নানা পাটেকর ও আমার আশির দশকের ব্যাঙ্গালোর

নানা পাটেকর ও আমার আশির দশকের ব্যাঙ্গালোর

সদ্যই পঁচাত্তর বছরে প্রয়াত হলেন হিন্দি ও মারাঠি জগতের চলচ্চিত্র প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকর। তিনি কেমন অভিনেতা ছিলেন তা নিয়ে আমার বিশেষ কিছু লেখার নেই, সে কথা লেখার জন্য অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন। আমি বরং একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করি।

১৯৮৩ সালে আমি যখন ব্যাঙ্গালোরে আসি, তখনো অবধি আমার দেখা হিন্দি ছবির সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। আমাদের বাড়িতে হিন্দি ছবি দেখার বিশেষ চল ছিল না। যাদবপুরে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ছবি দেখা হত। অনেকে শুনলে আশ্চর্য হবেন যে ব্যাঙ্গালোরে আসার আগে অবধি আমি অমিতাভ বচ্চনেরও মাত্র খান দুই তিন ছবিই দেখেছিলাম।
ব্যাঙ্গালোরে এসে একেবারে স্বাধীন জীবন। তা ছাড়া হাতে টাকা পয়সাও কিছু আসতে শুরু করেছে। এছাড়া ব্যাঙ্গালোর প্রায় সিনেমার শহর। সেইসময় বিনোদন বলতে সিনেমা দেখাই একমাত্র ছিল। তাই বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলে বেশ সিনেমা দেখা শুরু হয়ে গেল।
ব্যাঙ্গালোরে আমাদের সিনেমা দেখার মূল কেন্দ্র ছিল ম্যাজেস্টিক জায়গাটা। সেখানে বেশ সিনেমা হলের কেন্দ্র ছিল বললে অত্যুক্তি করা হবে না। আমাদের ওখানকার তুলনাতে এখানকার হলগুলিও বেশ আরামদায়ক ছিল।
সেইসময় ঘুরতে ঘুরতে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দেখে ফেললাম একটি ছবি, ‘আজ কী আওয়াজ’। সিনেমার মূল আকর্ষণ ছিল অবশ্য প্রযোজকের নাম – বি আর চোপরা। ছবির পরিচালক তাঁর পুত্র – রবি চোপরা। মূল চরিত্রে ছিলেন রাজ বব্বর আর স্মিতা পাতিল।
সুদর্শন তরুণ রাজ বব্বর তখন ‘নিকাহ’ ছবির দৌলতে বেশ জনপ্রিয়। আর স্মিতা যদিও আর্ট ফিল্মের নায়িকা হিসেবে বেশি প্রখ্যাত, তিনি কমার্শিয়াল ছবিতেও বেশ অভিনয় করছেন। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে শক্তি আর নমকহালাল নামে দুটি ছবি করে বেশ আমার বন্ধুদের অর্থাৎ যারা নিয়মিত সিনেমা দেখত আর ঘোষিত অমিতাভ ফ্যান, তাঁদের মন জয় করেছেন। সেটাই ছিল মূল আকর্ষণ।

‘আজ কী আওয়াজ’ ছবিতেই প্রথম তাঁর দেখা পাই

এও শোনা গিয়েছিল ছবিটি কোন বিদেশি ছবির আদলে তৈরি। এখন আমরা অবশ্য সবাই জানি সেই ছবিটি হল চার্লস ব্রনসন অভিনীত ‘ডেথ উইশ’। সব মিলিয়ে ছবিটি আকর্ষণীয় হবে এটা ধরে নিয়েই যাওয়া হয়েছিল।
বেশ স্মার্ট ছবি। তবে সেই ছবিতে নজর কেড়ে নিল একটি তরুণ অভিনেতা যে ভিলেনের ভূমিকাতে অভিনয় করেছিল। নামও জানতাম না কিন্তু তাঁর অভিনয়ের ধাঁচটি বেশ অন্যরকমের। সাধারণতঃ ভিলেন মানেই বেশ লাফালাফি মারামারি করবেন, চীৎকার করবেন, বকবেন, ধমকাবেন। এখানে একেবারেই চরিত্রটি অন্যরকম। খুব মৃদু গলাতে কথা বলা, শান্ত মুখে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করা, সঙ্গে ধীরস্থির গলাতে সুকঠিন নির্দেশ – ‘যো কুছ ভি করো, পকড়ে মত জানা। গলতি ম্যয় একহি বার মাফ কর শকতা হুঁ’।

মনে নেই তখনকার ছবির প্রচারে তাঁর নাম তেমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা, কিন্তু এখন যখন ইউটিউবে ছবির প্রচার দেখি, সেখানে নানা বিশালভাবে বিরাজমান।
এরপরে এল ‘অঙ্কুশ’। সেখানে অবশ্য নানা মূল ভূমিকাতে, সঙ্গে বিজ্ঞাপন জগতের একটি মেয়ে – নিশা সিং। এবার যখন ছবি দেখতে গিয়েছিলাম, মূল আকর্ষণ ছিলেন অবশ্যই নানা।
ছবিটি এবং নানার অভিনয় সত্যিই মনোমুগ্ধকর ছিল। কিছুটা যেন ঐ চারটি ছেলের মধ্যে ‘আপনজন’ বা ‘মেরে আপনে’র ছেলেগুলোর সঙ্গে মিল পেয়েছিলাম।
সময়টা আশির দশকের মধ্যভাগ। সত্তরের ‘রাগী যুবক’ অমিতাভ বচ্চন তখন কিছুটা স্তিমিত, তখন এই নতুন রাগী যুবকের আগমন বেশ মাতিয়ে দিয়েছিল আমাদের। আমাদের বয়স ও তখন ২৪-২৫, কাজেই ঐ যুবকদের হতাশা, রাগ বা সিস্টেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সঙ্গে নিজেদের চিন্তা ভাবনাকে মেলাতে অসুবিধে হয়নি। ছবিটির পরিচালক ছিলেন এন চন্দ্রা, সেটি ছিল তাঁর প্রথম পরিচালনা। তিনি ছিলেন গুলজারের সহকারি, কাজেই ঐ ‘মেরে আপনে’র সঙ্গে মিলটি নেহাৎ কাকতালীয় নয়।
এখানে নানার ভূমিকা ‘আজ কী আওয়াজ’ ছবির একেবারে বিপরীত মেরুর। সমালোচক হিসেবে অবশ্য মতামত দিতে সক্ষম হব না, কিন্তু নিশা সিং (ছবির নাম অনিতা) সমাজব্যবস্থার গাফিলতিতে আত্মহত্যা করার পর আইন হাতে নেওয়ার যে বেপরোয়া মনোভাব দেখানোর অভিনয় করেছিলেন, তা মনে রাখার মত। চার রাগী, হতাশ, যুবকের দলের তিনিই নেতা, তিনিই সবার মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মনোভাব জাগিয়ে দেন। এই ছবির পরই নানা পাটেকরের হিন্দি ছবিতে জায়গা পাকা হল।

অঙ্কুশ ছবিতে তিনি রাগী যুবক, হতাশ তরুণ সমাজের প্রতিনিধি
'সালাম বোম্বে' ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি

এরপরে তাঁর অভিনয়ের সুখ্যাতির জন্য একটি অন্যধরণের ছবিতেও তিনি ছবিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেলেন। ছবির নাম, ‘সালাম বোম্বে’ – পরিচালক মীরা নায়ার। এটি তাঁরও প্রথম ছবি। এখানে ‘বাবা’র চরিত্রটিও ছিল বেশ জটিল। অনিতা কানোয়ারের স্বামী এবং মঞ্জুর বাবা। বোম্বের অপরাধ জগতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। খুবই হাড়হিম করা অভিনয় করেছিলেন নানা, বিশেষ করে মেয়ের ওপর রাগ করে বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে। পরে শুনেছি ঐ দৃশ্যটি ছিল একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত, চিত্রনাট্যে সেটি ছিল না।

এইভাবেই ধীরে ধীরে নানা বলিউডে তাঁর জায়গা করে নিচ্ছিলেন। আর নব্বই দশকের শুরুতেই পরিন্দা তে তো তিনি একেবারে সর্বজনের মনের মাঝে ঢুকে পড়লেন।

ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। অনিল – মাধুরী তখন খুবই বিখ্যাত জুটি। জ্যাকিও নায়ক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। তার মাঝে নিজের জায়গা করে নেওয়া রীতিমতো শক্ত ছিল। পরে জানা যায় প্রথমে নানার জন্য ঠিক করা হয়েছিল বড় ভাইয়ের চরিত্র। ভিলেন চরিত্রে ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ। পরে নাসিরুদ্দিন কাজ করতে না পারায় ঐ চরিত্রে নানার আবির্ভাব। নানা পরিচালকের সঙ্গে আলাপ, আলোচনা ও ঝগড়া করে চরিত্রটিকে নিজের মনোমত করে সাজান। 

এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ে। একবার ব্যাঙ্গালোরে বসে আমরা বন্ধুরা মিলে ‘পরিন্দা’ তে নানার অভিনয় নিয়ে আমাদের মুগ্ধতা আলোচনা করছিলাম। প্রায় তক্ষুনি টিভিতে ঘোষণা এল যে নানা পাটেকর ঐ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন। হঠাৎ এক অদ্ভুত আনন্দ হয়েছিল।

নানার সম্পর্কে অনেক গল্প কথাই জড়িত। তাঁর রাগ, চেঁচামেচি, – সেটে নানারকম ঝামেলা করা, পরিচালকের ওপর কথা বলা, সহ অভিনেতাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা। অন্যদিকে আবার অনেকেই বলেন তিনি এক সহৃদয় মানুষ। সব মিলিয়ে তিনি যে এক বিশেষ অন্যধারার উজ্জ্বল মানুষ তাতে কোন সন্দেহ নেই। ভারতীয় চিত্রজগতে তিনি তাঁর ছাপ যে রেখে যাবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সত্যজিতের ডাইরিতে তাঁর নামের উল্লেখ নানার কাছে এক বড় পুরস্কার

 

পরিশেষে একটি কথা। একবার পুরস্কার নিয়ে কোন সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন যে তিনি শুনেছিলেন যে সত্যজিৎ রায় তাঁর ডাইরিতে কোথাও তাঁর উল্লেখ করেছেন, লিখেছেন এর সঙ্গে তিনি সুযোগ পেলে কাজ করতে চান।

নানা অকপটে সেই সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এই উল্লেখ তাঁর কাছে অনেক পুরস্কারের চাইতে বড় সম্মান।

জন্ম কলকাতায়, বেড়ে ওঠা দক্ষিণ চব্বিশ-পরগনার রাজপুর-সোনারপুর অঞ্চলে। ১৯৮৩ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রনিক্স ও টেলিকম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে। শখের মধ্যে অল্প-বিস্তর বাংলাতে লেখা - অল্প কিছু লেখা রবিবাসরীয় আনন্দবাজার, উনিশ-কুড়ি, নির্ণয়, দেশ, ইত্যাদি পত্রিকায় এবং বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিন (সৃষ্টি, অবসর, অন্যদেশ, পরবাস ইত্যাদিতে) প্রকাশিত। সম্প্রতি নিজের একটি ব্লগ চালু করেছেন – www.bhaskarbose.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *