পাহাড়ের প্রার্থনা

পাহাড়ের প্রার্থনা

আমরা যারা আপাদমস্তক শহরমোড়া হয়ে থাকি, তারা খোঁজও রাখিনা, আদিকাল থেকে এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে বসবাসকারী কত জন রয়েছেন, তাঁরা কী ভাবছেন, কী বলতে চাইছেন। আমাদের ধারণা শহরে নিজেদের স্বর্গটুকু রচনা করাটাই আমাদের কাজ, প্রাণপণে সেটা করতেই চব্বিশ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকি।

এহেন শহুরেদের প্রোফাইল মোটামুটি এইরকম:

  • আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় না।
  • ফ্লাইটে ওঠার সময় যখন বহু সময় ধরে Zone 1, Zone 2 queue-তে দাঁড়াতে বলে, আমরা অধৈর্য হইনা।
  • আমরা প্লাস্টিক বর্জন করিনি।
  • গ্লোবাল ওয়ার্মিং- এর খবর রাখি।
  • ডিপ্রেশন হলে কাউন্সেলিং নিই ও সাইকিয়াট্রিস্টের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ নিয়ম মেনে খেয়ে চলি।
  • বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি, আত্মীয়দের সঙ্গে কম।
  • অনলাইনে জিনিষ অর্ডার করার আগে আমরা যাচাই করি ঐ আইটেম কে কী রেটে দিচ্ছে।
  • বেড়াতে ভালোবাসি।

প্রথম সাতটা পয়েন্টওলা প্রোফাইলের মানুষ আপনি অনেককেই চিনবেন। কিন্তু এই যে শেষ অর্থাৎ অষ্টম বৈশিষ্ট্য যেটি, সেটির বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

Solo travel, family vacation, conducted tour করে দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে এরকম অনেকেই আপনার পরিচিত বা আপনিও এই ভাবেই হয়তো ঘুরে বেড়ান। কিন্তু এনাদের ইতিবৃত্ত একটু আলাদা।

আমার বোন-ভগ্নীপতি থাকেন কলকাতায়। ভগ্নীপতি ভদ্রলোকটির পায়ের তলায় আছে অপর্যাপ্ত সর্ষে। স্কুলের ব্যাচমেট ও তাদের পরিবারদেরকে নিয়ে ইনি তৈরী করে ফেলেছেন এক নিবিড় ‘ঘোরালু’ দল। সেইখানটায় এঁরা ব্যতিক্রমী। ষাটের আশেপাশে বয়স। স্কুলের ব্যাচ এক ছিলো তাই এঁদের ছেলেমেয়েরাও সমবয়সী বন্ধু। বছরে একবার নয়, বেশ কয়েকবার এই গ্যাং চলে যায় বেড়াতে। আমার বিরাট সৌভাগ্য যে সে দলে আমিও আমন্ত্রিত। বেশ কয়েকবার শিং ভাঙা হয়েছে, ঢুকে পড়েছি এই বাছুরের দলে।

এই গ্রহের যে নিঃশব্দ বাসিন্দাদের কথা আজ বলব, তাঁরা কারা? তাঁদের সঙ্গে আপনাদের রোজ দেখা হয়না… দেখা হলেই কিন্তু আমাদের আয়ু ও আনন্দ দুই-ই বাড়ে। তাঁরা বর্ষীয়ান, অভিজ্ঞ ও চলচ্ছক্তিহীন। তাই আমাদেরই উদ্যোগ করে যেতে হবে ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে, ওঁদের মৌনতার কাছে কান পাততে। দলের যে যেখানেই থাকিনা কেন, কান বোধহয় আমাদের পাতাই ছিল, নিজেদের অজান্তে; ব্যাঙ্গালোরে বসেও শুনতে পেলাম মিজোরাম থেকে ভেসে আসা পাহাড়ের সেই অপার্থিব ডাক। অথচ মিজোরামের নাম এই দীর্ঘ জীবনে ক’বার শুনেছি আর কতবার উচ্চারণ করেছি, হাতে গোনা যায়।

স্বাধীনতার পর কোনো দুর্জ্ঞেয় পক্ষপাতিত্বের শিকার হয়ে আমাদের দেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চল সরকার দ্বারা প্রচণ্ড অবহেলিত। এই সবে উন্নয়নের ঘণ্টা টুং টাং করে সেখানে জানান দিচ্ছে যে সে এবার আসতে চলেছে। সময় পরে বলে দেবে সে সত্যিই এলো কিনা।

থাকি এই উপমহাদেশের দক্ষিণ দিকে, ব্যাঙ্গালোরে। যাব এখান থেকে সম্পূর্ণ পূর্বে। ম্যাপ খুলে দেখলে পশ্চিমবাংলার সাইজের নিরিখে মনে হবে কয়েকখানা মিজোরাম ঢুকে যাবে তার ভেতর। আর বোঝা যাবে যে সাত বোন অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, এদের সকলের কাছাকাছি বলে একমাত্র ভাই হতেই পারতো পশ্চিম বাংলা।

ব্যাপারটা কীভাবে ‘পারতো’-তে পরিণত হলো দেখা যাক; একে তো কেন্দ্রের সদিচ্ছার অভাব, তায় এই সেভেন সিস্টার্স পুরো দেশটির সঙ্গে জোড়া আছে একটি সরু সুতোর মতো একফালি জায়গায়; জলপাইগুড়ি আর কুচবিহারে গিয়ে পড়েছে সেই যোগসূত্রের জায়গাটা। ইংরেজিতে খুব নেতিবাচক নাম দেওয়া হয়েছে সে জায়গার – ‘chicken’s neck’। এই যোগসূত্র ভৌগোলিক ভাবে ছাড়া আর কোনো ভাবেই সজীব নয়, সাত বোনের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী ভাইয়ের নেই বিশেষ যোগাযোগ। ফলে যা হবার, তাই হয়ে বসে আছে। বোনেদের সাতজনের নাম বলতে বললে কতজন বাঙালী ঠিক ঠিক পারবে তা বলা মুশকিল। শুধু এইটুকু জানা আছে যে তারা সকলেই সুন্দরী।

এই সাতটি রাজ্যই ভারতবর্ষের কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক সীমায় অবস্থিত। অরুণাচল ছুঁয়েছে চীন ও মায়ানমার; আসামের লাগোয়া হলো ভুটান; মেঘালয়ের প্রায় অর্ধেক সীমান্তরেখায় অবস্থিত বাংলাদেশ; ত্রিপুরার সীমা প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের গায়ে; নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে মায়ানমার, যার আগের নাম ছিলো বর্মা। এই নামটা শুনলেই যেন কেমন রহস্যের গন্ধে ভরে যায় মনটা। আর ‘পদী পিসির বর্মী বাক্স’ তো মনে পড়েই। খুব ইচ্ছে করে জানতে অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম এদের সকলের মায়ানমার ওরফে বর্মার সঙ্গে কি ধরনের আত্মীয়তা।

আমার প্রিয় লেখক অমিতাভ ঘোষের কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’ লেখা হয়েছে তৃতীয় অ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধের পটভূমিকায়। প্রথম পাতা থেকেই শোনা যায় সে যুদ্ধের সশব্দ পদক্ষেপ।

ফিরে আসি আমাদের গন্তব্যস্থল মিজোরামে। পশ্চিমে ৩১৮ কিলোমিটার ধরে বাংলাদেশ, পূর্ব ও দক্ষিণে ৪০৪ কিলোমিটার মায়ানমার একে আন্তর্জাতিক সীমারেখায় ঘিরে রেখেছে। বাকিটুকু ছুঁয়ে রয়েছে ত্রিপুরা, আসাম ও মণিপুর।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়া মাত্রই কিন্তু মিজোরাম অধিষ্ঠিত হয়নি, আমাদের দেশের এই বিস্তৃত পূর্বাঞ্চলকে ধরা হতো আসাম বলে। যদিও এখানে নানা গোষ্ঠী ও উপজাতির মানুষের বসবাস। সময়ের সাথে সাথে এখানকার বাসিন্দারা একে অন্যের থেকে পার্থক্য উপলব্ধি করার ফলে স্বতন্ত্র রাজ্যরূপ পেতে চায়। সর্বপ্রথম রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় নাগাল্যান্ড, ১৯৬৩-তে; মেঘালয় ১৯৭০-এ, ১৯৭২-এ মণিপুর ও ত্রিপুরা, সবশেষে অরুণাচল ও মিজোরাম ১৯৮৭-তে।

যে কথা বলছিলাম, এই রাজ্যগুলি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চরম পরাকাষ্ঠা। মিজোরাম নয়নাভিরাম পাহাড়, উপত্যকা, জঙ্গল, ঝর্ণা, পাখপাখালি, জীবজন্তু ও পাহাড়ী মানুষজনের সরল জীবনচর্যার এক অপূর্ব সমাহার।

সকালে ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে যখন বেলার দিকে কলকাতা পৌঁছোলাম, সেখানে আমাদের বাকি গ্রুপ উঠবে ঐ ফ্লাইটেই, গন্তব্য আইজল, মিজোরামের রাজধানী। যে গ্যাপটুকু ছিলো আইজল রওনার আগে, সেটা ভরিয়ে নেওয়া গেলো দুর্দান্ত ডিমের ডেভিল দিয়ে, ফলো’ড বাই অসাধারণ ফ্রায়েড রাইস ও চিকেন কারি, দলের সদস্যদের বাড়ি থেকে রান্না করে আনা।

প্লেন উড়েই পঞ্চাশ মিনিটে পৌঁছে গেলো আইজল। এয়ারপোর্ট নয়, যেন কারুর বাড়ির প্রাঙ্গণ, ফুলের বাগান দিয়ে সাজানো, চতুর্দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। ইচ্ছে করবে বাড়ির বারান্দায় বসে শুধু ঐ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। আসলে তো ওটা লেংপুই এয়ারপোর্ট। সে চত্বর পার হয়ে দেখা হয়ে গেলো আমাদের যে গাড়িগুলো নিতে এসেছে, তাদের চালকদের সঙ্গে। মিষ্টি হাসি সবার ঠোঁটে। 

লেংপুই এয়ারপোর্ট - যেন কারুর বাড়ির প্রাঙ্গণ
'গিফটল্যান্ড হোমস্টে' - মধ্যে কালো টি-শার্টে জোরিন

 

মাল ও মানুষ পেটে পুরে গাড়িগুলো রওনা দিলো, আমাদের গন্তব্য ‘গিফটল্যান্ড হোমস্টে’, দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে হবে এমন সে জায়গা।

ফুনসাং, সাইরাং, জোসাংলিয়ানা, এইসব নরম ছন্দোময় নামের বহু জায়গা পার হয়ে পৌঁছে গেলাম শ্রীমতী ‘জোরিন পুই’র মায়াবী ডেরায়। ‘গিফটল্যান্ড হোমস্টে’ আপনার ফোনে লিখলেই হবে, আধুনিক প্রযুক্তি নিমেষে দেখিয়ে দেবে পাহাড়ের কাঁধের ওপর বসে থাকা সেই মেঘছোঁয়া মায়াবী ঘরদোর যা কিছুদিনের জন্যে হবে আমাদের বাসস্থান। গাড়ি যেখানে এসে দাঁড়ালো, সেই লেভেলে আছে ব্রেকফাস্টের টেবিল চেয়ার, জোরিন ও তার পরিবারের থাকার জায়গা আর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় – দূরের গুলো যেন জলরঙে আঁকা, সেগুলো সত্যিই আছে না নেই দিনের বেলা আমি বলতে পারবোনা, কিন্তু রাতে গল্পটা অন্য। পাহাড়ের ওপর ছেয়ে আছে যে অন্ধকার, তাকেই টেনে আকাশের গা ঢেকে দেওয়া আর পাহাড়ের সমস্ত বাড়ির আলো জ্বলে উঠে দেখাচ্ছে যেন আকাশ থেকে বেশ কিছু তারা বাড়িগুলোর জানলা দিয়ে ঢুকে ভেতরে বসে পড়েছে। এই সৌন্দর্যসৃষ্টির জন্যে বেমালুম ক্রেডিট নিচ্ছে কিন্তু আকাশের তারারা।

আমাদের থাকার ব্যবস্থা দশ-বারোটা সিঁড়ি নিচে। সিঁড়িগুলো ছোটো ছোটো আর বেশ উঁচু। আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি মালপত্রগুলো নিয়ে যাবো কি ভাবে, হোমস্টের স্ট্রংম্যান হচ্ছে একটি ১৫-১৬ বছরের মেয়ে, সে ছুটে এসে দু’হাতে দুটো করে ঐ ভারী সুটকেসগুলো নিয়ে দৌড়ে নীচে আমাদের ঘরগুলোর সামনে রেখে এলো। আমরা সিঁড়ির ধার ঘেঁষে বেড়ে ওঠা নানা সাকালেন্ট গাছের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাতে তাকাতে অর্ধেক অন্যমনস্ক হয়ে, অর্ধেক মনোযোগ সহকারে নামলাম।

মনোরম নানা সবুজে মেশানো পাতাওলা চাতাল, সেখানে দোলনা ঝুলছে। সে লোভ সামলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম এক বড়োসড়ো বসার ঘরকে ঘিরে থাকার ঘরগুলো বেশ প্রশস্ত। এও লক্ষ করলাম যে ব্যালকনি থেকে গলা বাড়িয়ে দৃষ্টি যতদূর ছুটে যায়, শুধু দেখছি সাদা মেঘের সঙ্গে পাহাড়ি চূড়াদের খেলা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যেন ঢুকে পড়ি আকাশলীন সেই স্বর্গীয় খেলার মাঠে। মেঘে চড়ে ছুটোছুটি করে বেড়াই এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। দূর থেকে ভেসে আসে ইন্দ্রাণী সেনের গলা:

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে…

স্নানের ঘরের ছোট্ট জানলা – সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটু নীচের লেভেলে একটা বাড়িতে বাগানে খেলা করছে তিনটি শিশু। বুঝলাম ওরা আসলে মেঘ, লোভ সামলাতে না পেরে মাঝে মাঝেই নেমে আসে, ফুল পাতাদের সঙ্গে খেলবার জন্য।

জোরিনের রান্নার ব্যবস্থায় কোনো খামতি নেই, নিপুণ একটি টিম আছে যারা ওর তত্ত্বাবধানে তিন চার রকম মাংস, কোনোটা বাঁশগাছের সুস্বাদু কোঁড় দিয়ে রান্না করা, নানান সব্জী ও পাতার নিরামিষ স্যুপ, হালকা নুনজলে মনভোলানো মোচা সেদ্ধ, ইত্যাদি, বড় বড় গ্রুপের জন্য বা হানিমুনিং যুগলের জন্য সমান পারদর্শিতায় রান্না করে ফেলতে পারে। এই রকম সার্ভিস দিতে পারার জন্য গিফটল্যান্ড হোমস্টে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছে। তাদের কথা দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ছে আরো পর্যটকদের কাছে তাই ঘর তৈরী হচ্ছে আরো।

হোমস্টের ঘরের ভেতর - পরিপাটি ব্যবস্থা
রকমারি রান্নার বাহার

যেদিন পৌঁছোলাম সেদিন বিকেলের দিকে যাওয়া হলো স্কাইওয়কে – একটা লম্বা কাচের ডেক পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে রয়েছে, তাতে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে কাচের মধ্যে দিয়ে নীচের গভীর খাদ দেখা যায়, যাদের ভার্টিগো আছে, তাদের না যাওয়াই ভালো।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামলো, আর দেখলাম “তারায় তারায় খচিত” অঙ্গবস্ত্রের মনোহরণ দৃশ্য! রাতের আহার হলো ‘লা রুবি’ বলে খোলা ছাদে এক রেস্তোরাঁয় – সেখানেও উচ্চকিত আলোর প্রকোপ নেই অথচ সবই দৃশ্যমান, সবই ঠিক সেইভাবে উদ্ভাসিত যা আলোর মহিমা বাড়ায়, সে অন্ধকারকে আরো রূপসী করে তোলে বলে।

হোমস্টে থেকে রাতের দৃশ্য
স্কাইওয়ক
'লা রুবি' রেস্তোরাঁ
এক উপত্যকা থেকে অন্য উপত্যকায়

 

পরদিন যাওয়া রিয়েক পাহাড় (Reiek Tlang)। উচ্চতায় ১৪৬৫ মি এই পাহাড়টি আইজল থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। উপত্যকার পর উপত্যকা পার হচ্ছে আমাদের কনভয়, যতদূর তাকানো যায় শুধু পাহাড়, সঙ্গে বাজছে আমাদের গাড়িতে রেবেকার অপূর্ব গলায় আধুনিক গান। অবশ্যই শুনবেন। আমাদের অল্পবয়সী চালককে অনুরোধ করেছিলাম, “তোমার দেশের প্রিয় গায়ক/গায়িকার গান একটু শুনিয়ে দিও।” পুরো নাম তার Rebecca Lallawmsangi, গলায় এক অদ্ভুত সজীবতা। তাতে যেন আশেপাশের পাহাড়গুলোও নেচে ওঠে!

ঐ চূড়ার কাছে গিয়ে চারপাশটা দেখলে মনে হবে সারা পৃথিবীতে পাহাড় ছাড়া আর কিছু নেই। আমাদের মতো শহুরেদের কাছে এ এক বিশাল পাওয়া! তার পরের দিনের গন্তব্য মুইফাং। তিন-চার ঘণ্টা মনে হলো যেন মাটিতে তো পা ঠেকে নেই-ই, স্বর্গের আশপাশের কোনো জায়গা দিয়ে উড়ে চলেছে আমাদের গাড়িগুলো, নীচে মর্ত্যের মানুষ পড়ে রয়েছে নানান কূটকচালি নিয়ে।

মুইফাং-এ আমাদের থাকা গভর্নমেন্ট গেস্ট হাউসে – সবুজের সেই উঁচু-নীচুর সমারোহে মিলে মিশে একাকার কত নাম-না-জানা পাখির ডাক। পাশেই একটা বিরাট বড় পার্ক, তার সামনের দিকটার কিছুটা অংশ ল্যান্ডস্কেপিং করা, ট্রি-হাউস বানিয়ে রাখা আছে সেখানে, বাকিটা সাজানোর দায়িত্ব প্রকৃতির। গেস্ট-হাউসে রান্নার এলাহি ব্যবস্থা তবু রাস্তার ওপারে ছোট্ট কাঠের মেঝেওলা রেস্তোরাঁয় ব্রেকফাস্ট খাওয়ার লোভ সামলানো গেল না। তার জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সবুজের সাম্রাজ্য। সেখানে গরম গরম তৈরী হতে লাগলো রুটি ও ওমলেট, বিরাট ডেকচি ভর্তি আলুর তরকারি আগের থেকেই করা ছিলো। কদাচিৎ একটা আর্মি জীপ বা বাইকবাহিত এক্সপ্লোরারদের দল, এছাড়া আর কোনো যানবাহনকে ঐ রাস্তা ব্যবহার করতে দেখলাম না। পাহাড়ে খানিকটা উঠে জঙ্গলের মধ্যে পেলাম ওয়চ টাওয়ার, সেখানে ৩৬০° ঘাড় ঘুরিয়ে সিংহাবলোকনের অভিজ্ঞতা হলো দারুণ। পাখির ডাকের ফাঁকে ফাঁকে যে নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য তা আসলে পাহাড়ের কণ্ঠস্বর; আমাদের অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলো। মনে হলো আমাদের কারো সৎসাহস নেই জবাব দেওয়ার।

তুইরিহিউ ঝর্ণা যাওয়ার পথে

এর পর হবে তেনজলের বুয়াংপুইতে রহস্যঘেরা পাহাড়ে যাওয়া, সেখানে আছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেলাঘর – তুইরিহিউ ঝর্ণা। বহু সরু পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে তার কাছে পৌঁছোলে, সে আদর করে ডেকে নেয় তার বুকের ভেতর, না ভিজেও তার কোলে চলে যাওয়া যায়, উপর থেকে জল তীব্রগতিতে নেমে এসে আছড়ে পড়ে পায়ের কাছে কিন্তু ভেজায়না।

সুন্দরী ঝর্ণাকে পাহারা দিয়ে চলেছে দু’পাশের মহীরুহ। তাদের শেকড়ে-বাকড়ে কতো ইতিহাস, প্রকৃতির হাতে লেখা। অদূরেই তিরতির-করে-বয়ে-যাওয়া শান্ত জলপ্রবাহ, তার দু’পাড় থেকে বাঁশগাছ ঝুঁকে পড়ে আটকে দিয়েছে সূর্যের আলোকে, সেই নির্জনতায় মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায় ছোট্ট নৌকো বাওয়ার শব্দ। সিয়ালসুকের পথ ধরে এর পর রওনা। বিশাল উঁচু পাহাড়ের কোলে কত কি চাষ হয়, পশ্চিমে প্রায় ১০০০ মিটার আর পূর্বে প্রায় ১,৩০০ মিটার উচ্চতার এই পাহাড়ে চাষের পর এখনো ফসল কাটা হয়ে গেলে চাষা বেআইনি ভাবে সে জমি জ্বালিয়ে দেয়। পাহাড়েরা নিশ্চুপ। মনে হলো যেন শুনলাম তাঁদের প্রার্থনা – এতদিন এই সমস্ত পাহারা দিলাম, তোমরা সবাই আমাদের সুস্থ রেখো গো। প্রশ্ন করছেন ওঁরা – কেন তোমরা সব কিছু কেটে, ছিঁড়ে টুকরো করছো? আমি ওঁদের সঙ্গে চোখাচোখি সযত্নে এড়াচ্ছি।

Living Museum এ নাচের দল

এর পরের গন্তব্য আইবক। ওখানে জোখুয়া বলে এক জায়গায় দেখলাম Living Museum। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের থাকা, খাওয়া, জীবিকানির্বাহের কিছুটা ছবি এখানে পাওয়া গেলো এখানে প্রমাণ সাইজে সব কিছু বানিয়ে প্রদর্শনী করে রাখা হয়েছে বলে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত পুরুষ নিলেও সংসার চালানোর পরিশ্রম প্রায় পুরোটাই মহিলাদের ওপর। শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে মেয়ে, পুরুষের সমান অধিকার। ধর্মের পরিসংখ্যান এই প্রকার: –

খ্রিস্টান: ৮৭.১৬%
বৌদ্ধ: ৮.৫১%
হিন্দু: ২.৭৫%
মহমেডান: ১.৩৫%

নাচ ও গানের মাধ্যমে কিছুটা স্পর্শ পাওয়া গেলো মিজো পার্বণ ও উৎসব পালনের; নাচ ও গান হয় ঈষৎ ঢিমে তালে।

মিজো পোশাক ও আনুষঙ্গিক গয়না খুব উজ্জ্বল দেখতে হয়। এদের কাপড় বোনার শিল্পে আসাম ও নাগাল্যান্ডের সঙ্গে বেশ কিছুটা মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে মহিলারাই তাঁত বোনেন এবং পরের প্রজন্মকে knowledge transfer-ও তাঁদেরই দায়িত্ব।

উজ্জ্বল পোশাক ছাড়াও নাচ করতে গেলে মেয়েরা মাথায় পরে ভাকিরিয়া, বাঁশের কঞ্চি ও পাখির পালক দিয়ে তৈরী সঙ্গে জড়ানো নানা রংয়ের পুঁতি। পুরুষেরা সমান মাপের বাঁশকে জোড়ায় জোড়ায় মাটিতে সাজিয়ে রাখবেন ও মিষ্টি সুরের গানের সঙ্গে তালে তালে সেগুলোর স্থান বদল করবে্ন এবং মেয়েরা, বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে যে জায়গা তৈরী হচ্ছে, সেখানে নির্ভুলভাবে পা ফেলে ফেলে নাচবেন – এটা মিজোরামের বহু প্রচলিত নৃত্য।

এখানে আমরা মিজো হস্তশিল্পের কিছু অপূর্ব নিদর্শন দেখলাম; যে যার পছন্দমতো কিছু কিনলাম। রেবেকার গানের কথা বলেছিলাম। সে গান শুনতে শুনতে এবার আইজলের পথে। দেখা গেলো শহর আইজলের বেশ কিছুটা অংশ। পাহাড়ের বুকে শহুরে উঁচু বাড়ি, শপিং মল, সবই রয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আরো তৈরী হবে। চাপা পড়ে যাবে তার তলায় পাহাড়ের প্রার্থনা।

সঙ্গীতা ভারতীয় ও পাশ্চাত্যের নাটক নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছেন; অভিনয়, অনুবাদ, মঞ্চভাবনা, পরিচ্ছদ ও নাটকের প্রযোজনা, মূলতঃ ব্যাঙ্গালোরের ফোরাম থ্রি দলের জন্য। এখন নাট্যরচনা, পরিচালনা ও অনুবাদে প্রবৃত্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *