সুন্দরী সহ্যাদ্রি
২০২৫-এর নভেম্বর, মুম্বইয়ের বাতাস ভোরের দিকে সামান্য ঠান্ডা হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখনও রীতিমতো ফুল স্পিডে পাখা ঘুরছে ঘরে ঘরে। গত নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি হঠাৎই মনের মধ্যে ‘উঠিল বাজনা বাজি’—
চলো ঘুরে আসা যাক পঞ্চগনি, সঙ্গে মহাবালেশ্বর, প্রতাপগড় ফোর্ট, আর উপরি পাওনা হিসেবে ওই অঞ্চলের অপূর্ব নিসর্গ দৃশ্য তো আছেই। বৃহস্পতিবার সকালে বেরিয়ে শনিবার ফেরা, মাত্র তিন দিনের ছুটি— তাই স্থির হল আমাদের বয়স্ক শরীরকে ব্যস্ত না করে এই সফরে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই ঘোরা হবে। গুগলের ভরসায় দু-দিন, দু-রাত্রিবাসের জন্য বুক করা হল পঞ্চগনির ‘রেইন ফরেস্ট হোটেল;’ তৃতীয় দিনে সকালেই বেরিয়ে পড়া হবে বাড়ির পথে। সারা বছরই যাওয়া যেতে পারে এখানে, যদিও সহ্যাদ্রির রানি পঞ্চগনির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সব থেকে আরামদায়ক সময় সেপ্টেম্বর থেকে মে মাস। তবে যারা বৃষ্টি ভালোবাসেন, তাদের জন্য বলে রাখা ভালো— মহারাষ্ট্রের পাহাড় বর্ষার জলসিঞ্চনে আরও অপরূপা হয়ে ওঠে। তাই জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও এখানে ট্যুরিস্টদের যথেষ্ট ভিড় হয় বললে অত্যুক্তি করা হবে না। মুম্বই থেকে পঞ্চগনি যেতে পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে রোড ট্রিপই সবথেকে ভালো। রেলপথে পঞ্চগনি যেতে চাইলে নামতে হয় ৬০ কিমি দূরে সাতারা স্টেশনে। ৪৫ কিমি দূরে ওয়াথার বলে একটি ছোট স্টেশন থাকলেও সেটির যোগাযোগ ব্যবস্থা ভ্রমণকারীদের জন্য একেবারেই স্বচ্ছন্দ নয়।
প্রথম দিন
মুম্বইতে নভেম্বরে সেভাবে শীত না পড়লেও ভোরের দিকে হাওয়া চলছে ভালোই। বৃহস্পতিবার সকাল আটটা নাগাদ থানের আবাসন থেকে আমাদের গাড়ি যখন রওনা হল, তখন হেমন্তের প্রভাতী হাওয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে মিঠে হিমেল আমেজ আর মন চঞ্চল হয়ে আছে নতুন জায়গায় পৌঁছানোর উত্তেজনায়। মুম্বইয়ের দক্ষিণ-পূর্বে পঞ্চগনি; মুম্বই থেকে দূরত্ব প্রায় ২৫৪ কিমি, পাহাড়ি পথে গাড়িতে যেতে সময় লাগে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। পথে বিরতি নিলে সময় আরেকটু বাড়তে পারে। বাসে সময় লাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা।
মহারাষ্ট্রের এই পশ্চিমঘাট অঞ্চলে পাথরের বুক চিরে পথ তৈরি করা হয়েছে, যা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের সাধন হয়ে উঠেছে। পথে ছোট-বড়ো বেশ কয়েকটা টানেল পেলাম। টানেলের ভেতরে সুন্দর আলোর ব্যবস্থা থাকায় গাড়ি চলাচলের অসুবিধে হয় না। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে কাটা টানেলের মধ্য দিয়ে তৈরি করা প্রশস্ত রাস্তা, ‘ওয়ান ওয়ে’ না হওয়ায় দু-দিকেই গাড়ি আসা-যাওয়া করছে; কোথাও পথের ধারের ঘন সবুজ বনানীর নয়নাভিরাম রূপে মুগ্ধ হয়ে, আবার কোথাও বা রুক্ষ পাথুরে সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পঞ্চগনি— মাথার ওপরের সূর্য তখন মধ্যগগন পেরিয়েছে। সফরক্লান্ত দেহের দাবি মেনে লাঞ্চ করেই হোটেলরুমের নরম বিছানার উষ্ণ লেপের ভেতরে আশ্রয় নিলাম। পঞ্চগনির তাপমাত্রা তখনই মুম্বই থেকে বেশ কয়েক ডিগ্রি কম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪৩৮০ ফিট উঁচুতে মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশনে গ্রীষ্মেও গরমের ‘নো এন্ট্রি।’ কথাটা আমার নয়, কথাটা ‘রেইন ফরেস্ট হোটেল’-এর এক বঙ্গসন্তান বেয়ারার এবং ‘বোন টু বোন’ মানে হাড়ে হাড়ে সত্যি। হাড় কাঁপানো ঠান্ডার কামড় নয়, অথচ মিষ্টি শীতের আদুরে অভ্যর্থনায়, মাঝ-নভেম্বরের রাতে তো বটেই, দুপুরেও হোটেলে শয্যার নরম লেপের আবরণ, পক্ষীমাতার আরামদায়ক পালকের উষ্ণতার মতোই বড়ো উপভোগ্য লাগছিল আমাদের।
আশপাশের পাহাড়গুলোর উপস্থিতি দেখেই সম্ভবত পঞ্চগনিকে ‘ল্যান্ড অফ ফাইভ হিলস’ বলা হয়। এখানকার আরামদায়ক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে দান্দেঘর, গোদাবলি, আম্ব্রাল, খিঙ্খার ও তাইঘাট নামের পাঁচটি গ্রামের মধ্যবর্তী অনামা একটি জায়গায় ১৮৬০ সালে লর্ড জন চেসন নামের এক ব্রিটিশ আধিকারিকের দায়িত্বে ইংরেজরা তাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটানোর জায়গা হিসেবে এই শহরটি গড়ে তোলে এবং এখানকার নাম রাখা হয় পঞ্চগনি, যার অর্থ পাঁচটি গ্রামের মধ্যবর্তী মালভূমি।
ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম নিতেই শরীর একদম ঝরঝরে। বিকেল চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়া হল শহর দেখতে। এখানে দর্শনীয় স্পটের মধ্যে পড়ে পারসি পয়েন্ট, সিডনি পয়েন্ট, টেবল ল্যান্ড ইত্যাদি। পঞ্চগনি ট্যুরিস্ট স্পট হলেও প্রায় সারা বছরই লোকজনের আনাগোনা থাকে। শহরের জনসংখ্যাও খুব কম নয়; তাদের প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে বাজার থেকে ব্যাঙ্ক, স্কুল থেকে হাসপাতাল। আমরাও শহরের পথে এলোমেলো এ-রাস্তা ও-রাস্তা ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম বেশ কিছু পার্ক, সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান ঘেরা বাড়ি, কটেজ, রিসর্ট। দেশের অনেকগুলো নামকরা আবাসিক স্কুল রয়েছে এখানে; তৈরি হয়েছে হাসপাতাল, স্যানেটোরিয়াম। সেন্ট পিটার্স চার্চ এখানকার উল্লেখযোগ্য একটি পুরোনো চার্চ। লর্ড জন চেসনকে এখানকার সেন্ট পিটার্স চার্চে সমাহিত করা হয়েছিল। জন চেসনের মৃত্যুশতবার্ষিকীতে এখানকার সমস্ত স্কুলের ছাত্র ও স্থানীয় সংগঠনগুলো একত্রিত হয়েছিল।
পারসি পয়েন্ট আর সিডনি পয়েন্টের খ্যাতি এখান থেকে দৃশ্যমান নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য। কৃষ্ণা নদীর উপত্যকার এবং চারপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য এখানে ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করে। সিডনি পয়েন্ট থেকে দূরে পাহাড়ের ওপর মারাঠাদের নির্মিত কয়েকটি কেল্লাও দেখতে পাওয়া যায়।
টেবল ল্যান্ড
শেষ বিকেলে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম পঞ্চগনির সবথেকে উঁচু জায়গা (সমুদ্রতল থেকে প্রায় ৪৫৫০ ফিট) ‘টেবল ল্যান্ড’ নামের জায়গাটিতে। উইকিপিডিয়া জানাল, এটি এশিয়ার দ্বিতীয় ‘ভলক্যানিক প্ল্যাটো’। প্রায় ৯৫-৯৯ একর জমি জুড়ে তৈরি টেবিল টপের মতোই আয়তাকার এই জায়গাটি ল্যাটেরাইট পাথরের মালভূমি। প্রশস্ত উপত্যকা থেকে যত দূর চোখ যায়, পঞ্চগনির নৈসর্গিক দৃশ্য বড়ো সুন্দর, বড়ো উপভোগ্য। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতোই। এখানে ট্রেকিং, ‘স্মল রাইডিং ট্রেন,’ ‘হর্স রাইডিং,’ আর টাঙ্গা করে ঘুরে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। সযত্ন লালিত আর সুগঠিত দেহের অধিকারী ঘোড়াগুলোর রাজকীয় চলন দেখেই অশ্বারোহণের ইচ্ছে জেগেছিল মনে, কিন্তু শেষপর্যন্ত সপরিবারে একসাথে ঘোরার ইচ্ছেতে আমরা টাঙ্গাই নির্বাচন করলাম। টেবল টপের মাথা পাথুরে এবং কিছুটা অসমান হওয়ায় ঘোড়ার চালের সঙ্গে গাড়িও রীতিমতো দুলছিল, ফলে আমাদের টাঙ্গা এবং একে অপরকে রীতিমতো ধরে বসে থাকতে হচ্ছিল। টাঙ্গাওয়ারি ছেলেটির নাম সূরিয়া অর্থাৎ সূরজ। ছেলেটি সমানে ধারাবিবরণী দিয়ে যাচ্ছিল কোন কোন সিনেমার কোন দৃশ্যের শ্যুটিং এখানে হয়েছে, এখানে পঞ্চপাণ্ডবদের থাকার গুহা কোথায় কোথায় ছিল, পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী বনবাসে থাকাকালীন কোথায় রান্না করতেন ইত্যাদি। তবে আমাদের কান ওর কথাতে থাকলেও চোখ ছিল বাইরের দৃশ্যের দিকে। দিগন্তে তখন দ্রুত পটপরিবর্তন হচ্ছে। সূর্যদেব পাটে যাবেন বলে দিগন্ত বরাবর এক অসাধারণ কমলা ও হলুদ রঙের আলোর লম্বা সরলরেখা টেনেছেন প্রকৃতিদেবী। মনে হচ্ছে, কোনো দক্ষ শিল্পী তাঁর সযত্ন তুলিতে আকাশের ক্যানভাসে রঙ ধরিয়েছেন। আমরা টাঙ্গা দাঁড় করিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। চারিদিকে ক্রমশ অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে, বাড়ছে ঠান্ডা হাওয়ার তীব্রতা। শহরের আলো ছেড়ে এসেছি পেছনে। চারিদিকে অন্ধকারের মধ্যে ওই আলোকরেখা এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মতো আমাদের অনেকক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখল!
এখানে টাঙ্গা নিতে হয় ঘণ্টার হিসেবে। সময় শেষের দিকে, আমাদের টাঙ্গার ঘোড়াও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ততক্ষণে পা ঠুকে ঠুকে তার বিরক্তি জানান দিচ্ছিল; সুতরাং ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরতে হল শুরুর জায়গায়। টাঙ্গা থেকে যখন নামছি, তখন কনকনে ঠান্ডা। ওই ঠান্ডার মধ্যেই হাতে গোনা কয়েকটা দোকান— পাওয়া যাচ্ছে ভুট্টা, ফলের রস, মোমো, চিনেবাদাম আর কফি। একটা বেলুন ফাটানোর দোকানে দেখলাম বেশ কিছু বাচ্চা আর তাদের অভিভাবকদের ভিড়। আমার নাতনিটিও বাবার সঙ্গে গিয়ে দু-রাউন্ড বেলুন ফাটানো প্র্যাকটিস করে এল। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গরম গরম রোস্টেড ভুট্টা আর সফেন কফি পান করে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ানোর কিছুটা চেষ্টা করা হল। এখান থেকে বাজার দেড় থেকে দু-কিমি দূরে। বাজার অঞ্চল যথারীতি আলো ঝলমল করছে। সব জায়গাতেই বাজারের চেহারা মোটামুটি একই হয়, স্থানবিশেষে পণ্যের যেটুকু তফাত হয় আরকি! বাজারে এত মানুষ আর গাড়ির ভিড় যে, পার্কিংয়ে গাড়ি রাখাই সমস্যা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এখানকার নামকরা চকলেট কোম্পানি ‘ধনঞ্জয়’-এর আউটলেট থেকে এখানকার বিখ্যাত চিক্কি আর চকলেট কেনা হল। বাজারেই একটি রেস্তোরাঁতে ডিনারের পর স্ট্রবেরি মিল্কশেকের স্বর্গীয় স্বাদ নিয়ে ফিরে এলাম রাত-আবাসের উষ্ণতা ভরা বিছানার কোলে।
দ্বিতীয় দিন
পরের দিন শুক্রবার সকাল নটা নাগাদ হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হলাম। আজকের প্রথম গন্তব্য মহাবালেশ্বর থেকে আরও ২৩ কিমি এগিয়ে প্রতাপগড় ফোর্ট। মারাঠা সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ইতিহাসে এই প্রতাপগড় দুর্গের মাহাত্ম্য অপরিসীম। পাহাড়ের ঘাটের পথ পেরিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি। পর্যটকদের অপেক্ষায় পথের দু-ধারে প্রকৃতি সাজিয়ে রেখেছে তার অসাধারণ সৌন্দর্যের ডালি। কখনও তা ঘন সবুজ, কখনও রুক্ষতায় ভরা পাহাড়, কোথাও আবার পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারা রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে পড়ছে নীচের পাথরে। কখনও একাধিক বিচ্ছিন্ন জলধারা মিশে গিয়ে ঝরনার চেহারা নিচ্ছে। অনুমান করতে পারছিলাম বর্ষাকালে এই জলধারা ফুলে উঠে কী অপরূপ রূপ ধারণ করে! সত্যি বলতে, মহারাষ্ট্রের পাহাড় বর্ষাকালেই বেশি রূপসী হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝেই প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য আমাদের থামতে বাধ্য করছিল। সরকারি নোটিশ বোর্ড বলছিল, আমরা ফোর্টের কাছাকাছি এসে গেছি। পাহাড়ি পথের অগুনতি বাঁক পেরিয়ে, স্ট্রবেরি বাগানের সুবাস নিতে নিতে পৌঁছে গেলাম ফোর্টে। এই পথে আছে এখানকার বিখ্যাত স্ট্রবেরি বাগান। পথের ওপরে শিবাজির নামাঙ্কিত মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের নির্মিত আধুনিক একটি বিশাল প্রবেশতোরণ। তোরণের উলটোদিকেই প্রশস্ত পার্কিং প্লেস। গাড়ি পার্কিং করে এসে বেশ কিছুটা সিঁড়ি উঠে কেল্লার প্রধান দরজা—এর বিশাল আকারের জন্য একে ‘মহা দরওয়াজা’ বলা হয়, যা সেগুন জাতীয় শক্ত কাঠ ও ধাতব পাতের সমন্বয়ে তৈরি। দরজার ওপরে খোদাই করা কাজ দেখা যায়। কেল্লায় দুটি প্রধান দ্বার আছে: কোঠি ও মোচি দ্বার। মারাঠা স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, এই প্রধান দরজাটি ফোর্টের দেওয়ালের গায়ে মিশে আছে এবং এর সামনে পরিকল্পিতভাবেই একটি দেওয়ালের অন্তরাল আছে, যাতে দূর থেকে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা সরাসরি এই দরজাটি দেখতে পেত না। দরজার পাশেই রাখা আছে একটি কামান; শিবাজি রাজের আমলে দুর্গের নিরাপত্তার দায়িত্বে এটি ছাদের প্রাকারে রাখা থাকত। বর্তমানে অবশ্য পুরোনো দরজাটি খারাপ হয়ে যাওয়ার জন্য খুলে রাখা হয়েছে এবং অনুরূপ আর-একটি অন্য দরজা লাগানো হয়েছে। কেল্লাটির স্থাপত্য একাধারে সামরিক ও আবাসিক ব্যবস্থার উপযোগী ছিল। তাছাড়াও কেল্লাটি উচ্চ এবং নিম্ন—দুটি অংশে বিভক্ত। নীচের অংশে সৈন্যছাউনি এবং প্রাঙ্গণে দেবী ভবানী মন্দিরে মায়ের অষ্টভুজা মূর্তি আছে। এর কাছাকাছি মারাঠা সৈন্যদের অস্ত্রের সম্ভারের প্রদর্শনী আছে। কেল্লার উঁচু অংশে মহাদেবের মন্দির আছে। ধাপে ধাপে প্রায় ৫০০টি পাথুরে সিঁড়ি পেরিয়ে কেল্লার ছাতে উঠতে হয়। পথে পড়ল দুর্গের রান্নাঘরে রাখা জাঁতা। দূর থেকেই দেখা যায় দুর্গের মাথায় আজও উড়ছে শিবাজি রাজের স্বরাজের ‘ভগবা’ নিশান। শিবাজি রাজের ১৭ ফিট উঁচু ব্রোঞ্জের সুগঠিত ও তেজোদীপ্ত অশ্বারোহী মূর্তিটি এক দক্ষিণী দেশীয় শাসকের সুগ্রন্থিত শাসনামলকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে উঠছিল রবীন্দ্রনাথের ‘শিবাজী উৎসব’। ছোটবেলা থেকেই মনের বড়ো কাছের মানুষ এই মারাঠা বীর। হয়তো নারীর সম্মান রক্ষা, মাওয়ালি ছেলেদের নিয়ে গঠিত সীমিত সামরিক ক্ষমতাসম্পন্ন সৈন্যদল আর অসীম সাহস ও চাতুর্য নিয়ে দিল্লির মুঘল বাদশাহকে টক্কর দেওয়ার বর্ণময় কাহিনিগুলোর ভূমিকা আছে এর পেছনে। ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে শিবাজি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ৩৫৪৩ ফিট উচ্চতায় কেল্লাটি তৈরি করান। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এই দুর্গের নীচের প্রান্তরেই বিজাপুরের আদিলশাহি সালতানাতের সেনাপতি আফজল খাঁয়ের সঙ্গে শিবাজির সেই বিখ্যাত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আফজল খাঁ ও শিবাজির মধ্যে সন্ধি আলোচনা হওয়ার কথা স্থির ছিল। দুজনেরই নিরস্ত্র অবস্থায় মুখোমুখি হওয়ার কথা, কিন্তু আফজল খাঁ সেই শর্ত মানেননি। আদিল শাহের সেনাপতি আফজল খাঁয়ের মতলব ছিল নিরস্ত্র শিবাজিকে হত্যা করা। আফজল খাঁয়ের প্রতি সন্দেহবশত শিবাজি নিজের কাছে বাঘনখ লুকিয়ে রেখেছিলেন। আফজল খাঁ অকস্মাৎ শিবাজিকে আক্রমণ করলে শিবাজি নিজের জামার আস্তিনে লুকিয়ে রাখা বাঘনখ দিয়ে আফজল খাঁকে হত্যা করেন এবং মারাঠা সৈন্যদের অকস্মাৎ আক্রমণে বিজাপুরী সৈন্যরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। কেল্লার নীচের অংশে আফজল খাঁর কবর শিবাজির এই দুঃসাহসিক জয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। কেল্লার শাসকীয় অংশের অবস্থা ভাঙাচোরা হলেও, কেল্লার যেদিকে মানুষের বসতি ছিল, সেদিকটা এখনও মোটামুটি ঠিক আছে; আছে মানুষের বসতিও, সময়ের দাবি মেনে কিছুটা আধুনিকীকরণও হয়েছে। আছে ভবানী দেবীর মন্দির; বলা হয়, এখানেই মা ভবানী আবির্ভূত হয়ে শিবাজি রাজের হাতে তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট তলোয়ার তুলে দিয়েছিলেন। শিবাজির আরাধ্য মহাদেবের মন্দিরও আছে এখানে। বর্তমানে অবশ্য কেল্লাটি সংরক্ষণের জন্য মেরামতির কাজ চলছে দেখে এসেছি।
প্রতাপগড় ফোর্ট থেকে ফেরার পথে মহাবালেশ্বরের আরও কয়েকটি ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ানো হল। আর্থার সিট, উইলসন পয়েন্ট, কেটস পয়েন্ট এবং এলিফ্যান্ট হেড পয়েন্ট থেকে উপভোগ্য মনোরম দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু স্পটগুলোতে পৌঁছাতে এত সিঁড়ি ভাঙতে হত যে, আমরা দুই বয়স্ক মানুষ গাড়িতে বসে থাকারই সিদ্ধান্ত নিলাম। বিকেল প্রায় শেষ হওয়ার মুখে এসে পৌঁছালাম ভেন্না লেকে।
৪ কিমি লম্বা ও ১.৫ কিমি চওড়া এই লেকটি ১৮৪২ সালে সাতারার রাজা শাহজি তৈরি করান। লেকটির গড় গভীরতা ৮০ ফিট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১২০ ফিট। যত দূর চোখ যায় কূল দেখতে পাওয়া যায় না। নীল জলের বিস্তৃতি চোখ আর মনকে আরাম দেয়। পার দেখতে না পাওয়া জলরাশি যেন হাতছানি দেয় ট্যুরিস্টদের। ট্যুরিস্টদের লেকে বোটিং করার জন্য মোটর বোট ও প্যাডেল বোটের ব্যবস্থা আছে। আমরাও নিয়মমাফিক সেফটি জ্যাকেট পরে ওই বিস্তৃত জলরাশিতে প্যাডল বোটিং-এর আনন্দ নিলাম। লেকে ভাসতে ভাসতে দেখলাম, আকাশে রামধনু রঙ ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য গেলেন পাটে। সন্ধ্যার পরে বোটিং বন্ধ থাকে। নিয়ম মেনে একে একে সব বোট ফিরে এল লেকের পাড়ে।
এখান থেকে ফিরব হোটেলে, কিন্তু তার আগে ‘ম্যাপ্রো’-র কেক আর আইসক্রিমের স্বাদ নেব না, তাও কখনও হয়! তাই সোজা ‘ম্যাপ্রো গার্ডেন’ (Mapro Garden)। এখানে বাচ্চাদের রাখার জন্য ক্রেশ, নার্সারি, ছোটদের খেলার সরঞ্জাম রাখা রয়েছে। সবার ওপরে ম্যাপ্রো ভ্যারাইটি অফ কেকস আর আইসক্রিম। ছোটদের জন্য আছে ওখানকার কর্মীদের দেখভালের অধীনে ‘নিজের কেক নিজে বানাও’ প্রজেক্ট। অন্য অনেক বাচ্চার মতোই সেখানে আমার নাতনি নিজেও আনন্দ নিল কেক-শেফ হওয়ার। সারাদিনের পরিশ্রমের পর তখন বিছানা ডাকছে আমাদের। সুতরাং ওখানেই ডিনার সেরে আমরা ফিরলাম সোজা হোটেলে।
আগামীকালের প্রোগ্রাম ঠিক করাই আছে। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়ব বাড়ির উদ্দেশে।
———-
ছবিঃ লেখক
