ব তে বৈশাখ, জ তে জষ্ঠী, জ তে জামাই, জ তে জামাই- ষষ্ঠী

ব তে বৈশাখ, জ তে জষ্ঠী, জ তে জামাই, জ তে জামাই- ষষ্ঠী

জ-তে জামাইষষ্ঠী

কথায় কথায় বাঙালি বলে,’ যম- জামাই- ভাগনা, কেউ নয় আপনা’, কিংবা ‘কষ্টের কামাই, নিয়ে যাবে জামাই’। যম আর ভাগনার ব্যাপারটা তাও মাথায় ঢোকে কিন্তু বেচারা বাঙালি জামাই বাবাজীবন কী দোষ করে এহেন অপবাদের শরিক হলেন জানা নেই। সংস্কৃতে জামাই খেদানো নিয়ে একটা শ্লোক আছে জানি। এক ব্যক্তির জামাইরা বেশ গেঁড়ে বসে জামাই আদর খাচ্ছিল। ছয় মাস পর আর সহ্য করতে না পেরে সেই ব্যক্তি জামাইদের আদরের মাত্রা একটু একটু করে কমাতে কমাতে তিনটিকে বিদায় করলেও শেষের জন ছিল এঁটুলি জাতীয় প্রাণী। হেমলকের মত বিষাক্ত শ্যামলক নামের জামাইটিকে অবশেষে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদায় করা হল।

গর্গো হি পাদশৌচাল্লঘ্বাসনদানতো গতঃ সোমঃ ।
দত্তঃ কদশনভোজ্যাচ্ শ্যামলকশ্চার্ধচন্দ্রেণ৷৷    (পঞ্চতন্ত্র: লব্ধপ্রণাশ, ৪৭)

এইরূপ নির্মমতা বং-শাস্ত্রে নেই। তবে বাংলার বুকে ঘর জামাইরা খানিক নিন্দনীয় তো বটেই। ঘর-জামাই পোড়ার মুখ, মরা-বাঁচা সমান সুখ। মোদ্দা কথা,খালি চোখে যা দেখি বা দেখছি, বাংলায় জামাই মাত্রই একটি সমাদৃত প্রাণী। তার ওপর গোটা ভারত জুড়ে বাঙালি জামাইদের সবিশেষ কদর আছে। পুরনো পাড়ার মেহেরোত্রাজী সমগোত্রীয়দের বলতেন, “ওয়ে বংগালি জমাই লা। খুব সেবা করেগা তেরে নাল। গেস সিলিন্ডার তাক টাইমপে ঘর লা দেগা। “এই যে বাঙালি মায়েরা এত কষ্ট করেন ছেলেপুলে মানুষ করতে সে কি আর ফেলে দেবার মত কথা! তারপর আবার বয়সকালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেও বলেন, “ওই পরের জামাই মানুষ করলুম আর কি! “তবে আমার মনে হয় প্রবাদ যাই হোক না কেন উৎকর্ষ বিচারে বাঙালি জামাই হল এক নম্বর। তাই তার এত সমাদর ।

লোকাচার ও গ্লোবাল জামাই

সারা পৃথিবীর লোকাচারের দিকে যদি লক্ষ করেন তবে বাঙালিদের মত জামাই আপ্যায়ন কিন্তু খুবই বিরল। আহা! মানছি পৃথিবীতে জামাই নামক প্রাণীটির খুব একটা অনাদর নেই। অন্ধ্রপ্রদেশ আর তেলেঙ্গানা মানে ওই বিশেষ করে সেখানকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে আল্লাডু সংক্রান্তির দিনে নাকি জামাইয়ের প্রথম শ্বশুরবাড়ি আগমন তিথিকে স্মরণীয় করে রাখা হয়। জামাইয়ের খ্যাটনের জন্য প্রায় তিনশর উপর পদ তৈরি করা হয়। গোয়াতে “সাউ জুয়াও” উৎসবে নবদম্পতিকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তার সাথে জামাইকেও আদর করা হয় রীতিমতো। চিনে মায়েদের সাথে বাঙালি মায়েদের আমি খুব মিল পাই। চিনে মায়েরাও বাঙালি মায়েদের মতো ছেলেপুলেদের পেছনে বিস্তর খাটা-খাটুনি করে থাকেন। যখন পড়লাম যে চান্দ্র নববর্ষে চীনের “ডং” আর “মিয়াও” কমিউনিটির বাপ-মায়েরা জামাইকে পেট পুরে খাওয়ানোর সাথে সাথে বেশ গাবদা গোছের কিছু উপহারও দিয়ে থাকেন, তখন আমি একটুও অবাক হইনি। বেবাক পৃথিবীর লোকাচারে জামাই-আদর বিষয়টা নিয়ে  আরও একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যাবে কোরিয়াতে “চৌসিয়ক’ এবং “সিওলাল” নামের দুইটি উৎসবে জামাইকে বেশ আপ্যায়ন করে টরে খাওয়ানো হয়। সবার আগে জামাইকে  বসিয়ে খাওয়ানো হয়। মানে সেদিন জামাই মানে ফার্স্ট, তাঁকে সার্ভও করা হবে ফার্স্ট । ইস্টার্ন ইউরোপ আর বলকানের গ্রাম্য অঞ্চলে নতুন জামাইয়ের পদার্পণকে স্মরণীয় করে রাখা হয় গীত-বাদ্য আর পেটপুজোর যুগলবন্দীতে।

ভারতবর্ষ ও জামাই সংস্কৃতি

ভারতবর্ষে জামাই আপ্যায়নের ইতিহাস কিন্তু অতি প্রাচীন। কেউ কেউ তো আবার হাজার হাজার বছর পিছিয়ে গিয়ে হরপ্পা সভ্যতার আমলেও ষষ্ঠী পূজার চল দেখতে পেয়েছেন। ষষ্ঠী পূজার ব্যাপারে পরে আসছি। তবে ষষ্ঠী পুজো ছিল যখন, হরপ্পা সভ্যতায় জামাইষষ্ঠীও নিশ্চয়ই ছিল হবে। পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মহেঞ্জদারোর স্নানাগার থেকে জামাইরা বেরোলেন পোস্কের হয়ে, যাচ্ছেন হরপ্পার শস্যাগারের পানে। সেখান থেকে মিলেটের বস্তা তুলে শাশুড়িকে গিফট করবেন। নাকি লোথাল বন্দর থেকে কিছু আদিম ফ্যাশনের গয়না কিনবেন! সে যা হোক ,আদরের জামাইদের বরণ করে  ঘরে তুলবেন হরপ্পার সিন্ধুসভ্য শাশুড়ির দল। উলুধ্বনি হবে মুহুর্মুহু। যাক গে বাবা! এত পিছিয়ে কাজ নেই। তার চেয়ে বরং মহাকাব্যের কালে আসা যাক। মহাকাব্যিগুলিতে জামাই আদর যে বেশুমার ছিল তার ভরপুর উদাহরণ দিতে পারি। মিথিলার রাজা জনক আহ্লাদে গলে গিয়ে তার মহাপরাক্রমশালী জামাইয়ের পা পর্যন্ত ধুইয়ে দিয়েছিলেন কিনা জানা নেই তবে পাদ্য, অর্ঘ্য, ইত্যাদি দিয়ে বেশ ভাল সার্ভিস দিয়েছিলেন।

“पाद्यं अर्घ्यं तथा आचम्यं दत्त्वा विधिवत् ततः।
प्रतिगृह्य तु काकुत्स्थः सीतां ददौ जनकः॥”

রামের অপোনেন্ট রাবণেরও কিন্তু কপাল মন্দ ছিল না এ বিষয়ে। অমন লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ জামাইকে পেয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে মন্দোদরীর বাবা ময়দানবও নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জামাই বরণ করেছিলেন। পছন্দের জামাইকে তপস্যাবলে অর্জিত শক্তিশেল গিফট করেছিলেন খুশি হয়ে। অমন যে রোগা প্যাটকা পান্ডু, মানে আমাদের ওই মহাভারতের ফ্যাকাশে পান্ডুর কথা বলছি, তিনিও নাকি শ্বশুরবাড়িতে হেবি জনপ্রিয় ছিলেন। “মন্দ নয় সে পাত্র ভালো” থিওরিতে আকৃষ্ট হয়ে নাকি “উচ্চ বংশ উচ্চ ঘর দেখে” ঠিক জানিনা, অতি গদগদ হয়ে হরেকরকম খাদ্য সাজিয়ে পাত পেড়ে জামাই ভোজের আয়োজন করেছিলেন কুন্তীর পিতা কুন্তিভোজ। এদিকে প্রবল টমবয়িশ মেয়ে চিত্রাঙ্গদা যে হুট করে মেঘ না চাইতে জলের মতো অমন বীর ও রোমান্টিক জামাই খুঁজে আনবেন সেটা হয়ত স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি মণিপুর রাজ। তাই আপ্লুত হয়ে কুরু  বংশের জমকালো ছেলেকে পুজো করেছেন (पूजयामास) নানা বিধিবদ্ধ উপাচারে (विधिदृष्टेन कर्मणा)।

বাঙালির ষষ্ঠীপুজো ও জামাই আপ্যায়ন

বাঙালির ইতিহাস তো তেমন বেশি দিনের নয়। কবে থেকে বাংলায় এমন জামাই আবাহন ও আপ্যায়ন শুরু হল তা নিয়ে গবেষকরা কেউই বিশেষ সদুত্তর দিতে পারেননি। অনেকেই কৌলীন্য প্রথা এবং বহুবিবাহকেই জামাইষষ্ঠী উদ্ভাবনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেকালে মেয়েগুলোর বিয়ে দেওয়া হত পুতুল খেলার বয়সে। আধদামড়া আকামের ঢেঁকি বরগুলো গুচ্ছের বিয়ে করে বউয়ের লিস্ট বাড়িয়েই চলত। অতগুলো বৌ পালন করবে কী উপায়ে! অতএব বিবাহিত মেয়েগুলি পড়ে থাকত বাপের বাড়িতে। অনেকে বলেন যে বাপের বাড়িতে আজীবন থাকা সেসব মেয়েগুলোকে স্বামী সংসর্গের সুযোগ করে দিতে পিতামাতা জামাইকে মাঝে মাঝে বাড়িতে আমন্ত্রণ করতেন। কেউ কেউ মনে করেন, সেই নিমন্ত্রণের মধ্যেই হয়ত জামাইষষ্ঠীর আবির্ভাবের বীজ প্রোথিত আছে। কোন কোন সমাজতাত্ত্বিক আবার বলেন, বিয়ে দেওয়ার পর মেয়ে চলে যেত দূর দেশে। বাপের বাড়ি আসাও ছিল সেকালে বড় সমস্যা। এদিকে পুত্রবতী না হলে মেয়ের বাড়িতে যেতে পারেন না তার পিতা- মাতা। অতএব দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য, ননীর পুত্তলি মেয়েটিকে একবার চোখে দেখার জন্য জামাইকে আদর -আপ্যায়ন না করলে চলে! মেয়েকে নিজের কাছে এনে একটি দিন রাখবার উদ্দেশ্যে সম্মাননীয় জামাই বাবাজীবন ও তাঁর পদার্পণকে খানিক স্পেশালাইজ বা বিশেষায়িত করার নামই কি তবে “জামাই ষষ্ঠী”!

তবে জামাই আপ্যায়নের সাথে আমাদের ঘরের ষষ্ঠী ঠাকুরানী কেমন করে জুড়ে গেলেন সে বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়না। কেউ কেউ আবছা আবছা যুক্তি দিয়েছেন। বলা হয় বায়ুপুরাণে যে উনপঞ্চাশ দেবীর উল্লেখ আছে তার মধ্যে অন্যতম হলেন মা ষষ্ঠী। একাধিক নামের অধিকারিণী তিনি। কেউ তাঁকে বলেন কৌমারি,কেউ বলেন বালি আবার কেউ বলেন স্কন্দজায়া। তিনি কিন্তু মোটেই ন্যাকাবোকা আর জলঘটের মতো দেবী নন, রীতিমতো যুদ্ধ-পারদর্শী এক দেবী। দেবসেনাপতি কার্ত্তিকেয় তাঁর স্বামী। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে তিনি রীতিমতো ভয়াল, ভয়ংকর! বলা হয় তিনি জাতহারিনী, যিনি মাতৃগর্ভ থেকে ভ্রূণ অপহরণ করেন, সন্তান জন্মের ছয় দিনের মধ্যে তাকে ভক্ষণ করেন। এই জন্য শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ষষ্ঠ দিনে তাকে পুজো করা হয়।

কিন্তু বাঙালির চির পরিচিত যষ্ঠীমাতা হলেন উর্বরতার প্রতীক, বালক মাত্রেরই রক্ষাকারী। তিনি মার্জার বাহনা। মার্জার তার বাহন হিসেবে একেবারে সঠিক চয়েস ছিল কারণ বেড়াল হল উর্বরতার পরম পরাকাষ্ঠা। বছর বছর উর্বরতা বিষয়ক ওই কর্মে তাদের জুড়ি মেলা ভার। ষষ্ঠীমাতার মূর্তি হল দ্বিভুজা। তিনি  একাধিক সন্তান নিয়ে বসে আছেন একটি বটবৃক্ষের নিচে। বৃক্ষটির পেছনে  একটি দুধ-পুকুর। এই দুধ-পুকুর হয়ত বাঙালী মায়ের সেই চিরন্তন কামনার প্রতীক,”আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”

কিন্তু কথা হচ্ছে যে বাঙালির জীবনে ফেমাস ষষ্ঠী বলতে আছে সাকুল্যে তিনটি। একটি দুর্গাষষ্ঠী, অপরটি নীলষষ্ঠী আর অন্যটি অরণ্যষষ্ঠী। এই অরণ্যষষ্ঠীর দিনটিতে জামাই বাবাজীবন ফাঁকতালে হঠাৎ কী করে ঢুকে গেলেন কে জানে? কীভাবেই বা সাবেক অরণ্যষষ্ঠী পরিণত হল জামাইষষ্ঠীতে? জহর সরকারের মতে, “জৈষ্ঠ্য মাসের কৃষ্ণপক্ষে সাবিত্রী চতুর্দশীতে স্ত্রীরা, স্বামীর দীর্ঘজীবন কামনা করে যমের আরাধনা করতেন। মনে হয় এই লোকাচারটির সূত্র ধরেই কলকাতার বাবু সংস্কৃতি এই ষষ্ঠীটি জামাই কে নিবেদন করেছিলেন।” তার মতে ,আঠারো শতকের অগণিত বালবিধবার যন্ত্রণাময় জীবন প্রত্যক্ষ করে জামাইয়ের দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা মায়েদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মায়ের কাছে মেয়ে বড়ই আদরের। তার মঙ্গলকামনায় মা ছাড়া কে ই বা আর কৃচ্ছাচার করবে! আর সেকালের মেয়েদের সুখ আর শখ দুটোই আবর্তিত হত তার স্বামীকে ঘিরে। জামাইয়ের মঙ্গলকামনা করে মেয়েটিকে সারাজীবনের জন্য সুখী রাখতে চাইতেন মেয়ের মা-বাবা।

খ্যাটন পর্ব

ধীরে ধীরে এই জামাইষষ্ঠী বা বাঙালির ফি বছরের জামাই আপ্যায়ন এভাবেই পুরো লিজেন্ডে পরিণত হয়। পূর্ববঙ্গের শাশুড়ির এই বিশেষ মঙ্গলাচার কীভাবে যেন গোটা বাঙালি সমাজের অন্দরে কন্দরে প্রবেশ করে! নিরামিষ অরণ্যষষ্ঠী নিয়ে ব্যস্ত পশ্চিমবঙ্গীয় শাশুড়ি মাও কীভাবে যেন এই আদর-রীতির পাকচক্রে ঢুকে পড়েন! আপামর বাঙালি শাশুড়ি তাই এই বিশেষ দিনটিতে জামাইকে সাদরে বরণ করে নেন, তাঁর হাতে মাঙ্গলিক সুতো বেঁধে দেন, দুব্বার গুচ্ছ দিয়ে মাথায় জলের আশীর্বাদ ছিটিয়ে দেন, তাঁকে পাখার বাতাস করতে করতে বলে ওঠেন, “ষাট! ষাট!” তারপর শুরু হয় নানাবিধ খ্যাটনের পালা। সাধারণ মানুষ তো বটেই, দেবাদিদেব শিবের কথা ভাবুন দেখি। বাঙালির জামাই বলে কতা! তার পাতেও আমিষের রবরবা। আহা! তার পাতে অমৃতসম বাঙালি আমিষ রান্না পড়ল তো তারই অর্ধাঙ্গিনীর সৌজন্যে। দেবী অন্নপূর্ণা শিব ঠাকুরকে দেখাতে চেয়েছিলেন অন্ন চিন্তা চমৎকারা। তাই কাশীতে হল মহাভোজের আয়োজন। দেবীর পুজোতে এক সে বড়কর এক আমিষ পদ। রামা নামের রাঁধুনি একাগ্রচিত্তে  তৈরী করেছিলেন মায়ের সেই প্রসাদ।

কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝাল ঝোল রসা।
কালিয়া দোলমা বাগা সেকচী সমসা।।
অন্ন মাংস সীকভাজা কাবাব করিয়া।
রান্ধিলেন রামা আগে মসলা পুরিয়া।।

নানা বিধ ব্যঞ্জন আর অন্নের প্রকার।
সুগন্ধে ভরিল ঘর দেবী অন্নাধার।।

ঘৃত দধি দুধে পূর্ণ ভাণ্ডার যত।
মিষ্টান্নে সাজিল থালা অপার রত্নত।

এইবার দেখা গেল ভিখারী জামাই শিব বাবাজি তাঁর সাধের বৈরাগ্য ছেড়ে বউয়ের দাওয়াতে পাত পেড়ে বসে গেলেন। তারপর কব্জি ডুবিয়ে তিনি কি খেলেন ওই অমৃতসম আমিষ? তারপর এত হাই কার্ব ও প্রোটিন ইনটেক করে কি দিবানিদ্রায়ও গেলেন! জানতে মুনচায়।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে নাকি আবার এলাহী ব্যবস্থা ছিল। জামাইষষ্ঠীর দিন ব্রেকফাস্ট হিসেবে থাকত বাড়িতে তৈরি শিঙাড়া, কুচো নিমকি, রসবড়া, মালপোয়া। তার পর দুপুরের মেনুতে সাদাভাত, শুক্তো, সাত রকম ভাজা, লাউশাকের তরকারি, মুগের ডাল, সরষে-পাবদা, পোলাও, কচি পাঁঠার ঝোল, কই মাছের হর-গৌরী। সেইসব চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খ্যাটনের শেষে সাবেক রীতি বজায় রেখে জামাইদের হাতে পান গুঁজে দেওয়া হত। সেই মশলাদার পান আবার আটকে দেওয়া হত সোনার লবঙ্গ দিয়ে। জামাইরা পান খেয়ে হেলা ভরে সেই সোনার লবঙ্গ ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।

জামাই ঠকানো

সেকালে মানুষের জীবনে বিনোদন বড়ই কম ছিল। তাই বোধহয় নানা লোকাচারের মধ্যে জুড়ে দেওয়া হত কিছু না কিছু বিনোদনের উপকরণ। জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়িতে আদর খেতে আসা জামাইকেও দিতে হত নানারকম পরীক্ষা। বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ পীঠস্থান বটতলার এক জনপ্রিয় প্রবাদ ছিল, “অবাক কলি বোঝা ভার, শালীর লীলা চমৎকার!” আর জামাই ঠকানোর পুরোভাগে ছিলেন এইসব ফাজিল শালীর দল। স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত এবং অমৃতলাল বসুর কিছু স্মৃতিকথায় এইসব চতুর চূড়ামণি শালীদের কান্ডকারখানা ছবির মত বর্ণিত হয়েছে। রসরাজ অমৃতলাল বসু বলেছেন, সেকালে নাকি পিঁড়ির তলায় চারখানা সুপুরী রেখে পিঁড়িটি আসন দিয়ে ঢেকে জামাইকে বসতে দেওয়া হত। জামাই বাবাজি ওই পিঁড়িতে বসতে গেলেই অবধারিতভাবে পা হড়কে চিৎপাত হয়ে পড়ে যেতেন। আবার মাটির মিষ্টি তৈরী করে সেটি জামাইকে দেওয়া হত, কখনও বা চালবাটা দিয়ে তৈরি করা হত সন্দেশ, শোলাকে সরু করে কেটে বানানো হত মিছে অন্ন। মাটির চাকা বেসনে ডুবিয়ে ফুলুরি বানিয়ে দেওয়া হত সন্ধ্যার জলখাবারে। মহেন্দ্রনাথের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘পাতলা মলমলের চাদর ছিঁড়িয়া তাহাতে ময়দা লাগাইয়া তাহাতে লুচি করিয়া দিত …বোকা নূতন জামাই লুচি ছিঁড়িতে পারিত না, আর সকলে হাসিত।’ আবার, ‘ডিবের ভিতর আরশুলা পুরিয়া পান খাইতে দিত, জামাই যেমন ডিবে খুলিত আর চারদিকে আরশুলা ছড়াইয়া পড়িত। সেটা বড় বদ তামাসা ছিল।’

কথিত আছে যে এই জামাই ঠকাতে গিয়েই নাকি আবিষ্কৃত হয়েছিল তালশাঁসের মত শাঁসালো মিষ্টি। চন্দননগরের তেলেনি পাড়ার জমিদার গিন্নির একবার সাধ হল জামাই ঠকানোর। এমন একটি মিষ্টির আবদার তিনি করেছিলেন যাতে তার জামাইকে বেশ করে ঠকানো যায়। যেই কথা সেই কাজ। ডেকে পাঠানো হল ময়রা সূর্য মোদককে। তারই বুদ্ধিতে তৈরী হল একটি কড়াপাকের সন্দেশ যার ভেতরের অলিন্দে টইটম্বুর গোলাপ জল । এইবার জামাই খেতে গিয়ে যেইনা তাতে কামড় বসিয়েছেন ,ভেতরের গোলাপজল বেরিয়ে এসে দিল তার মলমলের পাঞ্জাবি ভিজিয়ে। বহুদিন পর্যন্ত এই সন্দেশটি জামাই ঠকানো সন্দেশ নামেই পরিচিত ছিল। পরে তালশাঁস নাম ধারণ করে।

অবশেষে…

আজকাল আর জামাইদের সেইরকম খাওন দাওনের দম নেই। শাশুড়িদেরও হাতে সময় কম, অনেকের গতরও মরচে ধরে নড়বড়ে। অনেক সময় বাঙ্গালী রেস্তোরাঁতেই নমো নমো করে নিয়মরক্ষা করে দেওয়া হয়। তবু ষষ্ঠী এলেই রাস্তায় রাস্তায় সুসজ্জিত জামাইদের ভিড় কিন্তু এখনও বেশ চোখে পড়ে। এখনও সলজ্জ হাসির রেশ ঠোঁটের কোণায় রেখে নতুন শ্বশুরবাড়ির পানে রওনা হয় নতুন জামাই, হাতে তার মিষ্টির বাক্স, শাশুড়ির জন্য নতুন শাড়ি। পাশে তার নতুন বৌ সতেজ বেতসলতার মত লেপটে আছে গায়ে। পুরনো ধেড়ে জামাইও বা বাদ যান কি! কাজকম্ম আগেভাগে গুটিয়ে নিয়ে সেই দিনটা ছুটির মেজাজে থাকেন পোড় খাওয়া প্রাচীন জামাই। এই একটা দিন তিনি রাজার মত। সম্বৎসরের মুখ নাড়ানি ভুলে তার সুপ্রাচীন গিন্নীটিও খানিক মোলায়েম হয়ে থাকেন এই দিনটিতে, মনের ভেতরকার পলি পড়া আদ্যিকালের নদীটি গতিপথ পাল্টে নব জলধারা নিয়ে সহসা ছলাৎছল শব্দে বেজে ওঠে, বয়ে যায় আনমনে। এই একটি দিন বই তো নয়! এখন আবার কোথাও কোথাও বৌমা ষষ্ঠীর চল হয়েছে। তা সে আর মন্দ কি! এখন ছেলে বলো আর মেয়ে ,কেউই তো বাপ-মায়ের কাছে পড়ে থাকেনা, সকলেরই কাজের জায়গা ভিন্ন হয়। সন্তানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত মায়ের জীবনে গেড়ে বসে এক খালিপন, এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা। এখনকার আধুনিক মায়েরা অবশ্য সেটা কাটিয়ে উঠছেন আস্তে আস্তে। নিজের জগৎ তৈরী করছেন। একালের শাশুড়িরা বেজায় ভাল, যা দেখি। তেমনই চালাক চতুর। বৌমাটিকে আদর- আপ্যায়ন করলে ছেলেটিও যে মুঠোয় থাকবে তা তারা বিলক্ষণ জানেন। সেই জন্যই বোধহয় বৌমাষষ্ঠীর প্রচলন হচ্ছে ধীরে ধীরে।

দূরের জামাইষষ্ঠী

আমার বাপের বাড়ি দূরে। যাওয়া হয়না। তাই বছরকার ওই দিনটাও মনে থাকেনা। দিনটা বুঝি রাস্তাঘাটে সুসজ্জিত জামাইদের দেখে নয়ত ফেসবুক দেখে। মেসেঞ্জারে শুভেচ্ছা আসে, “হ্যাপি জামাইষষ্ঠী,” কিংবা “জামাইষষ্ঠীর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।” আমার মেয়ে ছোট। জামাই আসতে এখনও ঢের দেরি। তাই এসবে মোটে গুরুত্ব দিই না। তো গত জামাই ষষ্ঠীতে হঠাৎ খুড়তুতো দিদির ফোন এল, “বনু চলে আয়, খুব দরকার।” আমি তড়িঘড়ি ছুটে গেছি কারণ দিদি একাই থাকেন বাড়িতে। ছেলে থাকে পুনেতে। ওমা! গিয়ে দেখি এলাহী বন্দোবস্ত চলছে তার বাড়িতে। রান্নাঘরের পানে ভাল করে ঠাহর করে দেখি প্রচুর রান্না বান্না চলছে। দিদি ব্যাজার মুখে বলল, “ওই ষষ্ঠীর রান্না করছি আর কি।” আমি তখন পুরো তোতলা বনে গেছি। তুতলে তুতলে কেবল বলতে পেরেছি, “তোর ছেলে বিয়ে করে নিল? বৌমা চলে এল! তুই জানালিও না! আবার জাঁক করে বৌমা-ষষ্ঠী করছিস! আমি চলে যাচ্ছি ভাই। তুই এত ইয়ে!” দিদি আমার হাত ধরে করুণ স্বরে বলল, “এসে যখন পড়েছিস, যাসনা ভাই। আমি খুব টেনশনে আছি। তুই থাকলে একটু জোর পাই। তুই তো আবার খুব উদারমনা! বুঝবি। বৌমা আসার কথাই তো ছিল রে, কিন্তু ছেলে নিয়ে এল মুষকো ধেড়ে এক জামাই। কী করি বল! তলে তলে এইসব চলেছে। কালই পুনে থেকে ওরা এসেছে। ওই ঘরে আছে দু’জনা। যা গিয়ে দেখ। আমি সব মেনে নিয়ে জামাইষষ্ঠী করছি। ওরা ভাল থাকলেই আমি খুশি।” সে তো দিদি খুশি, বা বাধ্য হয়ে খুশি হয়েছে! এদিকে আমি অতি লিব্যারাল তো আবার এক কাঠি সরেস। মনে মনে ভাবছি, ‘নতুন জামাইয়ের মুখ দেখব খালি হাতে! তাও আবার জামাই ষষ্ঠীর দিন! কি অসৈরণ!’

———-

ঋণ স্বীকার…

  • অন্তর্জাল
  • আনন্দবাজার পত্রিকা
  • অধ্যাপক সুকুমার সেন
  • রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
  • জহর সরকার
  • এই সময়
  • জাগো বাংলা
  • রায়গুনাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

উত্তরবঙ্গে জন্ম কিন্তু বিবাহসূত্রে দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দা। থাকেন কলকাতায়। প্রবন্ধ থেকে শুরু করে ছোটগল্প, উপন্যাস  কিংবা অনুবাদ, সাহিত্যের সব ধারায় কাজ করবার চেষ্টা করেন। নামি ও অনামি বহু পত্রিকায় লিখেছেন। প্রকাশিত বই রা প্রকাশন থেকে 'পটারাম ও অন্যান্য,' পালক প্রকাশন থেকে, 'রঙ্গ দেখে অঙ্গ জ্বলে?'

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *