম’ গল্পে লেখক অনেকটা বড় হয়ে গেছেন। থাকেন ধর্মতলা স্ট্রিটের ওপর পারিবারিক ইলেকট্রিক রিপেয়ারিং দোকানে। বাবা-দাদা সারাদিন কাজকর্মের পর সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি সোনারপুরে ফিরে যান। লেখক একাই থাকেন। নিজেই দু’বেলা রান্না করে খান এবং নিকটবর্তী তালতলা হাইস্কুলে পড়াশোনা। পার্শ্ববর্তী আমগাছ তলায় এক বদ্ধ পাগলের ডেরা। সে লেখকের নিত্য অতিথি। লেখকের অবশ্য ভালই লাগে এই অতিথিকে দু’বেলা খাওয়াতে। দু’একদিন স্কুল ছুটি পেলেও তিনি বাড়ি যেতে পারেন না। অন্তরে একটা দায়িত্ব অনুভব করেন নিধিরামের জন্য সে কী খাবে তার অনুপস্থিতিতে। নিধিরামও দিনের মধ্যে একাধিকবার ‘খোকার’ (লেখক) খোঁজ নিয়ে যায়। বোধহয় ভয় হয়, খোকা যদি অন্য কোথাও চলে যায়। হঠাৎ একদিন কর্পোরেশনের কালো গাড়ি এসে নিধিরামকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তার সেই আর্ত চিৎকার, ‘খোকা, আমাকে বাঁচা’ এখনও লেখকের কানে বাজে।
লেখক এখন একজন পরিণত মানুষ। স্কুলে চাকরি পেয়েছেন। গ্রামের ‘কালো বাগদি’ ‘বিশেকা’র মতো মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়েই ছিল। কালোখুড়োর গল্পের শেষ নেই। ঝিঙের দানা পুঁতে কী কৌশলে সেই গাছে দু’আড়াই ফুট লম্বা শসা ফলানো যায় সে রহস্য তার জানা আছে। নিজে কতবড়ো বংশের ছেলে তা লেখককে বোঝানোর জন্য তার ঠাকুরদার গল্প ফেঁদে বসে, ‘আমার ঠাকুরদা গাঁজা খেয়ে পুকুরির এপার থেকে নেমে, জলের তলা দে হেঁটে ওপারেগে, আবার ওপার থেকে হেঁটে হেঁটে এপারে চলে আসত, তুমি জানো?’
লেখকের ‘বিশেকা’ বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি হয়ে থেকে যাবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বিশেকা চোর, তবে আদর্শহীন নয়। টাকা-পয়সা, সোনাদানা বিশেকা চুরি করে না। গাছের কলা-পেঁপে, ক্ষেতের কচু ওল আর ধান পাকলে ধান এবং সুযোগ পেলে চাল সে চুরি করে। বিশেকার মতে, টাকা-পয়সা, সোনাদানা যারা চুরি করে তারা শয়তান-মহাপাপী। পেটে খাওয়ার জিনিস চুরি করলে কোনো পাপ হয় না। একবার এক ডাকাত দল জোর করে বিশেকাকে ধরে নিয়ে যায় ডাকাতি করতে। অভুক্ত বিশেকা সেই গৃহস্থ বাড়ি থেকে এক হাঁড়ি পাস্তা মাথায় নিয়ে পালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যায়। জেল থেকে ফিরে আসার পর তার দুরবস্থা দেখে লেখক নিজেকে তার সন্তানতুল্য দাবি করে জোর করে তাঁর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন। বছর তিনে বাদে বিশেকা লোক মারফত সেই টাকা তার ছোটবাবুকে (লেখক) ফেরত দিতে ভুলে যায়নি। গল্পের শেষে এই বিশেকাকে একটিবার দেখার জন্য লেখকের অন্তরের আর্তি পাঞ্চিং লাইনের মতো পাঠকের হৃদয়ে ধাক্কা দিয়ে যায়, ‘সত্যি বলছি, এখনও সেই খিদে সহ্য করতে না পারা, আমার চোর বিশেকার সঙ্গে দেখা করতে খুব খুব ইচ্ছে হয়’।
কালো বাগদি, বিশেকার মতো নিম্নবর্গের ও নিম্নবর্ণের মানুষকে চন্দ্রকান্তবাবু চিনতেন বাইরে থেকে নয়, একেবারে ভিতর থেকে। নিজে ইন সাইডার না হলে, বোধহয়, এভাবে চেনা যায় না, বোঝা যায় না। কালো বাগদির মতো এইরকম একজন খেয়াল রসের আজগুবি গল্প বলিয়ে কিংবা বিশেকার মতো আদর্শবাদী চোর এক সময় গ্রামের মাটিতে হেঁটে চলে বেড়িয়েছে- ভাবতে অবাক লাগবে এই প্রজন্মের।
শিক্ষকতার বাইরে চন্দ্রকান্তবাবুর দু’টি নেশা ছিল। একদিকে যাত্রা-নাটক নিয়ে মশগুল থাকা এবং অন্যদিকে ভ্রমণ পিপাসা। ‘পাঁচপোতার সিরাজদৌলা’ গল্পে পাই একদা দাপুটে যাত্রা জগতের অভিনেতা ললিতবাবুর করুণ পরিণতির কথা। অভাব-অনটনের কশাঘাতে শেষ পর্যন্ত এই অভিনেতা কীভাবে ‘ক্ষেপের যাত্রা’ এবং ‘কম পয়সায় দু’নম্বরি ফড়ের যাত্রা’ করতে বাধ্য হয়েছেন দু’একজন পূর্ব পরিচিত যাত্রা শিল্পীকে জুটিয়ে এনে (লেখক তাদের মধ্যে একজন) সে কথাই এ গল্পের প্রধান উপজীব্য। গল্পটা বেশ এগোচ্ছিল কান্না ঢাকার হাসি-রঙ্গ-তামাশা নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোখের জল দুকূল ছাপিয়ে ঝরঝর করে ঝরে পড়লো।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন হরিনাভি স্কুল ছেড়ে চলে গেলেন, তার কয়েক বছর পরে তাঁর যথার্থ একজন উত্তরসূরি চন্দ্রকান্ত মন্ডল এলেন এই স্কুলে শিক্ষক হয়ে। স্বভাবে-মেজাজে দু’জন একই রকমের। মাঝে মাঝে কাঁধে ঝোলা নিয়ে চন্দ্রকান্তবাবু বেরিয়ে পড়তেন সাঁওতাল পরগনার বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর বড় প্রিয় ওখানকার সাদাসিদে মানুষজন, পাহাড়, জঙ্গল আর লাল মাটি। ঘাটশিলার দশ-বারো কিলোমিটার দূরে পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা ধারাগিরির গায়ে ছোট্ট এক সাঁওতাল গ্রাম বাসাডেরায় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর স্নেহময়ী মধ্যবয়স্কা আদিবাসী দিদিকে। যে কেউ সেখানে গিয়ে দিদির বাড়ির সন্ধান করে তাকে পেয়ে যেতো। তাকে নিয়েই লেখকের গল্প ‘দিদি’।
‘ভূষণদা’-কে লেখক পেয়েছিলেন তার অদূরেই বুরুডি ড্যাম-এর নির্জন-নিঝুম বন-জঙ্গলের মাঝে। ভূষণদার বাঁশের বেড়ার ছোট্ট দোকান ঘরে তিনি এক রাত থেকেও গিয়েছিলেন। বুনো ফুলের গন্ধ, বেড়ার ফাঁক দিয়ে গায়ে এসে পড়া চাঁদের আলোয় দেহ-মন ভিজিয়ে, আশপাশে বন্যপ্রাণী আর অজস্র কীট-পতঙ্গের উপস্থিতির রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে সেই স্বর্গীয় রাত্রিযাপন। ভূষণদা অরণ্য মায়ের সন্তান। বনের গাছপালা, লতা, ফুল, আকাশের তারা, চাঁদ, ওই মহুল গাছ, ওই পাহাড় ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথা কখনও সে ভাবতে পারে না। ঠিক খুষণদার মতোই দানিয়া পাহাড়ের ‘হুপন’। সেও শেষ পর্যন্ত লেখকের একান্ত পীড়াপীড়িতে শোনাতে বাধ্য হলো তার মনের কথা, ‘ইয়ে দানিয়া, ইধারকা আদমি, নদী, পাহাড়, জঙ্গল ছোড়কে ম্যায় কেইসে যাউ। হররোজ দানিয়া পাহাড়কা উপর নয়া সুরষ নেহি দেখনে সে, ম্যায় কেইসে জিউ’। হিমাচল প্রদেশ খাবার এবং সেই দিদির বাগানের গোল্ডেন আপেল। আজও তার অপূর্ব মিষ্টি সুগন্ধ লেখকের স্মৃতিতে সৌরভ বিতরণ করে চলেছে। ভারতীয় অতিথি আপ্যায়নের যে শাশ্বত ঐতিহ্য ‘অতিথি দেব ভব’ তাকে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন এই কিন্নরী মহিলার কথায় এবং আচরণে।
চন্দ্রকান্ত মন্ডলের সুন্দরবন নিয়ে তিনটি গল্প ‘আঁচড়’,’ হলুদ ওড়না’ ও ‘ভুল করে’। তিনটি গল্পই ভ্রমণের অংশ বিশেষ। রাজকীয় বাঙালি বাঘের উপস্থিতিও তিনটি গল্পে। ‘হলুদ ওড়না’ গল্পে আছে নদীর বুকে নৌকায় কয়েক দিন রাত্রি কাটানোর অভিজ্ঞতা। তাঁদের সঙ্গী হয়েছে জঙ্গলের নাড়ি-নক্ষত্র এবং বাঘের হাল-হকিকত জানা এক গুনিন। বিচিত্র তার ক্রিয়াকর্ম এবং অদ্ভুত তার নির্দেশাবলী। নদীতে ভাটার মুখে সঙ্কীর্ণ সোঁতায় জাল পেতে মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি ধরা। জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘের আতঙ্কের মধ্যে মাঝ রাতে সদলবলে রেঞ্জার্সের আকস্মিক উপস্থিতিকে নৌকা-ডাকাতি ভেবে সবার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার উপক্রম।
যাওয়ার কথা পরিঘুমটিয়া ডাক বাংলো। কিন্তু ‘ভুল করে’ গল্পে কিছুটা নামের গোলমালে অনেক আগে লঞ্চ থেকে নেমে পড়ায় পায়ে হেঁটে শেষ রাতের দিকে গন্তব্যে পৌঁছোনো। প্রায় জনশূন্য এলাকার মধ্য দিয়ে বুনো গাছপালায় ঢাকা রায়মঙ্গল নদীর বাঁধ ধরে চাঁদের আলোয় এগিয়ে চলা। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সামনের দিক থেকে ভেসে এলো ভয়ঙ্কর বাঘের গর্জন। ইতিমধ্যে দুই বন্ধু হাওয়া হয়ে গেছেন। ‘সুন্দরবনের আর্জান সরদার’কে মান্যতা দিয়ে লেখক এবং আর এক বন্ধু তখন বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে লাগলেন।
এই গল্প সংগ্রহে লেখকের কয়েকটি বানানো গল্পও আছে যেগুলি প্রত্যক্ষভাবে স্মৃতি নির্ভর নয়। একটা মাকড়সাকে নিয়ে গভীর জীবনবোধের চমৎকার গল্প ‘এ কোন আলো’। ‘কে জানে’ গল্পে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জীবন কী ভয়ংকর হয়ে উঠতে চলেছে- তা তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু গল্প হিসেবে মনে তা কোনো দাগ কাটে না। ‘কাতিজুড়ি’ আদিবাসী দুই সাঁওতাল পরিবারের বিয়ের গল্প। লেখক বরযাত্রীর একজন সদস্য হিসেবে সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন এবং একটি মনোরম হৃদয়গ্রাহী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ‘কান্নানদী’ একটি রূপকথার গল্প, কিন্তু মানবিক আবেদনে তা অপরূপ।’ বাচেলি’, ‘ঠাম্মি’, ‘শিশিরে ভেজা’ কয়েকটি টুকরো স্মৃতি, তবে কাব্যিক মাধুর্যে ভরপুর। গল্পের উপাদান এখানে বিশেষ কিছু নেই। তবে উপস্থাপনের গুণে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চন্দ্রকান্তবাবু গল্প ও ভ্রমণ কাহিনিতে অন্ধকার রাত্রির কথা খুবই কম। সর্বত্র চাঁদের আলোর ছড়াছড়ি। এই চাঁদের আলোকে তিনি দেখেছেন ধু-ধু প্রান্তরে, কখনও নদীর বুকে নৌকায় বসে, কখনও পরেশনাথ মন্দিরের পাহাড়ি পথে ‘গাইড’-এর অনুগমন কালে আবার কখনও জাহাজে লাক্ষাদ্বীপ যাওয়ার পথে আরব সাগরের বুকে। গভীর রাতে পালামৌয়ের বিপদ সঙ্কুল। অরণ্যে কোয়েল নদীর পাশে জ্যোৎস্নার বন্যায় ভেসে যেতে যেতে পিউ কাঁহার ডাক শুনে তাঁর মনে হয়েছে, ‘জন্মলঙ্গেই বুঝি প্রিয়াকে হারিয়ে সারাজীবন শুধু ডেকেই চলেছে পিউ কাঁহা, পিউ কাঁহা’। প্রসঙ্গক্রমে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় এত গভীর প্রকৃতি প্রেম আর মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সত্ত্বেও চন্দ্রকান্তবাবুর এই গল্প সংগ্রহে একটিও নর-নারীর প্রেমের গল্প নেই কেন।
এই লেখার শুরুতে যে ‘বড় আমি’-র উল্লেখ করেছি, লেখকের সেই হয়ে ওঠার ইচ্ছে যা প্রকৃতপক্ষে তাঁর আসল আমি মাঝে মাঝেই উন্মোচিত হয়েছে নানা গল্পে ও ভ্রমণ কাহিনিতে। ‘দুলিয়া’ গল্পে দুলিয়া চাঁদনি রাতে অযোধ্যা পাহাড়ের নৈসর্গিক রূপের মাঝে আপন মনে যে সুর তুলেছিল, সেই সুরের জাদুতে লেখকের মনে হয়েছে, ‘সবহারা দুলিয়া সব কিছু ফিরে পাবার গভীর অতলে ডুব দিয়েছে’। এই সুর শুনেই তো রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, ‘আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই’। ‘ভোরের আলোয়’ গল্পে অসামাজিক কর্মে লিপ্ত দুটি মানুষ এক হতভাগ্যকে রক্ষা করতে পেরে অন্তরে উপলব্ধি করেছে, ‘এর আগে জীবনে এ ভালোলাগার স্বাদ পাইনি’। এভাবেই তো ব্যক্তি মানুষ তার potentiality of divinity-র স্বাদ পায়। চন্দ্রকান্তবাবু জীবনে অনেক পথ হেঁটেছেন হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানের অতৃপ্তি বুকে নিয়ে। একটা মিসিং লিঙ্ক তিনি যেন কিছুতেই খুঁজে পেলেন না।
কুড়িয়ে পাওয়া গল্প সংগ্রহের কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি চোখে পড়েনি তা কিন্তু নয়। সামগ্রিকভাবে প্রকাশক ‘বর্ণময়’-এর কাজ যথেষ্ট ভালো। তবে আরো একটু সতর্ক হলে বেশ কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ও বানান ভুলের হাত থেকে বইটি রক্ষা পেতো। ‘হুপন’ গল্পের সূচনাতে দু’চার পংক্তি নিশ্চয়ই বাদ পড়েছে। সেজন্যই, বোধহয়, গল্পের শুরুটা একটু বেখাপ্পা ঠেকে। শিবশঙ্কর ভট্টাচার্যের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ চমৎকার। তবে একটি দু’টি স্কেচ একটু বেমানান ঠেকেছে, যেমন ‘দিদি’ গল্পের স্কেচটিকে কোনভাবেই একজন আদিবাসী সাঁওতাল রমণী বলে মনে হচ্ছে না।
লেখকের গদ্য স্বাদু, মেদহীন এবং ঝরঝরে। সব রকমের বাহুল্য বিবর্জিত পরিমিতি বোধ সম্পন্ন এই প্রকাশভঙ্গী পাঠককে মুগ্ধ করবেই। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের যুগে যা প্রকৃতপক্ষে cultural hegemony তিনি মাথা উঁচু করে আভিজাত্য জায় রেখে তাঁর যাপনের পরিমণ্ডলটিকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মধ্যে যেমন কোথাও নিজেকে জাহির শের কিন্নরে তৃষ্ণার্ত লেখক সম্পূর্ণ অপরিচিত তাঁর ‘অন্য দিদি’-র কাছে পেয়েছিলেন জল, সঙ্গে চা, দু’তিন রকমের নাম না জানা করার চেষ্টা নেই ঠিক তেমনই কোনো হীনমন্যতাবোধও নেই। নিঃসন্দেহে এও এক দুর্লভ প্রাপ্তি। আজ যখন সহজ জিনিসকে কঠিন করে উপস্থাপনের একটা প্রবণতা শিল্প সাহিত্য চর্চায় বড় বেশী নজরে আসছে, তখন চন্দ্রকান্তবাবু এই কঠিন জিনিসকে সহজ করে বলার বিরল দক্ষতায় প্রান্তিক মানুষের জীবনকে নানা রূপ-রস-গন্ধে সাজিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছেন। সব রকমের পাঠক ভালোবেসে এই বই পড়বে আর সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র এবং গবেষকের কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে এর documentary aspect।
কুড়িয়ে পাওয়া গল্প সংগ্রহ
চন্দ্রকান্ত মন্ডল।
প্রকাশকঃ ‘বর্ণময়’, ১/২ কালী বাড়ি লেন, যাদবপুর, কলকাতা-৩২
