টিয়ারঙা দ্বীপ এবং জারোয়াজাতি

ব্রততী সেন দাস

[লেখক পরিচিতি: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুবাদ সাহিত্যের ওপর কোর্স করেছেন। চাকরি করেছেন, স্কুলে পড়িয়েছেন, এবং সমাজসেবার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। লেখক জীবন শুরু অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে। প্রথম অনুবাদ করেন নবারুণ ভট্টাচার্যের "ভাষাবন্ধন" পত্রিকায়। তাঁর non-fictional, ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ বাংলা প্রকাশনী জগতের প্রথম সারির প্রকাশন সংস্থা প্রকাশ করেছে। মূলত ছোটগল্পই, এছাড়া ভ্রমণকাহিনি, নিবন্ধও লিখেছেন। তাঁর লেখা দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা রবিবাসরীয়, যুগশঙ্খ, উত্তরবঙ্গ সংবাদপত্র, ফেমিনা, প্রভৃতি অসংখ্য ম্যাগাজিনে এবং বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। ]

সকালে চোখ মেলতেই মৃদু উত্তেজনা অনুভব করলাম। যত বেলা বাড়তে লাগল উত্তেজনার পারদ যেন বেড়েই চলল। বেড়াতে এসে নতুন জায়গা দেখার কম বেশি উত্তেজনা সবার মধ্যেই কাজ করে, আর জায়গাটা যদি আন্দামানের মত বঙ্গোপসাগরীয় দ্বীপ হয় তাহলে আশ্চর্যের কিছু নেই।

আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এমন এক বিস্ময়জনক রোমাঞ্চকর জায়গা, যেখানে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, এবং মানবিক কীর্তির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন চোখে পড়ে। আন্দামান নিকোবরের ছড়ানো ছেটানো দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে এমন অনেক দ্বীপ ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে যা অস্পৃষ্ট, যেখানে মানুষের পদচিহ্ণ কোনদিন পড়েনি। এমন অনেক বেলাভূমি আছে যেখানে সাগরের ঢেউ সৃষ্টির আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত প্রেমাভিলাষে নিরালায় ক্রীড়ারত। বারে বারে সমুদ্র এসে তার সিক্ত ওষ্ঠে বেলাভূমির পদচুম্বন করে চলেছে আর তীরভূমি নীরব অহঙ্কারে সে সমর্পণকে হেলায় ঠেলে দিচ্ছে। এমন অনেক বনভূমি-ঝর্ণা-গুহা আছে যেখানে কোনদিন কোনো মানব কণ্ঠস্বর অনুরণিত হয়নি।

আন্দামানে আসা ইস্তক এই চিন্তাই আমাকে মোহিত করে রেখেছে যে এই একবিংশ শতকে এখনও মানুষ প্রকৃতির কাছে কতটা অসহায় আর ক্ষুদ্র। পাহাড়ের চূড়া, মাটি বা সমুদ্রের নিচে, ঘন জঙ্গল, গভীর গিরিখাত, কোথাও অনুপ্রবেশ সে বাদ দেয়নি। কিন্তু এই আন্দামান আর নিকোবরকে যেন সেরকমভাবে করায়ত্ত করতে পারেনি। কারণ এ বড় রহস্যজনক, দুর্গম আর দুর্লঙ্ঘনীয়। সেই সঙ্গে মানব সভ্যতা থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছুক কিছু জনজাতির বসবাসও তথাকথিত সভ্য মানুষের আগ্রাসনকে একটু স্থিমিত করেছে। সভ্য মানুষ ‘অসভ্য” মানুষের দ্বারা প্রতিহত এ বড় আশ্চর্যজনক কাহিনী। যারা নিজেদের “সভ্য” বলে দাবী করে সে সব শহুরে শিক্ষিত মানুষের মত বেপরোয়া, অদমিত ও ক্ষমতালিপ্সু প্রাণী সব সময় শান্তিপ্রিয় নিভৃতচারীকে নিজের কুক্ষিগত বা পদানত করতে চেষ্টা করে, সে মানুষই হোক বা অন্য জীবজন্তু। কিন্তু এখানকার জনজাতি তাদের সে সুযোগ দেয়নি। এরা নিজেদের শর্তে জীবনধারণ করা পছন্দ করে, কারোর চাপিয়ে দেওয়া নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। বরং ওদের জীবনে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টাকে এরা অনায়াসে উৎপাটিত করে। আজ আমার উত্তেজনার কারণ সেই জনজাতির ডেরা হয়ে যাব, গন্তব্যস্থান বরাটাং। তার সঙ্গে আরো এমন একটি জায়গায় যাওয়া হবে যেখানে কোন মানুষ বা পশু নয়, বরং একদল পাখি বাস করে। স্বামীর কর্মসূত্রে আন্দামানে আমার বেশ কয়েকবার ঘোরা হয়ে গেছে। নানা দ্রষ্টব্যস্থল জলপথে, আকাশপথে, বা স্থলপথে ঘুরেছি আর প্রতিবারেই নতুন, কিছু আবিষ্কার করে রোমাঞ্চিত হয়েছি। কিন্তু এবার আমরা একদম অন্য দিকে, অন্য রকম একটা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাব।

আমরা এখন আছি পোর্ট ব্লেয়ারের করবাইন কোভ রোডের হর্নবিল নেস্ট রিসর্টে। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত সমুদ্রমুখী ছোটো কটেজগুলোয় এক অদ্ভুত রকমের আপন আপন ভাব আছে। নিরিবিলিতে সামনের লনে বসে সমুদ্রের ঢেউ গুনতে গুনতে দিন পার হয়ে যায়। রোদ তেরছা হয়ে চুলে তাপ ছড়ায় আর লোনা বাতাস এসে কপালে বিলি কাটে। সমুদ্রে ভেসে যাওয়া ফেরিবোটগুলোর সঙ্গে হিজিবিজি চিন্তা দিব্যি কাটাকুটি খেলে। আন্দামানে এলে আমার মনে হয় চারদিকে এক চাপ ধরা রহস্য খেলে যাচ্ছে। কী যেন একটা অচেনা কাহিনি গুঞ্জরিত হচ্ছে সফেন শ্যাওলা-নীল সমুদ্রে, খাঁড়ির পথে, নারকেল কুঞ্জে বা সোনালি বেলাভূমিতে। সেলুলার জেলের প্রাচীরের মধ্যে থেকে, প্রাকারের ঘন্টাঘর থেকে কত না অত্যাচার, ক্রন্দন, আর্তনাদ, দীর্ঘশ্বাস অনুরণিত হয় যুগ থেকে যুগান্তরে। শুধু মানুষ কেন প্রকৃতির এই সাম্রাজ্যে জীববৈচিত্রেরও সীমা পরিসীমা নেই। নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী আর পাখির পাশাপাশি এই প্রাকৃতিক অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় ডুগঙ্গ। ডুগঙ্গ হল এই রাজ্যের রাজ্যপশু, একে সামুদ্রিক গরু বা সমুদ্রের পরীও বলা হয়। এছাড়া রাবার ক্র্যাব, সুইফ্‌টলেট পাখি দেখা যায়। এই পাখির বাসাও খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়। জীববৈচিত্রের এ দিকটা আমরা তো দেখবই কিন্তু যাব একেবারেই এক অন্য কোন জায়গায়, যেখানে আছে টিয়াপাখির সাম্রাজ্য। মনুষ্যবর্জিত এক দ্বীপ, প্যারট আইল্যান্ডে – রাটাং হয়ে সে জায়গা যেতে হয়।

বরাটাং গাড়িতে যেতে হলে গ্রেট আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড বা জি.এ.টি.আর. ধরে যেতে হয়। যাওয়ার পথে দু’পাশে সাধারণ ঘর গেরস্থালির দৃশ্য, ছোট ছোট বসতি, দোকানপাট আর অনুর্বর কৃষি জমি দেখা যায়। নোনা এবং বালিময় মাটিতে সবুজ ফসলের অভাব বড় প্রকট। দু’পাশে গাছ কিন্তু সেখানেও একটা নিঃস্বতা অনুভব করা যায়। বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভ, ক্রান্তীয় বনভূমি, এছাড়া যথেচ্ছ নারকেল আর সুপুরি গাছ আছে।

বরাটাং গাড়িতে যেতে হলে গ্রেট আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড বা জি.এ.টি.আর. ধরে যেতে হয়। যাওয়ার পথে দু’পাশে সাধারণ ঘর গেরস্থালির দৃশ্য, ছোট ছোট বসতি, দোকানপাট আর অনুর্বর কৃষি জমি দেখা যায়। নোনা এবং বালিময় মাটিতে সবুজ ফসলের অভাব বড় প্রকট। দু’পাশে গাছ কিন্তু সেখানেও একটা নিঃস্বতা অনুভব করা যায়। বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভ, ক্রান্তীয় বনভূমি, এছাড়া যথেচ্ছ নারকেল আর সুপুরি গাছ আছে।

জিরকাটাং বনাঞ্চলে ঢুকতে গেলে পারমিশন নিতে হয় কারণ জঙ্গলে আদিম জনজাতি, জারোয়াদের বসতি আছে। এই ক্রমবিলীয়মান জনজাতি সংরক্ষণের জন্য সরকারপক্ষ অনেক রকমের নিষেধাজ্ঞা পর্যটকদের ওপর প্রয়োগ করেছে। যতগুলো ট্যুরিস্ট বাহন ছিল সেগুলো সেনাবাহিনীর গাড়ি দিয়ে এস্কর্ট করে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে জারোয়াদের সঙ্গে কোন অবাঞ্ছিত সমস্যায় কেউ জড়িয়ে না পড়ে ।শহুরে মানুষদের দ্বারা অনেকবারই এরা উতক্ত হয়েছে, আবার অনেক সময় জারোয়ারাও বিষ মেশানো তীর ছুঁড়েছে। দু’পক্ষের সুরক্ষার জন্যেই নানা বিধিনিষেধ। তাই জিরকাটাং সংরক্ষিত বনের মধ্যে পীচ বাঁধানো ৪৯ কিমি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় নির্দেশ দেওয়া হয় কোথাও গাড়ি থামানো চলবে না বা ওভারটেক করা যাবে না, জারোয়া দেখলে তাদের সঙ্গে সখ্যতা জমানোর চেষ্টা বা ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি গাড়ির কাচও নামানো যাবে না।

আমাদের ড্রাইভার বরুণ রাও হায়দরাবাদের ছেলে। কাজের খোঁজে প্রায় ত্রিশ বছর আগে আন্দামানে এসেছিল এবং এখানেই ঘর-সংসার পেতে বসেছে। বরুণ বলল, জারোয়ারা এখন আর অতটা নিভৃতচারী নেই। সরকারের তরফ থেকে মিত্রতাপূর্ণ সহযোগিতায় ওরা এখন ওদের গোপন ডেরা থেকে বেরিয়ে আসছে, বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছে। জঙ্গলের নির্দিষ্ট দূরত্বে ফরেস্ট গার্ড থাকে, তাদের অনেকের সঙ্গে জারোয়াদের দিব্যি সখ্যতা। আমার প্রবল কৌতূহল আর ঔৎসুক্য শেষ পর্যন্ত বাজি জিতে গেল, বেশ কয়েক দফায় আমরা জারোয়া মানুষ দেখলাম। এক জায়গায় দেখলাম দু’তিনজন মা কোলে শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে আরো কয়েকজন ছোটো ছেলে। মায়েদের পরনে স্কার্ট ব্লাউজ, গলায় পুঁতির রঙ-বেরঙের মালা। ছেলেদের পরনে গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। গাড়ি নির্দিষ্ট গতিতে ধীরে চলছিল তাই বেশ ভালভাবে দেখতে পেলাম। ওদের গায়ের রঙ কষ্টিপাথরের মত কালো আর মাথায় কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। এতগুলো পর্যটকের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও বেশ নির্বিকার ভাবভঙ্গী, উদাসীনও। এক জায়গায় দু’জন যুবককে দেখলাম দাঁড়িয়ে গল্প করছে ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে। আরো দু’একজনকে বিক্ষিপ্তভাবে দেখা গেল পরে। আমারও জারোয়া সাক্ষাৎ লাভের বহু বছরের আশা পূর্ণ হল।

অধিকাংশ নৃতত্ত্ববিদদের মতে জারোয়ারা হল বর্তমানে বিলুপ্ত জঙ্গিল উপজাতির উত্তরসূরী। অনুমান করা হয় দু’হাজারেরও বেশি সময় এরা বর্তমান রূপে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে। একসময় জারোয়ারা বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনো রকম সংসর্গ রাখত না কিন্তু গ্রেট আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড তৈরি হওয়ার পর ২০-৩০ বছর হল ওরা ধীরে ধীরে নিজেদের গন্ডির বাইরে বেরোচ্ছে। কেউ কেউ অন্যত্র গিয়ে বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসা করছে, পর্যটকদের সঙ্গে আলাপচারিতা করছে, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিচ্ছে, এমনকি নিজেদের সন্তানদের অক্ষরপরিচয় করানোর চেষ্টা পর্যন্ত করছে। কিন্তু এর একটা ক্ষতিকারক দিকও আছে। চোরা শিকারিরা জারোয়া অধ্যুষিত এলাকায় অনুপ্রবেশ করে বন্য পশু শিকার করছে। এই সব শিকারিরা বাইরে থেকে মদ, গাঁজা ইত্যাদি নেশার জিনিস আমদানি করে পরিবেশ দূষিত করছে। শুধু তাই নয় এই মেলামেশার দরুণ জারোয়ারা অনেক সময় অনেক মহামারি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ইতিপূর্বে বহির্বিশ্বের মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় নানা ধরনের মানুষবাহিত রোগ ছড়িয়ে গিয়ে সারা পৃথিবীতে বহু আদিম জনজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কেননা এই সব রোগ প্রতিরোধ করার মত প্রতিষেধকক্ষমতা ওদের শরীরে কম বা নেই বললেই চলে। তাই ১৯৯৯ এবং ২০০৬ তে হামের মত ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ায় অনেক জারোয়া মারা যায়। বর্তমানে এদের সংখ্যা ২৫০-৪০০। সরকার থেকে জারোয়া এলাকার মধ্যে দিয়ে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি হওয়াতে জঙ্গলে বুনো জন্তু জানোয়ার দেখার সাফারির মত পর্যটকদের জারোয়া সাফারি করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।। এমনকি জারোয়া রমনী বা বালিকাদের প্রতিও কিছু পর্যটকদের দৃষ্টিভঙ্গীও অত্যন্ত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ। তাদের নগ্ন ছবি বা তাদের দিয়ে যৌন ভিডিও বানিয়ে ব্যবসা করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জিরকাটাং জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলাম নীলাম্বর জেটিতে, ওখান থেকে ফেরিতে করে পৌঁছনো হল বরাটাং-এ। বরাটাং-এর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাংলোতে এক রাত কাটানো হল। একটা টিলার ওপরে সাজানো ছিমছাম বাংলো, হাতায় একটা সুন্দর বাগান। পরদিন বিকেলে আমরা প্যারট আইল্যান্ড দেখতে যাবো, ফেরিঘাট থেকে প্রায় ৩০কিমি দূরে অবস্থিত দ্বীপটিতে যেতে হবে স্পীডবোটে।

চারটে স্পীডবোট এগিয়ে চলেছে খাঁড়ির পথে, চারদিকে বিক্ষিপ্ত ছড়ানো বিন্দু বিন্দু দ্বীপ, সমুদ্র থেকে মুখটুকু বার করে আছে শুধু। প্রতিটি বোট সাত-আটজনকে নিয়ে জেটি থেকে রওনা হওয়া গেছে। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, সূর্য মধ্যগগন ছেড়ে পশ্চিমদিকে ঢলে পড়েছে। সমুদ্রের ওপরে একটা মনোরম হাওয়া খেলেছে। একই সঙ্গে রোদের তাপ আর বাতাসের ঝিলিমিলি খুব উপভোগ্য। আমরা, যাত্রীরা, শ্বাসরুদ্ধ করে বসে আছি আর বোট ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে।

বোটভাইরা যেখানটায় এসে নোঙর করল সেখানে তিনদিক ঘিরে আছে জেগে ওঠা টিলার মাথা- ম্যানগ্রোভ বনে ছাওয়া। সেখানে মানুষের পা রাখার কোন জায়গা নেই। দিন দিন প্রকৃতি আর মানুষ কোথাও যেন একে ওপরের পরিপূরক না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। এর জন্য মানুষ কি বেশ কিছু অংশে দায়ী নয়? যেখানে যার স্থান সে সেখানেই সুস্থির থাকে, প্রকৃতি রাজ্যের নিয়মই তাই। পশু-পাখি-মাছ-কীট-পতঙ্গ যে যেখানে বেঁচে থাকার সহায়ক পরিস্থিতি পায় সেখানেই থাকে, ডারউইনের তত্ব Survival Of the fittest প্রকৃতির রাজ্যে অবশ্যই প্রযোজ্য। শুধু মানুষ এই নিয়ম মানে না। বুদ্ধিমান এই প্রাণীটি ধীশক্তি ও বাহুবলের জোরে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে পদার্পণ করে নিজের দাপট স্থাপন করে। বুদ্ধিমান মানুষ কিন্তু সেখানেই পা দেয় যেখানে তার স্বার্থ আছে। সেখান থেকে যদি কোন লাভের মুখ না দেখে তাহলে সে স্থান তার কাছে পরিতায্য! সে কারণে বোধ হয় আন্দামানে ও নিকোবর জনবিরল স্থান, আবার অনেক জায়গায় তো জনমানুষের ছায়া পর্যন্ত নেই। কারণ এখানে বাস্তব লাভ তো কোন ছাড়, টিকে থাকাই এক মস্ত লড়াই!

বোটের ভাইরা বললেন সময় হয়ে গেছে টিয়াপাখিদের বাসায় ফেরার। আমরা উদগ্রীব হয়ে আকাশের দিকে চাইতে লাগলাম কোনদিক থেকে তারা আসে। বোট এক জায়গায় স্থির করে রাখা, অগভীর সমুদ্র, নিচে উপলখন্ড দেখা যাচ্ছে। জল তিরতির করে বয়ে্ চলেছে। স্বচ্ছ জলে হাত দিতে ইচ্ছে জাগে। একবার চেষ্টা করতেই বোট থেকে বারণ করা হল কেন না জলে কুমীর আছে। হঠাৎ একটা ডাক শুনে আকাশের দিকে চাইলাম। গোটা পাঁচেক টিয়া আমাদের মাথার ওপর দিয়ে দ্বীপটির দিকে চলে গেল। এক পাক প্রদক্ষিণ করে যেদিক থেকে এসেছিল সেই পশ্চিম দিকেই চলে গেল। একটু পরে আর একটা বড় দলে এক ঝাঁক টিয়া এলো। ওরা উড়ে এসে বসল নির্দিষ্ট দ্বীপটিতে। এর পর আরও একটা বড় দল এলো। তারপর আরো… আরো… আকাশ বোঝাই করে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া দল বেঁধে উড়ে এসে দ্বীপটির গাছগুলোয় ছেয়ে গেল। তাদের কলকাকলিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে গেল। টিয়াপাখির ডাক আদৌ শ্রবণসুন্দর নয়। আর হাজার হাজার টিয়া নিজেদের দিনান্তের আলাপচারিতা সারতে সারতে বেশ কয়েকটি দ্বীপে গিয়ে ঠাঁই নিল। তারা বিভিন্ন দিক থেকে এসে জড়ো হচ্ছিল, কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকেই যে আসছিল তা নয়। আশ্চর্য লাগল অতগুলো দ্বীপবিন্দু ফেলে এসে তারা কাছাকাছি নির্দিষ্ট কয়েকটি দ্বীপেই কেন বাসা বেঁধেছে? এর নিশ্চয়ই কোন বৈজ্ঞানিক উত্তর আছে যা আমার জানা নেই।

নিস্তব্ধ, নিরালা পটভূমিকা কিছুক্ষণের জন্য সরগরম হয়েছিল টিয়াগুঞ্জনে। সূর্য বিদায়বেলায় রঙের প্যালট থেকে প্রথমে হলুদ, তারপর কমলা, শেষে বেগুনি রঙ নিয়ে আকাশের ক্যানভাসে একের পর এক রঙের ফোয়ারা ছড়িয়ে দিতে লাগল। পরিশেষে টুপ করে ডুবে গেল কোন এক দ্বীপের ওপারে। আচমকা কেমন নৈঃশব্দ এসে গ্রাস করে নিল টিয়ারঙা দ্বীপটিকে। টিয়ারাও সপরিবারে, সবান্ধবে নিজ নিজ কোটরে স্থিতু হয়েছে, তাদের আর সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। চারদিক হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়ায় এক অদ্ভুত ভালো লাগার মায়া নিয়ে আমরা ফিরে চললাম নিজেদের ঠিকানায়। প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতির বরপুত্রদের মানুষের উপদ্রবহীন নিশ্চিন্ত সহাবস্থান আমাকে মুগ্ধ করল। আজও ভাবলে মনে হয় ওই টিয়াপাখিগুলি আমাদের অগ্রাহ্য করে নিজেদের দ্বীপে যেভাবে উড়ে বেড়াচ্ছিল তাতে নিজেদের অনুপ্রবেশকারী মনে করে ফিরে আসা ছাড়া কোন উপায় ছিল না!

লেখকের অন্য লেখা:

    One reply on “টিয়ারঙা দ্বীপ এবং জারোয়াজাতি”

    অনেকদিন বাদে একটি ভালো ভ্রমণকাহিনী পড়লাম। লেখিকার একাধারে কাহিনীকারের মতো ভাষা ও কল্পনা, এই অঞ্চল সম্বন্ধে জ্ঞান এবং সর্বোপরি টিয়াদ্বীপের মতো একেবারে নতুন একটি জায়গা সম্বন্ধে পড়ে মন ভরে গেলো। আরো এমন লেখা চাই অবসরের কাছে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিশেষ আকর্ষণ

    প্রাচ্যের ফরাসি সুগন্ধি – কেরল

    সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

    আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি, কিন্তু ভ্রমণের কল্পনা করতে আমার আরও ভালো লাগে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) রবিঠাকুর উবাচ। আমাদের মতন ভ্রমণপিপাসুদের বেদবাক্য হয়ে থাকবে চিরকাল। বছরে যদি দু’বার ঘুরতে যাওয়া হয়, বাকি সময় কাটে ভ্রমণ কল্পনায়। সেই সময়ের কথা বলছি যখন বিদেশ ভ্রমণ শুধুমাত্র কল্পনায় বাস্তবায়িত হত। সদ্য চাকরি পাওয়া দু’জন নববিবাহিত মানুষ তাই চেষ্টা করত দেশের […]

    Read More

    গিরিশ ঘোষ : বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের পিতা

    সূর্য সেনগুপ্ত

    যদি মিথ্যা কথায় বাপ দাদার নাম রক্ষা করতে হয়, সে নাম লোপ পাওয়াই ভাল।— মিথ্যায় আমার যেন চিরিদিন দ্বেষ থাকে।–মিথ্যায় আমার ঘৃণা, সে ঘৃণা বৃদ্ধ বয়সে ত্যাগ করবো না গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ‘মায়াবসান’ নাটকে (৪:২) কালীকিঙ্করের সংলাপ, (১৮৯৮) [১] ভদ্রলোক রাত্রে শো হয়ে গেলে একটা ভাড়ার গাড়ি ধরে শুঁড়িখানায় গিয়ে বসতেন। ততক্ষণে অবশ্য তিনি অর্ধমত্ত অবস্থায়। […]

    Read More

    নববর্ষের নতুন প্রভাতে

    ভাস্কর বসু

    সে ছিল এক সময়। তখন পয়লা বৈশাখে প্রভাতফেরি বার হত, আগের চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকেই উৎসবের সূচনা হয়ে যেত। গাজনের বাজনা শোনা যেত, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র হাত ধরে চড়কের মেলাতে নতুন জিনিষের আবদার করত। এখন একটু অন্যরকম! বিগত ইংরেজি বছরের দুর্বিষহ স্মৃতিকে পিছনে ফেলে পেরিয়ে এলাম আমরা এই বছরের আরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি সময়। কিন্তু […]

    Read More

    সুকুমার রায়ের নাটক

    সুমিত রায়

    সুকুমার রায়ের (১৮৮৭-১৯২৩) “সুকুমার রায়” হওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিলো না। তার প্রথম কারণ হলো তিনি ছিলেন কোলকাতায় রায়চৌধুরী বাড়ীর ছেলে, তাঁর জীবন উনিশ-বিশ শতকের মধ্যে সেতুর মতো। বাংলা সাহিত্য আর সংস্কৃতির কথা ধরলে সেসময়ে ঠাকুরবাড়ীর পরেই এই রায়চৌধুরীদের নাম করতে হয়। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যের রাজ্যে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই বাংলাদেশে ছাপাখানা এসে গেছে […]

    Read More

    বীরোল

    রিয়া ভট্টাচার্য

    গ্রন্থঃ বীরোল লেখকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনাঃ দ্য ক্যাফে টেবল কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা (genre)। অনেক দিকপাল লেখকের লেখনীর ঝরনাধারায় সিক্ত সাহিত্যমাতৃকার এই অংশ। কিশোর উপযোগী সায়েন্স ফিকশন রচনায় বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তাঁরই সাম্প্রতিকতম উপন্যাস গ্রন্থ বীরোল। এই গ্রন্থে আছে মোট দু’খানি উপন্যাস, “নতুন দিনের আলো” ও […]

    Read More
    +