অভিব্যক্তির পরকলায় নানা পাটেকর

অভিব্যক্তির পরকলায় নানা পাটেকর

“The play is not in the words, it’s in you!”

— Stella Adler

‘পরিন্দা’-র আন্না, ‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক, ‘খামোশি’-র জোসেফ আর ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি, এই চরিত্রদের দেখলে বিখ্যাত অভিনয় শিক্ষক স্টেলা অ্যাডলারের বক্তব্যের সারবত্তা কিছুটা বোঝা যাবে। শুধু মেজাজে নয়, মানুষ হিসেবেও তাদের মধ্যে যোজন দূরত্ব। অথচ অভিনেতা একজনই, শ্রী নানা পাটেকর। প্রত্যেক চরিত্রের রূপটানের ক্ষেত্রেই তিনি এমন কিছু ছাপ রাখেন, যা সেই চরিত্রকে নিছক গল্পের প্রয়োজন মেটানোর উপাদান হতে দেয়নি। ওঁর বলা সংলাপও শুধু কথার জোরে দাঁড়িয়ে থাকে না। কখনও চোখের দৃষ্টি, কখনও কথার মাঝখানে হঠাৎ নেয়া বিরতি সেই চরিত্রকে আমাদের সামনে প্রতিবিম্বিত করে পূর্ণ মহিমায়।

পরিন্দা’-র আন্না
ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক
ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি

বিশ্বনাথ পাটেকর ওরফে নানার জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায়। ওঁর জীবনের শুরুটা আকাশের কোনও তারকার চেনা গল্পের মতো নয়। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। বাবার ব্যবসায় বড় ক্ষতি হওয়ার পর সংসারে অভাব এমনভাবে চেপে বসে যে নবম শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই নানাকে কাজ করতে হয়। স্কুলের পরে মুম্বইয়ের চুনাভাট্টিতে গিয়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। মাসে পেতেন পঁয়ত্রিশ টাকা, সঙ্গে মিলত একবেলা খাবার। কাজের জায়গায় যাওয়া-আসার জন্য অনেকটা পথ হাঁটতে হতো। নানা পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা বলেছেন। অর্থ না থাকলে অন্যেরা কী চোখে দেখে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তবে তিনি নিজের জীবনকে করুণ কাহিনির বয়ান করে তোলেননি। বরং সংগ্রামের সেই দিনগুলোকে জীবনের শিক্ষা হিসেবেই দেখেছেন। খিদে, অনিশ্চয়তা, মানুষের ব্যবহার, এ সবই তাঁকে বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তাঁর অভিনয়ের চরিত্রগুলিকে দেখলে কখনও কখনও সেই অভিজ্ঞতার ছায়া অনুভব করা যায়, যদিও কোনও অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে তাঁর প্রতিটি চরিত্রকে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। জীবন তাঁকে উপাদান দিয়েছিল, কিন্তু সেই উপাদানকে অভিনয় শিল্পের মধ্যে আত্তীকরণের কাজটা ছিল তাঁর নিজের ।

স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টে পড়াশোনা করেন নানা। বিজ্ঞাপনী সংস্থাতেও কাজ করেছেন। কিন্তু নাটকের প্রতি টান তাঁকে বারবার মঞ্চে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। থিয়েটার তাঁর কাছে শুধু অভিনয়ের জায়গা ছিল না; সেখানে শরীর, কণ্ঠ, বিরতি আর দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের পাঠ ছিল। পর্দায় তাঁর অভিনয়ে যে মঞ্চসুলভ তীব্রতা দেখা যায়, তার শিকড় এই অভিজ্ঞতায়। কখনও সেই তীব্রতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে, এ কথাও বলা যায়। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের নিজস্ব ছন্দ তৈরি হয়েছে এই শরীরী ও কণ্ঠনির্ভর প্রকাশভঙ্গির মধ্য দিয়েই।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় তাঁর যাত্রা শুরু, যেটা ‘উমরাও জান’-খ্যাত পরিচালক মুজফফর আলিরও প্রথম চলচ্চিত্র। প্রথম থেকেই নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার রাস্তাটা মোটেই সহজ ছিল না। ‘অঙ্কুশ’, ‘প্রতিঘাত’ এবং ‘অন্ধা যুদ্ধ’-এর মতো ছবিতে নানা এমন সব চরিত্র করেছেন, যাদের জীবন একেবারেই গড়পড়তা নয়। তারা রাগী, ক্ষুব্ধ, কখনও ভুল পথে হাঁটে, কিন্তু তাদের আচরণের পেছনে থাকে সামাজিক চাপ, রাষ্ট্রের দমন আর রোজকার বেঁচে থাকার লড়াই। নানার অভিব্যক্তি এই মানুষদের আদর্শ নায়ক করে তুলে ধরেনি। তাঁর চরিত্রদের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষগুলো ভুল করছে ঠিকই, কিন্তু কেন করছে, সেই প্রতিপ্রশ্নটা তোলাও জরুরি।

‘পরিন্দা’ নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে ওঁর অভিনীত চরিত্র আন্না অপরাধজগতের অলিন্দের একজন ক্ষমতাবান মানুষ। সে নিষ্ঠুর, কিন্তু তার ভয়ংকর দিকটা শুধু হিংসার বহিঃপ্রকাশের মধ্যে নেই। সে নিজের কর্তৃত্বকে এতটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে যে অন্যের ভয় কিংবা যন্ত্রণা তার কাছে প্রায় অদৃশ্য। নানা আন্নাকে চিৎকৃত উচ্চারণ দিয়ে বড়ো করেন না। শান্ত গলায় কথা বলা, হঠাৎ থেমে যাওয়া, ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি—এই ছোট ছোট আচরণেই বোঝা যায়, লোকটা কতটা বিপজ্জনক। সে জানে চারিপাশের মানুষেরা তাকে ভয় পায়। এই আত্মবিশ্বাসই আরও অস্বস্তিকর। এদিকে সেই চরিত্রটাই ব্যক্তিগত শোকের আঘাতে দীর্ণ, যার জন্য দর্শকের সমবেদনাও জেগে ওঠে। এই ছবির জন্য নানা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান পান। তবে পুরস্কারের বাইরেও আন্না এমন এক চরিত্র, যে ভারতীয় সিনেমার আঙিনায় খলনায়কের চরিত্রকে নতুন এক অবয়বে তুলে ধরেছিল।

‘অঙ্গার’-এ অপরাধজগতের অন্ধকারে তাঁর উপস্থিতি অন্য রকম, আর ‘তিরঙ্গা’-য় শিবাজিরাও ওয়াগলে চরিত্রে দেশপ্রেম ও নাটকীয়তার ককটেল। এই ধাঁচের চরিত্র রূপদানের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির ঝুঁকি থাকে। নানার গলা আপাত কর্কশ, তাঁর শরীরী উপস্থিতিও প্রবল। কিন্তু তাঁর সংলাপের ছন্দ শুধু আওয়াজের উপর নির্ভর করে না। শব্দের আগে বিরতি, কোনও একটি শব্দে বাড়তি চাপ, বাক্যের শেষে স্বর নামিয়ে আনা, এসবই ছোট ছোট ভঙ্গিমা তাঁর নিজস্ব প্রকরণের অংশ। তাঁর অনেক সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে তাই মনে রাখা দরকার, সেই সংলাপকে স্মরণীয় করে তুলেছিল তাঁর বলার ধরন এবং চরিত্রের প্রতি বিশ্বাস।

‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক নানাকে আরও বড় দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেয়। প্রতাপ অন্যায়, সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে গলা তোলে। কিন্তু তাকে শুধু প্রতিবাদী নায়ক বললে তা একেবারেই সরলীকরণ হয়ে যায়। তার রাগের মধ্যে ন্যায়ের দাবি আছে, তেমনই আবার আছে জমে থাকা হতাশা এবং নিজের চারপাশের অসংগতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার অস্থিরতা। নানা প্রতাপের বক্তৃতাকে কেবল সংলাপের প্রদর্শনী হতে দেন না। শরীরের অস্থিরতা, চোখের তীক্ষ্ণতা, ব্যঙ্গের ঝলক এবং হঠাৎ আবেগে ভেঙে পড়ার মুহূর্ত তাকে মানুষ করে তোলে। প্রতাপের চিৎকার দর্শককে উত্তেজিত করে, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হল, সেই চিৎকারের মধ্যে দর্শক যেন চারিপাশের জমে থাকা অন্ধকারের  বিরুদ্ধে নিজের অন্তর্লীন ক্ষোভের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এই ছবির জন্য নানা সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ ওঁর অভিনীত চরিত্র জোসেফ ব্রাগাঞ্জা শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী এক বাবা। মেয়েকে সে গভীরভাবে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা তার সহজাত নয়। সে মেয়েকে আগলে রাখতে চায়, অথচ মেয়ের নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকারও আছে। এই টানাপোড়েন থেকেই জোসেফের অসহায়তা তৈরি হয়। নানা এখানে নিজের সবচেয়ে পরিচিত অস্ত্র, কণ্ঠস্বর, প্রায় সরিয়ে রাখেন। মুখের সামান্য পরিবর্তন, হাতের ভঙ্গি, চোখের উদ্বেগ আর নীরব প্রতিক্রিয়ায় চরিত্রের আবেগ ফুটিয়ে তোলেন। তিনি জোসেফকে করুণ করে দেখান না। তার ভালোবাসা যেমন সত্যি, তেমনই তার জেদ এবং সীমাবদ্ধতাও সত্যি। ফলে দর্শক তাঁর অসহায়তার ভেতরেও একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকে দেখতে পায়।

‘অঙ্গার’-এ অপরাধজগতের অন্ধকারে তাঁর উপস্থিতি অন্য রকম
‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’

‘অগ্নিসাক্ষী’-তে নানার চরিত্র আবার অন্য ধরনের ভয় তৈরি করে। এখানে আতঙ্কের উৎস শুধু শারীরিক হিংসা নয়, একজন মানুষের অন্যজনকে দখল করার প্রবণতা। বাইরে থেকে বৈবাহিক সম্পর্কের যে চেহারা দেখা যায়, তার আড়ালে দখলদারি বাসা বাঁধতে পারে, ছবিটা তা দেখায়। নানা চরিত্রটির অস্বস্তিকর দিককে সহজ করে দেননি। তাঁর উপস্থিতি দর্শককে স্বস্তি দেয় না, বরং বুঝিয়ে দেয় যে নির্যাতন সব সময় চিৎকার করে আসে না; অনেক সময় তা নিয়ম, অধিকারবোধ এবং ভালোবাসার নামে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। এই ছবির জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান পান।

২০০৪ সালের ‘আব তাক ছাপ্পন’-এ সাধু আগাশে একজন এনকাউন্টার-স্পেশালিস্ট পুলিশ অফিসার। এই চরিত্রে নানা দক্ষতা ও ক্লান্তিকে পাশাপাশি রেখেছেন। সে কাজ জানে, অপরাধীদের মোকাবিলা করতে জানে, কিন্তু সেই কাজের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটানোর মূল্যও তাকে দিতে হয়। হিংসার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষ কি নিজেকে নির্দোষ ভাবতে পারে? আইন রক্ষার দায়িত্ব আর নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার মধ্যে সীমারেখা কোথায়? ছবিটি এই প্রশ্নগুলির সামনে দাঁড়ায়, আর নানার অভিনয় চরিত্রটিকে সহজ নায়ক হতে দেয় না। ‘অপহরণ’-এ তবরেজ আলমের মতো রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে অপরাধের যোগসাজশে জড়ানো চরিত্রে তাঁর অভিনয় আরও ঠান্ডা, হিসেবি। ‘রাজনীতি’-তেও তাঁর উপস্থিতি ছবির রাজনৈতিক আবহকে ভারী করে তোলে।

‘যশবন্ত’, ‘গুলাম-এ-মুস্তাফা’ এবং ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’-এর মতো ছবিতে নানা নানা ধরনের মানুষের চরিত্র করেছেন। এদের কারও হাতে ক্ষমতা, কেউ অপরাধের জগতে, কেউ আবার নিজের ক্ষত ঢাকতে রাগকে ঢাল করে। নানার কৃতিত্ব হল, তিনি চরিত্রের রাগকে এক রকম করে দেখান না। কোথাও তা ক্ষমতার দম্ভ, কোথাও অপমানের প্রতিক্রিয়া, কোথাও নিজের ব্যর্থতা লুকোনোর চেষ্টা। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সব সময় সমান সাফল্যে ধরা পড়ে না, কিন্তু তাঁর সেরা অভিনয়গুলোতে তা স্পষ্ট।

নানার একেবারে অন্যরকম এক অভিব্যক্তি দেখতে হলে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টির কাছে যেতে হয়। উদয় একজন ডন, অথচ তার বড় দুশ্চিন্তা বোনের বিয়ে এবং তথাকথিত ভদ্রসমাজের স্বীকৃতি। অপরাধজগতের মানুষটি পারিবারিক সম্মানের প্রশ্নে এমন অস্বস্তিতে পড়ে যে সেখান থেকেই হাস্যরস জন্মায়। নানা নিজে কৌতুক করার চেষ্টা করেন না; উদয় নিজের সমস্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সামলাতে গিয়ে হাস্যকর হয়ে ওঠে। তাঁর গম্ভীর মুখ, বিরক্তি চেপে রাখার চেষ্টা এবং পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুহূর্তগুলো কমেডির উৎস। অনিল কাপুরের অভিনীত চরিত্র মজনু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর রসায়ন ছবিটিকে আরও প্রাণবন্ত করে।

মারাঠি ছবিতে নানা আরও কয়েকটি ভিন্ন মেজাজের কাজ করেছেন। ‘দেউল’-এ গ্রামের বিশ্বাস, রাজনীতি এবং ব্যবসার সম্পর্ক নিয়ে যে ব্যঙ্গ তৈরি হয়, সেখানে তাঁর উপস্থিতি গল্পকে মাটির কাছাকাছি রাখে। ‘ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো’-তে সমাজসেবক চিকিৎসক প্রকাশ আমটের চরিত্রে তাঁকে দেখা যায় সংযত ও নিবেদিত এক মানুষ হিসেবে। বাস্তবের কোনও ব্যক্তিকে পর্দায় তুলে ধরা কঠিন, কারণ শুধু চেহারা বা কথা নকল করলেই হয় না; তাঁর কাজের ভিতরের মূল্যবোধও ধরতে হয়। নানা এখানে পরিচিত তীব্রতার বদলে সংযমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘নটসম্রাট’ নিয়ে আলাদা করে না বললে এই কথালাপ অসম্পূর্ণ থাকে। বিশেষ করে এই ছবিতে তাঁর অভিনয় যখন প্রতিতুলনা করা হবে আরেকজন কিংবদন্তী অভিনেতা ড. শ্রীরাম লাগুর’র অভিনয়ের নিরিখে। প্রখ্যাত মরাঠি লেখক বিষ্ণু বামন শিরওয়াদকর ওরফে কুসুমাগ্রজের বিখ্যাত নাটক অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে নানা গণপতরাও বেলভালকর, এক অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চাভিনেতা। জীবনের একটা বড় অংশ তিনি মঞ্চের আলোর নিচে রাজা – সম্রাট হয়ে কাটিয়েছেন, কিন্তু শেষ বয়সে নিজের ঘরেই যেন অনাহূত। তাঁর যন্ত্রণা শুধু সন্তানদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সম্মান না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিজেও পুরোনো পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। মঞ্চের হাততালি তাঁকে যে আত্মপরিচয় দিয়েছিল, দৈনন্দিন জীবনে তা আর কোনও কাজে আসে না। এই ব্যবধানই তাঁর একাকিত্বকে গভীর করে। নানা কখনও মঞ্চের মতো উচ্চকিত, কখনও একেবারে চুপ। দীর্ঘশ্বাস, অপমানের পর নিজেকে সামলে নেওয়া, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে মুখের বদলে যাওয়া এইসব মুহূর্তের অভিনয় সবচেয়ে বেশি হৃদয় স্পর্শ করে। নানার সেরা অভিনয় সেখানে, যেখানে তিনি চরিত্রের আবেগকে জোর করে বোঝান না, বরং দর্শককে তা বুঝে নেওয়ার সুযোগ দেন।

অভিনেতা নানার পাশাপাশি পরিচালক নানা-ও একেবারেই উপেক্ষা করার মতো নন। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবি। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা, হিংসার অভিঘাত এবং একজন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামরিক জীবনের কঠোরতা দেখানোর পাশাপাশি এই চলচ্চিত্র প্রশ্ন তোলে, হিংসার অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন মানুষ সাধারণ জীবনে ফিরলে তার ভিতরে কী থেকে যায়। পরিচালনায় নানার ঝোঁক সরাসরি বক্তব্যের দিকে। আবেগ তিনি আড়াল করেন না, চরিত্রের নৈতিক দ্বন্দ্বও সামনে আনেন। তিনি অনেক ছবি পরিচালনা করেননি, কিন্তু ‘প্রহার’ দেখায় যে গল্প বলার পদ্ধতি নিয়েও তাঁর নিজস্ব ভাবনা ছিল। ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ – গানের দৃশ্যে ছেলেবেলার স্মৃতি, বিগতদিনের মর্মবেদনা খুবই মুন্সিয়ানার সঙ্গে চিত্রায়িত হয়েছিল। 

নানার ব্যক্তিজীবনের কথাও তাঁর পরিচয়ের অংশ। গ্রামজীবনের প্রতি তাঁর টান, সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালে মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলেন। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলে কৃষকদের দুর্দশা, জলসংকট এবং কৃষক পরিবারের সমস্যার দিকে নজর দেওয়াই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। একজন জনপ্রিয় অভিনেতার পক্ষে শুধু সহানুভূতির কথা বলা সহজ; বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক বেশি কঠিন। এই কাজ তাঁর জনপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে কোনও শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনকে নিখুঁত আদর্শের ছবি বানিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই। তাঁর জীবনেও বিতর্ক ও জটিলতা ছিল। সেগুলি অস্বীকার না করেও তাঁর শিল্প ও সামাজিক কাজের মূল্যায়ন করা যায়।

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর নানার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি নতুন করে ফিরে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কোনও শিল্পীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিখুঁত মানুষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা থাকে। নানাকে মনে রাখার জন্য সে পথ জরুরি নয়। তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের মুহূর্তগুলো মনে রাখা যায়, তাঁর ঝুঁকি নেওয়ার সাহসের কথা বলা যায়, আবার কোথাও অভিনয় বেশি তীব্র হয়ে উঠেছিল কি না, সেই আলোচনাও চালানো যায়। শ্রদ্ধা মানে প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং কাজটা মন দিয়ে অভিনিবেশের সঙ্গে দেখা।

শেষ পর্যন্ত নানা পাটেকর এমন এক অভিনেতা, যাঁর রূপায়িত চরিত্র ছবির পর্দা পেরিয়ে মনের অন্দরে থেকে যায়। কখনও তিনি ভয়ংকর আন্না, কখনও প্রতিবাদী প্রতাপ, কখনও অসহায় জোসেফ, কখনও বিপাকে পড়া উদয়, কখনও নিজের গৌরব হারিয়ে ফেলা গণপতরাও। এদের কাউকেই শুধু ভালো বা মন্দ বলে চেনা যায় না। প্রত্যেকের মধ্যে আছে কিছু দুর্বলতা, কিছু অহংকার, কিছু ভালোবাসা, কিছু না-পারা। নানা সেই বর্ণালীকেই অভিনয়ের উপাদান করেছেন। নানা পাটেকরের অভিনয়ের স্থায়ী প্রাপ্তি হয়তো এইখানেই। পর্দার আলো নিভে যাওয়ার পরেও তাঁর অভিনয়ে মূর্ত চরিত্রেরা চিরস্থায়ী আসন পেতে রাখে আমাদের মনের দোরে।

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায় পেশায় প্রযুক্তিবিদ্যার শিক্ষক হলেও মন পড়ে থাকে সংস্কৃতির সাতরঙা আঙিনায়। সঙ্গীত, সাহিত্য এবং বিশ্ব – সিনেমার নিষ্ঠ অনুরাগী। মূলত গদ্যসাহিত্যেই স্বচ্ছন্দ। নানা পত্রিকা এবং ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ এবং গল্প প্রকাশিত হয়েছে এবং যুগ্মভাবে সম্পাদনাও করেছেন সংকলন গ্রন্থের। ‘সৎ সাহিত্য’ - এই আবছায়াতে শব্দের ব্যারিকেড গড়ে নিতে পারার তীব্র আকাঙ্খা সন্দীপনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *