রূপবতী পুরুলিয়ার খোঁজে
“সবুজ ছায়ার মতন পুরোনো এই পৃথিবী;
এখানে অনেক দিন কেটে গেছে— অনেক যুগ কেটে গেছে…”
— জীবনানন্দ দাশ
গত আগস্ট মাসে যখন আমি বর্ষাস্নাত পুরুলিয়ার রূপ ছুঁয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল সবুজের এই আদিমতা কত পুরোনো… এর আগে সবুজের এত ভিন্ন শেড দেখিনি কখনও। বর্ষাস্নাত জঙ্গল আমায় টানে আর টানে প্রকৃতির আদিমতা; চোখকে আরাম দেয়। প্রকৃতির আদিমতা শুধু জঙ্গল নয়, তাকে ঘিরে রয়েছে পুরুলিয়ার সহজ, সরল ও সুন্দর আদিবাসীরা। আদিবাসী সাঁওতাল সমাজ কালীপুজোর পর থেকে, বিশেষত তাদের সহরায় পরবের (বা সোহরাই পরব) পর থেকে তাদের ঐতিহ্যবাহী মাটির বাড়ি-ঘর অসাধারণ দেওয়ালচিত্র এবং আলপনা দিয়ে সাজিয়ে তোলে, যা সারা বিশ্ব জুড়ে সুপরিচিত।
অনেক দিন আগে অযোধ্যা বুরু বা অযোধ্যা পাহাড়কে দেখে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় পাহাড়ি শহরের রূপরেখা এঁকেছিলেন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। সেই রূপরেখা হয়তো বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু তার সৌন্দর্য আজও তেমনভাবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
ছোটনাগপুর মালভূমির পূর্ব দিকে রাঢ় বাংলার প্রান্তর টুসু-ঝুমুরের দেশ পুরুলিয়া। পুরুলিয়া জেলায় ঝাড়খণ্ড সীমান্তে দলমা পাহাড়ের অংশ হিসেবে দুই হাজার ফুট উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই অযোধ্যা পাহাড়। চারিদিকে সবুজে ছাওয়া—শাল, মহুয়া, শিরীষ ও সেগুনে ঘেরা এই অরণ্যভূমি। ঋতুভেদে রঙের বৈচিত্র্য চোখে লাগার মতো। চারপাশে গহীন বন, ছোট-বড়ো পাহাড়ি ঝোরা আর অসংখ্য গিরিশিরা। তারই মাঝে মাঝে পাহাড়ের ঢালে আদিবাসীদের বাস। অতীতে কোনোকালে এখানে নানা বন্যজন্তুর দেখা মিলত, কিন্তু এখন জনবসতি অনেকটাই বেড়ে গেছে। জঙ্গল কেটে একদিকে যেমন মানুষের বাসস্থান তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে হরেক মানের রিসর্ট, হোটেল ও হোমস্টে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে আমাদের ঠিকানা ছিল পুরুলিয়ার মাঠাবুরু (মাথাবুরু)। অযোধ্যা পাহাড়ের কোলঘেঁষা বাঘমুণ্ডি ব্লকের মাঠা জঙ্গলে ঘেরা এ যেন এক টুকরো স্বর্গ। নীলাকাশ আর আদিম সবুজ বনানী যেন একে অপরের বুকে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এখানে। প্রকৃতির এই অমোঘ রূপ আমাদের শুধু মুগ্ধই নয়, আক্ষরিক অর্থেই আচ্ছন্ন করেছিল। “মাঠাবুরু ফরেস্ট রিসর্ট”-এ থেকেছিলাম তিন দিন। মাঠাবুরুর পাদদেশে এই রিসর্ট। সুন্দর তাদের আতিথেয়তা আর আপ্যায়নশৈলী। আমরা তাদেরই অতিথি হিসেবে ছিলাম এই কয়েকটা দিন।
মাঠাবুরুর আদিম বৃক্ষরাজির দিকে তাকালে মনে হয়, কত কিছু জানে এই অরণ্য— কত শত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বনস্পতিগণ। অরণ্য এতটাই নিবিড় যে, সূর্যের আলোও সহজে মাটি ছুঁতে পারে না। স্থানীয়দের মুখে শুনলাম, এই ঘন জঙ্গলের বুক চিরে মাঠা পাহাড়ের ঠিক চূড়োয় পৌঁছাতে নাকি এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে।
এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল বাঘমুণ্ডির চরিদা গ্রাম। অসামান্য সব মুখোশ তৈরির জন্য বিখ্যাত এই গ্রাম। অপ্রয়োজনীয় সাধারণ কাগজ থেকে এখানকার শিল্পীরা বিভিন্ন দেব-দেবীর অসাধারণ সব মুখোশ তৈরি করেন। এক শিল্পীর মুখে শুনলাম, তাঁরা দুর্গাপুরের বিভিন্ন স্কুলেও এই মুখোশ তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। দুর্গাপুজোর আগের থেকে শীত অবধি এই সব শিল্পীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো, যা দেখে মনটা গর্বে ভরে উঠল—আমাদের রাজ্যে কত বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীল কাজ ছড়িয়ে আছে!
এই মুখোশ পরেই স্থানীয় শিল্পীদের এক-একটা গোষ্ঠী ছৌ নৃত্য পরিবেশন করে। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—নানা বয়সের নৃত্যশিল্পীরা ধামসা, মাদল আর বাঁশির সুরে-তালে ছৌ নাচের মাধ্যমেই পরিবেশন করেন নানা পৌরাণিক কাহিনি। পর্যটকদের মনোরঞ্জন, শিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতা এবং সর্বোপরি এই গ্রামীণ লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আজকাল প্রায় প্রতিটি হোটেল ও রিসর্ট সপ্তাহান্তে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাঁদের এই সুন্দর উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
মাঠার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হাজার ফুট উঁচু পাহাড় কেটে গড়া পাখি পাহাড়। কলকাতার শিল্পী চিত্ত দে মহাশয়ের একক প্রচেষ্টায় ১৯৯২ সালে এর কাজ শুরু হয়। ‘ফ্লাইট টু হারমনি’ (Flight to harmony)-র শিল্পীরা নিখুঁত দক্ষতায় পাহাড় খোদাই করে পাথরকে রূপ দিচ্ছিলেন কোভিডের আগে পর্যন্ত। তবে বর্তমানের এই মহিলা ট্যুরিস্ট গাইডেরা জানালেন, কোভিডের পর সেই অসমাপ্ত কাজ আবার নতুন করে শুরু হয়েছে কিনা, তা তাঁদের ঠিক জানা নেই। তবে অতীতে খোদাই করা সেই অসামান্য কাজগুলোই তাঁরা পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখান, যা দেখলেই মন আপ্লুত হয়ে ওঠে।
এই মহিলা ট্যুরিস্ট গাইডরা আমাদের জানালেন তাঁরা মহুয়া গাছের ফল থেকে এক বিশেষ ধরনের তেল তৈরি করেন, যা বাতের ব্যথায় নাকি ম্যাজিকের মতো কাজ করে। একদিকে গাইড হিসেবে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখানো, অন্যদিকে এই ভেষজ তেল বানিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার লড়াই—অরণ্যকন্যাদের এই অদম্য জেদকে মনে মনে কুর্নিশ জানিয়ে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম, পরের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
দেখবার মতো আরও নানা জায়গা রয়েছে এই এলাকায়। রয়েছে বামনি জলপ্রপাত, তুর্গা জলপ্রপাত—এই বর্ষায় তারা সৌন্দর্যে ভরপুর। বামনি নদীর উপর অবস্থিত বামনি ফলস— এটি দেখতে হলে অনেক নীচে নামতে হয়, যেটা আমাদের মতো বয়স্ক মানুষের পক্ষে অসম্ভব। জলপ্রপাতটি প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এবং পাথরের উপর দিয়ে তিনটে ধাপে নীচে নামে। জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ৪০০টি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে হয়।
এর পরেই তুর্গা ফলস— দেখে মন ভরে গেল। এই বর্ষায় সে অপরূপ। পাহাড়ের বুক বেয়ে শ’ দুয়েক ফুট খাড়া পথ উঠে অরণ্যের গভীরে লুকিয়ে আছে এই প্রপাত। তুর্গা ফলস আকারে তেমন একটা বড়ো না হলেও, এর একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। শান্ত, নিরিবিলি এই পরিবেশের মায়ায় জড়িয়ে কখন যেন নিজের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরের সোনাঝরা রোদ এই ফলসের জলের উপর পড়ে চিকমিক করে যে ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করে, সেটি পরিবেশকে আরও মোহময় করে তোলে। এর জল এতটাই স্বচ্ছ আর পরিচ্ছন্ন যে, পর্যটকদের পানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এখানে জলের ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়েছে। মূলত সুবর্ণরেখা নদীর একটি ছোট্ট পাহাড়ি স্রোত—‘তুর্গা নালা’র ওপর এই ড্যামটি গড়ে উঠেছে।
পাহাড়ি রাস্তার বাঁক, তুর্গা ড্যাম, ড্যামের জলে আলোর মায়াজাল, দৃষ্টিনন্দন লেক আর বামনি নদীর জলপ্রপাত— আকর্ষণ বাড়িয়েছে এই পথের। পাহাড়, অরণ্য ও পান্না-সবুজ ড্যামের জল—মিলেমিশে চড়ুইভাতির সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে এই তুর্গায়। পৌষসংক্রান্তিতে এইখানে টুসু মেলা বসে।
বাঘমুণ্ডির ৮ কিমি দূরে পাহাড়ের উপর নির্মিত পাম্প স্টোরেজটাও দেখার মতো। অযোধ্যা পাহাড়ের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ভারতের প্রথম ও অন্যতম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি তৈরি করেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা। এই সংস্থার দ্বারাই এটি পরিচালিত হয়। ২০০৮ সালে প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে কাজ শুরু করে। এটির ‘লোয়ার ড্যাম’ (lower dam) ও ‘আপার ড্যাম’ (upper dam) দেখতে পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে তখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নিচের জলাধার থেকে উপরের জলাধারে পাম্প করে জল তোলা হয়। আবার যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে তখন উপরের জলাধার থেকে জল নিচে নামিয়ে টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এই কৃত্রিম জলাধার দুটিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা দেখে পর্যটকরা নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
বাঘমুণ্ডির আর একটি দ্রষ্টব্য স্থান হল খয়রাবেড়া বাঁধ। পাহাড়ে ঘেরা, অরণ্যে ছাওয়া বাঁধের নীল জলের লেকটিও মনোরম। এখানেও একটি বিলাসবহুল রিসর্ট রয়েছে। তাদের নিজস্ব বোটিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে—অবশ্য এই সুবিধা শুধুমাত্র তাদেরই জন্য, যারা এই রিসর্ট বুক করে সেখানেই কয়েকটা দিন সময় কাটানোর জন্য যাবেন। সুবর্ণরেখা নদীর অববাহিকা থেকে উৎপন্ন ‘খয়রা নদী’র ওপরই গড়ে উঠেছে এই ড্যামটি। স্থানীয়দের মুখে শুনলাম, শীতকালে এই চত্বর নাকি লাল পলাশের রঙে একেবারে রঙিন হয়ে ওঠে।
এরপর আসি পাড়ডি লেকের কথায়। পুরুলিয়ার পাড়ডি লেক বা পাড়ডি বাঁধ অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুন্দর ও শান্ত পর্যটন কেন্দ্র। সবুজে ঘেরা পাহাড় আর শান্ত জলাধার—এই পরিবেশ পর্যটকদের কাছে ভীষণ আকর্ষণীয় অবশ্যই। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গোর্গাবুরুর পাদদেশে কাঁথালঝোর (উচ্চারণের সামান্য তারতম্যের কারণে অনেকে এটিকে কাঁথালঝুড়ি নদী বলে থাকেন) নদীর ওপর এটি অবস্থিত। এই লেকের জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি একটি আলাদা সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। স্থির, নিশ্চল, টলটলে এই বাঁধের জল দেখলে এক প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য প্রতিদিন এখানে পর্যটকদের ভিড় জমে। শীত ও বসন্তকালে পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলিতে এই জায়গা মুখর হয়ে ওঠে।
পুরুলিয়ার অন্যতম আকর্ষণ হল মুরুগুমা বাঁধ বা ড্যাম। বাঘমুণ্ডি থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে মুরুগুমা। সেখানেও ড্যামের জলে সূর্যাস্ত দেখতে পড়ন্ত বিকেলে পর্যটকদের ভিড় জমে। লেকের জলে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে পর্যটকরা বিহ্বল হয়ে গেয়ে ওঠেন: “সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো… গোধূলির রঙে হবে এ ধরণী স্বপ্নের দেশ তো!” এই ড্যামটি অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে কংসাবতী নদীর এক উপনদী—সাহারাজোর নদীর ওপর তৈরি হয়েছে।
অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মনোরম আবহাওয়া পুরুলিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করার সেরা সময়। শীতের শেষে বসন্তের আগমনীতে এখানে পলাশ ও কুসুম ফুলের মেলা বসে; চারপাশ তখন লালে লাল হয়ে ওঠে। ইদানীং পুরুলিয়ায় কুসুম ফুলও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কুসুম গাছের কচি লাল পাতা দেখে অনেকেই প্রথমটায় পলাশ বলে ভুল করেন, তবে এই লাল পাতার মায়াবী রূপও পর্যটকদের মন ভরিয়ে দেয়।
এই সফরে এখানকার গাড়িচালক ভাইয়েরা আমাদের আরও কিছু চমৎকার অফবিট জায়গা ঘুরিয়ে দেখালেন, যার মধ্যে ‘কাঠের দুর্গা’ বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। আমাদের রাজ্যের প্রকৃতির এই বিপুল বৈচিত্র্য সত্যিই মন কেড়ে নেয়।
হাওড়া-পুরুলিয়া যাতায়াতের জন্য রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস (১২৮৮৩) বেশ আরামদায়ক। যাবার সময় ট্রেনটি সকাল সাড়ে ৬টায় সাঁতরাগাছি থেকে ছেড়ে দুপুর ১২টা ০৫ মিনিটে পুরুলিয়া পৌঁছেছিল। আবার ফিরতি পথে এই ট্রেনটিই (১২৮৮৪) পুরুলিয়া স্টেশন থেকে বিকেল ৩টে ২৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ৯টা ১৫ মিনিট নাগাদ হাওড়ায় এসে পৌঁছে দিল আমাদের। পুরো যাত্রাপথটিই ভীষণ মনোরম ও উপভোগ্য।
———-
ছবিঃ লেখক
