বদলে যাওয়া পুজোর মেজাজ
দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনের এক চিরন্তন উৎসব, সেই অনন্ত অতীতকাল থেকেই। কিন্তু মানুষের জীবনযাপন ও কাজের ধরনের রকমফেরে এখন পুজোর ছুটি কাটানোতেও বেশ খানিকটা বদল এসেছে। আধুনিক প্রজন্ম ধীরে ধীরে মানসিকভাবেও কসমোপলিটান হয়ে উঠছে। এই মানসিকতার উদাহরণ পাওয়া যায় একটু আশেপাশে তাকালেই, আমাদের চারপাশের চেনা মানুষগুলির মধ্যেই।
এই যেমন আমার বন্ধু সোমার ছেলে। সে এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। এবারই প্রথম সে একা বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোবে। ওরা জেন জি, আর ওদের পরিকল্পনাও তাই একেবারে ছকে-বাঁধা। হাতে গোনা কয়েকটা ঠাকুর দেখবে, তাও মূলত দক্ষিণ কলকাতার, যতটা হেঁটে দেখা যায় আর কী! তারপর মেট্রো ধরে সোজা পার্ক স্ট্রিট। সেইমতো পকেট ভারী করেই সবাই বেরোবে। সেখানে জম্পেশ করে ডান হাতের কাজ সেরে তবে বাড়ি ফেরা।
আমাদের কথা ভাবলে হাসি পায়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি আমরা ঠাকুর দেখেই হা-ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। সারা দিন ধরে এ-পাড়া থেকে ও-পাড়া, এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেলের লম্বা লাইন, ভিড়ে ঠেলাঠেলি, পা টনটন করছে, তবু ‘আর একটা’ দেখার নেশা। খাওয়াদাওয়া ছিল উপলক্ষ মাত্র, পথের ধারের রোল বা ফুচকা, আর বড়োজোর বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের খিচুড়ি। ঠাকুর দেখাটাই ছিল আসল কাজ, বাকি সব তার আনুষঙ্গিক।
এই প্রজন্মের হিসেব অন্য। ওদের কাছে পুজো মানে শুধু প্যান্ডেল পরিক্রমা নয়, একটা সম্পূর্ণ ‘অভিজ্ঞতা’, যার মধ্যে ঠাকুর, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া আর ছবি, সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওরা শক্তি খরচ করে ক্লান্ত হওয়ার আগেই, তাজা থাকতে থাকতেই খাবারের সেলফিগুলো তুলে নিতে চায়। তাদের পুজোর অ্যালবামে থাকে প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়ানো ছবি, তেমনি থাকে পার্ক স্ট্রিটের প্লেটভরা খাবারের ছবিও। ছবি তোলা এখন আর স্মৃতি ধরে রাখার উপায় মাত্র নয়, সেটা নিজের উদযাপনকে বন্ধুদের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটা ভাষা।
পুজোর রকমফেরের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জায়গাটা হল প্যান্ডেল। এক সময় প্যান্ডেল মানে ছিল বাঁশ আর কাপড়ের সাদামাটা চালচিত্র, বড়োজোর একটু জমকালো তোরণ। আজ সেখানে থিমের রাজত্ব। কোথাও গ্রামবাংলার মাটির ঘর তুলে আনা হয়েছে শহরের বুকে, কোথাও পুরোনো কলকাতার ট্রাম ডিপো, কোথাও বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস দিয়ে গড়া বিশাল স্থাপত্য। কোথাও প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকলে মনে হয় কোনো জাদুঘরে এসে পড়েছি, কোথাও আবার আলোর খেলায় গোটা চত্বরটাই যেন স্বপ্নের দেশ।
শিল্পী, স্থপতি আর আলোকশিল্পীরা এখন পুজোকে নিজেদের ক্যানভাস করে নিয়েছেন। প্রতিমার গড়নেও এসেছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কোথাও চিরাচরিত একচালা, কোথাও ভাবনার ছোঁয়ায় একেবারে অন্যরকম দেবীমূর্তি। বছরের পর বছর ধরে এই প্রতিযোগিতা চলছে, আর তার ফলে দর্শকের চাহিদাও বেড়েছে। এখন ‘ঠাকুর ভালো হয়েছে’ বলাটাই যথেষ্ট নয়, শুনতে হয় “থিমটা কী?” বা “কনসেপ্টটা কেমন?”
তবে এই বদলে সবাই খুশি, এমনও নয়। অনেক প্রবীণ মানুষের মনে হয়, থিমের চমকে অনেক সময় দেবীর মুখটাই আড়ালে চলে যায়। আবার নবীনরা বলেন, শিল্পের সঙ্গে ভক্তির তো বিরোধ নেই, বরং দুয়ের মিলনেই পুজো আরও প্রাণবন্ত হয়। এই তর্ক আসলে পুজোর প্রাণশক্তিরই লক্ষণ। যে উৎসব নিয়ে মানুষ এত ভাবে, এত বিতর্ক করে, সে উৎসব বেঁচে আছে পুরোদমে।
বদলের আরেকটা দিক হল, পুজোর ছুটি মানেই এখন আর শুধু শহরে থাকা নয়। আমাদের ছোটবেলায় পুজোয় বাইরে যাওয়া মানে ছিল প্রায় বিরল ঘটনা। পুজো তো বাড়িতে, পাড়ায়, শহরে। আজ অনেকে ষষ্ঠীর আগেই ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেন দার্জিলিং, সিকিম, পুরী, গোয়া, কেরালা কিংবা আরও দূরে, থাইল্যান্ড বা ইউরোপে।
এর পেছনে কারণ আছে। কর্মজীবী বাঙালির কাছে দীর্ঘ ছুটির সুযোগ বছরে খুব বেশি আসে না, আর পুজোর ছুটি সেই সুযোগগুলির একটি। তার ওপর ভিড়, যানজট আর গরম-ভ্যাপসা আবহাওয়ার ক্লান্তি এড়াতে অনেকে চান শান্ত কোনো জায়গায় কয়েকটা দিন কাটাতে। ট্রাভেল কোম্পানিগুলিও এখন ‘পুজো স্পেশাল প্যাকেজ’ বানিয়ে ফেলে, আর ভাড়া, হোটেল বুকিং হয়ে যায় মাসকয়েক আগেই।
মজার কথা হল, যাঁরা বাইরে যান, তাঁদের মধ্যেও অনেকে সঙ্গে করে পুজোটা নিয়েই যান। পাহাড়ের হোটেলে সপ্তমীর সকালে নতুন জামা পরে ছবি তোলা, পাড়ার বাঙালি সমিতির ছোট্ট পুজোয় গিয়ে অঞ্জলি দেওয়া, কিংবা মোবাইলে ঢাকের রেকর্ডিং চালিয়ে ঘরে বসে আরতির মেজাজ আনা, এই সবই এখন পুজোর নতুন চেহারা। বাঙালি যেখানেই যায়, পুজোকে সঙ্গে নিয়ে যায়।
সেই কথা ধরেই বলা যায়, পুজোর সীমানা এখন আর কলকাতা বা বাংলার মধ্যে আটকে নেই। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সান ফ্রান্সিসকো, সিডনি, সিঙ্গাপুর, যেখানেই বাঙালির বসতি, সেখানেই এখন দুর্গাপুজো। প্রবাসী বাঙালিরা সপ্তাহান্তের ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে হল ভাড়া করে, স্কুলের মাঠ বা কমিউনিটি সেন্টার সাজিয়ে পুজো করেন। প্রতিমা অনেক ক্ষেত্রেই যায় কুমোরটুলি থেকে, জাহাজে বা বিমানে চড়ে।
সেখানকার পুজোর ধরন খানিকটা আলাদা। কর্মদিবসে পুজো পড়লে অনেকেই অফিসের পর সন্ধ্যায় এসে অঞ্জলি দেন, আর মূল উৎসব জমে ওঠে শনি-রবিবারে। ভোগের লাইনে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি আর লাবড়া খাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছোটদের নাচ, গান ও আবৃত্তি, বাংলা ভাষার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের যোগসূত্র রক্ষার এক অলিখিত চেষ্টা—এসবই সেখানে পুজোর অংশ। অনেক সময় ভিনদেশি প্রতিবেশীরাও আসেন, শাড়ি পরে ছবি তোলেন, ভোগ চেখে দেখেন। ফলে দুর্গাপুজো এখন প্রকৃত অর্থেই এক বিশ্ব-উৎসব।
মনে রাখার মতো একটা তথ্য, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপুজোকে মানবজাতির ‘অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage)-এর তালিকায় স্থান দিয়েছে। এই স্বীকৃতি বাঙালির গর্বের বিষয় তো বটেই, সেই সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দেয় যে পুজো আজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়— এক জীবন্ত সংস্কৃতি।
প্রযুক্তি পুজোর চেহারা বদলে দিয়েছে বেশ গভীরভাবে। আগে কোনো ঠাকুর ভালো, কোথায় ভিড় কম, তা জানার উপায় ছিল আত্মীয়স্বজন আর পাড়ার লোকের মুখের কথা কিংবা পুজোসংখ্যার পত্রিকা। এখন গুগল ম্যাপে প্যান্ডেলের লোকেশন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিড়ের লাইভ আপডেট, ইউটিউবে প্রতিটি থিমের ভিডিও—সবই হাতের মুঠোয়। অনেকে আগে থেকেই ঠিক করে ফেলেন কোন পথে কোন ক্রমে ঠাকুর দেখবেন, যেন এক নিখুঁত রুট-ম্যাপ।
ইনস্টাগ্রাম রিল আর ছবির কল্যাণে প্যান্ডেল এখন এক ধরনের ‘ফটো-স্পট’। সাজপোশাক থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড, সবই ভাবা হয় ছবির কথা মাথায় রেখে। কেউ কেউ এ নিয়ে অভিযোগ করেন যে মানুষ ঠাকুরের দিকে না তাকিয়ে ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে থাকে। কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়। তবে এও সত্যি যে এই ছবিগুলোই দূরে থাকা আত্মীয়, প্রবাসী বন্ধু বা অসুস্থ ঠাকুরমাকে পুজোর ছোঁয়া পৌঁছে দেয়। ভিডিও কলে ঠাকুর দেখানো, লাইভ স্ট্রিমে আরতি দেখা—এসবের মধ্যে একটা আন্তরিকতা আছে, যা আগের দিনে ভাবাই যেত না।
কেনাকাটাতেও একই বদল। এক সময় পুজোর জামাকাপড় কিনতে দল বেঁধে যাওয়া হত নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাট বা হাতিবাগানে, আর সে ছিল এক বিরাট অভিযান। আজ অনেকেই অনলাইনে অর্ডার দেন, বাড়ির দরজায় প্যাকেট এসে পৌঁছায়। তবু বাজারের সেই ভিড়, দরদাম আর দোকানির ‘দিদি, একবার দেখুন না’ ডাকের টান এখনও অনেককে টেনে আনে। পুরোনো আর নতুন, দুটোই পাশাপাশি চলছে।
পুজোর এই সব বদলের মধ্যেও কিছু জিনিস আশ্চর্যরকম অটুট। যেমন বনেদি বাড়ির পুজো। উত্তর কলকাতার শোভাবাজার, জোড়াসাঁকো বা বাগবাজারের প্রাচীন বাড়িগুলিতে আজও দুশো-তিনশো বছরের পুরোনো রীতি মেনে পুজো হয়। সেখানে নেই থিমের রোশনাই, আছে ঐতিহ্যের গাম্ভীর্য। বংশপরম্পরায় চলে আসা নিয়ম, ঠাকুরদালানের সেই বিশেষ গন্ধ, ধুনোর ধোঁয়া আর কাঁসর-ঘণ্টা—এসবের আকর্ষণ আজও কমেনি। উলটো দিকে, অনেক তরুণ এই বনেদি পুজো দেখতেই ভিড় করে, কারণ এখানে তারা পায় এক হারিয়ে যাওয়া কলকাতাকে।
অন্য দিকে, বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজোর ইতিহাসই তো মিলেমিশে থাকার ইতিহাস। পাড়ার ছেলেমেয়েরা মিলে চাঁদা তোলা, প্যান্ডেল বাঁধা, ভোগের আয়োজন—সবই এক সামাজিক বন্ধনের গল্প। যদিও এখন বড়ো বড়ো পুজো কমিটির বাজেট কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, স্পনসরশিপ আর বিজ্ঞাপনের ভূমিকা বেড়েছে, তবু ছোট পাড়ার পুজোয় সেই আদি আন্তরিকতাটুকু আজও টিকে আছে। সেখানে এখনও দাদা-কাকিমারা মিলে খিচুড়ি রাঁধেন, ছোটরা প্রসাদ বিলি করে, আর বিজয়ার দিনে সবাই সবাইকে প্রণাম করে।
একটি ইতিবাচক বদল হল পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা। কয়েক বছর আগেও প্লাস্টিক, থার্মোকল আর রাসায়নিক রঙের ব্যবহার ছিল প্রায় অবাধ। আজ অনেক পুজো কমিটি মাটি, বাঁশ, কাপড়, পাট আর প্রাকৃতিক রঙে প্যান্ডেল ও প্রতিমা গড়ার চেষ্টা করছে। ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি পুজো’ এখন এক জনপ্রিয় শব্দবন্ধ। বিসর্জনের সময় নদীর জলদূষণ কমানোর জন্যও নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোথাও কোথাও প্রতিমার কাঠামো পুনর্ব্যবহারও হচ্ছে।
সামাজিক ভাবনাতেও পুজো এখন অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক। কোথাও পুজো পরিচালনা করেন মহিলারা, কোথাও পুরোহিতের আসনে বসেন নারী, কোথাও থিমের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সমকালীন সামাজিক বার্তা—যেমন নারী সুরক্ষা, পরিবেশ রক্ষা কিংবা শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম। কোথাও প্রান্তিক শিল্পী, ঢাকি বা মৃৎশিল্পীদের সম্মান জানানো হয়। দুর্গা তো নিজেই শক্তির প্রতীক, ফলে এই বদল যেন দেবীর ভাবনারই যুক্তিসংগত পরিণতি।
জেন জির প্রসঙ্গে যেখান থেকে শুরু, সেখানে ফিরে আসা যাক। খাওয়া-দাওয়ার চেহারাও বদলেছে দারুণভাবে। আগে পুজোর খাবার বলতে ছিল ভোগের খিচুড়ি, লুচি-আলুর দম, রোল, চাউমিন আর ফুচকা। এখন তার সঙ্গে জুড়েছে চিজ-বার্স্ট রোল, কোরিয়ান রামেন, ফিউশন বিরিয়ানি, নানা দেশের ক্যাফে আর অসংখ্য রেস্তোরাঁর ‘পুজো স্পেশাল মেনু’। অনেক নামি রেস্তোরাঁয় পুজোর চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই টেবিল বুক করতে হয়।
পার্ক স্ট্রিট এই খাওয়া-দাওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পুজোর সন্ধ্যায় আলোয় সাজানো সেই রাস্তায় হেঁটে যাওয়া, রেস্তোরাঁর বাইরে অপেক্ষার লাইন—এ যেন নিজেই এক উৎসব। যাঁরা ঘরে থাকেন, তাঁরা অ্যাপে অর্ডার দিয়ে বাড়িতেই ভোজের আয়োজন করেন। আবার অনেক পরিবার আজও অষ্টমীর দিন সবাই মিলে বাড়িতে বসে মাংস-ভাত খাওয়ার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বাঙালির পুজো আর খাওয়া, দুটোকে আলাদা করা যায় distractions না, শুধু খাওয়ার জায়গা আর ধরন বদলেছে।
পুজোর বদলের আরেকটা দিক হল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। আগে ভিড় সামলানো ছিল মূলত পুজো কমিটি আর পাড়ার স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব। এখন সিসিটিভি, ড্রোন, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা, মেট্রোর বাড়তি পরিষেবা—সবই পুজোর অংশ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, ফলে অনেক এলাকা পথচারীদের জন্য মুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে ছোট ছেলেমেয়েরা বা প্রবীণরাও তুলনামূলক নিশ্চিন্তে পুজো দেখতে বেরোতে পারেন।
কলকাতায় বিসর্জনের শোভাযাত্রাকে ঘিরে ‘দুর্গাপুজো কার্নিভাল’-এর আয়োজনও এখন এক বড়ো আকর্ষণ। বিভিন্ন পুজো কমিটির প্রতিমা, ঢাকের দল, নাচ ও ট্যাবলো নিয়ে রাস্তায় যে রঙিন মিছিল বের হয়, তা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসেন। এভাবে বিদায়ের বিষণ্নতার ওপরেও লেগেছে উৎসবের রং।
তবু, একই থাকে ভেতরের সুর
এই বদলকে শুধু ‘আজকালকার ছেলেপুলে’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কাজের ধরন বদলেছে, ছুটির হিসেব বদলেছে, শহরও বদলেছে। মেট্রো এখন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তকে মিনিটের ব্যবধানে জুড়ে দিয়েছে, ফলে আগের মতো দিনভর হেঁটে বা বাসে ঝুলে ঠাকুর দেখার প্রয়োজনই কমে গেছে। অনেকে আবার পুজোর ছুটিতে শহর ছেড়েই পেরিয়ে পড়ে—পাহাড়ে, সমুদ্রে বা বিদেশে। যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁরাও নিজের মতো করে বেছে নেন কোনো ঠাকুর, কোনো থিম, কোনো খাবার।
তবু একটা জায়গায় প্রজন্মের ভেদ ঘুচে যায়। আমরা হা-ক্লান্ত হয়েই ঠাকুর দেখি, আর ওরা সেলফি তুলেই ঠাকুর দেখে। কিন্তু দুজনেই ষষ্ঠী থেকে দশমীর সেই আলাদা আবহাওয়ার অপেক্ষায় থাকি। আকাশে শরতের নীল, বাতাসে শিউলির গন্ধ, কাশফুলের দুলুনি, আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ—এই সব কিছু আজও একইভাবে বুকের ভেতরটা নাচিয়ে তোলে। মহালয়ার ভোরে রেডিওর সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর আজ হয়তো শোনা হয় ফোনে বা ইউটিউবে, কিন্তু গায়ে কাঁটা দেওয়ার অনুভূতিটা একই থাকে।
সোমার ছেলে যখন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বেরোবে, তখন হয়তো সে জানেও না যে সে এক দীর্ঘ ধারার অংশ। তার ঠাকুরদা-ঠাকুরমা হয়তো গরুর গাড়িতে বা পায়ে হেঁটে ঠাকুর দেখেছেন, বাবা-মা দেখেছেন ভিড়ের ঠেলায় ক্লান্ত হয়ে, আর সে দেখবে মেট্রো ধরে, ফোনে ছবি তুলে। মাধ্যম বদলেছে, পথ বদলেছে, কিন্তু গন্তব্য সেই একই: আনন্দ, মিলন আর একটু বেশি করে একসঙ্গে থাকা। হয়তো একদিন সে-ও এই দিনগুলোকে স্মৃতির সিন্দুকে তুলে রাখবে—ঠিক যেমন আমরা রেখেছি নব্বইয়ের সেই ক্লান্ত অথচ মধুর পুজোগুলোকে।
পুজো বদলায়, বাঙালিও বদলায়, শুধু বদলায় না পুজোর মন।
———-
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
