সুকান্তের সেই মেয়েটি

সুকান্ত ছিল গর্কির মতো দেখতে। তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল। কথা বলতো না বেশি। সে জানতো না সে নিজেই গর্বিত নিঃসঙ্গ আকাশচারী, স্খলিত হয়ে পড়লো ফুটপাথের ভিড়ে, আর উড়তেই পারলো না, অথবা সময় পেল না। কবি হবার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কিন্তু কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হলো। (বুদ্ধদেব বসু, কালের পুতুল)
মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল সুকান্ত? হয়তো সেই মেয়েটির কথা! নিরুদ্দিষ্ট, নামহীনা এক সই! একটা অসম্পূর্ণ, অপূর্ণ প্রেম! অথচ অশেষ, অন্তহীন!
বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলের দুই বন্ধু। সবে সপ্তম শ্রেণি। দু’জনেরই কবি-কবি ভাব। আদ্যোপান্ত রোমান্টিক। দু’জনেই ভালোবাসেন স্বপ্ন দেখতে। সমকালের কঠোর সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা সত্ত্বেও। পরাধীন ভারত। দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ। উপনিবেশবাদী আগ্রাসন। আর সমান্তরালে বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে কমিউনিস্টদের উত্থান। ইতিহাস জানে, এই অস্থির অসম্ভবের অমরায়ই ফুটে ওঠে অমর ভালোবাসা। ওই দুই কিশোর বন্ধুও ভালোবেসেছিল দুই বিনুনি করা চুলের দুই স্কুলবালিকাকে। মনে মনে। ওই বালিকারাও দুই বন্ধু। স্কুলছুটির পরে তারা একসঙ্গে বাড়ি ফেরে। আর স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে দুটি কিশোর ছেলে তাদের পানে অপলক চেয়ে থাকে। মেয়ে দুটিও ভীরু ভীরু চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে ওই ছেলে দুটিকে। ভালোবাসা এভাবেই শুরু হয়। কিন্তু শেষ হয় না। হয়তো মাঝপথে থমকে যায়। কিন্তু তবুও থেকে যায়; আজীবন।
সুকান্তের মনেও সেই মেয়েটি থেকে গিয়েছিলেন—একুশ বছরের অকালমৃত্যুর দিন অবধি। সাক্ষী ছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই স্কুলের বন্ধুটি—অরুণাচল বসু। সেই দুই মেয়ের একজনকে অল্প অল্প ভালোবেসেছিলেন অরুণাচলও। দুই বন্ধু মিলে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘উপক্রমণিকা।’ কেন এমন নাম হঠাৎ? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা হাইস্কুলের পাঠ্য সংস্কৃত ব্যাকরণ বইয়ের নাম থেকে নেওয়া কি? হবেও বা। কিন্তু বড়ো বিস্ময়ের কথা, উপক্রমণিকার বন্ধু সেই মেয়েটির কোনো ‘নামকরণ’ হয়নি কেন? আসলে সুকান্ত জানতেন তাঁর নাম, আবাল্য। কারণ তাঁর বাড়িতে নিয়মিত আসতেন ওই মেয়েটি, সেই শিশুকাল থেকেই। পাশাপাশি পাড়ার দুই বাড়ির মেলামেশা বহুদিনের। কিন্তু কেন কে জানে, সুকান্ত কোনো দিনও ওই মেয়েটির নামোচ্চারণ করেননি। হয়তো ওই নামটা বলতে গলাটা কেঁপে যেত তাঁর! প্রেমে যেমন হয়। মেয়েটিও কোনো দিন নাম ধরে ডাকেনি সুকান্তকে। ওই যে, প্রেম! অথচ ওই মেয়েটি এটা পর্যন্ত জানত যে, এই ছেলেটির নাম ‘সুকান্ত’ হল কেন?
সদ্যোজাত খুড়তুতো ভাইয়ের ওই নাম দিয়েছিলেন ‘রানিদি।’ সুকান্তের ভাই অশোক ভট্টাচার্যের লেখা ‘কবি সুকান্ত’ বইয়ে এই নামকরণের নেপথ্য কারণের উল্লেখ আছে। গত শতকের তৃতীয় দশকের শুরুতে প্রকাশিত হয় সাড়া জাগানো প্রেমের উপন্যাস ‘রমলা।’ লেখক সেকালের যশস্বী কথাসাহিত্যিক মণীন্দ্রলাল বসু। সেই উপন্যাসের এক বর্ণময় চরিত্রের নাম ‘সুকান্ত,’ যিনি ছিলেন একজন ‘দুর্ভিক্ষের কবি।’ কাহিনির শেষে সেই বিদ্রোহী কবি অকালেই চলে যান সব কবিতার ঊর্ধ্বে। তাঁকে মনে রেখেই সেই ‘জ্যাঠতুতো দিদি’ আদরের ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘সুকান্ত।’ তখন কে জানত যে, এই সুকান্তও হয়ে উঠবেন এক দুর্ভিক্ষের কবি! এই সুকান্তও বড়ো ত্বরায় হারিয়ে যাবেন ঝলসানো রুটির মতো মরা চাঁদের ওপারে। সময় আসলে বড্ড খেয়ালি। কী আশ্চর্যের কথা, সুকান্ত জন্মেছিলেন ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। তখন কে জানত যে, মাত্র দু’ দশক পরে সেটাই হবে ভারতের ‘স্বাধীনতা দিবসন’ অথচ সেই স্বাধীনতা দেখাই হবে না সুকান্তের। তাঁর মাত্র তিন মাস আগেই, সেই ১৯৪৭ সালেই তিনি পাড়ি দেবেন ইতিহাসের পাতায়। আর জীবন এত নিষ্ঠুর যে, চলে যাওয়ার আগে, লাউডন স্ট্রিটে কমিউনিস্ট পার্টির হাসপাতাল ‘রেড এইড কিওর হোম’-এর শেষ বিকেলটিতে তাঁর সেই ‘প্রিয়তমাসু’ মেয়েটির সঙ্গে একটিবারও দেখা হবে না সুকান্তর।
অথচ সেই শৈশব থেকে যৌবনের মুখপাত ইস্তক কতবার যে দেখা হয়েছে সুকান্ত আর সেই মেয়েটির। দেখা হলেই কত রংবেরঙের খেলা, মান-অভিমান, হুটোপুটি, খুনসুটি। যেন পিঠোপিঠি দুই ভাই-বোন। এমনও হয়েছে, সারাদিনের দস্যিপনায় ক্লান্ত হয়ে নিরালা দুপুরে এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন তাঁরা। হয়তো হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে সুকান্তর। আধোস্বপ্নের ঘোরে তিনি নয়নভরে চেয়ে থেকেছেন সেই ঘুমন্ত রাজকুমারীর মুখপানে। আহা, বালিকার ঘুম যে কী শান্ত, স্নিগ্ধ, সুরারোপিত! সেই প্রথম জেনেছিলেন সুকান্তও। কিন্তু তখনও তাঁর ‘রাজামশাই একটি বালিকা চাইল’-এর বয়স হয়নি। একটু পরেই ঘুম ভেঙেছিল সেই বালিকার। হাপুস নয়নে তিনিও চেয়ে দেখেছিলেন সুকান্তকে। সেই ভুবনভোলানো দৃষ্টিপাত। একটু কি কেঁপে উঠেছিলেন সেই অনামিকা মেয়ে? তিনি নিশ্চিত টের পেয়েছিলেন যে, এই দেখাটা একেবারে অন্য রকম। কিন্তু মেয়েদের হয়তো এত তাড়াতাড়ি ধরা দিতে নেই ছেলেদের কাছে। মেয়েটি তাই বিছানা ছেড়ে উঠেই একছুটে ঘরের বাহির!
বড়ো হয়ে বাল্যবন্ধু অরুণাচলকে এই সব কথা চিঠিতে জানিয়েছিলেন সুকান্ত, যথারীতি মেয়েটির নামোল্লেখ না করেই। এরকম হয়। ভালোবাসার মেয়েটির নাম লিখতে গিয়ে হাত কেঁপে যায় মুগ্ধ প্রেমিকের। অরুণাচল তখন বিখ্যাত প্রতিবাদী কবি, দক্ষ চিত্রকর এবং অবশ্যই একজন সক্রিয় কমিউনিস্ট কর্মী। পার্টির দৈনিক মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’-তে প্রুফ রিডার ছিলেন তিনি। আর অবসর সময়ে তিনি সেকালের নামকরা সাময়িকপত্র ‘সোভিয়েত দেশ’ ফেরি করে অর্থোপার্জন করতেন। পাশাপাশি তিনি একজন মরমি সংগ্রাহকও ছিলেন। দেশ-বিদেশের বেশ কিছু অমূল্য ও দুষ্প্রাপ্য ছবির প্রতিলিপি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী ছিল তাঁর সযত্ন সংগ্রহে। ততদিনে অরুণাচলের জনপ্রিয় দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে—‘পলাশের কাল’ এবং ‘দূরান্ত রাধা।’ আর এই সব কিছুকে ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী সংগঠক। তাঁরই হাত ধরে গড়ে উঠেছিল ওই সময়ের মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য ও সঙ্গীত সংগঠন ‘নতুন সংস্কৃতি।’ এই সংস্থার পরিচালনায় অরুণাচল শুরু করেছিলেন ‘কবিতার সঙ্গীতায়ন’ অনুষ্ঠান। অভিনব সুর প্রয়োগ করে বাংলা আধুনিক কবিতাকে গান করে তোলার অনন্য সৃজনশিল্পের ফিতে কেটেছিলেন তিনিই।
বহুপ্রতিভার সমাহার এবং সমমতাদর্শের কারণেই সুকান্ত-অরুণাচলের সেই সখ্য ছিল অবিচ্ছেদ্য। এই দুই কবিবন্ধু মিলে ‘শতাব্দী’ নামে একটি সুললিত যৌথ কবিতা রচনা করেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে যা বিরলতম ঘটনা। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল অধুনা বাংলাদেশের ‘সাধনা’ পত্রিকায়। সুখরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘সুকান্তগাথা’ গ্রন্থেও এই কবিতাটি গ্রন্থিত হয়েছে। হাইস্কুল পেরোনোর অনেক আগে থেকেই সুকান্ত ও অরুণাচলের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি ক্ষুদ্রপত্রিকা। প্রায় ‘যমজ’ এই কবিদ্বয়ের ওই বন্ধুত্বের আরও একটা পোক্ত হেতু ছিল। অকালে মাতৃহারা সুকান্তকে নিজ পুত্রজ্ঞানেই প্রতিপালন করতেন অরুণাচলের মা সরলা দেবী। তিনি ছিলেন ওই সময়ের নামজাদা সাহিত্যিক। তাঁর লেখা ‘পাঁচটি ফাগুনসন্ধ্যা ও একটি কোকিল’ গল্পটি পাঠকসমাজে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। পরে সুকান্তকে নিয়ে তিনি একটি হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিনিবন্ধ লিখেছিলেন। সরলা দেবীর এই লেখাটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ প্রকাশিত ‘সুকান্ত মূল্যায়ন’ পুস্তকে। কাজেই বলাই বাহুল্য যে, এই বসু পরিবারের সান্নিধ্য সুকান্তকে সোহাগে-যতনে আলোকিত করেছিল।
যদিও সুকান্তের সৃষ্টিজীবনের প্রাথমিক সমৃদ্ধির সূচনা হয়েছিল তাঁর নিজেরই পরিবারে। তাঁর বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য ছিলেন নিষ্ঠাবান আধ্যাত্মবাদী ও সদাচারী ব্রাহ্মণ। কাজেই বেলেঘাটার ‘ভটচাজ বাড়ি’-তে পুজোপাট এবং সংস্কৃত মন্ত্রতন্ত্র ও শ্লোকাবলির নিয়মিত চর্চা ছিল। কিন্তু নিবারণবাবু ছিলেন প্রগতিশীল এবং পরমতসহিষ্ণু। কাজেই নাস্তিক ও কমিউনিস্ট পুত্র সুকান্তের রাজনৈতিক সক্রিয়তায় তিনি কখনোই বাধা দেননি। তাঁর ছিল প্রকাশনার ব্যবসা, নাম—‘সারস্বত লাইব্রেরি;’ যেটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা। উদারমনা এই সংস্থা থেকে যেমন প্রকাশিত হয়েছে সুকান্তের জেঠু সুরেন্দ্রমোহন ওরফে আচার্য কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতিতীর্থ বিরচিত কালজয়ী ‘পুরোহিত দর্পণ,’ তেমনই বেরিয়েছে যুগন্ধর কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমদের ‘প্রবন্ধ সংকলন।’
সারস্বত লাইব্রেরি’-র আরও দুই উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হল ‘সুকান্ত সমগ্র’ এবং ক্ষিতীশ রায়ের করা সুকান্তের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ; নাম—‘সুকান্ত ভট্টাচার্য: এ সিলেকশন অব হিজ পোয়েমস।’
সাহিত্য আকাদেমি প্রকাশিত জগন্নাথ চক্রবর্তীর ইংরেজি বই ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ থেকে বিদ্রোহী ‘কিশোর কবি’র বিকাশকালের বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, বাবার মন্ত্রোচ্চারণ ও শ্লোকাবৃত্তির মধ্য দিয়েই শিশু সুকান্তের মনে পদ্যভাবের সূচনা হয়েছিল। আর বালক সুকান্ত ছন্দ এবং সুরের দীক্ষা পেয়েছিলেন মা সুনীতি দেবীর পাঁচালিপাঠ থেকে। অবশ্য সুকান্তের মনে আধুনিক কবিতা প্রভাব বিস্তার করেছিল তাঁরই প্রিয় বৌদি সরযূ দেবীর শিক্ষাদীক্ষায়। এই পারিবারিক পটভূমির কল্যাণেই, বন্ধু অরুণাচলের মতোই সুকান্তও শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির বহুধা শাখাপ্রশাখায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। কী করেননি তিনি! পত্রিকা সম্পাদনা থেকে পার্টি সংগঠন। কী লেখেননি তিনি! গল্প, পদ্য, চিঠিপত্র, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, নাটক, গান, গীতিনাট্য—সব। অমর গায়ক পঙ্কজ মল্লিক নিজেরই সুরে সুকান্তের লেখা কবিতাকে গান বানিয়ে গেয়েছিলেন; সেই গান সম্প্রচারিত হয়েছিল ‘আকাশবাণী’ থেকে। এই রেডিয়োরই ছোটদের প্রিয়তম অনুষ্ঠান ‘গল্পদাদুর আসর’–এ নিয়মিত অংশ নিতেন সুকান্ত। নাট্যাভিনয়ও করতেন সদাব্যস্ত সুকান্ত। উপরন্তু তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করতেন পার্টির কাগজ ‘স্বাধীনতা’–র ‘কিশোরসভা’ বিভাগ।
সম্ভবত এরকম বহুমুখী মেধা ও প্রতিভার সুবাদেই সুকান্তের মধ্যে সদাই একটা অশান্ত মন মাথাচাড়া দিত। শিল্পীসুলভ অতৃপ্তির কারণে প্রায়শই অস্থির হয়ে উঠতেন তিনি। ব্যাপারটা নজর করেছিলেন অগ্রজ কমিউনিস্ট কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই মুখুজ্জেই ছিলেন কবি সুকান্তের আসল ‘আবিষ্কারক।’ এই সুভাষই পরোক্ষভাবে সদ্যযুবক চঞ্চলমনা সুকান্তর ওই অতিসক্রিয়তার কথা লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন: “সুকান্তকে আমি ছোট থেকে বড়ো হতে দেখেছি বলেই জানি, এক জায়গায় থেকে যাওয়া সুকান্তর পক্ষে অসম্ভব ছিল!” সম্ভবত সুকান্ত নিজেও সেটা বুঝতেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে একাগ্রতার সঙ্গে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়তো অসম্ভব ছিল। অনেকেরই অনুমান হল, সেই অনামা মেয়েটির সঙ্গে সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক প্রেমের সম্পর্ক থাকলে, সুকান্ত নিশ্চিত প্রশান্তি পেতেন কিঞ্চিৎ। কিন্তু সেটাও তো হয়ে ওঠেনি। কেন, কেউ জানে না। সুকান্ত নিজে বহুবার সেই অপ্রকাশ্য প্রেমসত্যিটা বলতে চেয়েছিলেন ওই মেয়েটিকে। পারেননি। কেন? সেই দোলাচল, সেই অহেতুক অনিশ্চিত দ্বন্দ্ব? শৈল্পিক সংঘাত? হবেও বা! হয়তো বা পথ চেয়ে ছিলেন সেই মেয়েও। তিনি হয়তো শুনতে চেয়েছিলেন যে, প্রিয় ছেলেটি কবে এসে বলবে—“তোমাকে ভালোবাসি!” কিন্তু অপেক্ষাই সার! সেই ছেলেটি তাঁকে সব কিছু বললেও, আসল কথাটা বলেননি! মেয়েটি শুধিয়েছিল: “তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না কেন?” তবুও মুখর সেই কবি ছিলেন নীরব, নিরুত্তর। অনন্ত অভিমানে মেয়েটি তাই হঠাৎই হারিয়ে গিয়েছিল বিক্ষিপ্ত সময়ের আড়ালে!
এমনটা সুকান্ত নিজেও তো চাননি। তিনি নিয়ত যুদ্ধ করে গেছেন নিজের সঙ্গে নিজে। মেয়েটিকে মনে মনে আপ্রাণ ভালোবেসেছেন সুকান্তও। শুধু সেটা মুখ ফুটে বলা হয়নি। কিন্তু প্রেমের তো অভিমানও থাকে! সে মানবে কেন এমন অব্যক্ত অপারগতা, এমন আনমনা অনাদর? তাই হয়তো সে অবশেষে হারিয়ে গেছে পথিমধ্যে! অথচ শুরুটি এমন অনির্দিষ্ট ছিল না; বরং ছিল সমারোহের। সুকান্ত চিঠিতে লিখেছিলেন সেই গল্প— বন্ধু অরুণাচলকে। তিনি লিখেছিলেন, কবে কীভাবে সেই বালখিল্য বন্ধুত্ব পেরিয়ে প্রেম এসেছিল সশব্দ চরণে। সেদিন মেয়েটি এসেছিল সুকান্তদের বাড়িতে। বাড়ির সবাই যে যার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। একটা নিঝুম দুপুর। একঘরের আড়ালে শুধুই সেই মেয়ে আর সুকান্ত। রেডিয়োতে বাজছে শচীনকর্তার সেই বিরহবিধুর গান: “আজও নয় প্রিয়, আজও নয়! বিরহী কপোতী আজিও কাঁদিছে, ওঠেনি সে চাঁদ মায়াময়।” সুকান্ত বিরহে ব্যাকুল। মেয়েটিকে দেখে দেখে তাঁর দৃষ্টি না ফেরে। হাতছোঁয়া দূরত্বেই ঈপ্সিত মেয়েটি বসে আছে। সলাজে আরক্ত আনত আনন তাঁর। প্রেম তো এমনই হয়—গভীর অথচ নিরুচ্চার। এই প্রথম সুকান্ত তাঁর প্রেমিকাকে দেখতে পেলেন।

এটুকুই। আর কিছু না। কারও কোনো কথা নেই যেন! কোনো কথা না বলেও তো অনেক কথা বলা যায়! ঠিক এই সময় কবি সরব হলেন। তিনি নাম ধরে ডাকলেন প্রিয়াকে। কনে-দেখা আলোর মতো রাঙা হয়ে উঠল মেয়েটির মুখ। সুকান্ত বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো!” মেয়েটি কিছুই বললেন না; শুধুই একপশলা হাসলেন। সুকান্ত বন্ধুকে চিঠি লিখলেন: “অরুণ, এই সেই মেয়ে, যে আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছে দান!” এরপর কত কত দিন যে এরকম দৃশ্যের জন্ম হয়েছে। মেয়েটি বারবার এসেছে সেই ‘ভটচাজ বাড়ি’-তে। মেয়েটিকে কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন সুকান্ত: “তবু লিখছি তোমাকে আজ… ঘরে ফেরার সময় এসে গেছে… একটি হৃদয় নেচে উঠবে আমার আবির্ভাবে, সে তোমার হৃদয়!” মেয়েটি পড়েছেন ‘শেষের কবিতা’: “উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে, সেই ধন্য করিবে আমাকে!” কখনও-বা পাড়ার পার্কের সবুজ অন্ধকারে কবির মুখোমুখি ‘বনলতা সেন’-এর মতো বসেছেন সেই মেয়েটি; কিংবা কখনও কোনো জোছনার রাতে তাঁরা দুটিতে মিলে মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়েছেন বন্ধনহীন গ্রন্থির মতো পথ বেয়ে!
পথের শেষ কোথায়, তা কে-ই বা জানে! তবে এটা ঠিক যে, চাঁদের আলোয় একটা অনিশ্চয়তা থাকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের মনে হয়, লুসি যদি মারা যায়! সেই মেয়েটিরও কি তাই হয়েছিল? সবাই যখন বনে যায়, তেমনই এক জ্যোৎস্নারাতে হঠাৎই তিনি সুকান্তকে বলেছিলেন: “তুমি তো ‘উপক্রমণিকা’-কে ভালোবাসতে পারো; তোমাদের দুটিতে বেশ মানাবে কিন্তু।” যাঁরা প্রেমিক, তাঁরা বুঝতে পারেন—এটাই শেষ দৃশ্য। এই রাস্তাটা থাকবে, চরাচর জুড়ে চুপটি করে বসে থাকবে শব্দহীন জোছনা, ভালোবাসা এমনই থাকবে জীবনের জন্য; শুধু ওই মেয়েটি থাকবে না। কোথাও না। সুকান্তও যেন বুঝতে পেরেছিলেন, আর অল্প একটু জীবন বাকি। অগত্যা সেই নগ্ন নির্জন রাতে কলকাতার একলা রাস্তা ধরে সেই প্রতিবাদী কবি, সেই প্রেমিক পথিকবর মাইলের পর মাইল হেঁটেছিলেন সেই গানটা গাইতে গাইতে: “কাছে যবে ছিল পাশে হল না যাওয়া, দূরে যবে গেল তারই লাগিল হাওয়া!” সত্যি, রবীন্দ্রনাথ পারেনও বটে!
পরিশেষে অরুণ মিত্রের কবিতার সেই চরণটি ফিরে আসুক আরবার: “মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল সুকান্ত?” সেই মেয়েটির কথা! নাকি এই মেয়েটির মতোই হারিয়ে যাওয়া কলকাতার কথা? সুকান্তের সেই— ‘প্রিয়ার মতো, রহস্যময় নারীর মতো’ কলকাতা!
সেই কবে এক কমরেডকে এপিটাফের মতো একটা চিঠি লিখেছিলেন সুকান্ত। যেটি পড়লে মনে হয়, সুকান্ত এই চিঠিটা লিখেছেন আজই। আজকেই। একটু আগেই।
অরুণ, কলকাতা এখন আত্মহত্যার জন্যে প্রস্তুত, নাগরিকরা পলায়ন-তৎপর। একদিন হয়তো এই পৃথিবীতে থাকব না… বাঁচতে ইচ্ছা করে, কিন্তু নিশ্চিত জানি কলকাতার মৃত্যুর সঙ্গেই আমিও নিশ্চিহ্ন হব!
———-
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
